কুরআন কি পৃথিবীকে সমতল বলছে?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

প্রশ্ন: কুরআন বলে পৃথিবীর গঠন বিছানা বা কার্পেটের মত (Quran 15:19, 20:53, 43:10, 50:7, 51:48, 71:19, 78:6, 79:30, 88:20 and 91:6)! কিন্তু কেউ কখনো স্ফেরিক্যাল কার্পেট দেখেনি! কুরআন কি তাহলে পৃথিবীকে সমতল বলছে না?

 

উত্তর: প্রথমত, কুরআনের কোথাও পৃথিবীর আকারকে সমতল বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত, কেউ কি অকাট্য যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে কুরআনের পৃথিবীকে সমতল বানাতে পারবেন? কখনোই না। চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক তাদের দেয়া কিছু কুরআনের আয়াত যেগুলো দিয়ে কুরআনের পৃথিবীকে সমতল বানানো হয়-

 

“আমি ভু-পৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি এবং তার উপর পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি।” (১৫:১৯)

“তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।” (২০:৫৩)

“যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বিছানা এবং তাতে তোমাদের জন্যে করেছেন পথ, যাতে তোমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পার।” (৪৩:১০)

“আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালার ভার স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদগত করেছি।” (৫০:৭)

“আমি ভূমিকে বিছিয়েছি। আমি কত সুন্দরভাবেই না বিছাতে সক্ষম।” (৫১:৪৮)  

“আর পৃথিবী -- এর পরে তাকে প্রসারিত করেছেন।” (৭৯:৩০)

“আর এই পৃথিবীর দিকে -- কেমন করে তাকে প্রসারিত করা হয়েছে?” (৮৮:২০)

 

তাদের কুযুক্তি হচ্ছে পৃথিবীকে যেহেতু কার্পেট ও বিছানার সাথে তুলনা করা হয়েছে, তাই কুরআন পৃথিবীকে সমতল বলেছে। কেন এটা অযৌক্তিক যুক্তি, তার কারণগুলো নিম্নরুপ-

 

১। একটা সহজ আর্গুমেন্ট দিয়েই শুরু করি। কারও চেহারার প্রশংসা করে যখন ‘চাঁদমুখ’ বলা হয়, তখন ‘চাঁদমুখ’ বলতে কিন্তু চাঁদের মত গোলাকার কোন মুখ বুঝায় না; বরং সৌন্দর্যের কথা বুঝায়। তাই কার্পেট বা বিছানা বললেই যে সেটা দিয়ে সমতল বুঝানো হচ্ছে- এরকম যুক্তি আসলে কুযুক্তি ছাড়া কিছু নয়।

 

২। বেড বা বিছানা বলতে সাধারণত নরম গদিকে বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ বেড তাকেই বলা হয় যেখানে আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নেয়া যায়। তাছাড়া বেড সাধারণত প্রটেকটিভ (protective) জায়গার মধ্যে রাখা হয় যাতে করে সূর্যের তাপ ও ক্ষতিকর রশ্মি, ঝড়-বৃষ্টি, হিংস্র জীবজন্তু ও বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের হাত থেকে জীবন বাঁচানো যায়। এবার আসা যাক কুরআনের ক্ষেত্রে। কুরআনে পৃথিবীকে বেড বা কার্পেট এর সাথে তুলনা করে পৃথিবীর আকার-আকৃতিকে বুঝানো হয়নি। বরঞ্চ এই তুলনাটা অত্যন্ত যৌক্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা সবাই জানি এ পর্যন্ত যতগুলো গ্রহ-উপগ্রহ আবিষ্কার করা হয়েছে তার মধ্যে পৃথিবী একটি ব্যতিক্রমধর্মী গ্রহ, যেখানে পানি-বাতাস ও জীবের অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তু-উদ্ভিদ যত সহজে বসবাস করতে পারে, যত সহজে আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নিতে পারে, সর্বোপরি যত সহজে বেঁচে থাকতে পারে, অন্য কোন গ্রহে যেয়ে তত সহজে বসবাস করা কিন্তু অসম্ভব। আর এ কারণেই কুরআনে পৃথিবীকে বেড বা বিছানার সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনে পৃথিবীকে বেডের সাথে তুলনা করে পৃথিবীকে বসবাস ও জীবন ধারণের উপযোগী বুঝানো হয়েছে, পৃথিবীর আকার-আকৃতিকে বুঝানো হয়নি। আয়াতগুলো পড়লেই বুঝা যায়। বেডকে যেমন প্রটেকটিভ জায়গার মধ্যে রাখা হয় তেমনি পৃথিবীকেও প্রটেকটিভ আবরণের মধ্যে রাখা হয়েছে (২১:৩২)।

