হাদিসে গিরগিটি (ওয়াযাগ) হত্যার বিধান প্রসঙ্গে

নৈতিকতা বিষয়ক



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ  হাদিসে বলা হয়েছে ইব্রাহিমের (আ.) অগ্নিকুণ্ডে ফুঁ দেবার অপরাধে গিরগিটি মেরে ফেলতে হবে, কেউ যদি ১ম আঘাতে মেরে  ফেলতে পারে, তাহলে তার জন্য অনেক পূণ্য। বহু যুগ আগের কোন এক গিরগিটির কাজের জন্য কেন এখনও গিরগিটি মেরে ফেলতে হবে? এটা কি একের দোষে অন্যকে শাস্তি দেয়া নয়? একজন স্রষ্টা কিভাবে নিরীহ গিরগিটি মেরে ফেলবার আদেশ দিতে পারেন?

 

উত্তরঃ জগতের প্রতিটি বস্তু আল্লাহ্‌ তা’আলার মাখলুক বা সৃষ্টি। গিরগিটি আল্লাহ্‌ তা’আলার মাখলুক। কাজেই এর ব্যাপারে আল্লাহর কিছু সুনির্দিষ্ট হুকুম-আহকাম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শুরুতেই আমরা এই প্রাণীটির ব্যাপারে আল্লাহর বিধান দেখে নিই।

 
وَعَنْ أُمِّ شَرِيكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا : أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَهَا بِقَتْلِ الأَوْزَاغِ وَقَالَ: «كَانَ يَنْفُخُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ». متفق عَلَيْهِ

অর্থঃ উম্মে শারীক রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ() ‘ওয়াযাগ’ (গিরগিটি/Gecko)  মারতে আদেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, ‘‘এ ইব্রাহিম(আ.) এর অগ্নিকুণ্ডে ফুঁ দিয়েছিল।" [1]

 

 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ قَتَلَ وَزَغَةً فِي أَوَّلِ ضَرْبَةٍ فَلَهُ، كَذَا وَكَذَا حَسَنَةً، وَمَنْ قَتَلَهَا فِي الضَّرْبَةِ الثَّانِيَةِ فَلَهُ كَذَا وَكَذَا حَسَنَةً، أَدْنَى مِنَ الْأُولَى، وَمَنْ قَتَلَهَا فِي الضَّرْبَةِ الثَّالِثَةِ، فَلَهُ كَذَا وَكَذَا حَسَنَةً أَدْنَى مِنَ الثَّانِيَةِ صحيح

অর্থঃ আবু হুরাইরা(রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ() বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি ‘ওয়াযাগ’ হত্যা করবে, তার জন্য এরূপ সওয়াব রয়েছে। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় আঘাতে এটি হত্যা করবে, তার জন্য এরূপ এরূপ সাওয়াব রয়েছে, যা প্রথম আঘাতে মারার তুলনায় কম। আর যে ব্যক্তি তৃতীয় আঘাতে তা হত্যা করবে, তার জন্য এরূপ এরূপ সওয়াব রয়েছে, যা দ্বিতীয় আঘাতে হত্যার চেয়ে কম। [2]

 

عَنْ سَائِبَةَ، - مَوْلاَةِ الْفَاكِهِ بْنِ الْمُغِيرَةِ - أَنَّهَا دَخَلَتْ عَلَى عَائِشَةَ فَرَأَتْ فِي بَيْتِهَا رُمْحًا مَوْضُوعًا فَقَالَتْ يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ مَا تَصْنَعِينَ بِهَذَا قَالَتْ نَقْتُلُ بِهِ هَذِهِ الأَوْزَاغَ فَإِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَخْبَرَنَا أَنَّ إِبْرَاهِيمَ لَمَّا أُلْقِيَ فِي النَّارِ لَمْ تَكُنْ فِي الأَرْضِ دَابَّةٌ إِلاَّ أَطْفَأَتِ النَّارَ غَيْرَ الْوَزَغِ فَإِنَّهَا كَانَتْ تَنْفُخُ عَلَيْهِ فَأَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ بِقَتْلِهِ ‏.

