কুরআন কি ঠিকভাবে সংরক্ষিত নেই?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

➫ মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

➫ অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

অনুবাদকের ভূমিকাঃ কিছু বর্ণনা আছে যেগুলো দেখে উলুমুল কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞ পাঠকরা আল কুরআনের সংরক্ষিত থাকা নিয়ে সংশয়ে পতিত হয়। অনেক সময়ে নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান মিশনারীরা এই সুযোগ সদ্বব্যবহার করতে কসুর করে না। সেই বর্ণনাগুলোর সাথে নিজস্ব বহু অপব্যাখ্যা সংযুক্ত করে মুসলিমদের মনে কুরআন সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টির অপচেষ্টা করে। এমন বেশ কিছু বর্ণনার ব্যাপারে এখানে আলোচনা করা হবে। এই বর্ণনাগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করলেই যে কারো সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে নিঃসন্দেহে আল কুরআন অবিকৃত ও সংরক্ষিত।

 

ফতোয়া নং ১৭৮২০৯: প্রশ্নকারীর সংশয়ের জবাব যিনি কিছু উদ্ধৃতি থেকে মনে করছেন কুরআন সঠিকভাবে সংরক্ষিত নেই

 

প্রশ্নঃ

আমি একটি হাদিস পড়েছি যেখানে উমার(রা.) বলেছেন, “আমি সুরা জুমু’আহতে “ফাসআও (ইলা যিকরিল্লাহ)” [فاسعوا إلى ذكر الله] এর বদলে “ফামদ্বু ইলা যিকরিল্লাহ” [ فامْضوا إلى ذكر الله ] পড়তাম [যার অর্থঃ “আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও” (৬২ : ৯)][দুররুল মানসুর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২১৯ ]

আমি আরো কিছু হাদিস পড়েছি যেগুলো ইঙ্গিত করে কুরআন সম্পূর্ণ নয়। যেমন, সাকিফাহতে অবস্থানকালে [নবী(ﷺ) এর ওফাতের পর সাহাবীরা যেখানে খলিফা ঠিক করবার জন্য একত্রিত হয়েছিলেন] উমার(রা.) এর হাদিস, যেখানে তিনি বলেছেন, “কুরআনে তো ১০২,৭০০টা অক্ষর ছিলো”। [আল ইতকান – সুয়ুতি, পৃষ্ঠা ৮৮]

অথবা এই বক্তব্যঃ “কেউ যেন দাবি না করে কুরআনের পুরো অংশই আছে। কারণ এর অনেক কিছুই এখন আর নেই।” [তাফসির দুররুল মানসুর – সুয়ুতি খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৪ ]

এবং উবাই ইবন কা’ব(রা.) বলতেন যে তাঁর মুসহাফে ২টি অতিরিক্ত সুরা আছে। খাল’ এবং হাফদ। [আল ইতকান – সুয়ুতি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৬]

সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি(র.) বলেছেন, “সহীহ বুখারীর আলোকে আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অন্যভাবে কুরআনের কিছু শব্দ বিকৃত হয়েছে। এ ব্যাপারে উসমান(রা.) এর সাক্ষ্য রয়েছে।” [ফাইযুল বারী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৫, ‘শাহাদাত’ (সাক্ষ্যসমূহ) শিরোনামের অধীনে]

সুয়ুতি(র.) তাঁর আল ইতকান গ্রন্থে (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৪) উসমান(রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, “আমাদের নিকট আজ যে মুসহাফ রয়েছে এতে কিছু ভুল বিদ্যমান।”

হিশাম ইবন উরওয়াহ বলেন, “আমি আয়িশা(রা.)কে কুরআনের ব্যাকরণগত ভুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।” إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ [নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, সাবেয়ী... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)], وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ  [আর যারা সলাতে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী... (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)] এবং  إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ [এই দুইজন নিশ্চিতই যাদুকর... (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)]

তিনি উত্তর দিলেন, “হে আমার বোনপো, এগুলো তো লিপিকারদের কাজ। তারা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে।”

[আল ইতকান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৩, ১৮৪] জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র.) এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, “শায়খাঈন (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) এর শর্তানুসারে এটি সহীহ বর্ণনা।”  

একইভাবে দুররুল মানসুর (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮০) এবং আল ইতকান (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫) এ বর্ণিত আছে, “নবী() এর যুগে সুরা আহযাবে ২০০ আয়াত ছিলো। এরপর উসমান(রা.) মুসহাফ সংকলন করার পরে একে বর্তমান দৈর্ঘ্যে ছোট করা হয়।

আয়িশা(রা.) থেকে একটি হাদিস আছে, “কুরআনে নাযিল হয়েছিল যে, দশবার দুধপানে বিবাহ হারাম হওয়া/মাহরাম হওয়া সাবিত হয়। তারপর তা পাঁচবার দুধপান দ্বারা রহিত হয়ে যায়। তারপর রাসুলুল্লাহ() ইন্তিকাল করেন আর সেগুলো তো কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।” ইমাম মুসলিম(র.) একে ‘দুধপান অধ্যায়’ এ বর্ণনা করেছেন।

 

এরপরেও আমরা কিভাবে এই কথা বলতে পারি যে কুরআন সংরক্ষিত আছে?