 

৩। কুরআনের এই আয়াতগুলোতে ‘Shape’ ও ‘Flat’ শব্দ দুটির কোনটিই ব্যবহার করা হয়নি। সুতরাং আয়াতগুলোতে আসলে কী বুঝাতে চাওয়া হয়েছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। প্রথমত, কিছু অনুবাদক ‘কার্পেট’ ও ‘বেড’ শব্দ দুটি ব্যবহারই করেননি। দ্বিতীয়ত, কার্পেটিং করতে হলে রাস্তা-ঘাট সরল রেখার মতো সমতল হতেই হবে, এমন আজগুবি কথা কে বলেছে! পাহাড়ের উপর দিয়ে যে রাস্তা তৈরী করা হয় সেটি তো বক্রাকার বা অর্ধবৃত্তাকার। সেই অর্ধবৃত্তাকার রাস্তায় কি কার্পেটিং করা হয় না? ফলে গোলাকার বস্তুর উপর কার্পেট বিছানো যাবে না কেন? ফুটবলের উপরের চামড়াকেও তো এক অর্থে কার্পেট বলা যেতে পারে। ঘরের মেঝেতে মানুষ কার্পেট বিছায় মূলত কিছু কারণে- মেঝে খসখসে হলে, মেঝে ঠান্ডা হলে, মেঝের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ইত্যাদি। রাস্তায় যানবাহন চলাচলের সুবিধার জন্য যেমন কার্পেটিং করা হয়, পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগকেও মানুষের বসবাস ও ফসল ফলানোর উপযোগী করার জন্য কার্পেটিং করা হয়েছে। পৃথিবীর মধ্যভাগ বসবাস ও ফসল ফলানোর উপযোগী নয়। বেডের উপর মানুষ যেমন বিশ্রাম নিতে পারে তেমনি পৃথিবীর পৃষ্ঠেও বিশ্রাম নিতে পারে। আর এ কারণেই পৃথিবীকে বেডের সাথে তুলনা করা হয়েছে, পৃথিবীর মধ্যভাগ বিশ্রামযোগ্য নয়। অতএব প্রচলিত বেডের আকার সমতল না হয়ে অন্য কিছু হলেও সেই বেডের সাথেই হয়তো তুলনা করা হতো। তাছাড়া স্ফেরিক্যাল বেডও তো অসম্ভব কিছু নয়। পুরো পৃথিবীকে একটি বিশাল স্ফেরিক্যাল বেড ধরে নেয়াটা অযৌক্তিক হবে কেন? আয়াতগুলোতে কিছু শব্দ যেমন Bed, Carpet, Spread out, Expanse ইত্যাদি দেখেই পৃথিবীর আকারকে সমতল ধরে নেয়া হয়েছে! কিন্তু Bed, Carpet, Spread out, Expanse ইত্যাদি বলতে যে সমতল হতেই হবে তার কোন যৌক্তিকতা নেই।

 

৪। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুবাদক বিভিন্ন রকম শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন- সূরা ত্বোয়া-হা ২০:৫৩ এর বিভিন্ন অনুবাদ লক্ষ্যণীয়:

[Qaribullah]: It is He who has made for you the earth as a cradle.

[Yusuf Ali]: He Who has, made for you the earth like a carpet.

[Pickthall]: Who hath appointed the earth as a bed.

[Shakir]: Who made the earth for you an expanse.

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ৪ জন অনুবাদক ৪ রকম শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং সবগুলোই আসলে যৌক্তিক, যার ব্যাখ্যা ইতোমধ্যে এবং সামনেও আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ্‌। অনুবাদের ক্ষেত্রে যে অনুবাদকে সবচেয়ে বেশী যৌক্তিক মনে হবে সেটা গ্রহণ করাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু বিভিন্ন অনুবাদ থেকে নিজের ইচ্ছেমতো কিছু শব্দ বেছে নিয়ে একটি গ্রন্থকে ভুল বা অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ করার চেষ্টা করা অযৌক্তিক। কারণ অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ কুরআন বা যে কোন গ্রন্থকেই দিতে হবে। কুরআনে এমন কোন আয়াত নেই যেখানে থেকে কেউ পৃথিবীর আকারকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে সমতল বানাতে পারে।

 

