ছাগলে খাওয়ার ফলে কুরআনের কিছু আয়াত কি হারিয়ে গেছে?

ছাগলে খাওয়ার ফলে কুরআনের কিছু আয়াত কি হারিয়ে গেছে?

12 বার দেখা হয়েছে
শেয়ার করুন:

 

অভিযোগ
কিছু সমালোচক দাবি করেন যে, আয়েশা (রাঃ)-এর একটি বর্ণনা থেকে বোঝা যায়রাসূল -কে প্রদত্ত কিছু কুরআনের আয়াত একটি ছাগল খেয়ে ফেলেছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই কারণে ঐ আয়াতগুলো হারিয়ে গেছে এবং আজকের কুরআনে নেই। এ থেকে তারা প্রশ্ন তোলেনআল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত আয়াত কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে, এবং তা মুসলিমদের জন্য কেন এখন অনুপস্থিত?

 

জবাব:

ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে:

عَائِشَةَ قَالَتْ لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا وَلَقَدْ كَانَ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا.

অর্থাৎ, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্ক লোকেরও দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে (সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস নং ১৯৪৪, মুসনাদে আহমাদ হা/২৬৩১৬)

 

উক্ত হাদীসের

  فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا

অর্থাৎ "যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে" অংশটকুকে সম্মুখে রেখে অনেকে নাস্তিক দাবী করে থাকেন যে কুরআনের আয়াত নাকি ছাগলে খেয়ে ফেলেছে বিধায় কুরআনের কিছু আয়াত বর্তমান কুরআনে অনুপস্থিত।

 

নাস্তিকদের উক্ত দাবী সঠিক তো নয়ই; বরং সবৈব মিথ্যা। কেননা হাদীসের যে অংশটুকুর উপর ভিত্তি করে উক্ত অভিযোগ করা হয়েছে সেই অংশটুকু সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে  তা অপ্রমাণিত। কেননা -

·         উক্ত বর্ণনায় যে রজম আয়াতবা দুধপানের আয়াতবলা হয়েছে, সেগুলো কুরআনের স্থায়ী অংশ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য নাযিল হয়নি।

·         হাদিসবিদরা স্পষ্ট বলেছেন, এগুলো আয়াত হিসেবে নাজিল হয়েছিল কিন্তু পরে তিলাওয়াত রহিত (منسوخ التلاوة)হয়, অর্থাৎ কুরআনের চূড়ান্ত সংকলনে অন্তর্ভুক্ত রাখার জন্য আল্লাহ নিজেই বাতিল করে দেন, তবে এর হুকুম (রুলিং) কার্যকর থাকে (যেমন রজমের শাস্তি)।

 

ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিলঃ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍদশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।তারপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ এর দ্বারা। (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)| হাদিস:৩৪৬৬)

 

এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারলাম রজম সম্পর্কে ও বয়স্ক লোকেরও দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিলো। কিন্তু আয়াত দুটি ছাগলে খেয়ে ফেলে। যেহেতু, কুরআনের আয়াত ছাগলে খেয়ে ফেলেছে সেহেতু কুরআন বিকৃত। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

 اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّكۡرَ وَ اِنَّا لَهٗ لَحٰفِظُوۡنَ

নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক সূরা আল-হিজর ১৫:৯

 

আল্লাহ যদি নিজেই কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকে তাহলে কুরআন কিভাবে ছাগলে খেয়ে পেলে এবং হারিয়ে যায়? 

এই অভিযোগের উত্তর হলো, ছাগলে খেয়ে নেওয়া আয়াতটি হারিয়ে যায়নি বরং এখনো তা আছে। রজমের আয়াতটি হলো:- الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة. (ইবনে মাজাহ/২৫৫৩) তবে আয়াতগুলো রহিত বা নাসখ হয়ে গিয়েছে তাই কুরআনে সেগুলো সংকলন করা হয়নি। পাঁচ ঢোক দুধপানের আয়াতও যে রহিত হয়েছিলো, তা বিভিন্ন হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়। যেমন:-

حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ بْنُ عَبْدِ الصَّمَدِ بْنِ عَبْدِ الْوَارِثِ حَدَّثَنَا أَبِي حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عَمْرَةَ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أَنْزَلَ اللهُ مِنْ الْقُرْآنِ ثُمَّ سَقَطَ لَا يُحَرِّمُ إِلَّا عَشْرُ رَضَعَاتٍ أَوْ خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ.

হজরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রথমদিকে কুরআনে এই বিধান ছিলো, যা পরে রহিত হয়ে যায়ঃ দশ ঢোক বা পাঁচ ঢোক দুধ পানের কমে নিষিদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। (সুনান ইবনু মাজাহ হা/ ১৯৪২,১৯৪৪ হাদিসের শব্দ, অনুরূপ আছে সহীহ বুখারী হা/১৪৫২, সুনান নাসায়ী হা/৩৩০৭, ২০৬২, মুয়াত্তা ইমাম মালেক হা/ ১২৯৩, সুনান দারেমী হা/ ২২৫৩, ইরওয়াহ ২১৪৭, তাহকীক আলবানী সহীহ।)

 

সুতরাং, ছাগলে খেয়ে নেওয়া আয়াতগুলো হারিয়ে যায়নি। বরং, সেগুলো নসখ হয়ে যাওয়ার কারণে আয়াতগুলো কুরআনে সংকলন করা হয়নি। আর যে আয়াতগুলো নসখ হয়ে যাবে সেগুলো কুরআনে থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। তাই ওই আয়াতগুলো ছাগলে খেয়ে নেওয়ার কারণে কুরআন বিকৃত এই দাবিটি কিছুতেই যুক্তিযুক্ত নয়।

 

ছাগল খেয়ে ফেলার ঘটনাটি কুরআন হারানোর প্রমাণ নয়

কুরআন মুখস্থ করা ছিল সাহাবিদের প্রধান মাধ্যম। রাসূল জীবদ্দশাতেই হাজারো সাহাবি সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন।

যদি কোনো আয়াত সংরক্ষণের জন্য অবতীর্ণ হতো, তবে শুধু এক টুকরো সহীফা নষ্ট হয়ে যাওয়া দ্বারা তা হারানো সম্ভব ছিল না, কারণ তা অনেক সাহাবির বুকে মুখস্থ থাকত।

 

সনদ (ইসনাদ) দুর্বলতা

এ বর্ণনার সনদে ইবনে ইসহাক আছেন, যিনি মুদাল্লিস ছিলেন এবং এখানে আনআনা (عن) করে বর্ণনা করেছেনফলে হাদিসবিদরা একে দুর্বল বলেছেন।

 

হাদীসটি যঈফ তথা প্রামাণ্য দালীল হিসাবে অগ্রহনযোগ্য।

সনদগত ভাবে হাদীসটিকে কিছু সংখ্যক মুহাক্কীক সহীহ বা হাসান বললেও প্রকৃত পক্ষে হাদীসটি যঈফ তথা প্রামাণ্য দালীল হিসাবে অগ্রহনযোগ্য।

 

শুয়াঈব আল আরনাউত রাহিমাহুল্লাহ বলেন -

وهذا حديث لا يصح، تفرد به محمد بن إسحاق صاحب المغازي، وفي متنه نكارة.

وهو في "المسند" (٢٦٣١٦).

অর্থাৎ উক্ত হাদীসটি সঠিক নয় । কেননা সাহেবে মাগাজী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক এই বর্ণনার ক্ষেত্রে একক আর এর বর্ণনা শৈলীতে কিছু অবাঞ্চিত কথা রয়েছে (তাহক্বীক সুনানে আবী দাউদ-আল আরনাউত হা/ ২০৬২ নং হাদীসের তাহক্বীক ১ নং টিকা)।

 

মুসনাদে আহমাদের তাহক্বীকে আল্লামা শুয়াঈব আল আরনাউত রাহিমাহুল্লাহ, আদেল মুরশেদ প্রমুখ বলেন-

إسناده ضعيف لتفرد ابن إسحاق - وهو محمد - وفي متنه نكارة

অর্থ: এর সনদ  যঈফ,কেননা এর বর্ণনার ক্ষেত্রে ইবনে ইসহাক একক, যিনি হলেন মুহাম্মাদ(ইবনে ইসহাক) আর তার বর্ণিত মতনেও কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথন রয়েছে(মুসনাদে আহমাদ:তাহক্বীক শুয়াঈব আল আরনাউত, আদেল মুরশেদ প্রমুখ: ২৬৩১৬ নং হাদীসের তাহক্বীক ১ নং টিকা- ৪৩/৩৪৩পৃ: )।

 

ইমাম জুরকানী (আবু আব্দুল্লাহ আল হুসাইন বিন ইব্রাহিম আল জুরকানী- মৃত্যু:৫৪৩ হিজরী) রাহিমাহুল্লাহ "আল আবাতীল ওয়াল মানাকীর" গ্রন্থে এই হাদীসটি প্রসঙ্গে বলেন -

هَذَا حَدِيثٌ بَاطِلٌ، تَفَرَّدَ بِهِ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ، وَهُوَ ضَعِيفُ الْحَدِيثِ، وَفِي إِسْنَادِ هَذَا الْحَدِيثِ بَعْضُ الِاضْطِرَابِ(الأباطيل والمناكير:الجورقاني-حديث 541))

