মুসলিমরা দলে দলে বিভক্ত, তাহলে ইসলাম কীভাবে সত্য ধর্ম হয়?

বিবিধ



লেখকঃ তানবীর হাসান বিন আব্দুর রফীক
সম্পাদনাঃ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 

নাস্তিক প্রশ্নঃ মুসলিমরা দলে দলে বিভক্ত। তাঁরা দলে দলে বিভক্ত হবে এটা নাকি নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই বলে গিয়েছেন। তাহলে ইসলাম আবার কীভাবে সত্য ধর্ম হয়, যেই ধর্মের অনুসারীরা দলে দলে বিভক্ত?

 

উত্তরঃ কোন একটা বিষয়ে একাধিক মত বা দল তৈরী হওয়া এটা বুঝায় না যে, সে বিষয়টা ভুল। মতভেদ বড় বড় বিজ্ঞানীদের ভিতরে হয়, মতভেদ ডাক্তারদের মাঝে হয়, মতভেদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যেও হয়।

 

ধরুন একজন ডাক্তার আপনার মাথা ব্যাথার জন্য একটা ট্যাবলেট খেতে দিল। আরেক ডাক্তার ভিন্ন নামের একটা ট্যাবলেট খেতে দিল। আরেক ডাক্তারের কাছে গেলে সেও ভিন্ন নামের আরেকটা ট্যাবলেট খেতে দিল। অতঃপর একজন গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে গেলে সেও একটা মাথা ব্যাথার ট্যাবলেট খেতে দিল।

দেখা গেল, প্রথম তিন ডাক্তারের ট্যাবলেট খেয়েই মাথা ব্যাথা সেরে যাচ্ছে। কিন্তু হাতুড়ে ডাক্তারেরটা খেয়ে কিছু তো হলোই না আরো মাথা ব্যাথা বেড়ে গেল! তাহলে বিষয়টা কী?

 

বিষয়টা হচ্ছে, প্রথম তিনজন ডাক্তার ভিন্ন নামের ওষুধ দিলেও, সে সব ওষুধের উপাদান ছিল এক। শুধুমাত্র একেকটা একেক ওষুধ কোম্পানী তৈরী করেছে। তাই সেগুলোর নাম ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু হাতুড়ে ডাক্তারের ওষুধ ছিল তাঁর মনগড়া।

প্রথম তিনজন ডাক্তার তিন নামের ওষুধ দিয়েও তাঁরা সঠিক পথে আছে। কিন্তু হাতুড়ে ডাক্তার ভুল পথে আছে। এরকম হাতুড়ে ডাক্তারের সংখ্যা হাজার হাজারও হতে পারে, এরপরও ডাক্তার ও ওষুধের অবদান অস্বীকার করা যায় না। ভুয়া ডাক্তারদের কারণে ওষুধ বলেই কিছু নেই, এ তথ্য তো আর পেশ করা যায় না।

 

আরেকটা উদাহরণ দেখুন, এক পথচারী বলল, আমি বরিশাল যেতে চাই। একজন বলল, সায়েদাবাদ থেকে বরিশালের বাস পাবেন। আরেকজন বলল, সদরঘাট থেকে বরিশালের লঞ্চে উঠবেন। আরেকজন তাকে বলল, কমলাপুর থেকে বরিশালের ট্রেন পাওয়া যায়।

যাদের বাড়ি বরিশাল তাঁরা হয়তো বা এতক্ষণে হেসে দিয়েছেন। কারণ তাঁরা জানেন কমলাপুর থেকে বরিশালের কোন ট্রেন ছেড়ে যায় না। বাসে কিংবা লঞ্চে বরিশাল যেতে পারবেন। তবে কমলাপুরের ট্রেন ধরলে হয়তো আপনি গাজীপুর যেতে পারবেন, চট্টগ্রাম যেতে পারবেন, কিন্তু বরিশাল আর যাওয়া হবে না। এজন্য এখন কি কেউ বলবেন, বরিশাল নামে কোন জেলাই নেই? কমলাপুর থেকে যাওয়া যায় না বলে বাসে আর লঞ্চে যাওয়ার বিষয়টাও ভুয়া- এ কথাও কি কেউ বলবেন?