 

উত্তরঃ

আলহামদুলিল্লাহ্‌।

 

প্রথমতঃ

সুরা জুমু’আহ থেকে উমার(রা.) এর “ফামদ্বু ইলা যিকরিল্লাহ” [ فامْضوا إلى ذكر الله ] এভাবে পাঠ করার তথ্যটি তাঁর থেকে ইমাম বুখারী(র.) তাঁর সহীহতে একটি সত্যায়নকারী মু’আল্লাক রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবন জারির তাবারী(র.)ও একটি সহীহ সনদে এটি বর্ণনা করেছেন। এটি উসমানী মুসহাফের রসম [1] বা লিখনের থেকে ভিন্ন এবং এটি ৭ কিরাতের (পঠনপদ্ধতি) কোনোটির অন্তর্ভুক্ত নয়। কোনো কোনো আলেম একে এই আয়াতের আরেকটি কিরাত হিসাবে বিবেচনা করেছেন। অন্যদের মতে এটি একটি তাফসির বা ব্যাখ্যামূলক কিরাত। এখানে তিনি আয়াতে আল্লাহর দিকে ধাবিত হবার ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। যেটির অর্থ স্রেফ “দ্রুত হেঁটে যাওয়া” নয়। আরো কিছু সাহাবীর(রা.) মুসহাফে [2] এমনটি পাওয়া যায়। তাঁরা আয়াতের কোনো কোনো শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতেন, এবং তাঁদের কোনো কোনো ছাত্র সেগুলোকে আয়াতের একটি কিরাত হিসাবে বর্ণনা করতেন। 

 

তবে এখানে যা বোঝা যাচ্ছে – এটি ছিলো উমার(রা.) এর কিরাত। তিনি এভাবেই আয়াতটি পাঠ করতেন। কারণ এ ব্যাপারে উমার(রা.) পর্যন্ত সহীহ সনদ রয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এটি আয়াতের সেই কিরাতের বিকল্প যেটি উসমানী মুসহাফে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে নবী(ﷺ) এর সাহাবীরা সর্বসম্মতভাবে ইজমায় উপনীত হয়েছিলেন। এবং যেটি নিঃসন্দেহে মুসলিমদের মাঝে মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত হয়েছে। বরং এটি ছিলো এমন একটি হারফ [যে ৭টি পদ্ধতি বা হারফ (বহুবচনে আহরুফ) এ কুরআন নাজিল করা হয়েছিলো] উমার(রা.) যেটি সচরাচর পাঠ করতেন। এবং তিনি অন্য হারফগুলোকে নাকচ করতেন না। (উসমানী) মুসহাফে যা লিপিবদ্ধ হয়েছে তা ঐ আয়াতেরই আরেকটি হারফ। এখানে উভয় হারফই গ্রহণযোগ্য। তবে এটিও মনে রাখা দরকার যে, (উসমানী) মুসহাফে যা লিপিবদ্ধ হয়েছে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত [এই এই উসমানী মুসহাফই আজ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ পাঠ করে থাকে]।

 

দ্বিতীয়তঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

 সাকিফাহতে অবস্থানকালে [নবী() এর ওফাতের পর সাহাবীরা যেখানে খলিফা ঠিক করবার জন্য একত্রিত হয়েছিলেন] উমার(রা.) এর হাদিস, যেখানে তিনি বলেছেন, “কুরআনে তো ১০২,৭০০টা অক্ষর ছিলো [আল ইতকান – সুয়ুতি, পৃষ্ঠা ৮৮]

 

এখানে একটি ভুল এবং একটি প্রতারণা আছে।

ভুলটি আছে এই অক্ষরসংখ্যার মধ্যে। এখানে বলা হয়েছে কুরআনে মোট এক লক্ষ দুই হাজার সাতশটি অক্ষর ছিলো।

আর প্রতারণাটি হচ্ছে, আপনার উল্লেখিত বাক্যে অতিরিক্তভাবে ছিলোশব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। যাতে বাক্যটি দেখে মনে হয় কুরআনে বুঝি কিছু ঘাটতি আছে (এবং আগে মনে হয় কুরআনে আরো অক্ষর ছিলো!)। আর হাদিসটি এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যাতে এটা দেখে সবাই ভাবে সুয়ুতি(র.) এটা বর্ণনা করেছেন, সমর্থন করেছেন এবং সহীহ বলে চিহ্নিত করেছেন। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ উল্টো। উল্লেখিত উমার(রা.) এর এই রেওয়ায়েতটি বানোয়াট। ইমাম সুয়ুতি(র.) নিজেই এর সনদের সমালোচনা করেছেন। তিনি এর সনদের ব্যাপারে যাহাবী(র.) এর সমালোচনা উল্লেখ করেছেন। মিযানুল ইতিদাল (৩/৬৩৯) গ্রন্থে ইমাম যাহাবী(র.) এই হাদিসের ব্যাপারে বলেছেন, এটি একটি বাতিল বর্ণনা। ইবন হাজার আসকালানী(র.) লিসানুল মিযান (৫/২৭৬) গ্রন্থে তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। এ অবস্থায় এমন একটি হাদিসকে ব্যাখ্যা করবার কোনো আবশ্যকতাই নেই। কারণ এর মাতান অত্যন্ত রকমের মুনকার। কুরআনে মোট কতোটি অক্ষর আছে, এই তথ্য কোনো প্রমাণিত হাদিসে উল্লেখ নেই। আর এটা (কুরআনের অক্ষর গোণা) সাহাবীগণেরও (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) আমল ছিলো না।