অর্থ: এই হাদীসটি বাতিল, এতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক একক এবং তিনি যঈফ। আর এই হাদীসের সনদে আরো কিছু বিচ্ছিন্নতা রয়েছে (আবাতীল ওয়াল মানাকীর: জুরকানী, হা/৫৪১)।

 

শাইখ আন নাসাফী (আবুল বারাকাত আব্দুল্লাহ আন নাসাফী) রাহিমাহুল্লাহ "مدارك التنزيل وحقائق التأويل" তথা তাফসীর আন নাসাফীতে বলেন-

وأما ما يحكى أن تلك الزيادة كانت في صحيفة في بيت عائشة رضى الله عنها فأكلتها الداجن فمن تأليفات الملاحدة والروافض(مدارك التنزيل وحقائق التأويل، 3/14")

অর্থাৎ এটা যা বলা হয়ে থাকে যে, আয়েশা(রা:) এর বাড়িতে সহীহফাতে কিছু বাড়তি অংশ ছিল যা তার বকরীতে খেয়ে নিয়েছিল,এটা মুলহিদ ও রাফেযীদের মনগড়া কথা(মাদা-রেকুত তানযীল ওয়া হাকায়েকুত তা-বীল/তাফসীর আন নাসাফী - সুরা আহযাব: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর-৩/১৪ পৃ:)।

 

একই ভাবে আস-সারখাসী (আবু বকর মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আস-সারখাসী- মৃত্যু:৪৮৩ হিজরী) রাহিমাহুল্লাহ বলেন-

وَحَدِيث عَائِشَة لَا يكَاد يَصح؛ لِأَنَّهُ قَالَ فِي ذَلِك الحَدِيث وَكَانَت الصَّحِيفَة تَحت السرير فاشتغلنا بدفن رَسُول الله فَدخل دَاجِن الْبَيْت فَأَكله وَمَعْلُوم أَن بِهَذَا لَا يَنْعَدِم حفظه من الْقُلُوب وَلَا يتَعَذَّر عَلَيْهِم إثْبَاته فِي صحيفَة أُخْرَى فَعرفنَا أَنه لَا أصل هَذَا الحَدِيث(أصول السرخسي-2/80").

অর্থাৎ আয়েশা(রা) এর হাদীসটি সম্ভবত সহীহ নয়... এই হাদীসের কোনো ভিত্তিমূল নেই (উসুলুস সারখাসী -২/৭৯-৮০)।

 

সুতরাং প্রমাণিত হলো -হাদীসে বর্ণিত "ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে" মর্মের অংশটুকু সঠিক রূপে প্রমাণিত নয়,বরং তা বাতিল ও প্রত্যাখ্যান যোগ্য।বিধায় আয়াত ছাগল বা বকরীতে খেয়ে ফেলেছে কিংবা আয়াত হারিয়ে গেছে ইত্যাদি অভিযোগ মূলক কথা বার্তা নিতান্তই ভীত্তিহীন ও অবান্তর দাবী বৈ কীছুই নয়।

 

ইমাম জুরকানী(আবু আব্দুল্লাহ আল হুসাইন বিন ইব্রাহিম আল জুরকানী- মৃত্যু:৫৪৩ হিজরী) রাহিমাহুল্লাহ "আল আবাতীল ওয়াল মানাকীর" গ্রন্থে এই হাদীসটি প্রসঙ্গে বলেন -

هَذَا حَدِيثٌ بَاطِلٌ، تَفَرَّدَ بِهِ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ، وَهُوَ ضَعِيفُ الْحَدِيثِ، وَفِي إِسْنَادِ هَذَا الْحَدِيثِ بَعْضُ الِاضْطِرَابِ(الأباطيل والمناكير:الجورقاني-حديث 541))

অর্থ: এই হাদীসটি বাতিল, এতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক একক এবং তিনি যঈফ। আর এই হাদীসের সনদে আরো কিছু বিচ্ছিন্নতা রয়েছে(আবাতীল ওয়াল মানাকীর: জুরকানী - হা/৫৪১)।

 

শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ সলেহ আল মুনাজ্জিদ হাফিযাহুল্লাহ বলেন -

فالخلاصة أن قصة الشاة التي أكلت صحيفة القرآن الكريم في بيت عائشة رضي الله عنها قصة ضعيفة لا تثبت .

