কুরআন ও বাইবেল : কোন গ্রন্থটি আসলে কপি করে লেখা?

খ্রিষ্টান মিশনারীদের জবাব/বাইবেল ও খ্রিষ্টবাদ সংক্রান্ত



প্রাচীনকালে মহাকাশ ও এর প্রকৃতি নিয়ে নানা রকমের মতবাদ মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল। এগুলোর মধ্যে প্রায় সব মতবাদই ছিল কাল্পনিক ও চরম অবৈজ্ঞানিক। যেমনঃ প্রাচীন মিসরের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, আকাশ স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জাতীয় বিভিন্ন কথাবার্তা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মাঝেই ছিল। [1] প্রাচীন গ্রীসেও এ রকম মতবাদ প্রচলিত ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, আকাশ ও পৃথিবী উভয়েই স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে! [2] আধুনিক কালে টেলিস্কোপ আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার উন্মেষ ঘটবার আগ পর্যন্ত এ রকম বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক ধারণা মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল। বর্তমান যুগে আমরা জানি যে এ রকম কোন স্তম্ভ দ্বারা আকাশ বা পৃথিবী দাঁড়িয়ে নেই। বরং মহাকর্ষীয় বলের দ্বারা আকাশের বিভিন্ন উপাদান যেমনঃ পৃথিবীসহ বিভিন্ন গ্রহ, সূর্য ও বিভিন্ন নক্ষত্র ইত্যাদি তাদের ভারসাম্য রক্ষা করে আছে এবং নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করছে। [3]

 

চলুন দেখি আকাশ ও পৃথিবী সম্পর্কে বাইবেল কী বলে।

 

“তিনি[ঈশ্বর] দুনিয়াকে তার জায়গা থেকে নাড়া দেন, তার থামগুলোকে কাঁপিয়ে তোলেন

[বাইবেল, ইয়োব(আইয়ুব/Job) ৯:৬ {কিতাবুল মোকাদ্দস, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি অনুবাদ}]

“He shakes the earth from its place so that its pillars tremble.”

[ Job 9:6; Holman Christian Standard Bible (HCSB) ]

 

"ভূগর্ভস্থ থামগুলি আকাশকে ধারণ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঈশ্বর যখন তাদের তিরস্কার করেন তখন তারা ভয়ে চমকে যায় এবং কাঁপতে থাকে।"

[বাইবেল, ইয়োব(Job) ২৬:১১, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি অনুবাদ]

"The pillars that hold up the sky tremble, astounded at His rebuke."

[ Job 26:11; Holman Christian Standard Bible (HCSB) ]

 

আরো দেখুনঃ বাইবেল এর—Pslams(গীতসংহিতা/যবুর শরীফ) ৭৫:৩, Isaiah(যিশাইয়/ইসাইয়া) ২৪:১৮  যে সব জায়গায় পৃথিবী কোন এক প্রকার পিলার বা স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোর কথা বলা হয়েছে।

 

আকাশ ও পৃথিবী সম্পর্কে প্রাচীন মিসর ও গ্রীসে যে সব অবৈজ্ঞানিক মতবাদ প্রচলিত ছিল, তার সঙ্গে আমরা বাইবেলের তথ্যের অদ্ভুত মিল খুঁলে পাচ্ছি। অথচ খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকরা সব সময় অভিযোগ করে আসে যেঃ তাদের বাইবেল হচ্ছে ঈশ্বরের বাণী এবং কুরআন হচ্ছে কপি করে লেখা গ্রন্থ। [[আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করি, বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের ‘মূল কপি’র নামে খ্রিষ্টানদের কাছে যা আছে, সেগুলো গ্রীক ভাষায় লেখা। অথচ ঈসা(আ) মোটেও গ্রীক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বনী ইস্রাঈলের মানুষ এবং তাঁর সময়ে বনী ইস্রাঈলের লোকেরা এ্যারামায়িক ভাষায় কথা বলত।]]

তাদের উদ্যেশ্যে বিনীতভাবে বলতে চাই যেঃ “ঈশ্বরের বাণী”তে কী করে বৈজ্ঞানিক ভুল থাকে? “ঈশ্বরের বাণী”র সাথে কী করে প্রাচীন পৌরাণিক মতবাদের এমন মিল থাকে? তারা অভিযোগ করে যে কুরআন নাকি কপি করে লেখা। কোন গ্রন্থ যে আসলে কপি করে লেখা, তা বাইবেলের তথ্যের সাথে প্রাচীন পৌরাণিক মতবাদের মিল দেখেই বোঝা যাচ্ছে!

 

এবার চলুন, একই নিক্তি দিয়ে কুরআনকে পরিমাপ করি। দেখা যাক আকাশের গঠন সম্পর্কে আল কুরআন কী বলে।

 

"আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমণ্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হলেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করলেন; প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে, তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।"

(আল কুরআন, রা'দ ১৩:২)

"It is Allah who erected the heavens without pillars that you [can] see; then He established Himself above the Throne and made subject the sun and the moon, each running [its course] for a specified term. He arranges [each] matter; He details the signs that you may, of the meeting with your Lord, be certain."

