কা’বা ঘরের ব্যাপারে ইসলামবিরোধীদের অভিযোগসমূহ ও তাদের খণ্ডন

ইসলামের উৎপত্তি সংক্রান্ত অভিযোগের জবাব



 

কা’বা – প্রাচীন এক গৃহ, একত্ববাদের ধারক ও বাহক মুসলিমদের পবিত্র কিবলা। এখানে ইবাদত করেছেন ইব্রাহিম (আ.), ইসমাঈল (আ.) ও মুহাম্মদ (ﷺ) এর মত সম্মানিত নবীরা। ইসলামের ইতিহাসের একটি বড় অংশ কা’বাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হলে এর কেন্দ্রভূমিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। কাজেই খ্রিষ্টান মিশনারী ও নাস্তিক মুক্তমনাচক্র কা’বাকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের ডালি খুলেছে। তাদের দাবিঃ কা’বা গৃহকে কিবলা হিসাবে গ্রহণ করা বিভিন্ন কারণে পৌত্তলিকতা বা paganism। কারণ হিসাবে তারা বলেঃ

 

❏ মুসলিমরা মানুষের তৈরি একটি স্থাপনার(কা’বা) দিকে মাথা নত করছে

❏ মুসলিমরা কা’বার উপাসনা করে

❏ কা'বায় এক সময় ৩৬০টি মূর্তি ছিল। যেখানে এক সময় মূর্তিপুজা হয়েছে তা কী করে একত্ববাদী ইবাদতের কেন্দ্র হয়?

 

এই অভিযোগগুলো দেখে অনেক সরলপ্রাণ মুসলিম বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তাদের অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক  সেগুলোর আদৌ কোন যৌক্তিকতা আছে কিনা।

 

মানুষের তৈরি একটি স্থাপনার(কাবা) দিকে মাথা নত করাঃ

ইসলামবিরোধীরা বলতে চায় যে, কা’বার দিকে মুখ করে উপাসনা করা একটি পৌত্তলিক রীতি। মুসলিমরা কেন কা’বার দিকে মুখ করে উপাসনা করে?

উত্তর হচ্ছেঃ কা’বা মুসলিমদের কিবলা (উপাসনার দিক)। এটি আল কুরআনের নির্দেশ যে কিবলা অর্থাৎ কা’বার দিকে মুখ করে সলাত আদায় করতে হবে। [1] পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, মুসলিমমাত্রই কা’বার দিকে মুখ করে সলাত পড়ে। এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যেরও একটি নিদর্শন।

পৃথিবীতে একটিও বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী কিংবা মূর্তিপুজারী কোন জাতি আছে যারা এরূপ কোন কিবলার দিকে মুখ করে উপাসনা করে?

উত্তর হচ্ছেঃ না।

ইসলাম ছাড়া আর একটিমাত্র ধর্মের লোকদের এইরূপ কিবলার ধারণা আছে। আর সেটি হচ্ছে ইহুদি ধর্ম। [2]

 

বাইবেলের পুরাতন নিয়ম(Old testament) অংশটি ইহুদি-খ্রিষ্টান উভয় ধর্মালম্বীদের ধর্মগ্রন্থ। বাইবেলের এ অংশে উপাসনা সংক্রান্ত বিধি-বিধানের বিবরণ এসেছে এবং তার মধ্যে একাধিকবার এই কিবলার কথা এসেছে। বাইবেল অনুযায়ী বনী ইস্রাঈলের নবীগণও কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করতেন। বনী ইস্রাঈলের জন্য কিবলা ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস(Temple Mount) যেটি মুহাম্মাদ(ﷺ) এর শরিয়তেও প্রথম কিবলা ছিল। নবী দাউদ(আ.) এর ইবাদতের বিবরণ দিয়ে বাইবেলে বলা হয়েছেঃ

 

ঈশ্বর, আপনার পবিত্র মন্দিরের দিকে আমি মাথা নত করি আমি আপনার নাম, প্রেম এবং নিষ্ঠার প্রশংসা করি কারণ আপনার নাম এবং আপনার বাণীকে আপনি সমস্ত কিছুর উপরে সুউচ্চ করেছেন