অর্থাৎ আয়েশা(রা:) এর ঘরে ছাগলের কুরআনের সাহীফাহ খেয়ে নেওয়ার ঘটনাটিরে খুলাসাহ হলো এই যে,এই ঘটনাটি যঈফ ও অপ্রমাণিত (ইসলাম সুওয়াল ওয়া জাওয়াব: আল্লামা মুনাজ্জিদ, ফা/১৭৫৩৫৫)

 

এই  বিষয়ে বিস্তারিত দেখতে দেখুন আল্লামা মুহাম্মাদ সলেহ আল মুনাজ্জিদের লেখা "حديث أكل الشاة صحيفة آية الرجم والرضاع في بيت عائشة لا يصح" শীর্ষক  প্রবন্ধটি।

 

বর্ধিত অংশটি প্রমাণিত নয়

শাহেদ থাকার কারণে উক্ত হাদীসের কিছু অংশ প্রামাণ্য রূপে স্বীকৃত হলেও,উক্ত অভিযোগের ভিত্তমূল তথা বর্ধিত অংশটি প্রত্যাখ্যান যোগ্য ও মনগড়া। কেননা "যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন....... তখন একটি ছাগলে তা খেয়ে ফেলে" মর্মে বর্ধিত অংশটি মুহাম্মাদ বিন ইসহাকের সুত্র ব্যাতীত কোনো সুত্রে উদ্ধৃত হয়নি যার দ্বারা এটা 'শায' হিসাবে প্রমাণিত হয়। তাছাড়া উক্ত অংশটি কুরআনুল কারীম, অন্যান্য সহীহ হাদীস ও কুরআনের আয়াতের ব্যাপারে  সমগ্র সাহাবায়ের কেরাম রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুমদের প্রতিষ্ঠিত ইজমার পরিপন্থী।

 

এই প্রসঙ্গে ইমাম মাহমুদ আলূসী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন-

 وأما كون الزيادة كانت في صحيفة عند عائشة فأكلها الداجن ، فمن وضع الملاحدة وكذبهم في أن ذلك ضاع بأكل الداجن من غير نسخ ، كذا في الكشاف

 অর্থাৎ আয়েশা (রা.) নিকট থাকা ছহিফাটি ছাগলে খেয়ে ফেলেছে, মর্মে অতিরিক্ত কথাটি মুলহিদদের বানানো আর তাদের মিথ্যাকথা। তারা (রজম আর বয়ষ্কদের দশ-পাঁচ ঢোক দুধ পান সংক্রান্ত) আয়াতগুলোকে মানসূখ তথা রহিত হওয়ার বিরোধিতা থেকেই ছাগলে খেয়ে ফেলেছে কথাটি তৈরি করেছে,যেমনটি কাশশাফে রয়েছে (রূহুল মাআনী ১১/১৪০,ইসলাম সুওয়াল ওয়া জাওয়াব: আল্লামা মুনাজ্জিদ,ফা/১৭৫৩৫৫)।

 

আল্লামা আল যামাখসারী রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় 'তাফসীরে কাশশাফ'-এ বলেন-

وأمّا ما يحكى: أن تلك الزيادة كانت في صحيفة في بيت عائشة رضى الله عنها فأكلتها الداجن فمن تأليفات الملاحدة والروافض

অর্থাৎ এটা যা বলা হয়ে থাকে যে, আয়েশা(রা:) এর বাড়িতে সহীহফাতে কিছু বাড়তি অংশ ছিল যা তার বকরীতে খেয়ে নিয়েছিল,এটা মুলহিদ ও রাফেযীদের (মনগড়া) রচিত কথা(তাফসীরে কাশশাফ লি যামাখসারী- সুরা আহযাব: ৩৩/১-৩ নং আয়াতের তাফসীর)।

 

ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহও আলোচ্য হাদীসের উক্ত বাড়তি অংশের ব্যাপারে বলেন -

فَمِنْ تَأْلِيفِ الْمَلَاحِدَةِ وَالرَّوَافِضِ.

অর্থাৎ আসলে এটা মালাহীদাহ(মুদহিদদের তথা নাস্তিকদের) ও রাওয়াফিযী (রফেযীদের) রচিত (তাফসীরে কুরতুবী - সুরা আহযাব এর তাফসীর-১৪/১১৩)।

 

ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন-

صح نسخ لفظها ، وبقيت الصحيفة التي كتبت فيها - كما قالت عائشة - رضي الله عنها فأكلها الداجن ، ولا حاجة بأحد إليها ، وهكذا القول في آية الرضاعة ولا فرق ، وبرهان هذا : أنهم قد حفظوها كما أوردنا ، فلو كانت مثبتة في القرآن لما منع أكل الداجن للصحيفة من إثباتها في القرآن من حفظهم .

فبيقين ندري أنه لا يختلف مسلمان في أن الله تعالى افترض التبليغ على رسوله صلى الله عليه وسلم ، وأنه عليه الصلاة والسلام قد بلغ كما أمر ... فصح أن الآيات التي ذهبت لو أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم بتبليغها لبلغها ، ولو بلغها لحفظت ، ولو حفظت ما ضرها موته ، كما لم يضر موته عليه السلام كل ما بلغ فقط من القرآن " انتهى من " المحلى " (12/177)

অর্থাৎ এটি প্রমাণিত যে আয়াতটি রহিত করা হয়েছিল। কিন্তু একটা সহীফাতে এটা লেখা ছিল যেমনটি আয়েশা(রা) এর বর্ণনায় রয়েছে- অত:পর একটি বকরীতে সেটা খেয়ে ফেলেছিল, এর প্রতি আগ্রহী হবার কোনো প্রয়োজন নেই। স্তন্যপান করানোর আয়াতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কিছু বলা যেতে পারে এবং উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এটা প্রমাণিত সত্য যে, তারা(সাহাবীরা) কুরআন মুখস্ত করে নিয়েছিল যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি।সুতরাং এটা যদি কুরআনের আয়াত হিসাবে সুনিশ্চিত রূপে প্রমাণিত হতো তবে  ছাগলে খেয়ে ফেলার ঘটনাটি দ্বারা এর উপর কোনো প্রভাবই আপতিত হতো না। কেননা এটা তাদের স্মৃতির সংরক্ষনে থাকত।

 

সুতরাং আমরা নিশ্চিতভাবে এই উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে, কোন দুই জন মুসলমানের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ নেই যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূল(সা:) যে বাণী পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন,তা তিনি(সা) যথাযথ ভাবে পৌছে দিয়েছেন।....আর হারিয়ে যাওয়া(বলে অভিযোগ কৃত) আয়াতগুলোর ব্যাপারে আমরা এই উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে, যদি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো,তাহলে তিনি(সা)  তা অবশ্যয় পৌঁছে দিয়েছেন,আর তিনি যদি তা পৌছে দিতেন তবে তারা(কুরআন হিফয কারী সাহাবীরা) অবশ্যই তা মুখস্ত করে নিতেন, আর যদি তারা এটা মুখস্ত করে নিতেন তবে নাবী(সা) এর ওফাত বরণ করা বিষয়টি সার্বিক ভাবে কোনো প্রভাব ফেলত না(অর্থাৎ তা হারানোর কোনো সম্ভাবনা থাকত না) ঠিক যেমনটি  তার(সা) মৃত্যুতে  কুরআনুল কারীমের অন্য কোনো একটি বিষয়ে বা ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েনি,  যা তিনি পৌঁছে দিয়েছেন (মুহাল্লা-১২/১৭৭, ইসলাম সুওয়াল ওয়া জাওয়াব: আল্লামা মুনাজ্জিদ ফা/১৭৫৩৫৫) 

 

ইমাম কাজী আবী বকর মুহাম্মাদ আল বাকিল্লানী রাহিমাহুল্লাহ কুরআন স্মৃতিতে সংরক্ষনের ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা পেশ করার পর বলেন-

وكيف يجوزُ في العادةِ أن يذهبَ على هؤلاءِ وعلى سائرِ الصحابةِ آيةُ الرضاع والرجمِ فلا يحفظها ويذكرها إلا عائشةُ وحدَها.........فقد بان بجملةِ ما وصفناه من حالِ الرسولِ والصحابةِ أنه لا يجوزُ أن يذهبَ عليهم شيءٌ من كتاب الله تعالى قلَّ أو كَثرُ-(الانتصار للقرآن-1/412-418)

সাধারনত: এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে যে,তাদের(হিফযকারীদের) এবং সমস্ত সাহাবায়ে কেরামগণদের থেকে দুধপান ও রজম সংক্রান্ত আয়াত হারিয়ে যাবে এবং তা আয়েশা(রা) ব্যাতীত কেউ হিফযও করবেন না ও তা  উল্লেখও করবেন না ?......... সুতরাং, আমরা যা বর্ণনা করেছি রাসুল(সা:) ও সাহাবাদের ব্যাপারে (যে রাসুলুল্লাহ(সা) বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিরূপ ভূমিকা পালন করেছেন এবং সাহাবারা কিভাবে এটিকে স্মৃতিতে সংরক্ষন করেছেন) তা দ্বারা সুস্পষ্ট যে, সুমহান আল্লাহর তায়ালার কিতাবের কিছু অংশও হারিয়ে যাওয়া কস্মিনকালেও সম্ভবপর নয়,চাই তা বৃহৎ অংশ হোক বা কিয়দ(ইনতিসার লিল কুরআন- ১/৪১২-৪১৮,ইসলাম সুওয়াল ওয়া জাওয়াব:আল্লামা মুনাজ্জিদ ফা/১৭৫৩৫৫)

 

নসখ এবং মানসুখ কি?

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

مَا نَنۡسَخۡ مِنۡ اٰیَۃٍ اَوۡ نُنۡسِهَا نَاۡتِ بِخَیۡرٍ مِّنۡهَاۤ اَوۡ مِثۡلِهَا ؕ اَلَمۡ تَعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰهَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۰۶

আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (সূরা আল বাকারাহ ২:১০৬)

 

নসখশব্দ দ্বারা বিধি-বিধান দূর করা অর্থাৎ রহিত করা বোঝানো হয়। অর্থাৎ কোনো আয়াতকে যে আয়াত দ্বারা রহিত করা হয় সেই আয়াতকে নসখ বলা হয়। যেমন, দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ (عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ) এই আয়াতটি রহিত বা নসখ হয় পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়।’ ( خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ) দিয়ে। সুতরাং, দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ (عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ) এই আয়াতটি হলো মানসুখ। এবং দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ (عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ) এই আয়াতটি হলো নাসখ।

 

রজমের আয়াত নাসখ হওয়ার দলিল

হাদিসে উল্লেখিত রজমের আয়াতটি বর্ণিত হওয়ার সময়ই রাসুল (সাঃ) তা কুরআনের অংশ হিসেবে লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে এ বিধান সাহাবিদের অন্তরে গেঁথে গেল। সাহাবিরা অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া পর রজমের আয়াতের তিলাওয়াত আল্লাহ রহিত করে দেন। কিন্তু বিধান বহাল রাখেন।

 

কাসির বিন সালত (রহ.) থেকে বর্ণিত, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, “যখন কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা মহিলা ব্যভিচার করে, তাদের উভয়কে রজম কর।”(এটি শুনে) আমর বলেন, “যখন এটি নাজিল হয়েছিল, আমি নবী (সা.)-এর নিকট আসলাম এবং এটি লিপিবদ্ধ করব কিনা তা জানতে চাইলাম। তিনি তা অপছন্দ করলেন। (আল মুসতাদরাক লি হাকিম, হাদিস নং ৮১৮৪) 

 

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، قَالَ رَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمَ أَبُو بَكْرٍ وَرَجَمْتُ وَلَوْلاَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أَزِيدَ فِي كِتَابِ اللَّهِ لَكَتَبْتُهُ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنِّي قَدْ خَشِيتُ أَنْ تَجِيءَ أَقْوَامٌ فَلاَ يَجِدُونَهُ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَكْفُرُونَ بِهِ . قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنْ عَلِيٍّ . قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ عُمَرَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَرُوِيَ مِنْ غَيْرِ وَجْهٍ عَنْ عُمَرَ

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজমের আইন বাস্তবায়ন করেছেন, আবূ বকর (রাঃ)-ও রজমের আইন বাস্তবায়ন করেছেন এবং রজমের আইন আমিও বাস্তবায়ন করছি। আল্লাহ্ তাআলার কিতাবের মধ্যে যদি কোন কিছু যোগ করাকে আমি নিষিদ্ধ মনে না করতাম তবে অবশ্যই এই বিধান মাসহাফে (কুরআনে) লিখে দিতাম। কেননা আমার ভয় হয় যে, পরবর্তী সময়ে মানব জাতির এমন দল আসবে যারা এই হুকুম আল্লাহ্ তাআলার কিতাবে না দেখতে পেয়ে তা অস্বীকার করবে। (সুনান তিরমিযী হা/১৪৩১, ইমাম তিরমিযী রহ হাসান সহীহ বলেছেন, শাইখ আলবানী, শাইখ শুয়াইব অরনাউত, জুবাইয়ের আলী যায় রহ নিজ নিজ তাহকীক সুনান তিরমিযী হা/১৪৩১ হাসান বলেছেন। 

 

উমার (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট গিয়েছিলেন এবং জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে রজমের আয়াতটি লিখে দেওয়া হোক। নবী মুহাম্মাদ (সা.) বললেন,’আমি তা করতে পারব না (সুনানুল কুবরা বাইহাকী ৮/২১১ এবং সুনানুল কুবরা নাসাঈ হাদিস নং ৭১৪৮)

এই হাদিসগুলো থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, রজমের আয়াতের তিলাওয়াত রহিত। এ কারণে এটি কুরআনে নেই। এটি তিলওয়াত হয়না তবে এর বিধান কিয়াতম পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

 

পাঁচ ঢোক দুধপানের আয়াত রহিত হওয়ার দলিল

ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিলঃ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍদশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।তারপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ এর দ্বারা। (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত। (সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) হা/৩৪৬৬)

 

এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে দশবার দুধপান হারাম সাবিত হয় পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এই হাদিস থেকে কোনোভাবেই এটা প্রমাণিত হয় না যে, পাঁচ ঢোক দুধপানের আয়াত কুরআনের অংশ। বরং হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো এবং অন্যন্য হাদিসের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, পাঁচ বার দুধপানের আয়াতও রহিত হয়েছিলো। 

 

এখানে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই হাদিসে তো বলা হয়েছে যে,  (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত। নাসখ হওয়ার পরেও কেন তিলওয়াত হতো? এর মানে কি এই না যে, ঐ আয়াতটি নাসখ হয়নি? 

