কুরআনের ৭ হারফ এবং ১০ কিরাআত - ইবন তাইমিয়া(র.)

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া(র.) এর 'মাজমু’উল ফাতাওয়া' খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৮৯-৪০৩ থেকে;

অনুবাদঃ শেখ সা'দী

সম্পাদনা ও সংক্ষেপণঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়া(র.)কে জিজ্ঞাসা করা হয়:

নবী () বলেছেন: কুরআন সাত হারফে নাযিল করা হয়েছে এই ৭ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? এই যে নাফে’, আসেম ও অন্যদের সাথে সম্পৃক্ত করে যে কিরাআতগুলো রয়েছে এগুলোই কি ৭ হারফ? নাকি এগুলো ৭ হারফের একটি? মুসহাফের (সম্পূর্ণ কুরআনের কপি) লেখনী থেকে সম্ভাব্য পাঠের ক্ষেত্রে ক্বারীদের মতভেদ কী কারণে হল? … …

 

তিনি উত্তরে বলেন:

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর যিনি জগৎসমূহের প্রভু।

এটি বেশ বড় একটি মাসআলা। আলেমদের বহু শ্রেণী যেমন ফুকাহা, ক্বারীগণ, হাদিসবিদ, তাফসিরবিদ, কালামবিদ, অভিধানবিদ এবং অন্যান্যরা এই নিয়ে কথা বলেছেন। এমনকি এই বিষয়ে গ্রন্থও রচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ যে গ্রন্থ এককভাবে এই বিষয়ে রচিত হয়েছে তার লেখক হচ্ছেন শায়খ আবু মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান বিন ইসমাইল বিন ইব্রাহীম আশ শাফেয়ী(র.), যিনি ‘শারহুশ শাতিবিয়্যাহ’ রচয়িতা । তিনি আবু শামাহ নামে প্রখ্যাত। এই বিষয়ে মানুষের বিভিন্ন বক্তব্য, তাদের দলিল-প্রমাণ এবং এসব থেকে সত্যকে সাব্যস্ত করতে হলে প্রাসঙ্গিক হাদিসগুলো, হাদিসের শব্দগুলো এবং এর সমস্ত দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করতে হবে যা একটি সুবিস্তৃত আলোচনা। এই স্থানে এটি করার সুযোগ নেই। তাছাড়া এমন প্রশ্নের উত্তরে এটি করা উপযোগীও নয়। তবে আমরা এমন কিছু সামগ্রিক পয়েন্ট উল্লেখ করব যা থেকে উত্তর প্রদানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগতি লাভ হবে।

 

সুতরাং আমরা বলি - নবী (ﷺ) যেই ৭ হারফে কুরআন নাযিল হওয়ার কথা বলেছিলেন সেগুলো এই প্রসিদ্ধ ৭ ক্বারীর কিরাআত নয়। এ প্রসঙ্গে গণ্যমান্য আলেমদের মাঝে কোনো মতদ্বন্দ্ব নেই ।

 

