“পশ্চাদ্দেশের হাড় (Coccyx / Tailbone) ব্যতিত গোটা মানবদেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে” – এই হাদিসের ব্যাখ্যা

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

মূলঃ Islamweb

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

ফতোয়া নং : ২৮০৬২৭ [পশ্চাদ্দেশের হাড় (মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের হাড়) ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া]

 

প্রশ্নঃ

আসসালামু আলাইকুম। কিয়ামত দিবসের ব্যাপারে একটি হাদিস আছে যেখানে বলা হয়েছে যে, মানুষের পুনরুত্থান হবে পশ্চাদ্দেশের হাড়ের শেষ অংশ (মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের হাড়) থেকে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ও নাস্তিকরা দাবি করছে যে, ঐ হাড়সহ সকল হাড় মাটিতে মিশে যাবে। আমি কিছু ইসলামী ওয়েবসাইট দেখেছি যেখানে দাবি করা হয়েছে পশ্চাদ্দেশের হাড় কখনো মাটিতে মিশবে না এটা নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমি সার্চ দিয়ে এই তথ্য অন্য কোথাও পাইনি। বরং আমি এর বিপরীত তথ্যই পেয়েছি। এ কারণে আমার প্রশ্ন হলোঃ  এ হাদিসটি আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? এমন কি হতে পারে যে, “ক্ষয়প্রাপ্ত হবে না” শব্দগুলো দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে এটা পুরোপুরি মাটিতে মিশে যাবে না যার ফলে হাড়টির অতি ক্ষুদ্র (বালির কণার মতো) অংশ অবশিষ্ট থাকবে এবং আর সব অংশ মিশে যাবে? খুব ক্ষুদ্র অংশ বলে বিজ্ঞানীরা হয়তো খেয়াল করেননি? নাকি অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে? অনুগ্রহ করে উত্তর দিন আর ঐসব ইসলামী ওয়েবসাইটগুলোর কথা উল্লেখ করবেন না। ঐসব ওয়েবসাইটে একই কথা বছরের পর বছর কপি-পেস্ট করা হচ্ছে। আর তাদের উল্লেখিত তথ্য তাদের নিজেদের সাইট বাদে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আমি বলছি না যে তারা একদমই নির্ভরযোগ্য না। তবে আমি তাদের থেকে উত্তর চাচ্ছি না। বারাকাল্লাহু ফিকা ওয়া জাযাকাল্লাহু খাইর।    

 

উত্তরঃ

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং এবং মুহাম্মাদ(ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসুল।

 

হাদিসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা(রা.) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। —

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كُلَّ ابْنِ آدَمَ تَأْكُلُ الْأَرْضُ، إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ

অর্থঃ রাসুলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেনঃ প্রতিটি আদম সন্তানকে মাটি খেয়ে ফেলবে, শুধু মেরুদণ্ডের নিচের হাড়টুকু (বা পশ্চাদ্দেশের হাড়) বাকি থাকবে। এ থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ থেকেই তাকে পুনর্গঠন করা হবে। [আবু দাউদ, হাদিস নং :  ৪৬৬৫] আবু সাঈদ(রা.) থেকে অপর বর্ণনায় আছে, তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, এটি (পশ্চাদ্দেশের হাড় / মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের হাড়) কেমন হে আল্লাহর রাসুল? তিনি [রাসুলুল্লাহ(ﷺ)]  বললেন, এটি সরিষার দানার মতো। [আহমাদ ও ইবন হিব্বান]

 

এই হাদিস ও বিভিন্ন বর্ণনা থেকে সরাসরি যা বোঝা যাচ্ছে – মানুষের দেহের একটি ক্ষুদ্র অংশ পশ্চাদ্দেশের হাড় কখনো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না (বা মাটিতে মিশে যায় না)। এটি সরিষার দানার মতই ক্ষুদ্র। কোনো কোনো আলিমের মতে পশ্চাদ্দেশের হাড় মূলত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, কিন্তু তা হয় মানবদেহের অন্যান্য অংশের ক্ষয়প্রাপ্ত হবার সময়ের তুলনায় বহুকাল পরে। যাই হোক, ব্যাখ্যাটি হাদিসের সরাসরি অর্থের বিপরীত।

 

ফাতহুল বারী গ্রন্থে উল্লেখ আছে, “কোনো কোনো মুহাদ্দিসের মতে এ হাদিসের অর্থ হচ্ছে, পশ্চাদ্দেশের হাড় একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এরপর এটি অন্যান্য সব হাড়ের মতোই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এ হাদিসের হিকমত হচ্ছে, পশ্চাদ্দেশের হাড় যে মানুষের (দৈহিক কাঠামো) উৎপত্তির উৎস এবং এই ভিত্তিমূল থেকেই যে শেষ বিচারের দিন মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, এই ব্যাপারগুলোকে দৃষ্টিগোচর করা। আর এ কারণেই এই হাড় অন্যান্য হাড়ের তুলনায় বেশি দৃঢ়, যেমনটি কোনো দেয়ালের ভেতরের নিরেট অংশের পাথরগুলো থাকে। অন্যান্য হাড়ের তুলনায় অধিক শক্ত ও দৃঢ় হবার জন্য পশ্চাদ্দেশের হাড় অন্যান্য হাড়ের তুলনায় দীর্ঘ সময় পরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদিও এই ব্যাখ্যাটি খণ্ডনযোগ্য কেননা এটি হাদিসের সরাসরি অর্থের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ওহীর প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়।”

 

মিরকাত আল মাফাতিহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, কোনো কোনো মুহাদ্দিস ব্যাখ্যা করেছেন, এ হাদিসের অর্থ হচ্ছে পশ্চাদ্দেশের হাড় মাটির অভ্যন্তরে একটা দীর্ঘ সময়ে থাকতে পারে। ব্যাপারটি এমন নয় যে এটি কখনোই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না কেননা এটি বাস্তব সত্যের বিপরীত। অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “একে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এটি সবার শেষে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে”। উভয় হাদিসের ইঙ্গিত একই। কোনো কোনো আলিমের মতে এ হাদিসের অর্থ হলো, পশ্চাদ্দেশের হাড় যে মানুষের (দৈহিক কাঠামো) উৎপত্তির উৎস এবং এটি দেহের অন্য যে কোনো অংশের তুলনায় অধিক দৃঢ়, যেমনটি কোনো দেয়ালের ভেতরের নিরেট অংশের পাথরগুলো থাকে। অন্য হাড়ের তুলনায় অধিক শক্ত ও দৃঢ় হবার কারণে এটি একটি দীর্ঘ সময় পর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আল্লাহই সাফল্য দানকারী, আমি [লেখক মোল্লা আলী ক্বারী(র.)] অনুসন্ধান করে দেখেছি যে, পশ্চাদ্দেশের হাড় সবার শেষে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ঠিক যেমনটি হাদিসে বলা হয়েছে। যাই হোক এটি পুরোপুরিভাবে মাটিতে মেশে না, যেমনটি বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে বলা হয়েছে। এই ক্ষেত্রটিতে বোধগম্য বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে হবে। মিরকাত আল মাফাতিহ গ্রন্থের ‘কবরের আযাব’ অংশের সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চাদ্দেশের হাড়ের এই অতি ক্ষুদ্র অংশ কবরের ধুলা ও মাটির সাথে এমনভাবে মিশে থাকে যে তা আর আলাদা করে বোঝার উপায় থাকে না। যে কারণে বিজ্ঞানীরাও তা ঠিকভাবে ধরতে সক্ষম হন না। [উদ্ধৃতি সমাপ্ত]

 

সংক্ষেপে বলা যায়, হাদিসের সরাসরি বক্তব্য হচ্ছে পশ্চাদ্দেশের হাড় (মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের হাড়) এর একটি ক্ষুদ্র অংশ কখনো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। কবরে এটি পাওয়া যায় না তা দ্বারা হাদিসের বক্তব্য ভুল প্রমাণ হয় না কেননা এটি অতি ক্ষুদ্র একটি জিনিস (ফলে তা মাটির অন্যান্য উপাদান থেকে আলাদা করা দুষ্কর)। মুমিনদের উচিত নবী(ﷺ) এর হাদিসের উপর ঈমান রাখা এবং এর অসঙ্গতির অভিযোগগুলোকে পাত্তা না দেয়া।

 

আল্লাহই উত্তম জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ  https://www.islamweb.net/en/fatwa/280627/