 

ইমাম সুয়ুতি(র.) বলেছেন, তাবারানি(র.) উমার ইবন খাত্তাব(রা.) থেকে একটি মারফু বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, কুরআনে এক লক্ষ দুই হাজার সাতশটি অক্ষর আছে। যে আল্লাহর নিকট পুরষ্কারের আশায় ধৈর্যের সাথে এগুলো পাঠ করবে, সে এর প্রত্যেক অক্ষরের জন্য ডাগরনয়না হুরদের থেকে একজন স্ত্রী পাবে।

তাবারানী(র.) এর শায়খ মুহাম্মাদ ইবন উবায়দ ইবন আদাম ইবন আবি ইয়াস ব্যতিত এর সনদের অন্যান্যরা ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। ইমাম যাহাবী(র.) তাকে এ হাদিসের জন্য সমালোচনা করেছেন।

বক্তব্য সমাপ্ত। ইতকান ফি উলুম আল কুরআন (১/২৪২, ২৪৩)

 

শায়খ আলবানী(র.) বলেছেন, এই হাদিস জাল হবার লক্ষণ একদম পরিষ্কার। হাফিয যাহাবী(র.) এবং পরবর্তীতে আসকালানী(র.) উল্লেখ করেছেন যে এই ব্যক্তির বর্ণনাগুলোর মধ্যে এই হাদিসটি অন্যতম, যার একমাত্র বর্ণনাকারী ইনি! এমন বর্ণনার ক্ষেত্রে (বর্ণনাকারীর) তাঁরা যে সমালোচনা উল্লেখ করেছেন, এর বেশি সমালোচনা উল্লেখের কোনো প্রয়োজন নেই।

বক্তব্য সমাপ্ত। সিলসিলা আহাদিস আদ দ্বঈফাহ ওয়াল মাউযুআহ (৯/৭১)

কুরআনের অক্ষর গণনার ব্যাপারে সুয়ুতি(র.) উল্লেখ করেছেন, সাখাওয়ী(.) বলেছেন, কুরআনের শব্দ বা অক্ষর গণনা করবার কোনো উপকারিতা আমার জানা নেই। কারণ উপকারিতা যদি থেকেই থাকতো, তাহলে তা এমন কোনো কিতাবের ক্ষেত্রে হতো যাতে কোনো কিছু যুক্ত করা যায় বা বাদ দেয়া যায়। কুরআনের ক্ষেত্রে তা কখনো সম্ভব নয়।

বক্তব্য সমাপ্ত। ইতকান ফি উলুম আল কুরআন (১/২৪২)

 

তৃতীয়তঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

এই বক্তব্যঃ “কেউ যেন দাবি না করে কুরআনের পুরো অংশই আছে। কারণ এর অনেক কিছুই এখন আর নেই।” [তাফসির দুররুল মানসুর – সুয়ুতি খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৪ ]

 

এর জবাব হচ্ছেঃ

সুয়ুতি(র.) এর আল ইতকান অথবা মুসলিমদের অন্য কোনো কিতাব থেকে হুবহু এই শব্দে বাক্যটির কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। এই বাক্যটির একটি সূত্র পাওয়া গেছে সাঈদ ইবন মানসুরের তাফসিরে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইবন উমার(রা.) থেকে নাফি, তাঁর থেকে আইউব, তাঁর সুত্রে ইসমাঈল ইবন ইব্রাহিম আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যেন না বলে, “আমি সম্পূর্ণ কুরআন শিখেছি।কারণ সে কিভাবে বুঝবে এর সম্পূর্ণ অংশ কী? তার থেকে হয়তো কুরআনের অনেক অংশই ছুটে গেছে। বরং সে যেন বলে, “আমাদের নিকট যতোটুকু এসেছে, আমরা ততোটুকুই শিখেছি।

বক্তব্য সমাপ্ত।

 

ইবন উমার(রা.) এর এই বক্তব্যের উদ্যেশ্য হলোঃ কেউই নিশ্চিতভাবে এটি বলতে পারে না যে কুরআন হিসেবে যা নাজিল হয়েছে সে এর সম্পূর্ণ অংশই মুখস্ত করেছে। কারণ কিছু আয়াত নাজিল করে সেগুলো আবার তুলে নেয়া হয়েছে যাকে বলা হয় তিলাওয়াত নাসেখ (রহিত) করা ইবন উমার(রা.) নিজেই এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন “কারো জন্য এমনটি বলা অপছন্দনীয় “আমি সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ করেছি।” কারণ কুরআনের কিছু অংশ তো তুলে নেয়া (রহিত করা) হয়েছে।” তাঁর থেকে ইবন দ্বররিসের উদ্ধৃত রেওয়ায়েতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ জন্য ইমাম আবু উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লাম(র.) এটি বর্ণনা করেছেন এবং একটি অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করে শিরোনাম দিয়েছেন, “অধ্যায়ঃ কুরআন নাজিল হবার পরে এর থেকে যা তুলে নেয়া হয়েছে এবং যা মুসহাফে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।” সুয়ুতি(র.)ও তাঁর কিতাব আল ইতকান এর “নাসেখ তিলাওয়াত” অধ্যায়ে এই তথ্য উল্লেখ করেছেন।

