আহলে কিতাব সম্পর্কিত বিধানে কি স্ববিরোধিতা আছে?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) স্ববিরোধিতা সংক্রান্ত



স্ববিরোধিতার অভিযোগঃ কুরআনের ভাষ্যমতে এটা যদি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো রচিত হত তবে তাতে বৈপরিত্য দেখা যেত (Quran 4:82) কিন্তু কুরআনে প্রচুর আয়াত খুজে পাওয়া যায় যেগুলো একটার সাথে অন্যটা সাঙ্ঘর্ষিক (যেমন Quran 29:46 and 9:29)! এর মানে কি এই নয় যে কুরআন আসলে মুহম্মাদেরই (স.) রচনা?

 

জবাবঃ আলোচ্য আয়াতগুলো হচ্ছেঃ

 

قَـٰتِلُوا۟ ٱلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ ٱلْحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَـٰبَ حَتَّىٰ يُعْطُوا۟ ٱلْجِزْيَةَ عَن يَدٍۢ وَهُمْ صَـٰغِرُونَ [٩:٢٩] 
তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

(সূরা তাওবাহ ৯ : ২৯)
 

وَلَا تُجَـٰدِلُوٓا۟ أَهْلَ ٱلْكِتَـٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُوا۟ مِنْهُمْ ۖ وَقُولُوٓا۟ ءَامَنَّا بِٱلَّذِىٓ أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَـٰهُنَا وَإِلَـٰهُكُمْ وَ‌ٰحِدٌۭ وَنَحْنُ لَهُۥ مُسْلِمُونَ [٢٩:٤٦] 
তোমরা আহলে কিতাবদের [ইহুদি ও খ্রিষ্টান] সাথে উত্তম পন্থা ব্যতিত তর্ক-বিতর্ক করবে না। তবে তাদের সাথে নয়, যারা তাদের মধ্যে বে-ইনসাফ। এবং বল - আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তাঁরই আজ্ঞাবহ।

(সূরা আনকাবূত ২৯ : ৪৬)

 

 প্রথমত, কুরআনে কোনোই সাঙ্ঘর্ষিক আয়াত নেই। এই আয়াত দুটির মধ্যেও মূলত কোনোই বিরোধিতা নেই। সূরা তাওবাহর আয়াতটিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে যে কোন উপায়ে অস্ত্রধারণ মানেই জিহাদ নয়। এর কিছু নীতিমালা আছে। এটি স্বতঃস্বিদ্ধ বিষয় যে ইসলামে সশস্ত্র জিহাদের পূর্বে দুইটি কাজ করতে হয়।
 

(১) অমুসলিমরা  যদি ইসলামের দাওয়াত না পেয়ে থাকে তবে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে যেমনটা রাসুলুল্লাহ(صلى الله عليه وسلم) করতে নির্দেশ দিয়েছেন। [1]  যেমনটি কাদিসিয়াহর যুদ্ধে করা হয়েছে, সেখানে পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের অনুরোধে তাদের কাছে তিনবার ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। [2]   
 

(২) ইসলামের দাওয়াত না মানলে তাদেরকে জিজিযা করের [3]  দিকে আহবান করতে হবে। যার মাধ্যমে ইসলামের কর্তৃত্ব মেনে নেবে এর বিনিময়ে মুসলিমরা নিজেদের মতোই তাদেরকেও নিরাপত্তা দেবে। [4]

 

 এই দু’টির একটি ও যদি তারা না মানে তাহলে একদম শেষ পদক্ষেপ হিসাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করার বিধান আছে। [5] জিজিয়া কর নেয়া এবং যুদ্ধ - এগুলো পরিচালনা করতে পারেন কেবল বৈধ ইসলামী খলিফা।

 

ইসলামে অস্ত্র ধারন শেষ পর্যায়; প্রথম পর্যায় নয়।

 

আর সুরা আনকাবূতের আয়াতটিতে সাধারন পরিস্থিতিতে ইসলামী দাওয়াতের একটি অংশ হিসেবে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বিপক্ষে উত্তমভাবে বিতর্ক করার অনুমতি ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় তাফসিরকারকগণ যা আলোচনা করেছেন,
 

