সকল প্রাণীর মানুষের মতো ‘জাতি’ /Community হওয়া সম্পর্কিত কুরআনের তথ্য

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) অসঙ্গতি সংক্রান্ত



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ

পৃথিবীর সকল প্রাণীই কি মানুষের মত একটা সমাজ বা কমুনিটিতে বাস করে (Quran 6:38) ? কুরআন রচয়িতার কি জাগুয়ার (jaguar), লেপার্ড (leopard) বা মাকড়শা (spiders) এদের ব্যাপারে অজানা ছিল ?

 

উত্তরঃ

আল কুরআনে বলা হয়েছে,

 

وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُم ۚ مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ

অর্থঃ

“আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী এবং দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মত এক একটি উম্মত। আমি কিতাবে কোনো ত্রুটি করিনি। অতঃপর তাদেরকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।(বায়ান ফাউন্ডেশন অনুবাদ)

“ভূ-পৃষ্ঠে চলাচলকারী প্রতিটি জীব এবং বায়ুমণ্ডলে ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রতিটি পাখিই তোমাদের ন্যায় এক একটি জাতি, আমি কিতাবে কোনো বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে বাদ রাখিনি। অতঃপর তাদের সকলকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।” (ড. মুজিবুর রহমান অনুবাদ)

 “And there is no creature on [or within] the earth or bird that flies with its wings except [that they are] communities like you. We have not neglected in the Register a thing. Then unto their Lord they will be gathered.” (Saheeh International Translation)

[আল কুরআন, আন’আম ৬ : ৩৮]

 

প্রথমতঃ

আলোচ্য আয়াতে মোটেও এই কথা বলা হয়নি যে “পৃথিবীর সকল প্রাণীই মানুষের মত একটা সমাজ বা কমুনিটিতে বাস করে”। এখানে এ অভিযোগ উত্থাপনকারীরা নিজে থেকে এই কথাটি বানিয়ে কুরআনের নামে চালিয়েছে।

 

দ্বিতীয়তঃ

অভিযোগ উত্থাপনকারীরা এখানে আয়াতের অর্থ একদমই বুঝতে পারেনি। আলোচ্য আয়াতে সব প্রাণীকে “তোমাদের (মানুষ) ন্যায় এক একটি জাতি / উম্মত” বলতে কী বোঝানো হয়েছে এ প্রসঙ্গে তাফসির আহসানুল বায়ানে বলা হয়েছে-

 

অর্থাৎ এদেরকেও মহান আল্লাহ ঐভাবেই সৃষ্টি করেছেন, যেভাবে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপ তাদেরকেও তিনি রুযী দেন, যেরূপ তোমাদেরকে রুযী দেন এবং তোমাদের মত তারাও তাঁর শক্তি ও জ্ঞানের আওতাভুক্ত। [1]

 

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির ইবন কাসিরে উল্লেখ করা হয়েছে,

 

মুজাহিদ(র.) বলেনঃ আল্লাহ বলেছেন, এমন বহু প্রজাতি আছে যা তোমাদের নিকট পরিচিত।

কাতাদা(র.) বলেনঃ পাখিও উম্মত, মানুষও উম্মত এবং জিনও উম্মত।

সুদ্দী(র.) বলেন إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُم (তোমাদের ন্যায় এক একটি জাতি) অর্থাৎ এই ধরনের উম্মত সকল প্রত্যেকেই তোমাদের মত সৃষ্ট জীব।  

আলোচ্য আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে  “আমি কিতাবে কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে বাদ রাখিনি।”

অর্থাৎ, প্রত্যেকটি জীব সম্পর্কে আল্লাহ সচেতন। পানিতে হোক বা ডাঙায় হোক, প্রত্যেকের জন্য তিনি রিযিকের বন্দোবস্ত করে থাকেন। কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ

“আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল। সব কিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে।” (সুরা হুদ ১১ : ৬)

অন্যত্র তিনি আরো বলেছেনঃ

" আর এমন কত জীব-জন্তু রয়েছে, যারা নিজদের রিযিক নিজেরা সঞ্চয় করে না, আল্লাহই তাদের রিযিক দেন এবং তোমাদেরও। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী " (সুরা আনকাবুত ২৯ : ৬০) [2]

 

 

