কাদের জন্য রয়েছে দোযখ থেকে পরিত্রাণ?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) স্ববিরোধিতা সংক্রান্ত



স্ববিরোধিতার অভিযোগঃ কাদের জন্য রয়েছে দোযখ থেকে পরিত্রাণ? – যেকোনো ধর্মপ্রাণ আস্তিকের জন্য (৫:৬৯, ২:৬২) নাকি শুধুই মুসলিমদের জন্য (৩:৮৫, ৩:১৯)?   

 

জবাবঃ এই প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর দেয়ার আগে আমরা প্রথমে আয়াতগুলোর মূল বক্তব্যটা দেখি। সূরা বাক্বারাহর ৬২ নম্বর আয়াত এবং সূরা মায়িদাহর ৬৯ নম্বর আয়াত মূলত একই কথাই বলছে।

“কোনো সন্দেহ নেই, যারা বিশ্বাস করেছে এবং যারা ইহুদী, খ্রিস্টান, সাবিইন — এদের মধ্যে যারা আল্লাহকে এবং শেষ দিনে বিশ্বাস করে এবং ভালো কাজ করে, তাদের পুরস্কার তাদের প্রভুর কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখও করবে না।” [আল-বাক্বারাহ ২:৬২] 

 

তাহলে এই আয়াতের অর্থ কি এই যে, আজকে যারা ভালো ইহুদী, ভালো খ্রিস্টান, অর্থাৎ ধর্মপ্রাণ আস্তিক, তারা সবাই জান্নাতে যাবে? তাহলে এত কষ্ট করে ইসলাম মানার কি দরকার? কারো যদি কু’রআনের সালাত, হিজাব, রোযা রাখার আইন পছন্দ না হয়, তাহলে সে কালকে থেকে খ্রিস্টান হয়ে গেলেই তো পারে? সে তখনো আল্লাহকে বিশ্বাস করবে, শেষ দিনেও বিশ্বাস করবে, এমনকি ভালো কাজও করবে। তখন এই আয়াত অনুসারে ‘তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখ করবে না।’ কী দরকার এত কষ্ট করে, এত নিয়ম মেনে মুসলিম হয়ে থাকার?

 

আমাদের অনেকের ধারণা, ইসলাম একটি নতুন ধর্ম, যা মুহাম্মাদ ﷺ -ই প্রথম প্রচার করে গেছেন। এটি একটি অসম্পূর্ণ ধারণা। ইসলাম হচ্ছে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাস; মহান আল্লাহর ﷻ নির্ধারিত সকল মানবজাতির জন্য একমাত্র ধর্ম, যার পুরো বাণী ও বিস্তারিত আইন মহান আল্লাহর ﷻ কাছে পূর্ব হতেই সংরক্ষিত। সেই আইন ও বাণীর বিভিন্ন সংস্করণ তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে বিভিন্ন রাসূলের ﷺ মাধ্যমে, প্রয়োজন অনুসারে যেটুকু দরকার, সেটুকু পাঠিয়েছেন। সেই বাণী ও সংগ্রহের বিভিন্ন সংস্করণকে কুরআনে সহীফা ও কিতাব বলা হয়েছে। কু’রআন হচ্ছে সেই বাণী বা আইনের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সংস্করণ, বা সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ, যা রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ -এর মাধ্যমে আমরা পেয়েছি।

 

এছাড়াও আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো: যারা মুহাম্মাদ ﷺ এর অনুসারী, শুধুমাত্র তারাই মুসলমান। নবী ইব্রাহিম ﷺ কা’বা বানানো শেষ করার পরে আল্লাহর ﷻ কাছে দু’আ করেছিলেন যেন তার সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা মুসলিম হয়।[আল-বাক্বারাহ ২:১২৭] নবী ইয়াকুব ﷺ মৃত্যুর সময় তাঁর সন্তানদেরকে বলে গিয়েছিলেন: তারা যেন কেউ অমুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ না করে। ‘মুসলিম’ কোনো বিশেষ গোত্র, বংশ, বা বিশেষ নবীর উম্মত নয়। যুগে যুগে যারাই মহান আল্লাহকে ﷻ এক ও একক উপাস্য মেনে নিয়ে, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে, তাঁর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলের ﷺ অনুসরণ করেছেন, তাঁর নাজিলকৃত কিতাব মেনে চলেছেন— তারাই মুসলিম।

 

রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ -এর জন্মের অনেক আগে থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে তাওরাত এবং ইঞ্জিল পাওয়া যায়, সেগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন এবং বিকৃতি করা হয়েছে, যার কারণে সেগুলো আর মৌলিক, অবিকৃত অবস্থায় থাকেনি।[৯] ফলে আমরা কেবল সেগুলোর ব্যাপারে মৌলিকভাবে ঐশী গ্রন্থ হওয়ায় বিশ্বাস করব, তবে সেগুলো পড়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কু’রআনের ভাষা এবং আজকালকার তাওরাত, ইঞ্জিলের ভাষার মধ্যে এতই আকাশ পাতাল পার্থক্য যে, সেগুলো পড়লেই বোঝা যায়: প্রচলিত এই তিন ধর্মগ্রন্থের উৎস একই মহান সত্তা নন।

 

আজকের তাওরাত এবং ইঞ্জিলে আল্লাহর ﷻ সম্পর্কে অনেক বিকৃত ধারণা রয়েছে। যেমন, মানুষকে সৃষ্টি করে তাঁর ‘অন্তরে’ বেদনা হওয়ার কথা[১], তাঁর নবী ইয়াকুবের ﷺ সাথে কুস্তি লড়ে হেরে যাওয়ার ঘটনা[২] ইত্যাদি — اَللّٰهُ أَكْبَر! এমনকি নবীদের ﷺ সম্পর্কে নানা ধরনের অশ্লীল, যৌনতার রগরগে ঘটনা রয়েছে।[৩] পুরুষদের মাথায় যত নোংরা ফ্যান্টাসি আছে, তার সব আপনি বাইবেলে পাবেন, কিছুই বাকি নেই। বাইবেলের গ্রন্থগুলো পুরো মাত্রায় পর্ণগ্রাফি। আপনি কখনই বাইবেলের বইগুলো আপনার ছোট বাচ্চাদের সাথে বা কিশোর বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে একসাথে বসে পড়তে পারবেন না। একারণে মুসলিমরা কোনো ভাবেই বিশ্বাস করে না যে, তাওরাত এবং ইঞ্জিল অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। তাই আজকের যুগে যারা ইহুদী এবং খ্রিস্টান, যারা এই ধরনের বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থের অনুসারী, তাদেরকে আল্লাহ ﷻ জান্নাতের নিশ্চয়তা দেননি।

 

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলছেন, “এদের মধ্যে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে …।” এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহর ﷻ সংজ্ঞা কি?

 

খ্রিস্টানরা তাদের ‘আল্লাহ’র যে সংজ্ঞা দিয়েছে তা হলো: তিনি তিন রূপে থাকেন- পিতা ঈশ্বর, পবিত্র আত্মা এবং প্রভু যিশু — তিনি কি কু’রআনের বাণী অনুসারে আল্লাহ ﷻ?

 

“নিঃসন্দেহে তারাও কুফরি করেছে যারা বলে, আল্লাহ্‌ তিনের (অর্থাৎ, তিন মা’বূদের) এক, অথচ এক মাবূদ ভিন্ন অন্য কোনই (সত্য) মা’বূদ নেই; আর যদি তারা স্বীয় উক্তিসমূহ হতে নিবৃত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কাফির থাকবে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি গ্রাস করবে।” [আল-মায়িদাহ ৫:৭৩]

“যে সব লোক বলে যে, ‘আল্লাহ হচ্ছেন ঈসা মাসিহ, মরিয়মের পুত্র’ — তারা আল্লাহতে অবিশ্বাস করেছে।… [আল-মায়িদাহ ৫:৭২]

 

তাদের সেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ﷻ নন। সেই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করলে আল্লাহতে ﷻ বিশ্বাস করা হয় না। আল্লাহর ﷻ একমাত্র গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দেওয়া আছে কু’রআনে।

 

“১। বল, তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়।

২। আল্লাহ্‌ কারও মুখাপেক্ষী নন।

৩। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয় নি।

৪। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” [সূরা ইখলাস ১১২:১-৪]

 

একইভাবে, আপনি যদি একজন ইহুদীকে জিজ্ঞেস করেন, “ভাই, আপনি কি শেষ বিচার দিনে বিশ্বাস করেন?” সে বলবে, “অবশ্যই। শেষ বিচার দিনে ইহুদীরা সবাই স্বর্গে যাবে, নবী নূহ ﷺ এর ৭টি আইন যারা মানবে, তারা স্বর্গ পেতে পারে। আর বাকি সবাই নরকে যাবে।”[৪] তাদের সেই শেষ দিন, এবং আমাদের শেষ দিনের ঘটনার মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে।

 