I bow down toward your holy temple and give thanks to your name for your steadfast love and your faithfulness, for you have exalted above all things your name and your word. (ESV)” [3]

 

বাইবেলে এটিই নবী রাসুলদের ইবাদতের রীতি এবং এ অনুয়ায়ী ইহুদিদের ধর্মীয় আইন হচ্ছে তাদের কিবলা অর্থাৎ মসজিদুল আকসা{বাইতুল মুকাদ্দাস/Temple Mount} এর দিকে ফিরে ইবাদত করা। হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিরা এভাবেই ইবাদত করে আসছে। [4]

 

বনী ইস্রাঈলের শরিয়তে যে কিবলার ধারণা ছিল তা আল কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত। [5] বাইবেলের নতুন নিয়ম(New Testament) এ যিশু খ্রিষ্ট বলেছেন যে পূর্ববর্তী নবীদের সকল আইন মেনে চলতে হবে এবং এগুলো চিরস্থায়ী আইন। বাইবেল অনুযায়ী তিনি নিজেও পূর্ববর্তী নবীদের শরিয়তের অনুসারী ছিলেন। [6] কাজেই আমরা দেখতে পেলাম যে, কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করা মোটেও পৌত্তলিক জাতির রীতি নয় বরং এটি বনী ইস্রাঈল জাতির একটি ধর্মীয় আইন। এবং এটি কুরআনের শরিয়তেও বহাল রাখা হয়েছে। যে সব খ্রিষ্টান মিশনারী মুসলিমদের কিবলার ধারণাকে পৌত্তলিকতার সাথে মিলিয়ে অপপ্রচার চালান, তারা নিজ ধর্মীয় গ্রন্থের বিধানকে গোপন করে এই মিথ্যাচার করেন। কিবলার দিকে ফিরে উপাসনা করা যদি পৌত্তলিকতা হয়, তাহলে বাইবেলে যে নবীগণের কথা উল্লেখ আছে {যেমন দাউদ(আ.)} তাঁরাও পৌত্তলিক (নাউযুবিল্লাহ)। বরং খ্রিষ্টানরাই  সেইন্ট পলের দর্শন গ্রহণ করে তাওরাতের শরিয়ত ও বনী ইস্রাঈলের ইব্রাহিমী উপাসনার রীতি বাদ দিয়েছে এবং নব উদ্ভাবিত পৌত্তলিক রোমক উপাসনা রীতি গ্রহণ করেছে। [7] যারা নিজেরাই পৌত্তলিক(pagan), তারা আবার অন্যদেরকে পৌত্তলিকতার জন্য অভিযুক্ত করে!

 

মুসলিমরা কাবার উপাসনা করেঃ

এটি পশ্চিমা বিশ্বে একটি খুব কমন ধারণা। খ্রিষ্টান মিশনারীদের লাগামহীন প্রচারণার দ্বারা এই ধারনা ব্যাপক ‘জনপ্রিয়তা’ লাভ করেছে।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে— ইসলামের মূল কথাই হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করা যাবে না। কেউ যদি কা’বার উপাসনা করে, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। কুরআন ও হাদিসে কোথাও কা’বার উপাসনার কথা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে কা’বার প্রভু আল্লাহ তা’আলার উপাসনা করতে।

 

فَلۡيَعۡبُدُواْ رَبَّ هَـٰذَا ٱلۡبَيۡتِ (٣) ٱلَّذِىٓ أَطۡعَمَهُم مِّن جُوعٍ۬ وَءَامَنَهُم مِّنۡ خَوۡفِۭ (٤)

অতএব তারা যেন ইবাদত করে এই ঘরের(কাবা) প্রভুর যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন [8]

 

প্রকৃতপক্ষে যারা এরূপ অভিযোগ করে তারা আসলে জানেই না যে পৌত্তলিকতা কী। সব থেকে অজ্ঞ মুসলিমটিও কখনোই কা’বাকে আল্লাহর মূর্তি বলে মনে করে না। বরং মুসলিমদের কাছে এটি আল্লাহর ইবাদতের ঘর। ঠিক যেমন ইহুদিদের কাছে বাইতুল মাকদিস বা বাইতুল মুকাদ্দাস {হিব্রুতে Bethel বা Beit HaMikdash, ইংরেজিতে Temple Mount} হচ্ছে ঈশ্বরের ইবাদতের গৃহ। [9] অথচ ইহুদিদেরকে তারা বলে একত্ববাদী আর মুসলিমদেরকে বলে পৌত্তলিক!

 

সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে মুসলিমরা সলাত(নামাজ) আদায় করে থাকে। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিমদের থেকেই কা’বা অনেক দূরে অবস্থিত। এমন কোন মূর্তিপুজারী কি আছে, যে তার দেবতার মূর্তিকে হাজার হাজার মাইল দূরে রেখে উপাসনা করে? কখনো যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে কিবলার দিক বোঝা যাচ্ছে না, তখন যে কোন দিকে ফিরে সলাত আদায় করা যায়। এমনকি কা’বাকে যদি কখনো ধ্বংসও করে ফেলা হয়, তাহলে মুসলিমরা কা’বা যে স্থানটিতে আছে, সেই স্থানের দিকে মুখ করে সলাত আদায় করবে। [10] এ থেকে প্রমাণ হয় যে মুসলিমরা মোটেও কা’বার ইমারতের উপাসনা করে না বরং কা’বা মুসলিমদের জন্য শুধুমাত্র ইবাদতের দিক বা কিবলা। যে কোন পৌত্তলিকের কাছে তার দেবতা সব থেকে পবিত্র ও মহান। অথচ ইসলাম ধর্মে একজন মু’মিন মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত কা’বার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। [11]   

 

কোন পৌত্তলিক কখনোই তার দেবতার মূর্তির উপর দাঁড়ায় না। কোন হিন্দু ধর্মালম্বী কি কখনো তার দেব মূর্তির উপর উঠে দাঁড়াতে পারবে? কিংবা কোন ক্যাথোলিক খ্রিষ্টান কি কখনো যিশু বা মরিয়মের মূর্তির উপর উঠে দাঁড়াতে পারবে? কখনোই না। মুসলিমদের কাছে কা’বা হচ্ছে কিবলা এবং ইবাদতের ঘর। এর উপর উঠে দাঁড়িয়ে মুসলিমরা আযান দিতে পারে। প্রতি বছর হজের মৌসুমে কা’বার ছাদে উঠে এর গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। [12]

কা’বার ছাদে দাঁড়িয়ে গিলাফ পরিবর্তনের ছবি দেখুনঃ

 

এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে কা’বা মুসলিমদের নিকট মোটেও মূর্তি বা প্রতিমা জাতীয় কিছু না এবং মুসলিমরা কখনোই কা’বার উপাসনা করে না।

 

কা'বায় এক সময় ৩৬০টি মূর্তি ছিল যেখানে এক সময় মূর্তিপুজা হয়েছে তা কী করে একত্ববাদী ইবাদতের কেন্দ্র হয়ঃ

মুহাম্মাদ(ﷺ) এর আগমনের পূর্বে কা’বায় মূর্তিপুজা হত এই ইতিহাসকে ব্যবহার করে দ্বীন ইসলামের একত্ববাদী চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে খ্রিষ্টান লেখক ও নাস্তিক-মুক্তমনারা। কা’বায় এক সময় মূর্তিপুজা হত এমনকি সেখানে এক সময় ৩৬০টি মূর্তিও স্থাপন করা হয়েছিল – সত্য। কিন্তু এটাই কা’বার প্রাচীনতম ইতিহাস নয়। কা’বা মোটেও মূর্তিপুজার জন্য স্থাপন করা হয়নি বরং এর স্থাপনের উদ্যেশ্য ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। কা’বা নির্মাণ করেন তাওহিদের(একত্ববাদ) দাওয়াহর মহানায়ক আল্লাহর নবী ইব্রাহিম(আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাঈল(আ.)। আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ

 

