স্রষ্টা কি তাঁর মতো আরেকজন স্রষ্টাকে তৈরি করতে পারেন?

ইসলামী বিশ্বাস সংক্রান্ত নাস্তিক্যবাদের অসারতা



 

☛ মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

☛ অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

অনুবাদকের ভূমিকাঃ আস্তিকদের বিরুদ্ধে নাস্তিকদের অন্যতম যুক্তি এটি। বহুকাল আগে থেকেই তারা স্রষ্টায় বিশ্বাসীদের উদ্যেশ্যে এই প্রশ্নটি করছে তারা বলেঃ স্রষ্টা কি তাঁরই মতো আরেকজন স্রষ্টাকে বানাতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে তো তিনি এক ও অতুলনীয় স্রষ্টা থাকেন না। আর যদি না পারেন তাহলে তো তিনি আর সর্বশক্তিমান থাকলেন না।  

মূলত তাদের এই প্রশ্নের মাঝেই অসারতা রয়েছে। এই প্রবন্ধে দ্বীন ইসলামের আকিদার আলোকে এর উত্তর প্রদান করা হয়েছে।

 

ফতোয়া নং ৮৭৬৭৭: নাস্তিকের প্রশ্নঃ আল্লাহ কি তাঁর  মতো আরেকজন ইলাহ সৃষ্টি করতে পারেন?

 

প্রশ্নঃ

কোনো কোনো নাস্তিক প্রশ্ন করে থাকে, “আল্লাহ যদি সব কিছু করতে পারেন, তাহলে কি তিনি তাঁর মতো আরেকজন ইলাহ বা উপাস্য বানাতে পারবেন?” অথবা “তিনি কি এমন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন যা এমন ভারী যে তিনি তা তুলতে পারবেন না?”

 

উত্তরঃ

আলহামদুলিল্লাহ্‌।

 

প্রথমতঃ

কারো উচিত সেই নাস্তিককে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। তাকে আল্লাহর অনুগ্রহ, নিয়ামত এবং নিদর্শনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়া যেগুলো আল্লাহর অস্তিত্বের ইঙ্গিত করে। আল্লাহর একত্ববাদ ও বড়ত্বের ইঙ্গিত করে। 

 

পুরো বিশ্বজগতই আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। ভেবে অবাক লাগে কী করে একজন অবিশ্বাসী একে এড়িয়ে যেতে পারে? কী করে একজন অবিশ্বাসী তাঁকে অমান্য করতে পারে বা অস্বীকার করতে পারে? প্রতিটি কদম, প্রতিটি চলন তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। আর প্রতিটি বস্তুর মাঝেই এই নিদর্শন আছে যে তিনি এক।

 

পথভ্রষ্ট নাস্তিকদের এই জাতীয় সংশয় সৃষ্টিকারী কথাবার্তা শোনা বৈধ নয়। তবে তাদের জন্য বৈধ যারা নাস্তিকদেরকে জবাব দেবার যোগ্যতা রাখেন এবং তাদেরকে খণ্ডন করতে পারেন। কাজেই এ ব্যাপারটিতে আমাদের খুবই সতর্ক থাকা উচিত। কারণ সংশয় সৃষ্টিকারী কোনো কথা অনেক সময় মনের মাঝে গেঁথে যেতে পারে। এরপর তা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক দুরূহ হতে পারে।

 

দ্বিতীয়তঃ

এই সংশয় সৃষ্টিকারী যুক্তিটি নাস্তিকদের অন্যতম প্রাচীন যুক্তি। আহলুল ইলমদের নিকট এর খুব মশহুর জবাব রয়েছে। যাকে দুইটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়।

 

১।

বিষয়টি অসম্ভব। কারণ কাউকে যদি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সে কী করে ইলাহ হয়? কেউ একই সঙ্গে ইলাহ এবং সৃষ্ট – এই বিষয়টি অসম্ভব।

 

দুরার আস সানিয়্যাহ মিনাল আজওয়াবাহ আন নাজদিয়্যাহ (৩/২৬৫) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ অন্য একটি বিষয়ে ইবন আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত আছে, “শয়তানেরা ইবলিসকে বললো, “হে আমাদের নেতা, আমরা আপনাকে কোনো সাধারণ ইবাদতকারীর মৃত্যুতে কেন সেভাবে উল্লাস করতে দেখি না যেভাবে একজন আলেমের মৃত্যুতে আপনাকে উল্লাস করতে দেখি? কারণ আলেমের (গুনাহতে) তো আমাদের অংশ নেই (কারণ তাঁর ক্ষেত্রে তাদের কুমন্ত্রণা ব্যার্থ হয়েছে) কিন্তু সাধারণ ইবাদতকারীর ব্যাপারে তো আমাদের অংশ আছে!”

ইবলিস তাদেরকে (ইবাদতকারীর কাছে) যেতে বললো। তারা ইবাদতকারীর কাছে গেলো। সেখানে গিয়ে তারা তাঁকে ইবাদতে মশগুল পেলো। তারা বললো, “তোমার কাছে আমাদের একটা প্রশ্ন আছে!” তিনি তাদের দিকে ফিরলেন। ইবলিস তাঁকে বললো, “তোমার রব কি তাঁর নিজের মতো অন্য কাউকে সৃষ্টি করতে পারবেন?”

জবাবে সে বললোঃ “আমি জানি না।”

ইবলিস বললোঃ “দেখলে তো, অজ্ঞতার জন্য তাঁর ইবাদত তাঁর কোনো উপকারেই আসেনি!”

 

শয়তানেরা এবার প্রশ্নটি একজন আলেমের নিকট করলো। জবাবে আলেম বললেন, “এটা অসম্ভব। কারণ সে যদি  যদি আল্লাহর মতোই হয়, তাহলে তো সে তো কোনো সৃষ্ট বস্তু না। কাউকে সৃষ্টি করার পর সে আল্লাহর মতো হবে – এটা এক অসম্ভব ব্যাপার। আল্লাহ যদি কাউকে সৃষ্টিই করেন, তাহলে সে আর আল্লাহর মতো নয় (কারণ আল্লাহ তা’আলা সৃষ্ট নন)সে তাহলে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন বান্দা।

 

ইবলিস বললোঃ “দেখলে, আমরা বছরের পর বছর ধরে যা (বিভ্রান্তি) গড়েছি, এই লোক নিমিষেই তা গুড়িয়ে দিতে পারে?”

এবং আল্লাহই উত্তম জানেন। বক্তব্য সমাপ্ত।

 

২।

আল্লাহর সাথে আরো একজন ইলাহ থাকতে পারে – এই ধারণাটিই অবাস্তব। এই ধারণা যে অবাস্তব, এর স্বপক্ষে বহু প্রমাণ আছে। আমাদের এই সুসংগঠিত বিশ্বজগতই অন্ততপক্ষে এর একটা প্রমাণ হতে পারে। একজন ব্যতিত যদি আরো একজন ইলাহ থাকতো, তাহলে এই বিশ্বজগতের পুরো ব্যাবস্থাটাই ভেঙে পড়তো। কারণ এই ইলাহেরা তাহলে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতো, প্রত্যেকেই অন্যের উপর জয়লাভ করতে চাইতো। ঠিক যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন,

 

لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلا اللَّهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ

অর্থঃ যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত, সুতরাং তারা যা বলে, আরশের রব আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।

[আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ২২]

 

مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِنْ وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهٍ إِذًا لَذَهَبَ كُلُّ إِلَهٍ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ

অর্থঃ আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র!

[আল কুরআন, মু’মিনুন ২৩ : ৯১]

 

ইবন কাসির(র.) তাঁর তাফসিরে বলেছেন, “যদি আল্লাহর কোনো শরীক থাকতো তবে সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মাবুদই তার সৃষ্টবস্তু নিয়ে পৃথক হয়ে যেতো এবং তখন জগতে শৃঙ্খলা বজায় থাকতো না। অথচ ঊর্ধ্ব ও অধঃজগতে পূর্ণ শৃঙ্খলা বিরাজ করছে। ইরশাদ হয়েছে,

مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ

অর্থঃ পরম করুণাময় আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো প্রকার ত্রুটি দেখতে পাবে না। (সুরা মুলক ৩)যদি সৃষ্টিকর্তা একাধিক হতো তবে প্রত্যেকেই অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইতো। একজন অন্য জনকে পরাজিত করতে চাইতো।” বক্তব্য সমাপ্ত।

 

“আল্লাহ কি এমন ভারী কিছু বানাতে পারবেন যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না” - একই কথা প্রশ্নের ক্ষেত্রেও সত্য। এটি অসম্ভব। কারণ আল্লাহই এই জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। এবং তিনি যে কোন মুহূর্তে একে ধ্বংস করবার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই এটা কী করে সম্ভব হতে পারে যে তিনি নিজেই একে তুলতে পারবেন না?  

 

নাস্তিকরা আল্লাহ তা’আলার এই বাণীর أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ [আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান (সুরা তালাক্ব ৬৫ : ১২)] সাধারণ অর্থকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়। এ জন্য তারা প্রশ্ন করেঃ আল্লাহ যদি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবানই হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি এই কাজটা করবার ক্ষমতা কেন রাখেন না?  

 

এর উত্তর হলোঃ এটা একটা অবাস্তব জিনিস। এবং এর কোনো অস্তিত্ব নেই (এটা কিছুই না)।

 

যেসব জিনিস অবাস্তব সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। যেহেতু এর কোনো অস্তিত্ব নেই, এটি আসলেই “কিছুই না”। যদিও (তাত্ত্বিকভাবে) মানুষের মন একে কল্পনা করতে পারে বা ধারণা করতে পারে। এটি তো জানা কথা যে, মানুষের মন অবাস্তব জিনিসের ব্যাপারে কল্পনা বা ধারণা করতে পারে। মানুষের মন একই সাথে বাস্তব কিংবা অবাস্তব এই বিপরীতমুখী দুইটি জিনিসকে একই সাথে কল্পনা করতে পারে।

আলোচ্য আয়াত (সুরা তালাক্ব ৬৫ : ১২) দাবি করে যে আল্লাহ তা’আলা সকল ‘কিছু’র (شيء) উপর ক্ষমতাবান। কিন্তু সেসব জিনিস ‘কিছু’ না, সেগুলো এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত নয়! কারণ সেগুলো তো ‘কিছু’ না। এসব জিনিসের অস্তিত্ব নেই। এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। 

 

একাধিক উলামার মতে, আল্লাহ তা’আলার ক্ষমতা বাস্তব বা সম্ভাব্য জিনিসের সাথে সম্পর্কিত। এর কারণ আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি। কারণ যার কোনো অস্তিত্বই নেই এবং যা অবাস্তব – সেটা মূলত ‘কিছু’ (شيء) না।

 

শাইখুল ইসলাম [ইবন তাইমিয়া] (র.) বলেছেন, “আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গী হলো, আল্লাহ তা’আলা সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান – এই কথার দ্বারা সকল বাস্তব জিনিসকে বোঝানো হয়। যা স্বভাবগতভাবেই অবাস্তব, যেমনঃ যার কোনো অস্তিত্বই নেই, এর মাঝে কোনো হাকিকত নেই। এর অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না। একে যে ‘কিছু’ই বলা যায় না, এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ একমত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “তাঁর (আল্লাহ) ন্যায় অন্য কাউকে সৃষ্টি করা।” এবং এই জাতীয় আরো বিষয়াবলী।”

বক্তব্য সমাপ্ত। [মিনহাজুস সুন্নাহ ২/২৯৪] 

 

ইবনুল কাইয়িম(র.) তাঁর ‘শিফাউল ‘আলিল’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৩৭৪) বলেছেন, “যেহেতু অবাস্তব জিনিসগুলো কোনো ‘কিছু’ নয়, কাজেই তাঁর (আল্লাহ) ক্ষমতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ সব ‘কিছু’র উপর ক্ষমতাবানআর কোনো বাস্তব জিনিসই তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়।

বক্তব্য সমাপ্ত।

 

এবং আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

আরবিঃ https://islamqa.info/ar/87677/

ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/87677/