এছাড়া এই আয়াতে একটি বিশেষ গোত্র ‘সাবিইন’দের কথা বলা হয়েছে। এরা হলো আরবে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য গোত্র যারা ওই সব আরব মুশরিক ছিল না, যাদের মূর্তি পুজার কথা কু’রআনে বিস্তারিত বলা আছে।[৫] তারা এক পরম সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করত, আবার একই সাথে নক্ষত্র পূজা করত (ইমাম কুরতুবী এবং ইমাম রাযী (রহ) এর মত)।[৬] তাদের ধর্ম ইসলাম ছিল না। ধারণা করা হয় তারা নবী নূহ ﷺ এর শিক্ষা ধরে রেখেছিল। ইমাম রাযী (রহ)-এর মতে, তারা কাসরানীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের কাছে নবী ইব্রাহিম ﷺ প্রেরিত হয়েছিলেন।[৬] কোন কোন আলেমের মত, এরা হল তারা যাদের কাছে কোন নবীর দাওয়াত পৌঁছায় নি।[৭] তবে তাদের সঠিক প্রকৃতি নিয়ে এখনো দ্বন্দ্ব রয়েছে।[৭][৮]

 

এই আয়াতটি রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ এর সময়ে যারা ইহুদী, খ্রিস্টান, সাবিইন ছিল, তাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, তারা এ পর্যন্ত যত ভালো কাজ করেছে আল্লাহ এবং শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রেখে, সেগুলোর পুরস্কার তারা পাবে, কোনো দুশ্চিন্তা নেই — যদি এবার মুসলিম হন। একই সাথে অতীতে যারা চলে গেছেন, নিজ নিজ যুগে যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস উপস্থাপন করেছেন, তারাও পুরস্কার পাবেন, তাদেরও দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।]৫][৭] এবার আল্লাহর ﷻ কাছ থেকে নতুন বাণী এসেছে। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই নতুন বাণী গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যাওয়া।[৭]

 

এ আয়াত যে মুহাম্মাদ ﷺ এর পূর্বের ইহুদী, খ্রিস্টান, সাবিইনদের ব্যাপারে, এর অকাট্য প্রমাণ আছে সুরা বাকারাহর ৬২ নং আয়াতের শানে নুযুল (অবতরণের ইতিহাস) এর মাঝে। 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির ইবন কাসিরে উল্লেখ আছে, "সালমান ফারসী (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে হাযির হওয়ার পূর্বে যেসব ধর্মপ্রাণ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করি, তাদের সালাত, সিয়াম ইত্যাদির বর্ণনা দেই। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ ইবন আবী হাতিম)। আর একটি বর্ণনায় আছে যে, সালমান ফারসী (রাঃ) তাঁদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন তারা সালাত আদায়কারী, সিয়াম পালনকারী ও ঈমানদার ছিল এবং আপনি যে প্রেরিত পুরুষ এর উপরও তাদের বিশ্বাস ছিল।' তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তারা জাহান্নামী।” এতে সালমান (রাঃ) দুঃখিত হলে তখন আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।" 

অর্থাৎ জানিয়ে দেয়া হল যে, রাসুল ﷺ এর পূর্বের ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ইহুদি, খ্রিষ্টান ও সাবিইনদের পরকালে কোন ভয় নেই। তাফসির ইবন কাসিরে আরো উল্লেখ আছে,

"ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে ইবন আবী হাতিম (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, এ আয়াতের পর আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি (আলি ইমরান ৩:৮৫) অবতীর্ণ করেন। (ইবন আবী হাতিম ১/১৯৮) ইবন আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন ব্যক্তির আমল কবুল করবেন না যদি ঐ আমল রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ এর নির্দেশ মত করা না হয় । মুহাম্মাদ ﷺ এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে অন্যান্য নবীর উম্মতরা তাদের নবীর মতাদর্শ অনুযায়ী আমল করলে তা ছিল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু রাসূল ﷺ এর আবির্ভাবের পর তার পূর্ববর্তী নবীগণের (আঃ) নির্দেশিত পথ ও আমল গ্রহণযোগ্য থাকল না। ... ... এটা স্পষ্ট কথা যে, ইহুদিদের মধ্যে ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যে তাওরাতের উপর ঈমান আনে এবং তা অনুযায়ী কাজ করে, কিন্তু যখন ঈসা (আঃ) আগমন করেন তখন তাঁরও অনুসরণ করে এবং তাঁর নবুওয়াতকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু তখনও যদি তাওরাতের উপর অটল থাকে এবং ঈসাকে (আঃ) অস্বীকার করে এবং তাঁর অনুসরণ না করে তাহলে সে বেদ্বীন হয়ে যাবে । অনুরূপভাবে, খৃষ্টানদের মধ্যে ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যে ইঞ্জীলকে আত্মাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করে, ঈসার (আঃ) শারীয়াত অনুযায়ী আমল করে এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পেলে তার আনুগত্য স্বীকার করে ও তাঁর নবুওয়াতকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু তখনও যদি ইঞ্জীল ও ঈসার (আঃ) আনুগত্যের উপর স্থির থাকে এবং মুহাম্মাদ ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ না করে তাহলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। সুদ্দীও (রহঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। সাঈদ ইবন যুবাইর (রহঃ) ইহাই বলেছেন। ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক নবীর অনুসারী, তাঁকে মান্যকারী হচ্ছেন ঈমানদার ও সৎলোক। সুতরাং সে আল্লাহ তা'আলার নিকট মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু তার জীবিতাবস্থায়ই যদি অন্য নবী এসে যান এবং আগমনকারী নবীকে সে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছে “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অনুসন্ধান করে, তা কবূল করা হবে এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৮৫) এই দু’টি [বাকারাহ ৬২ ও আলি ইমরান ৮৫] আয়াতের মধ্যে আনুকূল্য এটাই। কোন ব্যক্তির কোন কাজ ও কোন পন্থা গ্রহণীয় নয় যে পর্যন্ত না শারীয়াতে মুহাম্মাদীর অনুসারী হয়। কিন্তু এটা সে সময় যে সময় তিনি প্রেরিত নবী রূপে দুনিয়ায় এসে গেছেন। তাঁর পূর্বে যে নবীর যুগ ছিল এবং যেসব লোক সে যুগে ছিল তাদের জন্য ঐ নবীর অনুসরণ ও তার শারীয়াতেরও অনুসরণ করা শর্ত।" [১০]

এই আয়াতে [সুরা বাকারাহ ৬২] আরও একটা শর্তের কথা বলা হয়েছে- “যারা ভালো কাজ করে।” প্রশ্ন হল, কে নির্ধারণ করছে কোন কাজটা ভালো, আর কোন কাজটা খারাপ?

 

কোন কাজটা ভালো আর কোনটা খারাপ — সেটার মানদণ্ড হচ্ছে কু’রআন। যে কু’রআনের সংজ্ঞা অনুসারে ভালো কাজ করবে, তার কোনো ভয় নেই। তার পুরস্কার আছে আল্লাহর কাছে। আর যে অন্য কোনো ধর্মীয় বই অনুসারে ভালো কাজ করবে, সেটা যদি কু’রআনের ভালো কাজের সংজ্ঞার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেটা আর আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ভালো কাজ নয়।

 

এখানে একটি প্রশ্ন আসে: এই আয়াত বলছে শুধু আল্লাহ এবং শেষ দিনে বিশ্বাস করলেই হবে। তাহলে কি আমাদের রাসূল মুহাম্মাদের ﷺ উপর বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই?

উত্তর সোজা। “এই আয়াতটা আমাদেরকে কে দিয়েছে?” কু’রআন তো বই আকারে আকাশ থেকে পৃথিবীতে এসে পড়েনি। মানুষ কার মুখ থেকে এই আয়াত শুনেছে? যার মুখ থেকে শুনেছে, তাকে যদি তারা রাসূল না মানে, তাহলে তারা এই আয়াতকে আল্লাহর ﷻ বাণী হিসেবে মানবে কেন? যদি কেউ এই আয়াতকে আল্লাহর ﷻ বাণী হিসেবে মেনেই নেয়, তাহলে তো সে এই আয়াতের বাহককে আল্লাহর ﷻ রাসূল হিসেবেই মেনে নিল! সে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাসূল মুহাম্মাদের ﷺ উপর বিশ্বাস করে ফেলল।

 

আমাদের বিশ্বাসী বা মুত্তাকী হওয়ার জন্য কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে সেটা তিনি সূরা বাকারাহর আগের আয়াতগুলোতে বলে দিয়েছেন।

ওটা সেই বই যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ [ভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা, ভুল ধারণা] নেই একটি পথ নির্দেশক (হুদা) আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সচেতনদের (মুত্তাক্বী) জন্য যারা মানুষের চিন্তার ক্ষমতার বাইরে এমন বিষয়ে বিশ্বাস করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদেরকে আমি যা দিয়েছি তা থেকে খরচ করে যারা তোমার (মুহাম্মাদ) উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার আগে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস করে, যারা পরকালে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে” [আল-বাক্বারাহ ২:২-৪]

 

অর্থাৎ, কুরআনের এই আয়াতগুলোর মাঝে কোন অসঙ্গতি নেই। আল্লাহ্‌ এখানে সে সব ইহুদি, খ্রিস্টান বা গোত্রের জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যারা কুরআন আসার আগে তাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণ করত বা একেশ্বরবাদী ছিল, পরকালে বিশ্বাস করত। পরবর্তীতে যখন কুরআন নাযিল হয়, তখন তাদের সেই বিকৃত হয়ে যাওয়া কিতাবের অনুসরণ করাটা অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই শেষ রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ আসার পরে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের নিশ্চয়তা শুধু মুসলিমদের জন্য।

 

 

তথ্যসূত্র: