নিঃসঙ্গ পথযাত্রী

মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতা



রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাবুক অভিযান। আরবের তপ্ত গ্রীষ্মে মদীনা থেকে শামের (Levant) দিকে যাত্রা।  সাহাবীদের নিয়ে ভয়াবহ কঠিন এক সফর শুরু করেছেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)।

 

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন রওনা হচ্ছিলেন, তখন কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে  এ অভিযানে যাবার ব্যাপারে ইতস্তত ভাব প্রকাশ করছিল। পথে কাউকে দেখা না গেলে সাহাবীরা বলতেন, “হে আল্লাহর রাসুল(ﷺ), অমুক আসেনি।”  জবাবে তিনি বলতেন, যদি তার উদ্দেশ্য মহৎ হয় তাহলে শিগগিরই আল্লাহ তাঁকে তোমাদের সাথে মিলিত করবেন। না হলে আল্লাহ তাকে তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার থেকে তোমাদের নিরাপদ করেছেন। এক সময় আবু যার গিফারী(রা.) এর নামটি উল্লেখ করে বলা হল - সেও পিঠটান দিয়েছে!  আসল ঘটনা হল, তাঁর উটটি ছিল মন্থর গতির। প্রথমে তিনি উটটিকে দ্রুত চালাবার চেষ্টা করেন; কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে নিজের কাঁধে উঠিয়ে পায়ে হাঁটা শুরু করেন।

 

এক সাহাবী দূর থেকে তাঁকে দেখে বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসুল(ﷺ), রাস্তা দিয়ে কে যেন একজন আসছে!” তিনি বললেন, আবু যারই হবে। লোকেরা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে তাঁকে চিনতে পারল। বলল, হে আল্লাহর রাসুল(ﷺ), আল্লাহর কসম, এ তো আবু যারই! [1]  

 

রাসুলুল্লাহ(ﷺ) বললেনঃ

يرحم الله أبا ذر يمشي وحده ويموت وحده ويحشر وحده

অর্থঃ আল্লাহ আবু যারকে রহম করুন, যে নিঃসঙ্গ চলে। নিঃসঙ্গ অবস্থায়ই তাঁর মৃত্যু হবে এবং তাঁর হাশরও হবে নিঃসঙ্গ অবস্থায়। [2]  

 

এর বহুদিন পরের ঘটনা। মৃত্যুশয্যায় আবু যার(রা.)। সময়টি তখন ৩১ বা ৩২ হিজরী। মদিনা থেকে কিছু দূরে রাবযা নামক নির্জন এক মরুভূমি। জীবনের শেষ দিনগুলো এখানেই নিঃসঙ্গভাবে অতিবাহিত করেন আবু যার(রা.)। মানব বসতি থেকে বেশ দূরে সেই মরুপ্রান্তর।

 

তাঁর সহধর্মিনী তাঁর অন্তিমকালীন অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ

 

“আবু যারের অবস্থা যখন খুবই খারাপ হয়ে পড়লো, আমি তখন কাঁদতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, “কাঁদছো কেন?

আমি বললামঃ “এক নির্জন মরুভূমিতে আপনি পরকালের দিকে যাত্রা করছেন। এখানে আমার ও আপনার ব্যবহৃত বস্ত্র ছাড়া অতিরিক্ত এমন বস্ত্র নেই যা দ্বারা আপনার কাফন দেওয়া যেতে পারে!”

 তিনি বললেনঃ “কান্না থামাও। তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। রাসুল(ﷺ)কে আমি বলতে শুনেছি, যে ... … তিনি কতিপয় লোকের সামনে [এটি] বলেছিলেন, তার মধ্যে আমিও ছিলামঃ “তোমাদের মধ্যে একজন মরুভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তাঁর মরণের সময়ে মুসলিমদের একটি দল সেখানে অকস্মাৎ উপস্থিত হবে।” আমি ছাড়া সেই লোকগুলোর সবাই লোকালয়ে ইন্তিকাল করেছে। এখন একমাত্র আমিই বেঁচে আছি। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি - সে ব্যক্তি আমি।

 আমি কসম করে বলছি, আমি মিথ্যা বলছি না এবং যিনি এ কথা বলেছিলেন [রাসুলুল্লাহ(ﷺ)] তিনিও কোন মিথ্যা বলেননি। তুমি রাস্তার দিকে চেয়ে দেখ, গায়েবী সাহায্য অবশ্যই এসে যাচ্ছে!”