(Qur'an, Ra'd 13:2)

 

কুরআন নাজিল হয়েছিল ৭ম শতাব্দীতে। সে সময়ে পৃথিবীর মানুষের মাঝে আকাশ নিয়ে বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক মতবাদ প্রচলিত ছিল, মানুষ বিশ্বাস করত আকাশ দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব স্তম্ভের উপর। অথচ আল কুরআনে সরাসরি বলা হচ্ছে কোন প্রকার স্তম্ভ বা পিলার ছাড়াই আল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন। সেই সাথে কুরআনে চাঁদ, সূর্য ইত্যাদি মহাজাগতিক বস্তুর কক্ষপথের কথা বলা হয়েছে। যার সঙ্গে পৌত্তলিক পৌরাণিক মতবাদ, বাইবেলের তথ্য ইত্যাদির কোন মিল নেই। বরং আধুনিক কালে আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের মিল আছে। এটা তো কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার আরেকটি প্রমাণ, সুবহানাল্লাহ।

কুরআন যদি কপি করেই লেখা হত, তাহলে কি এমনটি হত? এ কেমন “কপি করে লেখা”(!) গ্রন্থ যার সাথে তৎকালিন অবৈজ্ঞানিক তথ্যের কোন মিল নেই? মুহাম্মাদ(ﷺ) যদি বাইবেল থেকেই কুরআন কপি করতেন(নাউযুবিল্লাহ), তাহলে কী করে বাইবেল থেকে বৈজ্ঞানিক ভুলগুলো বাদ দিলেন??

 

ঈসা(আ) এর একত্ববাদী ধর্ম ফিলিস্তিন থেকে রোমে গিয়ে কী করে “রোমান” ধর্মে পরিনত হয়েছিল সে ইতিহাস পড়লে সে সময়কার মিসরীয়, গ্রীক এইসব পৌত্তলিক জাতির মতবাদের সাথে খ্রিষ্টান মতবাদের মিল দেখলে আর অবাক হতে হয় না। [4]  শুধুমাত্র মহাকাশ বিষয়ক তথ্যই না — বাইবেলে যিশুর জন্মকাহিনী [দেখুনঃ মথি ২য় অধ্যায়লুক ২য় অধ্যায়], “ঈশ্বরের জন্ম দেওয়া পুত্র”(?!) হওয়া, ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মরা, এরপর  পুনরুত্থিত হওয়া, মানুষের পাপের ভার বহন করা, ক্রুশের প্রতীক ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসের সাথে প্রাচীন মিসরীয় দেবতা Horus এবং রোমে পুজিত পার্সী দেবতা Mithras এর কাহিনীর অদ্ভুত মিল আছে। [5] অথচ কুরআনে ঈসা(আ) এর জন্মকাহিনী [দেখুনঃ সুরা মারইয়াম ১৯:১৬-৩৪; ] বাইবেল থেকে ভিন্ন এবং এর সাথে পৌত্তলিকদের পৌরাণিক কাহিনীর মিল নেই। খ্রিষ্টান মিশনারিরা কুরআনের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ করে আসছেন যে এটা কপি করে লেখা। অথচ অনুসন্ধান করে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কুরআন আদৌ কপি করে লেখা নয় বরং খ্রিষ্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থের কিছু অংশ এমনকি তাদের প্রধান প্রধান আকিদা-বিশ্বাসগুলোও মূর্তিপুজকদের থেকে কপি করা। যাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মগ্রন্থে এ রকম কপি-পেস্টের আলামত লক্ষ্য করা যায়, তারা কোন মুখে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে এইসব অভিযোগ আনেন?

 

আর যে সব নাস্তিক-মুক্তমনা খ্রিষ্টান প্রচারকদের সাথে গলা মিলিয়ে কুরআনের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক ভুল আর কপি করে লেখার অভিযোগ করেন তাদেরকে বলব---একমুখী অধ্যায়ন আর অন্ধ বিরোধিতার বদ অভ্যাস পরিত্যাগ করুন, এতে আপনাদেরই ভালো হবে। নচেৎ নিজেরাই হাসির খোরাক হবেন। মানুষ এখন সচেতন হচ্ছে। আপনাদের অভিযোগগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান করে মানুষ উল্টো ইসলামের সত্যতা আবিষ্কার করছে। এর ফলে মুসলিমদের ঈমান আরো দৃঢ় হচ্ছে আর অমুসলিমরাও ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  ▪  “Ancient Egyptian religion and mythology; The Djed Pillar”

http://www.ancientegyptonline.co.uk/djed.html

▪  “Ancient Egypt: the Mythology – Nut”

http://www.egyptianmyths.net/nut.htm

[2]  “ATLAS - Greek Titan God, Bearer of the Heavens”

http://www.theoi.com/Titan/TitanAtlas.html

[3]  ▪ “Stars and galaxies”  [BBC]

http://www.bbc.co.uk/education/guides/z496fg8/revision

▪ “How does Earth keep its orbit around the Sun and not come closer to the Sun” [UCSB Science Line]

http://scienceline.ucsb.edu/getkey.php?key=770

 [4]  ▪ ‘Pagan Christianity?: Exploring the Roots of Our Church Practices’ by Frank Viola &‎ George Barna

পুরো বইটিই এ বিষয়ক তথ্য-প্রমাণে ভরপুর

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://www.theology.kiev.ua/images/afiles/0000412.pdf

▪ "Christianity and Paganism" - Wikipedia The Free Encyclopedia

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Christianity_and_Paganism

[5]  ▪ “Mithra: The Pagan Christ” by Acharya S/D.M. Murdock

http://www.truthbeknown.com/mithra.htm

▪ “Christ in Egypt: The Horus-Jesus Connection” by Acharya S/D.M. Murdock

https://goo.gl/g2UZrp

▪ “Horus” -- Ancient Egypt Wikia

http://ancientegypt.wikia.com/wiki/Horus

▪ “The Parallels Between Jesus and Horus”

http://hubpages.com/religion-philosophy/forum/42035/the-parallels-between-jesus-and-horus-

▪ “The Pagan Origins of the Cross” By Abdullah Kareem

http://www.answering-christianity.com/abdullah_smith/cross_pagan_origins.htm