হাদিসে কি নারীদেরকে ভোগ্যপণ্য বলা হয়েছে?

নারী



 

নাস্তিকদের দাবিঃ

“নারীকে ভোগ্যপণ্য বলেছেন নবী। নবী মুহাম্মদ বলেছেন, নারী হচ্ছে একটি উপভোগ্য উপকরণ বা ভোগ্য পণ্য। নারীর সৃষ্টি যদি পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য হয়ে থাকে, তা অবশ্যই নারীকে একটি স্বাধীন এবং স্বাভাবিক সত্ত্বা হিসেবে চিহ্নিত করে না, বরঞ্চ পুরুষের জন্য একটি উপভোগ্য বস্তু হিসেবে নির্দেশ করে, একটি যৌনযন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে।”

 

জবাবঃ

ইসলামবিরোধীরা একটি হাদিস দেখিয়ে দাবি করে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) নাকি নারীদেরকে ভোগ্যপণ্য বলতেন! হাদিসটি হচ্ছে,

 

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ‏"‏

অর্থঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ অনুবাদ] [1]

 

নাস্তিকদের বিভিন্ন ব্লগে ও ফেসবুক লাইভে এই হাদিস উল্লেখ করে লাগাতার এই দাবি করা হয়ঃ ইসলামে নারী শুধু ‘ভোগ্যপণ্য’, ইসলামে নারী শুধুমাত্র পুরুষের ‘যৌনযন্ত্র’ (নাউযুবিল্লাহ)।

তাদের এহেন দাবির জবাবে আমরা যা বলবোঃ

 

প্রথমতঃ

হাদিসের সরল অনুবাদেই এটা দেখা যাচ্ছে যে এখানে পুণ্যবতী নারীকে উত্তম বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছেঃ “দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী”। অর্থাৎ এই অনুবাদ থেকেও এটি বোঝা যাচ্ছে যে এখানে নারীর পুণ্যময়তাকে তথা নারীর গুণকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নারীকে শুধুই “ভোগ্যবস্তু” বা “যৌনযন্ত্র” বলা যদি হাদিসের উদ্যেশ্য হতো, তাহলে নারীর গুণকে মূল্যায়ন করা হতো না। বরং নারীর শারিরীক সৌন্দর্য বা এই জাতীয় বিষয়াদীর দিকে ইঙ্গিত করা হতো। তা না করে এখানে নারীর পুণ্যময়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই হাদিস থেকে নারীকে পুরুষের ‘যৌনযন্ত্র’ বোঝানো হয়েছে - এমন ব্যাখ্যার জন্য অনেক বড় মাপের কল্পনাবিলাসী হওয়া প্রয়োজন। স্বাভাবিক মানুষ এমন বাজে কল্পনা করে না। তবে নাস্তিক-মুক্তমনাদের থেকে এমন কল্পনা আসা অস্বাভাবিক কিছু নয় বৈকি!

 

দ্বিতীয়তঃ

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে অনূদিত মুসলিম শরীফে আলোচ্য হাদিসে مَتَاعٌ (মাতা’) শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে ‘উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য)’। مَتَاعٌ (মাতা’) শব্দ দ্বারা কী বোঝানো হয় তা আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম কুরতুবী(র.) বলেছেন,

 

وكل منافع الدنيا متاع . قال أبو جعفر النحاس : وهذا شرح حسن من قول إمام من أئمة المسلمين ، وهو موافق للغة . والمتاع في كلام العرب : المنفعة ؛ ومنه أمتع الله بك . ومنه فمتعوهن .

অর্থঃ পৃথিবীতে উপকারী যে কোনো কিছুই ‘মাতা’ (متاع)আবু জাফর নাহহাস [প্রখ্যাত মিসরীয় ব্যাকরণবিদ] বলেছেন, এটিই মুসলিম উম্মাহর ইমামদের মধ্য থেকে একজন ইমাম প্রদত্ত উত্তম ব্যাখ্যা। এটিই (আরবি) ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরবিভাষীদের কথামালায় ‘মাতা’ (متاع) এর মানে হলোঃ “উপকারী জিনিস”উদাহরণঃ “আল্লাহ তোমাকে উপকৃত/সুখী করুন।” আরো একটি উদাহরণঃ “তোমরা তাদের উপকার করো [2]

 

আমরা আরবি ভাষায় শব্দটির ব্যবহার দেখলাম। যা থেকে উপকার লাভ করা যায়, আরবি ভাষায় সেটিই হচ্ছে مَتَاعٌ (মাতা’)। হাদিসে বোঝানো হয়েছেঃ একজন পুণ্যবতী নারী হচ্ছেন এমন একজন যার থেকে পৃথিবীতে সব থেকে বেশি উপকার লাভ করা যায়।

 

তৃতীয়তঃ

হাদিসে পুরো পৃথিবীকেই মাতা’ (متاع) বলা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর সব কিছুই এর মাঝে শামিল। [3] হাদিসের মাকসাদ যদি এমনই হতো যে নারীকে আলাদা করে একটা 'ভোগ্যপণ্য' বলা হবে, তাহলে পুরো দুনিয়ার (الدنيا) কথা বলা হতো না। এখানে হাদিসে পুরো পৃথিবীকেই উপকারের আধার (الدنيا متاع) বলা হয়েছে আর এর মাঝে সব থেকে উপকারী হচ্ছে পুণ্যবতী নারী, সে কথাটি বোঝানো হচ্ছে। এ হাদিসটিতে মোটেও নারীজাতিকে তুচ্ছ করার উদ্যেশ্য নেই বরং পূণ্যবতী নারীর গুণকেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যে হাদিসে নারীজাতির গুণকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেই হাদিসকে উল্টো নারীর প্রতি অবমাননাকর বলে উল্লেখ করে নাস্তিক-মুক্তমনারা। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগগুলোর আসল অবস্থা কীরূপ।

 

চতুর্থতঃ

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় শায়খ মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আল উসাঈমিন(র.) বলেছেন,

إذا وفق الإنسان لامرأة صالحة في دينها ، وعقلها : فهذا خيرُ متاع الدنيا ؛ لأنها تحفظه في سره ، وماله ، وولده ، وإذا كانت صالحة في العقل أيضاً : فإنها تدبر له التدبير الحسن في بيته ، وفي تربية أولادها ، إنْ نظر إليها : سرَّته ، وإن غاب عنها : حفظته ، وإن وَكل إليها أمرَه : لم تخنه ، فهذه المرأة هي خير متاع الدنيا ، ولهذا قال النبي صلى الله عليه وسلم : ( تنكح المرأة لأربع : لمالها ، وحسبها ، وجمالها ، ودينها ، فاظفر بذات الدين تربت يداك ) يعني : عليك بها ؛ فإنها خير من يتزوجه الإنسان ، فذات الدين وإن كانت غير جميلة الصورة : لكن يجمِّلها خلُقها ، ودِينُها .

অর্থঃ কারো যদি দ্বীন এবং মনের দিক থেকে একজন পুণ্যবতী স্ত্রী থাকে, তাহলে তা হবে পৃথিবীর সব থেকে উত্তম সম্পদ। কারণ সে তার গোপনীয়তা রক্ষা করে, তার ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে হেফাজত করে। সে যদি বিবেক-বুদ্ধির দিক থেকেও পুণ্যবতী হয়, তাহলে সে তার গৃহের উত্তম ব্যাবস্থাপনা ও সন্তান লালন-পালনের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে স্বামী তার দিকে তাঁকালে তাকে আনন্দিত করে, আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে (সন্তান, সম্পদ, ও আমানত ইত্যাদি) হেফাজত করে। তাকে কোনো দায়িত্ব অর্পণ করা হলে এর খেয়ানত করে না। এমন নারী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ জন্যই নবী() বলেছেন, “চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (বুখারী ৫০৯০) এর মানে হলোঃ তোমাকে এটি (দ্বীনদারীকে প্রাধান্য প্রদান) করতেই হবে। এমন নারীই বিবাহের জন্য সব থেকে উত্তম। তার চেহারা যদি সুন্দর নাও হয়ে থাকে, তার চরিত্র এবং দ্বীন তাকে (প্রকৃত) সুন্দর করে তোলে।  [4]

 