 

আরো বিস্তারিত দেখুন ওয়েবসাইটের ১১০২৩৭ এবং ১০৫৭৪৬ নং প্রশ্নের উত্তরে।

 

চতুর্থতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

উবাই ইবন কা’ব(রা.) বলতেন যে তাঁর মুসহাবে ২টি অতিরিক্ত সুরা আছে। খাল’ এবং হাফদ। [আল ইতকান – সুয়ুতি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৬]

 

সুরা খাল’ বলতে যেটিকে বোঝানো হয়ঃ

بسم الله الرحمن الرحيم . اللهم إنا نستعينك ونستغفرك . ونثني عليك ولا نكفرك . ونخلع ونترك من يفجُرك

অর্থঃ “পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমরা আপনারই নিকট সাহায্য চাই, আপনার নিকট ক্ষমা চাই। আমরা আপনার প্রশংসা করি, আপনার প্রতি অকৃতজ্ঞ হই না। যারা আপনার বিরোধিতা করে, আমরা তাদেরকে অস্বীকার করি ও বর্জন করি।”

 

আর সুরা হাফদ বলতে যেটিকে বোঝানো হয়ঃ

بسم الله الرحمن الرحيم . اللهم إياك نعبد . ولك نصلي ونسجد . وإليك نسعى ونحفِد . نرجو رحمتك ونخشى عذابك . إن عذابك الجِدَّ بالكفار مُلحِق

অর্থঃ “পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, আপনার নিকট প্রার্থনা করি, আপনাকেই সিজদা করি। আপনার জন্যই আমরা শ্রমসাধনা করি, সংগ্রাম করি। আমরা আপনার রহমতের প্রত্যাশা করি, আপনার শাস্তিকে ভয় করি। আর অবশ্যই আপনার মহাশাস্তি কাফিরদের উপর আপতিত হবে।”

এখানে وإليك نسعى ونحفِد দ্বারা বোঝানো হয়েছেঃ আমরা আপনার আনুগত্য করার জন্য সংগ্রাম করি।

 

উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর মুসহাফে এই দুইটি ‘অতিরিক্ত’ সুরা ছিলো - এহেন দাবির জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, এগুলো তাঁর মুসহাফে ছিলো বটে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তা সর্বশেষ বার নাজিলের দ্বারা স্থিরিকৃত কুরআনের অংশ ছিলো। সাহাবীদের(রা.) মুসহাফগুলোর মধ্যে তাফসির এবং ফিকহী নানা বিষয়ও লিপিবদ্ধ থাকতো। এমনকি রহিত হওয়া আয়াতও থাকতো। এই দুইটি সুরা কুরআনের অংশ হিসাবে নাজিল হয়েছিলো এরপর আয়াতগুলো রহিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী তা সলাতে কুনুত হিসাবে তিলাওয়াত করতেন। [3] কারণ এর মাঝে আল্লাহর নিকট দোয়া ও আল্লাহর প্রশংসা রয়েছে। কেউ যদি (সর্বশেষ নাজিলের মাধ্যমে) কুরআনের চূড়ান্ত রূপটির ব্যাপারে জানতে চায়, তাহলে সে জানুকঃ এটি ছিলো আবু বকর(রা.) এর সংকলনকৃত মুসহাফের মধ্যে এবং এরপর উসমান(রা.) এর সংকলনের মধ্যে। এর মাঝে যা রয়েছে তা সংরক্ষিত, লিপিবিদ্ধ এবং অকাট্য। এবং এই মুসহাফে ঐ ২টি সুরা নেই। এ কারণে সলাতে (সুরা ফাতিহার পরে) কেউ তা তিলাওয়াত করে না। এগুলোর কোনো তাফসিরও লেখা হয়নি। এগুলো পাঠ করবার ভিন্ন আহরুফও নেই। এগুলো যে এক সময় কুরআনের দুইটি সুরা ছিলো এবং পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে এটা স্বয়ং ইমাম সুয়ুতি(র.) এর অভিমত।

 

ইমাম সুয়ুতি(র.) বলেছেন, হুসাইন ইবনুল মুনাদি  তাঁর ‘নাসিখ ওয়াল মানসুখ’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, “যেসব জিনিস কুরআন থেকে উঠিয়ে নেয়া (রহিত করা) হয়েছে কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে চলে যায়নি, এর মধ্যে অন্যতম হলো বিতরের কুনুতের দুইটি সুরা। যেগুলোকে বলা হয় সুরা খাল’ এবং সুরা হাফদ।”

বক্তব্য সমাপ্ত। সমাপ্ত। ইতকান ফি উলুম আল কুরআন (২/৬৮)

 

