অবিচল আগন্তুক

মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতা



 

আদী ইবন হাতিম ছিলেন ইয়েমেনের 'তাঈ' গোত্রের মানুষ। তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের সর্দার। ধর্মবিশ্বাসে তিনি ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। [1] নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের ঘটনা।

 

তাঁর নিজ জবানী থেকেঃ

"আমি মদীনায় রাসুলুল্লাহ্(ﷺ) -এর কাছে উপনীত হলাম। তারপর আমি মসজিদে তাঁর সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে সালাম করলাম।

তিনি বললেন, "আগন্তুকের পরিচয় কী ?"

আমি বললাম, "আদী ইবন হাতিম।"

রাসুলুল্লাহ্(ﷺ) উঠে দাঁড়ালেন এবং আমাকে নিয়ে তাঁর ঘরের দিকে রওনা হলেন। ...তিনি আমাকে তাঁর সাথে নিয়ে চলতে উদ্যত হওয়ার মুহূর্তে অতি দুর্বল এক বৃদ্ধা নারী তার সাথে সাক্ষাত করতে এসে তাঁকে দাঁড়াতে বললো। তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার সাথে তার প্রয়োজন সম্পর্কে আলোচনা করলেন।

তখন আমি মনে মনে বললাম, "লোকটি [মুহাম্মাদ(ﷺ)] তো রাজা বাদশাহ্ না!"

তারপর রাসূলুল্লাহ্(ﷺ) আমাকে সাথে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন এবং খেজুরের ছাল ভর্তি একটা চামড়ার আসন এনে আমার পাশে রেখে দিয়ে বললেন, "বসো এটিতে।"

আমি বললাম, "বরং আপনিই বসুন।" তিনি বললেন, "না তুমিই....।"

আমি গদীতে বসলাম আর রাসূলুল্লাহ্(ﷺ) মাটিতেই বসে পড়লেন।

আমি (আদী ইবন হাতিম) মনে মনে বললাম, এটাও কোন রাজার আচরণ হতে পারে না! [2]

 

আদী ইবন হাতিম আশা করছিলেন যে, মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান মুহাম্মাদ(ﷺ) এর মাঝে কিছু হলেও অন্তত রাজা-বাদশাহর আচরণের ছাপ থাকবে। কারণ সে যুগে রাজা বাদশাহদের জীবনাচরণে থাকতো সীমাহীন বিলাসিতার ছাপ। কিন্তু বিলাসিতা তো দূরের কথা, মদীনায় আদী বিন হাতিম দেখতে পেলেন এমন এক মানুষকে, যিনি দীর্ঘক্ষন দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা নারীর প্রয়োজনের কথা শোনেন। যিনি নিজে মাটিতে বসে অতিথীকে গদীতে বসান।

তাঁর চমকের কিন্তু এখানেই শেষ ছিল না! কাহিনীর বাকি অংশ শোনা যাক।

 

 রাসুলুল্লাহ্(ﷺ) বললেন, "আদী ইবন হাতিম, ইসলাম গ্রহণ করে নাও, নিরাপত্তা লাভ করবে।"

 আমি (আদী ইবন হাতিম ) বললাম, "আমি তো একটা ধর্ম অনুসরণ করে চলছি।"

তিনি বললেন, "তোমার ধর্মের সম্পর্কে আমি তোমার চাইতে বেশি অবগত।"

আমি বললাম, "আমার ধর্ম সম্পর্কে আপনি আমার চেয়ে বেশি জানেন?" [3]

 

এরপর রাসুলুল্লাহ্(ﷺ) আমাকে বললেন, "বলো তো হে আদী ইবন হাতিম, তুমি কি ‘রাকুসী' [4] নও?"

আমি বললাম, হ্যাঁ, তাই বটে!

তিনি বললেন, "তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ লাভ করতে না?" 

আমি বললাম, "হ্যাঁ।"

 তিনি বললেন, "তোমার ধর্ম অনুযায়ী তো সেটা তোমার জন্য বৈধ ছিল না।"

আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, যথার্থ বলেছেন।"

 

আদী বলেন; এতক্ষণে আমার বুঝতে বাকি থাকল না যে, তিনি একজন প্রেরিত নবী। যা বলা হয় না, তাও তিনি জানেন। [5]

 

ঘটনার এ পর্যায়ে আমাদের জন্য কিছু ভাবনার খোরাক রয়েছে। খ্রিষ্টান ধর্মের বহু দলবিভাজন সেই প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। [6] ৭ম শতাব্দীতেও অনেকগুলো খ্রিষ্টান ফির্কা বা দল (sect) আরব ভূমিতে ছিল। আদী বিন হাতিমের সাথে প্রথম দেখাতেই মুহাম্মাদ(ﷺ) বলে দিলেন তিনি কোন খ্রিষ্ট ধর্মীয় দলের সদস্য। এরপর তাদের ধর্মবিশ্বাসের একটি বিশেষ বিধানও বলে দিলেন। কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কি এমন কিছু করা সম্ভব? আদী ইবন হাতিমও এ ব্যাপারটি বেশ বুঝতে পারছিলেন।

 

মানুষের ভেতরে একটা প্রবৃত্তি থাকে যে, সে সব সময় শক্তিমানের অনুসরণ করতে চায়। আদি আদী ইবন হাতিমও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

 

তখন তিনি [নবী(ﷺ)] বললেন,  "শোনো, ইসলাম গ্রহণে তোমার জন্য বাধা কি তা আমি ভালো করেই জানি। তোমার ধারণা, দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা এ দ্বীনের অনুসারী হয়েছে। যাদের কোন শক্তি সামর্থ্য নেই, ওদিকে গোটা আৱব তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দঁড়িয়েছে। ... হীরা শহর কোথায় তুমি জানো?"

আমি (আদি আদী ইবন হাতিম) বললাম, "তা দেখার সুযোগ হয়নি। তবে লোকমুখে তার কথা শুনেছি।"

তিনি বললেন, “যাঁর হাতে আমার জীবন তার কসম! আল্লাহ অবশ্যই এ দ্বীনকে এমন পূর্ণতা দেবেন যে, কোনো হাওলানাশীনা (পর্দানশীন মহিলা) সুদুর হীরা থেকে সফর করে এসে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবে, তাতে কোন লোকের আশ্রয় দানের প্রয়োজন তার হবে না (অর্থাৎ তার কোনো ভয় থাকবে না)। আর হরমুয পুত্র খসরুর [7] ধনাগার অবশ্যই বিজিত হবে।"

"সেদিন দূরে নয়, যখন শুনতে পাবে বাবিলের [8] শ্বেত প্রাসাদগুলো মুসলিমদের হাতে বিজিত হয়ে গেছে।" [9]

আমি বললাম, "সম্রাট হরমুযের পুত্রের ধনাগার ?!!"

তিনি বললেন, "হ্যাঁ! হুরমুয পুত্র খসরুর ধনভাণ্ডারই।

আর সম্পদের এত ছড়াছড়ি হবে যে, তা নেওয়ার মত কোন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।" [10]

 

আদী ইবন হাতিম ইতিমধ্যেই পর্বেক্ষণ করেছিলেন মুহাম্মাদ(ﷺ) চরিত্রমাধুর্য। এরপর লক্ষ্য করলেন ওহীর মাধ্যমে ভবিষ্যতবাণী করার গুণাবলী। এমন ভবিষ্যতবাণী যা সাধারণ মানুষ করতে পারে না। এগুলো নবীদের বৈশিষ্ট্য। ইসলাম গ্রহণ করলেন আদী ইবন হাতিম। রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু - আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন।

 

রাসুলুল্লাহ্(ﷺ) এর করা এই ভবিষ্যতবাণীগুলো কি সত্য হয়েছিল? আদী ইবন হাতিম(রা.) নিজেই এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।

 

এ প্রসঙ্গে আদী(রা.) বলেছেন, "আমি দেখেছি যে, পর্দানশীন মহিলারা হীরা হতে এসে কা‘বা ঘরে তাওয়াফ করছে এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোন কিছুরই ভয় নেই। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি নিজেই সে সব লোকজনের মধ্যে ছিলাম যারা  হুরমুযের পুত্র খসরুর (কিসরা) ধন-ভাণ্ডার জয় করেছিল। তাছাড়া, তোমাদের জীবন যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তোমরাও ঐ সব কিছু দেখে নিতে পারবে যা নবী আবুল কাসিম [মুহাম্মাদ(ﷺ) এর উপনাম] বলেছেন যে, মানুষ হাত ভর্তি করে সোনা-রুপা বের করবে।" [11]

 

সে সময়ে হীরা নগরী থেকে মক্কা পর্যন্ত যাত্রাপথটি ছিল লুটেরাদের দ্বারা ছিনতাই ও রাহাজানীতে পূর্ণ। [12] এমন অপরাধপ্রবন একটি যাত্রাপথ চরমভাবে নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন হয়ে যাবে - এমন জিনিস ভবিষ্যতবাণী করা কোনো সাধারণ কথা নয়। পারস্য সাম্রাজ্য ছিল সে কালের পরাশক্তি। সে সময়ের দুর্বল মুসলিমরা এমন পরাশক্তিকে পরাজিত করবে - এমন ভাবনা ছিল কষ্ট কল্পনারও অতীত। কিন্তু এমন একটি জিনিসের ব্যাপারেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন মুহাম্মাদ(ﷺ)। এমনকি যে রাজার পতন হবে তার নামটিও তিনি বলে দিয়েছিলেন। কোনো যুক্তিবান মানুষ কি এ রকম ব্যাপারগুলোকে "স্রেফ কাকতালীয়" বলে উড়িয়ে দিতে পারবে?

 

যে মানুষটি স্বয়ং আল্লাহর রাসুল(ﷺ) এর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, যে মানুষটি আল্লাহর রাসুল(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতার সাক্ষ্য বহন করেছেন, তাঁর ঈমান যে দৃঢ় হবে এটাই স্বাভাবিক। এবং হয়েছেও তাই। রাসুল(ﷺ) এর মৃত্যুর পর কয়েকটি গোত্র ইসলাম ত্যাগ করেছিলো। এর মধ্যে আদী(রা.) এর তাঈ গোত্রও ছিল। এ মিছিলের মাঝেও ইসলামে অবিচল ছিলেন আদী ইবন হাতিম(রা.)। শুধু তাই না, তাঁর একক প্রচেষ্টায় তাঁর সম্পূর্ণ গোত্র পুনরায় ইসলামে ফিরে এসেছিলো। [13]

 

এভাবেই চোখের সামনে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ প্রত্যক্ষ করেছেন আদী ইবন হাতিম(রা.)। এবং সে অনুযায়ী সর্বদা ইসলামের উপর অবিচল ছিলেন তিনি। যেসব বস্তুবাদী গবেষক ইসলামী সূত্রগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চান, তাদের জন্য ভাবনার খোরাক হয়ে থাকুক এ বিষয়টি।

 

"...আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য"

(আল কুরআন, ত্ব-হা ২০ : ১৩২)

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] ‘সীরাতুন নবী(সা.)’ - ইবন হিশাম [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৭।

[2] 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া' - ইবন কাসির [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৫।

[3]  'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া' - ইবন কাসির [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৮-১২৯।

[4]  সে যুগের আরব অঞ্চলের এক বিশেষ খ্রিষ্টান দল রাকুসী (ركوشيا)। মূলধারার খ্রিষ্টবাদ ও সাবিঈ মতবাদের মাঝামাঝি একটি মতবাদের অনুসারী সম্প্রদায় বিশেষ। তারিখ আত তাবারী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৬৬ দ্রষ্টব্য।

[5]  ‘সীরাতুন নবী(সা.)’ - ইবন হিশাম [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৯-২৫০।

[6]  ■ "List of Christian denominations - Wikipedia"

https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Christian_denominations

■ "GNOSTICS, THOMASINES AND EARLY CHRISTIAN SECTS _ Facts and Details"

http://factsanddetails.com/world/cat55/sub352/item1417.html

■ "BBC - History - Ancient History in depth_ Lost and Hidden Christianity"

http://www.bbc.co.uk/history/ancient/romans/losthiddenchristianity_article_01.shtml

[7]  খসরু বা কিসরা।

"...Khosrow II (Chosroes II in classical sources; Middle Persian: Husrō(y)), entitled "Aparvēz" ("The Victorious"), also Khusraw Parvēz (New Persian: خسرو پرویز), was the last great king of the Sasanian Empire, reigning from 590 to 628.

He was the son of Hormizd IV (reigned 579–590) and the grandson of Khosrow I (reigned 531–579). He was the last king of Persia to have a lengthy reign before the Muslim conquest of Iran, which began five years after his death by execution. .."

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

https://en.wikipedia.org/wiki/Khosrow_II

[8]  ব্যাবিলন (Babylon); তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের (Persian Empire) অন্তর্গত অঞ্চল।

[9]  বাবিলের শ্বেত প্রাসাদ বিজয়ের কথাটি ইবন হিশামের রেওয়ায়েতে আছে। ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০ দ্রষ্টব্য।

[10]  'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া' - ইবন কাসির [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৯।

[11]  সহীহ বুখারী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫০৭; 'আর রাহীকুল মাখতুম' - শফিউর রহমান মুবারকপুরী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) পৃষ্ঠা ৪৮৯।

[12]  'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া' - ইবন কাসির [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩০।

[13]  'তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক' - ইমাম তাবারী(র.), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮৩