কুরআনের কিছু আয়াত কি আসলেই বকরীতে খেয়ে ফেলেছিল?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



সুনান ইবন মাজাহতে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েত ব্যবহার করে খ্রিষ্টান মিশনারী ও নাস্তিক-মুক্তমনারা দাবি করতে চায় যেঃ কুরআনের কিছু আয়াত চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে কেননা সেগুলো যে পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, সেটিকে একটি বকরী খেয়ে ফেলেছিল।কুরআনের সংরক্ষণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ইসলামবিরোধীরা যেসব (অপ)যুক্তি দাঁড় করায়, তার মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত(অথবা কুখ্যাত) যুক্তি এটি।এই নোটে সেই রেওয়ায়েতটিকে বিশ্লেষণ করে সত্য উন্মোচন করা হবে ইন শা আল্লাহ।
ইবন মাজাহ এর রেওয়ায়েতটি হচ্ছেঃ
 
عن عائشة قالت لقد نزلت آية الرجم ورضاعة الكبير عشرا ولقد كان في صحيفة تحت
سريري فلما مات رسول الله صلى الله عليه وسلم وتشاغلنا بموته دخل داجن
فأكلها
অর্থঃ আয়িশা(রা) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, “রজমের ও বয়স্কদের দশ ঢোক দুধপানের আয়াত নাযিল হয়েছিল এবং সেগুলো একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রাসুলুল্লাহ(ﷺ) ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে।”
[সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস নং ১৯৪৪]
 

রেওয়ায়েতটির বিশুদ্ধতা কতটুকুঃ

 
কোন দাবি পেশ করতে হলে সবার আগে যাচাই করা জরুরী যে এর দলিল হিসাবে পেশকৃত রেওয়ায়েতের বিশুদ্ধতা কতটুকু।
 
মুহাদ্দিসদের মতে রেওয়ায়েতটিতে কিছু সমস্যা আছে।এই রেওয়ায়েতের একজন বর্ণণাকারী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক এটি বর্ণণা করছেন عن(থেকে) শব্দ ব্যবহার করে যে কারণে বর্ণণাটি যঈফ(দুর্বল) হয়ে গেছে।কেননা তিনি একজন তাদলিসকারী। {{যেসব বর্ণণাকারী তাদের ঊর্ধ্বতর বর্ণণাকারীর পরিচয়ের ব্যাপারে ভুল তথ্য দেন তাদেরকে তাদলিসকারী বলা হয়। তাদলিসের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ এই আর্টিকেলটি। }}
 
[মুফতি তাকি উসমানী, ‘তাকমালা ফাতহুল মুলহিম’ ১/৬৯, দারুল আহইয়া আত তুরাছুল ‘আরাবী, বৈরুত]
 
মুসনাদ আহমাদেও একই রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। শায়খ শু’আইব আরনাউত(র) তাঁর মুসনাদ আহমাদের তাহকিকে একে যঈফ(দুর্বল) বলে মন্তব্য করেছেন।
[দেখুনঃ মুসনাদ আহমাদ ৬/২৬৯, হাদিস নং ২৬৩৫৯]
 

এই রেওয়ায়েত কোন উপায়েই কুরআনের বিশুদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নাঃ

 
এই রেওয়ায়েতটি যদি সহীহও হত, তাহলেও এ দ্বারা প্রমাণ হত না যে কুরআন সংরক্ষিত নেই।
কারণঃ-
 
১। এই রেওয়ায়েত অনুসারে দাবিকৃত ‘হারিয়ে যাওয়া’ আয়াত দু’টির ১টি আয়াত ছিল রজমের ব্যাপারে।
{{বিবাহিত পুরুষ কিংবা মহিলা ব্যাভিচার করলে তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকে ‘রজম’ বলে।}}
কিন্তু অন্য একাধিক বর্ণণাতে আমরা দেখি যে, রজমের ব্যাপারে হুকুম নাজিল হয়েছিল কিন্তু নবী(ﷺ) সেটিকে কুরআনের অংশ হিসাবে লিপিবিদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন।এ থেকে বোঝা যায় যে এটি কুরআনের অবিচ্ছেদ্য কোন অংশ ছিল না।
বর্ণণাগুলো নিম্নরূপ—
 
ক) কাসির বিন সালত থেকে বর্ণিতঃ যাঈদ(বিন সাবিত) বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ(ﷺ)কে বলতে শুনেছি যে, “যখন কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা মহিলা ব্যাভিচার করে, তাদের উভয়কে রজম কর।”
(এটি শুনে)আমর বলেন, “যখন এটি নাজিল হয়েছিল, আমি নবী(ﷺ) এর নিকট আসলাম এবং এটি লিপিবদ্ধ করব কিনা তা জানতে চাইলাম। তিনি{নবী(ﷺ)} তা অপছন্দ করলেন।”
[মুসতাদরাক আল হাকিম, হাদিস ৮১৮৪; ইমাম হাকিম(র) একে সহীহ বলেছেন]
খ) এই আয়াতের ব্যাপারে কাসির বিন সালত বলেনঃ তিনি(কাসির), যাঈদ বিন সাবিত ও মারওয়ান বিন হাকাম আলোচনা করছিলেন কেন একে কুরআনের মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।উমার বিন খাত্তাব(রা) তাদের সঙ্গে ছিলেন এবং তাদের আলোচনা শুনছিলেন।তিনি বললেন যে তিনি এ ব্যাপারে তাদের থেকে ভালো জানেন।তিনি তাদের বললেন যে তিনি{উমার(রা)} রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর নিকট গিয়েছিলেন এবং জিজ্ঞেস করেছিলেন,
يا رسول الله أكتبني آية الرجم قال لا استطيع ذاك
“হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে রজমের আয়াতটি লিখে দেওয়া হোক।তিনি{রাসুলুল্লাহ(ﷺ)} বললেন, আমি তা করতে পারব না।”
[সুনানুল কুবরা বাইহাকী ৮/২১১ এবং সুনানুল কুবরা নাসাঈ হাদিস নং ৭১৪৮।
আলবানী(র)এর মতে সহীহ]
 
যদি আলোচ্য আয়াত স্থায়ীভাবে কুরআনের অংশ হিসাবে নাজিল হত, তাহলে কেন রাসুলুল্লাহ(ﷺ) তা লিখিয়ে দিতে বললেন না? এ থেকে বোঝা যাচ্ছে এটি ছিল সেই সমস্ত মানসুখ বা রহিত আয়াতের একটি যা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ীভাবে নাজিল হয়েছিল। এটি রহিত হয়েছে, যা স্বয়ং আল্লাহর রাসুল(ﷺ) দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। কাজেই সাহাবীগণ বা উম্মুল মু’মিনীনগণ এই আয়াত ‘হারিয়ে ফেলেছেন’ তা নিতান্তই অসার কথা।
 
দ্বিতীয় যে আয়াত “হারিয়ে গেছে” বলে দাবি করা হয়, সেটি বয়স্কদের দশ ঢোক দুধপান সংক্রান্ত।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটিও মানসুখ বা রহিত আয়াত।সহীহ মুসলিমে এ সংক্রান্ত একটি বর্ণণা নিম্নরূপঃ
عن عائشة
أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنْ الْقُرْآنِ
رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ ثُمَّ نُسِخْنَ عَشْر
بِخَمْسٍ مَعْلُومَات
فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
فِيمَا يُقْرَأُ مِنْ الْقُرْآنِ وَهُن
আয়িশা(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনে নাযিল হয়েছিল যে, দশবার দুধপানে বিবাহ হারাম হওয়া/মাহরাম হওয়া সাবিত হয়। তারপর তা পাঁচবার দুধপান দ্বারা রহিত হয়ে যায়।তারপর রাসুলুল্লাহ(ﷺ) ইন্তিকাল করেন আর সেগুলো তো কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৩৪]
 
পাঁচবার দুধপানের বিধানটিও একটি মানসুখ বা রহিত বিধান। এ ব্যাপারে স্বয়ং উম্মুল মু’মিনিন(রা)গণ থেকে একটি বর্ণণা রয়েছে।
 
“ সাহলা বিনত সুহাইল(রা) ছিলেন আমির ইবনে লুয়াই গোত্রের, তিনি রাসুল(ﷺ) এর কাছে আসলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সালিমকে আমরা পুত্ররূপে গ্রহন করেছিলাম। সে আমার কক্ষে প্রবেশ করে এই অবস্থায় যখন আমি একটি কাপড় পরিধান করে থাকি(অর্থ্যাৎ মাথা খালি থাকে)। আর আমার ঘরও মাত্র একটি। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
তখন রাসুল(ﷺ) বললেন এ বিষয়ে আমাদের কথা হল তাকে পাঁচবার দুধপান করাও।
… … …
… নবী(ﷺ) এর অন্যান্য সহধর্মিণী এই প্রকার দুধপানের দ্বারা কোন পুরুষের তাদের নিকট প্রবেশ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতেন। তারা বলতেন{আয়িশা(রা)কে উদ্দেশ্য করে} আল্লাহর কসম, আমরা মনে করি রাসুল(ﷺ) সাহলা বিনতে সুহেইল(রা) কে যে অনুমতি দিয়েছিলেন তা কেবলমাত্র সালিম(রা) এর জন্য রাসুল(ﷺ) এর পক্ষ থেকে রুখসত ছিল। কসম আল্লাহর, এইরূপ দুধপান করানোর দ্বারা কেউ আমাদের নিকট প্রবেশ করতে পারবেনা। নবী করীম(ﷺ) এর সকল সহধর্মিণী এই মতের উপর অটল ছিলেন। ”
[সুনান আবু দাউদ, অনুচ্ছেদ ১০৪, হাদিস ২০৫৭]
 
এই বিবরণগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে পাঁচবার ও দশবার দুধপানের বিধান রহিত হয়েছিল।
কুরআনের মানসুখ বা রহিত আয়াতগুলো সম্পর্কে ইসলাম বিরোধীদের জবাব দেখুন এখানে
 
এছাড়া উল্লেখ্য যে - যতদিন ধরে কুরআন সংকলন হয়েছে, আয়িশা(রা) তাঁর পূর্ণ সময় জীবিত ছিলেন।আবু বকর(রা) কর্তৃক সংকলন ও উসমান(রা) কর্তৃক সংকলন উভয় সময়েই আয়িশা(রা)কে একজন গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদানকারী ছিলেন।বিশেষত উসমান(রা) কর্তৃক কুরআন সংকলনের সময়ে আয়িশা(রা) এর নিকট থেকে সংকলনকর্ম যাচাই করা হত। [দেখুনঃ তারিখুল মাদিনাহ, ইবন শাব্বা; পৃষ্ঠা ৯৯৭] যদি সত্যি সত্যিই কুরআনের আয়াত হারিয়ে যাবার মত এমন মহা দুর্ঘটনা ঘটতো (!!), তাহলে আয়িশা(রা) অবশ্যই সে ব্যাপারে সাহাবীগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। সে সময়ে প্রচুর পরিমাণে হাফিজ সাহাবী জীবিত ছিলেন যাঁরা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছেন। কিন্তু আয়িশা(রা) কখনোই এমন কিছু করেননি।
 
আর যদি এমনও হয়ে থাকে যে—কুরআনের কিছু আয়াত আসলেই আয়িশা(রা) এর খাটের নিচ থেকে বকরীতে খেয়ে ফেলেছিল এবং আয়িশা(রা) সে ব্যাপারে কোন সাহাবীরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি বরং চেপে গিয়েছেন, (নাউযুবিল্লাহ)[এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কোন কোন খ্রিষ্টান মিশনারী প্রচার করে থাকেন] তাহলেও এর দ্বারা “কুরআনের কিছু আয়াত হারিয়ে গেছে” এই তত্ত্ব প্রমাণ করা সম্ভব না। কারণ—কুরআন মূলতই লিখিত বই নয় বরং অগণিত মানুষের মুখস্থ বই। অবতরণের পর থেকেই মুহাম্মাদ(ﷺ) ও সাহাবীগণ তা মুখস্থ করেছেন।মুহাম্মাদ(ﷺ) রমজান মাসের শুরু থেকে তাহাজ্জুদে, তারাবীহে ও তিলাওয়াতে অগণিতবার খতম করেছেন। সকল যুগেই একই অবস্থা। কুরআনের লিখিতরূপ শুধু সহায়ক মাত্র। কুরআন প্রথম অবতরণ থেকেই প্রতিটি মুমিনের প্রতিদিনের পাঠ্য বই। প্রতিদিন নিজের নামাযে, জামাতে নামাযে ও সাধারণভাবে প্রত্যেক মুমিন তা তিলাওয়াত করেন বা শোনেন।বর্তমান সময়ের চেয়ে সাহাবীদের যুগে কুরআন মুখস্থ করার আগ্রহ অনেক বেশি ছিল। হাজার হাজার হাফিজ সাহাবী-তাবিয়ী মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে ছিলেন।সুতরাং ২-১টি আয়াত কেন, কুরআনের সকল আয়াতও যদি বকরীতে খেয়ে ফেলত, তাহলেও একটি আয়াতও “হারিয়ে যাওয়া” সম্ভব ছিল না। কেননা হাজার হাজার হাফিজ সাহাবী ও তাবিয়ী ঐ যুগে ছিলেন যাঁদের স্মৃতিতে পূর্ণ কুরআন সংরক্ষিত ছিল। সেই যুগ থেকে আজ পর্যন্ত একই অবস্থা।কাজেই বকরীতে খাওয়ার ফলে কিছু আয়াত চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে—তা নিতান্তই হাস্যকর অভিযোগ।
 
আজও যদি কুরআনের সকল লিখিত পাণ্ডুলিপি, পিডিএফ কপি, অনলাইন কুরআন, কুরআনের মোবাইল এ্যাপস—এ সকল কিছুও ধ্বংস করে ফেলা হয়, তাহলেও কুরআনের একটি অক্ষরও হারিয়ে যাবে না।কেননা কোটি কোটি কুরআনের হাফিজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন।তাঁদের স্মৃতি থেকে আবারও সম্পূর্ণ কুরআন পুনরুদ্ধার করা যাবে।
 
আল্লাহ তা’আলা প্রিয় নবী (ﷺ)কে বলেনঃ
وأنزلت عليك كتابا لا يغسله الماء
আমি তোমার উপর কিতাব নাজিল করেছি যা পানি দ্বারা ধুয়ে যাওয়া সম্ভব নয়
[সহীহ মুসলিম হাদিস নং ৭২০৭]
 
পানি দ্বারা সেই জিনিস ধুয়ে যাওয়া সম্ভব যা কাগজের উপর কালি দ্বারা লেখা হয়। যা স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে, তার পক্ষে ধুয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এবং আল্লাহ ভালো জানেন।
 
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