অর্থঃ ফাকিহা ইবনুল মুহীরার মুক্তদাসী সাইবা থেকে বর্ণিত, তিনি আয়িশা (রা.)-র নিকট প্রবেশ করে তাঁর ঘরে একটি বর্শা রক্ষিত দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আপনারা এটা দিয়ে কী করেন? তিনি বলেন, আমরা এই বর্শা দিয়ে এসব ‘ওয়াযাগ’ হত্যা করি। নিশ্চয়ই আল্লাহর নবী() আমাদের অবহিত করেছেন যে, ইব্রাহিম(আ.)-কে যখন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলো তখন পৃথিবীর বুকে এমন কোন প্রাণী ছিলো না, যা আগুন নিভাতে চেষ্টা করেনি, ‘ওয়াযাগ’ ব্যতিত। সে বরং আগুনে ফুঁ দিয়েছিল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ() এটিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। [3]

 

হাদিসে প্রাণীটির নাম হিসাবে ‘الوزغ’ (ওয়াযাগ) শব্দটি এসেছে। যা হচ্ছে টিকটিকি বা গিরগিটিজাতীয় এক ধরনের সরিসৃপ। কোনো কোনো অনুবাদক ‘টিকটিকি’ আবার কোনো কোনো অনুবাদক ‘গিরগিটি’ শব্দ দ্বারা অনুবাদ করেছেন। আমি এখানে ‘গিরগিটি’ অনুবাদটি ব্যবহার করছি। এই প্রাণীটির (Gecko) বহু প্রজাতি বিদ্যমান। [4]

 

এ হাদিসগুলো পড়ে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারেঃ ইব্রাহিম(আ.) এর যুগে গিরগিটি যদি আগুনে ফুঁ দিয়েও থাকে, এই যুগে সে কারণে কেন গিরগিটি মারার জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করা হচ্ছে?

 

হাদিসের ব্যাখ্যায় মুফতি তাকি উসমানী(হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, “আল্লাহই সব থেকে ভালো জানেন, আমার কাছে এটা মনে হয়েছে যে – ইব্রাহিম(আ.) এর আগুনে ফুঁ দেয়ার ঘটনা গিরগিটির অনিষ্টকারী স্বভাব বোঝাতে বর্ণনা করা হয়েছে। সাথে এর নিচু প্রকৃতিও বোঝানো হয়েছে। একে মারতে আদেশ করার মূল কারণ হল, এটি ক্ষতিকর ও কষ্টদায়ক প্রাণী। নতুবা ইব্রাহিম(আ.) এর জমানায় ঐসকল গিরগিটির অন্যায়ের কারণে এ সকল গিরগিটিকে হত্যা করা, শাস্তি দেয়া যুক্তিসঙ্গত হতো না। এ জন্য মূল কারণ তাদের কষ্টদান ও অবাধ্যাচারণ যার বহিঃপ্রকাশ ইব্রাহিম(আ.) এর ঘটনার সময়ে স্পষ্ট হয়ে যায়[5]

 

শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ(র.) এর মতে, গিরগিটিকে হত্যা করা হবে কারণ সেটা কষ্টদানকারী প্রানী [6]

 

শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাঈমিন(র.) এর মতে, মানুষকে যে সকল প্রাণী মারার আদেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো ইহরাম অবস্থায় ও ইহরাম ছাড়াও মারা হবে। যেমন, গিরগিটি, বিচ্ছু ইত্যাদি। হাদিসের মধ্যেই এসেছে যে এইগুলো কষ্টদানকারী প্রাণী সীমালঙ্ঘনের (মানুষকে কষ্ট দানে) ক্ষেত্রে এদের কোন তুলনা নেই।[7]

 

