ফাতিমা(রা) এর সাথে আলী(রা) এর বিয়ে দেয়া

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



নাস্তিক প্রশ্নঃ ক্ষমতার লোভে নিজ কন্যাকে(ফাতেমা) চাচাতো ভাইয়ের(হযরত আলী) সাথে বিয়ে দিয়ে (Sahih Bukhari 7:62:157) তিনি [মুহাম্মাদ(ﷺ)] কি কুরআনের আইন (Quran 4:23) অমান্য করেননি? তা ছাড়া এমন একটা ঘৃণিত কাজ কি একজন নবীর পক্ষে করা শোভা পায়?

 

উত্তরঃ কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে—

 

حُرِّمَتۡ عَلَيۡڪُمۡ أُمَّهَـٰتُكُمۡ وَبَنَاتُكُمۡ وَأَخَوَٲتُڪُمۡ وَعَمَّـٰتُكُمۡ وَخَـٰلَـٰتُكُمۡ وَبَنَاتُ ٱلۡأَخِ وَبَنَاتُ ٱلۡأُخۡتِ وَأُمَّهَـٰتُڪُمُ ٱلَّـٰتِىٓ أَرۡضَعۡنَكُمۡ وَأَخَوَٲتُڪُم مِّنَ ٱلرَّضَـٰعَةِ وَأُمَّهَـٰتُ نِسَآٮِٕكُمۡ وَرَبَـٰٓٮِٕبُڪُمُ ٱلَّـٰتِى فِى حُجُورِڪُم مِّن نِّسَآٮِٕكُمُ ٱلَّـٰتِى دَخَلۡتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمۡ تَكُونُواْ دَخَلۡتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡڪُمۡ وَحَلَـٰٓٮِٕلُ أَبۡنَآٮِٕڪُمُ ٱلَّذِينَ مِنۡ أَصۡلَـٰبِڪُمۡ وَأَن تَجۡمَعُواْ بَيۡنَ ٱلۡأُخۡتَيۡنِ إِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ غَفُورً۬ا رَّحِيمً۬ا (٢٣)

অর্থঃ " তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকন্যা; ভগিনীকন্যা তোমাদের সে মাতা, যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকরী, দয়ালু। " [1]


নাস্তিক-মুক্তমনাগণ রাসুল(ﷺ) এর নামে কুরআনের আইন অমান্য করার অভিযোগ এনে কুরআন থেকে একটি আয়াতের রেফারেন্স দেখিয়েছেন যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে— আপন ভাইয়ের কন্যার( بَنَاتُ الْأَخِ) সঙ্গে বিবাহ হারাম করা হয়েছে। মোটেও চাচাতো ভাইয়ের কন্যার( بنات ابن عم) সঙ্গে বিবাহ হারাম করা হয়নি। ফাতিমা(রা) ছিলেন আলী(রা) এর চাচাতো ভাই নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর কন্যা। ভাইয়ের কন্যা( بَنَاتُ الْأَخِ) এবং চাচাতো ভাইয়ের কন্যা( بنات ابن عم) মোটেও এক নয়। অভিযোগকারীগণ নিজে থেকেই “কুরআনের আইন”(!) তৈরি করে রাসুল(ﷺ) এর নামে অপবাদ দিয়েছেন। 

অভিযোগকারীগণের আরেকটি দাবি হচ্ছে রাসুল(ﷺ) নাকি ক্ষমতার লোভে(!) ফাতিমা(রা) এর সাথে আলী(রা) এর বিয়ে দিয়েছেন। 
ক্ষমতা?! অভিযোগকারীরা ধরেই নিয়েছেন যে ইসলামী খিলাফত হচ্ছে রাজতন্ত্র জাতীয় কিছু যাতে থাকে অবাধ ক্ষমতা এবং রাসুল(ﷺ) এর একমাত্র উত্তরাধিকার হচ্ছেন আলী(রা)। শিয়া ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রচারণার জন্য এই বিকৃত ধারণাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। রাসুল(ﷺ) তো সরাসরিভাবে তাঁর উত্তরাধিকার বা খলিফাই নির্ধারণ করে যাননি। আর যা নির্দেশনা ছিল তাও আলী(রা) এর ব্যাপারে নয়।তাঁর বিভিন্ন নির্দেশনা ছিল আবু বকর(রা) এর নেতৃত্বের ব্যাপারে। [2] কাজেই ক্ষমতার লোভের যে কথাটি অভিযোগকারীগণ তুলেছেন তা নিতান্তই ভিত্তিহীন ও অজ্ঞতাপ্রসূত। আলী(রা) এর ঘর ছিল চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত যা সকল ঐতিহাসিকই উল্লেখ করেছেন। সে ঘরে ছিল খেজুর গাছের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিশ, বিছানা, এক জোড়া যাতা, দু’টো মশক। চরম দারিদ্র্যের কারণে ঘর-গৃহস্থালীর কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য ফাতিমা(রা)কে কোন চাকরের ব্যবস্থা করতে পারেননি আলী(রা)। ফাতিমা(রা) একাই সকল কাজ সম্পাদন করার চেষ্টা করতেন। যাতা ঘুরাতে ঘুরাতে তাঁর হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল, মশক ভর্তি পানি টানতে টানতে বুকে দাগ পড়ে গিয়েছিল, ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে কাপড় চোপড় ময়লা হয়ে যেত। [3] আলী(রা) তাঁর কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। তাঁদের বিছানা ছিল শক্ত। তাঁদের ব্যবহারের কম্বল ছিল এত ছোট যে মাথার দিকে টানলে পায়ের দিক বেরিয়ে যেত আবার পায়ের দিকে টানলে মাথা ঢাকতো না। [4] এই ছিল আলী(রা) এর সংসার, যাঁর সাথে নবী(ﷺ) এর কন্যাকে বিয়ে পেছনে ‘ক্ষমতার লোভ’(!) দেখতে পেয়েছেন মহাজ্ঞানী(!) নাস্তিক-মুক্তমনাগণ।


আর চাচাতো ভাইয়ের কন্যার সঙ্গে বিয়ের মাঝে ঘৃণিত কী আছে তা আমার নিকট ঠিক পরিষ্কার নয়। যারা ব্যাভিচার(adultery), সমকাম(homosexuality), উভকাম(bisexuality), অযাচার(incest) এই সমস্ত জিনিসকে স্বাভাবিক এমনকি অধিকার বলে দাবি করে, তারা যে কিভাবে চাচাতো ভাইয়ের কন্যাকে বিয়ে করাকে ঘৃণ্য বলেন তা সত্যিই গবেষণার বিষয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, নিসা ৪:২৩

[2]  “Did the Prophet appoint ‘Ali as khaleefah?” –Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid(Islamqa)

https://islamqa.info/en/12103

[3]  তাবাকাত ৮/১৫৯, আল ইসাবা ৪/৪৫০

[4]  ‘আসহাবে রাসুলের জীবনকথা’, ষষ্ঠ খণ্ড (মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ) পৃষ্ঠা ৪৭-৫১