ছায়ার নির্দেশক সম্পর্কে আল কুরআনের তথ্য

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



নাস্তিক প্রশ্নঃ কুরআন দাবি করে, ছায়া পড়ে সূর্যের আবর্তনের কারণে(পৃথিবীর নয়) (Quran 25:45) ! আসলেই কি তাই?

উত্তরঃ আল কুরআনে বলা হয়েছে—


أَلَمْ تَرَ إِلَىٰ رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّ وَلَوْ شَاءَ لَجَعَلَهُ سَاكِنًا ثُمَّ جَعَلْنَا الشَّمْسَ عَلَيْهِ دَلِيلًا
অর্থঃ তুমি কি তোমার প্রভুর[আল্লাহ] প্রতি লক্ষ্য কর না, কিভাবে তিনি ছায়া সম্প্রসারিত করেন? তিনি ইচ্ছা করলে এটাকে তো স্থির রাখতে পারতেন; এরপর আমি সূর্যকে করেছি এর নির্দেশক।
(আল কুরআন, ফুরকান ২৫:৪৫)
 
এখানে আয়াতের কোথাও এটা বলা হয় নি যে—ছায়া পড়ে পৃথিবীর আবর্তনের জন্য নয় বরং সূর্যের আবর্তনের জন্য। অভিযোগকারীরা এখানে নিজেদের কথা কুরআনের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে অসত্য অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এখানে কোথাও পৃথিবীর আবর্তনকে অস্বীকার করা হয়নি। আয়াত প্রসঙ্গসহ পড়লেই স্পষ্ট বোঝা যাবে যে এখানে ছায়া তৈরির ব্যাপারে সূর্য যে নির্দেশক, সেই কথা বলা হচ্ছে। এবং এই কথার মাঝে বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি তো দূরের কথা, বরং স্রষ্টার অনন্য অনুগ্রহের স্বরূপ ফুটে উঠেছে। সূর্য যদি উদিত না হত, তাহলে রাত ও দিনের পরিচয় পাওয়া যেত না। কেননা বিপরীতকে বিপরীতের মাধ্যমেই চেনা যায়। কাতাদাহ(র) এই আয়াতের ব্যাপারে বলেন—সূর্য হল নির্দেশক যাকে ছায়া তার বিলীন হওয়া পর্যন্ত অনুসরণ করতে থাকে। [ইবন কাসির, দুররুল মানসুর ৬/২৬২]
 
একটি অস্বচ্ছ বস্তু দ্বারা আলোক বাঁধাপ্রাপ্ত হলে প্রতিবিম্বের সৃষ্টি হয় এবং এটি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দেখা যায়।সূর্যের মত আলোর উৎসটি যদি আপেক্ষিকভাবে স্থিতিশীল না হয়, তাহলে প্রতিবিম্বের দৈর্ঘ্য এবং অবস্থানও স্থিতিশীল হয় না; আলোর উৎস তথা সূর্যের অবস্থান দ্বারা তা নির্ধারিত হয়। সূর্য ও পৃথিবীর পারস্পরিক গতির এক নির্দিষ্ট অনুপাতের কারণে এই স্থিতিশীল অবস্থা বজায় থাকে। প্রতিবিম্বের দৈর্ঘ্য আপতন কোণের স্পর্শকের ব্যাস্তানুপাতিক হয়ে থাকে। সুতরাং আপতন কোণ যত ছোট হবে, প্রতিবিম্বের দৈর্ঘ্য ততই বড় হবে। কাজেই সকালে যখন দিগন্ত থেকে সূর্যের দৃশ্যমান উচ্চতা কম থাকে, তখন প্রতিবিম্বের দৈর্ঘ্য বেশি থাকে।এই উচ্চতা যতই বাড়তে থাকে, প্রতিবিম্বও পর্যায়ক্রমে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে। এরপর আবার সূর্যের উচ্চতা যত হ্রাস পেতে থাকবে, প্রতিবিম্বটি তত দীর্ঘতর হতে থাকবে। সূর্য কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিবিম্বের এ সকল পরিবর্তন আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ীই হয়ে থাকে।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে—“তিনি ইচ্ছা করলে এটাকে তো স্থির রাখতে পারতেন’’ – এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।এটা ঘটতে পারত শুধুমাত্র তখন, যখন পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণণের গতি এত ধীর থাকত যে, পৃথিবী যে সময়ে সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে আসে ততক্ষণে নিজ অক্ষের চারদিকে মাত্র একবার ঘূর্ণণ সমাপ্ত করত। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর এক পাশ স্থায়ীভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকত যেখানে প্রতিবিম্ব হত স্থির, আর অপর পাশ হত স্থায়ীভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন। এ ধরণের পরিস্থিতি হত ভয়ানক বিপর্যয়কর। কেননা পৃথিবীর যে পাশটি স্থায়ীভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকত, সে পাশটি হয়ে পড়ত জ্বলন্ত মরুভূমি। আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পাশটি জমাট বরফাচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। আর এ রকম পরিবেশগত অবস্থায় পৃথিবীতে প্রাণীজগতের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ত, সৌরজগতের অন্য গ্রহগুলোর মতই পৃথিবী হত প্রাণহীন। আল্লাহ তাঁর সীমাহীন দয়ায় পৃথিবীকে তার অক্ষের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘূর্ণণ দান করেছেন যে কারণে প্রতিবিম্ব বড় হয়, আবার আকারে ক্ষুদ্র হয়ে যায়। এভাবে পৃথিবীর কোন পাশই দীর্ঘকাল ধরে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে না, কিংবা সূর্যের বিপরীতমুখী হয়ে থাকে না। ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ু প্রাণের বিকাশের ও টিকে থাকার জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে।
 

কাজেই আমরা দেখছি যে নিরপপেক্ষ ও সত্যিকারের ‘বিজ্ঞানমনষ্ক’ ব্যক্তি কখনোই এই আয়াত থেকে বৈজ্ঞানিক ভুল খুঁজে পাবে না বরং স্রষ্টার অসামান্য অনুগ্রহ খুঁজে পাবে।

 

সহায়ক গ্রন্থঃ

'আল-কুরআনে বিজ্ঞান'
(Scientific Indications in the Holy Quran এর অনুবাদ)

অনুবাদে : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ অনুবাদ পরিষদ

সম্পাদনা : অধ্যাপক এ. এফ. এম. আবদুর রহমান।