ভালোবাসার নামে ধর্মকে বিকৃত করেছিলো যে

খ্রিষ্টান মিশনারীদের জবাব/বাইবেল ও খ্রিষ্টবাদ সংক্রান্ত



“ভালোবাসা সব সময় ধৈর্য ধরে। দয়া করে। হিংসা করে না। গর্ব করে না। ভালোবাসা অহংকার করে না। খারাপ ব্যবহার করে না। ভালোবাসা নিজের সুবিধার কথা ভাবে না, সহজে রাগ করে না। কারও খারাপ ব্যবহারের কথা মনেও রাখে না। খারাপ কিছু নিয়ে আনন্দ করে না। বরং যা সত্য তাতে আনন্দ করে। ভালোবাসা সব কিছুই সহ্য করে, সকলকেই বিশ্বাস করে। সব কিছুতে আশা রাখে আর সর্বাবস্থায় স্থির থাকে।”

 

অনেকের মতে, পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ ভালোবাসাকে যতভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে তার মধ্যে এই সংজ্ঞাটি সর্বশ্রেষ্ঠ। [১] এত সুন্দর সংজ্ঞা যিনি দিয়েছেন, তাঁর প্রতি স্বভাবতই শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠার কথা। তাঁর নাম সেইন্ট পল। যার ভাষ্যমতে, ফেরেশতাদের মতো করে কথা বললেও সে স্বরে যদি ভালোবাসা না থাকে, তবে তা ঘণ্টার ঝনঝনানি ছাড়া কিছুই না।[২] কিন্তু ধর্মের প্রশ্নে ভালোবাসা আবশ্যকীয় হলেও, শুধুমাত্র এতেই পড়ে থাকলে চলবে না। আমরা যা বিশ্বাস করি, তাতে অবশ্যই ন্যূনতম যুক্তি থাকতে হবে। কেউ যদি বলে, ‘ঈশ্বর মানুষকে ভালোবেসে এই পৃথিবীতে গাছ সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য অক্সিজেন পাই, তাই গাছের পূজা করতে হবে।’ তখন আমাদের মন স্বাভাবিকভাবেই বলবে, ঈশ্বর প্রেমময় কথাটা ঠিক, গাছের স্রষ্টা তাও ঠিক, কিন্তু এর সাথে তো গাছ পূজার কোনো সম্পর্ক নেই। গাছের স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরের উপাসনা করা যেতে পারে।

 

দুঃখজনকভাবে বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি [৩] মানুষ এই সামান্য কমনসেন্সের প্রয়োগ করতে নারাজ। তাদেরকে ‘খ্রিষ্টান’ বলা হয়। তারা ভালোবাসার কথা বলে। ভালোবাসার কারণে তাদের আইন মানতে হয় না, নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। শুধু ভালোবেসে কিছু ব্যাপার বিশ্বাস করলেই চলবে। প্রশ্ন আসতে পারে, এমন অদ্ভুত ভালোবাসার শিক্ষা তাদের কে দিয়েছে। আবারো ফিরতে হয় সেইন্ট পলের কাছে। তিনি আসলে কে?

 

বাইবেল অনুসারে, যিশুর তথাকথিত ক্রুসিফিকশনের ৪০ দিন পর তিনি স্বর্গে চলে যান। চলে যাবার আগে পৃথিবীবাসীর কাছে তাঁর বাণীগুলো পৌঁছে দিতে সাহাবীদের নির্দেশ দেন। [৪] তিনি তাঁদের নতুন কিছু প্রচার করার নির্দেশ দেননি। বরং তা-ই প্রচার করতে বলেছেন, যা পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় তিনি প্রচার করেছেন। এখন কোনো সাহাবী যদি এমন কিছু প্রচার করেন যা যিশু প্রচার করতে বলে যাননি, তবে সেটা অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে সাহাবী না হয়েও কেউ যদি এমন কিছু প্রচার করে যা যিশুর শিক্ষার একদম বিপরীত, তাহলে সেটা কতটুকু বাতিল হওয়া উচিত?

পলের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। তিনি যিশুর মনোনীত বারোজন সাহাবীর মধ্যে ছিলেন না। [৫] যিশুর জীবদ্দশায় তিনি যিশুর সাথে দেখা করেছেন, এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় না। বাইবেল অনুসারে, যিশু স্বর্গে চলে যাবার পর শিষ্যরা তাঁর বাণী প্রচার করতে থাকে। সাহাবীদের নেতা পিটার এই মিশনের শুরুটা করেন এভাবে-

বনি-ইসরাঈলরা, এই কথা শুনুন। নাসরতের যিশুর মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ আপনাদের মধ্যে মহৎ কাজ, চিহ্ন ও কুদরতি কাজ করে আপনাদের কাছে প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি যিশুকে পাঠিয়েছিলেন; আর এই কথা তো আপনারা জানেন।”  [৬]

সাহাবীদের নেতা হিসেবে পিটার মূলত যিশুর শিক্ষাই প্রচার করছিলেন। কারণ, যিশু তাঁর জীবদ্দশাতে আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করার সময় বলেছিলেন, “(হে আল্লাহ্‌!) তারা তোমাকে জানে যে, তুমিই একমাত্র সত্য ঈশ্বর এবং তুমি যাকে পাঠিয়েছো, সেই যিশু খ্রিষ্টকে জানে।” [৭]

 

পল শুরুতে যিশু খ্রিষ্টের শিক্ষা এবং তাঁর সাহাবীদের ঘোর বিরোধী ছিলো। যারা যিশুকে বিশ্বাস করতো, তাদের সে জেলে নিক্ষেপ করতো এবং হত্যা করতে চেষ্টা করতো। তখন তার উদ্দেশ্য ছিলো যিশুর শিক্ষাকে বিলুপ্ত করা। সে মিশন পূরণ করতে সে একবার দামেস্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময়ে যিশু এসে তাকে মনোনীত করেন। তার ছাত্র লূক সে ঘটনার কথা লিখেছে এভাবে

 

“তিনি (পল) মাটিতে পড়ে গেলেন এবং শুনলেন কে যেন তাঁকে বলছেন, “শৌল (পলের আসল নাম), শৌল! কেন তুমি আমার উপর জুলুম করছো?” শৌল জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রভু, আপনি কে?” তিনি বললেন, “আমি যিশু, যাঁর উপর তুমি জুলুম করছো। এখন তুমি উঠে শহরে যাও। কী করতে হবে তা তোমাকে বলা হবে।” যে লোকেরা শৌলের সঙ্গে যাচ্ছিলো, তারা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারা কথা শুনেছিলো, কিন্তু কাউকে দেখতে পায়নি।” [৮]

 

একই ঘটনা বাইবেলের অন্যত্র বর্ণিত আছে। কিন্তু সেখানে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী কথা রয়েছে। যেমন:

 

১) প্রেরিত (Book of Acts / শিষ্যচরিত) ৯:৭ এ বলা হচ্ছে যে, পলের সঙ্গীরা যিশুর কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলো। প্রেরিত ২২:৯ এ পল বলছে যে, তার সঙ্গীরা যিশুর কণ্ঠ শোনেনি।

২) প্রেরিত ৯:৭ এ বলা হচ্ছে যে, পলের সঙ্গীরা দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু প্রেরিত ২৬:১৪ তে পল বলছে যে, সে তার সঙ্গীসহ সব দেখে আবেগের আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলো।

৩) প্রেরিত (Acts / শিষ্যচরিত) ২২:১০ এ পল বলছে যে, যিশু তাকে বলেছিলেন সে দামেস্কে যাবার পরে তিনি তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। আবার প্রেরিত ২৬:১৪-১৮ তে পল বলছে যে, যিশু তাকে দামেস্কে পৌঁছার পূর্বেই, ঐ রাস্তাতেই যাবতীয় নির্দেশনা দিয়ে দেন!!