وَإِذۡ يَرۡفَعُ إِبۡرَٲهِـۧمُ ٱلۡقَوَاعِدَ مِنَ ٱلۡبَيۡتِ وَإِسۡمَـٰعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ (١٢٧) رَبَّنَا وَٱجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَيۡنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً۬ مُّسۡلِمَةً۬ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبۡ عَلَيۡنَآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (١٢٨) رَبَّنَا وَٱبۡعَثۡ فِيهِمۡ رَسُولاً۬ مِّنۡہُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَيُزَكِّيہِمۡ‌ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (١٢٩) 

অর্থঃ স্মরণ কর, যখন ইব্রাহিম ইসমাঈল কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল তারা দোয়া করেছিলঃ আমাদের প্রভু! আমাদের থেকে কবুল করুন নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ

হে আমাদের প্রভু, আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি করুন, আমাদের হজের রীতিনীতি বলে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, দয়ালু

হে আমাদের প্রভু, তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন রাসুল প্রেরণ করুণ যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান [13]

 

এমনকি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থেও কা’বার কথা উল্লেখ আছে এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকেই প্রমাণ করা যায় যে ইব্রাহিম(আ.) মক্কায় এসেছিলেন। [14] কালক্রমে ইব্রাহিম(আ.) ও ইসমাঈল(আ.) এর বংশধর মক্কার আরবরা একত্ববাদী ধর্ম ছেড়ে বিভিন্ন কাল্পনিক দেবতার মূর্তি সহকারে পুজা শুরু করে এবং কা’বাগৃহেও মূর্তি স্থাপন করে। ইব্রাহিম(আ.) এর দোয়ার ফসল নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) আগমন করে তাদেরকে পুনরায় একত্ববাদী ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং কা’বা ঘরকে মূর্তিমুক্ত করে এক আল্লাহর উপাসনার গৃহে পরিনত করেন ঠিক যেমনটি ইব্রাহিম(আ.) এর সময়ে ছিল। এটিই হচ্ছে কা’বাগৃহের ইতিহাস। [15] অর্থাৎ মূর্তিপুজা ছিল ইব্রাহিম(আ.) এর পরবর্তী লোকদের নব উদ্ভাবন ও পথভ্রষ্টতা। কা’বা নির্মাণের সাথে এর কোন সম্পর্কে নেই এবং এই ইতিহাস মোটেও কা’বাকে মূর্তিপুজার মন্দির প্রমাণ করে না।

 

এরপরেও যদি খ্রিষ্টান মিশনারীরা অপতর্ক করতে চায়, তাহলে আমরা বলব—বাইতুল মুকাদ্দাস তো তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ঈশ্বরের মহামন্দির(Temple Mount) যেখানে যিশু খ্রিষ্টসহ অন্য নবী-রাসুলগণ এক কালে  উপাসনা করতেন ও  শিক্ষা দান করতেন। [16] বাইবেল অনুযায়ী এই মহা মন্দিরের গোড়াপত্তনকারী হচ্ছেন ইব্রাহিম(আ.) এর নাতি ইয়া’কুব(আ.), [17] এবং এখানেও এক সময় পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা মূর্তিপুজা করেছে—ঠিক যেমনটি কা’বায় হয়েছে! এই তথ্য শুনে হয়তো অনেকেই চমকে উঠতে পারে, কিন্তু ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে এমনটিই বলা আছে। ----

 