অন্যান্য উলামাদের থেকেও এমন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। [8] অতএব আমরা দেখলাম হাদিসের ব্যাখ্যাকারকদের মতে, গিরগিটি মারতে আদেশ দেবার মূল কারণ এর ক্ষতিকর প্রকৃতি। একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেবার বিধান ইসলামে নেই, একের কর্মের ভার অন্য কেউ বহন করে না। আল্লাহ্‌ বলেন,

 

 قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ ۚ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۚ

অর্থঃ  বল, “আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন প্রভু অনুসন্ধান করব, অথচ তিনি সব কিছুর প্রভু?” আর প্রত্যেক সত্তা স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে, কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। ...” [9]

 

 مَّنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا

অর্থঃ “যারা সৎ পথ অবলম্বন করবে তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্য তা অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা তো পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং কেউ অন্য কারও ভার বহন করবে না; আমি [আল্লাহ্‌] রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকেও শাস্তি দিইনা। [10]

 

গিরগিটির (Gecko) অনিষ্টকর হবার ব্যাপারটি আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারাও প্রমাণিত। আমেরিকান গবেষক Sonia Hernandez এ সংক্রান্ত ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, গিরগিটিতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে ( enteric bacteria) যেটি এন্টিবায়োটিককে প্রতিরোধ করতে পারে। [11] কোনো ব্যাকটেরিয়া যদি এন্টিবায়োটিককে প্রতিরোধ করতে পারে, তাহলে সেটি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। Sonia Hernandez এর এই গবেষণা ‘Science of the Total Environment’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। [12] গিরগিটি কামড় দেয় এবং এর দ্বারা ক্ষতিকর রোগ ছড়াতে পারে। [13] আমেরিকায় ঘর-বাড়ীতে গিরগিটি প্রতিপালনের চল রয়েছে। ২০১৫ সালে গৃহপালিত গিরগিটির দ্বারা সেখানকার ১৬টি অঙ্গরাজ্যে ভয়ানক salmonella ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখা দেয়। [14] কাজেই গিরগিটিকে একেবারে ‘নিরীহ’ প্রাণী বলবার কোনো সুযোগ নেই।

 

হাদিসে ইব্রাহিম(আ.) এর আগুনে গিরগিটির ফুঁ দেবার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ এ দৃষ্টান্তটি দেখিয়ে দাবি করতে পারে যে, হাদিসে তো ‘কারণ’ হিসাবে ইব্রাহিম(আ.) এর আগুনে ফুঁ দেবার ঘটনা উল্লেখ আছে; ক্ষতিকর হওয়ার কথা তো বলা হয়নি! এর জবাবে আমরা বলবঃ গিরগিটির ক্ষতিকর প্রাণী হবার বিষয়টি অন্যত্র বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

 

 عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ لِلْوَزَغِ ‏ "‏ الْفُوَيْسِقَةُ ‏"‏ 

অর্থঃ আয়িশা থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ() ‘ওয়াযাগ’ (গিরগিটি/Gecko) সম্পর্কে বলেনঃ তা ক্ষতিকর প্রাণী [15]

 

عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَتْلِ الْوَزَغِ وَسَمَّاهُ فُوَيْسِقًا صحيح

অর্থঃ আমির ইবনু সা‘দ (রহ.) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ() গিরগিটি মারার হুকুম করেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন অনিষ্টকারী [16]

 

কাজেই এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে বিনা কারণে গিরগিটি হত্যা করতে বলা হয়েছে। আর ইব্রাহিম(আ.) এর অগ্নিকুণ্ডে ফুঁ দেবার দৃষ্টান্ত উল্লেখের দ্বারাও এটা প্রমাণ হয় না যে ঐ সময়ের গিরগিটিদের কর্মের জন্য এখনকার গিরগিটিদের মারতে বলা হয়েছে।

 