 

এমন পরস্পরবিরোধী কথাই প্রমাণ করে যে, পলের সাথে আসলে যিশুর দেখাই হয়নি। এটা সম্পূর্ণ বানানো গল্প, যা সে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ফেঁদেছিলো। স্বাভাবিকভাবেই পলের এই কাহিনী সাহাবীরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু বার্নাবাস পলের পক্ষে সত্যায়ন করার কারণে সবাই তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। পল নিজেকে রূপান্তরিত মানুষ হিসেবে সবার সামনে উপস্থান করা শুরু করে। নিজের পূর্বের নাম ‘শৌল’ (Saul) পরিবর্তন করে রাখে নতুন নাম - পল (Paul / পৌল)

 

যিশুর সাথে তথাকথিত সাক্ষাতের পর সাহাবীদের সাথে দেখা না করে পল আরবে চলে যায়।[১০] তার সামনে তখন সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো, নিজের নবলব্ধ জ্ঞানের আলোকে শারি’আতের নতুন ব্যাখ্যা দান করা। [১১]

 

প্রশ্ন আসতে পারে, পল কেন যিশুর উপর ঈমান আনার পর তিন বছর আলাদা কাটিয়েছিলো। সে কেন সরাসরি সাহাবীদের কাছে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করলো না? মুফতি তাকী উসমানি তাঁর খ্রিষ্টধর্মের স্বরূপ গ্রন্থে এর সহজ উত্তর দিয়েছেন- “সে আসলে হাওয়ারীগণ (যিশুর সাহাবীদের উপাধি) যে খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করছিলেন, সেই ধর্ম গ্রহণে প্রস্তুত ছিলো না। মূলত সে শারি’আত ও খ্রিষ্টধর্মের নতুন এক ব্যাখ্যা দিতে চাচ্ছিলো।” [১২]

 

পল এরপর শারি’আতের এমন অদ্ভুত ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করে, যা যিশু দূরে থাকুন, তাঁর সাহাবীরাও দেননি। উল্টো সে শিক্ষা ছিলো যিশুর শিক্ষার একদম বিপরীত। কয়েকটার উদাহরণ দেই:

 

১) সাহাবীদের নেতা পিটার: “ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আল্লাহ্, অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষদের আল্লাহ্ এই কাজের দ্বারা নিজের গোলাম যিশুর মহিমা প্রকাশ করেছেন।” [১৩] (অর্থাৎ, যিশু হলেন আল্লাহর গোলাম)

পল: এই পুত্রই (যিশু) হলেন অদৃশ্য আল্লাহ্‌র হুবহু প্রকাশ। সমস্ত সৃষ্টির আগে তিনিই ছিলেন এবং সমস্ত সৃষ্টির উপরে তিনিই প্রধান। কারণ, আসমান ও জমিনে যা দেখা যায় আর যা দেখা যায় না, সব কিছু তাঁর দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। আসমানে যাদের হাতে রাজত্ব, কর্তৃত্ব, শাসন ও ক্ষমতা রয়েছে, তাদের সবাইকে তাঁকে দিয়ে তাঁরই জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।” [১৪] (অর্থাৎ যিশুই ঈশ্বর)

২) যিশু: এই কথা মনে কোরো না, আমি তৌরাত কিতাব আর নবীদের কিতাব বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসিনি, বরং পূর্ণ করতে এসেছি। আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, আসমান ও জমিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত যতদিন না তৌরাত কিতাবের সমস্ত কথা সফল হয়, ততদিন সেই তৌরাতের এক বিন্দু কি এক মাত্রা মুছে যাবে না।” [১৫] (অবশ্যই তৌরাত মানতে হবে)

পল: “তিনি (যিশু) তাঁর ক্রুশের উপরে হত্যা করা শরীরের মধ্য দিয়ে সমস্ত হুকুম ও নিয়ম সুদ্ধ মূসার শারি’আতের শক্তিকে বাতিল করেছেন।” [১৬] (তৌরাত মানার প্রয়োজন নেই)

৩) অব্রাহাম [ইব্রাহিম (আ)] : এবং ঈশ্বর অব্রাহামকে বললেন, “এখন তোমার দিক থেকে এই চুক্তি হবে এই রকম। তুমি এবং তোমার উত্তরপুরুষগণ আমার চুক্তি মান্য করবে। এটাই চুক্তি যা তুমি মেনে চলবে। তোমার ও আমার মধ্যে এটাই হল চুক্তি। তোমার উত্তরপুরুষগণের জন্যেও এটাই চুক্তি। যত পুত্র সন্তান হবে প্রত্যেককে খৎনা করতে হবে।
 তোমার আর আমার মধ্যে চুক্তি য়ে তুমি মেনে চলবে, এই খৎনা হবে তার প্রমাণস্বরূপ।
 শিশু পুত্রের বয়স আট দিন হলে এই খৎনা সম্পন্ন করবে। তোমার পরিবারে যত ছেলের এবং তোমার দাসদের মধ্যে যত ছেলের জন্ম হবে, তোমার বংশধর নয় এমন বিদেশীদের কাছ থেকে তোমার অর্থ দিয়ে তুমি য়ে দাসদের কিনেছিলে তাদের য়ে ছেলেরা জন্মাবে, সকলের অবশ্যই খৎনা করা হবে।
সুতরাং তোমার জাতির প্রত্যেক শিশু পুত্রকে খৎনা করা হবে। তোমার পরিবারের অথবা ক্রীতদাসের সব পুত্রদের এভাবে খৎনা করা হবে।
 অব্রাহাম, তোমার ও আমার মধ্যে এটাই চুক্তি; খৎনা করা হয়নি এমন কোন পুরুষ থাকলে সে হবে তার নিজের লোকেদের স্বজাতির থেকে বিচ্ছিন্ন। কারণ সে ব্যক্তি আমার চুক্তি ভঙ্গকারী।” [১৭]

যিশু: জন্মের আট দিনের দিন ইহুদীদের নিয়ম মতো যখন শিশুটির খৎনা করাবার সময় হলো, তখন তাঁর নাম রাখা হলো যিশু। [১৮]

পল: “আমি পল তোমাদের বলছি শোনো, যদি তোমাদের খৎনা করানোই হয় তবে তোমাদের কাছে মসীহের কোনো মূল্য নেই।” [১৯]

 

এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। মুহাম্মদ ﷺ বলে গিয়েছেন যে, তিনি একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নন। আল্লাহ্‌ একজনই। এখন যদি তাঁর মৃত্যুর পর কেউ দাবি করে, সে রাসূলকে ﷺ দেখেছে আর রাসূল ﷺ তাকে বলেছেন যে, আসলে মুহাম্মদ ﷺ-ই আল্লাহ্‌ এবং আল্লাহ্‌ একজন হলেও তিনি হচ্ছেন তিনের বহিঃপ্রকাশ, চিন্তা করা যায় সাহাবীগণ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) এবং অন্যান্য মুসলিমদের কাছে ওই লোকের অবস্থা কী হবে? পলের অবস্থা ছিলো ঠিক তা-ই।

 

শুরুতে পল যিশুর সাহাবীদের আস্থা অর্জন করলেও পরবর্তীতে তাঁরা পলের ভণ্ডামি ধরতে পারেন। যার কারণে তাঁদের সাথে পলের মতবিরোধ হয়। সাহাবীরা পলের বিরুদ্ধে যেসব লেখা লিখেছেন, দুঃখজনকভাবে তার অধিকাংশই আর পাওয়া যায় না। আর যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোকে খ্রিষ্টানরা অবিশুদ্ধ বলে বাতিল ঘোষণা করে। যেমন, বার্নাবাস তাঁর গস্পেলে লিখেন

“যারা মাসীহকে আল্লাহ্‌র পুত্র বলছে, খতনা অস্বীকার করছে- যা আল্লাহ্‌র একটি অস্থায়ী বিধান, আর অপবিত্র মাংসাহারকে জায়েজ বলছে, আমি অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সাথে উল্লেখ করছি যে, তাদেরই কাতারে পলও গোমরাহ হয়ে গিয়েছে।”[২০]