বরং সর্বপ্রথম যিনি তাদের কিরাআতগুলো একত্রিত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন ইমাম আবু বকর বিন মুজাহিদ(র.)। যা হয়েছিল ৩য় শতকের সূচনায় বাগদাদে। তিনি চেয়েছিলেন দুই হারাম (মক্কা-মদীনা), দুই ইরাক (ইরাক-ইরান অঞ্চল) এবং শামের (বৃহত্তর সিরিয় অঞ্চল) প্রসিদ্ধ কিরাআতগুলো একত্রিত করবেন। কেননা এই শহরগুলো থেকেই নবুওতের ইলম তথা কুরআন, এর তাফসির, হাদিস, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন আমলের ফিকহ এবং দ্বীনের সমস্ত ইলম উৎসারিত হয়েছে। যখন তিনি এই শহরগুলোর প্রসিদ্ধ ৭ ক্বারীর কিরাআত একত্রিত করার পরিকল্পনা করেন তিনি চেয়েছিলেন যেন এতে নাযিল হওয়া কুরআনের ৭ হারফের সাথে মিল থাকে।  ব্যাপারটি এমন নয় যে তিনি এই ৭ কিরাআতকে ৭ হারফ বলে বিশ্বাস রাখতেন। কিংবা তিনি নিজে অথবা আলেমদের কেউ নির্দিষ্টভাবে এই ৭টি কিরাআত বাদে অন্য কোন কিরাআতে কুরআন পড়া জায়েয নয় বলে বিশ্বাস রাখতেন এমনও নয়। এ কারণেই ক্বারী ইমামদের মধ্যে যার বলার তিনি বলেছিলেন: “যদি ইবন মুজাহিদ এই কাজে আমার অগ্রগামী না হতেন, তাহলে আমি হামযার কিরাআতের জায়গায় ইয়াকুব আল হাদ্বরামীর কিরাআতকে স্থান দিতাম।”  ইনি ২য় শতকের প্রথম ভাগে বসরার জামে মসজিদের ইমাম এবং নিজ যুগে বসরার ক্বারীদের ইমাম ছিলেন।

 

এ ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে কোনো মতদ্বন্দ্ব নেই যে, নাযিল হওয়া কুরআনের ৭ হারফে এমন কিছু নেই যাতে একে অন্যের অর্থের মাঝে সংঘর্ষ বা বৈপরীত্য তৈরি হয়। বরং হারফগুলোর অর্থগুলো পরস্পর অনুরূপ অথবা কাছাকাছি। যেমনটি আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ(রা.) এই হাদিসে বলেছিলেন - এগুলো এমনই; যেমন ধরা যাক তোমাদের কেউ বলে আকবিল” (এগোও),  আবার কেউ বলে হালুম্মা” (চলো),  কেউ বলে তাআল” (এসো)

 

এখানে কখনো কখনো একটির অর্থ অন্যটির অর্থের একদম সমান হয় না, তবে উভয় অর্থই সত্য হয়। এটা হচ্ছে প্রকরণ ও পার্থক্যমূলক ভিন্নতা, বৈপরীত্য বা সংঘর্ষমূলক ভিন্নতা নয়। এ ব্যাপারে নবী (ﷺ) থেকে এই মারফু’ হাদিসে এসেছে যে, তিনি বলেন: কুরআন ৭ হারফে নাযিল করা হয়েছে, যদি গফুরার রহীমাবল অথবা আযীযান হাকীমাবল, তবে আল্লাহ তো এমনই। একইভাবে যতক্ষন রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াত দিয়ে কিংবা আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াত দিয়ে সমাপ্ত না করছো।

 

প্রসিদ্ধ কিরাআতগুলোতে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে যেমন - “রাব্বানা বা’ইদ” ও “রাব্বানা বা’আদ”, “ইল্লা আন ইয়াখাফা আল্লা ইউক্বীমা” ও “ইল্লা আন ইউখাফা আল্লা ইউক্বীমা”, “ওয়া ইন কানা মাকরুহুম লাতাযূলা মিনহুল জিবাল” ও “ওয়া ইন কানা মাকরুহুম লাইয়াযূলা মিনহুল জিবাল”, “বাল ‘আজিবতা” ও “বাল ‘আজিবতু” ইত্যাদি।

 

এছাড়াও কিরাআতগুলোতে কখনো একদিক থেকে অর্থের সামঞ্জস্য থাকে এবং অন্য দিক থেকে বিছিন্নতা থাকে যেমন আল্লাহর বাণী “ইয়াখদা’ঊনা” ও “ইউখাদি’ঊনা”, “ওয়া ইয়াকযিবূনা” ও “ওয়া ইউকাযযিবূনা”, “ওয়ালামাসতুম” ও “ওয়া লা~মাসতুম”, “হাত্তা ইয়াত্বহারনা” ও “হাত্তা ইয়াত্ত্বাহ্‌হারনা”  ইত্যাদি।

 