 একটা উদাহরণের দ্বারা বিষয়টি সহজে বোঝা যাবে। ধরা যাক, কোনো একটি ডাকাত দল বহু বছর ধরে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে যাচ্ছে। ডাকাত দলের কয়েক জন সদস্য ১০ বছর আগে একজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে ফেললো। এটি তাদের একটি ভয়াবহ জঘন্য কর্ম হিসাবে দৃষ্টান্ত হয়ে গেল। ঘটনার ১০ বছর পরে তাদের অনিষ্টকর স্বভাবের বিবরণ দিয়ে উল্লেখ করা হলঃ “এই ডাকাত দলকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এরা এমন লোক যারা পুলিশ মারে!” -- কেউ কি বলবে যে এই কথাটি ভুল?

কখনোই না। ডাকাত দলের সকল সদস্য হয়তো কাজটি করেনি, কাজটি হয়তো সাম্প্রতিক সময়েও হয়নি। কিন্তু বহু আগের ঐ কর্মটি তাদের ক্ষতিকর স্বভাবের একটি উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত হিসাবে স্বীকৃত হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের ঐ বিশেষ কাজটিকে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করে এভাবে তাদেরকে গ্রেপ্তারের কথা বলা যেতেই পারে।

একইভাবে, ইব্রাহিম(আ.) এর সময়ে করা গিরগিটির একটি অনিষ্টকর কাজকে বর্তমান সময়ের গিরটিগিটিদের বেলাতেও অনিষ্টকর স্বভাবে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা যেতেই পারে।

 

হাদিসে কেন এক আঘাতে মারলে বেশি সওয়াবের কথা বলা হল? এটি কি আসলেই গিরগিটির প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন?

 সংশ্লিষ্ট হাদিসের ব্যাখ্যায় ইজজুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম(র.) [৫৭৭-৬৬০ হি.] বলেছেন, “প্রথম আঘাতে (গিরগিটি) মারার আদেশ দেবার কারণ হল, তাকে এক আঘাতে হত্যা করা হলে উত্তম (সদয়)ভাবে হত্যা করা হবে এবং এই হাদিসের আওতায় আমল করা হবেঃ রাসুল() বলেছেন, ‘‘অবশ্যই আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর অনুগ্রহ লিপিবদ্ধ (জরুরী) করেছেন। সুতরাং যখন হত্যা করো তখন উত্তমরূপে অনুগ্রহের সাথে  হত্যা কর এবং যখন (পশু) যবেহ কর তখন উত্তমরূপে অনুগ্রহের সাথে  যবেহ কর।’’ [সহীহ মুসলিম হা/১৯৫৫] ... ” [17]

 

অর্থাৎ এ আদেশের সাথে নিষ্ঠুরতার কোনো সম্পর্ক নেই বরং দয়ার সম্পর্ক আছে। ক্ষতিকর প্রাণী বিধায় গিরগিটিকে মারতে বলা হয়েছে। এর প্রতি জুলুম করার জন্য মারতে বলা হয়নি। একে মারলেও এমনভাবে মারতে হবে যাতে এর কষ্ট কম হয়।

 

ইসলাম দয়ার ধর্ম, শান্তির ধর্ম। মানুষ, পশু-পাখি সকল কিছুর প্রতি দয়া প্রদর্শন হচ্ছে ইসলামের বিধান। মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন না হলে ইসলাম কোনো প্রাণী হত্যা করার বিধান দেয় না। পশু-পাখির প্রতি দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারেও ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে।

 

আল্লাহর রাসুল(ﷺ) বলেন, ‘‘এক ব্যক্তি এক কুয়ার নিকটবর্তী হয়ে তাতে অবতরণ করে পানি পান করল। অতঃপর উঠে দেখল, কুয়ার পাশে একটি কুকুর (পিপাসায়) জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে। তার প্রতি লোকটির দয়া হল। সে তার পায়ের একটি (চর্মনির্মিত) মোজা খুলে (কুয়াতে নেমে তাতে পানি ভরে এনে) কুকুরটিকে পান করাল। ফলে আল্লাহ তার এই কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।’’

লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল()! জীব-জন্তুর প্রতি দয়াপ্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, ‘‘প্রত্যেক সজীব প্রাণবিশিষ্ট জীবের (প্রতি দয়াপ্রদর্শনে) সওয়াব বিদ্যমান।’’ [18]

তিনি বলেন, ‘‘দুর্ভাগা ছাড়া অন্য কারো (হৃদয়) থেকে দয়া, ছিনিয়ে নেওয়া হয় না।’’ [19]

তিনি এক সাহাবীকে বলেন, ‘‘তুমি যদি তোমার বকরীর প্রতি দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।’’ [20]

 

 বিনা কারণে কোন জীবকে কষ্ট দেবার ব্যাপারে ইসলামে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।

 

রাসুলুল্লাহ(ﷺ)  বলেছেন, ‘‘একটি বিড়ালের কারণে একজন মহিলাকে আযাব দেওয়া হয়েছে; যাকে সে বেঁধে রেখেছিল এবং অবশেষে মারাও গিয়েছিল। সে যখন তাকে (বিড়ালটিকে) বেঁধে রেখেছিল তখন খেতেও দেয়নি ও পান করতেও দেয়নি। আর তাকে ছেড়েও দেয়নি; যাতে সে নিজে স্থলচর কীটপতঙ্গ ধরে খেত।’’ [21]

এক ব্যক্তি তার উটকে ঠিকমত খেতে দিত না, উপরন্তু কষ্ট দিত। তার পাশ দিয়ে রহমতের রাসুল() কে পার হতে দেখে উটটি আওয়াজ দিল এবং তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি উটের মালিককে ডেকে বললেন, ‘‘তুমি এই জন্তুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না কেন, আল্লাহ তোমাকে যার মালিক বানিয়েছেন? ও তো আমার কাছে অভিযোগ করছে যে, তুমি ওকে ভুখা রাখ এবং কষ্ট দাও!’’ [22]

 

ইসলামে অযথা কোন পশু-পক্ষীকে কষ্ট দেওয়া, সাধ্যের অতীত কোন পশুকে বোঝা বহনে বাধ্য করতে মারধর করা বৈধ নয়। পশু-পক্ষী কিছু অনিষ্ট করে ফেললে, গরু-মহিষ গাড়ি বা হাল টানতে অক্ষম হয়ে পড়লে অতিরিক্ত প্রহার করে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেওয়া বৈধ নয় ।

 

একবার ইবন উমার(রা.) কুরাইশের একদল তরুণের নিকট পার হয়ে (কোথাও) যাচ্ছিলেন; সে সময় তারা একটি পাখি অথবা মুরগীকে বেঁধে রেখে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীর ছুঁড়ে হাতের নিশা্না ঠিক করা শিক্ষা করছিল। ... ওরা ইবন উমার(রা.)-কে দেখতে পেয়ে এদিক-ওদিক সরে পড়ল। ইবন উমার(রা.) বললেন, ‘কে এ কাজ করেছে? যে এ কাজ করেছে আল্লাহ তাকে অভিশাপ করুন। অবশ্যই আল্লাহর রাসুল() সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন জীবকে (অকারণে) নিশানা বানায় [23]

একবার রাসুল() একটি গাধার পাশ বেয়ে পার হলেন। গাধাটির মুখে দাগার দাগ দেখে তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহ তাকে অভিশাপ করুন, যে একে দেগেছে।’’ [24]

রাসুল(ﷺ) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি অধিকার ছাড়া (অযথা) একটি বা তার বেশী চড়ুই হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সে চড়ুই সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন।’’ [25]

