ইসলাম কি শিশু নির্যাতনের নির্দেশ দেয়?

নৈতিকতা বিষয়ক



নাস্তিক প্রশ্নঃ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা না করার অপরাধে শিশু নির্যাতনের নির্দেশ দেয় ইসলাম (Abu Dawud 2:494, 2:495, 2:497) আপনার দৃষ্টিতেও কি এটাকে উচিত বলে মনে হয়?
 

উত্তরঃ


مُرُوا الصَّبِيَّ بِالصَّلاَةِ إِذَا بَلَغَ سَبْعَ سِنِينَ وَإِذَا بَلَغَ عَشْر سِنِينَ فَاضْرِبُوهُ عَلَيْهَاَ

অনুবাদঃ- তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন তাদেরকে নামায পড়ার নির্দেশ দাও এবং যখন তাদের বয়স দশ বছর হবে তখন নামায না পড়লে এজন্য তাদের শাস্তি দাও। [1]
 

ইবনে কুদামাহ(র) (মৃ ৬২০হি) বলেন,
 

“ বাচ্চাদেরকে সংশোধনের নিয়্যাতে সালাতের জন্য উদ্ধুব্ধ করা এবং বলা শরিয়াহ নির্দেশিত, যাতে করে সালাত তাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায় এবং বালেগ হওয়ার পরে সে যেন তা পরিত্যাগ না করে” [2]
 

বাচ্চাদেরকে শাস্তি দেওয়া বা মার দেওয়া এটির পর্যায় আছে। হাদীছ দ্বারা স্পষ্ট যে তাদেরকে সাত বছর থেকেই সালাতের(নামায) জন্য বলে যেতে হবে। সাত থেকে দশ এ তিন বছরে বাচ্চা আশা করা যায় যে সালাত পড়তে শুরু করবে কেননা ছোট বয়সে তাদেরকে যেকোনো বিষয় অভ্যাস করিয়ে নিলে পরবর্তীতে তা আর ত্যাগ করার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীন হয়ে যায়। সাত-দশ বছরে ও যদি বাচ্চা সালাত না পড়ে তবে তাকে মারা যাবে তবে তা হবে কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে।
 

(১) তা হতে হবে সাত থেকে নিয়ে দশ পর্যন্ত ক্রমাগত বাচ্চাকে নম্রভাবে, আদর-সোহাগ দিয়ে সালাতের জন্য আহবান করার পরে মারা যেতে পারে, কেউ সাত-দশের সময়ে কখনোই সালাতের জন্য বলে নি তাহলে তার জন্য দশ বছর বয়সে বাচ্চাকে মারা যাবেনা;

(২) তা হতে হবে শূধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। বাচ্চার উপর ব্যক্তিগত রাগ-ক্রোধ থেকে নয়। কেননা সালাত তো বাচ্চার কল্যানের জন্যই। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে অন্য কারনে এই কাজ করে তবে তিনি অবশ্যই যুলমের দায়ে দায়ী হবেন আল্লাহর নিকট;
 

(৩) তা হতে হবে সীমিত পরিমানে ও একান্ত প্রয়োজনে;

(৪) মার অবশ্যই হালকা হতে হবে এমনভাবে মারা যাবেনা যাতে মুখমন্ডল ক্ষতিগ্রস্থ হয় বা শরীরের ক্ষতি হয়।

শায়খ সালিহ আল ফাওযান বলেন,
 

“ এমনভাবে মার দেওয়া যাবে না যাতে করে বাচ্চা ব্যাথা পায় বা ত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হয় অথবা হাড় ভেঙ্গে যায়, বরং সীমিত পরিমানে প্রয়োজন অনুপাতে হতে হবে।” [3]
 

শায়খ উসাইমীন(রাহ) বলেন,
 

“ মার এমন হতে হবে যা বাচ্চাকে কোনো প্রকার আঘাত পৌছাবেনা, যা মুখে মারা হবেনা অথবা প্রানঘাতী হবে না।” [4]
 

(৫) সকলের সামনে মারা যাবেনা, কেননা এটি বাচ্চার ব্যক্তিসত্তার ও আত্মসম্মান পরিপন্থী। তাকে যথাসাধ্য গোপনেই শাসন করার চেষ্টা করতে হবে;
 