 

নাসখ হওয়ার পরেও আয়াতটি তিলওয়াত করার কারণ, অনেকেই নাসখ হওয়ার খবর জানতো না। কারণ তৎকালীন যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিলো না। একটা খবর ছড়াতে বহু সময় লাগতো। ফলে না জানার কারণে অনেক লোক রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর পরেও তা তিলাওয়াত করতো। রহিত হওয়ার খবর জানার পর তিলাওয়াত করে বাদ দিয়ে দেয়।

 

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أَنْزَلَ اللهُ مِنْ الْقُرْآنِ ثُمَّ سَقَطَ لَا يُحَرِّمُ إِلَّا عَشْرُ رَضَعَاتٍ أَوْ خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রথমদিকে কুরআনে এই বিধান ছিলো, যা পরে রহিত হয়ে যায়ঃ দশ ঢোক বা পাঁচ ঢোক দুধ পানের কমে নিষিদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। (সুনান ইবনু মাজাহ হা/১৯৪২ ভিন্ন মতন সহীহুল বুখারী হা/১৪৫২, সুনান  নাসায়ী হা/৩৩০৭, ২০৬২, মুয়াত্তা মালেক হা/ ১২৯৩,  সুনান দারেমী ২২৫৩)

 

অতীতে বিধান ছিল দশ বা পাঁচ ঢোকের কম দুধ পান করলে বিবাহ হারাম হয় না। কিন্তু উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী এই বিধান রহিত হয়েছে। অর্থাৎ, এখন পাঁচ ঢোকের কম দুধ পান করলেও বা কোনোভাবে দুধ পেটে গেলেই বিবাহ হারাম হবে। সুতরাং, এই হাদিস দ্বারা পাঁচ ঢোকের বাধ্যবাধকতার বিধানও স্পষ্টভাবে রহিত প্রমাণিত হয়। 

 

এছাড়া ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, পাঁচবারের উপর আমল নেই। দুগ্ধ পান অল্প হোক বা বেশি হোক বিবাহ সম্পর্ক হারাম করবে। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং-১২৬৫)

 عَنْ قَتَادَةَ، قَالَ قُلْتُ لِجَابِرِ بْنِ زَيْدٍ مَا يَقْطَعُ الصَّلاَةَ قَالَ كَانَ ابْنُ عَبَّاسٍ يَقُولُ الْمَرْأَةُ الْحَائِضُ وَالْكَلْبُ . 

মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন বযী’ (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) বলেনঃ আমরা ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ নখয়ীকে দুধপান সম্বন্ধে প্রশ্ন করে লিখেছিলাম। উত্তরে তিনি লিখলেন, ’শুরায়হ আমাদিগকে বর্ণনা করেছেন। আলী (রাঃ) এবং ইবন মাসউদ (রাঃ) বলতেনঃ দুধপান অল্প হোক অথবা অধিক হোক, তা বিবাহ হারাম করে। তার কিতাবে রয়েছে, আবু শাসা মুহারিবী বর্ণনা করেছেন- আয়েশা (রাঃ) তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ অল্প পরিমাণ পান করলে, তা হারাম করে না। (সুনান আন-নাসায়ী (ইফা) হা/৭৫২)

 

পাঁচবার দুধপানের বিধানটি যে একটি মানসুখ বা রহিত বিধান, এ ব্যাপারে স্বয়ং উম্মুল মুমিনিনগণ থেকেও একটি বর্ণনা রয়েছে।

 

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়িশাহ ও উম্মু সালামাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। আবূ হুযাইফাহ ইবনু উতবাহ ইবনু রাবীআহ ইবনু আবদি শাম্‌স সালিমকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে তার সাথে স্বীয় ভাতিজী ওয়ালীদ ইবনু উতবাহ ইবনু রাবীআহর মেয়ে হিন্দাকে বিয়ে দেন। সালিম এক আনসারী মহিলার ক্রীতদাস ছিলো। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদকে পালক পুত্র হিসাবে লালন করেছিলেন। জাহিলী যুগের নিয়ম ছিলো, কেউ কাউকে পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করলে লোকেরা তাকে ঐ ব্যক্তির পুত্র হিসেবে সম্বোধন করতো এবং ঐ লোক মারা গেলে পরিত্যক্ত সম্পদের উত্তরাধিকারীও তাকে করা হতো।

