সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) কি আসলেই ৩টি সুরাকে কুরআনের অংশ বলে মানতেন না?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে খ্রিষ্টান মিশনারী, নাস্তিক-মুক্তমনা ও ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদরা যেসব অভিযোগ করে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর মুসহাফে(লিপিবদ্ধ পূর্ণ কুরআন) ১১১টি সুরা ছিল। তিনি সুরার প্রচলিত কুরআনের ৩টি সুরা অন্তর্ভুক্ত করেননি। অতএব আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা)এই ৩টি সুরাকে কুরআনের অংশ হিসাবে মানতেন না এবং তাঁর কুরআন ছিল উসমান(রা) কর্তৃক সংকলিত কুরআন তথা বর্তমানে প্রচলিত কুরআন থেকে ভিন্ন!!! ---এই হচ্ছে তাদের অভিযোগ।
এই lলেখায় ইসলামবিদ্বেষীদের দাবির পোস্টমর্টেম করে তাদের ভ্রান্ত অভিযোগের স্বরূপ উন্মোচন করা হবে ইন শা আল্লাহ।
 
জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র)এর উলুমুল কুরআন সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল ইতকান’ এ একটি রেওয়ায়েত আছে যাতে বলা হয়েছে যে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর মুসহাফে তিনটি সুরা ছিল না। যথাঃ সুরা ফাতিহা ও মুয়াওয়িযাতাইন(সুরা ফালাক ও সুরা নাস) অর্থাৎ ১,১১৩ ও ১১৪নং সুরা। [১]
এই লেখায় প্রকৃত সত্য উন্মোচনের জন্য সুরা ফাতিহা ও মুয়াওয়িযাতাইন(সুরা ফালাক ও নাস) এর ব্যাপারে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর অবস্থান পৃথক পৃথকভাবে দলিল-প্রমাণসহ আলোচনা করা হবে।
 

সুরা ফাতিহার ব্যাপারে ইবন মাসউদ(রা) এর অবস্থানঃ

‘ফাতিহা’ মানে হচ্ছে সূচনা, ভূমিকা কিংবা সূত্রপাত করা।এর পুরো নাম “ফাতিহাতুল কিতাব” বা কিতাবের(অর্থাৎ কুরআনের) সূচনা।সুরা ফাতিহার বিষয়টি এমন যে এই সুরার অস্তিত্বের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর সন্দেহের দূরতম সম্ভাবনাও নেই। প্রতিদিনের ৫ ওয়াক্ত সলাতের প্রত্যেক রাকাতেই এই সুরাটি আবশ্যকীয়ভাবে পড়তে হয়।সলাত(নামাজ) আদায়কারী মুসলিমমাত্রই একে আল কুরআনের অংশ হিসাবে জানেন।
সুরা ফাতিহার অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিচ্ছে স্বয়ং কুরআনঃ
وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا مِنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنَ الْعَظِيمَ
“ আমি তোমাকে[মুহাম্মাদ(স)] সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কুরআন দিয়েছি।”
(কুরআন, হিজর ১৫:৮৭)
এখানে ‘সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত’ দ্বারা সুরা ফাতিহাকে নির্দেশ করা হচ্ছে।
 
ইবন জারির তাবারী(র)কে উদ্ধৃত করে জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র)নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি বর্ণণা করেনঃ
عن ابن مسعود في قوله: {ولقد آتيناك سبعا من المثاني} قال: فاتحة الكتاب
ইবন মাসউদ(রা) থেকে আল্লাহর বাণীর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, “ আমি তোমাকে[মুহাম্মাদ(স)] সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কুরআন দিয়েছি।” তিনি বলেনঃ এ হচ্ছে ফাতিহাতুল কিতাব(সুরা ফাতিহা)। [২]
 
এখানে দেখা যাচ্ছে যে স্বয়ং আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) কুরআনের আয়াত হিসাবে সুরা ফাতিহার কথা কুরআন থেকে বর্ণণা করছেন।এই বিবরণ থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) সুরা ফাতিহাকে কুরআনের অংশ বলে বিশ্বাস করতেন, ঠিক যেভাবে অন্য সকল মুসলিম বিশ্বাস করত।
 

ইবন মাসউদ(রা) কেন সুরা ফাতিহাকে তাঁর মুসহাফে অন্তর্ভুক্ত করলেন না? :

ইবন মাসউদ(রা) যদি সুরা ফাতিহাকে কুরআনের অংশ বলেই বিশ্বাস করতেন, তাহলে কেন তিনি একে তাঁর মুসহাফে অন্তর্ভুক্ত করলেন না? তাঁর নিজ বক্তব্যেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।
আবু বকর আল আনবারী(মৃত্যু ৩০৪ হিজরী) উল্লেখ করেছেন, বর্ণিত আছে যে--
قيل لعبد الله بن مسعود: لم لم تكتب فاتحة الكتاب في مصحفك؟ قال: لو كتبتها لكتبتها مع كل سورة. قال أبو بكر: يعني أن كل ركعة سبيلها أن تفتتح بأم القرآن قبل السورة المتلوة بعدها، فقال: اختصرت بإسقاطها، ووثقت بحفظ المسلمين لها
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কেন তিনি সুরা ফাতিহাকে তাঁর মুসহাফে উল্লেখ করেননি।তিনি জবাবে বলেছিলেন, “যদি লিপিবদ্ধ করতামই, তাহলে আমি একে প্রত্যেক সুরার আগে লিপিবদ্ধ করতাম।”
আবু বকর আল আনবারী এই কথার ব্যাখ্যায় বলেন, প্রত্যেক রাকাত(নামাজে) শুরু হয় সুরা ফাতিহার দ্বারা এবং এর পরে অন্য সুরা তিলাওয়াত করা হয়।ইবন মাসউদ(রা) এর বক্তব্য ছিল ঠিক এই বক্তব্যের ন্যায়ঃ “আমি সংক্ষিপ্ততার জন্য একে বাদ দিয়েছি এবং মুসলিমদের দ্বারা এর সংরক্ষণের ব্যাপারে আস্থা রাখছি।” [৩]
 
এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, কোন একটি অংশ মুসহাফে উল্লেখ না করার অর্থ এই নয় যে এটিকে তিনি কুরআনের অংশ বলে মনে করেন না।এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যা পাঠকদের মনে রাখবার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
 

মুয়াওয়িযাতাইন(সুরা ফালাক ও নাস) এর ব্যাপারে ইবন মাসউদ(রা) এর অবস্থানঃ

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) যে সুরা ফালাক ও সুরা নাসকে কুরআনের অংশ বলে বিশ্বাস করতেন—এই কথার পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে।
 
১।স্বয়ং ইবন মাসউদ(রা) থেকে মুয়াওয়িযাতাইন এর বিবরণঃ
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে সুরা ফালাক ও সুরা নাস এর মর্যাদার বর্ণণা পাওয়া যায়।
عن ابن مسعود قال: استكثروا من السورتين يبلغكم الله بهما في الآخرة المعوذتين
 
ইবন মাসউদ(রা) থেকে বর্ণিতঃ “দুইটি সুরা বেশি করে পড়ো, আল্লাহ এর জন্য আখিরাতে তোমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন।আর তারা হচ্ছেঃ আল মুয়াওয়িযাতাইন(সুরা ফালাক ও সুরা নাস)।” [৪]
এটা কী করে সম্ভব হতে পারে যে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) সুরা ফালাক ও সুরা নাসের মর্যাদা বর্ণণা করবেন, অথচ এই সুরাদ্বয়কে কুরআনের অংশ বলে মনে করবেন না তথা এদের অস্তিত্ব অস্বীকার করবেন? সুবহানাল্লাহ; ইসলামবিরোধীদের অভিযোগের অসারতা এই রেওয়ায়েতের দ্বারা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
 
২। ইবন মাসউদ(রা) থেকে বর্ণিত সকল কিরাতে মুয়াওয়িযাতাইন এর উপস্থিতিঃ
প্রাচীন যুগ থেকেই কুরআন সংরক্ষণের প্রধানতম মাধ্যম ছিল হাফিজগণের স্মৃতি। আল্লাহ তা’আলা প্রিয় নবী (ﷺ)কে বলেনঃ
وأنزلت عليك كتابا لا يغسله الماء
“আমি তোমার উপর কিতাব নাজিল করেছি যা পানি দ্বারা ধুয়ে যাওয়া সম্ভব নয়” [৫]
{{ পানি দ্বারা সেই জিনিস ধুয়ে যাওয়া সম্ভব যা কাগজের উপর কালি দ্বারা লেখা হয়। যা স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে, তার পক্ষে ধুয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।}}
মুসলিম কিরাত বিশেষজ্ঞগণ সবসময়েই কুরআনকে অবিচ্ছিন্ন বর্ণণাক্রম দ্বারা হিফাজত করেছেন যা স্বয়ং রাসুল(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে।মুতাওয়াতির কিরাতগুলো কুরআনের সংরক্ষিত থাকবার একটি বড় প্রমাণ।
 