শায়খ মুহাম্মাদ আমিন আশ শানকিতি(র.) বলেছেনঃ সুন্নাহর দ্বারা কুরআনের আয়াত রহিত হবার উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ১০ বার দুধপানের আয়াত রহিত হওয়া যার তিলাওয়াত এবং হুকুম মুতাওয়াতির সুন্নাহর দ্বারা রহিত হয়েছে আরো উল্লেখ করা যায় সুরা খাল’ এবং সুরা হাফদের কথা। এর উভয়ের তিলাওয়াত ও হুকুম মুতাওয়াতির সুন্নাহ দ্বারা রহিত হয়েছে। মালিকিদের মতে সুরা খাল’ ও সুরা হাফদ সকালে (ফজরের সলাতে) কুনুত হিসাবে পড়তে হয়। দুররুল মানসুরের লেখক সুয়ুতি(র.) এবং অন্যান্যদের অভিমত হচ্ছে এগুলো ছিলো আল্লাহর কিতাবের দুইটি সুরা। পরবর্তীতে এদেরকে রহিত করা হয়।

বক্তব্য সমাপ্ত। আদওয়াউল বায়ান (২/৪৫১)

 

উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর কিরাত নাফি, ইবন কাসির, আবু আমর এবং অন্যান্যদের থেকে বর্ণিত আছে। এবং তাঁদের কারো বর্ণনায় সুরা হাফদ এবং খাল’ নেই। বরং তাঁর মুসহাফ এবং অন্য সব মুসলিমের মুসহাফ একই ছিলো। আবুল হাসান আশআরী(রা.) বলেছেন, “আমি বসরায় আনাস(রা.) এর মুসহাফ তাঁর কিছু বংশধরের নিকটে দেখেছি আমি দেখেছি সেই মুসহাফ আর অন্য সব মুসলিমের মুসহাফ হুবহু এক ছিলো। আনাস(রা.) এর এর বংশধর এটি রেওয়ায়েত করেছেন। এটা ছিলো উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর নির্দেশনায় আনাস(রা.) এর হাতে লেখা 

বক্তব্য সমাপ্ত।

 

উবাই ইবন কা’ব(রা.) এই দোয়া দুইটিকে (চূড়ান্তভাবে) কুরআনের অংশ মনে করতেন – তাঁর থেকে এমন কোনো বক্তব্যকে সহীহ ধরে নেবার ফলেই এই সকল সংশয়ের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু এমন দাবির পেছনে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ এমন কোনো কিছু তাঁর থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়নি।

 

সারকথাঃ এ সকল সংশয়ের জবাব হচ্ছে - উবাই ইবন কা’ব(রা.) থেকে সহীহ সনদে এমন কিছু বর্ণিত হয়নি। কেউ যদি এমন দাবি করে, তাহলে তাকে এই দাবির স্বপক্ষে উবাই(রা.) থেকে সহীহ সনদে তা দেখাতে হবে। অথবা একে যদি সহীহও ধরে নেয়া হয় - এগুলো তো এক সময় কুরআনের অংশই ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এর তিলাওয়াত রহিত করা হয়। কিন্তু এর শব্দগুলো রয়ে গেছে, যেগুলো হচ্ছে সানা (আল্লাহর প্রশংসা) এবং দোয়া। এবং এদেরকে কুনুত হিসাবে পাঠ করা শুদ্ধ।

 

মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল আযিম আয যারকানি(র.) বলেছেন, ইনতিসার কিতাবের লেখক উল্লেখ করেছেন, “উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর মুসহাফে কুনুতের যে শব্দগুলো লিপিবদ্ধ ছিলো এগুলো নাজিলকৃত কুরআনের অংশ বলে কোনো প্রমাণ নেই। বরং এগুলো হচ্ছে এক প্রকারের দোয়া। এগুলো যদি কুরআন হতো তাহলে তা আমাদের নিকট সহীহভাবে বর্ণিত হতো এবং কুরআন হিসাবে পৌঁছাতো অতঃপর তিনি বলেছেন,হতে পারে এর মাঝে কিছু শব্দ আছে যা এক সময় কুরআন হিসেবে নাজিল হয়েছিলো। পরে একে রহিত করা হয়এই শব্দগুলোকে দোয়াতে (কুনুত) পাঠ করা কিংবা কুরআনের শব্দ বাদে অন্য শব্দের সাথে মিশ্রিত করা বৈধ তবে (এটি কুরআনের অংশ) এমন কিছু তাঁর থেকে সহীহভাবে বর্ণিত নেই। বরং বর্ণিত আছে তিনি এগুলোকে তাঁর মুসহাফে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি তাঁর মুসহাফে এমন শব্দও লিখতেন যা কুরআনের অংশ নয়। যেমনঃ দোয়া, ব্যাখ্যা ইত্যাদি। বক্তব্য সমাপ্ত।

 

এই দোয়াকে হানাফী আলেমগণ কুনুত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন উবাই(রা.) তাঁর মুসহাফে এগুলোর শব্দাবলীর জন্য (কুরআন হিসেবে নয় বরং দোয়া হিসেবে) সুরা খাল’ এবং সুরা হাফদ নামে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ নামেই এগুলো পরিচিত ছিলো। [4]

 

উপসংহারঃ

কোনো কোনো সাহাবী(রা.) নিজেদের জন্য কুরআনকে মুসহাফে লিপিবদ্ধ করতেন। এগুলো শুধুমাত্র তাঁদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য ছিলো এবং এগুলোর মাঝে এমন শব্দও থাকতো যা কুরআনের অংশ নয়। কুরআনের যেসব আয়াত বুঝতে কষ্ট হতো এসব মুসহাফের মধ্যে সেগুলোর ব্যাখ্যাও লিখিত থাকতো। অথবা কিছু দোয়াও লিপিবদ্ধ থাকতো যেগুলো কুরআনের দোয়ার মতো। যেগুলোকে সলাতে কুনুত অথবা দোয়া হিসেবে পড়া যায়। সাহাবীরা জানতেন যে তাঁদের মুসহাফের সম্পূর্ণ অংশই কুরআন নয়। তখন লেখার উপকরণের সংকট ছিলো। আর তাঁরা জানতেন যে এই মুসহাফগুলো শুধু তাঁরা নিজেদের জন্যই লিখছেন, অন্য কেউ এগুলো পড়বে না। তাই তাঁরা বিষয়টি সহজভাবে নিতেন। কারণ তাঁরা অন্য শব্দের সাথে কুরআনকে মিলিয়ে ফেলা এবং বিভ্রান্ত হওয়া থেকে নিরাপদ ছিলেন। পরবর্তীকালে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর কিছু মানুষ ভাবা শুরু করলো এসব মুসহাফে যা লিপিবিদ্ধ করে হয়েছে এর সবটুকুই কুরআন। যদিও প্রকৃত ব্যাপার মোটেও তা ছিলো না। আমরা ইতিমধ্যেই এটি ব্যাখ্যা করেছি।

বক্তব্য সমাপ্ত। মানাহিল আল ইরফান ফি উলুম আল কুরআন (১/২৭১)

 

এ বিষয়ে আরো জানতে এই শিরোনামের প্রবন্ধটি দেখুনঃ  “ফাইদ্বুর রব্ব ফির রাদ্দ ‘আলা মান ইদ্দা’আ আন্না হুনাকা সুরাতাঈন যাইদাতাঈন ফি মুসহাফ উবাই ইবন কা’ব”

 

পঞ্চমতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি(র.) বলেছেন, সহীহ বুখারীর আলোকে আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অন্যভাবে কুরআনের কিছু শব্দ বিকৃত হয়েছে। এ ব্যাপারে উসমান(রা.) এর সাক্ষ্য রয়েছে। [ফাইযুল বারী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৫, ‘শাহাদাত’ (সাক্ষ্যসমূহ) শিরোনামের অধীনে]

 

দুঃখের সাথে আমরা জানাচ্ছি যে – এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। এর কোনো ভিত্তি নেই। সাইয়িদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি(র.) অথবা অন্য কোনো মুসলিম মুসলিম আলেম থেকে এমন কিছুই বর্ণিত নেই।

 

ষষ্ঠতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

সুয়ুতি(র.) তাঁর আল ইতকান গ্রন্থে (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৪) উসমান(রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, “আমাদের নিকট আজ যে মুসহাফ রয়েছে এতে কিছু ভুল বিদ্যমান।”

 

সুয়ুতি(র.) আসলে যা বলেছেন তা মোটেও এই কথা নয়। উসমান(রা.) বা অন্য কোনো সাহাবী থেকে এমন কোনো বক্তব্যের প্রমাণ নেই। এমন কিছু যদি সহীহভাবে বর্ণিত হতো তাহলে এর একটা সরল অর্থ থাকতো। আমরা এ ব্যাপারে ১৩৫৭৫২ নং প্রশ্নের উত্তরে বিষদ ব্যাখ্যা করেছি।

 

সপ্তমতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

হিশাম ইবন উরওয়াহ বলেন, “আমি আয়িশা(রা.)কে কুরআনের ব্যাকরণগত ভুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।” إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ [নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, সাবেয়ী... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)], وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ  [আর যারা সলাতে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী... (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)] এবং  إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ [এই দুইজন নিশ্চিতই যাদুকর... (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)]

তিনি উত্তর দিলেন, “হে আমার বোনপো, এগুলো তো লিপিকারদের কাজ। তারা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে।” [আল ইতকান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৩, ১৮৪] জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র.) এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, “শায়খাঈন (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) এর শর্তানুসারে এটি সহীহ বর্ণনা।”  

 

কিন্তু এই বর্ণনাটি আয়িশা(রা.) থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়নি। এ ব্যাপারে ১৩৫৭৫২ নং প্রশ্নের উত্তরে বিষদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

 

অষ্টমতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

একইভাবে দুররুল মানসুর (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮০) এবং আল ইতকান (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫) এ বর্ণিত আছে, “নবী() এর যুগে সুরা আহযাবে ২০০ আয়াত ছিলো। এরপর উসমান(রা.) মুসহাফ সংকলন করার পরে একে বর্তমান দৈর্ঘ্যে ছোট করা হয়।

 