(১) ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন যদি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের কেউ ইসলাম সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে তাকে উত্তম পন্থায় ও ভদ্রতার সহিত, খুব সুন্দর উপায়ে, শালীনতার সাথে, ইসলাম সম্পর্কে জানিয়ে দিতে হবে; অথবা প্রয়োজনে বা পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে এমন তর্ক বিতর্ক করতে হবে যা উত্তম এবং আল্লাহর নিদর্শনের দিকে আহবান করতে হবে। এতে যদি তার চিন্তার দুয়ার উন্মুক্ত হয় বা সে সত্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ পায় অথবা যদি সে সত্য গ্রহন করে নেয়। এই উত্তম তর্ক-বিতর্ক শুধুমাত্র ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মুশরিকদের সাথেও এর অনুমতি আছে। যেমনটা আল্লাহ মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করতে (সূরা ফুসসিলাত ৪১ : ৩৪, সূরা মুমিনূন ২৩ : ৯৬) আল্লাহর দিকে হিকমাহ(প্রজ্ঞা) সুন্দর কথার মাধ্যমে আহবান করতে বলেছেন (সূরা নাহল ১৬ : ১২৫)। [6]

 

(২) তবে তাদের মধ্যে যারা যালিম ও সীমালঙ্ঘনকারী তাদের সাথে উত্তম পন্থা ব্যবহার না করার এবং সাথে সাথে তাদের যুলুমের প্রকারভেদে তাদেরকে উচিত জবাব দেওয়ার ও অনুমতি আছে। কেননা ইসলাম মানুষকে সত্যের পথে অটল থাকতে, সত্যের আহবায়কদেরকে নম্র ও শালীন হতে বলেছে তবে বিরোধীপক্ষ যাতে এইসকল গুনকে তাদের দুর্বলতা মনে করে তাদের উপর চড়াও না হতে পারে তাই পরিস্থিতি ভেদে তাদেরকে উচিত জবাব দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। [7]

 

(৩) তবে পূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, শরীয়তসম্মত জিহাদের প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ দাওয়াত দেওয়ার পর্যায়ে যদি দাওয়াতের প্রয়োজনে উত্তমরুপে তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন পড়ে তবে তাও করা যাবে।
 
তবে তারা যদি সীমালংঘনকারী হয়ে থাকে এবং তারা যদি ইসলামের দাওয়াতকে গ্রহন না করে এবং জিজিয়াও দিতে অস্বীকার করে তবে সেই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করার অনুমতি আছে। তবে জিজিয়া কর দিয়ে ইসলামী শাসনকে মেনে নিলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। [8]  
 

এই দুটি আয়াত কখনোই একটি আরেকটির সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং দুইটি আয়াত দুটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ হতে পারে।  আবার কখনো কখনো দুটি আয়াতই একই কাজের পর্যায়ক্রমিক ধাপ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), হা-৩৪৩৬; সহীহ মুসলিম (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার),৭/১৮৩-৮৪, হা-৪৩৭২

[2] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ),৭/৭৭

[3] জিজিয়া শব্দটি আরবি জাযাহ শব্দ থেকে উদগত যার অর্থ হলো প্রতিদান। ইসলামী পরিভাষায় জিজিয়া হলো এমন কর যা ইসলামী রাষ্ট্রে যুদ্ধক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের থেকে আদায় করা হয়। তাই এর দায়ভার নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও যাজকদের উপর বর্তায় না। এটি মূলত ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের নিরাপত্তার সাথে বসবাস করার ও প্রতিরক্ষা কাজে অংশগ্রহন না করার বিনিমিয়ে প্রদেয় কর। যেহেতু তাদের থেকে যাকাত আদায় করা হয়না তবুও তারা রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিক অধিকার ভোগ করে থাকে।  (তাফসির তাওযীহুল কুরআন,১/৫৩৩,টীকা-২৭)

[4] সহীহ মুসলিম (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার),৭/১৮৩-৮৪, হা-৪৩৭২)

[5] সহীহ মুসলিম (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার),৭/১৮৩-৮৪, হা-৪৩৭২

[6] তাফসির ইবনে কাসির, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ১৫/৫৮৭; কুরআনুল কারীম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, ড আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ২/২০৭১; তাফসির  জালালাইন,বঙ্গানুবাদ ৫/৯;উক্ত আয়াতের তাফসীর

[7] কুরআনুল কারীম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, ড আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ২/২০৭২; তাফসির  তাওযীহুল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, ২/৫৭৫; উক্ত আয়াতের তাফসীর

[8] বিস্তারিতঃ তাফসির ইবনে কাসির (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ১৫/৫৮৭-৮৮