তাঁর পিতা হিষ্কিয় যে সমস্ত উচ্চস্থান ভেঙে দিয়েছিলেন, মনঃশি আবার নতুন করে সেই সব বেদী নির্মাণ করেছিলেন বায়াল মূর্ত্তির পূজার জন্য বেদী বানানো ছাড়াও, ইস্রায়েলের রাজা আহাবের মতই মনঃশি আশেরার খুঁটি পুঁতেছিলেন তিনি আকাশের তারাদেরও পূজা করতেন মূর্ত্তিসমূহের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে তিনি প্রভুর প্রিয় পবিত্র মন্দিরের মধ্যেও বেদী বানিয়েছিলেন (এই সেই জায়গা যেখানে প্রভু বলেছিলেন, “আমি জেরুশালেমে আমার নাম স্থাপন করব”) মন্দিরের দুটো উঠোনে তিনি আকাশের নক্ষত্ররাজির জন্য বেদী বানান তাঁর নিজের পুত্রকে তিনি যজ্ঞবেদীর আগুনে আহুতি দেন ভবিষ্যত জানার জন্য তিনি প্রেতাত্মা পিশাচদের কাছে যাতায়াত করতেন প্রভুকে অসন্তুষ্ট করার মত আরো অনেক কাজই মনঃশি করেছিলেন ফলতঃ প্রভু খুবই রুদ্ধ হয়েছিলেন মনঃশি পাথর কুঁদে আশেরার একটা মুর্তি বানিয়ে সেটাকে মন্দিরে[Temple Mount / বাইতুল মুকাদ্দাস] বসিয়েছিলেন প্রভু দাউদ তাঁর পুত্র শলোমন[সুলাইমান(আ.)]কে বলেছিলেন, “সমস্ত শহরের মধ্যে থেকে আমি জেরুশালেমকে বেছে নিয়েছি এখানকার এই মন্দিরে আমার নাম চিরদিনের জন্য থাকবে ইস্রায়েলীয়দের পূর্বপুরুষদের আমি যে ভূখণ্ড দিয়েছিলাম, ইস্রায়েলীয়রা যদি আমায় মান্য করে চলে, আমার দাস মোশি[মুসা(আ.)/Moses] দেওয়া বিধি আদেশগুলো অনুসরণ করে, তাহলে সেই ভূখণ্ড থেকে আমি কখনও তাদের উত্খাত করব না কিন্তু লোকরা ঈশ্বরের কথা গ্রাহ্য করল না মনঃশি লোকদের বিপথে চালনা করলেন, যাতে তারা আরো বেশী পাপ কাজ করল সেই সব জাতিসমূহের চেয়েও, যাদের প্রভু ধ্বংস করেছিলেন এবং ইস্রায়েলীয়দের দিয়ে দিয়েছিলেন প্রভু তাঁর দাস ভাববাদী(নবী/prophet)দের মাধ্যমে বলে পাঠিয়েছিলেনঃ
যিহুদার [ফিলিস্তিনে বনী ইস্রাঈলের দক্ষিণ রাজ্য] রাজা মনঃশি, ইমোরীদের থেকেও বহুগুণে ঘৃণ্য অপরাধ করেছে এবং মূর্ত্তিপূজা করে যিহুদাকেও পাপের পথে ঠেলে দিয়েছে [18]

 

খ্রিষ্টান মিশনারীরা কা’বার বিরুদ্ধে যে (অপ)যুক্তি প্রদান করেন, সেই এক যুক্তি কিন্তু Temple mount এর ক্ষেত্রেও খাটে। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা অন্ধের ভান করে কা’বার বিরুদ্ধেই অভিযোগ করেন। নাস্তিক-মুক্তমনাদেরকেও কখনো বাইবেলের নবী-রাসুলদের Temple mountকে pagan temple বলতে দেখা যায় না; কারণ তাহলে যে জার্মানীর ভিসা নাও জুটতে পারে! এই হচ্ছে তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। প্রকৃতপক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাস(Temple Mount) কিংবা কা’বা গৃহের মসজিদ(মসজিদুল হারাম) এর কোনটিই pagan temple(পৌত্তলিকদের মন্দির) নয় বরং উভয়টিই এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনাগৃহ। উভয় গৃহই আল্লাহর নবীগণ নির্মাণ করেছেন, উভয় গৃহেই এক সময় পথভ্রষ্ট লোকেরা মূর্তিপুজা করেছে। এবং বর্তমানে এ উভয় গৃহই মূর্তিপুজামুক্ত হয়েছে, মসজিদুল হারাম ও বাইতুল মুকাদ্দাস উভয় স্থানেই এখন একত্ববাদী মুসলিমগণ এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করে।

 

নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) কা’বা থেকে মিথ্যা দেবতাদের মূর্তি অপসারণ করতে করতে যা বলছিলেন, ইসলামবিরোধীদের উদ্যেশ্যে আমরাও ঠিক তাই বলি---

 

جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَـٰطِلُ‌ۚ إِنَّ ٱلۡبَـٰطِلَ كَانَ زَهُوقً۬ا

অর্থঃ ...সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল [19]

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] আল কুরআন, বাকারাহ ২:১৪২-১৪৬ দ্রষ্টব্য

[2] সামেরি/শমরীয় (Samaritans)দেরকে ইহুদি ধর্মের অংশ বিবেচনা করে

[3] বাইবেল, গীতসংহিতা/সামসঙ্গীত/জবুর শরীফ/ Psalms ১৩৮:২

[4]  ■ “Why Do We Face East When Praying Or Do We - How to calculate mizrach - Questions & Answers” [chabad.org]
http://www.chabad.org/library/article_cdo/aid/3502321/jewish/Why-Do-We-Face-East-When-Praying-Or-Do-We.htm  
■ “Mizrah” - Wikipedia, the free encyclopedia 
https://en.wikipedia.org/wiki/Mizrah
■ "Jews praying at the Wailing Wall HD" (YouTube)

https://www.youtube.com/watch?v=jQTYU3O6H3o

[5] আল কুরআন, ইউনুস ১০:৮৭ নং আয়াত দ্রষ্টব্য

[6] বাইবেল, মথি(Matthew) ৫:১৭-২০, লুক(Luke) ১৬:১৬-১৭ দ্রষ্টব্য

[7]  ‘Pagan Christianity?: Exploring the Roots of Our Church Practices’ by Frank Viola &‎ George Barna

পুরো বইটিই এ বিষয়ক তথ্য-প্রমাণে ভরপুর

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://www.theology.kiev.ua/images/afiles/0000412.pdf

[8] আল কুরআন, কুরাঈশ ১০৬:৩-৪

[9] ■ খ্রিষ্টান বাইবেল/ইহুদি তানাখ, আদিপুস্তক(Genesis/Bereishit) ২৫:১০-২২

■ “The Holy Temple” (chabad)

http://www.chabad.org/library/article_cdo/aid/144586/jewish/The-Holy-Temple.htm

[10]  Question regarding Muslims worshiping Ka’bah and Hajr Aswad (islamQA Hanafi)
https://goo.gl/V6nJx2 অথবা http://bit.ly/2AKwrfT

[11]  আবদুল্লাহ ইবনে আমর(রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(ﷺ)কে কা’বা ঘর তাওয়াফ করতে দেখলাম এবং তিনি বলছিলেনঃ কত উত্তম তুমি হে কা’বা! আর্কষীয় তোমার খোশবু, কত উচ্চ মর্যাদা তোমার! কত মহান সম্মান তোমার। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আল্লাহর নিকট মুমিন ব্যক্তির জান-মাল ও ইজ্জতের মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশী। আমরা মু’মিন ব্যক্তি সম্পর্কে সুধারণাই পোষণ করি। [সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস নং ৩৯৩২] 

[12]  “Hajj 2013 | Exclusive Kaba Kiswa change 2013-1434 Arafa Day ” (You Tube)
https://goo.gl/i3zjxS অথবা http://bit.ly/2kdRttz

[13] আল কুরআন, বাকারাহ ২:১২৭-১২৯

[14] দেখুনঃ “কা’বাঃ মূর্তিপুজকদের মন্দির, নাকি ইব্রাহিম(আ.) এর নির্মাণ করা ইবাদতখানা?”

[15] ■“A brief history of al-Masjid al-Haraam in Makkah” --- islamQA(Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)
https://islamqa.info/en/3748

■ ‘আর রাহিকুল মাখতুম’, শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র) {তাওহিদ পাবলিকেশন্স}, পৃষ্ঠা ৪৬৩-৪৬৬

[16] বাইবেল, মথি(Matthew) ২১:১২-১৫, ২১:২৩; লুক(Luke) ২:৪৬-৪৯, ২০:১, ২১:৩৭-৩৮ দ্রষ্টব্য

[17] বাইবেল, আদিপুস্তক(Genesis) ২৮:১০-২২ দ্রষ্টব্য

[18] বাইবেল, ২ রাজাবলী(2 Kings) ২১:৩-১১

[19] আল কুরআন, বনী ইস্রাঈল(ইসরা) ১৭:৮১