কিন্তু যখন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেনঃ ’’তাদেরকে (পালক পুত্রদেরকে) তাদের (প্রকৃত) পিতার নামে ডাকবে। তারা তোমাদের দীনি ভাই ও বন্ধু’’ (সূরা আহযাবঃ)। অতঃপর তাদের প্রকৃত পিতার নাম ধরেই ডাকা আরম্ভ হয়। আর পিতার সন্ধান না পাওয়া গেলে তাকে বন্ধু ও দীনি ভাই বলে ডাকা হতো। পরবর্তীতে আবূ হুযাইফাহ ইবনু উত্ববাহর স্ত্রী সাহলা সুহাইল ইবনু আমর আল-কুরাইশী আল-আমিরী (রাযি.) এসে বলেন, হে আল্লাহ রাসূল! সালিমকে আমরা আমাদের পুত্র গণ্য করি। সে আমার ও আবূ হুযাইফাহর সাথে একই ঘরে থাকে। আর সে আমাকে একই বস্ত্রের মধ্যে দেখেছে। আল্লাহ যা কিছু অবতীর্ণ করেছেন আপনি তা ভালোভাবে অবহিত। এখন তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দেন?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে তোমার দুধ পান করাও। সুতরাং তিনি তাকে পাঁচ ঢোক দুধ পান করান। তখন থেকে সে তার দুধ পানকারী সন্তান গণ্য হয়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়িশাহ্ (রাঃ) তার ভাগ্নী ও ভাতিজীদেরকে নির্দেশ দিতেন যে, ’আয়িশাহ্ (রাঃ) নিজে যাদেরকে সাক্ষাৎ দান ও যাদের আগমন পছন্দ করতেন, তাদেরকে যেন পাঁচ ঢোক নিজেদের দুধ পান করানো হয়, তাদের বয়স দুধ পানের বয়সের (দুবছরের) বেশী হয়েও। অতঃপর তারা আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে সরাসরি আসতো।

কিন্তু উম্মু সালামাহ (রাযি.) এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ যে কোনো ব্যক্তিকে এরূপ দুধসন্তান বানিয়ে তাদের কাছে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি বর্জন করলেন, যতক্ষণ না শিশু বয়সে দুধ পান করা হয়। তারা আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমাদের জানা নেই, সম্ভবত সালিমের বিষয়ে এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি বিশেষ অনুমোদন ছিলো যা অন্য কারোর জন্য প্রযোজ্য নয়। (সুনান  আবূ দাউদ হা/২০৬১ হাদিস সহীহ আলবানী)

 

পাঁচঢোক দুধপানের আয়াতটি সূরা নিসার ২৩ নাম্বার আয়াত দ্বারাও রহিত হয়, যেখানে দুধপানের বাধ্যবাধকতার কোনো সীমা নেই।

 

حُرِّمَتۡ عَلَیۡكُمۡ اُمَّهٰتُكُمۡ وَ بَنٰتُكُمۡ وَ اَخَوٰتُكُمۡ وَ عَمّٰتُكُمۡ وَ خٰلٰتُكُمۡ وَ بَنٰتُ الۡاَخِ وَ بَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَ اُمَّهٰتُكُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَكُمۡ وَ اَخَوٰتُكُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَ اُمَّهٰتُ نِسَآئِكُمۡ وَ رَبَآئِبُكُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِكُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِكُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِهِنَّ ۫ فَاِنۡ لَّمۡ تَكُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ ۫ وَ حَلَآئِلُ اَبۡنَآئِكُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِكُمۡ ۙ وَ اَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ﴿ۙ۲۳

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা(তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ৪:২৩)

 

সুতরাং, কুরআনের আয়াত ছাগলে খাওয়ার কারণে এটা প্রমাণিত হয় না যে, কুরআন বিকৃত। আর ছাগলে খাওয়া আয়াতগুলো হারিয়ে যায়নি বরং, সেগুলো নাসখ হওয়ার কারণে কুরআনে সংকলন করা হয়নি। 

 

আরো পড়ুনঃ

কুরআনের কিছু আয়াত কি আসলেই বকরীতে খেয়ে ফেলেছিল?

 

আরো দেখুনঃ

"কুরআন সংকলনের ইতিহাস ● কিছু আয়াত কি সংকলনের সময়ে বাদ পড়ে গিয়েছিল ● কুরআনের আয়াত কি ছাগলে খেয়েছিল"

 

 

 

সোশ্যাল লিঙ্ক ও অ্যাপ

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ পোস্টসমূহ