এখানে অন্য একটি হাদিসের সাহায্যে আলোচ্য হাদিসটির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে, নারীর সৌন্দর্যের থেকেও তার দ্বীনদারী বড়। একজন নারী যদি চেহারার দিক থেকে সুন্দরী নাও হয়ে থাকেন, তাঁর গুণাবলীই তাঁকে সৌন্দর্যণ্ডিত করে তোলে। জীবনসঙ্গিনী হিসাবে এমন নারীকেই বেছে নিতে বলা হয়েছে। আমরা এখানে লক্ষ করলাম যে নারীর দৈহিক সৌন্দর্য নয় বরং তাঁর কর্মকেই এখানে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এই হচ্ছে হাদিস বিশারদদের ব্যাখ্যা। যে হাদিসে এভাবে একজন নারীকে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেই হাদিস থেকেই নাস্তিক-মুক্তমনারা বুঝেছেন নারীরা “যৌনযন্ত্র”, “পুরুষের ভোগ্যপণ্য” ইত্যাদি।

আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দিন।

 

পঞ্চমতঃ

নাস্তিক-মুক্তমনারা এরপরেও হয়তো দাবি করবেনঃ তারা তো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ উল্লেখ করেছেন, আর সেখানে তো ‘ভোগ্যপণ্য’ই বলা আছে!

 

এর জবাবে আমরা বলবোঃ অনুবাদটি ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। এমনকি ঐ অনুবাদেও নারীকে ‘ভোগ্যপণ্য’ বলা হয়নি বরং দুনিয়াকে ‘ভোগ্যপণ্য’ বলা হয়েছে। সে অনুবাদে বলা হয়েছেঃ

দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী।”

 

দুনিয়ার ক্ষেত্রে যে শব্দটি ব্রাকেট দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নারীর ক্ষেত্রে সেটি উল্লেখ করা হয়নি। আমরা জানি যে কর্তাভেদে শব্দের ভিন্ন প্রয়োগ ঘটে। দুনিয়া একটি জড়বস্তু, নারী জড়বস্তু নয়। অনুবাদ করতে গিয়ে দুনিয়ার ক্ষেত্রে যে বিশেষণটি ব্রাকেট দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নারীর ক্ষেত্রে সেটি উল্লেখ হয়নি। অথচ নাস্তিক-মুক্তমনারা অবলীলায় দুনিয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা বিশেষণটি নারীর উপর লাগিয়ে দিয়ে নবী(ﷺ) এর বদনাম করলেন! 

 

আমরা এই দাবি করছি না যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ ভুল। ‘মাতা’ (متاع) শব্দের অর্থ করতে গিয়ে সেখানে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোও ঐ শব্দের সঠিক অনুবাদ। কিন্তু আমরা এটিও মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সব সময়ে হাদিসের একটিমাত্র অনুবাদ দেখেই আকিদা বা মাসআলা নেয়া যায় না, হাদিসের মূলভাব বোঝা যায় না (আর যে মূলভাব বোঝা যায় তাকেও অনেক সময়ে নাস্তিক-মুক্তমনারা অপব্যাখ্যা করেন, তিলকে তাল বানান)। আমরা একটু আগেই দেখেছি আলোচ্য হাদিসে ভাষাগতভাবে ঐ শব্দের অর্থ কীরূপ হয়। আমরা আরো দেখেছি একজন হাদিস বিশারদ কিভাবে অন্য হাদিসের সাহায্যে আলোচ্য হাদিসটির ব্যাখ্যা করেছেনঃ ঐ হাদিসে একজন নারীর সৌন্দর্যের চেয়েও তার দ্বীনকে, তাঁর গুণকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারীকে মোটেও “যৌনযন্ত্র”, “ভোগ করার পণ্য” এইসব বোঝানো হয়নি। হাদিসের একটি অনুবাদ মানে একজন অনুবাদকের নিজস্ব বুঝ। আমরা ঐ একই হাদিসের আরো কয়েকটি অনুবাদ দেখতে পারি।

 

প্রসিদ্ধ হাদিস ওয়েবসাইট sunnah.com এ সহীহ মুসলিমে হাদিসটির এই অনুবাদ উল্লেখ করা হয়েছেঃ

 

The whole world is a provision, and the best object of benefit of the world is the pious woman. [5]

 

এখানে ‘মাতা’ (متاع) শব্দের অনুবাদে একবার Provision (সংস্থান) এবং আরেকবার Object of Benefit (এমন জিনিস যা থেকে উপকার লাভ করা যায়) বলা হয়েছে। ‘ভোগ্যপণ্য’ বলা হয়নি।

 

হাদিসগ্রন্থ অনুবাদের ক্ষেত্রে এদেশের উল্লেখযোগ্য একটি প্রকাশনা সংস্থা ‘বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার’ এর সহীহ মুসলিম অনুবাদে হাদিসটি এভাবে আছে—

