কোনটি আগে সৃষ্টি করা হয়েছে, আকাশ নাকি পৃথিবী?

কোনটি আগে সৃষ্টি করা হয়েছে, আকাশ নাকি পৃথিবী?

23 বার দেখা হয়েছে
শেয়ার করুন:

 

অভিযোগঃ

কুরআন অনুযায়ী পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করা হয়েছে যা বৈজ্ঞানিক ভুল। মহাকাশের উদ্ভবের আগে আলাদা করে পৃথিবীর উদ্ভব হওয়া অসম্ভব।

 

জবাবঃ

আল কুরআনে বলা হয়েছে—

 

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

অর্থঃ “পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনঃসংযোগ করেন, অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।[1]

 

( 27 )   أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ ۚ بَنَاهَا

( 28 )   رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا

( 29 )   وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا

( 30 )   وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا

অর্থঃ "তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন। তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং তিনি ওর রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন এবং ওর জ্যোতি বিনির্গত করেছেন। এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।[2]

 

আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির করতে গিয়ে মুফাসসিরগণ আকাশ ও পৃথিবী কোনটি আগে সৃষ্টি হয়েছে এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন অভিমত প্রদান করেছেন। সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল জাওযি(র.) তাঁর ‘যাদুল মাসির’ তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—

 

وَأَيُّهُمَا أَسْبَقُ فِي الْخَلْقِ: الْأَرْضُ، أَمِ السَّمَاءُ؟ فِيهِ قَوْلَانِ: أَحَدُهُمَا: الْأَرْضُ، قَالَهُ مُجَاهِدٌ. وَالثَّانِي: السَّمَاءُ، قَالَهُ مُقَاتِلٌ. وَاخْتَلَفُوا فِي كَيْفِيَّةِ تَكْمِيلِ خَلْقِ الْأَرْضِ وَمَا فِيهَا،.

অর্থঃ "সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনটি আগেঃ পৃথিবী নাকি আসমান? এ বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে। প্রথম মতটি হলো পৃথিবী [আগে সৃষ্টি হয়েছে], এটি মুজাহিদ (র.)-এর বক্তব্য। দ্বিতীয় মতটি হলো আসমান [আগে সৃষ্টি হয়েছে], এটি মুকাতিল (র.)-এর বক্তব্য। পৃথিবী এবং এর অভ্যন্তরীণ বিষয়াদির সৃষ্টির পূর্ণতা প্রদানের পদ্ধতি নিয়ে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। " [3]

 

আমরা দেখলাম এই প্রসঙ্গে ২টি মত আছে। কোনো কোনো মুফাসসিরের ব্যাখ্যা অনুসারে পৃথিবী আগে সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোনো কোনো মুফাসসিরের ব্যাখ্যা অনুসারে আসমান বা আকাশ আগে সৃষ্টি হয়েছে। তাবিঈ কাতাদাহ(র.) এর অভিমতকে প্রাধান্য দিয়ে প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম কুরতুবী(র.) আকাশ আগে সৃষ্টি হবার অভিমতকে গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেন—

 

وَقَالَ فِي النَّازِعَاتِ:" أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقاً أَمِ السَّماءُ بَناها «٤» " [النازعات: ٢٧] فَوَصَفَ خَلْقَهَا، ثُمَّ قَالَ:" وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذلِكَ دَحاها" [النازعات: ٣٠]. فَكَأَنَّ السَّمَاءَ عَلَى هَذَا خُلِقَتْ قَبْلَ الْأَرْضِ، وَقَالَ تَعَالَى" الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّماواتِ وَالْأَرْضَ «٥» " [الانعام: ١] وَهَذَا قَوْلُ قَتَادَةَ: إِنَّ السَّمَاءَ خُلِقَتْ أَوَّلًا، حَكَاهُ عَنْهُ الطَّبَرِيُّ.

...

قُلْتُ: وَقَوْلُ قَتَادَةَ يَخْرُجُ عَلَى وَجْهٍ صَحِيحٍ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى، وَهُوَ أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ أَوَّلًا دُخَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ خَلَقَ الْأَرْضَ، ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَسَوَّاهَا، ثُمَّ دَحَا الْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ.

