মানুষ কি আসলেই হৃদয় দিয়ে চিন্তা করে?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



নাস্তিক প্রশ্নঃ  কুরআন দাবি করে মানুষ চিন্তা করে হৃদয় দিয়ে(Quran 11:5)। আমরা জানি যে মানুষ মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করে। এটা কি কুরআনের বৈজ্ঞানিক ভুল না?

 

উত্তরঃ কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে—

 

 أَلَا إِنَّهُمْ يَثْنُونَ صُدُورَهُمْ لِيَسْتَخْفُوا مِنْهُ ۚ أَلَا حِينَ يَسْتَغْشُونَ ثِيَابَهُمْ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ

অর্থঃ “জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তারা নিজেদের বক্ষদেশ ঘুরিয়ে দেয় যেন আল্লাহর নিকট হতে লুকাতে পারে। শোন, তারা তখন কাপড়ে নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করে, তিনি তখনও জানেন যা কিছু তারা চুপিসারে বলে আর প্রকাশ্যভাবে বলে। নিশ্চয় তিনি জানেন যা কিছু বক্ষ/অন্তর সমূহে নিহিত রয়েছে।” [1]

 

أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا ۖ فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ

অর্থঃ “তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তারা জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিশক্তিসম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারে? বস্তুত: চক্ষু তো অন্ধ হয় না, বরং বক্ষস্থিত হৃদয়/অন্তরই অন্ধ হয়।” [2]

 

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لاَৃ يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا

অর্থঃ “আর আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের হৃদয়/অন্তর রয়েছে, তারা এর দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তারা এর দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তারা এর দ্বারা শোনে না। ...” [3]

 

 فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ ۖ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ

অর্থঃ “অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনিভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না আল্লাহ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন।” [4]

 

কুরআন মাজিদে এমন প্রচুর আয়াত রয়েছে যেখানে চিন্তা, অনুধাবন এই জাতীয় কর্মগুলোর ক্ষেত্রে মানুষের বক্ষ অথবা হৃদয়কে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। অনেক অনুবাদে صدر ও قلب এর স্থলে  আক্ষরিকভাবে ‘বক্ষ’ ও ‘হৃদয়’ অনুবাদ করা হয়েছে।আবার কখনো কখনো শব্দগুলোকে ‘অন্তর’ লিখে অনুবাদ করা হয়েছে।

 

সাহাবী ইবন আব্বাস(রা) এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় বলেনঃ  “বক্ষ উন্মুক্ত” করার অর্থ হলঃ তাওহিদ ও ঈমানের জন্য তা প্রশস্ত হওয়া। [ইবন কাসির]

... ... ... মূলতঃ বক্ষ সংকীর্ণ করার অর্থ কঠিন, দুর্ভেদ্য করে দেয়া। উমার(রা) বলেনঃ মুনাফিকের ক্বলব হল অনুরূপ সেখানে কোন ভালো কিছু পৌঁছুতে পারে না। [তাবারী, ইবন কাসির]

মুজাহিদ(র) ও সুদ্দী(র) বলেন, এর অর্থ সন্দেহে পড়ে থাকা। মানসিক অশান্তিতে বিরাজ করা। [ইবন কাসির] [5]

 

কুরআনে قلب  শব্দের এমন ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে প্রখ্যাত দাঈ ড. জাকির নায়েক বলেনঃ আরবিতে قلب শব্দের ২টি অর্থ আছে।যথাঃ হৃদয় ও বুদ্ধিমত্তা। এ স্থলে সঠিক অনুবাদ হবে বুদ্ধিমত্তা। صدر শব্দের ২টি অর্থ হয় যথাঃ বক্ষ ও কেন্দ্র।এ স্থলে সঠিক অনুবাদ হবে কেন্দ্র। অর্থাৎ আয়াতসমূহের সঠিক অনুবাদ হবেঃ “আল্লাহ তাদের(ইসলাম অস্বীকারকারী) বুদ্ধিমত্তা মোহর করে দিয়েছেন...” (সুরা বাকারাহ ২:৭) এবং  “...চক্ষু তো অন্ধ হয় না, বরং কেন্দ্রস্থিত বুদ্ধিমত্তা অন্ধ হয়।“ (সুরা হাজ্জ ২২:৪৬)  [6]     

আমরা যদি ধরে নিই আলোচ্য আয়াতসমূহে আক্ষরিকভাবে বক্ষস্থিত হৃদয় দ্বারা চিন্তা করার কথা বলা হয়েছে, তাহলেও তা  বিজ্ঞান দ্বারা ভুল প্রমাণ হয় না বরং সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যেঃ মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে হৃদয়(heart) এর ভূমিকা আছে। HeartMath Institute এর গবেষক হাওয়ার্ড মার্টিনের মতে, “আমরা জানি যে আমরা হৃদপিণ্ড থেকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শক্তি নির্গত করি এবং এটি মাপা যায়। এটাও জানা আছে যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এই সিগনাল আমাদের মানসিক অবস্থার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ... ... আমার মতে আমাদের আত্ম নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি হৃদপিণ্ড/হৃদয়(heart) নিয়ন্ত্রিত।” শুধু তাই নয়, তিনি মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির(thoughts and feelings) ব্যাপারে মন্তব্য করেছেনঃ “It all comes from the heart.”।  [7]     

 

Dr. Mercolaর মতে, হৃদয়(heart) হচ্ছে সত্য ও আবেগের(অনুভবকারী) অঙ্গ। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন হৃদপিণ্ডেও এক প্রকার ‘মস্তিষ্ক’ রয়েছে এমনকি Neuronও রয়েছে। এবং এই Neuronগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রভাব রাখে। heart প্রত্যক্ষভাবে মানসিক অবস্থায় ভূমিকা রাখে। [8]      

 

Gregg Braden ২২ বছরেরও অধিক সময় ধরে গবষণা করেছেন। তাঁর মতেঃ হৃদয়ের(heart) আক্ষরিকভাবেই নিজস্ব মগজ আছে। এটি শুধুমাত্র রক্ত পাম্প করার অঙ্গ নয় বরং এর নিজস্ব neuron[সাধারণত মস্তিষ্কের কোষকে neuron বলে] এবং বুদ্ধিমত্তা আছে। [9]      

 

আমেরিকান গবেষক Rollin McCraty(যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার Institute of HeartMath এর প্রতিষ্ঠাতা) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন হৃদয় কিভাবে মস্তিষ্কের সঙ্গে দ্বিমুখী যোগাযোগ স্থাপন করে। [10]

মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ও হৃদয়ের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তিনি The coherent heart নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইতে হৃদয় ও মস্তিস্কের সম্পর্ক অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণণা করা হয়েছে। [11]

 

অতীতকালের ধারণা ছিল যে, মস্তিষ্ক থেকে নিউরাল সিগনাল আকারে হৃদপিণ্ডে নির্দেশ যায়। অর্থাৎ দেহের সিদ্ধান্তগ্রহণ ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ হয় মস্তিষ্ক থেকে। আধুনিককালে বিজ্ঞানীগণের গবেষণায় এর বিপরীত তথ্য উঠে এসেছে। HeartMath Institute এর গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে মস্তিষ্ক থেকে হৃদপিণ্ডে যে পরিমাণ সিগনাল যায়,  তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণ সিগনাল হৃদপিণ্ড থেকে মস্তিষ্কে যায়! শুধু তাই না, হৃদপিণ্ড থেকে মস্তিষ্কে যে সিগনাল যায়, সেগুলো বোধসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়াদি যেমনঃ মনোযোগ, উপলব্ধি,স্মৃতি এবং সমস্যা সমাধাণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তাঁদের গবেষণায় আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, হৃদপিণ্ড সহজাত জ্ঞান(intution) তৈরির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে। তাঁরা এও বলেছেন যে এ ব্যাপারে(অর্থাৎ মানুষের বোধ ও চিন্তার ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের ভূমিকা) মানুষের এখনো অনেক কিছু জানবার বাকি আছে।

“... HeartMath Institute have even indicated that the heart appears to play a key role in intuition. Although there is much yet to be understood, it appears that the age-old associations of the heart with thought, feeling, and insight may indeed have a basis in science. ...”  [12]    

 

প্রকৃতপক্ষে কুরআনে হৃদয় দ্বারা চিন্তার যে কথা বলা হয়েছে, তা বিশ্বাস করবার জন্য মুসলিমদের কোন বিজ্ঞান জার্নালের প্রয়োজন নেই। কেননা বিজ্ঞানের মতামত তো প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হয়। মুসলিমদের বিশ্বাস হচ্ছেঃ কুরআন ও সুন্নাহ হচ্ছে ওহী, এগুলো স্রষ্টাপ্রদত্ত জ্ঞান। কাজেই এগুলো মানুষের যে কোন জ্ঞান-বিজ্ঞানের থেকে এগিয়ে আছে। মুসলিমরা বিজ্ঞানের আলোকে এগুলোকে বিচার করে না বরং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে বিচার করে। তবে আলোচ্য বিষয়ে কুরআনের তথ্য ও আধুনিক কালে বিজ্ঞানীদের গবেষণাকর্মের মধ্যে পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে এ দু’য়ের মধ্যে কোন বিরোধ নেই।

 আধুনিক বিজ্ঞান সুস্পষ্টভাবে বলছে যে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে হৃদয়ের ভূমিকা আছে। কাজেই আল কুরআনে উল্লেখিত তথ্য{চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে হৃদয়ের ভূমিকা} নিয়ে প্রশ্ন তুলছে যেসব তথাকথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’(?) মানুষ, তাদের নিজেদেরই বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

 

এবং আল্লাহ ভালো জানেন।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, হুদ ১১:৫

[2]  আল কুরআন, হাজ্জ ২২:৪৬

[3]  আল কুরআন, আ’রাফ ৭:১৭৯

[4]  আল কুরআন, আন’আম ৬:১২৫

[5]  সূত্রঃ কুরআনুল কারীম(বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির), ড.আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ১ম খণ্ড,  সুরা আন’আমের ১২৫নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ৬৯২

[6]   “Does the heart think or brain? What does the Quran say?” [Dr. Zakir Naik]

https://www.youtube.com/watch?v=O6xyVOzT7dc

[7]  “It All Comes from the Heart” by Diane M. Cooper

http://www.spiritofmaat.com/archive/nov3/prns/martin.htm

[8]   “Modern Research Reveals Your Heart Does Have a Mind of Its Own” by Dr. Mercola

http://articles.mercola.com/sites/articles/archive/2016/03/05/brain-heart-emotion.aspx

[9]  “The Heart Literally Has Its Own Brain” ~ Gregg Braden on Heart Math

https://tv.greenmedinfo.com/gregg-braden-institute-of-heartmath/

[10]  THINKING FROM THE HEART – HEART BRAIN SCIENCE

http://noeticsi.com/thinking-from-the-heart-heart-brain-science/

[11]  ডাউনলোড লিঙ্কঃ  https://www.heartmath.com/wp-content/uploads/2014/04/coherent_heart.pdf

[12]  “The Heart-Brain Connection”

https://www.heartmath.org/programs/emwave-self-regulation-technology-theoretical-basis/