 

“আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ দুনিয়ায় সব কিছুই সম্পদ। তবে দুনিয়ার মধ্যে সব চাইতে উত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।[6]

 

নাস্তিক-মুক্তমনাদেরকে প্রায়শই প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়খ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফের (হাফিযাহুল্লাহ) বিভিন্ন বক্তব্যকে উদ্ধৃত করতে দেখা যায়। [ যদিও তারা এটি করে ইসলামকে হেয় করার উদ্যেশ্যে। ] শায়খ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (হাফিযাহুল্লাহ) তাঁর ‘উপদেশ’ বইতে এই হাদিসকে এভাবে অনুবাদ করেছেন—

 

‘সম্পূর্ণ পৃথিবী সম্পদ। আর পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হচ্ছে সৎ চরিত্রবান নারী

(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮৩) [7]

 

 

তিনি এখানে অনুবাদ করেছেনঃ ‘সম্পদ’। অর্থাৎ একজন পুণ্যবতী নারী হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই অনুবাদে ‘ভোগ্যপণ্য’ নেই।

 

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ) অনুবাদেও সহীহ মুসলিমের এই হাদিসটি রয়েছে। সেখানে এর অনুবাদ এভাবে করা হয়েছেঃ

 

আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়ার সমস্ত কিছুই (তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী) ধন-সম্পদ। (তন্মধ্যে) মুসলিম সতীসাধ্বী রমণী সর্বশ্রেষ্ঠ ধন।[8]

 

 

প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব (হাফিযাহুল্লাহ) তাঁর সুবিখ্যাত ‘মাসিক আত-তাহরীক’ পত্রিকায় আলোচ্য হাদিসের অনুবাদ এভাবে করেছেনঃ

 

‘দুনিয়াটাই সম্পদ। যার সেরা সম্পদ হ’ল পূণ্যশীলা স্ত্রী’ [9]

 

 

এখানে আমরা বাংলায় আরো একটি অনুবাদে দেখলাম ‘ভোগ্যপণ্য’, ‘উপভোগের উপকরণ’ এমন কোনো শব্দ নেই। বরং এখানে পূন্যশীলা স্ত্রীকে সেরা সম্পদ বলা হয়েছে। অধিকাংশ বাংলা অনুবাদেই এখানে পূণ্যবতী নারীকে পৃথিবীর সেরা সম্পদ বলে অর্থ করা হয়েছে। একজন নারীকে কী পরিমাণ মর্যাদা দিয়ে ও কদর করে ‘সম্পদ’ বলে অভিহীত করা হয় এর উদাহরণ বাংলা সাহিত্যেও দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ গল্পের বিখ্যাত একটা লাইন উল্লেখ করছি—

 

“কিন্তু, সে যে আমার সাধনার ধন ছিল ; সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ। [10]

 

আলোচ্য হাদিসেও এভাবে পুণ্যবতী নারীর কদর করা হয়েছে। উপরের ব্যাকরণগত আলোচনা, অনেকগুলো বাংলা অনুবাদের উদাহরণ থেকে এটি পরিষ্কার যে হাদিসের মূলভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চিত্র নাস্তিক-মুক্তমনারা উপস্থাপন করেছে। এমনকি যে অনুবাদটি তারা উল্লেখ করে, সেটিকেও তারা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। এতোগুলো অনুবাদের বিপরীতে গিয়ে এরপরেও যদি নাস্তিক-মুক্তমনারা একটি অনুবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এই দাবি করতে চায় যে ইসলামে নারীকে ‘ভোগ্যপণ্য’ বলা হয়েছে – তাহলে এটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অসারতাকেই প্রমাণ করবে।

 

ষষ্ঠতঃ

এই হাদিসের কথা যদি বাদও দেয়া হয়, ইসলামে নারীদেরকে কি পুরুষের ভোগ্যপণ্য বলা হয়েছে? নাকি অন্য কিছু বলা হয়েছে?