আলোচ্য আয়াতে মোটেও এটা বলা হয়নি যে সব প্রাণী একটা সমাজ বা কমিউনিটির মধ্যে বসবাস করে। বরং আয়াতে যা বলা হয়েছে সকল প্রাণীকেই আল্লাহ ‘উম্মত’ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এরাও মানুষের মতোই সৃষ্ট জীব। যাদের সবার কথা তাঁর নিকট এক কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। মানুষের মতো এদেরকেও আল্লাহ রিযিক দেন এবং এরা সবাই আল্লাহর আওতার মধ্যেই আছে। এবং এদের সবাইকেই (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সামনে সমবেত করা হবে। এখানে এই কথাটিই উদ্যেশ্য। এই প্রাণীকুল সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে নাকি একাকী বসবাস করে এখানে মোটেও তা উদ্যেশ্য নয়। জাগুয়ার, চিতাবাঘ বা কোনো কোনো প্রজাতির মাকড়শা দলবদ্ধভাবে বসবাস না করলেও এটা এই আয়াতের তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পৃথিবীতে এরা দলবিহীনভাবে বাস করলেও এই প্রাণীগুলোকে আল্লাহ ‘উম্মত’ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। পশু একটি উম্মত, পোকামাকড়ও একটি উম্মত। পৃথিবীতে হয়তো এদের অনেকে দলবদ্ধ হয়ে বাস করে না, কিন্তু এদের সকল সদস্য একটি উম্মত বা জাতি হিসেবে গণ্য। যেমনটি উপরের তাফসিরে আমরা দেখেছি, তাবিঈ কাতাদা(র.) বলেছেন, “পাখিও উম্মত, মানুষও উম্মত এবং জিনও উম্মত।” এই ‘উম্মত’ হিসেবেই এদের কথা লিপিবদ্ধ আছে এবং এভাবেই এরা কিয়ামতের দিন সমবেত হবে। আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির আবু বকর যাকারিয়াতে বলা হয়েছে,

 

এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কিয়ামতের দিন মানুষের সাথে সর্বপ্রকার জানোয়ারকেও জীবিত করা হবে। আবু হুরাইরা(রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ() বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তোমরা সব হক আদায় করবে, এমনকি (আল্লাহ তা'আলা এমন সুবিচার করবেন যে,) কোনো শিং বিশিষ্ট জন্তু কোন শিংবিহীন জন্তুকে দুনিয়াতে আঘাত করে থাকলে এ দিনে তার প্রতিশোধ তার কাছ থেকে নেয়া হবে। [মুসনাদ আহমাদ ২/৩৬২] এমনিভাবে অন্যান্য জন্তুর পারস্পরিক নির্যাতনের প্রতিশোধও নেয়া হবে। [মুসনাদ আহমাদ ২/৩৬২] [3]

 

মূলত কুরআন ও হাদিসের পরিভাষায় জাতি, উম্মত এই কথাগুলোর অর্থ সম্পর্কে ধারণা থাকলে মোটেও এ ব্যাপারে কারো প্রশ্ন বা সংশয় সৃষ্টি হবার সুযোগ নেই। এমনকি, যদি এমনও হতো যে, একটি প্রজাতির কেবলমাত্র একটি সদস্য রয়েছে এবং সেটি পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী বসবাস করে – তবুও কুরআন-হাদিসের পরিভাষা অনুযায়ী আলোচ্য আয়াতের তথ্য ভুল হতো না।

কিভাবে?

 

কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মানুষ এবং প্রাণীকুলকে বিভিন্ন উম্মত বা জাতিতে বিন্যাস্ত করে সমবেত করা হবে। অনেক উম্মতের মধ্যে প্রচুর সদস্য থাকবে, আবার কোনো কোনো উম্মত ১ জন সদস্য দ্বারাও গঠিত হতে পারে। একাধিক সহীহ হাদিসে এ ব্যাপারে আলোচনা রয়েছে। যেমন, প্রাচীন আরবের যায়দ ইবন আমর(র.) জাহেলী যুগে পৌত্তলিকতা, ইহুদি বা খ্রিষ্ট কোনো প্রকারের ধর্ম অনুসরণ না করে একাই ইব্রাহিম(আ.) এর একত্ববাদী ধর্মের অনুসরণ করছিলেন। এ জন্য তিনি একাই একটি উম্মত হিসাবে পরিগণিত হবেন। সবার থেকে আলাদা হয়েও তিনি একটি ‘উম্মত’।  রাসুলুল্লাহ(ﷺ) যায়দ ইবন আমর(র.) এর ব্যাপারে বলেছেন, তাঁকে স্বতন্ত্র একটি উম্মত হিসেবে কিয়ামতের ময়দানে উঠানো হবে।” [4]

