নন্দন-কাননে নগ্নতা

ইসলামী বিশ্বাস সংক্রান্ত খ্রিষ্টান মিশনারীদের জবাব/বাইবেল ও খ্রিষ্টবাদ সংক্রান্ত



 

নগ্নতার ব্যাপারে পশ্চিমা সমাজ বেশ ‘উদার’। নাস্তিকদের কথা বলছি না শুধু। ধর্মে বিশ্বাসী (খ্রিষ্টান ও ইহুদি) যারা, তারাও। সেখানে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, মানবজাতির আদিপুরুষ অ্যাডাম এবং তাঁর স্ত্রী ইভ ইডেন গার্ডেন বা নন্দন-কাননে উলঙ্গ অবস্থায় থাকতেন। তাদের বিশ্বাস হচ্ছে আদি মানব-মানবীর বাসস্থান ইডেন গার্ডেন এই পৃথিবীরই মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক স্থানে অবস্থিত। [1] ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস হচ্ছে, আদি মানব-মানবী যেখানে কোনো জামাকাপড় না পরেই উলঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়াতেন, তাদের কোনো লজ্জা ছিলো না। বাইবেলে উল্লেখ আছে,

 

19 প্রভু ঈশ্বর পৃথিবীর ওপরে সমস্ত পশু আর আকাশের সমস্ত পাখী তৈরী করবার জন্য মৃত্তিকার ধূলি ব্যবহার করেছিলেন| প্রভু ঈশ্বর ঐ সমস্ত পশুপাখীকে মানুষটির কাছে নিয়ে এলেন আর মানুষটি তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম দিল|

...

21 তখন প্রভু ঈশ্বর সেই মানুষঢিকে খুব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করলেন| মানুষটি যখন ঘুমোচ্ছিল তখন প্রভু ঈশ্বর তার পাঁজরের একটা হাড় বের করে নিলেন| তারপর প্রভু ঈশ্বর য়েখান থেকে হাড়টি বের করেছিলেন সেখানটা চামড়া দিয়ে ঢেকে দিলেন|

22 প্রভু ঈশ্বর মানুষটির পাঁজরের সেই হাড় দিয়ে তৈরি করলেন একজন স্ত্রী| তখন সেই স্ত্রীকে প্রভু ঈশ্বর মানুষটির সামনে নিয়ে এলেন|

...

25 তখন নরনারী উলঙ্গ ছিল, কিন্তু সেজন্যে তাদের কোন লজ্জাবোধ ছিল না। [2]

 

বাইবেল আরো বলে, নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাবার পর থেকে আদি মানব-মানবীর মধ্যে লাজ-লজ্জাবোধের উদ্ভব হয়। [3] এবং পরবর্তীকালে মানবজাতির মাঝে শালীন পোশাক পরার কথাও বাইবেলে পাওয়া যায়।

 

 

এ জন্যই খ্রিষ্টীয় বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও চলচ্চিত্রে অ্যাডাম ও ইভকে বোঝাতে সুঠামদেহী একজন পুরুষ ও নারীকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখানো হয়। আদি মানব-মানবীই যেহেতু দুনিয়ায় উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াতো, কাজেই নগ্নতা জিনিসটা হয়তো পশ্চিমা ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে এক ধরণের “পূর্বসুরীর আমল” হিসাবে বিবেচিত হয়। আর নাস্তিকদের কথা তো বলাই বাহুল্য। পশ্চিমের আধুনিক সমাজে এখন নগ্নতা (আংশিক বা সম্পূর্ণ) কোনো অস্বাভাবিক জিনিস নয়। মুসলিমরা যেভাবে নগ্নতা ও নির্লজ্জতার বিরুদ্ধে সরব, পশ্চিমাদের কাছে এটা অনেক সময় ‘অতি রক্ষণশীলতা’ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ‘বর্বরতা’ বলে বিবেচিত হয়। ওরিয়েন্টালিস্টদের প্রচারণার ফলে সেখানে অনেকেরই ধারণা মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন হচ্ছে বাইবেল থেকে নকল করে লেখা একটা কিতাব। যেহেতু বাইবেলের অ্যাডাম-ইভ ইডেন গার্ডেনে ন্যাংটো হয়ে থাকতো, পশ্চিমে অনেকের ধারণা কুরআনের আদম-হাওয়ার কাহিনীও বোধ হয় এক। সেই ধারণা থেকে প্রভাবিত হয়ে অনেক সময়ে দেশিয় ইসলামবিদ্বেষীরা মুসলিমদের খোঁচা মেরে এমন ছবিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছাড়ে যাতে যায় প্রায় উলঙ্গ একজন পুরুষ আর নারীর ছবি দিয়ে তারা বলেঃ এই হলো ইসলামের আদম-হাওয়া!

এমন প্রচারণা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। ইসলামের এই সমালোচকরা ভালো করে কুরআন পড়েও দেখে না। পড়লে তারা জানতো যে বাইবেলের অ্যাডাম-ইভের কাহিনীর সাথে আল কুরআনের আদম(আ.) ও তাঁর স্ত্রীর কাহিনীতে ব্যাপক পার্থক্য।

 

এর অন্যতম হলোঃ জান্নাতে আদম(আ.) ও তাঁর স্ত্রী মোটেও বস্ত্রহীন ছিলেন না। তাঁরা সেখানে জান্নাতের পোশাক পরা ছিলেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আদম(আ.) এর বসবাসের জান্নাত পৃথিবীর কোনো স্থান নয় বরং তা ৭ম আসমানে। [4]

 

অতঃপর আমি বললাম, ‘হে আদম, নিশ্চয় এ (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং সে যেন তোমাদের উভয়কে জান্নাত থেকে কিছুতেই বের করে না দেয়, তাহলে তোমরা দুর্ভোগ পোহাবে