৫। বিছানা/কার্পেটের সংজ্ঞা কি? এমন কোন কিছু যার উপর আমরা আরাম অনুভব করি। এখন আমরা পৃথিবীর উপর সার্চলাইট ফেলি। আপনি জানেন কি পৃথিবীর অনেকগুলো লেয়ার আছে?[১]

 

এই লেয়ারগুলোর সবচেয়ে উপরে আছে Crust।[২] এটি সবচেয়ে পাতলা আস্তরণ। আমরা যেখানে দাড়িয়ে আছি, সেই Crust-এর আয়তন মাত্র ৩০ কিমি। এই লেয়ারটাই আমাদের বসবাসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। Crust এর নিচেই আছে ম্যান্টল। এটি প্রায় ২৯০০ কিমি পুরু। এটি বসবাসের জন্য ভয়াবহভাবে অনুপযোগী। উইকিপিডিয়াতে সার্চ করে দেখতে পারেন এই mantle সম্পর্কে কি লেখা আছে- In the mantle, temperature ranges between 500 to 900°C.[] আর পৃথিবীতে এই Crust-এর মাত্রা মোট আয়তনের মাত্র ১%। এবার বলুন, আপনি যদি সৃষ্টিকর্তা হতেন, তাহলে এই ক্রাস্টের কথা বুঝাতে কোন শব্দটি ব্যবহার করতেন? এখানে বিছানা/কার্পেটই সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ। কারণ ভূপৃষ্ঠ বা ক্রাস্টের লেয়ার খুবই পাতলা। বিছানা, কার্পেটও পাতলা আস্তরণ। ক্রাস্ট যেমন আমাদের বসবাসের জন্য আরামদায়ক, তেমনি বিছানা, কার্পেটও আরামদায়ক করার জন্যই বিছানো হয়। সূরা নূহের ১৯-২০ আয়াতটাতে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট- “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্যে ভূমিকে করেছেন বিছানা। যাতে তোমরা চলাফেরা করো প্রশস্ত পথে।” (৭১:১৯-২০) ভূপৃষ্ঠের গুরুত্ব এটাই যাতে আমরা স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারি। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিবার দেখা Windows XP-এর default wallpaper “Bliss”[৪] ছবিটা দেখুন। এটাকে কি আপনার ঘাসের কার্পেট বা গালিচা মনে হচ্ছে না?

 

আপনি যদি কুরআনের বিছানা বা কার্পেট সংক্রান্ত আয়াতগুলো দেখেন- তাহলে দেখবেন- ভূমিকে বিছানো হয়েছে- এই কথা বলার সাথে সাথেই তোমরা চলাফেরা করতে পারো, ফসল উৎপন্ন করতে পারো- এই কথাগুলো বলা হয়েছে। কথাগুলো দিয়ে ক্রাস্টের ব্যাপারটা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ব্রেইন ওয়াশ্ড নাস্তিকদের এগুলো চোখে পড়ে না।

 

এবার আমরা কুরআনে পৃথিবীর আকারকে যে সমতল বলা হয় নি, বরং গোলাকারের (স্ফেরিক্যাল) দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে সে ব্যাপারে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তবে তার আগে আপনাদের কাছে আমার একটা জিজ্ঞাসা, পৃথিবীর আকার গোলাকার- এটা কি কুরআনে বলা খুব জরুরি? মানবজাতিকে দিক নির্দেশনার জন্য কুরআন নাযিল হয়েছে, আমাদেরকে Geography, Astronomy শেখাতে নয়। যাই হোক, আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাই।

 

১ম প্রমাণ: সূরা ইন্‌শিক্বাক্বের ৩ নম্বর আয়াত দেখুন- “আর যখন পৃথিবীকে সমতল করা হবে।” (৮৪:৩)

‘যখন সমতল করা হবে...’ অর্থাৎ এখনই সমতল না। যদি আল্লাহ্‌ পৃথিবীকে সমতলই বলতেন, তাহলে আবার সমতল করার কথা বলবেন কেন? এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায়, কুরআনে পৃথিবীকে সমতল বলা হয় নি। যদি এখানে মসৃণ সমতলের কথা বলা হত তা হলে আল্লাহ্‌ পরের আয়াতে এটি উল্লেখ করতেন না- “আর তার ভেতরে যা-কিছু রয়েছে তা নিক্ষেপ করবে এবং শূন্যগর্ভ হবে।” (৮৪:৪) এখানে মসৃণ সমতল নয়- একেবারে অরিজিন সমতল। যদি মসৃণ সমতলের কথা বলতেন, তাহলে পৃথিবীর উপরিভাগের কথা বলতেন। কিন্তু পুরো সূরাতে আল্লাহ্‌ কোথাও উপরি-অংশ বা উপরিভাগের কথা উল্লেখ করেন নি।

