বর্তমান সময়ে কেন আল্লাহ্‌ অলৌকিক কিছু করেন না যাতে সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে?

নাস্তিক্যবাদের অসারতা বিবিধ



মহান আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগেই তাঁর অলৌকিকতা বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন যাতে মানুষ তাঁর দেখানো পথে ফিরে আসে। কিন্তু প্রতিটা সময়েই মানুষ তাঁর সবচেয়ে মোক্ষম যুক্তি(?) দিয়ে সে অলৌকিকতাকে ভুয়া প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। ১৪০০ বছর আগে রাসূল(সা:) যখন মক্কার লোকদের সামনে কুরআন তিলওয়াত করতেন তখন সবাই তাঁর অলৌকিকতার সামনে অসহায়বোধ করত। কিন্তু তারপরেও তাদের অনেকেই কুরআনকে অলৌকিক হিসেবে বিশ্বাস করেনি, তাদের কাছে একটাই (অপ) ব্যাখ্যা ছিল- “এটা যাদু ছাড়া আর কিছুই না।” একই ঘটনা অন্যান্য নবীদের বেলাতেও ঘটেছে।

 

আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করি তাই সবকিছু বিজ্ঞান দিয়েই ব্যাখ্যা করতে ভালবাসি। ধরুন আপনি কক্সবাজার বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে গেলেন এবং হঠাৎ আপনাদের মাথায় এই চিন্তা আসল যে, যদি এই অসম্ভব সুন্দর জায়গায় আল্লাহ তায়ালা তাঁর কোনো নিদর্শন দেখান তবে আপনারা সবাই বাকি জীবন তাঁর কথামত চলবেন। আর হঠাৎই দেখতে পেলেন সমুদ্রের পানি দু’ভাগ হওয়া শুরু করেছে। সন্দেহ নেই ঘটনার আকস্মিকতা আপনাদের অভিভূত করবে মক্কার সেই লোকগুলোর মতই।

 

কিন্তু তারপরেই সবাই ব্যখ্যা দাঁড় করানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবেন। মক্কার লোকগুলো উত্তর হিসেবে নিয়ে এসেছিল জাদু আর আপনারা নিয়ে আসবেন বিজ্ঞানকে। সব যুক্তি ব্যর্থ হলে ‘প্রকৃতির হেয়ালীপনা’ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার নজির কিন্তু খুব একটা বিরল নয়। আশেপাশে শত অলৌকিকতা দেখেও যে তার হ্রদয়টাকে অন্ধ রাখতে পারে, তার পক্ষে জলজ্যান্ত অলৌকিকতা দেখে তাতে ঈমান আনা বেশ কঠিনই। আল্লাহ তায়ালা এই কারণেই বলেন,
 
“যারা বিশ্বাস করে তারা জানে যে এটাই তাদের রবের পক্ষ থেকে একমাত্র সত্য। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে, তার বলে, ‘আল্লাহ আসলে এসব উদাহরণ দিয়ে কি বুঝাতে চান?’ এভাবেই আল্লাহ তায়ালা অনেককে পথ দেখান আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেন। তিনি কেবল অবাধ্য ব্যক্তিদেরই পথভ্রষ্ট করেন।”[১]
 
অলৌকিকতার সাথে সাথেই যে দুইটা প্রশ্ন প্যারালালি চলে আসে তা হল আল্লাহকে দেখতে পেলে কিংবা তাঁর সাথে কথা বলতে পারলেই তো আমরা সবাই তাঁর উপর ঈমান আনতাম। সে ক্ষেত্রে একই কথা আসে। হঠাৎ কোন গায়েবী আওয়াজ কিংবা আলোর ঝলকানি দেখলেই যে অবিশ্বাসী মন সেটা স্রষ্টাপ্রদত্ত বলে বিশ্বাস করবে এমন কোন কথা নেই। বরং অনেকেই তাকে মানসিক বিকারগ্রস্থ ভাবা শুরু করবে আর সে নিজেও হয়তো কোন সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হবার প্রয়োজনবোধ করবে।
 
তাছাড়া ধরুন, একদিন সোমালিয়াতে আকাশ থেকে খাবার পড়তে শুরু করলো। এরপর ফলাফলটা কি হতে পারে ভাবুন তো! বিশ্বের সব মিডিয়া ঐখানে জড়ো হবে, টুরিস্টরা দেখতে আসবে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলো আসবে গবেষণা করতে। অতঃপর, ঐ এলাকাকে তারা restricted area ঘোষণা করে দিবে। যাদের মূলত উপকার পাওয়ার কথা, তারাই বঞ্চিত হবে। সবশেষে তাদের গবেষণায় উঠে আসবে, এলিয়েনদের খাবার পাঠানো থেকে শুরু করে আরও বিভিন্ন ধরণের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব!
 
দ্বিতীয়ত, আপনি এমন কোন VIP হয়ে যান নি যে আপনাকে বিশ্বাস করানোর জন্য আল্লাহর আপনার সাথে কথা বলতে হবে। আপনি ফেরারি গাড়ির শোরুমে গিয়ে যদি বলেন, আমি এই গাড়ি কিনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না ফেরারি কোম্পানির CEO আমার সাথে দেখা না করে বা আমার সাথে ফোনে কথা না বলে- তাহলে কি সে আপনার সাথে দেখা করবে? বা আপনার সাথে কথা বলবে? নিশ্চয়ই না। সে-ই আপনার সাথে বলবে না, আর সবকিছুর স্রষ্টা, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাঁর অস্তিত্ব বিশ্বাস করানোর জন্য আপনার সাথে কথা বলবে? How funny! কোম্পানির আপনার মত দু-একজন মাথা মোটা কাস্টমার না হলেও চলবে। কারণ ভাল জিনিসের কাস্টমারের অভাব হবে না। বরং মাঝখানে আপনি একটা ভাল গাড়ির মালিক হওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন!
 