 

ঠিক একই রকম ইসলামের ব্যাপারটি। কেউ ইসলামের নামে দলে দলে ভাগ হয়ে গেলেই ইসলামও ভুল বিষয়টি এমন নয়। আবার এর মাঝে কোন দলই হকের উপর নেই এমনও নয়।

 

নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামে যে হাদিসটি মুসলিমদের দলে দলে ভাগ হওয়ার বিষয়ে বলা হয় সেটি হচ্ছে,
لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بني إسرائيل حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ، حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلَانِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ، وَإِنَّ بني إسرائيل تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً»، قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
নিঃসন্দেহে আমার উম্মাত সে অবস্থায় পতিত হবেই, যে অবস্থায় বানী ইসরাইলরা পতিত হয়েছিল। এমনকি তাদের কেউ যদি প্রকাশ্যে নিজের মায়ের সাথে যেনা করে, আমারও উম্মাতও এমনটাই করবে। আর বানী ইসরাইলরা ভাগ হয়েছিল ৭২ দলে। আর আমার উম্মাত ভাগ হবে ৭৩ দলে। প্রত্যেকেই জাহান্নামে যাবে, শুধু একটি দল ছাড়া। তাঁরা (সাহাবাগণ) বলল, হে আল্লাহর রসূল তাঁরা কারা? তিনি বললেন, যার উপর আমি ও আমার সাহাবারা আছি (এর উপর যারা থাকবে)। [১]

 

সাহাবারা যদি কোন বিষয়ে ইখতিলাফ (মতভেদ) করে থাকেন, তাহলে সেসব বিষয়ে ইখতিলাফ চলবে। আর যেসব বিষয়ে তাঁরা ইখতিলাফ করেননি সেসব বিষয়ে কোন ইখতিলাফ চলবে না। সাহাবারা দীনের ফুরুয়ী বা শাখাগত মাসয়ালায় ইখতিলাফ করেছেন। তবে দীনের আছল বা মৌলিক বিষয়ে তাঁরা কোন ইখতিলাফ করেননি। তাই মতভেদ মানেই দলভেদ নয়।

এখানে ফিরকা বা দলে দলে ভাগ হওয়ার মানদণ্ড হচ্ছে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবা বা সাথীদের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া। কেউ মতভেদ করেও জান্নাতপ্রাপ্ত দলের ভিতরে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে যদি তাঁর মতভেদ এমন বিষয়ে হয় যা সাহাবা যুগে ছিল।

 

যেমন এ হাদিসের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে ইমাম মানাবী (৯৫২-১০৩১ হি) রহিমাহুল্লাহ বলেন,
هذا الاختلاف في الأصول وأما اختلاف الرحمة فهو في الفروع واختلف العلماء
এই (জাহান্নামপ্রাপ্ত দলগুলোর) ইখতিলাফ হচ্ছে মৌলিক বিষয়ের ইখতিলাফ, আর সেই ইখতিলাফ তো রহমতস্বরূপ যে ইখতিলাফ আলিমগণ শাখাগত বিষয়ে করেছেন। [২]

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় উবাইদুল্লাহ আর-রহমানী মুবারকপুরী (১৩২৭-১৪১৪ হি) রহিমাহুল্লাহ আরো সুন্দর ভাষায় বলেছেন,
وليس المراد بالافتراق في الحديث مطلق الافتراق حتى يدخل فيه ما وقع من الاختلاف في مسائل الفروع في زمان الخلفاء الراشدين، ثم في سائر الصحابة، ثم في التابعين، ثم في الأئمة المجتهدين، بل المراد به الافتراق المقيد
আর এই হাদিসে মতবিভক্তি দ্বারা সকল সাধারণ মতবিভক্তি উদ্দেশ্য নয়; তাই এতে তা প্রবেশ করবে না যা খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগে শাখাগত মাসয়ালায় হয়েছিল, অনুরূপ তাও প্রবেশ করবে না যা সাহাবাদের মাঝে সংঘটিত হয়েছিল। এরপর যা তাবিয়ীনদের মাঝে হয়েছিল। এরপর যা মুজতাহিদ আলিমদের মাঝে হয়েছিল। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট বিভক্তি বা আকীদাগত বিভক্তি। [৩]

একই ধরণের কথা আরো বহু কিতাবে এসেছে। [৪]

 

