কুরআন কি আসলেই প্রাচীন কবি ইমরুল কায়েসের কবিতা থেকে নকল করে লেখা?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

অনন্য ও অসামান্য এক গ্রন্থ আল কুরআন। এর সাহিত্যগুণ, সুদৃঢ় বক্তব্য ও ভাষাগত মাধুর্য সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের নিকট এক বিস্ময় বলে পরিগনিত হয়ে আসছে। বিবেকবান ও সত্যসন্ধানীরা একে আল্লাহর বাণী হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। আল্লাহ তা’আলার বাণী আল কুরআনের কোনরূপ ত্রুটি প্রমাণ করতে ব্যার্থ হয়ে নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান প্রচারক চক্র নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে চলছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে—কুরআনের উৎসমূলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি কুখ্যাত নাস্তিক্যবাদে ব্লগে আর্টিকেল প্রকাশ করা হয়েছে—কুরআনের কিছু আয়াত নাকি প্রাচীন আরবীয় কবি ইমরুল কায়েসের কবিতা থেকে কপি করে লেখা (নাউযুবিল্লাহ)। এর অপনোদনের জন্যই এই লেখা।
 
নাস্তিক-মুক্তমনাদের এই অভিযোগ কোন মৌলিক অভিযোগ না। বহু আগে থেকেই রবার্ট মোরি, আনিস সরোশসহ বহু খ্রিষ্টান মিশনারী আল কুরআনের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আসছে। তাদের দাবি হচ্ছে – প্রাচীন আরবে মুশরিকদের একটি প্রথা ছিল কবিরা তাদের কবিতা কা’বা ঘরের গায়ে ঝুলিয়ে রাখত। এগুলোকে বলা হত ‘মুয়াল্লাকাত’। আল কুরআনের সুরা ক্বমারের কিছু অংশ নাকি আরবের জাহেলী যুগের কবি ইমরুল কায়েসের এমন একটি কবিতা থেকে নেয়া (নাউযুবিল্লাহ)। আর সেই অংশ হচ্ছে সুরা ক্বমারের প্রথম আয়াত- 
 
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ
অর্থঃ “কিয়ামত আসন্ন এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” [1]
 
এই অভিযোগ যে নির্জলা মিথ্যা তা প্রমাণ করা খুবই সহজ।
 
প্রথমতঃ সুরা ক্বমারের এই আয়াতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) কর্তৃক চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার মুজিজার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। এই মুজিজার প্রেক্ষিতেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে। সুরাটির ২ ও ৩ নং আয়াতে মক্কার মুশরিকরা এই মুজিজা দেখেও কিভাবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল তার বিবরণ উল্লেখ আছে। [2] রাসুলুল্লাহ(ﷺ) নবুয়ত পেয়েছেন ৪০ বছর বয়সে (৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) [3]  এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার মুজিজা ঘটেছে এরও পরে।
অপরদিকে, ইমরুল কায়েস প্রাচীন আরবের একজন কবি। তার মৃত্যু হয়েছে ৫০০ খ্রিষ্টাব্দে, [4] রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর জন্মের প্রায় ৭০ বছর আগে। যে ঘটনা ইমরুল কায়েসের মৃত্যুর ১১০ বছরেরও বেশি সময় পরে ঘটেছে, তার উল্লেখ কি আদৌ তার কবিতায় থাকা সম্ভব? ইমরুল কায়েস কী করে তার মৃত্যুর শত বছর পরে সংঘটিত হওয়া রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর মুজিজা নিয়ে কবিতা লিখবে?!!! 
 
দ্বিতীয়তঃ সে যুগের আরবের মুশরিকরা পরকালে বিশ্বাস করত না। [5] ইমরুল কায়েস পৌত্তলিকতা ছেড়ে একত্ববাদী ও পরকালে বিশ্বাসী ইব্রাহিমী ধর্ম অনুসরণ করত এমন কোন বিবরণ নেই। কাজেই ইমরুল কায়েসের কবিতায় পরকালের কথা উল্লেখ থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। কোনভাবে যদি পরকালের কথা নিয়ে কোন কবি লিখেও থাকত, তাহলেও পৌত্তলিক আরবরা সেই কবিতা কা’বার গায়ে ঝুলিয়ে রাখতে দিত না কেননা এটা ছিল তাদের ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধ কথা। অথচ সুরা ক্বমারের ১নং আয়াতে বলা হচ্ছেঃ “কিয়ামত আসন্ন...”। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা প্রাচীন আরবের কোন মুশরিক কবির লেখা কবিতার অংশ নয়। 
 
এই ভিত্তিহীন ও উদ্ভট অভিযোগের উৎস হচ্ছে, খ্রিষ্টান পণ্ডিত Clair-Tisdall এর কিছু বক্তব্য। তিনি ১৯০০ সালে তার গ্রন্থ ‘The Sources of Islam’ এ সুরা ক্বমারের ১ম আয়াতের ব্যাপারে লিখেছেন,