অর্থঃ “আল্লাহ তা’আলা সুরা নাযিয়াতে বলেছেনঃ " তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন" [নাযিয়াত: ২৭]। এখানে তিনি আসমান সৃষ্টির বিবরণ দিয়েছেন; অতঃপর বলেছেনঃ "এবং পৃথিবীকে এর পরে বিস্তৃত করেছেন" [নাযিয়াত: ৩০]। এই বর্ণনা অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, আসমান পৃথিবীর আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান আল্লাহ আরও বলেছেনঃ "সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন" [আনআম: ১]। এটিই কাতাদাহ (র.)-এর অভিমত যে, আসমান আগে সৃষ্টি করা হয়েছে; ইমাম তাবারী (র.) তাঁর থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।

...

আমি (ইমাম কুরতুবী) বলছিঃ কাতাদাহ (র.)-এর বক্তব্যটি ইন শা আল্লাহ একটি সঠিক ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব। আর তা হলো—আল্লাহ তাআলা প্রথমে আসমানের ধোঁয়া সৃষ্টি করেছেন, তারপর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; এরপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন যখন তা ধোঁয়া অবস্থায় ছিল এবং সেটিকে সুবিন্যস্ত করলেন। এরপর তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত (বসবাসযোগ্য) করেছেন।[4]

 

ইমাম ওয়াহিদি(র.) [মৃত্যু ১০৭৬ খ্রি.] সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন—

 

وَالْآيَةُ لَا تَدُلُّ عَلَى أَنَّهُ خَلَقَ السَّمَاءَ بَعْدَ الْأَرْضِ، إِنَّمَا تَدُلُّ عَلَى أَنَّهُ جَعَلَهَا سَبْعًا بَعْدَ مَا خَلَقَ الْأَرْضَ، وَقَدْ كَانَتِ السَّمَاءُ قَبْلَ ذَلِكَ مَخْلُوقَةً، كَمَا قَالَ أَهْلُ التَّفْسِيرِ: إِنَّهَا كَانَتْ قَبْلُ دُخَانًا.

অর্থঃ "আর এই আয়াতটি এটি প্রমাণ করে না যে, তিনি পৃথিবী সৃষ্টির পর আসমান সৃষ্টি করেছেন; বরং এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী সৃষ্টির পর তিনি আসমানকে সাত আসমানে রূপান্তর করেছেন। অথচ আসমান তার আগেই সৃষ্টি করা হয়েছিল, যেমনটি মুফাসসিরগণ বলেছেন যে—তা আগে থেকেই ধোঁয়া আকারে ছিল।" [5]

 

বিশিষ্ট মুফাসসির সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে,

 

আল্লাহ্ তা'আলা যমীনকে আসমানের আগেই সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার মধ্যে খাবার জাতীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেটাকে আসমান সৃষ্টির পূর্বে প্রসারিত ও সামঞ্জস্যবিধান করেননি। তারপর তিনি আকাশের প্রতি মনোযোগী হয়ে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেন। তারপর তিনি যমীনকে সুন্দরভাবে প্রসারিত ও বিস্তৃত করেছেন।[6]

 

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস(রা.) এর এই অভিমতটি ব্যাপকভাবে প্রাচীন মুফাসসিরগণ গ্রহণ করেছেন।

সুরা বাকারাহর ২৯নং আয়াতের তাফসির করতে গিয়ে তাহির বিন আশুর(র.) উল্লেখ করেছেন -

 