পরিশেষে বলা যায়, একেক বাচ্চার প্রতিপালন বা তারবিয়্যাহর পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে কারো জন্য মুখের সুন্দর কথা হয়ত কাজ করে ও যথার্থ ফলাফল দেয় তবে অন্য কারো জন্য হয়তো তা একইভাবে কাজ না ও করতে পারে। বাচ্চার তারবিয়্যাহ বা প্রতিপালন অবশ্যই ভালোবাসা ও শাসনের ভারসাম্য হতে হবে। ইসলামে সালাতের গুরুত্ব অপরিসীম। সালাত আর অন্যান্য ধর্মের প্রার্থনার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল, এই পার্থক্যের ফারাক না উপলব্ধি করার কারণেই অনেকে প্রশ্ন তোলে যে একটি শিশুকে শুধুমাত্র প্রার্থনা না করার জন্য কিভাবে নির্যাতন(!!!) করা যেতে পারে?? প্রথমেই আলোচনা হয়ে গেছে শিশুকে শাস্তি কিভাবে দিতে হবে তার মাত্রা ও প্রয়োগ সম্পর্কে তারপরেও কিভাবে তাকে নির্যাতনের কাতারে ফেলা যায় তা ঠিক বোধগম্য নয়। সালাত শুধুমাত্র কিছু মন্ত্রের মত পড়ে চলে যাওয়া নয়, সালাত মুমিনের ঈমানের প্রদর্শন, সালাত মুমিনের অন্তরের শান্তি, সালাত মানুষকে তার রবের সাথে সংযোগ ঘটায়, আর মুসলিমদের প্রতিটি কাজেই সালাতের প্রভাব অপরিসীম। তাই শিশুদেরকে একান্ত প্রয়োজনে সামান্য শাসন আর শাস্তির মাধ্যমে সালাত তথা আল্লাহর আনুগত্যের জন্য অভ্যস্ত করাই হলো মূল লক্ষ্য।
 

শিশুদেরকে প্রয়োজনুপাতে শাসন করা ইসলামে বাচ্চাদের প্রতিপালনের অন্যতম অংশ। অনেকেই পশ্চিমাদের রঙ্গচঙা সভ্যতায় বাচ্চাদের প্রতিপালন দ্বারা অনুপ্রানিত যেখানে বাচ্চাদেরকে ধরা যাবেনা, ছোঁয়া যাবেনা, শাসন করা যাবেনা তাদেরকে নিজেদের চলতে দিতে হবে আর এগুলোর ফলই হলো এই অসুস্থ ও অসভ্য সভ্যতা যারা নিজেদের খেয়াল-খুশি মত চলতে চলতে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেছে সবার একটাই উদ্দেশ্য বল্গাহীনভাবে নিজেদের চরিতার্থ হাসিল করা।

 

এর সামান্য ঝলক দেখা যাক— The Guardian পত্রিকার একটি রিপোর্ট মতে, “স্কুলে ছেলে শিশুদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত আচরণগত দৈন্যতা দেখা যায় যদি ছেলে বা মেয়ে কেউই এই অবস্থার বহির্ভূত নয়... ... ... এর কারণ হিসেবে তারা দেখেন বাসায় রোল মডেলের অভাব যাদেরকে দেখে বাচ্চারা নৈতিকতা শিখতে পারেন... ... ...তারা কেউই বাসায় পিতা মাতার কর্তৃত্বের গণ্ডিতে না থাকাও এর কারণ।” [5]
 

 তথ্যসূত্রঃ

[1]  তিরমিযী, ১/৩৪৭, হা-৪০৭; আবুদাউদ, ১/২৭২, হা-৪৯৪

[2]  আল-মুগনী, ১/৩৫৭

[3]   https://islamqa.info/en/127233

[4]  https://islamqa.info/en/127233

[5]  “Teachers criticised a lack of role models in the home. A primary teacher said: "The boys are far more willing to be aggressive to adults, verbally and even physically. There don't seem to be any parental boundaries set of what is an appropriate way to speak and deal with another adult” 
 
https://www.theguardian.com/education/2011/apr/18/childrens-behaviour-school-teachers