 

২য় প্রমাণ: “তিনি রাত্রি দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাত্রিকে আচ্ছাদিত করেন দিন দ্বারা।” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫)

উপরের আয়াতটিতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হলো “يُكَوِّرُ”। যার অর্থ কোন জিনিসকে প্যাঁচানো বা জড়ানো, যেমনটা মাথার পাগড়ির ক্ষেত্রে বুঝানো হয়। অবিরত প্যাঁচানোর পদ্ধতি- যাতে এক অংশ আরেক অংশের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আমরা ভালোভাবেই জানি, পাগড়ি কিভাবে গোলাকারভাবে প্যাঁচানো হয়। এই আয়াতে বলা হচ্ছে, রাত ধীরে ধীরে ক্রমশ দিনে রূপান্তরিত হয়, অনুরূপভাবে দিনও ধীরে ধীরে রাতে রূপান্তরিত হয়। এ ঘটনা কেবল পৃথিবী গোলাকার হলেই ঘটতে পারে। পৃথিবী যদি চ্যাপ্টা বা সমতলভূমি হত, তাহলে রাত্রি থেকে দিনে এবং দিন থেকে রাত্রিতে একটা আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে যেত।

 

এছাড়া দেখুন আরও দুইটা আয়াত-

“আল্লাহ দিন ও রাত্রির পরিবর্তন ঘটান। এতে ‘অর্ন্তদৃষ্টি-সম্পন্নগণের’ জন্যে চিন্তার উপকরণ রয়েছে।” (সূরা নূর ২৪:৪৪)

“নিশ্চয়ই মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং ‘রাত ও দিনের আবর্তনে বিশেষ নিদর্শন রয়েছে’ জ্ঞানবান লোকদের জন্য।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৯০)  

 

আল্লাহ্‌ কেন বললেন অন্তর্দৃষ্টির কথা? কেন বললেন না বাহ্যিক দৃষ্টির কথা? আমরা বাহ্যিকভাবে দেখি, সূর্য উদিত হয় বা অস্ত যায়। আসলেই কি তাই? ‘রাত ও দিনের আবর্তনে বিশেষ নিদর্শন রয়েছে’- কি এমন ‘বিশেষ’ জিনিস রয়েছে যাতে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দিতে হবে? অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার আর পাগড়ির মত প্যাঁচানোর কথা বলে এখানে ইঙ্গিতে পৃথিবীর স্ফেরিক্যাল শেপ এবং ঘূর্ণায়মানতার কথা বলা হয়েছে।

 

৩য় প্রমাণ: “তিনি দুই পূর্বের প্রভু, আর দুই পশ্চিমেরও প্রভু।” (সূরা রাহমান ৫৫:১৭)

কুরআনে যদি পৃথিবীকে সমতলই বলা হত- তাহলে দুইবার পূর্ব আর দুইবার পশ্চিমের কথা বলা হল কেন? পৃথিবী যদি সমতল হত তাহলে সমগ্র পৃথিবীতে সূর্যের উদয় ও অস্ত একবার করে হত। কিন্তু পৃথিবী গোলাকার হওয়ায় এমনটা হয় না। কারণ আপনি যখন দেখছেন সূর্য উঠছে, তখন আসলে অন্য জায়গায় সূর্য ডুবছে। আর যখন দেখছেন সূর্য ডুবছে, তখন আসলে অন্য অবস্থানে সূর্য উঠছে (প্রকৃতপক্ষে সূর্য অস্ত বা উদয় কোনোটাই হয় না। বুঝানোর সুবিধার্থে এভাবে বললাম)। মোট দুইটা পূর্ব, দুইটা পশ্চিম। বিষয়টা আসলে আরও অনেক গভীর এবং আলোচনার বিষয়। জায়গার অভাবে এই মুহূর্তে সেদিকে আর যাচ্ছি না।

 

৪র্থ প্রমাণ: আমরা যদি চারপাশে তাকাই, তাহলে কিন্তু পৃথিবীকে আমাদের কাছে সমতলই মনে হয়। কারণ পৃথিবী এত বড় গোলক যা নির্দিষ্ট কোন স্থান থেকে সমতলই মনে হবে। বিজ্ঞানের যে পরীক্ষাগুলোতে পৃথিবীর ছোট কোনো অংশ বিবেচনা করা হয় সেখানে কিন্তু সমতলই ধরা হয়। তবে বৃহৎ দুরত্বে অবশ্যই গোলাকার। আপনি যদি পৃথিবীর surface area, circumference-এর কথা চিন্তা করেন, সেটা অবশ্যই বিশাল।[৫] এই বিশাল জায়গাকে দেখলে বিস্তৃতই মনে হয়; এটা পৃথিবীর সমতল হওয়া প্রমাণ করে না।