فَأَمَّا هَذِهِ الْآيَةُ فَإِنَّهُ إِذَا كَانَتِ السَّمَاوَاتُ مُتَأَخِّرًا خَلْقُهَا عَنْ خَلْقِ الْأَرْضِ فَثُمَّ لِلتَّرَاخِي الرُّتْبِيِّ لَا مَحَالَةَ مَعَ التَّرَاخِي الزَّمَنِيِّ وَإِنْ كَانَ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ سَابِقًا فَثُمَّ لِلتَّرْتِيبِ الرُّتْبِيِّ لَا غَيْرَ. وَالظَّاهِرُ هُوَ الثَّانِي. وَقَدْ جَرَى اخْتِلَافٌ بَيْنَ عُلَمَاءِ السَّلَفِ فِي مُقْتَضَى الْأَخْبَارِ الْوَارِدَةِ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَقَالَ الْجُمْهُورُ مِنْهُمْ مُجَاهِدٌ وَالْحَسَنُ وَنُسِبَ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ إِنَّ خَلْقَ الْأَرْضِ مُتَقَدِّمٌ عَلَى خَلْقِ السَّمَاءِ لِقَوْلِهِ تَعَالَى هُنَا: ثُمَّ اسْتَوى إِلَى السَّماءِ وَقَوْلِهِ فِي سُورَةِ حم السَّجْدَة [٩- ١١] : قُلْ أَإِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ إِلَى أَنْ قَالَ: ثُمَّ اسْتَوى إِلَى السَّماءِ وَهِيَ دُخانٌ. وَقَالَ قَتَادَةُ وَالسُّدِّيُّ وَمُقَاتِلٌ إِنْ خَلْقَ السَّمَاءَ مُتَقَدِّمٌ وَاحْتَجُّوا بِقَوْلِهِ تَعَالَى: بَناها رَفَعَ سَمْكَها فَسَوَّاها إِلَى قَوْلِهِ: وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذلِكَ دَحاها [النازعات: ٢٧- ٣٠] . وَقَدْ أُجِيبَ بِأَنَّ الْأَرْضَ خُلِقَتْ أَوَّلًا ثُمَّ خُلِقَتِ السَّمَاءُ ثُمَّ دُحِيَتِ الْأَرْضُ فَالْمُتَأَخِّرُ عَنْ خَلْقِ السَّمَاءِ هُوَ دَحْوُ الْأَرْضِ، عَلَى مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ عُلَمَاءُ طَبَقَاتِ الْأَرْضِ مِنْ أَنَّ الْأَرْضَ كَانَتْ فِي غَايَةِ الْحَرَارَةِ ثُمَّ أَخَذَتْ تَبْرُدُ حَتَّى جَمَدَتْ وَتَكَوَّنَتْ مِنْهَا قِشْرَةٌ جَامِدَةٌ ثُمَّ تَشَقَّقَتْ وَتَفَجَّرَتْ وَهَبَطَتْ مِنْهَا أَقْسَامٌ وَعَلَتْ أَقْسَامٌ بِالضَّغْطِ إِلَّا أَنَّ عُلَمَاءَ طَبَقَاتِ الْأَرْضِ يُقَدِّرُونَ لِحُصُولِ ذَلِكَ أَزْمِنَةً مُتَنَاهِيَةَ الطُّولِ وَقُدْرَةُ اللَّهِ صَالِحَةٌ لِإِحْدَاثِ مَا يَحْصُلُ بِهِ ذَلِكَ التَّقَلُّبُ فِي أَمَدٍ قَلِيلٍ بِمُقَارَنَةِ حَوَادِثِ تَعَجُّلِ انْقِلَابِ الْمَخْلُوقَاتِ عَمَّا هِيَ عَلَيْهِ.

وَأَرْجَحُ الْقَوْلَيْنِ هُوَ أَنَّ السَّمَاءَ خُلِقَتْ قَبْلَ الْأَرْضِ لِأَنَّ لَفْظَ بَعْدَ ذلِكَ أَظْهَرُ فِي إِفَادَةِ التَّأَخُّرِ مِنْ قَوْلِهِ: ثُمَّ اسْتَوى إِلَى السَّماءِ

অর্থঃ “আর এই আয়াতের ক্ষেত্রে বক্তব্য হলো, যদি আসমানসমূহ সৃষ্টি করার কাজ পৃথিবী সৃষ্টির পরে হয়ে থাকে, তবে এখানে ‘ছুম্মা’ (তারপর) শব্দটি অবশ্যই সময়ের বিলম্ব এবং মর্যাদাগত ক্রম উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। আর যদি আসমান আগে সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল মর্যাদাগত ক্রম বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর দ্বিতীয় মতটিই (আসমান আগে সৃষ্টি হওয়া) অধিক স্পষ্ট।

 

আসমান ও জমিন সৃষ্টির ব্যাপারে বর্ণিত বর্ণনাগুলোর মর্মার্থ নিয়ে পূর্বসূরী আলেমদের (সালাফ) মধ্যে মতভেদ রয়েছে। জুমহুর উলামায়ে কেরাম, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুজাহিদ, হাসান বসরী এবং ইবনে আব্বাস (রা.)-এর দিকেও মতটি নিসবত করা হয়—তাঁরা বলেন যে, পৃথিবী সৃষ্টি আসমান সৃষ্টির আগে হয়েছে। এর স্বপক্ষে তাঁরা আল্লাহর এই বাণী পেশ করেনঃ ‘অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন’ এবং সুরা  হা-মীম আস-সাজদাহর [৯-১১] আয়াতঃ ‘বলুন, তোমরা কি সেই সত্তাকে অস্বীকার করছ যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন... অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন যখন তা ছিল ধূম্রকুঞ্জ।’ অন্যদিকে কাতাদাহ, সুদ্দী এবং মুকাতিল বলেন যে, আসমান সৃষ্টি আগে হয়েছে। তাঁরা দলিল হিসেবে আল্লাহর এই বাণী পেশ করেনঃ ‘তিনিই এটা [আসমান] নির্মাণ করেছেন। তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং তিনি ওর রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন এবং ওর জ্যোতি বিনির্গত করেছেন। এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।[আন-নাযিয়াত: ২৭-৩০]।

 

এর জবাবে বলা হয়েছে যে, পৃথিবী প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে, তারপর আসমান সৃষ্টি করা হয়েছে, আর এরপর পৃথিবীকে বিস্তৃত (দাহওয়াহ) করা হয়েছে। সুতরাং আসমান সৃষ্টির পরে যা ঘটেছে তা হলো পৃথিবীর বিস্তৃতি। এটি ভূতত্ত্ববিদদের (Geologists) মতের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, পৃথিবী প্রথমে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ছিল, তারপর শীতল হতে শুরু করে এবং জমে গিয়ে শক্ত ভূত্বক তৈরি হয়। এরপর চাপের ফলে তা ফেটে যায়, কিছু অংশ ধসে পড়ে আর কিছু অংশ উপরে উঠে আসে। তবে ভূতত্ত্ববিদরা এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য সুদীর্ঘ সময়ের ধারণা দেন, অথচ আল্লাহর কুদরত এমন যে তিনি সৃষ্টির এই পরিবর্তনগুলো অতি অল্প সময়েও ঘটাতে সক্ষম।

 

তবে দুই মতের মধ্যে অধিকতর শক্তিশালী মত হলো—আসমান পৃথিবীর আগে সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ‘বা’দা যালিকা’ (এর পরে) শব্দটি ‘ছুম্মাসতাওয়া ইলাস সামা’ (অতঃপর আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন) বাক্যের তুলনায় পরবর্তী সময়কাল বোঝাতে অধিকতর স্পষ্ট।[7]

 

এখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে জমহুর উলামা পৃথিবী আগে সৃষ্টি হবার অভিমত গ্রহণ করেছেন। তবে উভয় মতের মধ্যে আকাশ আগে সৃষ্টি হবার মতটিই অধিক স্পষ্ট এবং এটিই শক্তিশালী মত। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি(র.) তাঁর তাফসিরে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং তিনিও অনুরূপ অভিমত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন—

 

الْمَسْأَلَةُ الثَّالِثَةُ: قَالَ بَعْضُ الْمُلْحِدَةِ: هَذِهِ الْآيَةُ تَدُلُّ عَلَى أَنَّ خَلْقَ الْأَرْضِ قَبْلَ خَلْقِ السَّمَاءِ، وَكَذَا قَوْلُهُ:

﴿أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ﴾ إِلَى قَوْلِهِ تَعَالَى: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ﴾ [فُصِّلَتْ: ٩–١١]،

وَقَالَ فِي سُورَةِ النَّازِعَاتِ:

﴿أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا ۝ رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا ۝ وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا ۝ وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا﴾

[النَّازِعَاتِ: ٢٧–٣٠]،

وَهَذَا يَقْتَضِي أَنْ يَكُونَ خَلْقُ الْأَرْضِ بَعْدَ السَّمَاءِ.

وَذَكَرَ الْعُلَمَاءُ فِي الْجَوَابِ عَنْهُ وُجُوهًا:

أَحَدُهَا: يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ خَلْقُ الْأَرْضِ قَبْلَ خَلْقِ السَّمَاءِ، إِلَّا أَنَّهُ مَا دَحَاهَا حَتَّى خَلَقَ السَّمَاءَ؛ لِأَنَّ التَّدْحِيَةَ هِيَ الْبَسْطُ.

وَلِقَائِلٍ أَنْ يَقُولَ: هَذَا أَمْرٌ مُشْكِلٌ مِنْ وَجْهَيْنِ:

الْأَوَّلُ: أَنَّ الْأَرْضَ جِسْمٌ عَظِيمٌ، فَامْتَنَعَ انْفِكَاكُ خَلْقِهَا عَنِ التَّدْحِيَةِ، وَإِذَا كَانَتِ التَّدْحِيَةُ مُتَأَخِّرَةً عَنْ خَلْقِ السَّمَاءِ، كَانَ خَلْقُهَا أَيْضًا لَا مَحَالَةَ مُتَأَخِّرًا عَنْ خَلْقِ السَّمَاءِ.

الثَّانِي: أَنَّ قَوْلَهُ تَعَالَى:

﴿خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ﴾

يَدُلُّ عَلَى أَنَّ خَلْقَ الْأَرْضِ وَخَلْقَ كُلِّ مَا فِيهَا مُتَقَدِّمٌ عَلَى خَلْقِ السَّمَاءِ، لَكِنَّ خَلْقَ الْأَشْيَاءِ فِي الْأَرْضِ لَا يُمْكِنُ إِلَّا إِذَا كَانَتْ مَدْحُوَّةً، فَهَذِهِ الْآيَةُ تَقْتَضِي تَقَدُّمَ كَوْنِهَا مَدْحُوَّةً قَبْلَ خَلْقِ السَّمَاءِ، وَحِينَئِذٍ يَتَحَقَّقُ التَّنَاقُضُ.

وَالْجَوَابُ: أَنَّ قَوْلَهُ تَعَالَى:

﴿وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا﴾ [النَّازِعَاتِ: ٣٠]

يَقْتَضِي تَقْدِيمَ خَلْقِ السَّمَاءِ عَلَى الْأَرْضِ، وَلَا يَقْتَضِي أَنْ تَكُونَ تَسْوِيَةُ السَّمَاءِ مُقَدَّمَةً عَلَى خَلْقِ الْأَرْضِ، وَعَلَى هَذَا التَّقْدِيرِ يَزُولُ التَّنَاقُضُ.

وَلِقَائِلٍ أَنْ يَقُولَ: قَوْلُهُ تَعَالَى:

﴿أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا﴾

[النَّازِعَاتِ: ٢٧–٢٨]

يَقْتَضِي أَنْ يَكُونَ خَلْقُ السَّمَاءِ وَتَسْوِيَتُهَا مُقَدَّمًا عَلَى تَدْحِيَةِ الْأَرْضِ، وَلَكِنَّ تَدْحِيَةَ الْأَرْضِ مُلَازِمَةٌ لِخَلْقِ ذَاتِ الْأَرْضِ، فَإِنَّ ذَاتَ السَّمَاءِ وَتَسْوِيَتَهَا مُتَقَدِّمَةٌ عَلَى ذَاتِ الْأَرْضِ، وَحِينَئِذٍ يَعُودُ السُّؤَالُ.

وَثَالِثُهَا — وَهُوَ الْجَوَابُ الصَّحِيحُ — أَنَّ قَوْلَهُ: «ثُمَّ» لَيْسَ لِلتَّرْتِيبِ هَاهُنَا، وَإِنَّمَا هُوَ عَلَى جِهَةِ تَعْدِيدِ النِّعَمِ، مِثَالُهُ قَوْلُ الرَّجُلِ لِغَيْرِهِ:

أَلَيْسَ قَدْ أَعْطَيْتُكَ النِّعَمَ الْعَظِيمَةَ، ثُمَّ رَفَعْتُ قَدْرَكَ، ثُمَّ دَفَعْتُ الْخُصُومَ عَنْكَ؟

وَلَعَلَّ بَعْضَ مَا أُخِّرَ فِي الذِّكْرِ قَدْ تَقَدَّمَ، فَكَذَلِكَ هَاهُنَا.

وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

অর্থঃ “তৃতীয় মাসয়ালাঃ

কিছু নাস্তিক বলে যে, এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে আসমান সৃষ্টির আগে পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে। অনুরূপভাবে আল্লাহর বাণী—

তোমরা কি সেই সত্তার সঙ্গে কুফর করবে, যিনি দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন—এরপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন” [ফুসসিলাত: ৯–১১]—এর দ্বারাও তারা এ কথা দাবি করে।

আর সুরা  নাযিয়াতে তিনি বলেনঃ

তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন। তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং তিনি ওর রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন এবং ওর জ্যোতি বিনির্গত করেছেন। এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।[নাযিয়াত: ২৭–৩০]।

আর এটি দাবি করে (বা এর অর্থ দাঁড়ায়) যে, পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে আকাশ সৃষ্টির পরে।

এ বিষয়ে আলেমগণ কয়েকটি জবাব উল্লেখ করেছেন—

প্রথমতঃ সম্ভব যে, পৃথিবীর সৃষ্টি আসমানের সৃষ্টির আগেই হয়েছে; তবে আসমান সৃষ্টি না করা পর্যন্ত তিনি পৃথিবীকে দাহ্‌ও (বিস্তার/প্রসারণ) করেননি। কারণ তাদহিয়া অর্থ বিস্তার করা। কিন্তু কেউ বলতে পারে—এতে দুই দিক থেকে সমস্যা আছেঃ

(১) পৃথিবী একটি বিরাট পিণ্ড; তাই এর সৃষ্টি হওয়াটা এর বিস্তৃতি থেকে আলাদা করা অসম্ভব (অর্থাৎ সৃষ্টি হলেই তা কোনো একটা আকার বা বিস্তৃতি নিয়ে থাকবে)। তবে পৃথিবীর সৃষ্টি অনিবার্যভাবে আসমান সৃষ্টির পরেই হতে হবে।

(২) আল্লাহর বাণী—"তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন"—এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী এবং এর ভেতরের সব কিছু সৃষ্টি করা আসমান সৃষ্টির আগে হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ভেতরের বস্তুসমূহ (গাছপালা, খনিজ ইত্যাদি) সৃষ্টি করা তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী বিস্তৃত থাকবে। ফলে এই আয়াতটি আসমান সৃষ্টির আগেই পৃথিবীর বিস্তৃতিকে আবশ্যক করে দেয়। আর এখানেই বৈপরিত্য বা বৈসাদৃশ্য দেখা দেয়।

এর জবাবঃ আল্লাহর বাণী— “এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।” [নাযিয়াত: ৩০]—এটি আসমান সৃষ্টিকে পৃথিবীর আগে হওয়া বোঝায়; কিন্তু এটি আবশ্যক করে না যে আসমানের সুবিন্যাস (তাসওয়া) পৃথিবী সৃষ্টির আগেই হয়েছে। এভাবে ধরলে বিরোধ দূর হয়।

আর তবে কেউ বলতে পারেনঃ সুরা নাজিয়াতের আয়াতসমূহ আসমানের নির্মাণ ও সুবিন্যস্ত করাকে পৃথিবীর বিস্তৃতির আগে হওয়াকে আবশ্যক করে। আর যেহেতু পৃথিবীর বিস্তৃতি পৃথিবীর অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য, তাই আসমানের অস্তিত্ব ও বিন্যাস পৃথিবীর অস্তিত্বের আগে প্রমাণিত হয়। ফলে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে।

 

তৃতীয় জবাব— আর এটাই সঠিক জবাবঃ এখানে (বাকারাহর ২৯ নং আয়াতে ও ফুসসিলাতের ১১ নং আয়াতে) «ثُمَّ» (অতঃপর) শব্দটি পর্যায়ক্রমিক ধারা বা ক্রম বোঝানোর জন্য আসেনি; বরং এটি নেয়ামতসমূহ গণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপঃ একজন মানুষ অন্যজনকে বলল, "আমি কি তোমাকে বিশাল নেয়ামত দেইনি? অতঃপর (ثُمَّ) আমি তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি, অতঃপর (ثُمَّ) আমি তোমার থেকে শত্রুদের তাড়িয়েছি।" এখানে বর্ণনায় যা পরে আনা হয়েছে, বাস্তবে তা আগে ঘটে থাকতে পারে। এখানেও (কুরআনের বর্ণনাতে) বিষয়টি তেমনই। আর আল্লাহই ভালো জানেন।[8]

 

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি(র.) এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে এই ব্যাপারে সকল প্রকার প্রশ্নের উত্তর প্রদান এবং সংশয় দূর করার প্রয়াস পেয়েছেন।

আলোচনার শেষাংশে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আর তা হল, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের শুরুতে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টির উল্লেখ আছে, এরপর ثُمَّ (ছুম্মা) শব্দটি ব্যবহার করে সপ্তাকাশ বিন্যাসের উল্লেখ আছে। ثُمَّ (ছুম্মা) শব্দটিকে সাধারণভাবে অর্থ করা হয়ঃ অতঃপর/তারপর। কাজেই এ থেকে মনে হয় পৃথিবীকে আকাশের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার সুরা নাযিয়াতের ২৭-৩০ নং আয়াতের বর্ণনা থেকে পৃথিবীর পূর্বে আকাশ সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারটি বঝা যায়। এখানে কি তবে পরস্পরবিরোধিতা আছে?

 

ইমাম রাযি(র.) এখানে আরবি ভাষার একটি ব্যবহার উল্লেখ করে এই প্রশ্ন বা সংশয়ের জবাব দিয়েছেন। আরবিতে ثُمَّ (ছুম্মা) শব্দটি দ্বারা সব সময়ে ক্রম বোঝায় না বা “অতঃপর” অর্থ বোঝায় না। অনেক সময়ে গণনা বা সংযোগ বোঝাতেও এই শব্দটি ব্যবহার হয়। আল কুরআনের অন্যত্র এমন আরো স্থান আছে যেসব স্থানে ثُمَّ (ছুম্মা) শব্দটিকে ক্রম হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। যেমন, আল কুরআনের সুরা বাকারাহর ১৯৮ নং আয়াতের পরের আয়াতটি ‘ছুম্মা’ দ্বারা শুরু হয়েছে। —

 

( 198 )   لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ ۚ فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ ۖ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ

( 199 )   ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অর্থঃ “ তোমরা স্বীয় রবের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করলে তাতে তোমাদের পক্ষে কোন অপরাধ নেই; অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত হতে প্রত্যাবর্তিত হও তখন পবিত্র স্মৃতি-স্থানের নিকট আল্লাহকে স্মরণ কর; এবং তিনি তোমাদেরকে যেরূপ নির্দেশ দিয়েছেন তদ্রুপ তাঁকে স্মরণ কর; এবং নিশ্চয়ই তোমরা এর পূর্বে বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।

অতঃপর (ثُمَّ) অন্যান্যরা যেখান হতে প্রত্যাবর্তন করে তোমরাও প্রত্যাবর্তন কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।[9]

 

আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির কুরতুবীতে উল্লেখ করা হয়েছে—

 

و" ثم" لَيْسَتْ فِي هَذِهِ الْآيَةِ لِلتَّرْتِيبِ وَإِنَّمَا هِيَ لِعَطْفِ جُمْلَةِ كَلَامٍ هِيَ مِنْهَا مُنْقَطِعَةٌ

অর্থঃ “আর এই (১৯৯ নং) আয়াতে ثُمَّ (ছুম্মা) ক্রম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি এমন একটি বাক্যাংশকে সংযুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে যা তার থেকে বিচ্ছিন্ন।[10]

 

প্রসিদ্ধ আরবি ভাষাবিদ ও অভিধানবিদগণও এটি উল্লেখ করেছেন। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ইয়াহইয়া বিন যিয়াদ আল ফাররা(র.) বলেন—

 

وَقَدْ تَسْتَأْنِفُ الْعَرَبُ بِـثُمَّ وَالْفِعْلُ الَّذِي بَعْدَهَا قَدْ مَضَى قَبْلَ الْفِعْلِ الْأَوَّلِ مِنْ ذَلِكَ أَنْ تَقُولَ لِلرَّجُلِ: قَدْ أَعْطَيْتُكَ أَلْفًا ثُمَّ أَعْطَيْتُكَ قَبْلَ ذَلِكَ مَالًا فَتَكُونُ "ثُمَّ" عَطْفًا عَلَى خَبَرِ الْمُخْبِرِ كَأَنَّهُ قَالَ: أُخْبِرُكَ أَنِّي زُرْتُكَ الْيَوْمَ، ثُمَّ أُخْبِرُكَ أَنِّي زُرْتُكَ أَمْسِ

অর্থঃ “আরবরা কখনো কখনো ‘ثمَّ’ (ছুম্মা) শব্দ দিয়ে নতুন বাক্য শুরু করে। যদিও তার পরে যে ক্রিয়াটি আসে তা প্রথম ক্রিয়ার আগেই ঘটে থাকে। এর উদাহরণ হলো—আপনি কোনো ব্যক্তিকে বলতে পারেনঃ

আমি তোমাকে এক হাজার (টাকা) দিয়েছি, ছুম্মা (ثمَّ) এর আগে তোমাকে আরও কিছু অর্থ দিয়েছিলাম।”

এ ক্ষেত্রে ‘ثمَّ’ (ছুম্মা) বর্ণনাকারীর সংবাদ বা বক্তব্যের উপর ‘আত্‌ফ’ (সংযোগ) হিসেবে আসে। যেন বক্তা বলছেঃ

আমি তোমাকে জানাচ্ছি যে আমি আজ তোমার কাছে এসেছিলাম, ছুম্মা (এবং) তোমাকে জানাচ্ছি যে আমি গতকাল তোমার কাছে এসেছিলাম।”[11]

 

বিশিষ্ট আরবি ব্যাকরণবিদ সিবাওয়াইহি (র.) বলেছেনঃ

 

فَمِنْ ثَمَّ كَانَ حَدُّ اللَّفْظِ أَنْ يَكُونَ فِيهِ مُقَدَّمًا، وَهُوَ عَرَبِيٌّ جَيِّدٌ كَثِيرٌ، كَأَنَّهُمْ إِنَّمَا يُقَدِّمُونَ الَّذِي بَيَانُهُ أَهَمُّ لَهُمْ وَهُمْ بِبَيَانِهِ أَغْنَى، وَإِنْ كَانَا جَمِيعًا يُهِمَّانِهِمْ وَيَعْنِيَانِهِمْ.

অর্থঃ "সুতরাং 'ছুম্মা' শব্দটি ব্যবহারের সীমা হলো এতে একটি অংশকে আগে উল্লেখ করা হয়। আর এটি আরবি ভাষার একটি উৎকৃষ্ট ও বহুল ব্যবহৃত বৈশিষ্ট্য যেন তারা কেবল সেই বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসেন যার ব্যাখ্যা তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং যা স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে তারা বেশি মনোযোগী, যদিও উভয় বিষয়ই তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকে।" [12]

 

উপসংহারঃ

আকাশ বা পৃথিবী কোনটি আগে সৃষ্টি হয়েছে তথা কোনটির উদ্ভব আগে হয়েছে এই প্রসঙ্গে আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের মধ্যে একাধিক মত দেখা দিয়েছে। অনেক মুফাসসিরের মতে পৃথিবী আগে এবং আকাশ পরে সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেক মুফাসসিরের মতে আকাশ আগে এবং পৃথিবী পরে সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ইখতিলাফী বা মতপার্থক্যপূর্ণ। প্রচলিত বিজ্ঞানের সঙ্গে কুরআনকে যে কোনো উপায়ে মেলানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা উপসংহারে এটুকুই বলব যে, আকাশ বা পৃথিবী কোনটি আগে সৃষ্টি হয়েছে এটি ইসলামী মৌলিক আকিদার কোনো বিষয় নয় এবং এটি দুনিয়াবী সৃষ্টি সংক্রান্ত একটি বিষয়; এই প্রসঙ্গে উভয় প্রকার মতই এসেছে এবং এর যে কোনো উপায়েই কুরআনের অর্থ গ্রহণ করার অবকাশ আছে। কেউ যদি একটি অভিমতকে টেনে এনে দাবি করতে চায়ঃ “এটিই চূড়ান্ত মত এবং কুরআনের মাঝে বৈজ্ঞানিক ভুল আছে!” – তাহলে তা মোটেও সঠিক কথা হবে না।

 

 

তথ্যসূত্রঃ


[1] আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ২৯

[2] আল কুরআন, নাযিয়াত ৭৯ : ২৭-৩০

[3] যাদুল মাসিরি ফি ইলমিত তাফসির - ইবনুল জাওযি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/23619/42

[4] তাফসির কুরতুবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৫-২৫৬, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/20855/261

https://shamela.ws/book/20855/262

[5] তাফসির বাসিত - আলি বিন আহমাদ আল ওয়াহিদি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০১-৩০২, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/13231/852

https://shamela.ws/book/13231/853  

[6] কুরআনুল কারীম (বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির), ড.আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ১ম খণ্ড, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসি্র পৃষ্ঠা ৫৪

[7] তাফসির ইবন আশুর (আত তাহরির ওয়াত তানওয়ির) – তাহির বিন আশুর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৪, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/9776/414  

[8] তাফসির কাবির (তাফসির রাযি) – ফখরুদ্দিন রাযি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮০-৩৮১, সুরা বাকারাহর ২৯ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/23635/357

https://shamela.ws/book/23635/358

[9] আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ১৯৯

[10] তাফসির আল জামি’ লি আহকামিল কুরআন – আবু আব্দুল্লাহ আল কুরতুবী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২৭

https://shamela.ws/book/20855/899

অথবা https://archive.is/wip/XRnbv (আর্কাইভকৃত)

[11] মা’আনিল কুরআন - ইয়াহইয়া বিন যিয়াদ আল ফাররা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৬

https://shamela.ws/book/23634/409

অথবা https://archive.is/wip/2FAnW (আর্কাইভকৃত)

[12] আল কিতাব – সিবাওয়াইহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪

https://shamela.ws/book/23018/32

 

সোশ্যাল লিঙ্ক ও অ্যাপ

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ পোস্টসমূহ