আল্লাহঃ চন্দ্রদেবতা (Moon god) নাকি সারা জাহানের পালনকর্তা?

ইসলামের উৎপত্তি সংক্রান্ত অভিযোগের জবাব



 

আপনি যদি একটি মতাদর্শকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে চান, তাহলে সব থেকে ভালো উপায় হচ্ছে এর উৎসমূল ধরে নাড়া দেয়া। আপনি যদি উৎসমূলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন, ভিত্তিহীন প্রমাণ করতে পারেন, সেই মতাদর্শটি বিলীন হতে বাধ্য। ইসলামের বিরুদ্ধে এই কাজটিই করে যাচ্ছে খ্রিষ্টান মিশনারী ও নাস্তিক মুক্তমনারা। দ্বীন ইসলামের উৎসমূল সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি করে এরা মুসলিমদেরকে সংশয়ে ফেলতে চাচ্ছে, ইসলামকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। ইসলাম ধর্মে মহান স্রষ্টা আল্লাহর ব্যাপারে এরা বিভিন্ন অভিযোগ ও তত্ত্ব উপস্থাপন করছে। এর মধ্যে অন্যতম ‘জনপ্রিয়’ তত্ত্ব হচ্ছেঃ আল্লাহ নাকি প্রাচীন আরবের চন্দ্রদেবতার (Moon god) নাম (নাউযুবিল্লাহ), মুসলিমরা নাকি না জেনে সেই চন্দ্রদেবতার উপাসনা করছে। আর এ কারণেই নাকি বিভিন্ন মসজিদের গম্বুজের উপরে কিংবা বিভিন্ন মুসলিম দেশের পতাকায় এক ফালি চাঁদ (Crescent Moon) ও তারার ছবি দেখা যায়। আল্লাহ তা’আলাকে Moon god প্রমাণ করতে এদের প্রচেষ্টা সত্যিই চোখে পড়ার মতো, ইন্টারনেটে এই কথা লিখে সার্চ দিলেই অজস্র আর্টিকেল চলে আসে। সম্প্রতি বঙ্গীয় নাস্তিক-মুক্তমনাদের কলমেও এই জিনিসটির আগমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 আমরা এখন তাদের এই তত্ত্বের উৎস ও স্বরূপ সন্ধান করবো। সেই সাথে এর আদৌ কোনো সত্যতা আছে কিনা তা-ও যাচাই করবো।

 

চন্দ্রদেবতা (Moon god) তত্ত্বের উৎপত্তি কীভাবে

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন থেকে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেছেন, তাঁর দাওয়াহর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ শুরু হয়েছে। সে সময়ে তাঁকে যাদুকর, মিথ্যাবাদী, পাগল সহ অনেক কিছুই বলা হয়েছে। কালক্রমে এর সব কিছু ভুল প্রমাণ হয়েছে, পরবর্তীকালে ইসলামের শত্রুরা নতুন নতুন অপবাদ ইসলামের উপর আরোপ করেছে। এভাবে ইসলামের অগ্রযাত্রা রোখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চন্দ্রদেবতা বা Moon god তত্ত্ব একটি একদম নতুন তত্ত্ব। বিভিন্ন পশ্চিমা গবেষক আল কুরআনে উল্লেখিত স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলাকে প্রাচীন আরবের চন্দ্রদেবতার সাথে সংশ্লিষ্ট বলে প্রচার করা শুরু করেন। সর্বপ্রথম এই তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক হুগো উইঙ্কলার (Hugo Winckler)। ১৯০১ সালে তিনি দাবি করেন যে, মক্কায় পুজিত হুবাল ছিল চন্দ্রদেবতা। [1] সে সময়ে ড্যানিশ পণ্ডিত ডিটলেফ নিয়েলসেন (Ditlef Nielsen)ও আল কুরআনের আল্লাহকে পৌত্তলিক আরবের চন্দ্রদেবতার সাথে সংশ্লিষ্ট করে কিছু বইপত্র লেখেন। [2] এর অনেক কাল পরে ১৯৯০ এর দশকে আমেরিকান খ্রিষ্টান মিশনারীদের দ্বারা এই জিনিসটি আবার হালে পানি পায়। আমেরিকান খ্রিষ্টান প্রচারক রবার্ট মোরি (Robert Morey) ১৯৯২ সালে ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ নামে একটি বই লেখেন। এই বইয়ের মাধ্যমেই মূলত চন্দ্রদেবতা তত্ত্ব পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯৯৪ সালে সেই বইটিকে ভিত্তি করে লেখা তার পুস্তিকা ‘The Moon-god Allah: In Archeology of the Middle East’  দ্বারা এই তত্ত্ব আরো জনপ্রিয় হয়ে যায়। [3] ঐ বছরেই এই জিনিসটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেবার ‘মহান’ কাজটি করেন খ্রিষ্টীয় প্রচারযন্ত্রের আরেক মুখপাত্র কার্টুনিস্ট জ্যাক চিক (Jack Chick)। তার "Allah Had No Son" নামক গল্পধর্মী কার্টুন বা কমিকসের দ্বারা Moon god তত্ত্ব খ্রিষ্টীয় ও পশ্চিমা দুনিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে যায়। [4] এভাবেই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারা ইসলামের উৎসমূলের বিরুদ্ধে মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ এক তত্ত্বে দাঁড় করা হয় গত শতকের ’৯০ এর দশকে। ধীরে ধীরে নাস্তিকসহ ইসলামের সকল সমালোচকদের মাঝেই এই তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে যায়।

 

ইসলামের শত্রুদের অভিযোগ

আমরা আল্লাহ তা’আলার নামের চন্দ্রদেবতা অপবাদের উৎস নিয়ে আলোচনা করলাম। বর্তমানকালে যারা ইসলামের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখালেখি করেন, তাদের সকলেরই তথ্যের উৎস হচ্ছে গত শতকের শুরুর দিককার এবং শেষে ’৯০ এর দশকের সময়কালের লেখা বইগুলো। সে বইগুলোতে যেসব তত্ত্বের সাহায্যে আল্লাহ তা’আলাকে চন্দ্রদেবতা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলঃ

 

১। হুগো উইঙ্কলারের মতে, প্রাচীন আরবে মক্কায় যে হুবালের উপাসনা হত, সে ছিল চন্দ্রদেবতা। [5] এর উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অনেক খ্রিষ্টীয় মিশনারী (যেমন স্যাম শামুন) এবং ইসলামবিরোধী নাস্তিকরা বলার চেষ্টা করে যে হচ্ছেন প্রাচীন মক্কার পৌত্তলিক দেবতা হুবাল (নাউযুবিল্লাহ)

২। খ্রিষ্টান মিশনারী রবার্ট মোরির মতে, আল্লাহ হচ্ছেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার চন্দ্রদেবতা সিন (Sin) এর আরবীয় সংস্করণ (নাউযুবিল্লাহ)

৩। আল্লাহ ছিলেন জাহিলিয়াতের যুগে মক্কার কা’বায় পুজিত ৩৬০ দেবতার এক দেবতা (নাউযুবিল্লাহ)

 

এই প্রস্তাবনাগুলোকে ভিত্তি ধরে এবং এর সাথে সম্পুরক আরো কিছু অভিযোগ সংযুক্ত করে খ্রিষ্টান মিশনারী ও নাস্তিক মুক্তমনারা মহান স্রষ্টা আল্লাহ রব্বুল আলামিনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবার চেষ্টা করে।

 

আল্লাহ (الله) শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ

আল্লাহ তা’আলার পবিত্র নামটি এসেছে আরবি ক্রিয়াপদ আলাহা > ইয়া’লাহু > মা’লুহ (أَله يأله فهو مألوه) থেকে। এগুলোর মূলে রয়েছে আলিফ, লাম এবং হা এই ৩টি হরফ। এই ক্রিয়ার অর্থের মধ্যে ভালোবাসা এবং উপাসনা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন একজন সত্তা যিনি ভালোবাসা ও উপাসনার হকদার। যাঁর প্রতি বিশ্বাসীগণ আশা ও ভয় রাখেন, যাঁর জন্য স্তুতি করেন। [6] আরবি ভাষায় এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টাবোধক এক পবিত্র শব্দ এটি। অনন্য এই শব্দের কোনো বহুবচন বা বিপরীত লিঙ্গ নেই।  Edward William Lane  এর অভিধানে চমৎকারভাবে আল্লাহ শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ উল্লেখ করা হয়েছেঃ- “ الله‎ [Witten with the disjunctive alif الله‎, meaning God, i.e the only true god]” [7]

অর্থাৎ ‘আল্লাহ’ শব্দ দ্বারা একমাত্র সত্য উপাস্যকে বোঝায়।

একই মূল শব্দ থেকে উদ্ভুত শব্দ (Cognates) হিব্রু ও অ্যারামায়িকের মতো অন্যান্য সেমিটিক ভাষাগুলোতেও পাওয়া যায়। [8] হিব্রু ভাষায় এর সমজাতীয় শব্দ ‘এলোহিম’ (אלהים) এবং ‘এলোয়াহ’ (אלוהּ), যা বাইবেলে পাওয়া যায়। [9] বাইবেলীয় অ্যারামায়িক ভাষায় এর সমজাতীয় শব্দ ‘এলাহা’ (ܐܠܗܐ) এবং অ্যারামায়িকের একটি উপভাষা সিরিয়াকে এর উচ্চারণ হয় ‘আলাহা’ (ܐܲܠܵܗܵܐ)। [10]

‘আল্লাহ’ শব্দের অর্থের মাঝে চন্দ্র বা এ রকম কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই।

 

হুবাল এবং আল্লাহ কি এক?

প্রাচীন আরবে মক্কায় যে হুবালের উপাসনা তাকে চন্দ্রদেবতা বলে অভিহীত করেছিলেন হুগো উইঙ্কলার। এই তথ্যকে ভিত্তি করে পরবর্তীতে খ্রিষ্টীয় মিশনারী এবং ইসলামবিরোধী নাস্তিকরা মুসলিমদেরকে এই বলে আক্রমণ করে যেঃ মুসলিমরা জেনে বা না জেনে হুবাল দেবতার উপাসনা করছে। হুবাল নাকি চন্দ্রদেবতা আর সেই চন্দ্রদেবতাই নাকি আল্লাহ! (নাউযুবিল্লাহ)

 

প্রথম কথাঃ

কোনো দাবি পেশ করতে হলে এর স্বপক্ষে প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। হুবাল যে চন্দ্রদেবতা এ ব্যাপারে আদৌ কোনো প্রমাণ নেই। এটি ইসলামের শত্রুদের নিজস্ব উক্তি ছাড়া কিছুই নয়। ইসলামী ইতিহাসের কোনো প্রাথমিক উৎসে (primary source) এটা বলা নেই প্রাচীন মক্কায় পুজিত হুবাল ছিল চন্দ্রদেবতা। মক্কা ও এর আশপাশের অঞ্চলের দেব-দেবীদের বিবরণের ব্যাপারে প্রাথমিক উৎসের একটি হচ্ছে হিশাম ইবন কালবী(র.) এর ‘কিতাবুল আসনাম’। এই গ্রন্থে হুবাল দেবতা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। হুবাল দেবতাকে মক্কার পৌত্তলিকরা ভাগ্য গণনার কাজ ব্যবহার করতো। হুবালের মূর্তির সামনে গিয়ে তারা তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য নির্ণয়ের চেষ্টা চালাতো। [11] চাঁদের সাথে এর কোনো সংযোগেরই উল্লেখ নেই।

 

দ্বিতীয় কথাঃ

আল্লাহকে মক্কার মানুষেরা বহু আগে থেকে উপাসনা করতো এবং সারা জাহানের প্রভু বলে বিশ্বাস করতো। তাদের ধর্মবিশ্বাস এমন ছিল। তারা আল্লাহকে মূর্তি দিয়ে প্রকাশ করা কোনো দেবতা বলে বিশ্বাস করতো না। [12]

কিন্তু হুবাল দেবতার পুজা তাদের মধ্যে কিভাবে এলো?

মক্কায় কিভাবে হুবাল দেবতার পুজা শুরু হয়, এ ব্যাপারে আমাদের নিকট বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। হুবাল দেবতাকে মোটেও কা’বা ঘর স্থাপনের সূচনা থেকে পুজা করা হতো না বরং এর পুজা অনেক পরে শুরু হয়। এমনকি হুবাল মক্কার কোনো নিজস্ব দেবতাও ছিল না বরং তা বাইরে থেকে মক্কায় আমদানী হয়েছে। এবং কাজটির সূচনা করেছিল আমর বিন লুহাই নামে এক ব্যক্তি। 

 

আরবের মানুষজন ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর সময় থেকে এক আল্লাহর উপাসনা করতো। দীর্ঘদিন তারা একত্ববাদী ইব্রাহিমী ধর্মের উপরেই ছিল। বনু খুযা’আহ গোত্রের সর্দার ‘আমর বিন লুহাই এর ধর্মীয় মতাদর্শের লালন ও পরিপোষণ, দান খয়রাত এবং ধর্মীয় বিষয়াদির প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে লোকজন তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাপোষণ করতে থাকেন। অধিকন্তু, তাঁকে বড় বড় আলেম এবং সম্মানিত ওলীদের দলভুক্ত ধরে নিয়ে তাঁর অনুসরণ করতে থাকেন।

 

এমন অবস্থার এক পর্যায়ে তিনি শাম দেশ (বৃহত্তর সিরিয় অঞ্চল)  ভ্রমণে যান এবং সেখানে গিয়ে মূর্তি পূজা-অর্চনার জাঁকালো চর্চা প্রত্যক্ষ করেন। শাম দেশ বহু নবী-রাসুলের জন্মভূমি এবং আল্লাহর বাণী নাজিলের ক্ষেত্র হওয়ায় ঐ সকল মূর্তিপূজাকে তিনি অধিকতর ভাল এবং সত্য বলে ধারণা করেন। তাই দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি ‘হুবাল’ নামক মূর্তি সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং কা’বা গৃহের মধ্যে তা রেখে দিয়ে পুজা-অর্চনা শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে মক্কাবাসীগণকেও পুজা করার জন্য আহ্বান জানান। মক্কাবাসীগণ তার আহবানে সাড়া দিয়ে মূর্তি হুবালের পুজা করা শুরু করে দেয়। কাল-বিলম্ব না করে সমগ্র হিজাযবাসীও মক্কাবাসীগণের পদাংক অনুসরণ করতে থাকেন। কারণ, তাঁরাও এক কালে বাইতুল্লাহর অভিভাবক এবং হারামের বাসিন্দা ছিলেন। এভাবে একত্ববাদী আরববাসী অবলীলাক্রমে মূর্তিপূজার মতো এক অতি জঘণ্য এবং ঘৃণিত পাপাচার ও দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এভাবে আরব ভূমিতে মূর্তিপূজার গোড়াপত্তন হয়ে যায়। [13]

 

এ থেকে বোঝা গেল হুবাল মূর্তি ও আল্লাহ তা’আলা মোটেও এক নয়। হুবাল পরবর্তীকালে মক্কায় আমদানী করা একটি কাল্পনিক দেবমূর্তি ছাড়া কিছুই নয়। মক্কায় ইব্রাহিমী দ্বীনের মধ্যে শির্কের প্রচলন ঘটানোয় আমর বিন লুহাইর কী পরিনতি হয়?

 

নবী(ﷺ) বলেন,

‏رَأَيْتُ عُمَرَو بْنَ عَامِرِ بْنِ لُحَى الْخُزَاعِى يَجُرُّ قَصَبَهُ ‏[‏أَيْ أَمْعَاءَهُ ‏]‏ فِي النَّارِ

‘‘আমি আমর বিন লুহাইকে জাহান্নামের মধ্যে তার নাড়ি-ভুড়ি টানতে দেখেছি।’’

কেননা ‘আমর বিন লুহাই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ইব্রাহিম(আ.)-এর দ্বীনে পরিবর্তন আনয়ন এবং মূর্তির নামে চতুষ্পদ জন্তু উৎসর্গ করার ব্যবস্থা করেছিলেন। [14]

 

ইসলামে যদি হুবালের উপাসনা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোভাবে সমাদৃত হতো - তাহলে নবী(ﷺ) কেন এর সূচনাকারীর জাহান্নামী হবার কথা বলবেন?