নিশ্চয় তোমার জন্য এ ব্যবস্থা যে, তুমি সেখানে ক্ষুধার্তও হবে না এবং বস্ত্রহীনও হবে না [5]

 

অর্থাৎ আল কুরআনের আদম(আ) ও তাঁর স্ত্রী মোটেও বাইবেলের অ্যাডাম-ইভের ন্যায় নন্দন কাননে নগ্ন ঘুরে বেড়াতেন না।

আল কুরআনে আরো বলা আছে, নিষিদ্ধ গাছ থেকে ভক্ষণ করার পরে তাঁদের সতর অনাবৃত হয়ে যায় অর্থাৎ জান্নাতের পোশাক খুলে যায়। এরপরেও তাঁরা নগ্ন না থেকে জান্নাতের গাছের পাতা দ্বারা নিজেদের আবৃত করেন। নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে ভক্ষণের আগে বা পরে কখনো তাঁরা নগ্ন থাকেননি।

 

অতঃপর তারা উভয়েই সে গাছ থেকে খেল। তখন তাদের উভয়ের সতর তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে নিজদেরকে আবৃত করতে লাগল এবং আদম তার রবের হুকুম অমান্য করল; ফলে সে বিভ্রান্ত হল।[6]

 

বাইবেলে অ্যাডাম-ইভের গল্পে তারা খুব সাধারণভাবেই ইডেন গার্ডেনে উলঙ্গ থাকতেন, তাদের লাজ-লজ্জা ছিলো না। অপরদিকে কুরআনে বর্ণিত ঘটনায় আদম(আ) ও তাঁর স্ত্রী বিবস্ত্র থাকতেন না বরং তাঁদের নগ্ন করা ছিলো শয়তানের ইচ্ছা। শয়তান তাঁদেরকে বিবস্ত্র করবার জন্যই কুমন্ত্রণা দিয়েছিলো। বাইবেলে অ্যাডাম ও ইভের জন্য যা সাধারণ ঘটনা, কুরআনে তা শয়তানী হিসাবে চিহ্নিত।

 

অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান, যা গোপন রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, ‘পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।

...

অতঃপর সে (শয়তান) তাদেরকে প্রতারণার মাধ্যমে পদস্খলিত করল। তাই তারা যখন গাছটির ফল আস্বাদন করল, তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে গেল। আর তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজদেরকে ঢাকতে লাগল এবং তাদের রব তাদেরকে ডাকলেন যে, ‘আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছটি থেকে নিষেধ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি যে নিশ্চয় শয়তান তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু’?” [7]

 

সুরা আ’রাফের ২০ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির আহসানুল বায়ানে বলা হয়েছেঃ আদম ও হাওয়া (আলাইহিমাস সালাম)-কে এই ভ্রষ্ট করার পিছনে শয়তানের উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে সেই জান্নাতী পোশাক থেকে বঞ্চিত করে লজ্জিত করা, যা তাদেরকে জান্নাতে পরার জন্য দেওয়া হয়েছিল [8]

 

 

কুরআনবাইবেলের এই পার্থক্যের ব্যাপারে না জেনেই অনেক সময় ইসলামবিরোধীরা ইসলামের সমালোচনা করে, মুসলিমদেরকে খোঁচা দেয়। যাদের যেমন রুচি, তারা সেভাবেই অন্যকে খোঁচা দেবে এটাই স্বাভাবিক। ইসলামের পর্দার বিধান হয়তো তাদের নিকট আপত্তিকর ঠেকে। বেপর্দা হওয়া, নগ্নতা তাদের নিকট স্বাভাবিক জিনিস হতে পারে, ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু আমাদের নিকট নির্লজ্জতা, নগ্নতা এগুলো শয়তানী কর্ম। আমাদের ধর্মগ্রন্থে যে জিনিস নেই, সেই জিনিস আমাদের উপর আরোপ করে আমাদেরকে খোঁচা দেয়া তাদের অজ্ঞতা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার পরিচায়ক।

 

কুরআনের আরো ২টি আয়াত দিয়ে প্রবন্ধটির সমাপ্তি টানছি—

 

হে আদাম সন্তান! আমি তোমাদেরকে পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এবং শোভা বর্ধনের জন্য। আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক। ওটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।

হে আদাম সন্তান! শয়ত্বান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ফিতনায় ফেলতে না পারে যেমনভাবে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করেছিল। সে তাদের পরস্পরকে লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য তাদের দেহ হতে পোশাক খুলিয়ে ফেলেছিল। সে আর তার সাথীরা তোমাদেরকে এমনভাবে দেখতে পায় যে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না তাদের জন্য আমি শয়ত্বানকে অভিভাবক বানিয়ে দিয়েছি। [9]

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] “What is the location of the Garden of Eden_ _ GotQuestions.org”

https://www.gotquestions.org/garden-of-Eden-location.html

[2] বাইবেল, আদিপুস্তক (Genesis) ২ : ১৯-২

[3] দেখুনঃ বাইবেল, আদিপুস্তক (Genesis) ৩ : ১-১০

[4] তাফসির কুরতুবী, সুরা নাজমের ১৫ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য

http://quran.ksu.edu.sa/tafseer/qortobi/sura53-aya15.html

[5] আল কুরআন, ত্ব-হা ২০ : ১১৭-১১৮

[6] আল কুরআন, ত্ব-হা ২০ : ১২১

[7] আল কুরআন, আ’রাফ ৭ : ২০, ২২

[8] তাফসির আহসানুল বায়ান -আল্লামা হাফিয সালাহুদ্দীন ইউসুফ; সুরা আ’রাফের ২০ নং আয়াতের তাফসির

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=974

[9] আল কুরআন, আ’রাফ ৭ : ২৬-২৭