উমার (রা.) কি আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির বইগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন?

বিবিধ



 

লিখেছেনঃ আরিফুল ইসলাম

 

ক.
'মুসলমানরা খুবই বর্বর ছিলো, তারা জ্ঞানচর্চার পথ রুদ্ধ করে দিতো, তারা খুব অসহিষ্ণু ছিলো' এই কথাগুলো প্রমাণ করার জন্য খৃষ্টান মিশনারি, নাস্তিকরা একটা ঘটনাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। ঘটনাটি তাদের কাছে খুব প্রিয়। 
ঘটনাটি হলো:

 

খলিফা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময় যখন মিসর বিজিত হয় তখন মিসরের গভর্নর নিযুক্ত করা হয় আমর ইবনুল আ'স রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির বইগুলো কী করবেন, সেসম্পর্কে আমর ইবনুল আ'স রাদিয়াল্লাহু আনহু উমার রাদিয়াল্লাহুর কাছে জানতে চাইলে তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

"বইপত্রগুলো যদি কুরআনের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে সেগুলো আমাদের দৃষ্টিতে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। কাজেই এগুলোর ধ্বংস অনিবার্য। আর বইপত্রগুলোতে যদি কুরঅানের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কথা থেকেও থাকে, তবে সেগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত। তাই বইগুলো ধ্বংস কর।"

 

খলিফার নির্দেশে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির সমস্ত বইগুলো পুড়িয়ে ফেলেন।

 

খ.
মুসলমানরা মিসর বিজয় করে ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে আর উপরের ঘটনাটি লিপিবদ্ধ হয় মিসর বিজয়ের প্রায় ৬০০ বছর পরে। ঘটনাটি মূলধারার কোনো ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায়না।

 

প্রথমে আব্দুল লতিফ (১২০৩) তারপর ইবন আল কিফতি (১২২৭) এই ঘটনাটি উল্লেখ করেন। এই দুজনের উদ্ধৃতি দিয়ে খৃষ্টান লেখক বার-হেব্রাইউস (Barhebraeus) ঘটনাটি উল্লেখ করেন।

অর্থাৎ, ঘটনাটি সংঘটিত হবার প্রায় ৬০০ বছর পর এই তিনটি সূত্রে এগুলো লিপিবদ্ধ হয়!

 

১৬৬৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির আরবী বিভাগের প্রফেসর Edward Pococke এই ঘটনাটি উল্লেখ করে পাশ্চাত্যে জনপ্রিয় করে তুলেন।

বাংলা ভাষায় এই ঘটনাটি আমদানি করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর [১]। তারপর কমিউনিস্ট লেখক এম.এন রায় তার The Historical Role of Islam বইয়ের ৭৮-৭৯ পৃষ্ঠায় এই ঘটনাটি উল্লেখ করেন।

 

গ.
ঘটনাটির বর্ণনা যেহেতু মূলধারার কোনো মুসলিম ইতিহাসবিদদের গ্রন্থে পাওয়া যায়না সেহেতু এই ঘটনা নিয়ে পূর্ববর্তী মুসলিম ইতিহাসবিদদের কোনো কমেন্টও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 

ড. মুহাম্মাদ আলী আল সাল্লাবি তাঁর Umar Ibn Al-Khattab- His Life and Times গ্রন্থে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেওয়া নির্দেশের ঘটনাটিকে একটি 'বানোয়াট গল্প' বলে উল্লেখ করেছেন [২]।

 

ঘ. 
পি. কে. হিট্টির ভাষায়,
"At the time of the Arab conquer (Egypt), therefore no library existed in Alexandria."
অর্থাৎ, আরবরা যখন মিসর জয় করে তখন আলেকজান্দ্রিয়ায় কোনো লাইব্রেরি ছিলো না।

মুসলমানরা মিসর জয়ের আগে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি অন্তত ৪ বার বিভিন্ন যুদ্ধের সময় পুড়িয়ে ফেলা হয়।
প্রথমবার ৮৯-৮৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, দ্বিতীয়বার জুলিয়াস সিজার কর্তৃক ৪৮ খ্রিষ্টাব্দে, তৃতীয়বার ২৭৩ খ্রিষ্টাব্দে, চতুর্থবার ৩৯১ খ্রিষ্টাব্দে।

 

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশের ইতিহাসকে পি.কে হিট্টি বলেন, "Tales that make good fiction but bad history."