‘It was the custom of the time for and orators to hang up their compositions upon the Ka’aba; and we know the seven Mu’allaqat were exposed. We are told that Fatima, the Prophet’s daughter, was one day repeating as she went along the above verse. Just then she met the daughter of Imrul Qays, who cried out, “O that’s what your father has taken from one of my father’s poems, and calls it something that has come down to him out of heaven;” [6] 
অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর কন্যা ফাতিমা(রা) এর মুখে আয়াতটি শুনে ইমরুল কায়েসের কন্যা চিৎকার করে বলেছিলঃ “ওটা তোমার বাবা [মুহাম্মাদ(ﷺ)] আমার বাবার কবিতা থেকে নিয়েছে (নাউযুবিল্লাহ) এবং বলে বেড়াচ্ছে তা নাকি আসমান থেকে এসেছে! ” 
 
খ্রিষ্টান মিশনারীদের দাবির উৎস হচ্ছে এই লেখা। তারা Clair-Tisdall কে উদ্ধৃত করে কুরআনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলেন। বাংলাদেশের নাস্তিক্যবাদী ব্লগটিতে এ ঘটনার উৎস হিসাবে Ibn Waraq ছদ্মনামের এক ইসলামবিরোধী অপ্রপ্রচারকারীর বইয়ের উদ্ধৃতি দেয়া আছে, কিন্তু Ibn Waraq এর বইতে উল্লেখিত ঘটনাটিরও মূল উৎস হচ্ছে Clair-Tisdall এর ১৯০০ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থটি। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, খোদ Clair-Tisdall নিজ জীবদ্দশাতে কুরআনের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগটি থেকে সরে এসেছিলেন এবং পূর্বের বইতে তার নিজের বর্ণনাটিকে ‘মিথ্যা ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তার গ্রন্থ ‘The Original Sources of the Qur'an’ এ তিনি লিখেছেন,

“...I have even heard a story to the effect that one day when Fatimah, Muhammad's daughter, was reciting the verse "The Hour has come near and the Moon has split asunder" (Surah LIV., Al Qamar, 1), a daughter of the poet was present and said to her, "That is a verse from one of my father's poems, and your father has stolen it and pretended that he received it from God." THE TALE IS PROBABLY FALSE, for Imrau'l Qais died about the year 540 of the Christian era, while Muhammad was not born till A.D. 570, "the year of the Elephant.
In a lithographed edition of the Mu`allaqat, which I obtained in Persia, however, I found at the end of the whole volume certain Odes there attributed to Imrau'l Qais, THOUGH NOT RECOGNIZED AS HIS IN ANY OTHER EDITION OF HIS POEMS WHICH I HAVE SEEN. …” [7]  
অর্থাৎ, ইমরুল কায়েসের মৃত্যুবরণ করেছে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর জন্মেরও আগে। কাজেই এই ঘটনাটি খুব সম্ভব মিথ্যা। তা ছাড়া তিনি প্রাচীন আরবের ‘মুয়াল্লাকাতের’ মধ্যে কোথাও ইমরুল কায়েসের এমন কোন কবিতা পাননি।
 
যে ঘটনাটিকে মিথ্যা ঘটনা বলে উল্লেখ করে করে খোদ এই ঘটনার বর্ণনাকারী নিজ বইতে ভুল সংশোধণ করেছেন, সেই ঘটনাটিকে ‘উৎস’ ধরে আল কুরআনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে খ্রিষ্টান মিশনারী ও নাস্তিক-মুক্তমনারা। আল্লাহ এদের মিথ্যাচারের নিপাত করুন। সত্যের বিপরীতে মিথ্যা কোন কাজে আসে না এবং মিথ্যারোপকারীরা ব্যার্থই হয়।
 
“কিন্তু আমি [আল্লাহ] সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে ওটা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা যা বলছ তার জন্য।” [8]
 
“নিশ্চয়ই এটা (কুরআন) এক সম্মানিত রাসুলের তেলাওয়াত। এটা কোন কবির কথা নয়; তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।
এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। ”
 [9]
 
“ আমি তাঁকে [মুহাম্মাদ()] কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং সেটি তো তার জন্যে শোভনীয়ও নয়। এটা তো এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।
যাতে তিনি সতর্ক করেন যারা জীবিত তাদেরকে এবং যাতে কাফিরদের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা সত্য হতে পারে।”
 [10]
 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, ক্বমার ৫৪ : ১

[2]  বিস্তারিত দেখুনঃ তাফসির ইবন কাসির ৮ম খণ্ড (হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী), সুরা ক্বমারের ১-৫ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ১৭১-১৭৫

[3]  ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র), পৃষ্ঠা ৯৪

[4]  ‘Encyclopædia Britannica’; Article: ‘Imruʾ al-Qays, Arab poet’

https://www.britannica.com/biography/Imru-al-Qays-Arab-poet

[5]  ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র), পৃষ্ঠা ১১৪

[6]  W. St Clair-Tisdall's book ‘The Sources of Islam’, being Sir William Muir's translation of Tisdall's Persian work Yanabi`u'l Islam (published in 1900) page 9-10
আরো দেখুন - The Origin of Islam (The Origins of the Koran, pp.235-236)

[7]  ‘The Original Sources of the Qur'an’ by W. St Clair-Tisdall, published by SPCK, London, 1905; page: 47-49

[8]  আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ১৮

[9]  আল কুরআন, হাক্কাহ ৬৯ : ৪০-৪৩

[10]  আল কুরআন, ইয়াসিন ৩৬ : ৬৯-৭০