যে কিরাআতগুলোর মাঝে অর্থে পরস্পর বিছিন্নতা রয়েছে তার প্রত্যেকটিই সত্য এবং এক কিরাআতের সাথে অন্য কিরাআতের সম্পর্ক হচ্ছে এক আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের সম্পর্কের মত। এর প্রত্যেকটির উপর ঈমান আনা এবং এর প্রতিটিতে যে অর্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে তার অনুসরণ করা ওয়াজিব। পরস্পরের মাঝে সংঘাত আছে ভেবে একটির কারণে অন্যটির ওয়াজিব বিধান পরিত্যাগ করা জায়েয নয়। বরং যেমনটি আব্দুল্লাহ বিন মাস’উদ(রা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এর কোন একটি হারফের প্রতি কুফর করবে, সে স্বয়ং কুরআনের প্রতিই কুফর করেছে।

 

আর যেসব ক্ষেত্রে শব্দ ও অর্থ এক হয়, কিন্তু এর উচ্চারণ পদ্ধতির একাধিক প্রকার থাকে যেমন হামযা, মাদ্দ, ইমালাত, হরকতের স্থানান্তর, ইযহার, ইদগাম, ইখতিলাস, ‘লাম’ কিংবা ‘রা’ এর হালকা কিংবা ভারী করা ইত্যাদি কিরাআতের উসুল সম্পর্কিত বিষয় খুবই স্পষ্ট ও প্রকাশ্য যে - এতে না শব্দে কোন সংঘর্ষ কিংবা বৈপরীত্য আছে, না অর্থে। কেননা শব্দ উচ্চারণ পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকরণ থাকার কারণে এটি একই শব্দ বা একই অর্থ হওয়া থেকে ব্যতিক্রম হয় না।

 

আর যদি এটি মুসহাফের (সম্পূর্ণ কুরআনের কপি) লেখনী অনুযায়ী হয়, তবে কেবল নুকতা কিংবা তাশকীলে (যের-যবর) ভিন্নতা থাকে। এ কারণেই অনুসরণীয় সালাফ ও ইমাম তথা অনুসরনীয় উলামায়ে ইসলামের কেউ এ নিয়ে বিবাদ করেন নি এবং বলেন নি যে - এই নির্দিষ্ট কিরাআতগুলোই মুসলিমদের সকল দেশে নির্দিষ্ট করে নিয়ে পড়তে হবে। বরং যার কাছে হামযার শায়খ আ’মাশের কিরাআত প্রমাণিত হবে কিংবা ইয়াকুব বিন ইসহাক আল হাদ্বরামীর কিরাআত কিংবা উভয়ের অনুরূপ অন্য কিরাআত যেমন হামযা ও আল কিসাইর কিরাআত প্রমাণিত হবে, তবে সে সেই কিরাআত অনুযায়ী (কুরআন)পড়তে পারবে। ইজমা ও খিলাফ বর্ণনাকারী অনুসরণীয় এবং স্বীকৃত আলেমদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। বরং অধিকাংশ নেতৃস্থানীয় উলামা যারা হামযার কিরাআত পেয়েছেন যেমন সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ, আহমাদ বিন হাম্বাল, বিশর বিন আল হারেস (রহিমাহুমুল্লাহ) এবং অন্যরা; তারা দুই মদীনাবাসী তথা আবু জাফর বিন আল ক্বা’ক্বা’ ও শায়বাহ বিন নিসাহর কিরাআত এবং বসরাবাসীদের কিরাআত যেমন - ইয়াকুব বিন ইসহাকের শায়খদের কিরাআতকে হামযা ও আল কিসাই’র কিরাআতের উপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। জ্ঞানী ইমামদের এই বিষয়ে বক্তব্য রয়েছে যা আলেমদের কাছে প্রসিদ্ধ। যেমনিভাবে এই (প্রচলিত)৭ কিরাআতের ব্যাপারে প্রমাণিত হয়েছে, একইভাবে ইরাকের যে ইমামদের কাছে ১০ কিরাআত কিংবা ১১ কিরাআত প্রমাণিত হয়েছে তারা এগুলো কিতাবসমূহে একত্রিত করেছেন। এবং সালাতে ও সালাতের বাইরে এগুলো পাঠ করেছেন। আর এটা আলেমদের মাঝে সর্বসম্মত একটি বিষয় যার কারণে কারো উপর আপত্তি করা যায় না।