আপনি যদি ভেবে থাকেন যে এই ধরনের কথা নব্য নাস্তিকদের আবিষ্কার, তাহলে ভুল করছেন। রাসূল (সা) কেও কাফিররা এরকম প্রশ্ন করতো। পূর্বের নবী-রাসুলদেরও একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। কুরআনে আল্লাহ্‌ এর উত্তর দিয়েছেন-
 
“যারা বোঝে না, তারা বলে, ‘কেন আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলে না?’ বা ‘আমাদের কাছে কোনো অলৌকিক নিদর্শন আসে না কেন?’ ওদের আগের প্রজন্মও একই কথা বলে গেছে। ওদের সবার অন্তর আসলে একই রকম। আমি অবশ্যই আমার নিদর্শনগুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করে দিয়েছি সেই সব মানুষের কাছে, যারা নিশ্চিত হতে চায়।”[২]
 
এই মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী বিশাল সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মত। সেখানে আমরা তো ব্যাকটেরিয়াসমও না। কোন ধরনের Guideline ছাড়া আমাদের শাস্তি দেয়াটা নিতান্তই অযৌক্তিক বলে আল্লাহ্‌ তায়ালা দয়াপরবশ হয়ে আমাদের জন্য একটা জীবনবিধান দিয়ে দিয়েছেন। আর আমরা এখানে তার নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে উল্টো প্রশ্ন করি কেন তিনি তার অস্তিত্ব বোঝাতে আমাদের মত VIP (!)-দের সাথে কথা বলেন না!
 
“কোন মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ্‌ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওয়াহয়ির মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত (ফেরেশতা) পাঠানো ছাড়া?” [৩]
 
যুক্তি দিয়ে বিচার করলেও ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর। একটা ব্যাক্টেরিয়া যদি চায় সে আমাদের সাথে দেখা করবে কিংবা কথা বলবে তাহলে সেটা যতটা হাস্যকর শোনায়, স্রষ্টা আমাদের সবার সাথে দেখা করবেন কিংবা কথা বলবেন এটা তার চেয়েও বেশি হাস্যকর এবং অযৌক্তিক।
 
ফিজিসিস্ট পল ডেভিয়েস বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
 
“মনে করুন 3D জগত থেকে একজন মেশিন-গানার 2D স্ক্রিনে গুলি করতে করতে ডান পাশ থেকে বাম পাশে যাচ্ছে যাতে করে প্রতিটি গুলির দ্বারা তৈরী গর্তগুলোর দূরত্ব সমান হয়। এখন 2D জগতে বসবাসকারী বিজ্ঞানী জ্যামিতির দ্বারা লিমিটেড হওয়ায় মেশিন-গানার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে কিন্তু সে গর্তগুলোকে দেখতে পাবে।
 
কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর সে বুঝতে পারবে যে গর্তগুলো রেন্ডমলি সৃষ্টি হচ্ছে না বরং একটা নিয়ম (সমান দূরত্ব) মেনে সৃষ্টি হচ্ছে এবং তাতে Regularity-ও বিদ্যমান থাকছে। অতঃপর এই বিষয়টাকে সে “The Law Of Hole Creation” হিসেবে ব্যাখ্যা করবে।
 
অথচ প্রতিটি গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে মেশিন-গানারের কারণে। সেই চাইলে যে কোন সময়ই গর্তগুলোর দূরত্ব পরিবর্তন করতে পারে আর সেটার কনভার্শন না হলে 2D এর সাইন্টিস্টের কাছে সেটা মিরাকল বলে আর্বিভূত হবে। কনভার্শন হলে সে তার Law দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলেও বুঝতে পারবে না যে এটা অটোমেটিক নয়।”[৪]
 
কোন কিছুর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একেক যুগে একেকটা জিনিস মানদণ্ড ছিল। বিজ্ঞান নিজেই একটা মিরাকল। বিজ্ঞান কোনো কিছু invention করে না, discovery করে। যেমন- বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়মগুলো আবিস্কার করেছে, কিন্তু শুন্য থেকে প্রকৃতিতে একটা নিয়মের প্রচলন ঘটাতে পারে নি। বিজ্ঞান ইচ্ছা করলেই g=9.8 m/s^2 থেকে পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই এই Law-গুলাও মিরাকল আর ২ টা ম্যাগনেটের মাঝখানে একটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে এটাই একটা মিরাকল। কিন্তু যারা চিন্তা করে তাদের জন্য।
 
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মহান আল্লাহ তায়ালার অলঙ্ঘনীয় একটা সুন্নাত আছে। সেটা হচ্ছে অলৌকিকতা দেখানোর পরেও যদি কোন জাতি কুফরীতে অটল থাকে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের সমূলে ধ্বংস করে দেন। ঈসা(আঃ) এর সাহাবীরা যখন তার নিকট আসমান থেকে খাবার নিয়ে আসার কথা বলে তখন আল্লাহতায়ালা তাদের এই বলে সাবধান করেন,
 
“নিশ্চয় আমি সে (খাবারের) ঝুড়ি তোমাদের প্রতি অবতরণ করব। অতঃপর যে ব্যাক্তি এর পরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকে দেব না।”[৫]
 
 
তথ্যসূত্র:
[১] সূরা বাকারা ২:২৬
[২] সূরা বাকারা ২:১১৮
[৩] আশ্‌-শূরা ৪২:৫১
[৪] Paul Davies –এর বই God and The New Physics
[৫] সূরা মায়েদা ৫:১১৫