 

আর আমরা জানি, আমাদের এই পৃথিবী হঠাৎ করেই এই আকৃতিতে চলে আসে নি। এই আকৃতিতে আসতে প্রসারিত হতে হয়েছে। উপরের আয়াতের পরের আয়াতটা যদি আমরা পাশাপাশি দেখি-

“আর পৃথিবী -- এর পরে তাকে প্রসারিত করেছেন। এর থেকে তিনি বের করেছেন তার জল, আর তার চারণভূমি।” (৭৯:৩০-৩১)

 

প্রসারণের পর তৈরি হয়েছে জল, চারণভূমি- তারমানে প্রসারণের আগে এগুলো ছিল না। এ থেকে বুঝা যায়, আয়াতটি পৃথিবী সৃষ্টির সময়কালের কথা বুঝাচ্ছে; পৃথিবীর সমতল আকার নয়।

আপনি হয়তো জানেন না, পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রতি বছর .০০৪ ইঞ্চি (০.১ মি.মি) করে বাড়ছে। এই তথ্য কোথা থেকে পেলাম? তথ্যসূত্র- নাসার ওয়েবসাইট।[৬] সংখ্যাটা অতি ক্ষুদ্র হলেও, পৃথিবীর মিলিয়ন-বিলিয়ন বছরের হিসেবে সেটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

 

৫ম প্রমাণ: পৃথিবীর আকার যে গোলাকার- এ ব্যাপারে ইসলামিক স্কলারদের অসংখ্য ফতওয়া রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে তাইয়িম্যার ফতওয়া রয়েছে।[৭] গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার শাইখ আব্দুল আজিজ ইবন বাযেরও এই ব্যাপারে ফতওয়া রয়েছে[৮]-

Translation:

"According to the people knowledge (scholars of Islaam) the earth is round, for indeed Ibn Hazim and a group of other scholars mentioned that there is a consensus (unanimous agreement, Ijmaa') among the people of knowledge that it is round. This means that all of it is connected together thus making the form of the entire planet like a ball. However, Allaah has spread out surface for us and He has placed firm mountains upon it and placed the animals and the seas upon it as a mercy for us. For this reason, Allaah said:

"And (do they not look) at the Earth, how it was made FLAT (Sutihat)." [Al-Ghaashiyyah (88):20]

Therefore, it (the Earth) has been made flat for us in regards to its surface, so that people can live on it and so that people can be comfortable upon it. The fact that it is round does not prevent that its surface has been made flat. This is because something that is round and very large, if it is made flat (its surface), then its surface will become very vast or broad (i.e. having a flat appearance). "

 

এছাড়াও আপনি দেখতে পারেন IslamQA-র ফতওয়া।[৯] আরও দেখতে পারেন IslamWeb-এর ফতওয়া।[১০]

 

কুরআনে পৃথিবীকে সরাসরি স্ফেরিক্যাল ও ঘূর্ণায়মান উল্লেখ না করে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেওয়ার পেছনে যৌক্তিক একটি কারণ হতে পারে এই যে, বিষয় দুটি সেই সময়ের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতো এবং যার ফলে তারা হয়তো কুরআনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতো। এমনকি নিকট অতীতেই গ্যালিলিও ও ব্রুনোর কাহিনী কে না জানে! কারণ, একদিকে যেমন সেই সময়ের মানুষের কাছে ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ বলতে পৃথিবীটা 'সমতল' ও 'অনড়' ছিল, অন্যদিকে আবার পৃথিবীটা যে সত্যি সত্যি স্ফেরিক্যাল ও ঘূর্ণায়মান- সেটা তাদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখানোও সম্ভব হতো না। ফলে বিষয় দুটি সত্য হলেও তাদের কাছে কোনো তাৎপর্য বহন করতো না। যার ফলে কুরআনের মূখ্য উদ্দেশ্য “পার্থিব ও অপার্থিব গাইডেন্স” ব্যর্থ হতে পারতো। কুরআনে তেমন কোনো উক্তি নেই যেটি সেই সময়ের মানুষের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে… আল্লাহ্‌ ভাল জানেন।    

 

 

তথ্যসূত্র: