আল কুরআনে কি আসলেই মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেবার মত 'আক্রোশপূর্ণ' বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে?

নৈতিকতা বিষয়ক



নাস্তিক প্রশ্নঃ সমস্ত মানুষ যদি আল্লাহর সৃষ্টি হয় তবে কেমন করে নিজ সৃষ্টির প্রতি(যারা অবিশ্বাসী)তিনি এতো আক্রোশপূর্ণ বাণী(Quran 2: 191) উচ্চারণ করতে পারেন যা মানুষের মাঝে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়?

 
উত্তর: নাস্তিক-মুক্তমনাদের ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো out of context কোট করা নয়তো অর্থের বিকৃতি ঘটিয়ে প্রকাশ করা। এই উল্লেখিত আয়াতের ক্ষেত্রেও তারা একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। তাদের এ স্বরূপটি উন্মোচিত হবে ইন শা আল্লাহ।
 
আল্লাহ কুরআনুল কারীমে বলেন: "আর যেখানে পাও, তাদেরকে হত্যা কর এবং যেখান থেকে তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার কর। ফিতনা (অশান্তি, শিরক বা ধর্মদ্রোহিতা) হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর। আর মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) নিকট তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না; যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তবে তোমরা তাদের হত্যা কর। এটাই তো অবিশ্বাসীদের প্রতিফল।" [1]
 
মক্কায় মুসলিমরা যেহেতু দুর্বল ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, তাই কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করা নিষেধ ছিল। হিজরতের পর মুসলিমদের সমস্ত শক্তি মদীনায় একত্রিত হলে তাদেরকে জিহাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা হতো, যারা অগ্রিম মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসত। এরপর এটাকে আরো সম্প্রসারিত করা হয় এবং মুসলিমরা প্রয়োজন অনুযায়ী কাফিরদের অঞ্চলে গিয়েও জিহাদ করেন। কুরআন কারীমে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই জন্য নবী করীম(ﷺ) স্বীয় সৈন্যদের তাকীদ করতেন যে, খিয়ানত ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না। আঙ্গিক বিকৃতি ঘটিয়ো না। শিশু, মহিলা এবং গির্জায় উপাসনায় মগ্ন উপাসক বা পুরোহিতদেরকে হত্যা করো না। অনুরূপ বৃক্ষাদি জ্বালাবে না এবং বিনা উদ্দেশ্যে পশুদের হত্যা করবে না।[2]
 
"যেখানে পাও তাদেরকে হত্যা কর’’ এর অর্থ হল, যখনই তাদেরকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তখনই তাদেরকে হত্যা কর।” {আইসারুত তাফসীর} 
 
অর্থাৎ, যেভাবে কাফিররা তোমাদেরকে মক্কা থেকে বের করেছিল, সেভাবে তোমরাও তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার কর। তাইতো মক্কা বিজয়ের দিন যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, চুক্তির সময় সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘ফিতনা’র অর্থ, কুফরী ও শিরক। এটা হত্যার চেয়েও কঠিন (বড় অপরাধ) । তাই এর মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে জিহাদ থেকে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। ‘হারাম’ সীমানায় যুদ্ধ করা নিষেধ। কিন্তু কাফিররা যদি ‘হারাম’-এর মর্যাদার খেয়াল না রাখে, তাহলে তোমাদেরও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি রয়েছে।
 
এ তো গেলো আয়াতের ব্যাখ্যা। এবার নাস্তিক-মুক্তমনা শ্রেণী যে আল্লাহর প্রতি অভিযোগ এনেছে আল্লাহ নাকি 'আক্রোশ পূর্ণ বাণী'(!) প্রচার করেন তার সৃষ্টি সম্পর্কে এর ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে আল্লাহ তাঁর সমগ্র সৃষ্টির প্রতি যেমন দয়াবান তেমনি ন্যায়বিচারক। আল্লাহ যেমন তাঁর অবিশ্বাসী বান্দাদের প্রতি ন্যায়বিচার করেন (বাকারাহ : ১৯২-১৯৩) তেমনি তাঁর বিশ্বাসী বান্দার প্রতিও করেন। একজন স্বাভাবিক মানুষও যদি সূরা বাকারার ১৯০-১৯৩ নং আয়াত পড়ে তাহলে তার মনে এ ধরনের অসুস্থ প্রশ্নের উদয় হবার কথা নয়।
 
এখানে তো কাফিররা মুসলিমদের যেখান থেকে বহিষ্কার করেছে, তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করতে বলা হয়েছে। তারা যদি যুদ্ধ করে, তাহলেই কেবল তাদের মারতে বলা হয়েছে। এখানে 'আক্রোশ' কোথায়? মক্কার কুরাইশরা মুসলিমদের ঘর-বাড়ী থেকে বহিষ্কার করল, তাদেরকে সামাজিক বয়কট করল, এত সাহাবীকে হত্যা করল [3] সেগুলো নাস্তিক-মুক্তমনাদের চোখে 'আক্রোশ' হয়ে ধরা দিল না, আর তাদের কর্মকাণ্ডের জবাবমূলক যে যুদ্ধে নির্দেশ কুরআনে দেয়া হল সেটাতেই তারা 'আক্রোশ' খুঁজে পেলো? দুষ্টের দমন যদি 'আক্রোশ' হয়, তাহলে আমাদের দেশের নাস্তিক-মুক্তমনাদের উচিত হবে পৃথিবীর সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর 'আক্রোশের' বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া।
 
আর আল্লাহ অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে বলেনঃ "আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।" [4]
 
১৯১ নং আয়াতের এই আক্রোশপূর্ণ (!) বাণী মূলত বাতিলের বিরূদ্ধে হক্বের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের। যুদ্ধের ময়দানে কোন সেনাপতি যদি বলে 'শত্রুপক্ষকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে' তাহলে সেটা অবশ্যই যেমন যুক্তিযুক্ত হবে তেমনি উল্লিখিত আয়াতের বিষয়টিও এমন। এখানে আক্রোশের কোন বিষয়ই নেই। যুদ্ধের ময়দানে কোন সেনাপতি তার সৈন্যকে উজ্জীবিত করতে উদ্দীপনামূলক বক্তব্য না দেয়? 
 
নাস্তিক-মুক্তমনারা যে কী পরিমাণ অসৎ তার শত শত প্রমাণ পাওয়া যাবে যদি কেউ শুদ্ধ মনে কুরআন-হাদিস ও তাফসীরের কিতাবের অধ্যয়ন করে। Lawrence Krauss এর একটা কথা আসলেই সত্য যে "Atheism has no moral basis."

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, বাকারাহ : ১৯১

[2]  ইবনে কাসীর, সহীহ মুসলিম ইত্যাদি

[3]  রাহিকুল মাখতুম: পৃষ্ঠা : 78, 125, 127, 128

[4]  আল কুরআন, তাওবাহ : ৬