 

হাদিস ও সিরাতশাস্ত্রে এমনকি ইসলামের শত্রুদের উক্তি থেকেও আমরা দেখতে পাই যে, হুবাল এবং আল্লাহ মোটেও এক সত্তার নাম নয়। বরং মুসলিমদের সাথে তাদের শত্রুতাই তো এ কারণে ছিল যে, মুসলিমরা হুবালসহ সকল দেব-দেবীর উপাসনা ত্যাগ করে এক আল্লাহর উপাসনা করতো। উহুদ যুদ্ধের ঘটনার মধ্যে আমরা দেখি, যুদ্ধ শেষ হবার পর সে সময়ে মুসলিমদের সব থেকে বড় শত্রু আবু সুফিয়ান আল্লাহ তা’আলা ও হুবালকে আলাদা হিসাবে উল্লেখ করছে।

 

“…অতঃপর সে [আবু সুফিয়ান] চিৎকার করে বললো, اعل هبل  অর্থাৎ “হুবাল সুউচ্চ হোক।” 

নবী() তখন সাহাবীদেরকে বললেন, “তোমরা জবাব দিচ্ছ না কেন?” তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল(), আমরা কী জবাব দেবো? তিনি বললেন, “তোমরা বলো - الله اعلى و اجل অর্থাৎ “আল্লাহ সব থেকে উচ্চ ও অতি সম্মানিত”

আবার আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বললো, لنا العزى ولا عزى لكم অর্থাৎ “আমাদের উযযা আছে, তোমাদের উযযা নেই।” নবী() পুনরায় সাহাবীদেরকে বললেন, “তোমরা উত্তর দিচ্ছ না কেন?” তাঁরা বললেন, কী উত্তর দেবো?

 তিনি বললেন, তোমরা বলো,  الله مولانا ولا مولى لكم অর্থাৎ “আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, আর তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই।” [15]

 

 উপরের কথোপকথন দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, হুবাল এবং আল্লাহ মোটেও এক সত্তা না। মুসলিমরা শুধুমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতো, হুবাল, উযযা এই সকল কাল্পনিক দেব-দেবীকে তারা পরিত্যাগ করেছিল।

 

হুবালের মূর্তিটি কা’বার ভেতরে ছিল। সেটি ছিল কা’বার ৩৬০ টি দেবমূর্তির একটি। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ(ﷺ) কা’বার সকল ছবি ও মূর্তি ধ্বংস করেন। অর্থাৎ হুবালের মূর্তিটিও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। [16] হুবাল যদি মুসলিমদের উপাস্য হতো, তাহলে কেন সেটিকে ধ্বংস করে দেয়া হলো?

 

ঠিক এই জিনিসটি উপলব্ধি করতে পেরে ড্যানিশ-আমেরিকান প্রাচ্যবিদ  Patricia Crone বলেছেন, 

"If Hubal and Allah had been one and the same deity, Hubal ought to have survived as an epithet of Allah, which he did not.” [17]

অর্থাৎ - হুবাল এবং আল্লাহ যদি একই উপাস্য হয়ে থাকতো, তাহলে হুবাল আল্লাহর একটা গুণবাচক বিশেষণ হিসাবে টিকে থাকতো, কিন্তু এমন কিছুই হয়নি।

 

এই পয়েন্টে ইসলামের শত্রুদের দাবির জবাব সংক্ষেপে যা বলা যেতে পারে,

 

১। হুবাল চন্দ্রদেবতা ছিল - এই কথা কেবলমাত্র ইসলামবিরোধীদের উক্তির মধ্যেই পাওয়া যায়। এর স্বপক্ষে কোনো প্রকারের প্রমাণ প্রাথমিক উৎস (primary source)গুলোতে নেই। প্রাথমিক সূত্রগুলো অনুযায়ীঃ হুবাল দেবতা ভাগ্যগণনার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।

২। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে, হুবাল ছিল চন্দ্রদেবতা তবুও তাকে আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট করবার কোনো উপায় নেই। ইসলামের প্রাথমিক সূত্রগুলোর তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে হুবাল এবং আল্লাহ মোটেও এক নয়।

 

মেসোপটেমিয় চন্দ্রদেবতা এবং মক্কাবাসীর আল্লাহ : মিল নাকি অমিল?

খ্রিষ্টান মিশনারী রবার্ট মোরির ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ বইতে বলবার চেষ্টা করেছেন যে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় সিন (Sin) নামে যে চন্দ্রদেবতার পুজা করতো, সেই পুজা প্রাচীন আরবেও চলে এসেছিল। নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সময়ে পৌত্তলিক আরবরা সেই চন্দ্রদেবতাকে আল্লাহ বলতো এবং ইসলামে সেই আল্লাহর উপাসনাই চালু আছে। [18]

চিত্রঃ খ্রিষ্টান মিশনারী রবার্ট মোরির বইতে ব্যাবিলোনীয় চন্দ্রদেবতা Sin এর ছবি [19]

 

প্রাচীনকালে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে (বর্তমান ইরাক) যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সেখানে বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা চালু ছিল। সুমেরীয়রা নান্না (Nanna) নামে এক চন্দ্রদেবতার উপাসনা করতো। পরবর্তীতে ব্যাবিলোনীয় ও অ্যাসিরিয় সভ্যতায় যে দেবতার নাম দেয়া হয় সিন (Sin)। সুয়েন (Suen) নামেও এই দেবতা পরিচিত। এই চন্দ্রদেবতা ছিল আকাশের দেবতা এনলিল এবং ফসলের দেবী নিনলিল এর পুত্র। তার পবিত্র শহর ছিল উর (Ur)। চন্দ্রদেবতা সিনের স্ত্রীর নাম নিনগাল। তাদের এক পুত্র ও এক কন্যা ছিল। পুত্র সূর্যদেবতা শামাশ (Shamash) এবং কন্যা শুক্রগ্রহের দেবী ইশতার (Ishtar)। [20]

 

প্রাচীন আরবে কি আদৌ এমন কোনো  পৌত্তলিক দেবতার উপাসনা হতো?

 

প্রথমত,

ব্যাবিলোনীয় যে চন্দ্রদেবতার যে ধারণা আমরা দেখলাম, এর সাথে প্রাচীন আরবের পৌত্তলিকদের আল্লাহর ধারণার কি  মিল ছিল? প্রাচীন আরবরা আল্লাহকে মোটেও ‘সিন’ বলে ডাকতো না। তাছাড়া ব্যাবিলোনীয় চন্দ্রদেবতা ছিল আকাশের দেবতা এনলিল এবং ফসলের দেবী নিনলিল এর সন্তান। অপরদিকে, আরব পৌত্তলিকরা আল্লাহ তা’আলাকে মোটেও কারো সন্তান মনে করতো না। আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ধারণা অন্য রকম ছিল। আল্লাহকে তারা সকল কিছুর আদি সৃষ্টিকর্তা বলে বিশ্বাস করতো। [21] চন্দ্রদেবতা সিন এর ২টি সন্তানের উল্লেখ পাওয়া যায় – একটি পুত্র ও একটি কন্যা। আর আল্লাহ সম্পর্কে আরবের পৌত্তলিকদের বিকৃত বিশ্বাস ছিলঃ আল্লাহর ৩ কন্যা আছে যারা হচ্ছে লাত, মানাত ও উযযা (নাউযুবিল্লাহ)। [22] আর এদেরকেও তারা সূর্যদেবতা কিংবা শুক্রগ্রহের দেবী বলে মনে করতো না। বিশ্বাসের এই বিশাল ভিন্নতা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আরবের পৌত্তলিকদের আল্লাহর ধারণা ব্যাবিলনীয় চন্দ্রদেবতা সিন থেকে প্রভাবিত না।

 

দ্বিতীয়ত,

রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর সময়ে সে অঞ্চলে যেসব দেব-দেবীর উপাসনা হতো, তার একদম বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে হিশাম ইবন কালবী(র.) এর ‘কিতাবুল আসনাম’ গ্রন্থে। [23]  ৮ম শতাব্দীতে লিখিত এই বইতে সেই যুগে উপাসনা হওয়া দেব-দেবীর তালিকা আছে। কিন্তু পুরো বইতে কোনো চন্দ্রদেবতার উল্লেখ নেই। সিরাত ইবন হিশামেও সে সময়ে পুজিত দেব-দেবীর সবিশেষ উল্লেখ আছে। [24] কিন্তু সেখানেও কোনো চন্দ্রদেবতার খোঁজ পাওয়া গেল না। ইসলামের কোনো প্রাথমিক উৎসে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর বসবাসের এলাকায় চন্দ্রদেবতার পুজার উল্লেখ নেই।

 

প্রাচীন আরব ছিল পৌত্তলিকতার লীলাভুমি। সেখানে বহু কাল্পনিক দেব-দেবীর উপাসনা হতো। আমি সে সময়কার মুর্তিপুজার ব্যাপারে অনুসন্ধান করে যা পেলাম – দক্ষিণ আরবের হাদরামাউতে (বর্তমান ইয়েমেনের একটি অঞ্চল) আকাশ [25], সূর্য [26], চন্দ্র [27]  ইত্যাদির সাথে বিভিন্ন দেবতাকে সংশ্লিষ্ট করে পুজা করা হতো। সেই সাথে আরো অনেক দেবতার উপাসনা হতো। কিন্তু এই উপাসনা হতো ইয়েমেনে; মক্কায় না। কারো কারো মতে, ইয়েমেনে্র হাদরামাউতে যে চন্দ্রদেবতার পুজা হতো তার নাম ‘সিন’। [28] এখানে আরো কথা রয়েছে। কারো কারো মতে এই ‘সিন’ চন্দ্রদেবতা ছিল না বরং সূর্যদেবতা ছিল! [29]  ইয়েমেনের ঐ দেবতাও যে চন্দ্রদেবতা ছিল সেটিও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। আর সেটি চন্দ্রদেবতা বা সূর্যদেবতা যা-ই হোক - সেই দেবতার নাম মোটেও ‘আল্লাহ’ ছিল না। সে সময়ে বিভিন্ন গোত্রের আলাদা আলাদা দেব-দেবী ছিল। মক্কায় “চন্দ্রদেবতা”র পুজা আদৌ হতো না। কাজেই “মক্কার চন্দ্রদেবতা থেকে আল্লাহর ধারণা নেয়া হয়েছে” – এই অভিযোগ সত্য হবার দূরতম সম্ভাবনাও নেই।

 

খ্রিষ্টান মিশনারী রবার্ট মোরি তার ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ বইতে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে চন্দ্রমন্দির ছিল এবং সেগুলো চন্দ্রদেবতার পুজা হতো বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। সেগুলো আসলেই চন্দ্রমন্দির কিনা তা নিয়ে ব্যাপক সংশয়ের অবকাশ আছে। একটা উদাহরণ দেই। রবার্ট মোরি তার বইয়ের ২১৩-২১৪ পৃষ্ঠায় ১৯৫০ সালে ফিলিস্তিনের হাজর অঞ্চলে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন উপাসনালয়কে ‘চন্দ্রমন্দির’ বলে দাবি করেছেন। সেখানে প্রাপ্ত মূর্তিকে ‘চন্দ্রদেবতা’র মূর্তি বলে দাবি করেছেন। 

চিত্রঃ ফিলিস্তিনের হাজরে আবিষ্কৃত উপাসনালয় ও বিভিন্ন কোন থেকে তোলা মূর্তির ছবি [30]

 

কিন্তু প্রাপ্ত মূর্তিগুলো আদৌ চন্দ্রদেবতার মূর্তি কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত নন। মূর্তিটি হাতে একটি পেয়ালা ধরে উপরের দিকে তাঁকিয়ে আছে। এমন ভঙ্গিমা কোনো উপাস্য মূর্তির হয় না, বরং উপাসকের হয়। এসব কারণে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি সেখানকার পুরোহিতের মূর্তি। [31]

 

যদি এটাও ধরে নিই যে ওটি আসলেই কোনো চন্দ্রদেবতার মূর্তি, তা থেকেও মোটেই এটা প্রমাণ হয় না যে মুসলিমদের আল্লাহর উপাসনা সেখান থেকে এসেছে। সে সময়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই বিভিন্ন দেব-দেবীর পুজা হতো। এর মাঝে যদি মক্কা থেকে সুদূর ফিলিস্তিনে একটা চন্দ্রদেবতার মূর্তি থেকেও থাকে, এ থেকে কিভাবে প্রমাণ হয় যে মুহাম্মাদ(ﷺ) সেখান থেকে আল্লাহর ধারণা নিয়েছেন?!! তিনি সে সময়ের মূর্তিপুজার বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি ফিলিস্তিনের সেই মূর্তিটির কোনো নামও কারো জানা নেই। ইসলামের একদম মূল দাওয়াহর একটা হচ্ছেঃ মূর্তিপুজা ধ্বংস করা। [32] যে মূর্তিপুজা ধ্বংস করা ইসলামের মূল্মন্ত্রের একটি, সেটিকেই ইসলামের নামে চালিয়ে দেয়া কি হাস্যকর প্রচেষ্টা নয়?

 

তর্কের খাতিরে তবুও যদি ধরে নিই যে পৌত্তলিক আরবরা চন্দ্রদেবতার পুজা করতো এবং তাকে ‘আল্লাহ’ বলতো – তবুও তা থেকে ইসলামকে পৌত্তলিক বলার সুযোগ ছিল না। কারণ ইসলামে স্রষ্টা সম্পর্কে তাদের পৌত্তলিক ধারণাগুলোর সাথে মোটেও একমত হয়নি। বরং কুরআনে স্রষ্টা সম্পর্কে যাবতীয় পৌত্তলিক ধারণাকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে, পৌত্তলিক স্রষ্টার উপাসনাকে অস্বীকার করা হয়েছে। পৌত্তলিকদের উদ্যেশে রাসুলুল্লাহ(ﷺ)কে এই কথা বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে -

( 1 )   قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ

( 2 )   لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ

অর্থঃ বলোঃ হে কাফিরেরা, আমি আমি তার ইবাদাত করি না যার ইবাদাত তোমরা করো [33]

 

প্রাচীন ইরাকের যে চন্দ্রদেবতার সাথে আল্লাহকে মেলানোর অপচেষ্টা করা হয়, সেই চন্দ্রদেবতা উপাসনার ব্যাপারে কি কুরআনে কিছু বলা আছে? আল্লাহর নবী ইব্রাহিম(আ.) প্রাচীন ইরাকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সেখানকার ‘উর’ শহরের বাসিন্দা ছিলেন যা ফোরাত বা ইউফ্রেটিস নদীর তীরে কুফা শহরের নিকটে অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ কর্তৃক ঐ শহরটির ভূগর্ভ খননের সময় যে সকল শিলালিপি পুঁথি-পুস্তক ও দলিলাদী উদ্ধার করা হয়েছে তার মাধ্যমে এ শহর সম্পর্কে নানা মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। অধিকন্তু, এ সবের মাধ্যমে ইব্রাহিম(আ.), তাঁর উর্ধ্বতন বংশধরগণ এবং তথাকার বাসিন্দাগণের ধর্মীয়, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান এবং অবস্থা সম্পর্কে বহু নতুন নতুন তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। [34] একটু আগেই আমরা আলোচনা করেছি যে, চন্দ্রদেবতা সিন এর পবিত্র শহর ছিল উর। চন্দ্রদেবতা সিনের পুত্র সূর্যদেবতা শামাশ এবং কন্যা শুক্রগ্রহের দেবী ইশতার (Ishtar)। প্রাচীন ইরাকের সেই জায়গাটি ছিল চন্দ্রসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনার লীলাভুমি। তারা মূর্তিসহ এসব দেব-দেবীর পুজা করতো। ইব্রাহিম(আ.) যেহেতু সেই অঞ্চলেরই বাসিন্দা, তাঁর সাথে এসব দেব-দেবীর পুজারীদের দেখা হবার কথা।