সাহাবাদের যুগে অসংখ্য বিষয়ে ইখতিলাফ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ নিম্নের হাদিসটি আমরা দেখি,
ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আহযাব থেকে ফিরে আসলেন তখন আমাদেরকে বললেন,
«لاَ يُصَلِّيَنَّ أَحَدٌ العَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ» فَأَدْرَكَ بَعْضَهُمُ العَصْرُ فِي الطَّرِيقِ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: لاَ نُصَلِّي حَتَّى نَأْتِيَهَا، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: بَلْ نُصَلِّي، لَمْ يُرَدْ مِنَّا ذَلِكَ، فَذُكِرَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمْ يُعَنِّفْ وَاحِدًا مِنْهُمْ
"তোমাদের কেউ যেন বানী কুরাইযাহতে না যাওয়া পর্যন্ত আসরের সলাত না পড়ে।'' অতঃপর তাদের কারো কারো রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল। তাই তাদের কেউ কেউ বলল, "আমরা সেখানে না পৌছা পর্যন্ত সলাত পড়ব না।'' আর তাদের কেউ কেউ বলল, "আমরা বরং সলাত পড়ে নিব, তিনি আমাদেরকে অমনটা বুঝাননি (যে সেখানে না পৌছাতে পারলে সলাত পড়ব না)।'' অতঃপর তাঁরা নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করল। কিন্তু তিনি তাদের কারো সমালোচনা করেননি। [৫]

এভাবে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যেখানে দেখা যায় সাহাবারা পরষ্পর মতভেদ করেছেন।

 

এবার আসুন শুরুর উদাহরণগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখি, আমরা দেখলাম, ডাক্তারদের ভিতরে মতভেদ হয়, পথনির্দেশকারীদের ভিতরেও মতভেদ হয়, একইভাবে মুসলিমদের ভিতরেও মতভেদ হতে পারে।

আমরা দেখলাম ওষুধের উপাদান যদি ঠিক থাকে, তাহলে যে কোম্পানীর ওষুধই দেয়া হোক না কেন তা সঠিক, রাস্তা যদি গন্তব্যের দিকে হয় তাহলে যে বাস আর লঞ্চ দিয়ে যেভাবেই খুশি যাওয়া হোক না কেন তা সঠিক, একইভাবে কারো, কথা, কাজ ও বিশ্বাস যদি নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা যার উপর ছিলেন সে ভিত্তিতে হয় তাহলে এখানে একাধিক মত দেয়া হলেও তা সঠিক।

এখানে ভিত্তি হচ্ছে ওষুধের উপাদান ঠিক থাকা, রাস্তা গন্তব্যের দিকে হওয়া এবং নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা যার উপরে ছিলেন তাঁর উপরে থাকা। তাই উপাদান ঠিক না রেখে যত ওষুধই বানানো হোক, গন্তব্যের দিকে পথ না ধরে যে কোন দিকেই যাওয়া হোক, আর নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা যার উপরে ছিলেন তা বাদ দিয়ে যত বিষয়ই আকড়ে ধরা হোক; তাঁর সব কিছুই বাতিল।

 

এসব বাতিল কোটি কোটি থাকলেও যেমন ওষুধ আর ডাক্তারের অবদান অস্বীকার করা যায় না এবং লঞ্চ ও বাস ভুয়া আর বরিশাল নামে কোন জেলাই নেই বলা যায় না, ঠিক তেমন ইসলামের নামে তৈরী হওয়া বাতিল অনুসারীদের কারণে ইসলামকেও অস্বীকার করা যায় না আর সত্যিকারের অনুসারীদেরও তুচ্ছ করা যায় না।

 

এখন প্রশ্ন হতে পারে, নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাহলে এ কথা বলল কেন? তিনি কি এ কথা বলে বিষয়টিকে উৎসাহিত করলেন না?

উত্তর হচ্ছে, না। কারণ তিনি এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা থেকে পাওয়া তথ্যই উম্মাতকে জানিয়ে দিয়েছেন। এখানে আমাদেরকে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, যাতে আমরা দলে দলে ভাগ না হই।

 

ধরুন, একটি সংগঠন বানানো হলো। অবস্থাদৃষ্টে সংগঠণের সভাপতি বললেন, "আমার মনে হচ্ছে অচিরেই এ দলে ভাঙন আসবে। অনেক নামধারী কর্মী সৃষ্টি হবে। আমি সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি। আর বলে যাচ্ছি, এসব নামধারী ভুয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।''

এখন এই সভাপতির ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন? এটা কি দলের দুর্বলতার প্রমাণ? এতে করে কি তিনি সংগঠণের ভাঙনে উৎসাহ দিয়েছেন? এটা বরং সভাপতির দূরদর্শিতার প্রমাণ। তাই যদি হয়, তাহলে নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্ত বাণীতে আপনি কীভাবে সমস্যা খুঁজে পান? এতে কি তিনি দলাদলিতে উৎসাহ দিয়েছেন বলে মনে হয়?

বিপরীতে দেখুন কোথায় সেই সভাপতি আর কোথায় মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা তাকে আল্লাহ প্রেরিত নাবী ও রসূল বলে বিশ্বাস করি। তিনি আল্লাহর থেকে ওহীপ্রাপ্ত সূত্রে আমাদেরকে এমন তথ্য জানাতেই পারেন।

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, নাউযুবিল্লাহ, অনেকের কথা মত যদি এমনই হতো যে, নাবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য নাবী নয়, তাহলে তিনি নিজ স্বার্থের জন্য নিজের অনুসারীদের খুশি রাখতে দলাদলির কথা না বলে, বিপরীতে তাঁরা আরো একত্রিত থাকবে বলেই ঘোষণা দিতে পারতেন। যেখানে তিনি বানী ইসরাইল অর্থাৎ, ইহুদীরা ৭২ দলে ভাগ হয়েছে বলে জানিয়েই দিলেন সেখানে তিনি বিপরীতে মুসলিমদের খুশি রাখতে তাঁরা একত্রিত থাকবে বলেই ঘোষণা দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে আরো ১ দলের কথা বাড়িয়ে বললেন! তিনি বললেন, "আমার উম্মাত ভাগ হবে ৭৩ দলে!''

 

কারণ তিনি এ কথা নিজ থেকে বানিয়ে বলেননি। মহান আল্লাহ কুরআনে বলে দিয়েছেন,
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى * إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
আর তিনি নিজ খেয়ালখুশি থেকে কিছুই বলেন না। তাতো কেবল ওহী ছাড়া ভিন্ন কিছুই না, যা তাঁর কাছে প্রেরণ করা হয়। [৬]

উপরন্তু উক্ত হাদিসের শেষেই কিন্তু নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন, কীসের উপরে থাকলে সেই জান্নাতের পথিক হওয়া যাবে;
مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
যার উপর আমি ও আমার সাহাবারা আছি।

 

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এবং আরো অসংখ্য হাদিসে এভাবে বাচাঁর পথ বলেই দেয়া হয়েছে;
যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
আর তোমরা একত্রিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআন ও সুন্নাহ) মজবুত করে আকড়ে ধরো, আর দলে দলে ভাগ হয়ো না। [৭]

নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন,
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি। এ দুটি জিনিস আকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব অপরটি নাবীর সুন্নাহ। [৮]

 

অপর হাদিসে বলা হয়েছে,
مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
তোমাদের মধ্য হতে কেউ আমার পর বেঁচে থাকলে, সে অসংখ্য ইখতিলাফ বা মতভেদ দেখতে পাবে। তাই তোমরা আমার সুন্নাহকে আকড়ে ধরো এবং সত্যনিষ্ঠ হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাহকে আকড়ে ধরো। আর এই সুন্নাহ আকড়ে ধরো তোমাদের মাড়ীর দাত দিয়ে। [৯]

 

কুরআনের বহু আয়াতে দলাদলিকে জোরালো ভাষায় নিন্দনীয় হিসেবেই ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেছেন,
فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ زُبُرًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
অতঃপর তাঁরা তাদের (দীনের) নির্দেশনাকে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ভাগে টুকরো টুকরো করে নিয়েছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা রয়েছে তা নিয়ে আনন্দিত। [১০]

 

মহান আল্লাহ আরো বলেছেন,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করো না। করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি চলে যাবে। আর সবর করো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন। [১১]

 

মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে অন্য আয়াতে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দীনকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ ভাগ করে নিয়েছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, (হে মুহাম্মাদ) তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর কাছেই ন্যস্ত। এরপর তিনি তাদেরকে তাঁরা যা কিছু করত সে সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন। [১২]

 

কত স্পষ্টভাবে আল্লাহ নিজের নাবীকেই জানিয়ে দিলেন যে, তাদের সাথে তাঁর কোন সম্পর্কই নেই।

আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফীক দান করুন।

(আল্লাহু আ'লাম) আল্লাহই সব কিছু সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[১] তিরমিযী, মুহাম্মাদ বিন ঈসা, ২৬৪১; আল-বিদয়ু', ইবনু ওয়াদাহ, ২৫০; আস-সুন্নাহ, মারওয়াযী, ৫৯; আশ-শারীয়া'হ, আজরী, ২৩; আল-মুসতাদরাকু লিল-হাকিম, আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম, ৪৪৪; শারহুস সুন্নাহ, আবূ মুহাম্মাদ আল-বাগাবী, ১/২১৩; আল-ইবানাতুল কুবরা, ইবনু বাত্তাহ, ১; আল-আরবা'য়ূনা হাদীছা, আজরী, ১৩; আল-গুরাবা, আজরী, ৯; উরূসুল আজযা, আবুল ফারাজ আছ-ছাকাফী, ৯৬; আরবা'য়ু মাজালিস, খতীব আল-বাগদাদী, ৩৪; জামি'উল আহাদিস, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ১৩১৮০ ১৯২৩৩; কানযুল আ'মাল, মুত্তাকিল হিন্দী, ৯২৮, ১০৬০, ৩০৮৩৭; জামি'উল উসূল, ইবনুল আছীর, ৭৪৯০; মিশকাতুল মাসাবীহ, আবূ আব্দুল্লাহ আত-তিবরীযী, ১৭১; সহীহুল জামিউস সগীর, আলবানী ৫৩৪৩।
হাদিসটিকে শাইখ আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাসান বলেছেন।
[২] ফাইযুল কাদীর, মানাবী, ৫/৩৪৬
[৩] মিরআ'তুল মাফাতীহ, উবাইদুল্লাহ আর-রহমানী, ১/২৭০
[৪] আওনুল মা'বুদ ওয়া হাশিয়াতু ইবনুল কয়্যিম, আল-আযীম আবাদী, ১২/১২২; তুহফাতুল আহওয়াযী, আব্দুর রহমান আল-মুবারকপুরী, ৭/৩৩২
[৫] বুখারী, মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল, ৯৪৬, ৪১১৯; মুসলিম, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, ১৭৭০; শারহুস সুন্নাহ, আবূ মুহাম্মাদ আল-বাগাবী, ৩৭৯৮; জামিউ'ল উসূল, ইবনুল আছীর, ৬০৯৬; কানযুল আ'মাল, মুত্তাকিল হিন্দী, ৩০০৯৫; আল-লু'লু ওয়াল মারজান, আব্দুল বাকী, ১১৫৮; আল-মুসনাদুল জামি', মাহমুদ মুহাম্মাদ খলীল, ৮১৪৬; আল-মুকাররার আ'লা আবওয়াবিল মুহাররার, ইউসুফ বিন মাজিদ, ৭১৭; জামিউ'ল আহাদিস, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ৩৯৩৪৮; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (দারুল ফিক্‌র), ইবনু কাছীর, ৪/১১৭; তারীখুল ইসলাম (তাদমিরী), শামসুদ্দীন যাহাবী, ২/৩০৮; সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (রিসালাহ), শামসুদ্দীন যাহাবী, সীরাহ ১/৫০৬
[৬] সুরাতুন নাজমঃ ৩-৪
[৭] সূরা আলু ইমরানঃ ১০৩
[৮] তাফসীরু ইবনু কাছীর (সালামাহ), ইবনু কাছীর, ৭/২০৩; মুয়াত্তায়ু মালিক (আ'যামী), মালিক বিন আনাস, ৩৩৩৮; আশ-শারীয়া'হ, আজরী, ১৭০৪, ১৭০৫, আল-ই'তিকাদ, আবূ বাক্‌র আল-বাইহাকী, ১/২২৮; জামি'উ বায়ানুল ই'লমি ওয়া ফাদলিহী, ইবনু আব্দিল বার, ১৩৮৯, ১৮৬৬, ২২৯৯; তারতীবুল আমালী, আল-মুরশিদ বিল্লাহ, ৭৫৩; আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকী, আবূ বাক্‌র আল-বাইহাকী, ২০৩৩৬; জামি'উল উসূল, ইবনুল আছীর, ৬৪; ইত্তিহাফুল মাহরাহ, ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ১৬০২৪; কানযুল আমাল, মুত্তাকিল হিন্দী, ৯৪১; আল-জামি'উস সগীর, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ৫২৪৮; জামি'উল আহাদিস, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ৬৪৩৭, ২৫৭৪৯; তারীখুত ত্বাবারী, আবূ জাফর আত-ত্বাবারী, ৩/১৫১; তারীখুল ইসলাম (তাদমিরী), শামসুদ্দীন যাহাবী, ২/৭০৯