এই শব্দচয়ন থেকে অনেকের মনে হতে পারে – কুরআন বুঝি বিকৃত হয়েছে! অথচ সঠিকভাবে এই শব্দচয়ন বর্ণিত হয়েছে ইবন হিব্বান(র.) থেকে তাঁর সহীহ গ্রন্থে (১০/২৭৩)। এবং হাকিম(র.) থেকে তাঁর মুসতাদরাকে (২/৪৫০)। উবাই ইবন কা’ব(রা.) থেকে যিরর বর্ণনা করেছেন, “সুরা আহযাব দৈর্ঘ্যে সুরা বাকারাহর সমান ছিলো। আর এতে এই আয়াত ছিলোঃ الشَّيْخُ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة [যদি বয়স্ক পুরুষ ও মহিলা ব্যাভিচার করে, তবে তাদের উভয়কে রজম করো]”। একই রকম আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন নাসাঈ(র.) তাঁর আল কুবরা গ্রন্থে (৪/২৭১, ২৭২)। এটা সে সকল আয়াতের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো রহিত হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে আলোচনা করেছি যাতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে এভাবে রহিতকরণ হতে পারে।

 

নবমতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

আয়িশা(রা.) থেকে একটি হাদিস আছে, “কুরআনে নাযিল হয়েছিল যে, দশবার দুধপানে বিবাহ হারাম হওয়া/মাহরাম হওয়া সাবিত হয়। তারপর তা পাঁচবার দুধপান দ্বারা রহিত হয়ে যায়। তারপর রাসুলুল্লাহ() ইন্তিকাল করেন আর সেগুলো তো কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।” ইমাম মুসলিম(র.) একে ‘দুধপান অধ্যায়’ এ বর্ণনা করেছেন।

 

এটি সহীহ বর্ণনা। এই বর্ণনায় উভয় প্রকার রহিতকরণের উল্লেখ আছে। প্রথম প্রকার হলো, তিলাওয়াত ও হুকুম উভয়ই রহিত হওয়া। রহিত হওয়া আয়াতে কোনো ব্যক্তি ১০ বার দুধপানের দ্বারা মাহরাম সাব্যস্ত হবার কথা বলা ছিলো। দ্বিতীয় প্রকার হলো আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হওয়া কিন্তু হুকুম বহাল থাকা। ৫ বার দুধপানের দ্বারা কারো মাহরাম সাব্যস্ত হওয়া সংক্রান্ত আয়াত যার অন্তর্গত। যদিও আয়াতটি তুলে নেয়া (রহিত করা) হয়েছে এবং আয়াতটি (তিলাওয়াত) আর অবশিষ্ট নেই, আয়াতটির মধ্যে একটি শারঈ বিধান ছিলো যা এখনো সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত।  

 

আয়িশা(রা.) এর এই বক্তব্যঃ “তারপর রাসুলুল্লাহ() ইন্তিকাল করেন আর সেগুলো তো কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত” – থেকে আমরা যা বুঝতে পারি তা হলো, এই আয়াত [নবী() এর জীবদ্দশার] শেষ দিকে রহিত করা হয়েছিলো এবং এই রহিতকরণের খবর কারো কারো নিকট তখনও পৌঁছায়নি। তবে উসমানী মুসহাফের কোনো পাণ্ডুলিপিতে এই আয়াত ছিলো না, যা ইঙ্গিত করে এই আয়াত চূড়ান্তভাবে কুরআনের অংশ ছিলো না। যে কারণে এই আয়াতের কোনো শব্দ, কিরাত অথবা তাফসিরও দেখা যায় না।

 

ইমাম নববী(র.) বলেছেন, “আয়িশা(রা.) এর বক্তব্যঃ “তারপর রাসুলুল্লাহ() ইন্তিকাল করেন আর সেগুলো তো কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত”। তিনি এখানে يقرأ তে يতে পেশ যুক্ত করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, ৫ বার দুধপানের আয়াত রহিতকরণ এতো পরে হয়েছে যে যখন নবী() মারা গেলেন তখনও কিছু লোক ৫ বার দুধপানের আয়াত পাঠ করতো। তারা তখনো একে পঠিতব্য কুরআনের অংশ মনে করতো কারণ এই আয়াত রহিত হবার খবর তখনও তাদের নিকট পৌঁছায়নি। কারণ তা (এই আয়াতের রহিতকরণ) খুব অল্প সময় আগে ঘটেছিলো। কিন্তু যখনই এই রহিতকরণের সংবাদ তাদের নিকট পৌঁছালো, তারা তা (পাঠ করা) পরিত্যাগ করলো এবং সকলে একমত হলো যে এই আয়াত আর পঠিতব্য নয়।  

 

রহিতকরণ তিন প্রকার।

১। আয়াতের হুকুম ও তিলাওয়াত উভয়ই রহিত হওয়া। যেমনঃ ১০ বার দুধপানের আয়াত।

২। আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হওয়া কিন্তু হুকুম বহাল থাকা। যেমনঃ ৫ বার দুধপানের আয়াত, বয়স্ক পুরুষ ও মহিলা ব্যাভিচার করলে তাদেরকে রজম করার আয়াত।

৩। আয়াতের হুকুম রহিত হওয়া কিন্তু তিলাওয়াত বহাল থাকা। এই প্রকারের রহিতকরণ সব থেকে বেশি দেখা যায়।  এমন আয়াতের মধ্যে আছেঃ

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم

অর্থঃ “আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য ওসিয়ত করবে...”

[আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ২৪০] ”

 

বক্তব্য সমাপ্ত। শারহ মুসলিম (১০/২৯)

আরো দেখুন ১৭৫৩৫৫ নং প্রশ্নের উত্তর।

 

দশমতঃ

আপনি উল্লেখ করেছেনঃ

এরপরেও আমরা কিভাবে এই কথা বলতে পারি যে কুরআন সংরক্ষিত আছে?

 

এর উত্তর হচ্ছেঃ হ্যাঁ, আমরা পূর্ণ নিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে এটি বলতে পারি। কুরআন অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক সংরক্ষিত আছে। যে এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে সে কাফির। তার অন্তরে ঈমানের লেশমাত্রও নেই। এ ব্যাপারে একটি বিস্তারিত আলোচনা দেখুন ১২৯১৭০ নং প্রশ্নের উত্তরে।

 

এবং আল্লাহই ভালো জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

আরবিঃ https://islamqa.info/ar/178209/

ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/178209/

 

অনুবাদকের টিকা

[1] Rasm – Wikipedia

https://en.wikipedia.org/wiki/Rasm

[2] একই মলাটের মধ্যে কিতাব আকারে লিখিত সম্পূর্ণ কুরআনের কপিকে ‘মুসহাফ’ বলা হয়।

[3] বিতর সলাতে কুনুত পড়বার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। কুনুতের মধ্যে হাদিসে উল্লেখিত যে কোনো দোয়া করা যায় অথবা অর্থের দিকে লক্ষ রেখে অন্য দোয়াও করা যায়। বিস্তারিত দেখুনঃ ‘রাহে বেলায়েত’ – ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, পৃষ্ঠা ৪১৮-৪২০।

যেহেতু কুনুতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই, সাহাবায়ে কিরাম(রা.) রহিত হয়ে যাওয়া কুরআনের ২টি সুরাকে কুনুত হিসাবে পড়তেন। কারণ সেগুলো তো আর কুরআনের সুরা হিসাবে ছিলো না এবং সেগুলোতে আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর নিকট দোয়া রয়েছে। সাহাবীদের অনুসরণে আমাদের দেশেও অনেকে এই রহিত হওয়া সুরা ২টিকে বিতরে কুনুতে পাঠ করে থাকেন। উত্তর আফ্রিকায় মালিকি মাযহাবের অনুসারীরা এই দোয়াগুলোকে ফজরের কুনুত হিসাবে পড়ে থাকেন। যেসব অজ্ঞ ইসলামবিরোধী বলতে চায় যে উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর কুরআনের ২টি অতিরিক্ত “সুরা হারিয়ে” (!) গেছে, তারা জানে না যে এই রহিত হওয়া সুরাগুলোও উম্মাহর নিকট থেকে হারিয়ে যায়নি। আজও কুনুত হিসাবে তা উম্মাহর অন্তরে জারি রয়েছে। এমনকি এগুলো যদি হারিয়েও যেতো, তবু এতে কোনো অসুবিধা ছিলো না।

[4]এ থেকে বোঝা গেলো এ প্রসঙ্গে দুইটি অভিমত রয়েছে। কারো কারো মতে সুরা খাল’ ও সুরা হাফদ এক সময়ে কুরআন হিসাবে নাজিল করা হয়েছিলো কিন্তু পরে তা রহিত করে দেয়া হয়। আবার কারো কারো মতে, এগুলো কুরআন হিসেবে নাজিলই হয়নি বরং উবাই(রা.) দোয়া হিসেবে তা স্বীয় মুসহাফে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। আর নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলোতে সকলে একমত এবং কারো দ্বিমত নেইঃ

১। সুরা খাল’ ও সুরা হাফদ উবাই(রা.) এর ব্যক্তিগত মুসহাফটির মধ্যে ছিলো।

২। উবাই(রা.) চূড়ান্তভাবে একে কুরআনের অংশ মনে করতেন না। এর প্রমাণ হচ্ছে, তাঁর থেকে বর্ণিত কোনো কিরাতেই এই সুরাদ্বয় নেই। তিনি একে চূড়ান্তভাবে কুরআনের অংশ মনে করলে অবশ্যই কুরআনের সুরা হিসেবে এদেরকে বর্ণনা করতেন।

৩। উসমানী মুসহাফ। উসমান(রা.) এর খিলাফতকালে যে মুসহাফ সংকলন করা হয় এর ১১৪টি সুরা এবং এর প্রতিটি অক্ষরের ব্যাপারে সকল সাহাবী একমত ছিলেন, সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একমত ছিলো। এই মুসহাফের মাঝে লিপিবদ্ধ কুরআন হচ্ছে হুবহু সেই কুরআন  যা মৃত্যুর আগে নবী(ﷺ) এর উপর চূড়ান্তভাবে নাজিল হয়েছিলো।