 

আল কুরআনে নবী ইব্রাহিম(আ.) এর জীবন ও ধর্ম প্রচারের বহু বিবরণ রয়েছে। তাঁর সময়ে শুকতারা বা শুক্রগ্রহ, চন্দ্র ও সূর্য এগুলোর সাথে কাল্পনিক দেবতাদের সংশ্লিষ্ট করে উপাসনার বস্তু বানানো হতো। মূর্তিসহকারে পুজা করা হতো। এই ব্যাপারগুলো আল কুরআনের পাতাতেও ঊঠে এসেছে। কেউ যদি সে পাতাগুলো খুলে দেখে, প্রাচীন ইরাকের অদেখা জগত আল কুরআনের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠে আসবে পাঠকের চোখের সামনে। সে দেখতে পাবেঃ আল্লাহর এক প্রিয় বান্দার সাথে পৌত্তলিকদের দ্বন্দ্বের চিত্র। সে জানবে - আল্লাহর নবী ইব্রাহিম(আ.) গ্রহ, চাঁদ, সূর্য সব কিছুর উপাসনা অস্বীকার করেছেন এবং এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর দিকে নিজ সম্প্রদায়কে আহ্বান করেছেন। 

 

“এমনিভাবেই আমি ইব্রাহিমকে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি, যাতে সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যখন রাতের অন্ধকার তাকে আবৃত করলো তখন সে আকাশের একটি গ্রহ [35] দেখতে পেলো, আর বললঃ এটা তো আমার প্রভু! কিন্তু যখন ওটা অস্তমিত হল তখন সে বললঃ আমি অস্তমিত বস্তুকে ভালবাসি না।

অতঃপর যখন সে চাঁদ উজ্জ্বলরূপে উদীয়মান দেখলো, বললো, এ তো আমার প্রভু! পরে যখন তা ডুবে গেল, বললো, যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ না দেখান, নিশ্চয়ই আমি পথহারা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো

অতঃপর যখন সে সূর্য উজ্জ্বলরূপে উদীয়মান দেখলো, বললো, এ তো আমার প্রভু, এ সবচেয়ে বড়! পরে যখন তা ডুবে গেল, তখন সে বললো,  হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত। নিশ্চয় আমি নিবিষ্ট করেছি আমার চেহারা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিক (অংশীবাদী)দের অন্তর্ভুক্ত নই

 

আর তাঁর জাতি তার সাথে বাদানুবাদ করলোসে বললো, তোমরা কি বাদানুবাদ করছ আমার সাথে আল্লাহর ব্যাপারে, অথচ তিনি আমাকে হেদায়েত দিয়েছেন? তোমরা তাঁর সাথে যা শরীক কর, আমি তাকে ভয় করি না, তবে আমার প্রভু যদি কিছু করতে চান (তাহলে ভিন্ন কথা)আমার প্রভু ইলম দ্বারা সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছেন। অতঃপর তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না’? তোমাদের মনগড়া ও বানানো শরীকদেরকে আমি কীভাবে ভয় করতে পারি? অথচ তোমরা এই ভয় করছো না যে, আল্লাহর সাথে যাদেরকে তোমরা শরীক করছো, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের কাছে কোন দলিল প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা অধিকতর শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী যদি তোমাদের জানা থাকে তাহলে বলো তো? প্রকৃতপক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত, যারা নিজেদের ঈমানকে যুলমের সাথে (শির্কের সাথে) মিশ্রিত করেনি।

 

আর এ হচ্ছে আমার দলিল, আমি ইব্রাহিমকে তার জাতির উপর দান করেছি। আমি যাকে চাই, তাকে মর্যাদায় উঁচু করি। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” [36]

 

নবী ইব্রাহিম(আ.) শুধু এগুলোর উপাসনাকে অস্বীকারই করেননি বরং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর উপাসনাকে শয়তানের উপাসনা হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন।

 

বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইব্রাহিমের কথা; সে ছিল সত্যবাদী ও নবী। যখন সে তার পিতাকে বললো, ‘হে আমার পিতা, তুমি কেন তার ইবাদাত করো যে না শুনতে পায়, না দেখতে পায় এবং না তোমার কোন উপকারে আসতে পারে’? ‘হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা তোমার কাছে আসেনি, সুতরাং আমার অনুসরণ করো, তাহলে আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাবো’
‘হে আমার পিতা, তুমি শয়তানের ইবাদাত করো না। নিশ্চয়ই শয়তান হল পরম করুণাময় [আল্লাহ] - এর অবাধ্য’
[37]

 

এসব দেব-দেবীর উপাসনাকে নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি, এসবের মূর্তি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলেন ইব্রাহিম(আ.)। তাদেরকে এটাও বুঝিয়ে বলেছেন যেঃ উপাসনা করা উচিত একমাত্র তাঁরই যিনি আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা। কাল্পনিক দেব-দেবীর নিজ হাতে তৈরি মূর্তির উপাসনা করা কোনো যৌক্তিক কাজ নয়।

 

 “তারা বললো, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এদের পুজা করতে দেখেছি’ সে বললো, ‘তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই রয়েছ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে’ তারা বললঃ তুমি কি আমাদের নিকট সত্য এনেছ, নাকি তুমি কৌতুক করছ? সে বললো, ‘না, বরং তোমাদের প্রভু তো আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রভু; যিনি এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর এ বিষয়ে আমি অন্যতম সাক্ষী’ শপথ আল্লাহর! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্তিগুলি সম্বন্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা অবলম্বন করবো অতঃপর সে মূর্তিগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল তাদের বড় (প্রধান)টি ছাড়া, যাতে তারা তাঁর দিকে ফিরে আসে[38]

 

তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে আসল। সে বললঃ তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ করো,  তাদেরই কি পুজা কর? ‘অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন’ [39]

 

আল কুরআনে ইব্রাহিম(আ.) এর কার্যাবলীর প্রশংসা করা হয়েছে, তাঁকে “আল্লাহর বন্ধু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর ধর্মাদর্শের দিকে ফিরে যেতে বলা হয়েছে।

 

“যে আল্লাহর নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করে সৎকাজে নিয়োজিত থাকে এবং একনিষ্ঠ ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে - তার চাইতে উত্তম দ্বীন কার? আল্লাহ ইব্রাহিমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।[40]

 

প্রাচীন ইরাকে মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তু নিয়ে  পৌত্তলিকতা প্রচলিত ছিল, আল কুরআন এর মূলে কুঠারাঘাত করে রেখেছে। যে চন্দ্রদেবতা এবং পৌত্তলিকতার সাথে ইসলামকে জড়ানোর অপচেষ্টা আজ করা হচ্ছে, আল কুরআনে তার মূল উৎসকেই খণ্ডন করে দেয়া আছে, ইব্রাহিম(আ.) এর ঘটনায়। সুবহানাল্লাহ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কিতাবে সকল কিছুর যথাযথ বিবরণ আছে।

 

“…আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।[41]

 

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারী খ্রিষ্টীয় প্রচারকরা হুবাল, সিন প্রভৃতি পৌত্তলিক দেবতাকে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়ে এক বিকৃত মিথ্যা অপবাদ ইসলামের উপর আরোপ করেছে। কিন্তু প্রকৃত বিশেষজ্ঞরা ইসলামের নামের এমন উদ্ভট জিনিস বলেন না। International Journal of Frontier Missions এর "Who Is "Allah"?" শীর্ষক আর্টিকেলে প্রখ্যাত বাইবেল পণ্ডিত Rick Brown উল্লেখ করেছেনঃ

 

“…Those who claim that Allah is a pagan deity, most notably the moon god, often base their claims on the fact that a symbol of the crescent moon adorns the tops of many mosques and is widely used as a symbol of Islam. It is in fact true that before the coming of Islam many "gods" and idols were worshipped in the Middle East, but the name of the moon god was Sin, not Allah, and he was not particularly popular in Arabia, the birthplace of Islam. The most prominent idol in Mecca was a god called Hubal, and there is no proof that he was a moon god. It is sometimes claimed that there is a temple to the moon god at Hazor in Palestine. This is based on a representation there of a supplicant wearing a crescent-like pendant. It is not clear, however, that the pendant symbolizes a moon god, and in any case this is not an Arab religious site but an ancient Canaanite site, which was destroyed by Joshua in about 1250 BC. ... If the ancient Arabs worshipped hundreds of idols, then no doubt the moon god Sîn was included, for even the Hebrews were prone to worship the sun and the moon and the stars, but there is no clear evidence that moon-worship was prominent among the Arabs in any way or that the crescent was used as the symbol of a moon god, and Allah was certainly not the moon god's name…” [42]

অর্থাৎ - যারা দাবি করে আল্লাহ একজন পৌত্তলিক দেবতা, নির্দিষ্ট করে বললে চন্দ্রদেবতা, তাদের দাবির ভিত্তি হচ্ছে এক ফালি চাঁদের চিহ্ন যা অনেক মসজিদের উপরিভাগে দেখা যায় এবং যেটিকে ইসলামের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এটা সত্য যে ইসলামপূর্ব যুগে মধ্যপ্রাচ্যে বহু দেবতা ও মূর্তির পুজা করা হতো, কিন্তু চন্দ্রদেবতার নাম ছিল ‘সিন’, আল্লাহ নয়। এবং এই দেবতা ইসলামের জন্মভুমি আরবে সেভাবে জনপ্রিয় ছিল না। মক্কার সব থেকে প্রসিদ্ধ মূর্তিটি ছিল হুবাল দেবতার এবং এটি চন্দ্রদেবতা বলে কোনো প্রমাণ নেই। কখনো কখনো এই দাবিও করা হয় যে, ফিলিস্তিনের হাজরে চন্দ্রদেবতার একটি মন্দির ছিল। অর্ধচন্দ্র আকৃতির গলার হার পরা একজন পুজারীর মূর্তি দেখিয়ে এই কথা বলা হয়। সেই গলার হারটি যে চন্দ্রদেবতাকেই নির্দেশ করে এটা মোটেও স্পষ্ট নয়। আর এটা কোনোভাবেই প্রাচীন আরবদের ধর্মীয় স্থান ছিল না বরং কানানীয় (Canaanite)দের ধর্মীয় স্থান ছিল। যেটিকে ১২৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ধ্বংস করেন যিহোশূয় (ইউশা বিন নুন)।  ...  যদি প্রাচীন আরবরা শত শত মূর্তির পুজা করে থাকে তাহলে সন্দেহ নেই যে এর মাঝে চন্দ্রদেবতা সিনও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে কারণ এমনকি ইহুদিরাও একসময়ে সূর্য, চন্দ্র এবং তারকার পুজা করেছিল। কিন্তু চন্দ্রপুজা আরবদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিংবা এক ফালি চাঁদকে চন্দ্রদেবতার প্রতীক হিসাব ব্যবহার করা হতো এমনও কোনো প্রমাণ নেই। এবং কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহ কোনো চন্দ্রদেবতার নাম ছিল না।

 

আল্লাহ সম্পর্কে মক্কার পৌত্তলিক আরবদের বিশ্বাস: আল্লাহ কি আসলেই ৩৬০ দেবতার একজন ছিলেন?

অনলাইন জগতে এই কথাটা  প্রায়ই শোনা যায়। মুসলিমদের দিকে চট করে অভিযোগের আঙুল তুলে বলা হয় – “তোমরা তো আল্লাহর উপাসনা করো। কিন্তু তোমরা কি জানো যে মক্কার পৌত্তলিকরাও আল্লাহর উপাসনা করতো? কা’বায় ৩৬০টা দেবতার মূর্তি ছিল। আর এর একজন দেবতা ছিল আল্লাহ! তাহলে তোমাদের সাথে তাদের পার্থক্য রইলো কী?”

কথাগুলোর ভেতরে কিছু সত্য আছে। আবার সূক্ষ্ম মিথ্যাও আছে।

 

আরবের মক্কায় বসবাসকারী সাধারণ লোকজন সেই প্রাচীন কাল থেকেই ইসমাঈল(আ.)-এর দাওয়াত ও প্রচারের ফলে ইব্রাহিম(আ.) প্রচারিত দ্বীনের অনুসারী ছিলেন। এ কারণেই তাঁরা ছিলেন আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করতেন। কিন্তু কাল প্রবাহে ক্রমান্বয়ে তাঁরা আল্লাহর একত্ববাদ এবং খালেস দ্বীনী শিক্ষার কোন কোন অংশ ভুলে যেতে থাকেন, কিংবা সে সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। [43] কীভাবে মক্কায় মূর্তিপুজা আরম্ভ হয় সে বিষয়ে ইতিমধ্যেই “হুবাল এবং আল্লাহ কি এক?” এই পয়েন্টে বিষদ আলোচনা করা হয়েছে। আমর বিন লুহাই নামে মক্কার এক নেতা শাম (বৃহত্তর সিরিয় অঞ্চল) থেকে মূর্তিপুজার আমদানী ঘটায়। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও আল্লাহর একত্ববাদ এবং দ্বীনে ইব্রাহিম(আ.) এর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থেকে যায়। আর কিছু কিছু বিকৃত জিনিস এর সাথে মিশ্রিত হয়। খাঁটি ইব্রাহিমী একত্ববাদী থেকে তারা মুশরিক বা অংশীবাদী পৌত্তলিকে পরিনত হয়। ধীরে ধীরে শুরু হয় অজ্ঞতা, কুসংস্কার আর অন্যায়ের এক যুগ ইতিহাসে যাকে বলা হয় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’।

 

 আল কুরআনে, হাদিসে এবং সিরাহ গ্রন্থগুলোতে অন্যান্য জিনিসের সাথে সাথে আরব পৌত্তলিকদের অনেক বিশ্বাসের কথাই উঠে এসেছে। আল কুরআনে বিভিন্ন স্থানে সে যুগের আরব মুশরিক বা পৌত্তলিকদের বিশ্বাস উল্লেখ করে তাদেরকে খণ্ডন করা হয়েছে।

 

মক্কার আরবরা নিজেদেরকে ইব্রাহিম(আ.) এর বংশধর হিসাবে বিশ্বাস করতো, [44] এবং ইব্রাহিম(আ.) এর উপাস্য আল্লাহ তা’আলাকে তারাও উপাসনা করত। যদিও এর সাথে সাথে তারা মূর্তিপুজাও করতো। আল্লাহকে আরব মুশরিকরাও তাদের স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করতো। সারা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা বলেও বিশ্বাস করতো।

 

وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۖ فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ

অর্থঃ তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তাহলে তারা অবশ্যই বলবেঃ “আল্লাহ” তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে? [45]

 

  وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۚ قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ ۚ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ ۖ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ
অর্থঃ আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে - তারা অবশ্যই বলবে “আল্লাহ” তুমি বলঃ আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকো তারা কি সেই ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করতে চাইলে, তারা কি সে রহমত প্রতিরোধ করতে পারবে? বল, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, ভরসাকারীরা তাঁরই উপর ভরসা করে। [46]

 

তারা এক অদ্বিতীয় আল্লাহর বিশ্বাসের সাথে সাথে বিভিন্ন নব উদ্ভাবিত উদ্ভট ধারণার প্রচলন করেছিল। তারা আল্লাহ তা’আলার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করতে শুরু করে। তারা লাত, মানাত এবং উযযা নামে তিন কাল্পনিক দেবীকে আল্লাহর কন্যা বলা শুরু করে (নাউযুবিল্লাহ)। অথচ এমন কোনো কিছুর ব্যাপারে তাদের কোনো দলিল-প্রমাণ ছিল না, ইব্রাহিম(আ.) বা পূর্বের কোনো নবী এরূপ কিছু শিক্ষা দেননি। আল কুরআনে তাদের এই নব উদ্ভাবিত বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরপর এই ভ্রান্ত বিশ্বাস নাকচ করে পৌত্তলিকতার নোংরামী ঝেড়ে ফেলে বিশুদ্ধ একত্ববাদিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