অর্থাৎ, এই গল্পটা 'বানানো গল্প' হিসেবে খুব ভালো, কিন্তু ইতিহাসের বেলায় খুব দূর্বল। [৩]

 

ঙ.
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে এই বানোয়াট কাহিনীকে বেশিরভাগ প্রাচ্যবিদ, ইতিহাসবেত্তা অস্বীকার করেছেন।

 

ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা আর্থার স্ট্যানলি ট্রিট্টন তার What Happened To The Ancient Library Of Alexandria গ্রন্থে লিখেন,

"It has been proved that Umar I did not destroy the library at Alexandria." 
আরেকটু অগ্রসর হয়ে তিনি লিখেন,

"THE MYTH OF THE ARAB DESTRUCTION OF THE LIBRARY OF ALEXANDRIA IS NOT SUPPORTED BY EVEN A FABRICATED DOCUMENT."

অর্থাৎ, আরবদের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ধ্বংসের কাহিনী একটা জাল দলিলপত্র দিয়েও সমর্থিত নয় [৪]।

 

নাস্তিকদের দার্শনিক গুরু, ব্রিটিশ দার্শনিক এবং ইতিহাসবেত্তা বার্টান্ড রাসেল তার Human Society in Ethics and Politics গ্রন্থে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কের কাহিনীটিকে মুসলমানদের অসহিঞ্চুতা প্রমাণের জন্য 'খৃষ্টানদের প্রপোগান্ডা' এবং কাহিনীটাকে 'সম্পূর্ণ বানোয়াট' বলে অভিহিত করেছেন [৫]।

 

আরেক ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা আলফ্রেড জে. বাটলার উমার রাদিয়াল্লাহুর লাইব্রেরি পোড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার ইতিহাসকে একটা হাস্যকর (Ridiculous) কাহিনী উল্লেখ করে বলেছেন 
"The story is a mere fable, totally destitute of historical foundation."
[৬]।

 

ভারতের পণ্ডিত ডি.পি. সিংগহাল তার India and World Civilization গ্রন্থে কাহিনীটিকে একটা 'বানোয়াট' কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন [৭]।

 

এডওয়ার্ড গিবন এই কাহিনীকে জোড়ালোভাবে অস্বীকার করে বলেন,
"I am strongly tempted to deny both the fact and the consequences." [৮]।

 

চ.
এই মিথ্যা কাহিনীকে কেন্দ্র করে ইসলাম বিদ্বেষীরা উচ্ছাস করে এই ভেবে যে, তারা পেয়ে গেলো ইসলামকে কটাক্ষ করার সুযোগ। কারণ এই কাহিনী প্রমাণ করতে পারলে তো এটা প্রমাণিত হয়ে যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা একটা লাইব্রেরির বই পুড়িয়েছেন। সুতরাং, মুসলমানরা কট্টর, তার জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা তো করেই না, বরং তা বিঘ্ন করার জন্য বই পোড়ায়।

 

কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হচ্ছে, ইতিহাস খুঁজে ইসলাম বিদ্বেষীদের 'খুশী' করা গেলো না!

একটু কষ্ট করে তারা যদি তাদের গুরুদের বইগুলোতে এই ঘটনা সম্পর্কে তারা কী মন্তব্য করেছেন তা দেখতেন, তাহলে আর কষ্ট করে এইসব লিখতে হতো না।

 

 

রেফারেন্স:

 ১। বিদ্যাসাগর রচনাসম্ভার, শ্রী প্রমথনাথ সম্পাদিত, মিত্র ও ঘোষ, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলিকাতা, ১৩৬৪।

২। Umar Ibn al-Khattab – His Life & Times 
by Dr. Muhammad Ali al-Sallabi, volume 2, page 339 – 341

৩। History Of The Arabs From The Earliest Times To The Present 
by Philip K. Hitti, page 166

৪। What Happened To The Ancient Library Of Alexandria
by Bernard Lewis, page 213 – 217

৫। Human Society In Ethics And Politics 
by Bertrand Russell, page 217 – 218

৬। The Arab Conquest Of Egypt And The Last Thirty Years Of The Roman Dominion 
by Alfred J. Butler,page 405 – 408

৭। India And World Civilization 
by D. P. Singhal, volume 1, page 136 – 137

৮। The History Of The Decline And Fall Of The Roman Empire
by Edward Gibbon, volume V (5), page 481 – 484

 

সহযোগিতায়ঃ

https://discover-the-truth.com/2017/08/04/the-myth-of-umar-ibn-al-khattab-burning-the-library-of-alexandria/