সকল মুতাওয়াতির কিরাতের মধ্যেই সুরা ফালাক ও সুরা নাস বিদ্যমান(এবং অবশ্যই সুরা ফাতিহাও সেগুলোতে রয়েছে।)।এই কিরাতগুলোর মধ্যে চারটি কিরাত রয়েছে, যেগুলোর বর্ণণাক্রম আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে রাসুল(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নিম্নে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে বর্ণণাকৃত কিরাতগুলোর ব্যাপারে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হল।
 
ক) আসিম এর কিরাতঃ এর বর্ণণাক্রম যির থেকে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে মুহাম্মাদ(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
উল্লেখ্য যে, উক্ত আসিম(মৃত্যু ১২৮ হিজরী) এবং যির(মৃত্যু ৮৩ হিজরী) মুসনাদ আহমাদ এর বর্ণণাকারীদের অন্তর্ভুক্ত।এই বর্ণণাকারীগণ থেকে এমন বিবরণ পাওয়া যায় যাতে বলা হয়েছে যে ইবন মাসউদ(রা) তাঁর মুসহাফে সুইটি সুরা(ফালাক ও নাস) উল্লেখ করেননি। অথচ তাঁদের থেকেই আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর সূত্রে যে কিরাত বর্ণিত হয়েছে, তাতে সুরা ফালাক ও সুরা নাস বিদ্যমান, আলহামদুলিল্লাহ।অতএব স্বয়ং বর্ণণাকারীগণ থেকে প্রমাণিত হল যে, মুসহাফে উল্লেখ না করলেও আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এই সুরাদ্বয়কে কুরআনের অংশ হিসাবে তিলাওয়াত করতেন। [৬]
খ) হামজা এর কিরাতঃ এর বর্ণণাক্রম আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা)এর সূত্রে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। [৭]
গ)আল কিসাই এর কিরাতঃ এর বর্ণণাক্রমও আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে মুহাম্মাদ(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। [৮]
ঘ) খালাফ এর কিরাতঃ এর বর্ণণাক্রমও আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) থেকে মুহাম্মাদ(ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। [৯]
এই মুতাওয়াতির কিরাতগুলোর বর্ণাক্রমের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) রয়েছেন এবং কিরাতগুলোর প্রত্যেকটিতে সুরা ফাতিহা, সুরা ফালাক ও সুরা নাস রয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।এর ফলে সামান্যতম সন্দেহেরও আর অবকাশ রইলো না যেঃ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) সুরা ফাতিহা, সুরা ফালাক ও সুরা নাসকে আল কুরআনের অংশ হিসাবে তিলাওয়াত করতেন।
 

কিছু বিপরীত বর্ণণা সম্পর্কে আলোচনাঃ

এবার আমরা কিছু রেওয়ায়েতের পর্যালোচনা করব যেগুলো ব্যবহার করে ইসলামবিরোধিরা অপপ্রচার চালায়।
 
বর্ণণা ১:
আবদাহ এবং আসিম যির থেকে বর্ণণা করেছেন, তিনি বলেনঃ
قلت لأبي: إن أخاك يحكهما من المصحف، قيل لسفيان: ابن مسعود؟ فلم ينكر
“আমি উবাই(রা)কে বলেছি, “আপনার ভাই ইবন মাসউদ(রা) সেগুলোকে(সুরা ফালাক ও নাস) তাঁর মুসহাফ থেকে মুছে ফেলেছেন”, এবং তিনি এতে কোন আপত্তি করলেন না।” [১০]
 