খ্রিষ্টানরা বার্নাবাসের গস্পেলকে যদিও অবিশুদ্ধ বলে, কিন্তু বিশুদ্ধতার বিচারে এ গস্পেলটি বাইবেলের কোনো গ্রন্থের চেয়েই পিছিয়ে নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে। অবশ্য বাইবেলের সকল গ্রন্থগুলো যদি আমাদের হাদীসগ্রন্থের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণ করা হতো, তাহলে হয়তো সব গ্রন্থের সাথে হয় ‘অত্যন্ত দুর্বল’ নয়তো ‘জাল’ উপাধি লেগে থাকতো। পঞ্চম শতকে পোপ গেলাসিয়াস ‘Gelasius Decree of 496’ জারি করেন। সেখানে গস্পেল অফ বার্নাবাসের পাঠকে নিষিদ্ধ করা হয়।[২১] কারণ, এই গস্পেলে মুহাম্মদ ﷺ এর কথা ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।[২২] এছাড়া অস্বীকার করা হয়েছে যিশুর ঈশ্বরত্ব, ক্রুসিফিকশন। সেখানে বলা হয়, যিশুর পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতক জুডাসকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।

যিশুর অন্যান্য সাহাবীরা পলের এইসব কুফরী মতবাদের নিন্দা করেন। বাইবেলে বর্ণিত যিশুর ভাই জেমস লিখেন-

“যে লোক সমস্ত শারি’আত পালন করেও মাত্র একটা বিষয়ে গুনাহ্ করে, সে সমস্ত শারি’আত অমান্য করেছে বলতে হবে। যিনি বলেছেন, “জেনা করো না,” তিনিই আবার বলেছেন, “খুন করো না।” তাহলে যদি তোমরা জেনা না করে খুন করো, তবে কি তোমরা আইন অমান্যকারী হলে না?”[২৩] (অর্থাৎ, শারি’আতের একটি আইনকেও অমান্য করা যাবে না।)

পল কম যায় কীসে? সে উল্টো বার্নাবাস আর পিটারকে মুনাফিকির দোষে দুষ্ট বলে।[২৪] তার কথার জাদু দিয়ে খুব সহজেই বহু মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতো। দ্রুত পলের অনুসারী বাড়তে থাকে।

 

যিশু নিজেই প্রচার করেছিলেন, ঈশ্বর তাঁর চেয়েও মহান।[২৫] যার অর্থ তিনি ঈশ্বর নন। বাইবেলের অসংখ্য জায়গায় যিশুর মানবিক সত্তার প্রকাশ পায়। অন্যদিকে পল প্রচার শুরু করে, যিশু নিজেই ঈশ্বর ছিলেন। এ কারণে ঈশ্বরত্বের প্রশ্নেই খ্রিষ্টানরা অসংখ্য ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যেমন:

  • ইবোনাইটসরা বিশ্বাস করতো যিশু ঈশ্বর ছিলেন না।
  • ইবোনাইটদের আরেক দল বলতো- যিশু খোদা ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি ব্যক্তি খোদা নন বরং খোদার গুণের প্রকাশ।
  • প্যাট্রি প্যাশিয়ানরা বিশ্বাস করতো, ঈশ্বর মানবরূপে যিশু হয়ে পৃথিবীতে এসেছেন।[২৬]
  • পৌলিশিয়ানরা বলতো, যিশু আসলে ফেরেশতা ছিলেন।[২৭]

 

যিশুর মানব সত্তা আর ঐশ্বরিক সত্তার মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য আনা যায়, তা নিয়ে পরবর্তীতে থিওলজিয়ানরা বিপদে পড়েন। এমনকি সেইন্ট অগাস্টিনের মতো জ্ঞানী লোক এ ধাঁধা সমাধান করতে হাস্যকর যুক্তি দেন। বলেন-

“খোদা হিসেবে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আবার মানুষ ছিলেন বিধায় তিনি নিজেই সৃষ্ট ছিলেন।” [২৮]

 

আনুমানিক ৬৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পল মারা যায়। রেখে যায় তার ভ্রান্ত মতবাদ। যে পরিমাণ মানুষ পলের দ্বারা ধর্মীয়ভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে আর এখনো হচ্ছে, তা আর কারো দ্বারা হয়নি। পলের দাবী অনুসারে, সে ছিল ফরাশীদের নেতা, একজন জ্ঞানী ইহুদী। কিন্তু যেভাবে সে বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে ভুলভাবে উদ্ধৃতি দিয়ে যিশুর ঈশ্বরত্ব আর ক্রুসিফিকশনকে প্রমাণ করতে চেয়েছে, তা তার এই দাবীকে যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 

পল ও তার অনুসারীদের অনেক চেষ্টার পরেও বহু খ্রিষ্টান বিশ্বাস করতো যে, যিশু একজন মানুষই ছিলেন, ঈশ্বর নন। এ মতবাদের অন্যতম নেতা ছিলেন এরিয়াস। ফলে, খ্রিষ্টানদের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি হয়। এতে রোম সাম্রাজ্যে শান্তি বিঘ্নিত হলে সম্রাট কনস্টেনটাইন বিশপদের নিয়ে নাইসিয়াতে (বর্তমান তুরস্কের ইজনিকে) একটা সভা ডাকেন। ইতিহাসে এটি ‘Council of Nicaea’ নামে পরিচিত। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিভক্ত খ্রিষ্টানদের এক করা। সভায় এরিয়াসের মত বাতিল হয়ে যায় এবং তাঁর সব বই-পত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘোষণা করা হয় ‘Nicene Creed’। যেখানে বলা হয়-

“আমরা বিশ্বাস করি একজন ঈশ্বরে, সর্বশক্তিমান পিতা- দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব কিছুর স্রষ্টা এবং একমাত্র প্রভু যিশু খ্রিষ্ট- ঈশ্বরের পুত্র, তাঁর একমাত্র ঔরসজাত সন্তান। তাঁর পিতার উপাদান। ঈশ্বরের ঈশ্বর। আলোর আলো।” [২৯]

 

কাউন্সিল অফ নাইসিয়া সকল খ্রিষ্টানদের একটি ধর্মমতে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। যারা বিরোধিতা করে, তাদেরকে হত্যা করা হয়। অনেক বিশপ প্রাণের ভয়ে এটা মেনে নেন এবং পরবর্তীতে প্রচণ্ড অনুশোচনায় ভুগেন। যেমন ইউসেবিয়াস লিখেন:

“(ঈশ্বর!) আমরা খুবই অধার্মিক কাজ করেছি। তোমাকে ভয় না করে এই ব্লাসফেমিকে মেনে নিয়েছি।” [৩০]

 

এভাবে পলের মৃত্যুর বহু বছর পর তার কুফরী আকিদাকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। খ্রিষ্টানদের সাথে আমাদের আকিদার মৌলিক পার্থক্য তিন জায়গায়-

  • ঈশ্বরের অবতারত্বে: আমরা বিশ্বাস করি না ঈশ্বর মানুষরূপে এ পৃথিবীতে এসেছিলেন।
  • যিশুর ক্রুসিফিকশনে: যিশু বা ঈসা (আলাইহিসসালাম) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, এটাও আমরা বিশ্বাস করি না।
  • পাপ মোচনে: খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে যিশু পৃথিবীর সবার পাপের ভার বহন করেছেন। এ ধরনের হাস্যকর থিওরিতেও আমরা বিশ্বাস করি না।

 

মজার ব্যাপার হলো, এই তিন জায়গায় তারা নিজেরাই একমত হতে পারেনি। শুরু থেকেই নতুন নতুন দল বের হয়েছে, যারা নতুনভাবে এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

মানুষ পলের এমন অদ্ভুত থিওলজি কেন গ্রহণ করেছিলো, যদিও তা যিশু আর তাঁর সাহাবীদের শিক্ষার বিপরীত ছিলো? উত্তর হচ্ছে- পল তার ভণ্ডামিকে ভালোবাসার চাদর পরিয়েছিলো। প্রচার করেছিলো-

“ঈশ্বর ভালোবেসে তার পুত্রকে আমাদের জন্য কুরবানী দিয়েছেন। ক্রুশবিদ্ধ হয়ে যিশু তোমার পাপের ভার বহন করেছেন। বিশ্বাস করলে তুমি নাজাত পাবে।”

এটা খুবই সহজ নাজাত লাভের মাধ্যম। বেশিরভাগ মানুষ সহজটাকেই সবসময় আঁকড়ে অনুসরণ করতে চায়, যদিও সে চিন্তা করে না তা আল্লাহ্‌র কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য। আর যারা এই মতবাদের বিরোধিতা করেছিলো, তাদের শক্ত হাতে দমন করা হয়।

জ্ঞানীদের নিকট তো বটেই, এমনকি আমাদের মতো অনেক সাধারণ মুসলিমের কাছেই এই থিওলজি হাস্যকর। এটা কীভাবে সম্ভব একজন মানুষ কোনো মরুভূমিতে একজন নবীর দেখা পেয়ে এমন কিছু প্রচার করা শুরু করবে, যা ঐ নবীরই শিক্ষার বিপরীত? আবার মানুষ এটাকে বিশ্বাসও করবে?