শাইখ আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
[৯] মুসনাদু আহমাদ, আহমাদ বিন হাম্বাল, ১৭১৪৪, ১৭১৪৫; দারিমী, আবূ মুহাম্মাদ আদ-দারিমী, ৯৬; ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ বিন ইয়াযীদ, ৪২; আবূ দাউদ, সুলাইমান ইবনুল আশআছ, ৪৬০৭; আস-সুন্নাহ, ইবনু আবী আছিম, ৫৪, ৫৫, ৫৮, ৫৯; মুসনাদুল বাযযার, আবূ বাক্‌র আল-বাযযার, ৪২০১; আস-সুন্নাহ, মারওয়াযী, ৬৯, ৭০, ৭২; শারহু মুশকিলুল আছার, ত্বাহাবী, ১১৮৬; সহীহ ইবনু হিব্বান, ইবনু হিব্বান, ৫; আশ-শারী'আহ, আজরী, ৮৬, ১৭০৬; আল-মু'জামুল আওসাত, ত্বাবারানী, ৬৬; আল-মু'জামুল কাবীর, ত্বাবারানী, ৬১৭, ৬১৮, ৬২২, ৬২৪, ৬৪২; মুসনাদুশ শামিয়ীন, ত্বাবারানী, ৪৩৭, ৬৯৭, ৭৮৬, ১৩৭৯; আল-মুসতাদরাকু লিল-হাকিম, আবূ আব্দুল্লাহ আল-হাকিম, ৩২৯, ৩৩২, ৩৩৩; ফাওয়ায়িদুত তামাম, তামাম বিন মুহাম্মাদ, ২২৫১ ৩৫৫; শারহু উসূলু ই'তিকাদ,আলকায়ী, ৮০; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবূ নুয়াইম আল-ইস্পাহানী, ৫/২২০, ১০/১১৪; আমালী, ইবনু বুশরান, ৫৬; আস-সুনানুল ওয়ারিদাহ, আবূ আমর আদ-দানী, ১২৩; আল-ই'তিকাদ, আবূ বাক্‌র আল-বাইহাকী, ১/২১৯; শু'য়াবুল ঈমান, আবূ বাক্‌র আল-বাইহাকী, ৭১১০; জামি'উ বায়ানুল ইলমি ওয়া ফাদলিহী, ইবনু আব্দিল বার, ১৭৫৮, ২৩০৫, ২৩১১; শারহুস সুন্নাহ, আবূ মুহাম্মাদ আল-বাগবী, ১০২; মা'রিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, আবূ বাক্‌র আল-বাইহাকী, ৩২৭; আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকী, ২০৩৩৮; আল-ইবানাতুল কুবরা, ইবনু বাত্তাহ, ১৪২; আল-আরবা'য়ূনা হাদীছা, আজরী, ৮; আর-রিসালাতুল ওয়াফিয়াহ, আবূ আমর আদ-দানী, ১৯৮; হাদীসু আব্বাস আত-তারকুফী, আব্বাস আত-তারকুফী, ৫২; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, কওওয়ামুস সুন্নাহ, ৪৮৫; জামিউ'ল উসূল, ইবনুল আছীর, ৬৭; জামিউ'ল মাসানীদ ওয়াস সুনান, ইবনু কাছীর, ৭৩৯৮, ৭৩৯৯, ৭৪০১; তাযকিরাতুল মুহতাজ, ইবনুল মুলকিন, ৫৫; আত-তালখীছুল হাবীর, ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ২০৯৭; কানযুল আমাল, মুত্তাকিল হিন্দী, ৮৭৪; আল-মুসনাদুল জামি', মাহমূদ মুহাম্মাদ খলীল, ৯৭৮২, ৯৭৮৪; মাছাবীহুস সুন্নাহ, আবূ মুহাম্মাদ আল-বাগবী, ১২৯; আল-জামি'উস সগীর, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ৪৩১৪; জামি'উল আহাদিস, জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, ৯৫৮০; আল-মা'রিফাতু ওয়াত তারীখ, ফাসাবী, ২/৩৪৪; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১২/২৫৩
হাদিসটিকে শাইখ আরনাউত ও শাইখ আলবানী রহিমাহুমাল্লাহ সহীহ বলেছেন।
[১০] সূরাতুল মু'মিনুনঃ ৫৩
[১১] সূরাতুল আনফালঃ ৪৬
[১২] সূরাতুল আন'আমঃ ১৫৯