 

 আমি [আবু যার(রা.) এর স্ত্রী] বললামঃ “এখন তো হাজীদেরও প্রত্যাবর্তন শেষ হয়ে গেছে, রাস্তায়ও লোক চলাচল বন্ধ।”

 তিনি বললেন, “না!  তুমি যেয়ে দেখো।”

 সুতরাং আমি এক দিকে দৌঁড়ে গিয়ে টিলার ওপর উঠে দূরে তাকিয়ে দেখছিলাম, আবার অপর দিকে ছুটে এসে তাঁর শুশ্রুষা করছিলাম। এরূপ ছুটাছুটি ও অনুসন্ধান চলছিল। এমন সময় দূরে কিছু আরোহী দৃষ্টিগোচর হলো। সেটি ছিল [3] ইরাকের কুফা থেকে আগত একটি কাফেলা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা.)।

 

আমি তাঁদেরকে ইশারা করলে তাঁরা দ্রুতগতিতে আমার নিকট এসে থেমে গেল। আবু যার সম্পর্কে তাঁরা প্রশ্ন করলো, “ইনি কে?”  বললামঃ “আবু যার।”

“রাসুলুল্লাহর(ﷺ) সাহাবী?”

বললামঃ “হ্যাঁ।”

“মা বাবা কুরবান হোক!” – এ কথা বলে তাঁরা আবু যারের কাছে গেল। [4]

 

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আল্লাহর রাসুল(ﷺ) এর সাহাবী আবু যার গিফারী(রা.)। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা.) চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তিনি তখন বলছিলেনঃ “রাসুলুল্লাহ(ﷺ) সত্যই বলেছিলেন, আবু যার! তুমি নিঃসঙ্গ চলবে, নিঃসঙ্গ মারা যাবে এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় তোমার হাশর হবে!” তখন তিনি ও তাঁর সঙ্গীগণ দ্রুত সওয়ারী হতে নেমে গেলেন। এরপর ইবন মাসউদ(রা.) তাঁদের কাছে তাবুকের পথে আবু যার (রা)-এর সেই ঘটনাটি  এবং রাসুলুল্লাহ(ﷺ) তাঁকে যা বলেছিলেন, তা বর্ণনা করলেন। [5]

 

তাবুকের অভিযান হয়েছিল ৯ম হিজরী সালে। [6] আর আবু যার গিফারী(রা.) মৃত্যুবরণ করেন ৩১ বা ৩২ হিজরী সালে। ২০ বছরেরও বেশি সময় পর আবু যার(রা.) এর ইন্তিকাল কীভাবে হবে তা হুবহু বলে দিয়েছিলেন মুহাম্মাদ(ﷺ)। যার সাক্ষী হিসাবে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা.) এবং আরো অনেকে।

মুহাম্মাদ(ﷺ) যদি সত্য নবী না হতেন, তাহলে তিনি কীভাবে এই ভবিষ্যতবানী করতে পারলেন? হাদিস ও সিরাহশাস্ত্র ঘেটে যারা মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তাদের জন্য প্রশ্নটি তোলা থাকলো।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের(রা.) সূত্রে বর্ণিত; ‘আল-ইসাবা’ - ইবন হাজার আসকালানী (র.) 

‘আসহাবে রাসুলের জীবনকথা’ – মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১

[2] তারিখুল ইসলাম, শামসুদ্দিন যাহাবী(র.), সীরাতুন নবী(সা.) – ইবন হিশাম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮২

[3] এই অংশটুকু ইবন হিশামের বর্ণনায় আছে

[4]  ‘আসহাবে রাসুলের জীবনকথা’ – মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৩

[5] সীরাতুন নবী(সা.) – ইবন হিশাম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৩

[6] ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.), [তাওহিদ পাবলিকেশন্স] পৃষ্ঠা ৪৯১