রাসুল(ﷺ) বলেছেন, একবার একটি গাছের নিচে একজন নবীকে পিঁপড়ে কামড়ে দিলে তিনি গর্তসহ পিঁপড়ের দল পুড়িয়ে ফেললেন। আল্লাহ তাঁকে ওহী করে বললেন, ‘‘তোমাকে একটি পিঁপড়ে কামড়ে দিলে তুমি একটি এমন জাতিকে পুড়িয়ে মারলে, যে (আমার) তাসবিহ পাঠ করত? ...’’  [26]

রাসুল(ﷺ) বলেছেন, ‘‘আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে অযথা পশু হত্যা করে।’’ [27]

 

আরো একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, গিরগিটি যদি ক্ষতিকর প্রাণীই হয়ে থাকে, একে যদি মেরেই ফেলতে হবে - তাহলে আল্লাহ্‌ একে কেন সৃষ্টি করলেন?

 

১। বিভিন্ন অনিষ্টকর বস্তু এবং জীব-জন্তু থাকবার কারণে মানুষ আল্লাহর নিকট বিভিন্ন যিকির (স্মরণ) ও দোয়ায় অভ্যস্ত হতে পারে যারা দ্বারা সে সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায়।

 

২। এর মাঝে আল্লাহর অসামান্য সৃষ্ট নৈপুণ্যের প্রমাণ ও নিদর্শন রয়েছে। ক্ষুদ্র প্রাণী গিরগিটি মানুষকে অনেক বড় ক্ষতি করতে পারে। আবার এর চেয়ে বৃহৎ প্রাণী উট মানুষকে কোনো ক্ষতি করে না। এর মাঝে মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

 

৩। মানুষ পৃথিবীর এই সব কষ্টদায়ক প্রাণীর দ্বারা শিক্ষাগ্রহন করতে পারে যে, দুনিয়াতে যদি এদের থেকে কষ্টকর রোগ-ব্যধি হতে পারে, তাহলে আখিরাতের শাস্তি কত কঠোর! আল কুরআন ও হাদিসে জাহান্নামে সাপ-বিচ্ছুর আযাবের কথা বলা হয়েছে।

 

৪। মানুষ জানবে যে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কোনগুলো কল্যাণকর। সেগুলোর জন্য আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করবে। আর যেগুলো কষ্টদায়ক – সেগুলো থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাইবে।

 

উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম যে ইসলামে কোনোভাবেই বিনা কারণে জীব-জন্তু হত্যা করা জায়েজ নয়। যারা গিরগিটি হত্যার হাদিস দেখিয়ে ইসলামকে নিষ্ঠুর ও বর্বর ধর্ম হিসাবে দেখাতে চায় – তারা ভুলের মধ্যে আছে। গিরগিটি ও অন্য সকল প্রাণীর সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ্‌ তা’আলার অসাধারণ হিকমতের পরিচয় রয়েছে। সুতরাং যাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে, তারা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক।

 

এ প্রসঙ্গে শায়খ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার এই আলোচনাটিও দেখা যেতে পারেঃ https://youtu.be/YIuLkM6m-YY

 

  

তথ্যসূত্রঃ

[1]. সহীহ বুখারী ৩৩০৭, ৩৩৫৯, সহীহ মুসলিম ২২৩৭, নাসায়ী ২৮৮৫, ইবনু মাজাহ ৩২২৮, মুসনাদ আহমাদ ২৬৮১৯, ২৭০৭২, দারিমী ২০০০, রিয়াদুস সলিহীন ১৮৭২

[2]. সহীহ মুসলিম, তিরমিযী, সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং : ৫২৬৩  

[3]. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস নং ৩২৩১

[4]. ■ “Gecko _ reptile _ Britannica.com”

https://www.britannica.com/animal/gecko

■ “The Many Types Of Geckos - Tail and Fur”

https://tailandfur.com/the-many-types-of-geckos/

■ “Dangerous of Wild Animals_ Gecko”

http://dangerous-wild-animals.blogspot.com/2010/10/gecko.html

[5]. তাকমিলা ফাতহিল মুলহিম ৪/৩৫০

[6]. ইবরিযিয়্যা ২/৮৭ [শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ(র.)]

[7]. শারহু সহীহ বুখারী ৫/৫৭৩ [শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাঈমিন(র.)]

[8]. দেখুন – ‘বাজলুল মাজহুদ’ ২০/২০২, [খলিল আহমেদ শাহরানপুরী]; ‘তুহফাতুল কারী’ ৪/৫২৮ [মুফতি পালনপুরী], ‘যাখিরাতুল উক্ববাহ শারহ নাসাঈ’ ২৫/৮ [মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আদাম ইবন মুসা], ‘ফাতহুল বারী’ ৪/৪১ [ইবন হাজার আসকালানী]

[9]. আল কুরআন, আন’আম ৬ : ১৬৪

[10]. আল কুরআন, বনী ইস্রাঈল (ইসরা) ১৭ : ১৫

[11]. “Geckos resistant to antibiotics, may pose risk to pet owners, study finds -- ScienceDaily”

https://www.sciencedaily.com/releases/2015/05/150514141039.htm

[12]. Christine L. Casey, Sonia M. Hernandez, Michael J. Yabsley, Katherine F. Smith, Susan Sanchez. The carriage of antibiotic resistance by enteric bacteria from imported tokay geckos (Gekko gecko) destined for the pet tradeScience of The Total Environment, 2015; 505: 299 DOI: 10.1016/j.scitotenv.2014.09.102

[13]. ■ “Why You Don’t Want to Get Bitten by A Tokay Gecko _ Tokay Gecko Guide”

http://tokaygeckoguide.com/why-you-dont-want-to-get-bitten-by-a-tokay-gecko/1603/

■ “Gecko Bite” (Reptile Magazine)

http://www.reptilesmagazine.com/Lizard-Care/Lizard-Bite/

[14]. “Geckos Linked to Dangerous Salmonella Outbreak in 16 States - ABC News”

https://abcnews.go.com/Health/geckos-linked-dangerous-salmonella-outbreak-16-states/story?id=31069405

[15]. সহীহ বুখারী ১৮৩১, সহীহ মুসলিম ২২৩৯, সুনান নাসাঈ ২৮৮৬, মুসনাদ আহমাদ ২৪০৪৭, ২৪৬৮৯, ২৫৮০০, ২৫৮৫০

[16]. সহীহ মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ, সুনান আবু দাউদ হাদিস নং : ৫২৬২

[17]. আওনুল মা’বুদ, পৃষ্ঠা ২৩৮২

[18]. সহীহ বুখারী, হা/ ২৪৬৬ , সহীহ মুসলিম, হা/২২৪৪

[19]. মুসনাদ আহমাদ, ২/৩০১, সুনান আবু দাউদ ৪৯৪২, তিরমিযী, ইবন হিববান, সহীহুল জা’মে হা/৭৪৬৭

[20]. হাকিম, সহীহ তারগীব ২২৬৪

[21]. সহীহ বুখারী, হা/ ২৩৬৫, ৩৪৮২

[22].  মুসনাদ আহমাদ, আবু দাঊদ, হাকিম, সিলসিলাহ সহীহাহ  হা/২০

[23].  সহীহ বুখারী, হা/ ৫৫১৫, সহীহ মুসলিম,  হা/১৯৫৮

[24].  সহীহ মুসলিম, হা/২১১৬

[25].  সুনান নাসাঈ, সহীহ তারগীব ২২৬৬

[26].  সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, হা/২২৪১ 

[27].  হাকিম, বাইহাকী, সহীহুল জা’মে হা/১৫৬৭ 

ইসলামে জীবে দয়া ও এ সকল বিষয়ে দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনার জন্য এই বইটি দেখুনঃ ‘ইসলামী জীবন-ধারা’ [আবদুল হামীদ ফাইযী]

 

[ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান (হাফিযাহুল্লাহ) ]