কুরআন কি আসলেই দাবি করে সৌরজগতে গ্রহ ৭টি?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



নাস্তিক প্রশ্নঃ মুসলিমরা কোন ভিত্তিতে দাবি করে (Quran 65:12) সৌর জগতে সাতটি গ্রহ 

যেখানে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন তেরটি?

 

উত্তরঃ

"আল্লাহ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে, এসবের মধ্যে তাঁর আদেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু তাঁর গোচরীভূত।"

(৬৫:১২)

 

এখানে নাস্তিকদের দাবী যে, এই আয়াতে সৌর জগতে মোট সাতটি গ্রহের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত, সৌর জগতে আবিষ্কৃত গ্রহের সংখ্যা তেরটি। এটা কি কুরআনের সায়েন্টিফিক ত্রুটি নয়?

 

১৮০১ সালের পূর্বে, Ceres গ্রহটি( গ্রহটিকে পরে বামন গ্রহে ফেলা হয়) আবিষ্কারের আগে সৌর জগতে মোট আবিষ্কৃত গ্রহের সংখ্যা ছিল সাতটিই।তারা হল বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল,বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস। ২০০৬ সালে সংখ্যাটি এসে দাড়ায় ১৩ তে। বিজ্ঞানীর এই তেরটি celestial body গুলোর মধ্যে আটটিকে গ্রহের মর্যাদা দিয়ে বাকিগুলোর গ্রহত্ব কেড়ে নিয়ে বামন গ্রহে সংজ্ঞায়িত করেন। [1]

 

এরিস্টটলের সময় থেকে কোপার্নিকাসের সময় পর্যন্ত মুক্ত চোখে আকাশে সাতটি চলমান celestial body দেখা যেত - চাঁদ, সূর্য, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি। [2] নাস্তিকদের দাবি, মুহাম্মাদ (সাঃ) এই সাতটি বস্তুকেই সাত পৃথিবী হিসেবে কোরানে লিখে দিয়েছেন! এর মানে কুরআন সৌর জগতে কেবল সাতটি গ্রহের কথা বলে। আসলেই কি তাই?

 

তৎকালীন মক্কার সবচেয়ে বোকা লোকটিও হয়তো জানতো যে সূর্য একটি উত্তপ্ত অগ্নিগোলক যা কোন ভাবেই পৃথিবীর সাথে তুলনা করা চলে না। আয়াতে যেহেতু বলা হয়েছে পৃথিবী কিংবা ভূমিও তৈরি করা হয়েছে সপ্ত আসমানের মত সমান সংখ্যায়। সুতরাং মুহাম্মাদ (সাঃ) যদি কোরান তার ইচ্ছে মত তৎকালীন জানা জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে লিখতেন তাহলে অবশ্যই সূর্য বাদে হিসেব করতেন। কারণ, অন্যান্য বস্তু গুলো গ্রহ নাকি নক্ষত্র নাকি উপগ্রহ সে সম্পর্কে তখনকার মানুষের জানা ছিল না কিন্তু সূর্য যে গ্রহ নয় তা জানা ছিল। পৃথিবীর সাথে তুলনা কেবল টেরেস্ট্রিয়াল গ্রহেরই হওয়া উচিত। পক্ষান্তরে, সূর্যকে কোরানের অন্য আয়াতে নক্ষত্র হিসেবেই ঘোষণা করা হয়েছে যার নিজের আলো আছে আর চাঁদকে প্রতিফলিত আলো বলা হয়েছে। এদেরকে কোন ভাবেই গ্রহ বলা হয়নি বা পৃথিবীর মত বাসযোগ্য কোন স্থান বলা হয়নি।

"এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন প্রতিফলিত আলোরূপে ( نُورً) এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে ( سِرَاجًا) " [3]

 

সুতরাং, কুরআনে বর্ণিত সাত পৃথিবী বা seven earth কোন ভাবেই সৌর জগতের গ্রহের সংখ্যার সাথে তুলনীয় নয়। নাস্তিকদের এই দাবী সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

 

তবে এই সাত জমিন আসলে কি??

অনেকে এই সাত জমিনকে পৃথিবীর সাতটি অভ্যন্তরীণ স্তরের সাথে তুলনা করেছেন। কেউ পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সাথে তুলনা করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই আয়াতের তাফসীরে এরকম কিছুই বলা হয়নি। সপ্ত জমিনের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস রয়েছে। সেগুলো কোনটাই পৃথিবীর জিওলজিক্যাল লেয়ারের কিংবা সাত মহাদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি হাদিসে নবীজি (সাঃ) প্রত্যেকটি জমিনের দূরত্বকে পাঁচশত বছরের পথ বলেছেন। [4]

তাহলে বোঝা যাচ্ছে এই সাত পৃথিবী হয়তো পৃথিবীর অনুরুপ গ্রহ হয়ে থাকবে যা আমরা এখনো জানিনা। মরিস বুকাইলিও মনে করতেন এই সাত পৃথিবী পৃথিবীর অনুরুপ গ্রহ হয়ে থাকবে। [5]


এটা মোটেই আশ্চর্যজনক নয় যে সমগ্র মহাবিশ্বে কেবল পৃথিবীর মত গ্রহ মাত্র সাতটি থেকে থাকবে। Guillermo Gonzalez এর The Privileged Planet বই আমাদের দেখিয়েছে যে আমাদের পৃথিবী এই মহাবিশ্বে কতটা ইউনিক, রেয়ার এবং কেবল মাত্র প্রাণ সৃষ্টির জন্য তৈরি করা। আল্লাহ আমাদের এই সপ্ত পৃথিবী সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে জানাননি। এই সপ্ত পৃথিবীগুলো কোথায় এবং এতে কি আছে তা আল্লাহই একমাত্র ভাল জানেন। [6]

 

তবে এটা পরিষ্কার যে এই সপ্ত পৃথিবী মোটেই সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা সম্পর্কে কিছু বলছে না।


তথ্যসূত্রঃ

[1]  “How many Planets are there in the Solar System __ The Planets Today”

http://www.theplanetstoday.com/how_many_planets_are_in_the_solar_system.html

[2]  Classical planet – Wikipedia

https://en.wikipedia.org/wiki/Classical_planet

[3]  আল কুরআন, সুরা নুহ, আয়াত : ১৬

[4]  তাফসীর ইবন্ কাসীর- হাফেজ ইমামুদ্দিন ইবনু কাসীর (র)

[5]  Dr. Maurice Bucaille, The Bible,the Qu'ran & Science : The Holy scriptures examined in the light of modern knowledge

[6]  মা'রিফুল কোরআন- মুফতি শাফী উসমানী