মুহাম্মাদ(ﷺ) এর পূর্বে আরবে কি আর কোনো সতর্ককারী আসেনি?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) স্ববিরোধিতা সংক্রান্ত



 

প্রশ্নঃ

কুরআনে বলা হয়েছে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ)কে এমন স্থানে পাঠানো হয়েছে যেখানে তাঁর পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি (সুরা কাসাস ৪৬, সুরা সাজদাহ ৩)। আবার মুসলিমরা দাবি করে ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) নাকি মক্কায় এসেছিলেন এবং কা’বা নির্মাণ করেছিলেন (সুরা বাকারাহ ১২৫-১২৭)। এই দুই দাবি কি পরস্পরবিরোধী নয়?

 

১। যদি সুরা বাকারাহ ১২৫-১২৭ এর দাবি অনুযায়ী মক্কায় ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এসে থাকেন, তাহলে সুরা কাসাস ৪৬ ও সুরা সাজদাহ ৩ এর দাবি মিথ্যা হয় [মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পূর্বে আরবে কোনো নবী না আসা]

২। সুরা কাসাস ৪৬ ও সুরা সাজদাহ ৩ অনুযায়ী মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পূর্বে আরবে কোনো নবী না আসার দাবি সত্য হলে সুরা বাকারাহ ১২৫-১২৭ এর দাবি মিথ্যা হয় [মক্কায় ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর আগমন ও কা’বা নির্মাণ]। তাহলে প্রমাণ হয় ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.)  মক্কায় আসেননি।

 

উত্তরঃ

আলোচ্য আয়াতগুলো কেউ একটু খেয়াল করে পড়লেই বুঝতে পারবে এখানে অভিযোগটি সম্পূর্ণ অসার। অভিযোগকারীরা দাবি করেছে  << কুরআনে বলা হয়েছে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)কে এমন স্থানে পাঠানো হয়েছে যেখানে তাঁর পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি (সুরা কাসাস ৪৬, সুরা সাজদাহ ৩)>>  অথচ কুরআনের আলোচ্য আয়াতগুলোতে মোটেও স্থানের কথা বলা হয়নি বরং আলোচ্য আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে সম্প্রদায়ের (قَوْمًا) কথা।

 

وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَٰكِن رَّحْمَةً مِّن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

অর্থঃ  “মূসাকে যখন আমি আহবান করেছিলাম, তখন তুমি ত্বুর পর্বত-পার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুতঃ এ সংবাদ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে করুণাস্বরূপ, যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি; যেন ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।” [1]

 

  أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۚ بَلْ هُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ

অর্থঃ “তবে কি ওরা বলে, এ তো তার নিজের রচনা?  বরং এ তোমার প্রতিপালক হতে আগত সত্য; যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। হয়তো ওরা সৎপথে চলবে।” [2]

 

অর্থাৎ আল কুরআনে বলা হয়েছে হয়েছে নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এর কওম বা সম্প্রদায়ের কাছে আগে কখনো সতর্ককারী তথা নবী আসেনি। এটা বলা হয়নি যে আরব ভূখণ্ড কিংবা মক্কায় কোনো নবী আসেনি।

 

সুরা সাজদাহর ৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির কুরতুবীতে বলা হয়েছে,

 

قال قتادة : يعني قريشا ، كانوا أمة أمية لم يأتهم نذير من قبل محمد صلى الله عليه وسلم .

অর্থঃ [প্রখ্যাত মুফাসসির তাবিঈ] কাতাদাহ(র.) বলেছেন, "এর অর্থ হলো কুরাঈশ। তারা ছিলো নিরক্ষর জাতি। তাদের কাছে মুহাম্মাদ () এর পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি."  [3]

 

সুরা সাজদাহর ৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির তাবারীতে বলা হয়েছে,

 

(ما أتاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ منْ قَبْلكَ)يقول: لم يأت هؤلاء القوم الذين أرسلك ربك يا محمد إليهم، وهم قومه من قريش، نذير ينذرهم بأس الله على كفرهم قبلك

অর্থঃ (যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি) – তিনি বলেছেন, এই সম্প্রদায়ের কাছে তোমার প্রতিপালক তোমাকে পাঠিয়েছেন হে মুহাম্মাদ(,) যাদের কাছে (আগে) আর কেউ আসেনি। আর এরা হচ্ছে তাঁর সম্প্রদায় কুরাঈশ। সতর্ককারী, যে তোমার পূর্বে তাদের কুফরীর জন্য তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করবে।” [4]

 

সুরা কাসাসের ৪৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির মা’আরিফুল কুরআনে বলা হয়েছে,

 

لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ এখানে কওম বলে হযরত ইসমাঈল(আ.)-এর বংশধর আরবদেরকে বোঝানো হয়েছে। হযরত ইসমাঈলের পর থেকে শেষ, নবী (সা.) পর্যন্ত তাদের মধ্যে কোন পয়গম্বর প্রেরিত হননি। সূরা ইয়াসীনেও এই বিষয়বস্তু আলোচিত হবে। কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে وَإِن مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ । অর্থাৎ এমন কোন উম্মত নেই, যার মধ্যে আল্লাহর কোন পয়গম্বর আসেন নি। এই ইরশাদ, আলোচ্য আয়াতের পরিপন্থী নয়। কেননা, আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, সুদীর্ঘকাল ধরে হয়রত ইসমাঈলের পর তাদের মধ্যে কোন নবী আসেন নি। কিন্তু নবী-রসূলের আগমন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এই উম্মতও নয়। [5]

 

 

অর্থাৎ আলোচ্য আয়াতে কুরাঈশ আরবদের কথা বলা হয়েছে যারা ইসমাঈল(আ.) এর বংশধর। কুরাঈশদের উৎপত্তি ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর বহুকাল পরে। আর কুরাঈশদের উৎপত্তিরও বহুকাল পরে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আগমন। ইসমাঈল(আ.) এর পরে দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিলো এবং কুরাঈশদের কাছে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পূর্বে কোনো নবী আসেনি।

 

নবী মুহাম্মাদ() এর বংশতালিকা। দেখুনঃ রাহিকুল মাখতুম – শফিউর রহমান মুবারকপুরী (তাওহিদ পাবলিকেশন্স), পৃষ্ঠা ৭৪

 

সাধারণভাবে আল্লাহ তা’আলা সকল উম্মাত বা জাতির নিকটেই নবী প্রেরণ করেছেন। কিন্তু একটি জাতির অন্তর্গত সকল কওম বা সম্প্রদায়ের মাঝে সব সময় দ্রুত নবী আসেন না। বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যেভাবে একের পর এক নবী আসতেন, ইসমাঈল(আ.) এর বংশধরদের মধ্যে সেটি হয়নি। নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বংশটিতে দীর্ঘকাল ধরে কোনো নবী আসেননি। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে দীর্ঘকাল নবী না আসার এ ব্যাপারটিই এখানে উদ্যেশ্য। আলোচ্য আয়াতগুলোতে কোনো স্থানের কথা বলা হয়নি বরং এই সম্প্রদায়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই বক্তব্য দীর্ঘকাল পূর্বে ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর মক্কায় আগমনের তথ্যের সাথে মোটেও সাংঘর্ষিক নয়। কুরআনে কোথাও এটি বলা হয়নি যে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পূর্বে আরবে বা মক্কায় আর কোনো নবী আসেনি। কুরআনে বলা হয়েছে মুহাম্মাদ() এর কওমের কাছে পূর্বে নবী আসেনি। অথচ অভিযোগকারীদের দাবি ছিলো কুরআনে নাকি বলা হয়েছে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ)কে এমন জায়গায় পাঠানো হয়েছে যেখানে তাঁর পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি! কুরআনে যেটি বলা হয়নি, সেটি কুরআনের উপর আরোপ করে ‘স্ববিরোধিতা’ (!) বের করবার ব্যার্থ চেষ্টার উদাহরণ এটি। মূলত অভিযোগকারীরা এখানে Straw-man’s Fallacyর আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের এই অপচেষ্টার অন্যতম উদ্যেশ্য হচ্ছে ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর মক্কায় আগমনের তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কিন্তু তাদের উদ্যেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

 

( 125 )   وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۖ وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

( 126 )   وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَىٰ عَذَابِ النَّارِ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

( 127 )   وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

অর্থঃ "এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর,) যখন কাবাগৃহকে মানবজাতির সম্মিলনক্ষেত্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম (এবং বলেছিলাম), তোমরা মাকবামে ইব্রাহীম (ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গা)কেই নামাযের জায়গারূপে গ্রহণ কর। আর আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে। স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এ (মক্কা)কে নিরাপদ শহর কর, আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে, তাদেরকে রুযীস্বরূপ ফলমূল দান কর।’ তিনি বললেন, ‘যে কেউ অবিশ্বাস করবে, তাকেও আমি কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দেব, অতঃপর তাকে দোযখের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট পরিণাম (বাসস্থান)। যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কাবাগৃহে ভিত্তি স্থাপন করছিল, (তখন তারা বলেছিল,) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর; নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা।” [6]

 

উল্লেখ্য, নবী মুহাম্মাদ(ﷺ)কে কুরাঈশদের মধ্য থেকে পাঠানো হলেও তাঁর নবুয়তের সীমানা সমগ্র মানবজাতির জন্য।

 

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থঃ “আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [7]

 

( 107 )   وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

( 108 )   قُلْ إِنَّمَا يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ

অর্থঃ “আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। বল, ‘আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্য একই উপাস্য। সুতরাং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হবে কি?’” [8]

 

কাজেই আমরা সমগ্র মানবজাতিকে আহ্বান জানাবো তারা যেন সত্যের পথে আসেন এবং সেই নবীর অনুসরণ করেন যাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] আল কুরআন, কাসাস ২৮ : ৪৬

[2] আল কুরআন, সাজদাহ ৩২ : ৩

[3] তাফসির কুরতুবী, সুরা সাজদাহর ৩ নং আয়াতের তাফসির

http://quran.ksu.edu.sa/tafseer/qortobi/sura32-aya3.html

[4] তাফসির তাবারী, সুরা সাজদাহর ৩ নং আয়াতের তাফসির

http://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura32-aya3.html

[5] তাফসির মা’আরিফুল কুরআন, সুরা কাসাসের ৪৬ নং আয়াতের তাফসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭১৩

[6] আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ১২৫-১২৭

[7] আল কুরআন, সাবা ৩৪ : ২৮

[8] আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ১০৭-১০৮