এই হাদিস আমরা দেখলাম যে যায়দ ইবন আমর(র.) একজনই একটি ‘উম্মত’।

 

আমরা এ সংক্রান্ত আরো একটি হাদিস দেখতে পারিঃ

 

فالأول عن ابن عباس رضي الله عنهما قال‏:‏ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ‏:‏ عرضت علي الأمم، فرأيت النبي ومعه الرهيط، والنبي ومعه الرجل والرجلان، والنبي وليس معه أحد

অর্থঃ ইবনু আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল() বলেন, ‘‘আমার কাছে সকল উম্মত পেশ করা হল। আমি দেখলাম, কো্নো নবীর সাথে কতিপয় (৩ থেকে ৭ জন অনুসারী) লোক রয়েছে। কোনো নবীর সাথে এক অথবা দুইজন লোক রয়েছে। কোনো নবীকে দেখলাম তাঁর সাথে কেউ নেই।…” [5]

 

এ হাদিসে আমরা দেখলাম যে, রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর নিকট কিয়ামতের ময়দানে সকল উম্মতকে দেখানো হয়েছিলো। এই উম্মতগুলোর মাঝে তিনি কোনো নবীকে দেখেছিলেন যাঁর সাথে কেউ ছিলো না। এক্ষেত্রে সেই উম্মত বা জাতির সদস্য হচ্ছেন সেই নবী একাই।

 

বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে আমরা দেখলাম যে জাতি বা উম্মত কথাটি কিভাবে ব্যবহৃত হয়। আমরা দেখলাম যে একজন বিচ্ছিন্ন সদস্য দ্বারাও এই উম্মত গঠিত হতে পারে। পৃথিবীর যে কোনো প্রাণীর কথাই আল্লাহর নিকট লেখা আছে, তারা মানুষের মতোই ‘উম্মত’, তাদের সকল সদস্য নিয়ে এই ‘উম্মত’ গঠিত এবং এ হিসাবেই কিয়ামতের দিন তাদেরকে আল্লাহর সামনে সমবেত করা হবে। তারা সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করুক বা একাকী – বসবাস করুক এটি মোটেও এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়। মূলত আয়াতের অর্থ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা করে এখানে কুরআন থেকে ‘ভুল’ (!) বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং বরাবরের মতোই এই চেষ্টাটিও ব্যর্থ হয়েছে।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] তাফসির আহসানুল বায়ান – সালাহুদ্দীন ইউসুফ; সুরা আন’আমের ৩৮ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ২৩১

[2] তাফসির ইবন কাসির, ৩য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ); সুরা আন’আমের ৩৮ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ৭৫৫

[3] কুরআনুল কারীম (বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির) – ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ১ম খণ্ড, সুরা আন’আমের ৩৮ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ৬৪১

[4]সীরাতুননবী(সা) – ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) পৃষ্ঠা ২০৭

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইবন কাসির, ২য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) পৃষ্ঠা ৪৪৮

মুসতাদরাক আল হাকিম, হাদিস নং : ৪৯৫৬; শায়খ যুবায়র আলী জাঈ(র.) এর মতে হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। ইমাম হাকিম(র.) এর মতে হাদিসটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বিশুদ্ধ এবং ইমাম যাহাবী(র.) তাঁকে সমর্থন করেছেন। দেখুনঃ ফাদ্বায়িলুস সাহাবা, পৃষ্ঠা ৭৬

সূত্রঃ https://www.systemoflife.com/a-monotheist-at-the-time-of-jahiliyyah-zaid-ibn-amr/

[5] সহীহ বুখারী ৫৭০৫, ৩৪১০, ৫৭৫২, ৬৪৭২, ৬৫৪১, ২২০; তিরমিযী ২৪৪৬; মুসনাদ আহমাদ ২৪৪৪; রিয়াদুস সলিহীন ৭৫