শরিয়া আইনে মৃত্যুদণ্ড কি আসলেই 'বর্বর'?

নৈতিকতা বিষয়ক



লিখেছেনঃ আল মাহমুদ খান নিঝু

 

 

নাস্তিক প্রশ্নঃ সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে কেন আপনার চোখে অমানবিক বোধ হয় যখন সেটার নির্দেশ এসেছে আপনার কথিত আল্লাহর কাছ থেকে (Quran 5:45) ? (আসতাগফিরুল্লাহ)
 
উত্তর: আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

 

"আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফ্ফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম।"

(মায়িদাহ ৫ : ৪৫)
 

আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন:

 

""হে বিশ্বাসীরা! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের (বদলা) বিধান দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস, নারীর বদলে নারী কিন্তু (দ্বীনি) ভাইয়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা করা হলে, কিসাসের পরিবর্তে প্রচলিত রক্তপণ প্রথা অনুসরণ করবে এবং সদয়ভাবে তার পাওনা আদায় করতে হবে। এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে লঘু বিধান ও করুণা। সুতরাং এরপর যে কেউ সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। হে বুদ্ধিমানগণ! কেসাসের মধ্যে তোমাদের জন্যে জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।"

(বাক্বারাহ ২ : ১৭৮-১৭৯)

 

২০০৭ সালে একটি মার্কেটে ডাকাতি ও এক মিসরীয় নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করার দায়ে দণ্ডিত হয় ৮ বাংলাদেশি। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ এবং উচ্চতর উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনক্রমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৮ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড গত ৭ অক্টোবর শুক্রবার প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। [1] বাংলাদেশ অনুরোধ জানালেও সৌদি কর্তৃপক্ষ দণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। তারা জানায়, ক্ষমা করার এখতিয়ার একমাত্র নিহতের পরিবারেরই আছে। কিন্তু নিহতের পরিবার জীবনের বিনিময়ে জীবন নিতে অনড় ছিলো। 
 
কোনভাবেই এই মৃত্যুদণ্ডকে অমানবিক বলা যায় না। একটা প্রশ্ন করি, মনে করুন আপনি আর আপনার যুবক ছেলে রাতের বেলা ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত এক সড়ক দিয়ে বেশ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন। এমন সময় ৮ জন ডাকাত মিলে আপনার সর্বস্ব লুট করে নেয় এবং আপনার ছেলে বাধা দিতে গেলে তারা তাকে হত্যা করে এবং চলে যায়। আপনি তাদের বিরুদ্ধে তাহলে কি বিচার চাইবেন? বিকৃত মস্তিষ্ক না হলে ১০০ ভাগ নিশ্চিত যে সবাই তাদের মৃত্যুদণ্ডই চাইবেন।

তাহলে এই ৮ জন কি মহৎ কাজ করলো যে তাদের শিরশ্ছেদ “মধ্যযুগীয় বর্বরতা” বলে গণ্য হবে? স্বজাতি বলে? আইন কি স্বজাতির জন্য পৃথক হতে হবে? সুন্দর দ্বিমুখিতা তো!
 
যারা বলে বেড়াচ্ছে যে শুধু গরীব দেশের লোকজনেরই শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে তাঁদের উচিত পরিসংখ্যান দেখা।


২০০৭ সালে সৌদি আরবে কমপক্ষে ৭৬ বিদেশিসহ মোট ১৫৮ জনের শিরশ্ছেদ করা হয় (৭৬ জন ছাড়া বাকী সব সৌদিয়ান)।
২০০৮ সালে শিরশ্ছেদ শিকার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ১০২। এর মধ্যে প্রায় ৪০ জন বিদেশি (বিদেশী ছাড়া বাকী ৬২ জন সৌদিয়ান)।
২০০৯ সালে ১৯ জন বিদেশিসহ মোট ৬৯ জন (বিদেশী ছাড়া বাকী ৫০ জন সৌদিয়ান) এবং
২০১০ সালে কমপক্ষে ৬ বিদেশিসহ মোট ২৭ জনের শিরশ্ছেদ করা হয় (বিদেশী ৬ জন ছাড়া বাকী ২১ জন সৌদিয়ান)।
 
শরিয়া আইন অনুসারে সৌদি সরকার সুযোগ দিয়েছে যে, যদি নিহতের পরিবার মাফ করে দেয় তাহলে ক্ষমা পেয়ে যাবে। কিন্তু নিহতের পরিবার ক্ষমা করেনি। ইসলামে শরিয়া আইন প্রনিতই হয়েছে যেন অপরাধ সর্বনিম্ন মাত্রায় থাকে বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ভীতিপূর্ণ বাণী মানুষকে অপরাধ থেকে যতটা না দূরে রাখতে সক্ষম ব্যবহারিক আইন তার থেকে অনেক বেশি কার্যকর। প্রকাশ্য শাস্তি দেওয়ার কারণও তাই যেন মানুষ অপরাধ করার আগে দশবার ভাবে। ইসলামী শরিয়া আইনের মত এমন কার্যকর আইন আর কোথায় আছে? এই আইন এতই সূক্ষ্ম ও স্বজনপ্রীতিহীন যে হাদীসে এসেছে, আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ


"মাখযূম গোত্রের এক নারী চুরি করে ধরা পড়লে তার বিষয়টি কুরায়শদেরকে বিচলিত করে তোলে। তারা বলাবলি করলো, বিষয়টি নিয়ে কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এর সাথে কথা বলতে পারে? তারা বলাবলি করলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রিয়পাত্র উসামা বিন যায়েদ ছাড়া আর কেউ এমন দুঃসাহস করতে পারবে না। অতঃপর উসামা (রাঃ) তাঁর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তুমি কি আল্লাহ নির্ধারিত হদ্দের ব্যাপারে সুপারিশ করছো? অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন এবং বলেনঃ হে জনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তীরা এ কারণে ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের মধ্যকার কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিতো এবং কোন দুর্বল অসহায় ব্যক্তি চুরি করলে তাকে শাস্তি দিতো। আল্লাহর শপথ ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করতো, তাহলে অবশ্যই আমি তার হাতও কেটে দিতাম।" [সহীহ বুখারী ২৫৪৭]
 
এখানে মাত্র ৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ইরাক, আফগান সহ বিভিন্ন দেশে কত কিছু হয়, বাংলাদেশের বর্ডারে বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়। এগুলো নিয়ে কি নাস্তিক-মুক্তমনাগণ সোচ্চার হন? আবু গারিব, গুয়ান্তানামো বে এসবের কথা নিয়ে কি তারা ব্লগে লেখেন? নাকি জার্মানীর ভিসালোভীদের সেগুলো নিয়ে লিখতে বারণ? আসলে সৌদি আরবের সাথে "ইসলাম" যুক্ত, তাই সমস্যা তাদের। অথচ সৌদি আরবও পূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র না। সেখানে আংশিক শরিয়া আইন বাস্তবায়ন হয় কেবল।

 

শিরশ্ছেদের প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। মানবসভ্যতায় প্রাচীনকাল থেকেই শিরশ্ছেদ একটি অতি প্রচলিত মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়া। বাইবেলে যোহন বাপ্তাইজক [John The Baptist বা ইয়াহইয়া(আ)] নামক একজন নবীর শিরশ্ছেদে মৃত্যুদণ্ড পাবার কথা উল্লেখ আছে। [2] ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ জাপান, চীনসহ বহু দেশে প্রাচীনকাল থেকেই শিরশ্ছেদে মৃত্যুদণ্ড দেবার পদ্ধতি চলে এসেছে। যদিও তারা বর্তমানে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে না। [3]

যারা সৌদি আরবে শিরশ্ছেদে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে এত প্রশ্ন তুলছেন, তারা কিন্তু আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে প্রচলিত ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেবার প্রক্রিয়াকে ‘বর্বর’ বলেন না। সেই মৃত্যুদণ্ডগুলোকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে মিডীয়াতেও কোন সংবাদ আসে না।

তাদের উদ্যেশ্যে বলব – আচ্ছা বলুন দেখি, কোন পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডে কষ্ট বেশি হয়, ফাঁসীতে নাকি শিরশ্ছেদে? 

ফাঁসীতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনেকক্ষন ধরে তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে বা ঘাড় ভেঙে মারা যান।

আর শিরশ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডে এক মুহূর্তের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি মারা যান। এটি অপেক্ষাকৃত সহজ ও দ্রুত মৃত্যু।

এক দিকে এই মৃত্যুদণ্ডের এই প্রক্রিয়া ফাঁসীর তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত এবং দণ্ডিতের মৃত্যু হয় অতি দ্রুত। অপরদিকে চাক্ষুষভাবে একটি প্রকাশ্য শিরশ্ছেদ পরিদর্শন হাজার হত্যাসংবাদ শ্রবণের চেয়েও অধিক কার্যকরভাবে শিক্ষণীয়। এই দণ্ড স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে মানুষ কখনো আর এ ধরণের কাজ করতে পারবে না। 

লোক দেখানো 'মানবিকতা'র চেয়ে শরিয়া আইনে কার্যকর ব্যবস্থার দিকে জোর দেয়া হয়। অজ্ঞদের তা ভালো লাগুক আর না লাগুক।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  সূত্রঃ “সৌদি আরবে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ” [প্রথম আলো] তারিখ: ০৮-১০-২০১১

http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2011-10-08/news/192145

[2]  বাইবেল, লুক(Luke) ৩:১৯ দ্রষ্টব্য

[3]  Beheading - New World Encyclopedia

http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Beheading