চাঁদের আকৃতি কি আসলেই ছোট হয়ে খেজুরের ডালের ন্যায় হয়ে যায়?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

লিখেছেনঃ শেখ সা'দী

 

সংশয়:

সুরা ইয়াসিনের ৩৯ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, চাঁদ নাকি ছোট হতে হতে শুকনো খেজুরের ডালের মত হয়ে যায়।
কিন্তু মুহম্মদ (স) জানতো না, চাঁদ কখনো ছোট হয় না। এর আকার ঠিক থাকে।
পৃথিবী, সূর্য এবং চাঁদের অবস্থান অনুযায়ী চাঁদের উপরে যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে সে অংশই আমরা পৃথিবী থেকে দেখি। বাকি অন্ধকার অংশ দেখা যায় না। একে চাঁদের দশা (Phases) বলে।
অথচ, এই সুরার প্রথমেই বলা আছে বিজ্ঞানময় কোরআনের কসম।

নিরসন:
 
আল্লাহ বলেন:
وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ
অর্থঃ এবং চাঁদও, আমি এর জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছি কতগুলো মনযিল। এমনকি চাঁদ ফিরে আসে যেন এটি খেজুরের থোকাবাহী প্রাচীন শাখা।
(আল কুরআন, ইয়াসিন ৩৬ : ৩৯)


আরবির প্রাথমিক পাঠ নেয়া ছাত্র পর্যন্ত বুঝবে এটা উপমা এবং রূপক। কারণ উর্জুন (عُرْجُونِ-খেজুরের থোকাবাহী ডাল) এর আগে আরবী অব্যয় كـ (কা) রয়েছে। কা অর্থ "যেন"। এই অব্যয় রূপক বোঝায়, আক্ষরিক বোঝায় না। চাঁদকে মাসের শুরুতে যেমন চিকন দেখা যেত, মাসের শেষেও একে চিকন দেখা যায়। ভাবের যোজনা সৃষ্টিতে উপযুক্ত উপমা ব্যবহার ভাষাকে অলংকার প্রদান করে। আর উপমা হচ্ছে রূপক, আক্ষরিক নয়। কুরআনের অডিয়েন্স ছিল কাব্যে উৎকর্ষপ্রাপ্ত বিশুদ্ধভাষী আরবরা। চাঁদকে খেজুরের ডালের সাথে তুলনা দেয়া থেকে তার ভালো করেই এর তাৎপর্য বুঝেছে। তাদের ভাষাজ্ঞান ও কাব্যরুচি এতটা দীন-হীন ছিল না যে, তারা একে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করবে। সুকান্ত যখন পূর্ণিমার চাঁদকে রুটির সাথে তুলনা দিয়েছিল, সে চাঁদকে আটার তৈরি ভেবে তুলনা দেয় নি। এটা আমিও বুঝি, সুকান্তও বোঝে। বোঝে না কেবল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীরা।
 
দ্বিতীয়ত: বিজ্ঞান একটি পারিভাষিক শব্দ। এই শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ পারিভাষিক অর্থের সমান নয়। ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী বিজ্ঞান অর্থ কেবল বিশেষ জ্ঞান। কিন্তু আধুনিক পরিভাষায় বিজ্ঞান হচ্ছে পরীক্ষা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান। একইভাবে রসায়ন শব্দ বললে বর্তমানে একটি বিশেষ ধরনের বিদ্যা বোঝায়। এটা আরোপিত অর্থ বা পারিভাষিক অর্থ। কিন্তু রসায়নের শব্দের মূলে গেলে এই অর্থ পাওয়া যাবে না। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা।

কুরআনকে আল্লাহ বলেছেন হাকীম। এর মূল হচ্ছে হিকমাহ। হিকমাহ অর্থ প্রজ্ঞা, বিজ্ঞতা। সহজ ইংরেজিতে wisdom. বিজ্ঞানময় কুরআন বললে scientific Quran বোঝায় না, বরং wise Quran বোঝায়।
 
কুরআন হচ্ছে আল্লাহর অনাদি কথা eternal word. অপরদিকে সায়েন্স বা বিজ্ঞান হচ্ছে যেকোন মুহূর্তে মানুষের সর্বোচ্চ পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। সায়েন্স সদা উৎকর্ষ ও উন্নতি লাভ করে। সহজ কথায় বিজ্ঞান হচ্ছে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। সায়েন্স বা বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, ধ্রুব নয়। কুরআন হচ্ছে আল্লাহর চিরন্তন কথা। এটি ধ্রুব, নিত্য, অনাদি। কুরআনকে কোনভাবেই প্রচলিত অর্থে “সায়েন্টিফিক” বলা সম্ভব নয়। অর্থাৎ সায়েন্টিফিক এটা কুরআনের বিশেষণ হতে পারে না। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, কুরআন বা ওহীর উদ্ধৃতি (নকল) মানবের যুক্তিবুদ্ধি (আকল) এর সাংঘর্ষিক হবে। স্পষ্ট আকলের সাথে শুদ্ধ নকলের কোন সংঘাত নেই।
.