আল কুরআনে বলা হয়েছে,

 

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ أُولَٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থঃ মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, নামায ক্বায়িম করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহা প্রজ্ঞাবান।” [11]

ভোগ্যপণ্য তো দূরের বস্তু, আল কুরআনে মুমিন পুরুষ ও নারীকে পরস্পরের বন্ধু বলা হয়েছে। প্রিয় পাঠক, বাস্তবতার সাথে নাস্তিক-মুক্তমনাদের ইসলামবিরোধী অপপ্রচারগুলোর একটু তুলনা করে দেখুন।

 

সহীহ বুখারীর একটি হাদিসে উল্লেখ আছে,

 

“…উমার (রাঃ) আরও বললেন, আল্লাহর কসম! জাহেলী যুগে নারীদের কোন আধিকার আছে বলে আমরা মনে করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাদের সম্পর্কে যে বিধান নাযিল করার ছিল তা নাযিল করলেন এবং তাদের হক হিসেবে যা নির্দিষ্ট করার ছিল তা নির্দিষ্ট করলেন। …” [12]

 

ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে নারীদের অধিকার বলতে কোনো কিছু ছিলো না। আল্লাহ তা’আলা কুরআনের আয়াত নাজিল করে নারীদের হক (অধিকার) প্রতিষ্ঠিত করলেন। ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে নারীরা আক্ষরিকভাবেই পণ্যদ্রব্যের মতো ছিলো। পিতার স্ত্রী অর্থাৎ মা পর্যন্ত তাদের কাছে পণ্যের মতো ছিলো। উত্তরাধিকার সূত্রে অন্য পণ্যদ্রব্যের মতো বাবার নিকট থেকে তারা তার স্ত্রী অর্থাৎ মায়েরও মালিকানা লাভ করতো! জাহেলিয়াতের যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা বিনা দ্বিধায় বিয়ে করে নিত। [দেখুনঃ বুখারীঃ ৪৫৭৯] আল্লাহ তা'আলা এই নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন এবং একে 'আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলে অভিহিত করেছেন। [13]  নারীর পণ্যায়নের এই অশ্লীল রীতিকে নিষিদ্ধ করে আল্লাহ নাজিল করেছেনঃ

 

وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۚ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا

অর্থঃ “নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃ পুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না, তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (সেটা ক্ষমা করা হলো) নিশ্চয় তা ছিল অশ্লীল, মারাত্মক ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা।” [14]

 

                         

পরিশেষ বলবো, যে ইসলাম নারীকে পণ্যদ্রব্যের মতো অবস্থা থেকে মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করেছে, সেই ইসলামের নামেই এখন উল্টো নারীকে পণ্য বানানোর অপবাদ দিচ্ছে নাস্তিক-মুক্তমনারা। তারা ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর নামে যে চিত্র উপস্থাপন করে তা খণ্ডিত, অপব্যাখ্যায় পূর্ণ এবং প্রকৃত সত্য থেকে বহু দূরের কোনো চিত্র। আমরা আল্লাহর নিকট তাদের সংশোধণ এবং হেদায়েত কামনা করি।

 

আরো পড়ুনঃ

 

"তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র" (২ : ২২৩) - এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম কি নারীকে ছোট করেছে?

 

ইসলাম কি নারীকে যে কোন পরিস্থিতে জোর করে স্বামীর সাথে যৌন কাজ করার আদেশ দেয়? নারীর কি কোন অধিকার নেই?

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), হাদিস নং : ৩৫১২

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=13123

[2] তাফসির কুরতুবী, সুরা নুরের ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://bit.ly/3dzBkda

[3] http://tiny.cc/q670tz

[4] শারহ রিয়াদুস সলিহীন ২/১২৭,১২৮

https://islamqa.info/ar/109190/

[5] https://sunnah.com/muslim/17/76

[6] সহীহ মুসলিম (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার) খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৩০

[7] উপদেশ – আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ পৃষ্ঠা ১৪৭

[8] মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত). হাদিস নং : ৩০৮৩

https://www.hadithbd.com/hadith/email/?id=68410

[9] প্রবন্ধঃ ‘উত্তম পরিবার’; মাসিক আত-তাহরীক’ (জুলাই ২০১৪) – ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

https://at-tahreek.com/article_details/5580

[10] হৈমন্তী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

https://rabindra-rachanabali.nltr.org/node/2694

https://bn.wikisource.org/wiki/গল্পগুচ্ছ/হৈমন্তী

[11]  আল কুরআন, তাওবাহ ৯ : ৭১

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=1306

[12]  সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৪৫৪৮

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=4854

[13]  তাফসির যাকারিয়া, সুরা নিসার ২২ নং আয়াতের তাফসির

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=515

[14]  আল কুরআন, নিসা ৪ : ২২