( 19 )   أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّىٰ

( 20 )   وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَىٰ

( 21 )   أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنثَىٰ

( 22 )   تِلْكَ إِذًا قِسْمَةٌ ضِيزَىٰ

( 23 )   إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنفُسُ ۖ وَلَقَدْ جَاءَهُم مِّن رَّبِّهِمُ الْهُدَىٰ

অর্থঃ তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উযযা সম্বন্ধে? আর মানাত সম্পর্কে, যা তৃতীয় আরেকটি?
তোমাদের জন্য কি পুত্র আর আল্লাহর জন্য কন্যা?
এ ধরণের বণ্টন তো অসঙ্গত।
এগুলো তো কেবল কিছু নাম, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছো
এ ব্যাপারে আল্লাহ কোন দলিল-প্রমাণ নাযিল করেননি। তারা তো কেবল অনুমান এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের কাছে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে হিদায়াত এসেছে। [47]

 

( 1 )   الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنزَلَ عَلَىٰ عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجًا ۜ

( 2 )   قَيِّمًا لِّيُنذِرَ بَأْسًا شَدِيدًا مِّن لَّدُنْهُ وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا

( 3 )   مَّاكِثِينَ فِيهِ أَبَدًا

( 4 )   وَيُنذِرَ الَّذِينَ قَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا

 ( 5 ) مَّا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ وَلَا لِآبَائِهِمْ ۚ كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ ۚ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا

অর্থঃ  সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নিজের বান্দার [মুহাম্মাদ()] প্রতি এ গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তাতে কোন বক্রতা রাখেননি। একে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করে এবং মু’মিনদেরকে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করে-তাদেরকে সুসংবাদ দান করে যে, তাদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে। তারা তাতে চিরকাল অবস্থান করবে। এবং তাদেরকে সতর্ক করার জন্যে যারা বলে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে। এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। কত উদ্ভট তাদের মুখের কথা। তারা যা বলে তা তো সবই মিথ্যা। [48]

 

( 88 )   وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَٰنُ وَلَدًا

( 89 )   لَّقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا

( 90 )   تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا

( 91 )   أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَٰنِ وَلَدًا

( 92 )   وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا

( 93 )   إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَٰنِ عَبْدًا

( 94 )   لَّقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا

( 95 )   وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا

অর্থঃ  তারা বলেঃ দয়াময় [আল্লাহ] সন্তান গ্রহণ করেছেন।  তোমরা তো এক বিভৎস কথার অবতারণা করেছো। এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়বে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচুর্ণ হবে। এ কারণে যে, তারা দয়াময়ের জন্যে সন্তান সাব্যস্ত করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়। নভোমণ্ডল ও ভূ-মন্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় [আল্লাহ]র কাছে বান্দা হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদেরকে গণনা করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে। [49]

 

কী ভেবে তারা মূর্তিপুজা করতো? এর স্বপক্ষে তাদের যুক্তি কী ছিল? আল কুরআন থেকেই এ বিষয়ে আমরা জানতে পারি। কুরআনের তাদের এই যুক্তিকে উল্লেখ করা হয়েছে এবং খণ্ডন করা হয়েছে।

 

( 1 )   تَنزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ

( 2 )   إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ

( 3 )   أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ

( 4 )   لَّوْ أَرَادَ اللَّهُ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا لَّاصْطَفَىٰ مِمَّا يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ سُبْحَانَهُ ۖ هُوَ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ

( 5 )   خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ ۖ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ ۖ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّسَمًّى ۗ أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ

অর্থঃ “এই  কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমি তোমার [মুহাম্মাদ()] প্রতি এ কিতাব যথার্থরূপে নাযিল করেছি। অতএব, তুমি আল্লাহর ইবাদত করো তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্তে। জেনে রাখো, অবিমিশ্রিত আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।

 যারা আল্লাহ ব্যতিত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না যে মিথ্যাবাদী ও সত্য গোপনকারী ।

আল্লাহ যদি সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করতেন, তবে তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যা কিছু ইচ্ছা মনোনিত করতেন, তিনি পবিত্র। তিনি আল্লাহ, এক পরাক্রমশালী। তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সুর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রেখো, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। [50]

 

তারা আল্লাহকেই সকল কিছুর নিয়ন্তা বলে মানতো। দেবতাদের ব্যাপারে তাদের ধারণ ছিল যেঃ তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে বা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। তারা ঐ দেবমূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে এক করে দেখতো না।

 

আল্লাহকে বিশ্বাসের সাথে সাথে শির্ক করা সেই জাতি ইব্রাহিমী বিশ্বাসের ছিটেফোঁটা হিসাবে এটাও বলতো যেঃ “আল্লাহর শরীক” নেই। কিন্তু এই কথা বলার পরে তারা উদ্ভট অপব্যাখ্যা করে আল্লাহর উপসনায় শরীক করতো। ইব্রাহিম(আ.) এর শরিয়ত থেকে তারা হজের বিধান পেয়েছিল। সেই হজ তারা বংশপরম্পরায় ঠিকই চালু রেখেছিল, কিন্তু এর ভেতরে বিভিন্ন নবউদ্ভাবন (বিদআত) এবং অংশীবাদ (শির্ক) ঢুকিয়ে ফেলেছিল।

 

তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে হজ করত, তাওয়াফ করত, তার সামনে নত হত ও সিজদা করত। তাওয়াফের সময় তারা শির্কী তালবিয়া পাঠ করত। -- لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ

অর্থাৎ, ‘(হে আল্লাহ!) আমি হাজির। আপনার কোনো শরীক নেই – সেই শরীক ছাড়া, যে আপনি যার মালিক আর সে মালিক নয়।” মুশরিকরা ‘লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা’ {আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই} বলার পর রাসুল(ﷺ) তাদের উদ্দেশ্যে “ক্বাদ, ক্বাদ” (থামো থামো) বলতেন। [51]

মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ(ﷺ) সেখানে আবার খাঁটি একত্ববাদী হজের তালবিয়া চালু করেন। আগের তালবিয়ার ভুল জিনিসগুলো বাদ দেন, সঠিক জিনিসগুলো বহাল রাখেন।

 

ইসলামী তালবিয়াহ হ’ল,

 لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ

অর্থাৎ - “আমি হাজির হে আল্লাহ আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা, অনুগ্রহ ও সাম্রাজ্য সবই আপনার; আপনার কোনো শরীক নেই’ [52]

 

আমরা দেখলাম যে, অংশী স্থাপন করলেও মক্কার মুশরিকরা তাদের অন্য দেবতাদেরকে আল্লাহর সমতুল্য মনে করতো না। আল্লাহর মর্যাদা তাদের নিকট সব থেকে উচ্চ ছিল। প্রাচীন আরবীয় সেই পৌত্তলিকদের নিকট আল্লাহ মহান স্রষ্টা হিসাবে বিবেচিত হতেন। এবং এই স্রষ্টার  মোটেও তাদের দৃষ্টিতে কোনো পার্থিব দেবতা ছিলেন না। তাদের নিকট দেবতারা ছিল পার্থিব এবং আল্লাহ তা’আলা এর ঊর্ধ্বে। Oxford Islamic Studies এর ওয়েবসাইটেও এটি উল্লেখ করা হয়েছে যেঃ আরবের পৌত্তলিকরা কখনো আল্লাহর মূর্তি বানায়নি। [53] কাজেই আল্লাহ যে আরব মুশরিকদের ৩৬০ দেবতার ১ জন দেবতা ছিলেন কিংবা মূর্তিসহকারে পুজিত হতেন – ইসলামের শত্রুদের এ জাতীয় কথা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

 

 জাহিলিয়াতের যুগে আরবের পৌত্তলিকদের এই ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যাবে নিচের ঘটনাটি থেকে।

 

হুসাইন নামে এক বৃদ্ধ বেদুঈন একবার রাসুলুল্লাহর() কাছে এলো। নবী() তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কয়জনের “ইবাদাত করো, হুসাইন?”

 সে বললো, “৭ জনের ৬ জন পৃথিবীতে আর ১ জন আসমানের উপর[54]

নবী() তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কাকে ভয় করো?” সে বললো, “যিনি আসমানের উপর আছেন তাঁকে।”

তিনি এবার জিজ্ঞেস করলেন, “হুসাইন, কার কাছে চাও তুমি?” সে বললো, “যিনি আসমানের উপর আছেন, তাঁর কাছে।”

নবী() তখন বললেন, “তাহলে পৃথিবীতে যারা আছে তাদের বর্জন করে যিনি আসমানের উপর আছেন [আল্লাহ] কেবল তাঁর ইবাদাত করো

[রাসুলুল্লাহ() এর কথা শুনে] হুসাইন ইসলাম গ্রহণ করলেন। [55]

 

এই পৌত্তলিক আরব আল্লাহতেও বিশ্বাস করছিল, আবার বিভিন্ন পৃথিবীর কাল্পনিক দেবদেবীতেও বিশ্বাস করছিল।

আল্লাহতে বিশ্বাসের সাথে সাথে তারা অংশী স্থাপন করতো। যে কথা উঠে এসেছে আল কুরআনের পাতায়ঃ

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ

অর্থঃ তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর সাথে শরীক করে। [56]

 

নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) মুশরিক আরবদের এইসব নব উদ্ভাবিত অংশীবাদী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বলেন, এবং আল্লাহর ওহীর দ্বারা বিশুদ্ধ ইব্রাহিমী একত্ববাদের দাওয়াত দেন। আল কুরআনে পৌত্তলিক সেসব দেব-দেবীকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। কেবলমাত্র এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনার দিকে আহ্বান করা হয়েছে। সেই বিশুদ্ধ ধর্মের দিকে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে যেই ধর্ম এক সময়ে প্রচার করেছিলেন তাদের পুর্বপুরুষ ইব্রাহিম(আ.)।

 

“আর যে নিজকে নির্বোধ বানিয়েছে, সে ছাড়া কে ইব্রাহিমের আদর্শ থেকে বিমুখ হতে পারে? আর অবশ্যই আমি তাকে দুনিয়াতে বেছে নিয়েছি এবং নিশ্চয় সে আখিরাতে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
যখন তাঁর প্রভু তাকে বললেন, ‘তুমি আত্মসমর্পণ কর’
সে বললো, ‘আমি সকল সৃষ্টির প্রভুর কাছে নিজকে সমর্পণ করলাম’আর এরই উপদেশ দিয়েছে ইব্রাহিম তার সন্তানদেরকে এবং ইয়া’কুবও (যে,) ‘হে আমার সন্তানেরা, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীনকে চয়ন করেছেন। সুতরাং তোমরা মুসলিম হওয়া ছাড়া মারা যেয়ো না। যখন ইয়াকুবের মৃত্যু উপস্থিত হল তখন কি তোমরা উপস্থিত ছিলে, যখন সে নিজ পুত্রদেরকে বলেছিলঃ আমার পরে তোমরা কোন্ জিনিসের ইবাদাত করবে? তারা বলেছিলঃ আমরা তোমার উপাস্যের এবং তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্য - সেই অদ্বিতীয় উপাস্যের ইবাদাত করবো এবং আমরা তাঁরই অনুগত থাকবো [57]

 

“ইব্রাহিম ইহুদি ছিল না এবং খ্রিষ্টানও ছিলনা, বরং সে হানিফ (একনিষ্ঠ) মুসলিম ছিল এবং সে মুশরিকদের (অংশীবাদী) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে ইব্রাহিমের সবচেয়ে নিকটবর্তী তারা, যারা তাঁর অনুসরণ করেছে এবং এই নবী [মুহাম্মাদ()] ও মুমিনগণ। আর আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক।[58]

 

"এবং আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা দুই উপাস্য গ্রহণ করো না উপাস্য তো মাত্র একজনই। অতএব আমাকেই ভয় কর।” [59]

 

"সে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে, যে তার অপকার করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। এটাই চরম পথভ্রষ্টতা।" [60]

 

"তারা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর পুজা করে, যার কোন সনদ নাজিল করা হয়নি এবং সে সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। বস্তুতঃ জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।" [61]

 

"এবং যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যদেরকে ডাকে, ওরা তো কোন বস্তুই সৃষ্টি করে না; বরং ওরা নিজেরাই সৃজিত। তারা মৃত-প্রাণহীন এবং কবে পুনরুত্থিত হবে জানে না।" [62]

 

"তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পুজা কর, তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর যদি মাছি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না, প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়ে শক্তিহীন।" [63]

 

"অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক উর্দ্ধে।" [64]

 

"বলো, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, আল্লাহ ব্যতিত যাদেরকে উপাস্য মনে করতে, তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অণু পরিমাণ কোন কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়।" [65]

 

"বলো, তোমরা কি তোমাদের সে শরীকদের কথা ভেবে দেখেছ, যাদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা ডাকো? তারা পৃথিবীতে কিছু সৃষ্টি করে থাকলে আমাকে দেখাও। না আসমান সৃষ্টিতে তাদের কোন অংশ আছে, না আমি তাদেরকে কোন কিতাব দিয়েছি যে, তারা তার দলিলের উপর কায়েম রয়েছে, বরং জালেমরা একে অপরকে কেবল প্রতারণামূলক ওয়াদা দিয়ে থাকে।" [66]

 

"...এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলো; সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো" [67]

 

"তারা তাঁর [আল্লাহর] পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছু্ই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক নয়।" [68]

 

"যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ করে তদের উদাহরণ মাকড়সা। সে ঘর বানায়। আর সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো অধিক দূর্বল, যদি তারা জানত।" [69]

 

"আর তোমরা তাঁকে(আল্লাহ) বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকো তারা না তোমাদের কোনো সাহায্য করতে পারবে, না নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।" [70]

 

"তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পুজা কর, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরাই তাতে প্রবেশ করবো" [71]

 

"তাদেরকে বলা হবেঃ তারা কোথায়, তোমরা যাদের পুজা করতে আল্লাহর পরিবর্তে? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে, অথবা তারা প্রতিশোধ নিতে পারে? অতঃপর তাদেরকে এবং পথভ্রষ্টদেরকে অধোমুখী করে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামে। এবং ইবলিসের বাহিনীর সকলকে।" [72]

 

“এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনিত করেছেন। তিনি ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের উপর কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম এবং এই কিতাবেও, যাতে রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরা স্বাক্ষী হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা সলাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি!” [73]

 

সকালে ও সন্ধ্যায় যে সকল দুয়া-যিকিরের দ্বারা আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তার মধ্যে একটি হচ্ছেঃ

أَصْبَحْنا / أَمْسَـينا عَلَى فِطْرَةِ الْإِسْلاَمِ، وَعَلَى كَلِمَةِ الْإِخْلاَصِ، وَعَلَى دِينِ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ (ﷺ)، وَعَلَى مِلَّةِ أَبِينَا إِبْرَاهِيمَ، حَنِيفاً مُسْلِماً وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشرِكِينَ،

অর্থঃ “আমরা সকালে / সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছি ইসলামের ফিতরাতের উপর, নিষ্ঠাপূর্ণ বাণী (তাওহিদ) এর উপর, আমাদের নবী মুহাম্মাদ() এর দ্বীনের উপর, আর আমাদের পিতা ইব্রাহিম(আ.) এর ধর্মাদর্শের উপর—যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না”[74]

 

এভাবে মুসলিমরা প্রতিদিন একত্ববাদের সাক্ষ্য দিচ্ছে, নিজেদেরকে ইব্রাহিম(আ.) এর সাথে সংশ্লিষ্ট করছে এবং পৌত্তলিকতা বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে। যারা ইসলামকে পৌত্তলিকতার সাথে সম্পর্কযুক্ত বানাতে চান, তারা প্রকৃত সত্যের সম্পূর্ণ উল্টো জিনিস ইসলামের উপর আরোপ করেন। ইসলাম মোটেও পৌত্তলিক (pagan) নয়, ইসলাম সম্পূর্ণরূপে ইব্রাহিমী (Abrahamic)। ইব্রাহিম(আ.) এবং আল্লাহর সকল নবী তো একই ধর্ম প্রচার করেছেন। আর তা হল ইসলাম।

 

ধরা যাক একজন ব্যক্তি বৃষ্টির বিশুদ্ধ পানি একটি পাত্রে সংরক্ষণ করলো। কিছুদিন পর সেই পানিতে ময়লা মিশ্রিত হয়ে দূষিত হয়ে গেলো।

এরপর আরেকজন ব্যক্তি সেই পানিকে ফিল্টার করে এবং ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে আবার আগের জায়গায় নিয়ে আসলো। এখন কেউ যদি বলেঃ ঐ পানি খাওয়া যাবে না, কারণ ঐ পানি একসময় ময়লা ছিল। ঐ পানি সম্পূর্ণ ফেলে দিতে হবে! – তাহলে সেটি কি যৌক্তিক কথা হবে? মোটেও না। কারণ ঐ পানি একসময় ময়লা থাকলেও পরে সেটিকে ফিল্টার করে এবং ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে বিশুদ্ধ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ঠিক যেমন ঐ পানি আদি অবস্থায় ছিল। পানিকে সম্পূর্ণ ফেলে না দিয়ে সেটিকে বিশুদ্ধ করাই যথেষ্ট।

 

একইভাবে, প্রাচীন আরবের পৌত্তলিকদের ইতিহাস বলে ইসলামের ভিত্তিকে পৌত্তলিক বলাও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেননা, আরব পৌত্তলিকদের ইতিহাসই মক্কার সর্বপ্রাচীন ইতিহাস না। তারা সব সময় পৌত্তলিক ছিল না। তারা আল্লাহর ধারণা ও একত্ববাদী ধর্ম পেয়েছিল ইব্রাহিম(আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল(আ.) এর কাছ থেকে। কালক্রমে তাদের মাঝে পৌত্তলিকতা শুরু হয়। পরবর্তীতে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) তাদের মাঝে আগমন করেন, তাদের মধ্যকার সব পৌত্তলিকতাকে দূর করে দিয়ে বিশুদ্ধ ইসলামী একত্ববাদ পুণঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ইসলাম আরব পৌত্তলিকদের আল্লাহতে বিশ্বাস বাতিল করে দেয়নি কেননা সেটা তো সঠিক বিশ্বাস। শুধুমাত্র আল্লাহর সাথে তারা যে শরীক করতো – সেগুলোকে বাতিল করেছে। আল্লাহ সম্পর্কে নবউদ্ভাবিত ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে বাতিল করেছে। আরবের ইহুদিরা উজাইরকে আল্লাহর পুত্র বলতো, [75] ইসলাম তাদের এই জিনিসটিকে বাতিল করেছে। তাদের আল্লাহ ও নবী-রাসুলে বিশ্বাসকে বাতিল করে দেয়নি। খ্রিষ্টানরা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করতো, ঈসা(আ.)কে আল্লাহর পুত্র বলতো। আল কুরআনে খ্রিষ্টানদের এই জিনিসগুলোকে বাতিল বলে অভিহিত করা হয়েছে। খ্রিষ্টানদের আল্লাহতে বিশ্বাস, পরকালে বিশ্বাস - এর সবকিছুকে বাতিল করে দেয়া হয়নি।

 

এবার এতক্ষণের আলোচনা থেকে ঝটপট কিছু পয়েন্ট করে ফেলা যাক-

 

১। মক্কার মানুষেরা ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর মাধ্যমে একত্ববাদী ধর্মাদর্শ পেয়েছিল। তারা এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করতো। কালক্রমে তাদের সত্য ধর্মে বিভিন্ন নব উদ্ভাবন চালু হয়ে যায়। তাদের মাঝে মূর্তিপুজা শুরু হয় এবং তারা এক-আল্লাহর সাথে সাথে কিছু দেব মূর্তিরও উপাসনা করতে শুরু করে। আল্লাহর উপাসনা ছিল আদি বিশ্বাস, মূর্তিপুজা ছিল নব উদ্ভাবন।

২। মুশরিক বা পৌত্তলিক আরবরা বিভিন্ন দুনিয়াবী দেবতার মূর্তির পুজা করত। তারা আল্লাহকে তারা কোনো দুনিয়াবী দেবতা মনে করতো না বরং মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও সব কিছুর মালিক মনে করতো। কা’বার নির্মাতা ইব্রাহিম(আ.) এর ইলাহ মনে করতো।

৩। মক্কার পৌত্তলিকরা আল্লাহর কোনো মূর্তি বানায়নি। আল্লাহ মোটেও নব উদ্ভাবিত ৩৬০ দেবতার এক দেবতা ছিলেন না।

৪। নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) আল্লাহর পক্ষে থেকে ওহী পেয়ে পুনরায় সেই আদি একত্ববাদী ধর্মাদর্শ (ইসলাম) প্রচার করতে শুরু করেন। এক আল্লাহর উপাসনা করতে আহ্বান জানান এবং সকল প্রকার মূর্তিপুজা ও পৌত্তলিকতা ত্যাগ করতে বলেন। আল কুরআনে বারংবার মুশরিকদের পৌত্তলিকতার অসারতা বর্ণনা করা হয়েছে ও নাকচ করে দেয়া হয়েছে।

৫। আল্লাহর নির্দেশে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) মুশরিকদের ধর্মের নব উদ্ভাবনগুলো অপসারিত করেন এবং আদি সঠিক জিনিসগুলোকে বহাল রাখেন। এক আল্লাহর উপাসনা, হজের ইব্রাহিমী রীতি – এগুলো সেই আদি একত্ববাদী ধর্মাদর্শের অংশ ছিল। সেগুলো নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর শরিয়তে বহাল থাকে।

৬। আরব মুশরিকদের পৌত্তলিকতার সাথে ইসলাম একমত হয়নি, তাদের নব উদ্ভাবন মিশ্রিত স্রষ্টার ধারণাকে ইসলাম গ্রহণ করেনি। কুরআনে পুনর্বার তাদের পৌত্তলিকতাকে নাকচ করা হয়েছে। সেখানে এক অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে ইব্রাহিমী ধর্মাদর্শে প্রত্যাবর্তন করতে। কাজেই আরব পৌত্তলিকরা জাহেলী যুগে যতই দেব-দেবীর উপাসনা করুক – তা দিয়ে ইসলামের উৎসকে পৌত্তলিক বলার উপায় নেই। তারা যদি চন্দ্রদেবতার উপাসনাও করে থাকতো (প্রকৃতপক্ষে তারা তা করতো না) – সেটিও প্রমাণ করে না যে আল্লাহ হচ্ছেন চন্দ্রদেবতা। কেননা ইসলামে স্পষ্টভাবে তাদের পৌত্তলিকতাকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

 

মুসলিমরা কেন চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহার করে?

এখন আরো একটি প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন মুসলিম দেশের পতাকায় কেন একফালি চাঁদ (Crescent Moon) এবং তারার প্রতীক থাকে? এই জিনিসটি কেন ইসলামের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার হয়? এই চাঁদ-তারা প্রতীকের প্রচলনকে ইসলামবিরোধীরা ‘চন্দ্রদেবতা’ তত্ত্বের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ হিসাবে দাঁড় করায়।

 

প্রথমেই একটি জিনিস বলে রাখি। কোনো সম্প্রদায় একটি প্রতীক ব্যবহার করার অর্থ এই নয় যে তারা সেই জিনিসের পুজা করে। খ্রিষ্টানরা তাদের গির্জায় ক্রুশের প্রতীক ব্যবহার করে। ইহুদিরা Star of David নামক ছয় কোণা তারার প্রতীক ব্যহার করে। এর অর্থ কি এই যে খ্রিষ্টানরা ক্রুশের পুজা করে বা ইহুদিরা তারার পুজা করে? ইহুদি বা খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে কিন্তু কেউ এই অভিযোগ তোলে না। অযৌক্তিকভাবে শুধু মুসলিমদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলা হয়।

 

চাঁদ তারার প্রতীক মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত আছে – এটা সত্য। কিন্তু মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত সব জিনিসই যে ‘ইসলামী’ এমন কোনো কথা নেই। চাঁদ-তারার এই প্রতীককে ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট করতে হলে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে এর পক্ষে দলিল দিতে হবে। কুরআন বা হাদিসের কোথাও চাঁদকে বা তারাকে ইসলামের প্রতীক বলা হয়নি। কোথাও চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহারের আদেশ দেয়া হয়নি। নবী (ﷺ) কখনো এই প্রতীক ব্যবহার করেননি। এমনকি খুলাফায়ে রাশিদীন (প্রথম চারজন ন্য্যায়পরায়ণ খলিফা) এবং তাঁদের পরে উমাইয়া খলিফা – এদের কারো যুগেও মুসলিমদের মধ্যে চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই। এই খলিফাদের যুগের বেশ পরের সময় থেকে চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার শুরু হয়। যা থেকে প্রমাণ হয় যে, ইসলামের সাথে সরাসরি এই প্রতীকের কোনো সম্পর্ক নেই। কাদের দ্বারা এই প্রতীকের প্রচলন মুসলিমদের মাঝে শুরু হয় তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন মত আছে। কারো কারো মতে পারস্যবাসীদের থেকে আবার কারো কারো মতে গ্রীকদের মাধ্যমে এই প্রতীক মুসলিমদের মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে। [76] তবে এ ব্যাপারে সব চেয়ে স্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে – মুসলিম উম্মাহর মাঝে তুর্কীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এই প্রতীকের ব্যবহার শুরু হয়। তুর্কী ঐতিহাসিকদের [যেমন Mehmet Fuat Köprülü] মতে, প্রাচীন কাল থেকেই এশিয়ায় তুর্কীদের বিভিন্ন রাজ্যে এক ফালি চাঁদ (চাঁদ-তারা নয়) এর প্রতীকের প্রচলন ছিল। [77]

 

জার্মান প্রাচ্যবিদ Franz Babinger এর মতে,

"It seems possible, though not certain, that after the conquest Mehmed took over the crescent and star as an emblem of sovereignty from the Byzantines. The half-moon alone on a blood red flag, allegedly conferred on the Janissaries by Emir Orhan, was much older, as is demonstrated by numerous references to it dating from before 1453. But since these flags lack the star, which along with the half-moon is to be found on Sassanid and Byzantine municipal coins, it may be regarded as an innovation of Mehmed. It seems certain that in the interior of Asia tribes of Turkish nomads had been using the half-moon alone as an emblem for some time past, but it is equally certain that crescent and star together are attested only for a much later period. There is good reason to believe that old Turkish and Byzantine traditions were combined in the emblem of Ottoman and, much later, present-day Republican Turkish sovereignty." [78]

অর্থাৎ, সাধারণভাবে তুর্কী যাযাবর গোত্রগুলো তাদের রাজ্যের জন্য অর্ধচন্দ্রের প্রতীক ব্যবহার করতো। তবে সেই প্রতীকে চাঁদ-তারা একত্রে ছিল না। তারার প্রতীক  ছিল (পারস্যের) সাসানীয় এবং বাইজানটাইনদের মুদ্রায়।  ১৪৫৩ সালে বাইজানটাইন (পূর্ব রোম সাম্রাজ্য) বিজয়ের পর উসমানী সুলতান মেহমেদ [মুহাম্মাদ আল ফাতিহ(র.)] তাদের থেকে চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার শুরু করেন। এভাবে উসমানী তুর্কী দের মধ্যে চাঁদ-তারা প্রতীকের ব্যবহার শুরু হয়ে যায় এবং আরো পরে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্রেও এই প্রতীক ব্যবহার হয়।

 

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতেও অনুরূপ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। [79]

 

চিত্রঃ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে প্রচলিত চাঁদ-তারা প্রতীক [80]

 

উসমানীরা (Ottomans) কয়েক শত বছর পুরো মুসলিম উম্মাহর নের্তৃত্ব  দিয়েছে এবং তারাই মুসলিম উম্মাহর খলিফার মর্যাদায় ছিল। দীর্ঘদিন তাদের শাসনের ফলে তাদের সরকারী প্রতীক পুরো মুসলিম বিশ্বে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে যায়। মসজিদ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ জায়গায় খলিফার প্রতীক ব্যবহার হতে থাকে। মসজিদে এই প্রতীক ব্যবহারের আরো একটি কারণ আছে। খ্রিষ্টানরা তাদের গির্জায় ক্রুশের প্রতীক ব্যবহার করতো। এর দেখাদেখি মুসলিমরাও মসজিদে কোনো একটা প্রতীকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল। [81] এই প্রতীক স্থায়ী হবার পেছনে ইসলামী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিরও একটা ভুমিকা আছে। হিজরী বর্ষপঞ্জিকা চাঁদের অবস্থানের মাধ্যমে গণনা করা হয়। এ ছাড়া রমযান এবং ঈদের সময়েও নতুন চাঁদের একটা বিশাল ভুমিকা থাকে মুসলিম বিশ্বে। এসব কারণে চাঁদ-তারার প্রতীক মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।

 

ইসলামের প্রতীক হিসাবে চাঁদ-তারা ব্যবহারের শরয়ী বিধান কী? যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহতে এই প্রতীক ব্যবহারের কোনো উল্লেখ নেই – ইসলামী শরিয়তে এই প্রতীকের তাই কোনো ভিত্তি নেই। অনেক আলেম একে বিদআত (নব উদ্ভাবন) বলে অভিহিত করেছেন। তা ছাড়া এই প্রতীক ব্যবহারের ফলে বিজাতীয়দের সাদৃশ্য অবলম্বনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় কেননা অনেক পৌত্তলিক জাতি আছে যারা এ জাতীয় মহাজাগতিক বস্তুর পুজা করে। কাজেই এই প্রতীক না ব্যবহার করাই সঙ্গত। [82]

 

আমরা দেখলাম যে, কুরআন-সুন্নাহর সাথে চাঁদ তারা কিংবা এক ফালি চাঁদের প্রতীকের কোনো সম্পর্ক নেই। এই প্রতীক তুর্কী যাযাবর ও পরে উসমানী সাম্রাজ্যের দ্বারা মুসলিম বিশ্বে প্রসিদ্ধ হয়েছে। এমন একটি বিষয়কে চন্দ্রদেবতা তত্ত্বের ‘প্রমাণ’ হিসাবে পেশ করার কোনোরূপ যুক্তি নেই।

 

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ এবং আল্লাহ

ইহুদি-খ্রিষ্টানরা আল্লাহ সম্পর্কে বিভিন্ন ভ্রান্ত জিনিসে বিশ্বাস করে। কিন্তু তাদের ধর্মগ্রন্থের প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে বলা যায় – সেখানে যে স্রষ্টার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আমরা মুসলিমরাও সেই একই স্রষ্টার উপাসনা করি। যদিও তাদের প্রতি যে কিতাব নাজিল করা হয়েছিল তা পরবর্তীকালে বিকৃত হয়ে গেছে এবং তাতে স্রষ্টা সম্পর্কেও অনেক ভুল তথ্য আছে তথাপি তাদের গ্রন্থে সাধারণভাবে সত্য সৃষ্টিকর্তার উপাসনার কথাই বলা হয়েছে। খ্রিষ্টানরা ত্রিত্ববাদ (Trinity) এ বিশ্বাসী হলেও বাইবেলে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। বাইবেলে বারংবার Godকে Abraham, Isaac ও Jacob এর প্রভু হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [83] আমরা মুসলিমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি যে, আমরাও ইব্রাহিম(আ.), ইসহাক(আ.) এবং ইয়া’কুব(আ.) এর ইলাহ মহান আল্লাহ তা’আলার উপাসক। প্রাচীন সেইসব নবীদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল, আমরা সেগুলোতেও বিশ্বাসী। আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ

 وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ ۖ وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

অর্থঃ আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের [ইহুদি-খ্রিষ্টান] সাথে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া, যারা যুলুম করেছে। আর তোমরা বলো, ‘আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একইআর আমরা তাঁরই সমীপে আত্মসমর্পণকারী [84]

 

যদিও অনেক খ্রিষ্টান মিশনারী এবং নাস্তিক-মুক্তমনারা এই ব্যাপারটি মানতে নারাজ! প্রবন্ধের শুরুতেই আলোচনা করা হয়েছে যে, আরবি ভাষায় যেমন মহান স্রষ্টাকে ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়, হিব্রু ভাষায় এর সমজাতীয় শব্দ ‘এলোহিম’ (אלהים) এবং ‘এলোয়াহ’ (אלוהּ) যা বাইবেলে রয়েছে। এর উৎপত্তি মূল শব্দ ‘এল’ থেকে। বাইবেলীয় অ্যারামায়িক ভাষায় এর সমজাতীয় শব্দ ‘এলাহা’ (ܐܠܗܐ) এবং সিরিয়াকে এর উচ্চারণ হয় ‘আলাহা’ (ܐܲܠܵܗܵܐ)। ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত এই ভাষাগুলো। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে ‘Allah’ শীর্ষক আর্টিকেলে বলা হয়েছে -

“The name’s origin can be traced to the earliest Semitic writings in which the word for god was il or el, the latter being used in the Hebrew Bible (Old Testament). Allah is the standard Arabic word for God and is used by Arabic-speaking Christians and Jews as well as by Muslims regardless of their native tongue.” [85]

অর্থাৎ, আল্লাহর নামের উৎস পাওয়া যেতে পারে প্রাচীন সেমিটিক লেখনীতে, যেখানে উপাস্যের জন্য ‘ইল’ অথবা ‘এল’ শব্দ ব্যবহার করা হতো। হিব্রু বাইবেল অর্থাৎ বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) অংশে ‘এল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আরবিভাষী ইহুদি, খ্রিষ্টানদের নিকট স্রষ্টা বোঝানোর জন্য ‘আল্লাহ’ হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড শব্দ। আর যে কোনো ভাষাভাষী মুসলিমের জন্য এটি স্ট্যান্ডার্ড শব্দ।

 

আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে, পৌত্তলিক আরবদের নিকটেও আল্লাহ কোনো পার্থিক দেবমূর্তির নাম ছিল না বরং সারা বিশ্বের স্রষ্টা এবং ইব্রাহিম(আ.) এর উপাস্য হিসাবে বিবেচিত হতেন। শুধু পৌত্তলিক আরবরাই নয়, আল্লাহর উপাসনা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দুই আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারী ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। সেই প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আরবিভাষী ইহুদি, খ্রিষ্টান সকলেই স্রষ্টাকে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকে। বর্তমানে ইরাক, সিরিয়া, মিসর, লেবানন – এসব দেশে লক্ষ লক্ষ আরবিভাষী খ্রিষ্টান বাস করে। তাদের ধর্মগ্রন্থ আরবি বাইবেলেও God এর স্থলে ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [86]  তারাও ইব্রাহিম(আ.) এর উপাস্য মহান সত্তাকে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকে।

চিত্রঃ ইহুদি পণ্ডিত সাদিয়া গাওন কর্তৃক বাইবেলের ৯ম শতকের সুপ্রাচীন আরবি অনুবাদ। সেই অনুবাদের ১ম পৃষ্ঠায় [আদিপুস্তক (Genesis) ১ম অধ্যায়] ‘আল্লাহ’ নামের ব্যবহার

 

যেসব খ্রিষ্টান প্রচারক এবং ইসলামবিরোধী নাস্তিক এক্টিভিস্ট বলতে চান যে, মুসলিমদের আল্লাহ কোনো আব্রাহামিক স্রষ্টা না বরং আরবীয় পৌত্তলিক দেবতা (!) তাদের উদ্যেশ্যে প্রশ্নঃ আরবিভাষী ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তাহলে কেন সেই যুগে এবং আজও নিজ স্রষ্টাকে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকে? তারাও কি তবে পৌত্তলিক দেবতা কিংবা ‘Moon god’ এর উপাসক?!!

 

পশ্চিমা খ্রিষ্টান প্রচারকদের লাগামহীন ইসলামবিরোধী ক্যাম্পেইনের অংশ হিসাবে আল্লাহ তা’আলাকে নিয়ে যে আজেবাজে তত্ত্ব প্রচার করা হয়, এতে শুধু মুসলিমরা যে আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়। আরবিভাষী খ্রিষ্টানরাও এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার খ্রিষ্টান ইভানজেলিস্টরা যখন দিন-রাত আল্লাহ তা’আলাকে Moon god বলে প্রচার করে যায়, তখন আরব খ্রিষ্টানরা নিজ ভাষার বাইবেল খুলে ‘আল্লাহ’ নাম দেখে খুব বিব্রত হয়। আরব খ্রিষ্টানরা খুব ভালো করেই জানে যে আল্লাহকে ‘চন্দ্রদেবতা’ বলা কতো বড় মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। এ কারণে আরব খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের কাউকে কাউকে স্বধর্মের লোকদের এই বানোয়াট তত্ত্বের প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। প্রখ্যাত আরব খ্রিষ্টান পণ্ডিত এবং Arabic Bible Outreach এর পরিচালক মাইকেল আব্দিল মাসিহ বলেন,

 

It is an unproven theory, so it may well be false. Even if it turns out to be true, it has little bearing on the Muslim faith since Muslims do not worship a moon god. That would be blasphemy in Islamic teachings. If we use the moon-god theory to discredit Islam, we discredit the Christian Arabic speaking churches and missions throughout the Middle East. This point should not be discounted lightly because the word Allah is found in millions of Arabic Bibles and other Arabic Christian materials. The moon-god theory confuses evangelism. When Christians approach Muslims, they do not know whether they need to convince them that they worship the wrong deity, or to present them the simple Gospel message of our Lord Jesus Christ.

As far as the moon symbol on the mosques or on the flags, the simple reason behind it is that Islam depends on the moon for their religious calendar (lunar calendar) specially during the Ramadan (month of fasting). Islam forbids symbols or pictures of God. [87]

অর্থাৎ - এটি একটি অপ্রমাণিত তত্ত্ব এবং খুব সম্ভব মিথ্যা। এটা যদি সত্য হয়েও থাকে, তাহলেও ইসলামী বিশ্বাসে তা খুব তুচ্ছ প্রভাব রাখতে পারে কারণ মুসলিমরা কোনো চন্দ্রদেবতার উপাসনা করে না। এমন কিছু করা ইসলামে ঈশ্বরনিন্দার পর্যায়ে পড়ে। আমরা (খ্রিষ্টানরা) যদি ইসলামকে হেয় করার জন্য এই চন্দ্রদেবতা তত্ত্ব ব্যবহার করি তাহলে এটা বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে খ্রিষ্টান আরবিভাষী চার্চগুলো এবং মিশনারীগুলোকেই হেয় করা হবে। এই ব্যাপারটি মোটেও খাটো করে দেখার মতো কিছু না কারণ ‘আল্লাহ’ শব্দটি লক্ষ লক্ষ আরবি বাইবেল ও অন্যান্য খ্রিষ্টীয় বইপুস্তকে পাওয়া যায়। এই চন্দ্রদেবতা তত্ত্ব খ্রিষ্ট ধর্মের প্রচারকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় করে দিচ্ছে।...মসজিদ এবং পতাকায় চাঁদের প্রতীকের কারণ হচ্ছে, মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বর্ষপঞ্জির জন্য বিশেষ করে রমযান মাসে চাঁদের উপর নির্ভর করে। ইসলামে ঈশ্বরের কোনো প্রকারের প্রতীক বা ছবি বানানো নিষিদ্ধ।

 

নবী মুহাম্মাদ () এর বাবার নাম ‘আব্দুল্লাহ’ প্রসঙ্গ

অনলাইনে আরো একটি জিনিস প্রায়ই দেখা যায়, নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বাবার নাম ‘আব্দুল্লাহ’ ছিল, এই ব্যাপারটিকে সামনে এনে নাস্তিক-মুক্তমনারা মুসলিমদের দিকে তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। তারা বলেঃ মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বাবার নাম ছিল আব্দুল্লাহ, যার মানে হচ্ছেঃ আল্লাহর দাস। নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বাবা ছিলেন মুশরিক, [88] আল্লাহকে সে যুগের মুশরিকরাও উপাসনা করতো। এখন মুসলিমরা আল্লাহর উপাসনা করে। মুশরিকদের এই নাম হতো, এখন মুসলিমদেরও এই নাম হয়। মুসলিমরা কি তাহলে সেই পৌত্তলিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার নয়?

 

এ ব্যাপারে যা বলবঃ আমরা ইতিমধ্যেই অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করেছি যে, আল্লাহ মোটেও আরবের মুশরিকদের পুজিত কোনো পার্থিব দেবমূর্তি ছিলেন না। বরং আরবের মুশরিকরা আল্লাহ তা’আলাকে সারা জাহানের স্রষ্টা, সকল কিছুর মালিক এবং ইব্রাহিম(আ.) এর ইলাহ মনে করতো। তাদের বিশ্বাসের এই জায়গাটি সঠিক ছিল। ইসলাম তাদের বিশ্বাসের সঠিক জিনিসটির বিরোধিতা করে নি, নব উদ্ভাবন মূর্তিপুজা ও পৌত্তলিক আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছে ও সেগুলো অপসারণ করেছে। ইসলাম কখনো সঠিক জিনিসের বিরোধিতা করে না। ‘আব্দুল্লাহ’ (আল্লাহর দাস) নামের মাঝে কোনো সমস্যা নেই। এটি যথার্থ ও সুন্দর একটি নাম। যথার্থই সকল মানুষ মহান আল্লাহর দাস। বরং হাদিসে এই নামকে আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় নামের একটি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [89]

 

আর ‘আব্দুল্লাহ’ যে শুধু আরবের পৌত্তলিকদেরই নাম হতো – ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা ইতিমধ্যেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি যে, আল্লাহ শুধু আরবের পৌত্তলিকদের নয় বরং আরবের ইহুদি, খ্রিষ্টান এইসব Abrahamic ধর্মের মানুষদেরও উপাস্য প্রভু হিসাবেও বিবেচিত হতেন। কাজেই স্বাভাবিকভাবে আরবের ঐসব ধর্মের লোকদের নামও ‘আব্দুল্লাহ’ হতো। সিরাত ইবন হিশামে নবী(ﷺ) এর যুগে আরবের ইহুদি পণ্ডিতদের নামের যে তালিকা আছে, এর মধ্যে ২ জনের নাম ‘আব্দুল্লাহ’। তারা হচ্ছেনঃ সে যুগে হিজাজের ভূমিতে তাওরাতের সব চেয়ে বড় পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবন সুরিয়া আল আওয়ার এবং অন্যজন হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবন সায়ফ (কারো কারো মতে আব্দুল্লাহ ইবন যায়ফ)। [90] কাজেই ‘আব্দুল্লাহ’ শুধু আরব পৌত্তলিকদের নাম হতো - এটা একটা অসার কথা। মহান স্রষ্টার দাস – এভাবে নাম রাখা একটি সুপ্রাচীন Abrahamic ঐতিহ্য। হিব্রু ভাষাতে ‘আব্দুল্লাহ’ এর সমজাতীয় নাম হচ্ছেঃ ‘আব্দিয়েল’। হিব্রুভাষী ইহুদিদের এমন নাম হয়। বাইবেলেও এমন নামের উল্লেখ আছে। [91] বাইবেলে উল্লেখ আছে বলে অনেক খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীরও এমন নাম দেখা যায়। [92] সেই ‘আব্দিয়েল’ নামেরই আরবি সমজাতীয় নাম ‘আব্দুল্লাহ’। আব্দুল্লাহ হচ্ছে Abrahamic নাম। ইসলাম হচ্ছে Abrahamic ধারার চূড়ান্ত ও বিশুদ্ধতম ধর্ম বিশ্বাস। “আব্দুল্লাহ একটি পৌত্তলিক নাম” - এই কথা বললে ইহুদিদের ঈশ্বর তথা বাইবেলের ঈশ্বর ‘পৌত্তলিক’ হয়ে যাচ্ছেন, কেননা আরবের ইহুদি পণ্ডিতদের এমন নাম হতো। ইহুদি আর খ্রিষ্টান উভয়েই বাইবেলের পুরাতন নিয়ম বা Old testament অংশে বিশ্বাসী। কাজেই ‘আব্দুল্লাহ’ নাম নিয়ে অভিযোগ তোলার আগে খ্রিষ্টান মিশনারীদের উচিত এই দিকটিও বিবেচনা রাখা!

 

কুরআন-হাদিস এবং চন্দ্রদেবতা

আপনি যদি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস পোষণ করার অভিযোগ আনতে চান, তাহলে এর স্বপক্ষে সেই ব্যক্তি বা দলের থেকে বক্তব্য নিয়ে আসতে হবে। যদি এর স্বপক্ষে বক্তব্য না পাওয়া যায়, তাহলে বোঝা যাবে যে অভিযোগ মিথ্যা। আর যদি এর বিপরীত বক্তব্য পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে অভিযোগ মিথ্যা সেই সাথে এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা যেখানে মূল সত্যের বিপরীত জিনিস এনে অভিযোগ করা হয়েছে।  মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে এত “চন্দ্রদেবতা উপাসনা”র অভিযোগ আনা হয়, আল কুরআন বা হাদিসে কি এর স্বপক্ষে কোনো বক্তব্য আছে? আল কুরআন ও হাদিসে কি চাঁদকে আলাদা কোনো ঐশ্বরিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে?

 

 أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى وَأَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

অর্থঃ তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহ রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান? তিনি চাঁদ-সূর্যকে করেছেন নিয়মাধীন, প্রত্যেকটি বিচরণ করে নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত; তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। [93]

 

আলোচ্য আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি বলা হচ্ছে – আল্লাহই চাঁদ-সূর্যকে নিয়মাধীন করেছেন, যারা একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত বিচরণ করে। চাঁদকে দেবতা বলা তো অনেক দূরের কথা, কুরআনে বার্তা দেয়া হয়েছে যে, চাঁদ-সূর্য এগুলোর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, আল্লাহই এদের নিয়ন্ত্রক। এখানে চাঁদকে নয় বরং আল্লাহকেই ক্ষমতাবান বলা হয়েছে। আল কুরআনে আরো বলা হয়েছে,

 

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ ۖ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ ۗ 

অর্থঃ তোমার নিকট তারা জিজ্ঞেস করে নতুন চাঁদের বিষয়ে। বলে দাও যে এটি মানুষের জন্য সময় (মাসসমূহ) নির্ধারণ এবং হজের সময় ঠিক করার মাধ্যম।[94]

 

আলোচ্য আয়াতে নতুন চাঁদের ভুমিকার কথা বলা হয়েছে। এর ভুমিকা হচ্ছে মানুষের সময় গণনায় সহায়ক হওয়া। সময় গণনার সহায়ক একতি জিনিস আর উপাস্য দেবতা কি এক হল?

 

আল কুরআনের একটি আয়াত আছে যা চন্দ্রদেবতা তত্ত্বকে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট বলে প্রমাণ করে। আয়াতটি হলঃ

 

  وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ۚ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ

অর্থঃ তাঁর [আল্লাহ] নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা সূর্যকে সিজদাহ করো না, চাঁদকেও নয় সিজদাহ করো আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন - যদি তোমরা প্রকৃতই তাঁর ইবাদাত করো [95]

 

এখানে সরাসরি বলে দেয়া হল সূর্য বা চাঁদ কারো উপাসনা না করতে, শুধুমাত্র এদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ইবাদত করতে।

 

শুধু চন্দ্রের উপাসনাই না, ইসলামে প্রাচীন আরবের সকল প্রকার মূর্তিপুজা এবং পৌত্তলিকতাকে একদম বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

( 1 )   قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ

( 2 )   لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ

অর্থঃ বলোঃ হে কাফিরেরা, আমি আমি তার ইবাদাত করি না যার ইবাদাত তোমরা করো [96]

 

আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব (রা.)ঐ দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেন যাতে (রোমের বাদশাহ) হিরাক্লিয়াসের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করলেন (তখন তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি) তিনি, অর্থাৎ নবী() তোমাদেরকে কোন্ কাজের আদেশ করছেন?

আবু সুফিয়ান বলেন, “আমি বললামঃ তিনি [মুহাম্মাদ()] বলছেন যে, তোমরা মাত্র এক আল্লাহর উপাসনা করো, তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার করো না এবং ঐসব কথা পরিহার করো, যা তোমাদের বাপ-দাদারা বলতোআর তিনি আমাদেরকে সলাত (নামায) পড়া, সত্য কথা বলা, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার আদেশ দেন। [97]

 

যারা সূর্য বা চন্দ্রের উপাসনা করে, অথবা অন্য মিথ্যা উপাস্যদের পুজা করে, কিয়ামতের দিন তারা নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর উম্মতদের মধ্যে শামিল থাকবে না। বরং তারা আলাদাভাবে থাকবে এবং জাহান্নামে যাবে। মুক্তি পাবে শুধুমাত্র “লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ” [আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই] কালিমার ঘোষণা দেয়া মুহাম্মাদ(ﷺ) এর উম্মতরা।

 

“…তখন যারা সূর্যের উপাসনা করতো, তারা সূর্যের সাথে থাকবে। যারা চন্দ্রের উপাসনা করতো, তারা চন্দ্রের সাথে থাকবে।  আর যারা তাগুতের (মিথ্যা উপাস্য) উপাসনা করতো, তারা তাগুতদের সাথে জমায়েত হয়ে যাবে। কেবল এ উম্মত অবশিষ্ট থাকবে। 

…এরপর আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা হতে অবসর হলে স্বীয় রহমতে কিছু সংখ্যক জাহান্নামীদের (জাহান্নাম হতে) বের করতে দেয়ার ইচ্ছা করবেন তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন যারা কালিমায় বিশ্বাসী ও শিরক করেনি যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা রহম করতে চাইবেন যে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসো। আর যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা দয়া করতে চেয়েছেন তারা ঐ সকল লোক যারা “লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ” [আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই] বলতো  [98]

 

প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন,  ইসলামে সরাসরি বলা হচ্ছে চন্দ্রকে সিজদাহ না করতে। সেই সাথে সকল প্রকার পৌত্তলিকতাকে নাকচ করে দেয়া হল। যারা চাঁদ, সূর্য ইত্যাদির উপাসনা করে, তাদের জাহান্নামী হবার কথা বলা হল, শুধুমাত্র এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসকদের মুক্তির কথা ঘোষিত হল। অথচ ইসলামবিরোধীরা অভিযোগ করেঃ মুসলিমরা এক প্রাচীন চন্দ্রদেবতার উপাসনার করে। মূল সত্যের সম্পূর্ণ উল্টো জিনিস দাবি করে অভিযোগ। তাদের এইসব অভিযোগ যে কতো বড় ষড়যন্ত্র আর ধাপ্পাবাজি তা কি এবার বোঝা যাচ্ছে?

 

বাইবেলে ‘চন্দ্র উৎসব’ এবং ঈশ্বরের বন্দনা

আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি যে, ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক ‘চন্দ্রদেবতা তত্ত্ব’ প্রচার করায় কীভাবে ভুমিকা রেখেছে খ্রিষ্টান মিশনারীরা। আমরা এটাও দেখেছি যে, আল কুরআন কিংবা হাদিসে চাঁদকে মোটেও আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সম্মান করা হয়নি, উপাস্য বানানো তো অনেক দূরের কথা। শুধুমাত্র চাঁদের ভুমিকা আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে চাঁদ সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? চাঞ্চল্যকর ব্যাপার হচ্ছে, খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল ঘাটলে দেখা যায় সেখানে নতুন চাঁদ দেখে উৎসব করতে বলা হয়েছে! শুধু তাই না, ঈশ্বরের বন্দনা করতে চাঁদের জন্য শিঙ্গা (এক ধরনের বাঁশি) বাজাতে বলা হয়েছে! বাইবেলে চাঁদ এমনই একটি বিশেষ জিনিস --

 

Sing for joy to God our strength; shout aloud to the God of Jacob! Begin the music, strike the timbrel, play the melodious harp and lyre. Sound the ram’s horn at the New Moon, and when the moon is full, on the day of our festival; this is a decree for Israel, an ordinance of the God of Jacob. [New International Version (NIV)]

“সুখী হও এবং আমাদের শক্তিদাতা ঈশ্বরের কাছে গান গাও। যাকোবের (ইস্রায়েল) ঈশ্বরের কাছে আনন্দ ধ্বনি দাও। সঙ্গীত শুরু কর, খঞ্জনীগুলি বাজাও, সুশ্রাব্য বীণা এবং অন্যান্য তন্ত্রবাদ্য বাজাও। নতুন চাঁদের জন্য  মেষের শিঙ্গা বাজাও। পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের সময় যখন আমাদের ছুটির উত্সব হয় তখন মেষের শিঙ্গা বাজাও। ইস্রায়েলের লোকের জন্য এটাই বিধি যাকোবের ঈশ্বরের সেই আজ্ঞা [99]

 

প্রিয় পাঠক, কুরআন-হাদিসে কোথায় নতুন চাঁদ কিংবা পূর্ণিমার চাঁদ দেখে শিঙ্গা বাজাতে বলা হয়নি। বরং তা বলা হয়েছে বাইবেলে। অথচ চন্দ্রদেবতা তত্ত্বের অভিযোগ খ্রিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে তোলা হয় না, ইসলামের বিরুদ্ধে তোলা হয়! বাইবেল থেকে আরো কিছু উদ্ধৃতি দেখুন -

 

 Also at your times of rejoicing—your appointed festivals and New Moon feasts—you are to sound the trumpets over your burnt offerings and fellowship offerings, and they will be a memorial for you before your God. I am the Lord your God.” [NIV]

এছাড়াও তোমার বিশেষ সভার সময়, নতুন চাঁদের দিনগুলোতে এবং তোমাদের সকলের সুখের সমাবেশে এই শিঙ্গা দু’টিকে বাজাবে| তুমি যখন তোমার হোমবলি এবং মঙ্গল নৈবেদ্য প্রদান করবে সেই সময়ও শিঙ্গা দু’টিকে বাজাবে প্রভু, তোমার ঈশ্বর তোমাকে যেন মনে রাখেন, সে জন্যই এই বিশেষ পদ্ধতি এটি করার জন্য আমি তোমাকে আদেশ করছি; আমিই প্রভু তোমার ঈশ্বর|” [100]

 

 “After that, they presented the regular burnt offerings, the New Moon sacrifices and the sacrifices for all the appointed sacred festivals of the Lord, as well as those brought as freewill offerings to the Lord. [NIV]

তারপর তারা প্রতিদিন নিত্য হোমবলি উত্সর্গ করা শুরু করল, এবং নতুন চাঁদের (বা অমাবস্যার) উৎসবের জন্য, অন্যান্য সমস্ত ছুটির দিনের জন্য এবং ঈশ্বরের আদেশকৃত উত্সবের দিনগুলোর জন্য উত্সর্গ করতে লাগল লোকরা প্রভুকে বিশেষ উপহারগুলোর মধ্যে য়ে কোন উপহার দিতে শুরু করল যা তারা প্রভুকে দিতে চাইত [101] 

 

এখানে দেখা যাচ্ছে, বাইবেলে চাঁদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু আচার-অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। বাইবেলে নতুন চাঁদ বা অমাবস্যা এবং পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্র দেখলে সে সময়ে শিঙ্গা বাজাতে বলা হচ্ছে। এভাবে ঈশ্বরকে বন্দনা করতে বলা হচ্ছে এবং একটি বিশেষ উৎসব পালন করতে বলা হচ্ছে। শুধু তাই না, সে সময়ে বিশেষ হোমবলি এবং মঙ্গল নৈবেদ্য প্রদানের কথাও বলা হচ্ছে! প্রিয় পাঠক লক্ষ করুন, যারা মুসলিমদেরকে ‘চন্দ্র দেবতার উপাসক’ বলতে চায়, তাদের নিজ ধর্মগ্রন্থের কীরূপ অবস্থা। চাঁদকেন্দ্রিক এই কথাগুলো আছে বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অংশে যাকে ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায় ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করে। বাইবেলের নতুন নিয়ম (New Testament) অংশে যিশু খ্রিষ্ট বনী ইস্রাঈলের সকল আইন ও বিধানকে সমর্থন করেছেন এবং তিনি এগুলো পূর্ণ করতে এসেছেন বলে দাবি করেছেন। এগুলো মেনে চলতে বলেছেন। [102]  শুধু তাই না, বাইবেলের নতুন নিয়মেও (New Testament) দেখা যায় যে, প্রাচীন খ্রিষ্টানদের সময়েও এই নতুন চাঁদের পর্ব উদযাপন ছিল।

 

“Therefore do not let anyone judge you by what you eat or drink, or with regard to a religious festival, a New Moon celebration or a Sabbath day.”

তোমরা কী খাও, পান করো, বা কোন পর্ব পালন করো, নতুন চাঁদের পর্ব উদযাপন করো, বিশ্রামবারের বিশেষ দিনগুলো পালন করো - এ নিয়ে কেউ যেন তোমাদের বিচার না করে৷[103] 

 

এখানে আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে পৌত্তলিকরা নতুন চাঁদের বা অমাবস্যার সময়ে তাদের দেবতা মারদুকের বন্দনা করে ‘আকিটু’ (Akitu) উৎসব পালন করতো। [104] এখন কেউ যদি চাঁদ সম্পর্কিত এই সাদৃশ্য দেখিয়ে দাবি করা শুরু করে যে, খ্রিষ্টানদের ঈশ্বরের ধারণা এসেছে মেসোপটেমিয়ার পৌত্তলিকদের থেকে – তাহলে ব্যাপারটি কেমন দাঁড়াবে? যেসব মানুষেরা ইসলামের নামে অপবাদ আরোপ করতে চায়, তারা যেন একই নিক্তি দিয়ে নিজেদের ব্যাপারগুলোকেও পরিমাপ করে। 

 

শেষ কথাঃ

ইসলামের বিরুদ্ধে যারা পৌত্তলিকতার অভিযোগ তোলে, তাদের ইতিহাসজ্ঞান এবং কাণ্ডজ্ঞান উভয়েরই অভাব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ(ﷺ) যদি প্রাচীন আরবের পৌত্তলিকতাকেই বহাল রাখতেন – তাহলে আরব মুশরিকদের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব ছিল কী নিয়ে? ইসলামের ইতিহাস নিয়ে যাদের সামান্যও জ্ঞান আছে তারা জানে যে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নবী করিম(ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীদেরকে মাক্কী যুগে কী ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। শুধু মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যে রাসূল(ﷺ) তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে হারিয়েছেন। হারিয়েছেন প্রাণপ্রিয় আত্মীয়দেরকে। সমাজ তাঁকে বয়কট করেছে। দেশ থেকে মানুষজন তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মরুভূমির তপ্ত রোদে সাহাবীদের বুকে পাথর বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। দেশত্যাগ করে তাদের আবিসিনিয়া ও মদীনায় পাড়ি জমাতে হয়েছে। কীসের জন্যে? কোনো ক্ষমতার জন্যে নয়, সম্পদের জন্যেও নয়। শুধু তাওহিদের প্রশ্নে আপোষহীনতার জন্যে। আল্লাহ তা‘আলাকে একমাত্র রব ও ইলাহ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্যে। পাথরের তৈরী কোনো মূর্তির সামনে মাথা না ঝোঁকানোর জন্যে। সেটা হুবাল, লাত, উযযা- যাই হোক না কেন।

 

আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কাউকে হিসেবে মেনে নিলে আল্লাহর রাসূল ও সাহাবীদের এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, অশ্রু বিসর্জনের কোনো প্রয়োজন ছিলো না। কারণ, আরবের মুশরিকরা আল্লাহকে রব হিসেবে মানত। তাইতো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন-

“বলো - ‘তোমরা যদি জানো তবে বলো, ‘এ যমীন ও এতে যারা আছে, তারা কার?’

সাথে সাথেই তারা বলবে, ‘আল্লাহর।’ বলো, ‘তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’

বল, ‘কে সাত আসমানের রব এবং মহা আরশের রব?’

তারা বলবে, ‘আল্লাহ।’ বল, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’

বলো, ‘তিনি কে, যাঁর হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্ব, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার ওপর কোন আশ্রয়দাতা নেই? যদি তোমরা জানো

তারা বলবে, ‘আল্লাহ।’ বলো - ‘তবুও কীভাবে তোমরা মোহচ্ছন হয়ে আছো?’

বরং আমি তাদের কাছে সত্য পৌঁছেয়েছি, আর নিশ্চয়ই তারা তো মিথ্যাবাদী।” [105]

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]."Arabisch, Semitisch, Orientalisch: Kulturgeschichtlich-Mythologische Untersuchung" - Hugo Winckler, 1901, W. Peiser: Berlin, Page 83

[2]. এ বিষয়ে তার বেশ কিছু রচনা ছিল। যেমনঃ

■  ‘Die Altarabische Mondreligion Und Die Mosaische Ueberlieferung’ (১৯০৪ সালে প্রকাশিত; আর্কাইভ বুক লিঙ্কঃ

https://archive.org/details/diealtarabischem00nieluoft/page/n3)

■ ‘Der Dreieinige Gott In Religionshistorischer Beleuchtung’ (১৯২২ সালে প্রকাশিত; আর্কাইভ বুক লিঙ্কঃ https://archive.org/details/derdreieinigegot01niel/page/n5)

[3]. দেখুন, ‘A History of Pagan Europe’ - Prudence Jones, Nigel Pennick,  Page 77

[4]. 'Allah Had No Son' - Jack T. Chick
https://www.slideshare.net/gabrieldnino/allah-had-no-son

[5]. Hugo Winckler: "Arabisch, Semitisch, Orientalisch: Kulturgeschichtlich-Mythologische Untersuchung", 1901, W. Peiser: Berlin, p. 83.

[6]. ■ “…The blessed name "Allaah" is derived from the Arabic verb alaha/yalahu/malooh [the root of which is the three letters alif, laam, haa]. This verb includes the meaning of love as well as worship. Allaah, may He be glorified and exalted, is the One Who is loved, glorified and feared by the believers, and they put their hope in Him.”

From: “Doubts of one who is interested in Islam – IslamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

https://islamqa.info/en/1930/

■ 'মুখতারুস সিহাহ' - যাইনুদ্দিন ইবন আবি বাকর আর রাজি আল হানাফী, ১/২০

[7]. Edward William Lane, An Arabic-English Lexicon (London: Willams & Norgate, 1863), under the entry “Allah”

[8]. ■ Columbia Encyclopaedia says: Derived from an old Semitic root referring to the Divine and used in the Canaanite El, the Mesopotamian ilu, and the biblical Elohim and Eloah, the word Allah is used by all Arabic-speaking Muslims, Christians, Jews, and other monotheists.

■ “Allah _ Encyclopedia.com”

https://www.encyclopedia.com/philosophy-and-religion/islam/islam/allah

[9]. “Allah _ Encyclopedia.com”

https://www.encyclopedia.com/philosophy-and-religion/islam/islam/allah

[10]. ■ The Comprehensive Aramaic Lexicon – Entry for ʼlh 

■ “Allah – Wikipedia”

https://en.wikipedia.org/wiki/Allah#Etymology

[11]. ‘কিতাবুল আসনাম’ – হিশাম ইবন কালবী(র.) [‘The Book Of Idols’ শিরনামে ইংরেজিতে অনূদিত] পৃষ্ঠা ২১-২২

https://archive.org/details/KitabAlAsnam/page/n19

[12]. এ বিষয়ে একটু পরেই ”আল্লাহ সম্পর্কে মক্কার পৌত্তলিক আরবদের বিশ্বাস: আল্লাহ কি আসলেই ৩৬০ দেবতার একজন ছিলেন?” এই পয়েন্টের ভেতর বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইন শা আল্লাহ

[13]. ■ ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স] পৃষ্ঠা ৫৫

■ শাইখ মুহাঃ আব্দুল নাজদী (রহঃ), ’মুখতাসার সীরাতুর রাসূল (সাঃ)’, ১২ পৃষ্ঠা

■ আরো দেখুন, ‘সীরাতুন নবী(সা)’ – ইবন হিশাম(র.) [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ] ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮

[14]. আর রাহিকুল মাখতুম পৃষ্ঠা ৬০, সহীহ বুখারী ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৪৯৯

[15]. ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ পৃষ্ঠা ৩২০,  ‘ইবন হিশাম’, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৩-৯৪, ‘যাদুল মা'আদ’, ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৯৪ পৃষ্ঠা এবং ‘সহীহ বুখারী’ ২য় খণ্ড, ৫৭৯ পৃষ্ঠা

[16]. ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ – ইবন কাসির(র.) [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ] ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮-৫১৯

[17]. Patricia Crone, ‘Meccan Trade And The Rise Of Islam’, 1987, page 193-194

[18]. ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ by Robert Morey; Page 47-53 and 211-218

[19]. ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ by Robert Morey; Page 47-53 and 212

[20]. ■ “Sin (mythology) - New World Encyclopedia”

http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Sin_(mythology)

■ “Shamash - New World Encyclopedia”

http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Shamash

[21]. এ বিষয়ে একটু পরেই ”আল্লাহ সম্পর্কে মক্কার পৌত্তলিক আরবদের বিশ্বাস: আল্লাহ কি আসলেই ৩৬০ দেবতার একজন ছিলেন?” এই পয়েন্টের ভেতর বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইন শা আল্লাহ

[22]. আল কুরআনে তাদের এই বিকৃত বিশ্বাসের অপনোদন করে বলা হয়েছেঃ আল্লাহর কোনো সন্তান নেই বরং এগুলো তো কিছু কাল্পনিক নামমাত্র। সুরা নাজম ৫৩ : ১৯-২৩ দ্রষ্টব্য

[23]. এখান থেকে বইটি পড়া ও ডাউনলোড করা যাবেঃ https://archive.org/details/KitabAlAsnam

[24]. সীরাতুন নবী(সা) – ইবন হিশাম [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৭-১১২

[25]. ‘The Routledge Dictionary of Gods and Goddesses, Devils and Demons’ by Manfred Lurker; Page 22

[26]. ‘The Routledge Dictionary of Gods and Goddesses, Devils and Demons’ by Manfred Lurker; Page 165

[27]. ‘The Routledge Dictionary of Gods and Goddesses, Devils and Demons’ by Manfred Lurker; Page 173

[28]. ‘The Routledge Dictionary of Gods and Goddesses, Devils and Demons’ by Manfred Lurker; Page 173

[29]. ■ “Arabia Felix From The Time Of The Queen Of Sheba, Eighth Century B.C. To First Century A.D” - J. F. Breton (Trans. Albert LaFarge), page 122

[30]. ‘The Islamic Invasion : Confronting The World's Fastest Growing Religion’ by Robert Morey; Page 214

[31]. "The statue was found decapitated, and the head was discovered lying on a floor at a lower level. It depicts a man, possibly a priest, seated on a cubelike stool. He is beardless with a shaven head; his skirt ends below his knees in an accuentated hem; his feet are bare. He holds a cup in his right hand, while his left, clenched into a fist, rests on his left knee...."

From: 'Treasures of The Holy Land: Ancient Art From The Israel Museum (Metropolitan Museum of Art, NY:1986)' , Page 107

[32]. মক্কা বিজয়ের পর রাসুল(ﷺ) মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন এবং হাতের মাথা বাঁকানো লাঠি দ্বারা হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করেন। অতঃপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। এ সময় কা‘বাগৃহের ভিতরে ও বাইরে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসুলুল্লাহ(ﷺ) হাতের লাঠি দ্বারা এগুলি ভাঙতে থাকেন এবং কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়তে থাকেন। وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا ‘তুমি বলো, হক এসে গেছে, বাতিল দূরীভূত হয়েছে। নিশ্চয়ই বাতিল দূরীভূত হয়েই থাকে’ (বনি ইস্রাঈল ১৭/৮১)। তিনি আরও পড়েন, قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ ‘তুমি বলো হক এসে গেছে এবং বাতিল আর না শুরু হবে, না ফিরে আসবে’ (সাবা ৩৪/৪৯)। অর্থাৎ সত্যের মোকাবিলায় মিথ্যা এমনভাবে পর্যুদস্ত হয় যে, তা কোন বিষয়ের সূচনা বা পুনরাবৃত্তির যোগ্য থাকে না’ (বুখারী হা/৪২৮৭)।

ইবন আব্বাস(রা।)-এর বর্ণনা অনুযায়ী অতঃপর তিনি উসমান বিন ত্বালহাকে ডেকে তাকে ভিতর থেকে সমস্ত মূর্তি-প্রতিকৃতি বের করার নির্দেশ দেন। এসময় তিনি তার মধ্যে ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর দু’টি প্রতিকৃতি দেখেন। যাদের হাতে ভাগ্য নির্ধারণী তীর দেখে তিনি বলে ওঠেন, قَاتَلَهُمُ اللهُ لَقَدْ عَلِمُوا مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطُّ ‘মুশরিকদের আল্লাহ ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! তারা জানে যে, তাঁরা কখনোই এ ধরনের ভাগ্যতীর ব্যবহার করেননি’। তিনি বলেন,مَا كانَ إِبْراهِيمُ يَهُودِيًّا وَلا نَصْرانِيًّا، وَلكِنْ كانَ حَنِيفاً مُسْلِماً، وَما كانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ‘ইব্রাহিম কখনো ইহুদি বা খ্রিষ্টাম ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’ (আলি ইমরান ৩/৬৭)। ইবন আব্বাসের(রা.) অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, সেখানে মারিয়মের ছবিও ছিল (বুখারী হা/৩৩৫১)। এভাবে সমস্ত ছবি-মূর্তি দূর হওয়ার পর তিনি কা‘বাগৃহে প্রবেশ করেন ও ঘরের চারিদিকে তাকবীর দেন (বুখারী হা/৪২৮৮)।

[সীরাতুর রাসূল(ছাঃ) – ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, পৃষ্ঠা ৫৩৫]

[33]. আল কুরআন, কাফিরুন ১০৯ : ১-২

[34]. ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স] পৃষ্ঠা ৩৭

[35]. ■ 'كوكب' শব্দের সঠিক অনুবাদ ‘গ্রহ’।
“…and using the word “kawkab” to refer to solid heavenly bodies that are not burning, such as the planets of the solar system, …”
From: “Meteorites and shooting stars may be called “stars” (nujoom) and “heavenly bodies” (kawaakib) in Arabic”- islamQA (Shaykh Muhammmad Saalih al-Munajjid)
https://islamqa.info/en/243871/

■ “Translation and Meaning of كوكب In English, English Arabic Dictionary” (almaany)

https://www.almaany.com/en/dict/ar-en/كوكب/

[36]. আল কুরআন, আন’আম ৬ : ৭৫-৮৩

[37]. আল কুরআন, মারইয়াম ১৯ : ৪১-৪৪

[38]. আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ৫৩-৫৯

[39]. আল কুরআন, আস সফফাত ৩৭ : ৯৪-৯৬

[40]. আল কুরআন, নিসা ৪ : ১২৫

[41]. আল কুরআন, নাহল ১৬ : ৮৯

[42]. R. Brown, "Who Is "Allah"?", International Journal of Frontier Missions, 2006, Volume 23, No. 2, page 79-80.

এখান থেকেঃ https://bit.ly/2z6dEde অথবা এখান থেকে https://bit.ly/2PmNQDL পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়া যাবে।

[43]. ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স] পৃষ্ঠা ৫৫

[44]. ‘আর রাহিকুল মাখতুম’ – শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স] পৃষ্ঠা ৬২

[45]. আল কুরআন, যুখরুফ ৪৩ : ৮৭

[46]. আল কুরআন, যুমার ৩৯ : ৩৮

[47]. আল কুরআন, নাজম ৫৩ : ১৯-২৩

[48]. আল কুরআন, কাহফ ১৮ : ১-৫

[49]. আল কুরআন, মারইয়াম ১৯ : ৮৮-৯৫

[50]. আল কুরআন, যুমার ৩৯ : ১-৫

[51]. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ১১৮৫ ; মিশকাত, হাদিস নং : ২৫৫৪

[52]. সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৫৯১৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৮৬৮

[53]. “Allah - Oxford Islamic Studies Online”

http://www.oxfordislamicstudies.com/article/opr/t125/e128

[54].  সুরা মুলক ৬৭ : ১৬ তেও আল্লাহর ক্ষেত্রে فِي السَّمَاءِ এই শব্দগুলো রয়েছে। হাফিজ ইবন আব্দুল বার(র.) এর মতে, فِي السَّمَاءِ এর অর্থ “আসমানের উপরে”। অর্থাৎ আরশেরও উপরে [কেননা আরশ আসমানের উপরে; দেখুন ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ – ইবন কাসির(র.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪-৫৫)]। যেমনটি আছে সুরা তাওবা ৯ : ২ তে - “সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে বিচরণ কর চার মাস...” এখানে فِي الْأَرْضِ দ্বারা ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরভাগ বোঝায়নি বরং পৃথিবীর উপরে বিচরণকে বুঝিয়েছে। ‘আত তামহিদ’ ৭/১৩০ দ্রষ্টব্য। কোনো কিছুই আল্লাহ তা’আলাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।

فِي السَّمَاءِ এর আরো একটি অর্থ হতে পারে, আর তা হলঃ ‘উপরে’। কেননা আরবি ভাষায় ‘سماء’ দ্বারা ‘উপর’ও বোঝায়। বিস্তারিত দেখুনঃ “What is meant by saying “Allah is in heaven”  - islamqa (Shaykh Muhammad Saalih al Munajjid)”

https://islamqa.info/en/131956/

[55]. ■ لأنك الله رحلة إلى السماء السابعة (লি আন্নাকাল্লাহ, রিহলাহ ইলাস সামাইস সাবিআহ) - আলি বিন জাবির আল ফাইফী, পৃষ্ঠা ১৬

■ আরো দেখুন, তিরমিযী, ৩৮২০-১২/৪৫২

[56]. আল কুরআন, ইউসুফ ১২ : ১০৬

[57]. আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ১৩০-১৩৩

[58]. আল কুরআন, আলি ইমরান ৩ : ৬৭-৬৮

[59]. আল কুরআন, নাহল ১৬ : ৫১

[60]. আল কুরআন, হাজ্জ ২২ : ১২

[61]. আল কুরআন, হাজ্জ ২২ : ৭১

[62]. আল কুরআন, নাহল ১৬ : ২০-২১

[63]. আল কুরআন, হাজ্জ ২২ : ৭৩

[64]. আল কুরআন, নামল ২৭ : ৬৩

[65]. আল কুরআন, সাবা ৩৪ : ২২

[66]. আল কুরআন, ফাতির ৩৫ : ৪০

[67]. আল কুরআন, হাজ্জ ২২ : ৩১

[68]. আল কুরআন, ফুরকান ২৫ : ৩

[69]. আল কুরআন, আনকাবুত ২৯ : ৪১

[70]. আল কুরআন, আ'রাফ ৭ : ১৯৭

[71]. আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ৯৮

[72]. আল কুরআন, শু'আরা ২৬ : ৯২-৯৫

[73]. আল কুরআন, হাজ্জ ২২ : ৭৮

[74]. হিসনুল মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ ৩/৪০৬, ৪০৭, নং ১৫৩৬০ ও নং ১৫৫৬৩; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল-লাইলাহ, নং ৩৪। আরও দেখুন, সহীহুল জামে’ ৪/২০৯

[75]. এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এই ওয়েবসাইটের “ইহুদিরা কি আসলেই উজাইর (Ezra)কে আল্লাহর পুত্র বলে বিশ্বাস করে?” শীর্ষক লেখায়

[76]. ■ তারাতিব আল ইদারিয়্যাহ – আল কিত্তানী ১/৩২০

■ “Taking the crescent as a symbol – islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

https://islamqa.info/en/1528/

[77]. ‘Some Observations On The Influence Of Byzantine Institutions On Ottoman Institutions’ - Mehmet Fuat Köprülü, Gary Leiser (trans.),  Page 118

[78]. ‘Mehmed the Conqueror and His Time’ - Franz Babinger, Page 108

[79].  “Crescent Symbol - Encyclopædia Britannica”

https://www.britannica.com/topic/crescent-symbol

[80].  “Star and crescent - Wikiwand.html”

http://www.wikiwand.com/en/Star_and_crescent

[81]. “Taking the crescent as a symbol – islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

https://islamqa.info/en/1528/

[82]. “Putting a crescent on top of the minaret of a mosque – islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)”

https://islamqa.info/en/575/

[83]. বাইবেল, যাত্রাপুস্তক (Exodus) ৩ : ৬, মথি (Matthew) ২২ : ৩২ এবং আরো অনেক স্থানে

[84]. আল কুরআন, আনকাবুত ২৯ : ৪৬

[85]. “Allah - Encyclopædia Britannica”

https://www.britannica.com/topic/Allah

[86]. অনলাইন আরবি বাইবেল থেকে সহজেই চেক করে দেখা যেতে পারে।

https://www.wordproject.org/bibles/ar/

[87]. “The word Allah and Islam - Arabic Bible Outreach Ministry”

https://www.arabicbible.com/for-christians/1810-the-word-allah-and-islam.html

[88]. ■ আনাস(রা.) থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ(ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসুলুল্লাহ(ﷺ) বলোলেনঃ জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন পিছনে ফিরে যাচ্ছিলো, তখন তিনি ডাকলেন এবং বললেনঃ আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৯৪]

■ ইমাম আবু হানিফা(র.)-র ফিকহুল আকবার (বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা - খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর(র.) , পৃষ্ঠা ৪৭৭-৪৮৮

[89]. “...আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অধিক প্রিয় নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। ...” [যাদুল মা’আদ, নাসাঈ, আবু দাউদ, মুসনাদ আহমাদ, আদাবুল মুফরাদ হাদিস নং : ৮২১, মিশকাতুল মাসাবিহ হাদিস নং : ৪৭৮২]

[90]. ‘সীরাতুন নবী(সা)’ - ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) পৃষ্ঠা ১৯২

[91]. "অন্য এক পরিবারের নেতা অহির পিতার নাম আব্দিয়েল। তিনি ছিলেন গূনির পুত্র।" [বাইবেল, ১ বংশাবলী (1 Chronicles) ৫ : ১৫]

[92]. “Abdiel - Wikipedia”

https://en.wikipedia.org/wiki/Abdiel

[93]. আল কুরআন, লুকমান ৩১ : ২৯

[94]. আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ১৮৯

[95]. আল কুরআন, হা-মিম সিজদাহ (ফুসসিলাত) ৪১ : ৩৭

[96]. আল কুরআন, কাফিরুন ১০৯ : ১-২

[97]. সহীহ বুখারী ৭, ৫১, ২৬৮১, ২৮০৪, ২৯৩৬, ২৯৪১, ৩১৭৪, ৪৫৯৩,  সহীহ মুসলিম ১৭৭৩, তিরমিযি ২৭১৭, আবু দাউদ ৫১৩৬, মুসনাদ আহমাদ ২৩৬৬

[98]. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৪৮

[99]. বাইবেল, গীতসংহিতা [সামসঙ্গীত/জবুর শরীফ/Psalms] ৮১ : ১-৪

[100]. বাইবেল, গণনাপুস্তক [Numbers] ১0 : ১0

[101]. বাইবেল, ইষ্রা [Ezra] ৩ : ৫

[102]. বাইবেল, মথি (Matthew) ৫ : ১৭-২০ দ্রষ্টব্য

[103]. বাইবেল, কলসীয় (Colossians) ২ : ১৬

[104]. ■ “5 Ancient New Year’s Celebrations - HISTORY”

https://www.history.com/news/5-ancient-new-years-celebrations

■ “The Ancient Akitu Festival and the Humbling of the King” By April Holloway

https://www.ancient-origins.net/news-general-human-origins-religions/babylonian-akitu-festival-and-humbling-king-002128

[105]. আল কুরআন, মু‘মিনুন ২৩ : ৮৪-৯০