 

৪র্থ শতকের মাঝামাঝিতে শায বা বিছিন্ন-পরিত্যাক্ত কিরাআত পাঠের কারণে ইবন শানবূযের উপর কাযী ইয়ায আপত্তি করেছিলেন। এই প্রসিদ্ধ ঘটনায় তার নিন্দা করে যেসব কথা উদ্ধৃত হয়েছে তার কারণ হচ্ছে - ইবন শানবূযের কিরাআত এমন শায বা বিচ্ছিন্ন কিরাআত ছিল যা [নবী (ﷺ) ও সাহাবীদের] মুসহাফ থেকে বিচ্যুত। এটি আমরা স্পষ্ট করে আলোচনা করব। আলেমদের কেউই ১০ কিরাআতের উপর আপত্তি করেন নি। তবে যদি এমন হয় যে, ইসলামী দুনিয়ার মাগরিব বা পশ্চিমাঞ্চলে কিংবা অন্য স্থানে থাকায় কেউ এর ব্যাপারে জ্ঞাত ছিলেন না কিংবা তার কাছে এটি প্রমাণিত ছিল না কারণ এই কিরাআতগুলোর কোন কোনোটি তার কাছে পৌঁছায় নি, তবে তাদের জন্য এই কিরাআতগুলো অনুযায়ী পাঠ করার অবকাশ নেই। কেননা কিরাআত হচ্ছে, যেমনটি যায়দ বিন সাবিত(রা.) বলেছেন: একটি সুন্নাহ যা পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে। যেভাবে নবী (ﷺ)থেকে সালাতের বিভিন্ন প্রকারের ইসতিফতাহ বা শুরুর দোয়া বর্ণিত হয়েছে। যেভাবে আযান, ইকামাত, সালাতুল খাওফ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকারের পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে, এটাও তেমনি। এই সবগুলোই হাসান এবং এগুলোর মধ্যে যে যেটা অনুযায়ী আমল করতে চায় সেটা তার জন্য শরিয়তসম্মত। কিন্তু যে একটি প্রকার জানে এবং অন্য প্রকার জানে না, তার জন্য জানা প্রকার থেকে সরে এসে অজানাতে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে যে এমন পদ্ধতি জানে না তার জন্য যে এটি জানে তার উপর আপত্তি করা কিংবা বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। যেমন নবী (ﷺ)বলেছেন: তোমরা মতবিরোধ করো না। কেননা তোমাদের পুর্ববর্তীরা বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে, ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

 

মুসহাফে উসমানীর [উসমান(রা.) এর সংকলিত কুরআন] লেখনী থেকে বিচ্যুত-বহির্গত শায কিরাআত যেমন ইবন মাস’উদ(রা.) ও আবু দারদা(রা.) এর কিরাআত وَاللَّيْلِ إذَا يَغْشَى وَالنَّهَارِ إذَا تَجَلَّى وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى যা সহীহাইনে (বুখারী ও মুসলিম) প্রমাণিত আছে, এছাড়াও আব্দুল্লাহর(রা.) কিরাআত فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مُتَتَابِعَاتٍ এবং إنْ كَانَتْ إلَّا زَقْيَة وَاحِدَةً ইত্যাদির ব্যাপারে কথা হচ্ছে - যদি এই কিরাআতগুলো কোন সাহাবী থেকে প্রমাণিত থাকে তবে সালাতে কি এটা পাঠ করা জায়েয আছে?

 

এতে দুইটি মত আছে এবং দুটোই ইমাম আহমাদ(র.) থেকে প্রসিদ্ধ দুই রেওয়ায়াত এবং ইমাম মালিক(র.) থেকেও এই দুইটি বর্ণিত আছে।

প্রথম মত হচ্ছে: এটা জায়েয কেননা সাহাবী, তাবেয়ীগণ এই হারফগুলো দিয়ে সালাতে পাঠ করতেন।

দ্বিতীয় মত হচ্ছে: জায়েয নয়। এটাই অধিকাংশ আলেমদের মত। কেননা এই কিরাআতগুলো নবী(ﷺ) থেকে মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত নেই। আর যদি প্রমাণিত হয়েও থাকে তবে এটি সর্বশেষ পেশকৃত কুরআনের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনা সহীহ কিতাবসমূহে আয়িশা(রা.) ও ইবন আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, “জিব্রাঈল(আ.) নবী(ﷺ) এর কাছে প্রতি বছর ১ বার করে কুরআন পেশ করতেন। কিন্তু যেই বছরে তাঁকে কবয করা (মৃত্যু দেয়া) হয়, সেই বছরে তিনি ২ বার পেশ করেন।”  আর এই সর্বশেষ পেশকৃত কুরআনই হচ্ছে যায়িদ বিন সাবিত(রা.) ও অন্যদের কিরাআত। খুলাফায়ে রাশেদা আবু বকর, উমার, উসমান, আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) একেই মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবু বকর(রা.) ও উমার(রা.) এটি আবু বকরের(রা.) খিলাফতকালে সহীফাসমূহে লেখান এবং যায়িদ বিন সাবিতকে(রা.)  লেখার আদেশ প্রদান করেন। অতঃপর উসমান(রা.) তাঁর খিলাফতকালে সাহাবা ও অন্যদের সর্বসম্মতিক্রমে এটি মুসহাফসমূহ লেখার আদেশ দেন এবং বিভিন্ন শহরে সকল মানুষের কাছে প্রেরণ করেন।

 

সুতরাং এই মতভেদের ব্যাপারে উত্তর সে অনুযায়ী দিতে হবে যার উপর ভিত্তি করে প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেছেন যে- এই ৭ কিরাআত কি ৭ হারফের ১টি নাকি না?

 

সালাফ ও ইমামদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমরা যে মতের উপর আছেন তা হচ্ছে - এই কিরাআতগুলো ৭ হারফের কেবল একটি হারফ এবং এই কিরাআতগুলো নবী() এর কাছে জিব্রাঈল(আ.) কর্তৃক সর্বশেষ পেশকৃত কুরআনের মাঝে অন্তর্ভুক্ত আছে। সুপ্রসিদ্ধ ও সুবিদিত হাদিস ও আছারসমূহ এটাই নির্দেশ করে।

 

 

আর প্রশ্নকারী যা জিজ্ঞেস করেছে “মুসহাফের লেখনী থেকে সম্ভাব্য পাঠের ক্ষেত্রে ক্বারীদের মধ্যে মতভেদ কী কারণে হল?”

 

এর উত্তরের জন্য উদ্ধৃতি ও আরবি ভাষায় ফিরে যেতে হবে। কেননা শরিয়ত প্রণেতা [নবী (ﷺ)] তাঁদেরকে এই সবগুলো কিরাআতেরই অবকাশ প্রদান করেছেন। কেননা কারো জন্যই স্রেফ নিজের মত অনুযায়ী কোন কিরাআতে পাঠ করার অধিকার নেই। বরং কিরাআত হচ্ছে একটি অনুসরণকৃত সুন্নাহ। তাঁরা যখন মুসহাফে ইমামীতে [উসমান(রা.) এর সংকলিত কুরআন]   লিখিত কুরআনের অনুসরণের ব্যাপারে সর্বসম্মত হয়েছিলেন, তখন তাঁদের কেউ কোন শব্দ ‘ইয়া’ দিয়ে পড়েছিলেন, কেউ ‘তা’ দিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের কেউই মুসহাফ থেকে বিচ্যুত হন নি। এছাড়াও যে বিষয়টির মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়, তা হচ্ছে - যারা কোন কোন স্থানে ‘ইয়া’ কিংবা ‘তা’ দিয়ে পড়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন, তাঁরাই আবার অন্য স্থানে মতভেদ করেছেন। যেমন তারা আল্লাহর বাণী وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا يَعْمَلُونَ এর ব্যাপারে ১টি স্থানে সহমত হয়েছেন এবং ২টি স্থানে মতভেদ করেছেন। (সুতরাং বোঝা গেল, তাঁরা নিজস্ব মত অনুযায়ী কিরাআত পড়তেন না, বরং রাসুলের(ﷺ) অনুমোদিত কিরাআতের অনুসরণ করতেন।)

 

আমরা বিস্তারিতভাবে বলেছি যে, ২টি কিরাআত হচ্ছে ২টি আয়াতের মতো এবং অতিরিক্ত কিরাআত হচ্ছে অতিরিক্ত আয়াতের মতো। যখন লেখনী একই হয় এবং একাধিক শব্দের সম্ভাবনা থাকে, তবে এই ভিন্নতা লিখিতরূপের মধ্যে সীমিত থাকে। আর একে অন্যের কাছ থেকে কুরআন উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে অন্তরসমূহে যা সংরক্ষিত আছে, তার উপর নির্ভর করা হয়; (লিখিত)মুসহাফসমূহের উপর নির্ভর করা হয় না। যেমনটি নবী(ﷺ) থেকে সহীহ হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:আমার রব আমাকে আদেশ করলেন: কুরাইশের মাঝে দাঁড়াও এবং তাদের সতর্ক কর। আমি বললাম: হে আমার রব! তারা আমার মাথা ভেঙে ফেলবে। তিনি বললেন: আমি তোমাকে পরীক্ষা করব এবং তোমার মাধ্যমে অন্যদের পরীক্ষা করব। তোমার উপর আমি এমন কিতাব নাযিল করব, যা পানিতে ধৌত হয়ে হারিয়ে যাবে না। তুমি একে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় পাঠ করবে। তুমি যদি কোন বাহিনী পাঠাও, আমি এর দ্বিগুণ পাঠাব। তুমি তোমার অনুগতদের নিয়ে তোমার অবাধ্যদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ কর। আর ব্যয় কর, আমি তোমার উপর ব্যয় করব। সুতরাং আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তাঁর কিতাব সংরক্ষণের জন্য (কালি দ্বারা লিখিত)পুস্তকের প্রয়োজন নেই যা পানিতে ধৌত হয়ে যায়। বরং আল্লাহর রাসূল(ﷺ) সর্বাবস্থাতেই এটি পাঠ করবেন যেভাবে তাঁর উম্মাহর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা নিজেদের বক্ষে তাঁদের ইনজিলসমূহ ধারণ করবে। এটা আহলে কিতাবের [ইহুদি-খ্রিষ্টান] বিপরীত। কেননা তারা তাদের কিতাব কেবল বই-পুস্তকেই সংরক্ষণ করতে সক্ষম এবং পুরো কিতাব না দেখে কেবল অন্তর থেকে পাঠ করতে সক্ষম নয়। সহীহ হাদিসে প্রমাণিত আছে যে, নবী () এর যুগে সাহাবীদের একটি জামাত গোটা কুরআনকে একত্রিত করেছিলেন। যেমনঃ আনসারদের ৪ ব্যক্তি, আব্দুল্লাহ বিন আমর(রা.) এবং তাঁদের অনুরূপগণ।

 

সুতরাং আমরা যা উল্লেখ করলাম তাতে স্পষ্ট হল - নাফে’, আসেমের দিকে সম্পর্ক করে যেসব কিরাআত রয়েছে সেগুলো কুরআন নাযিল হওয়া ৭ হারফ নয়। এতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামাদের ঐকমত্য রয়েছে। একইভাবে গণ্যমান্য উলামাদের মতে, এই ৭ কিরাআত ৭ হারফের কোনো একটি হারফের সর্বমোট সংকলনও নয়। বরং ক্বারীদের ইমামগণ যেমন আ’মাশ, ইয়া’কুব, খালাফ, আবু জা’ফর ইয়াযীদ বিন আল ক্বা’ক্বা’, শায়বা বিন নিসাহ এবং অনুরূপ ইমামদের (আল্লাহ তাঁদের সকলকে রহম করুন) থেকে প্রমাণিত কিরাআত এবং এই ৭ কিরাআত – এর যে কোনোটিই যাদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে তাদের কাছে একই মর্যাদা রাখে। এটাও এমন একটি বিষয় যা নিয়ে ফুকাহা ও কারীদের মান্যবর ইমামগণ ও অন্যরা মতভেদ করেন নি।

 

বরং আল্লাহর রাসুলের(ﷺ)  সাহাবী, তাঁদের উত্তম অনুসারী তাবেয়ী ও পরবর্তী উম্মাহর ইজমা’পূর্ণ ‘আল মুসহাফ আল উসমানী আল ইমামী’ নিয়ে পরবর্তীদের কিছু মানুষ মতভেদ করেছে  এই বিষয়ে - এই মুসহাফ থেকে যে ৭টি বা পূর্ণাঙ্গ ১০ কিরাআত কিংবা অন্য কিরাআত রয়েছে সেগুলো কি কুরআন নাযিল হওয়া ৭ হারফের একটি হারফ নাকি এটি ৭ হারফের একত্রিত সংকলন?

 

এতে দুইটি প্রসিদ্ধ মত আছে। প্রথমটি সালাফের ইমাম ও আলেমদের বক্তব্য। দ্বিতীয়টি কালাম শাস্ত্রবিদ, কারী ও অন্যদের মধ্যকার কিছু উপদলের বক্তব্য। তবে সকলেই একমত যে, ৭ হারফের একটির সাথে অন্যটির এমন কোন ভিন্নতা নেই যাতে একে অন্যের মধ্যে অর্থগত দ্বন্দ-বিরোধ সৃষ্টি হয়। বরং এর একটি অন্যটিকে সেভাবেই সত্যায়ন করে যেভাবে এক আয়াত অন্য আয়াতের সত্যায়ন করে।

 

আর মুসহাফের লেখনী থেকে সম্ভাব্য পাঠ অনুযায়ী কিরাআতে ভিন্নতার কারণ হচ্ছে শরিয়ত প্রণেতার [রাসুল(ﷺ) ] দেয়া অনুমোদন এবং অবকাশ। কেননা এই ভিন্নতার উৎস হচ্ছে সুন্নাহ এবং ইত্তেবা-অনুসরণ, ব্যক্তিমত মত কিংবা নব-আবিষ্কার নয়। যদি বলা হয় এই কিরাআতগুলোই ৭ হারফ তবে তো এটি যাহের বা বাহ্যমান কথা। আর যদি বলা হয় এগুলো হচ্ছে ৭ হারফের একটি হারফ, তবে তো এটি আরো অগ্রাধিকার পাবে। যে ৭ হারফে পড়ার অবকাশ তাঁদের দেয়া হয়েছে, সে সবের লেখনীতে হারফের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো কার্যকরী ও যথেষ্ট ছিল। তাহলে লেখনীতে মিল থাকার পরও যদি শব্দে ভিন্নতা থাকে, তবে তা তো আরো আগে এবং আরো বেশি করে কার্যকরী ও যথেষ্ট হবে। এ কারণেই প্রাথমিকভাবে লিখিত তাশকীল (যের-যবর) ও নুকতাবিহীন মুসহাফগুলো তাঁরা পরিত্যাগ করেছেন। কেননা এই মুসহাফগুলোর লেখনী থেকে উভয় সম্ভাবনারই সুযোগ থাকত যেমন ইয়া কিংবা তা, যবর কিংবা পেশ। তাঁরা শব্দ গঠনের সময় দু’টোই করতেন এবং উদ্ধৃত, শ্রুত, পঠিত উভয় শব্দই একই লেখনী উদ্ভূত ছিল। যেমন ধরা যাক, একই শব্দ থেকে উদ্ভূত হওয়া ও উদ্ধৃত করা অনুভূত ও বোধগম্য দু’টি অর্থ থাকা।