বিভ্রান্তি অপনোদনঃ
আমরা এই বর্ণণাটিতে দেখছি যে, ইবন মাসউদ(রা) সুরাগুলো মুছে ফেলেছেন শুনেও কুরআনের আলিম সাহাবী উবাই বিন কা’ব(রা) কোন আপত্তি বা প্রতিবাদ করছেন না।অথচ ইসলামের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আকিদা হচ্ছেঃ কেউ যদি কুরআনের একটি আয়াতও অস্বীকার করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং কাফির হিসাবে পরিগণিত হয়।অতএব ইবন মাসউদ(রা) যদি আসলেই সুরাদ্বয়কে কুরআনের অংশ হিসাবে মানতে অস্বীকার করতেন, তাহলে উবাই(রা) অবশ্যই কোন না কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন। অথচ তিনি তেমন কিছুই করেননি।এ থেকে সুপষ্টভাবে প্রতিভাত হচ্ছে যেঃ উবাই(রা) এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে ইবন মাসউদ(রা) উক্ত সুরাদ্বয়কে কুরআনের অংশ হিসাবে মানতে অস্বীকার করছেন না। শুধুমাত্র নিজ মুসহাফে উল্লেখ করেননিমাত্র।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছেঃ যে আসিম ও যির এই রেওয়ায়েতের বর্ণণাকারী, তাঁরা স্বয়ং আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর সূত্রে বর্ণিত কিরাত থেকে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করেছেন।
 
বর্ণণা ২:
عن عبد الرحمن بن يزيد، قال: كان عبد الله، ” يحك المعوذتين من مصاحفه، ويقول: إنهما ليستا من كتاب الله “
আব্দুর রহমান বিন ইয়াজিদ বর্ণণা করেছেনঃ ইবন মাসউদ(রা) মুয়াওয়িযাতাইন(সুরা ফালাক ও সুরা নাস)কে তাঁর মুসহাফ থেকে মুছে ফেলেছেন এবং বলেছেন এগুলো কুরআনের অংশ নয়। [১১]
একই বিবরণ ইমাম তাবারানী(র) এর মু’জামুল কাবিরেও এসেছে। [১২]
 
বিভ্রান্তি অপনোদনঃ
এই বর্ণণাটি সত্য হতে পারে না কেননা এটি একটি শাজ বা বিচ্ছিন্ন বর্ণনা যা শুধুমাত্র আব্দুর রহমান বিন ইয়াজিদ বর্ণণা করেছেন।হাদিস শাস্ত্রে মুতাওয়াতিরের বিপরীতে বিচ্ছিন্ন বর্ণণা দ্বারা কোন বিষয় প্রমাণিত হয় না।এমনকি ঐ বর্ণণার সনদ সহীহ হলেও।এক্ষেত্রে একে মু’আল্লাল বা ত্রুটিপূর্ণ বর্ণণা বলে। [১৩]
 

বিপরীত বর্ণণাগুলো সম্পর্কে উলামাগণের অভিমতঃ

ইমাম নববী(র) বলেনঃ
أجمع المسلمون على أن المعوذتين والفاتحة من القرآن وأن من جحد منها شيئا كفر وما نقل عن ابن مسعود باطل ليس بصحيح.
“এ ব্যাপারে মুসলিমগণের ইজমা রয়েছে যে মুয়াওয়িযাতাইন ও সুরা ফাতিহা কুরআনের অংশ এবং যে তা অস্বীকার করে সে কাফির হয়ে যায়।আর এ ব্যাপারে ইবন মাসউদ(রা) থেকে যা বর্ণিত আছে তা মিথ্যা এবং সহীহ নয়।”
[১৪]
আবু হাফস ইবন আদিল আল হাম্বালী(র) লিখেছেনঃ
هذا المذهب عن ابن مسعود نقل كاذب باطل
“ইবন মাসউদ(রা) এর থেকে বর্ণিত এই অভিমতটি মিথ্যা ও বানোয়াট।” [১৫]
আল খিফাজী(র) বলেনঃ
وما نقل عن ابن مسعود رضي الله عنه من أنّ الفاتحة والمعوّذتين ليست من القرآن لا أصل له
“আর, ইবন মাসউদ(রা) থেকে সুরা ফাতিহা ও মুয়াওয়িযাতাইন কুরআনের অংশ নয় মর্মে যা বর্ণিত হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই।” [১৬]
এছাড়া ইমাম ইবন হাজম(র) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। [১৭]
ইমাম সুয়ুতি(র) আবু বকর আল বাকিলানী(র) থেকে উদ্ধৃত করেছেনঃ
لم يصح عنه أنها ليست من القرآن ولا حفظ عنه. إنما حكها وأسقطها من مصحفه إنكارا لكتابتها لا جحدا لكونها قرآنا لأنه كانت السنة عنده ألا يكتب في المصحف إلا ما أمر النبي صلى الله عليه وسلم بإثباته فيه ولم يجده كتب ذلك ولا سمعه أمر به.
“এটি মোটেও তাঁর{ইবন মাসউদ(রা)} থেকে প্রমাণিত নয় যে এই সুরাদ্বয় কুরআনের অংশ নয়।কুরআনের অংশ হিসাবে অস্বীকার করে তিনি এই সুরাদ্বয়কে তাঁর মুসহাফ থেকে মোছেননি বা বাদ দেননি।তাঁর নিকট বিষয়টি এরূপ ছিল যে, তিনি নবী(ﷺ) এর নির্দেশ ব্যতিত কিছুই মুসহাফে লিখতেন না।এবং তিনি এ ব্যাপারে কিছু লিখিত পাননি বা এ ব্যাপারে কোন নির্দেশ শোনেননি। ” [১৮]
 
