শরিয়া আইনে চুরির অপরাধে হাত কাটার বিধান

নৈতিকতা বিষয়ক



নাস্তিক প্রশ্নঃ  শুধুমাত্র চুরি করার জন্য আল্লাহ তার সৃষ্ট বান্দার (নারী/পুরুষ) হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেন (Quran 5:38) ! এটা কি আপনার কাছে কোন ভাবেই মানবিক বলে মনে হয়?

 

উত্তরঃ কুরআন মাজিদে বলা হয়েছেঃ

 

 যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবেএবং আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞানময়।

অতঃপর স্বীয় সীমালঙ্ঘণের পর  যে তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। অবশ্যই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। [1]

 

ইসলামী শরিয়ায় চুরির শাস্তি হিসাবে হাত কাটার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্র আছে; এগুলো পূরণ না হলে হাত কাটা হয় না। চুরিকৃত বস্তুটি যদি মূল্যবান ও দরকারী কিছু হয়, চুরি যাবার আগে জিনিসটি যদি সম্পদ বা প্রয়োজনীয় দ্রব্য রাখার স্থানে রাখা হয়(খোলা স্থানে অরক্ষিতভাবে ফেলে রাখা না হয়), চুরির যদি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, চুরি যাওয়া জিনিসটির মালিক যদি দাবি করে—কেবলমাত্র এ সব ক্ষেত্রে জন্য চোরের হাত কাটা যায়। [2]

এ ছাড়া একটি নির্দিষ্ট মূল্যমানের বেশি দামের দ্রব্য চুরি গেলে হাত কাটা যায়। হাদিস দ্বারা এই মূল্যমান নির্ধারিত হয়েছেঃ ১.০৬২৫ গ্রাম স্বর্ণের মূল্য। এর কম দামের কোন জিনিস চুরি গেলে সে জন্য হাত কাটা যায় না। বরং নিয়মাধীন অন্য শাস্তি দেয়া হয়। [3]

 

আমেরিকা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উন্নততম। কিন্তু চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে এই দেশটির রেকর্ড ভয়াবহ। [4] এই আমেরিকায় যদি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে একদিকে প্রতিটি সার্মথ্যবান ব্যক্তি রীতিমতো যাকাত আদায় করে অপর দিকে নারী বা পুরুষ চোর প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হাত কেটে ফেলা হয়; তাহলে আমেরিকায় চুরি, ডাকাতির বর্তমান প্রবণতা কি বাড়বে? না একই রকম থাকবে? নাকি একেবারে কমে যাবে?

সঙ্গতভাবেই তা কমে যাবে। তদুপরি এই ধরনের কঠিন আইন থাকলে অনেক স্বভাবজাত চোরও নিজেকে এই ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবে। অর্থাৎ চুরি ডাকাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

 

ইসলামী এই বিধান কি আসলেই খুব বর্বর? এই বিধানের ফলে কি মানুষজন গণহারে তাদের হাত হারাতে থাকে?!!

ইসলামী এই বিধান বর্তমান পৃথিবীতে চালু আছে সৌদি আরবে। অথচ সেখানে কখনোই রাস্তায় কোন মানুষের হাত কাটা অবস্থায় দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই ইসলামী আইন চালু থাকার ফলে ভয়েই কেউ আর চুরি করে না। সেখানকার  সমাজে চুরির কোন অস্তিত্বই বলতে গেলে নেই। এর ফলে নাগরিকদের জান-মাল সংরক্ষিত থাকে। আর মানুষের হাতও অক্ষত থাকে। সৌদি আরবে শরিয়া আইন চালু আছে এবং সেখানে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। আপাতদৃষ্টিতে এ অবস্থাকে কঠোর মনে হলেও এ কথা মানতেই হবে যে এর ফলে নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষিত থাকছে—ভয়ে কেউ চুরি করছে না(এবং হাত হারাচ্ছে না) এবং চুরি না হবার ফলে নাগরিকদের সম্পদও অক্ষত থাকছে।

 

এমনটি মনে হতে পারে যে বিশ্বব্যাপী চুরি-ডাকাতির বর্তমান যে হার তাতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী হাত কাটা আইন চালু হলে লক্ষ লক্ষ লোক দেখা যাবে যাদের হাত কাটা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে -যে মুহুর্তে এই আইন ঘোষণা করা হবে, তার পরের মুহুর্ত থেকেই এ প্রবণতা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কমে আসতে থাকবে। পেশাদার চোরও এ পথে পা ফেলার আগে একবার ভেবে দেখবে ধরা পড়লে তার পরিনতি কী হতে পারে। শাস্তির ভয়াবহতাই চোরের ইচ্ছাকে দমন করার জন্য যথেষ্ট। তখন নিতান্ত দুরাত্মা ও দুর্ভাগা ছাড়া এ কাজ আর কেউ করবে না। সামান্য কয়েকজন লোকের হয়তো হাত কাটা যাবে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষ লাভ করবে নিরাপত্তা, শান্তি এবং সর্বস্ব হারাবার ভয় থেকে মুক্তি। ইসলাম এভাবে ছোট ক্ষতির মাধ্যমে বড় ক্ষতি থেকে সমাজকে রক্ষার ব্যবস্থা করে। প্রকৃত ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে এই ছোট ক্ষতিটিও হবে না অর্থাৎ কেউ চুরিই করবে না।

ইসলামী বিধান এই রকম বাস্তবধর্মী এবং প্রত্যক্ষভাবে ফলদায়ক।

 

এবং আল্লাহ ভালো জানেন।

 

[ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ ড. জাকির আব্দুল করিম নায়েক (হাফিজাহুল্লাহ) ]

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, মায়িদাহ ৫:৩৮-৩৯

[2]  “The hadd punishment for theft - islamqa.info” – islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)

https://islamqa.info/en/9935

[3]  “There is no amputation of the hand except in the case of one who steals something worth one quarter of a dinar or more ” islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)

https://islamqa.info/en/239920

[4]  “Countries With Highest Reported Crime Rates - World Top Ten”  

 http://www.mapsofworld.com/world-top-ten/countries-with-highest-reported-crime-rates.html