 

আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) কুরআনের যা যা পৌঁছে দেয়ার আদেশ পেতেন, সেগুলো তাঁর সাহাবীরা তাঁর কাছ থেকে শব্দ ও অর্থসহ একত্রে গ্রহণ করতেন। যেমনটি উসমান(রা.) থেকে বর্ণনাকারী আবু আব্দির রহমান আস সুলামী তাঁর সুত্রে বলেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে যে কুরআন শেখে এবং শিক্ষা দেয়”  যা বুখারী(র.) তাঁর সহীহতে বর্ণনা করেছেন। আবু আব্দির রহমান আস সুলামী ৪০ বছর যাবত কুরআনের কিরাআত শিখিয়েছেন। তিনি বলেন: উসমান বিন আফফান(রা.), আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ(রা.)  এবং অন্য যাঁরা আমাদেরকে কিরাআত শিক্ষা দিতেন, তাঁরা আমাদের বলতেন যে - তাঁরা নবী (ﷺ) থেকে ১০টি আয়াত শেখার পর এগুলোর অন্তর্ভূক্ত ইলম ও আমল শিক্ষা না করে পরের আয়াতে অগ্রসর হতেন না। তাঁরা বলতেন: “আমরা কুরআন, ইলম ও আমল সব একত্রে শিখেছি।”

 

এ কারণে নবীর(ﷺ)  তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে যে কুরআন শেখে এবং শিক্ষা দেয়  এই কথার মাঝে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে কুরআনের হারফসমূহ এবং এগুলোর অর্থ শিক্ষাদান করা। হারফসমূহ শিক্ষা দানের প্রথম উদ্দেশ্যই তো হচ্ছে এর অর্থসমূহ শিক্ষা দান। আর এটাই ঈমান বৃদ্ধি করে থাকে। যেমনটি জুনদুব বিন আব্দুল্লাহ(রা.), আব্দুল্লাহ বিন আমর(রা.) এবং অন্যরা বলেছেন:আমরা ঈমান শিখেছি। এরপর কুরআন শিখেছি। ফলে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তোমরা কুরআন শেখ, তারপর ঈমান শেখ।

 

সহীহাইনে (বুখারী ও মুসলিম)  হুযায়ফা(রা.) থেকে বর্ণিত আছে, “আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে দুইটি কথা বলেছেন যার একটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এবং অপরটির জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি আমাদেরকে বলেছেন: লোকদের অন্তরগুলোর মূলে আমানত নাযিল করা হয়েছে এবং নাযিল করা হয়েছে কুরআন তিনি বিস্তারিতভাবে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন যা এই পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা সম্ভব না। বরং এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে এই কথার দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করা যে - এর সবগুলোই আল্লাহর রাসূল () মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আর তাঁর সাহাবীরা তাঁর কাছ থেকে ঈমান, কুরআন, এর হারফ ও অর্থসমূহ আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আর এই মর্মেই আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করে বলেছেন:

 

এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ তথা আমার নির্দেশ; তুমি তো জানতে না কিতাব কী ও ঈমান কী! পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি; তুমি তো প্রদর্শন করো শুধু সরল পথ – (শুরা ৪২ : ৫২)

 

অতএব মুসহাফের লেখনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থাৎ শায বা বিচ্ছিন্ন নয় এমন সুপ্রমাণিত কিরাআত দ্বারা সালাতের ভেতরে এবং বাইরে পাঠ করা জায়েয।

 

আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

 

______

এ সম্পর্কে আরো পড়ুনঃ

সাত হারফ [‘সাবআতুল আহরুফ’ / ৭টি উপভাষা / 7 Dialects] কি কুরআনের একাধিক ভার্সন?

 

দেখুনঃ

"কুরআনের বিভিন্ন কিরাত এবং আহরুফ কি কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন ভার্সন?_শায়খ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া"