অতএব, উপরিউক্ত আলোচনা ও দলিল-প্রমাণ দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হল যেঃ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ(রা) এর বিরুদ্ধে ৩টি সুরাকে(ফাতিহা, ফালাক ও নাস) কুরআনের অংশ হিসাবে না মানার যে অভিযোগ তোলা হয় তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত এবং এই সম্মানিত সাহাবী অন্য সকল মুসলিমের ন্যায় একই কুরআন পাঠ করতেন।সেই সাথে উসমান(রা) কর্তৃক সংকলিত কুরআনের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষীদের অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হল।
এবং আল্লাহ ভালো জানেন।
 

 

 

তথ্যসূত্রঃ
[১] আস সুয়ুতি, আল ইতকান ফি উলুমিল কুরআন,(কায়রোঃ আল হাইয়া আল মিসরিয়্যাহ, ১৯৭৪) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭
[২] আস সুয়ুতি, দুরর মানসুর ফি তাফসির বিল মাসুর, (বৈরুতঃ দারুল ফিকর) খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৯৪
[৩] কুরতুবী, জামি লি আহকাম আল কুরআন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৫(কায়রোঃ দারুল কুতুব আল মিসরিয়্যাহ, ১৯৬৪)
[৪] আলী আল মুত্তাকী, কানজুল উম্মাল, (বৈরুতঃ আর রিসালাহ পাবলিকেশন্স, ১৯৮১) হাদিস নং ২৭৪৩
[৫] মুসলিম, আস সহীহ, (রিয়াদঃ মাকতাবা দারুস সালাম, ২০০৭) হাদিস ৭২০৭
[৬] আল জাযরী, আন নাশর ফি কিরাআত আল ‘আশার, (কায়রোঃ মাকতাবা আত তিজারিয়াহ আল কুবরা) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৫
[৭] প্রাগুক্ত; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৫
[৮] প্রাগুক্ত; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭২
[৯] প্রাগুক্ত; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৫
[১০] আহমাদ বিন হাম্বাল, আল মুসনাদ, (বৈরুতঃ আর রিসালাহ পাবলিকেশনস, ২০০১) হাদিস নং ২১১৮৯
[১১] আহমাদ বিন হাম্বাল, আল মুসনাদ, হাদিস নং ২১১৮৮
[১২] আত তাবারানী, মু’জামুল কাবির, (কায়রোঃ মাকতাবা ইবন তাইমিয়া, ১৯৯৪) হাদিস নং ৯১৫০
[১৩] মু’আল্লাল বা ত্রুটিপূর্ণ বর্ণণার ব্যাপারে জানতে দেখতে পারেনঃ Ibn as-Salah, An Introduction to the Science of Hadith, Translated by Dr. Eerik Dickinson (Berkshire: Garnet Publishing Ltd., 2006) page 57 & 67
[১৪] আস সুয়ুতি, আল ইতকান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭১
[১৫] ইবন আদিল আল হাম্বালী, আল বাব ফি উলুমুল কিতাব, (বৈরুতঃ দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৮) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৯
[১৬] আল খিফাজী, ইনায়া আল কাযি ওয়া কিফায়া আর রাজি ‘আলা তাফসিরুল বাইযাওয়ি, (বৈরুত, দারুস সদর) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯
[১৭] ইবন হাজম, আল মুহাল্লা(বৈরুতঃ দারুল ফিকর) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২
[১৮] আস সুয়ুতি, আল ইতকান, (কায়রো: হাইয়া আল মিসরিয়্যাহ, ১৯৭৪) খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭১
 
সহায়ক ওয়েবসাইটঃ
http://www.icraa.org/
http://www.letmeturnthetables.blogspot.com/