হকিংয়ের খোদা ?! [Hawking’s GOD ?!]

নাস্তিক্যবাদের অসারতা



 

লিখেছেনঃ রাফান আহমেদ

 

– এই যে মাঠ দেখছিস, গড়পড়তা এটি ১২০ মিটার বাই ৯০ মিটার হয়। সবুজ হতে হবে মাঠ, বুঝলি? ঐ যে দুই পাশে সাদা বাক্সের মতো দেখছিস, ওগুলোকে গোলপোস্ট বলে, ওটা থেকে ৬ ইয়ার্ড ও ১৮ ইয়ার্ড দূরে দুটো সাদা বাক্স আঁকা। মাঠের মাঝখানে দেখ, একটা গোল্লা আঁকা। খেলা মোট ৯০ মিনিটের হয়, ৪৫ মিনিট পরে একটা ব্রেক। প্রতি দলে খেলোয়াড় লাগে ১১ জন, এর মধ্যে ১ জন গোলকীপার। খেলাওয়াড়দের কাজ হলো অপর গোলপোস্টের জালে বলটাকে জড়িয়ে দেওয়া। তারপর নাদনকোদন করে গোল উদযাপন। এটাই হলো ফুটবল। তবে সাবধান, ফাউল বা অফসাইড করা যাবে না। তাহলে মাশুল দিতে হবে, বুঝলি।

– হুম, বুঝলাম। তো এই খেলাটা বানালো কে?

– কেউ বানায় নি!

– মানে!! ফাজলামো করছিস?!

– নাহ! ফাজলামো করবো কেন? শোন, যেহেতু ফুটবল খেলার জন্য নিয়ম বা সূত্র আছে, সুতরাং ফুটবল খেলা নিজেকে শূন্যতা থেকে সৃষ্টি করতে পারে।

– গাঁজা খেয়েছিস নাকি? প্রথমবার খেলি?

 

গল্পের ১ম জনের ব্যাখ্যা শুনে আমার-আপনার অভিব্যক্তি ২য় জনের সাথে পুরোপুরি না মিললেও খুব একটা ভিন্ন হবে না। আপনি হয়তো বলবেন, কিরে রঙ্গিন পানি খেয়েছিস নাকি? প্রথমবার খেলি? অথবা কিরে বাবা খেয়েছিস নাকি? প্রথমবার খেলি?

 

তো কেন এমন অভিব্যক্তি? কারনটা সহজ, আমরা সবাই জানি সূত্র কোনো স্বতন্ত্র-স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্ত্বা নয়। এগুলো হলো কিছু প্যাটার্ণ, কমন সেন্স বলে এগুলো কোনো বুদ্ধিমত্তার দিকে ইঙ্গিত করে। সূত্র আছে তাই হাওয়া থেকে হয়ে গেছে এমন গাঁজাখুরি ব্যাখ্যা কোন সুস্থ মানুষ মানবে না। তবে হ্যাঁ, কোনো বিজ্ঞানী যদি বলে? তাহলে মানবে কি?

 

তো হঠাৎ এমন কথা কেনো জুড়ে দিলাম বলুন তো। লেখার শিরোনাম দেখে ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন লেখাটার সাথে প্রয়াত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ নাস্তিক স্টিফেন হকিং এর কোনো না কোন কানেকশান আছে। তো কি সেই কানেকশান? একটু খুলেই বলি কেমন?

 

স্টিফেন হকিং তার A Brief History of Time গ্রন্থ লিখে একসময় বেশ নজরে আসেন। নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও এই বইতে তিনি এমন কিছু উক্তি করেন যা আস্তিকতার পক্ষে ইঙ্গিত বহনকারী। যেমন মহাবিশ্বের অভূতপুর্ব ডিজাইন ও সমন্বয় দেখে বলেছিলেন –

 

মহাবিশ্বের সূচনা ঠিক এমন (মাপা) কেনো হলো সেটার ব্যাখ্যা দিতে চাইলে – এটি এক স্রষ্টার কাজ যিনি আমাদের মতো সত্ত্বাকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, এমন ব্যাখ্যা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনোভাবে এই সমন্বয়ের সুরাহা করা খুবই কঠিন।  [১]

 

সেই তিনিই আবার মরার আগে আরেক বই লিখলেন The Grand Design শিরোনামে। এই বইতে এসে তিনি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন। আমাদের ফুটবল গল্পের প্রথম চরিত্রের মত গাঁজাখুরি কথা বলে বসলেন! বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরে বসলো তাকে!  তো, কি বললেন তিনি? তিনি বললেনঃ

 

যেহেতু মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের মতো পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র রয়েছে, (তাই) মহাবিশ্ব নিজেকে শূন্যতা থেকে সৃষ্টি করতে পারে এবং তা করবেও [২]

 

ব্যস, কেল্লাফতে। নাস্তিক-মুক্তমণা সম্প্রদায় তো মহা খুশি। নবী কইছে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে সৃষ্ট হতে পারে! আর কি লাগে! এইবার নিশ্চিন্তে –

 

দুনিয়াটা মস্তবড়,

খাও-দাও ফূর্তি করো

আগামীকাল বাঁচবে কিনা বলতে পারো।

(পাশাপাশি ইসলাম বিরোধী পোস্ট মারো

জার্মানী থেকে ডাক পেতেও পারো,

নাহলে অন্তত, টাকার গন্ধ পেতে পারো!)