 

কিন্ত আমরা নিজেরাই কি তাদের চেয়ে খুব পিছিয়ে আছি?

হয়তো আমরা খ্রিষ্টানদের মতো এত বিচ্যুত হইনি আর কেউ এমন বিচ্যুতির শিক্ষা দিলে তাকে জানালার বাইরে নিক্ষেপ করেছি। কিন্তু মুসলিমদের একটা বড় অংশ কি এটা বিশ্বাস করে না যে, ঈমান থাকলেই হলো, একদিন তো জান্নাতে চলেই যাবো? অথচ মৃত্যুর আগেও আমাদের রাসূল ﷺ বারবার সালাতের দিকে নজর দিতে বলেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শারি’আতের বিধি-নিষেধগুলো কঠোরভাবে মেনে চলেছেন।

 

যিশু খ্রিষ্টের ভাষায় ইহুদীদের মধ্যে শুধু শারি’আতই ছিলো, কিন্তু ঈমান ছিলো না। আর এখন খ্রিষ্টানদের দাবী তাদের ঈমান আছে, তাই শারি’আত না মানলেও চলে। আল্লাহ্‌ তায়ালা কুর’আনের অসংখ্য জায়গায় ঈমান আনার সাথে সাথে ভালো কাজ করাকেও সম্পৃক্ত করেছেন। আমরা যেন একে আলাদা না করি। আল্লাহ্‌ তা’আলা আগের উম্মাতদের সরিয়ে আমাদের জায়গা দিয়েছেন।
আমাদের ভাগ্য যেন তাদের মতো না হয়।

 

"যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এরপর তারা তোমাদের মতো হবে না।” [সূরাহ মুহাম্মাদ (৪৭): ৩৮]

 

তথ্যসূত্রঃ

[১] Holy Bible 1 Corinthians 13:4-7

[২] Holy Bible 1 Corinthians 13:1

[৩] ANALYSIS (2011-12-19). “Global Christianity”. Pewforum.org.

[৪] Holy Bible Mark 16:15

[৫] Holy Bible Matthew 10:2

[৬] Holy Bible Acts 2:22

[৭] Holy Bible John 17:3

[৮] Holy Bible Matthew 10:2

[৯] Holy Bible Acts 9:4-7

[১০] Holy Bible Galatians 1:17

[১১] Encyclopædia Britannica Vol:17 Page:389

[১২] খ্রিষ্টধর্মের স্বরূপ, মুফতি তাকী উসমানি পৃষ্ঠাঃ ১০৪-১০৫

[১৩] Holy Bible Acts 3:13

[১৪] Holy Bible Colossians 1:16

[১৫] Holy Bible Matthew 5:17-18

[১৬] Holy Bible Ephesians 2:15

[১৭] Holy Bible Genesis 17:9-14

[১৮] Holy Bible Luke 2:21

[১৯] Holy Bible Galatians 5:2

[২০] Gospel of Barnabas 1:2-9

[২১] Encyclopædia Americana Vol:3 Page:262

[২২] Gospel of Barnabas 44:30, 163:7-8

[২৩] Holy Bible James 2: 9-11

[২৪] Holy Bible Galatians 2:11-13

[২৫] Holy Bible John 14:28

[২৬] Studies in Christian Doctrine- Morris Milton Page 61,74

[২৭] Encyclopædia Britannica Vol:10 Page:397

[২৮] Augustine Vol 2 page 678

[২৯] A Select Library of Nicene and Post-Nicene Fathers of the Christian Church Wm. B. Eerdmans Publishing Co. 1979) 2d ser. 14:3

[৩০] From Wilson, Jesus: The Evidence, p.168