 

কিন্তু ঝামেলা হলো, যে সূত্রকে তিনি স্বয়ম্ভূ বানিয়ে নিলেন সেগুলো কোথা থেকে এলো? সূত্র হলো কিছু নিয়ম, প্রকৃতিতে থাকা কিছু প্যাটার্ন, যা অন্য কোনো বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন সত্ত্বা নির্ধারণ করেন। যেহেতু এই কোম্পানি ঠিকঠাক নিয়মমত চলছে, তাই এটি শূন্য থেকে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে – এমন কথা কোনো পাগলও বলবে কি?

 

হকিং এমন কথার মানে হলো, মহাবিশ্বে এমন মাপা সূচনা পদার্থবিজ্ঞানীদের সূত্রই নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাহ বাহ! এই, ওয়েট আ মিনিট? তারমানে বিগ ব্যাং এর আগেও সূত্র ছিলো!! কিন্তু বিগ ব্যাং

এর আগে তো টাইম-স্পেস-এনার্জি-ল কিচ্ছু ছিলো না। তো সূত্র এলো কোথা থেকে? পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলোর জন্মই তো হয়েছে বিগ ব্যাং এর পর! এই সেরেছে! হকিং সাহেব খোদার জায়গায় সূত্রকে বসিয়ে দিলেন দেখছি! নটি বয়, স্যরি বুড়া!

 

হকিং এর এমন আজগুবি দাবী সম্পর্কে সেক্যুলার গবেষক, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ পল ডেইভিস বলেন,

 

হকিং এর এই দাবীকৃত সূত্র হলো মূলত ব্যাখ্যাহীন ও উর্ধ্বে অবস্থানকারী স্রষ্টার সমতূল্য! [৩]

 

বিজ্ঞান পদ্ধতিগত বস্তুবাদের দর্শন নিয়ে তার গবেষণা শুরু করে। তাই বস্তুজগতের উর্ধ্বে যা, তা বিজ্ঞানের নাগালের বাইরে। ফুটবলের নিয়ম দেখে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এই খেলার কোনো ডিজাইনার আছে, স্রষ্টা আছে। কারণ নিয়ম বা সুত্র হাওয়া থেকে ভেসে আসে না, এর নির্মাতা লাগে। তো মহাবিশ্বের সূত্রের নির্মাতা কে? কমন সেন্স বলে, কোনো কসমিক ডিজাইনার, মহাজাগতিক স্রষ্টা। কিন্তু বিজ্ঞান তা বলতে পারে না, কারণ সেই স্রষ্টা বস্তুজগতের বাইরে। ডার্ক এনার্জির ধারণা আবিষ্কারের জন্য ২০১১ সালে নোবেল পুরস্কার  পাওয়া টিমের একজন, প্রফেসর অ্যালেক্সে ফিলিপ্পেনকো এক সাক্ষাতকারে বলেন,

 

“… আমি মহাবিশ্বকে একজন বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতে চাই … কোন অতিমানবিক বা স্বকীয় স্রষ্টা আছেন কিনা বা এই মহাবিশ্বের কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানীরা দিতে পারে না…।” [৪]

 

তো হকিং সাহেব শুধু স্রষ্টার জায়গায় সূত্রকে বসিয়েছেন বস্তুবাদী হওয়ার কারণে, আর তার কথা শুনে বাচবিচার না করেই মুক্তমণারা যারপরনাই আনন্দিত। এদের জন্য কি রকম সমবেদনা হবে ফ্রান্স?

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[১] Stephen Hawking, A Brief History of Time; Chapter 8: The Origin and Fate of the Universe (Epub Edition, Bantham Books, 10th anniversary edition)

[২] Adam Gabbatt, Stephen Hawking says universe not created by God; Retrieved from: https://www.theguardian.com/science/2010/sep/02/stephen-hawking-big-bang-creator

[৩] https://www.theguardian.com/commentisfree/belief/2010/sep/04/stephen-hawking-big-bang-gap

[৪] ‘Scientists only understand 4% of universe’ Retrieved from: https://www.rt.com/news/universe-physics-laws-energy-329