বনী ইস্রাঈলের পাপের পর থেকে কি খাদ্যে বা মাংসে পচন ধরা শুরু হয়?

বনী ইস্রাঈলের পাপের পর থেকে কি খাদ্যে বা মাংসে পচন ধরা শুরু হয়?

শেয়ার করুন:

 

অভিযোগঃ

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীতে রান্না করা খাদ্য বা মাংসে পচন ধরা শুরু হয় বনী ইস্রাঈলের পাপের পর থেকে, যখন তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে সেগুলো অতিরিক্ত সময় জমিয়ে রেখেছিল। এর আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে মাংস পচন ধরতো না বা নষ্ট হতো না। অথচ এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। কারণ ইস্রাঈলী বা ইহুদি জাতির আবির্ভাবের বহু পূর্ব থেকে পৃথিবীতে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ইত্যাদি অণুজীবের অস্তিত্ব ছিল। রান্নার পর খাবার যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ রাখা হয়, তখন আর্দ্রতা ও পুষ্টির সদ্ব্যবহার করে এই অণুজীবগুলো অতি দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এদের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার কারণে খাবারে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে মাংসের প্রোটিন ও চর্বি ভেঙে গিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস, বিষাক্ত টক্সিন এবং অম্ল তৈরি হয়, যা খাবারকে সম্পূর্ণ নষ্ট ও খাওয়ার অযোগ্য করে তোলে। বনী ইস্রাঈল বা কোনো জাতির পাপ কাজের পর থেকে মাংস পচে না বরং এসবের বহু আগ থেকে এই প্রক্রিয়া ঘটে আসছে।

ইসলামের এই দাবি ইহুদিবিদ্বেষী এক দাবি। ইসলাম এমন দাবি করে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ উস্কে দেয়।

 

জবাবঃ

অভিযোগকারীরা তাদের দাবির স্বপক্ষে নিম্নের হাদিসগুলো উল্লেখ করে—

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَحْوَهُ يَعْنِي ‏ "‏ لَوْلاَ بَنُو إِسْرَائِيلَ لَمْ يَخْنَزِ اللَّحْمُ، وَلَوْلاَ حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَى زَوْجَهَا ‏"‏‏.‏

অর্থঃ “আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী() থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। অর্থাৎ নবী() বলেছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে মাংস দুর্গন্ধযুক্ত হতো না। আর যদি হাওয়া (আ.) না হতেন তবে কোন নারীই তাঁর স্বামীর খেয়ানত করত না।[1]

 

عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، قَالَ هَذَا مَا حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ لَوْلاَ بَنُو إِسْرَائِيلَ لَمْ يَخْبُثِ الطَّعَامُ وَلَمْ يَخْنَزِ اللَّحْمُ وَلَوْلاَ حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَى زَوْجَهَا الدَّهْرَ ‏"‏ ‏.

অর্থঃ "হাম্মাদ ইবনু মুনাব্বিহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ হল রসূলুল্লাহ() হতে আমাদের কাছে আবূ হুরায়রাহ্ (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদীস। তিনি অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। তার মাঝে অন্যতম ..... রসূলুল্লাহ() আরো বলেছেনঃ বানূ ইসরাঈলীরা না হলে খাদ্য নষ্ট হত না এবং মাংস বিকৃত দুৰ্গন্ধযুক্ত হত না এবং হাওয়া (আঃ) না হলে যুগ যুগান্তরে কোন নারী তার স্বামীর বিশ্বাস ভঙ্গ করত না।" [2]

 

এর প্রেক্ষাপট হিসেবে আল কুরআনের সুরা বাকারাহর ৫৭ নং আয়াত উল্লেখ করা যায়।

 

وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَىٰ ۖ كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ ۖ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَٰكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

অর্থঃ “আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করলাম, তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করলাম, (আর বললাম) তোমাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে বৈধ বস্তুগুলো খাও, আর মূলত তারা আমার প্রতি কোন যুলম করেনি, বরং তারা নিজেদের প্রতিই যুলম করেছিল।[3]

 

এর তাফসিরে ইস্রাঈলী রেওয়ায়েতের মাধ্যমে মুফাসসিরগণ বিশদ আলোচনা করেছেন। তাফসির ইবন কাসিরে উল্লেখ আছেঃ

 

“ ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’যে মান্না, তাদেরকে দেয়া হতো তা গাছের উপর অবতারণ করা হতো। তারা সকালে গিয়ে তা জমা করতো এবং ইচ্ছে মত খেয়ে নিতো। ওটা আঠা জাতীয় জিনিস ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, শিশিরের সঙ্গে ওর সাদৃশ্য ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, শিলার মত মান্না তাদের ঘরে নেমে আসতো, যা দুধের চেয়ে সাদা ও মধু অপেক্ষা বেশী মিষ্ট ছিল। সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অবতারিত হতে থাকতো। প্রত্যেক লোক তার বাড়ীর জন্যে ঐ পরিমাণ নিয়ে নিতো যা ঐ দিনের জন্যে যথেষ্ট হতো। কেউ বেশী নিলে তা পচে যেতো।[4]

 

আল্লাহ তা’আলা বনী ইস্রাঈলের উপর নিয়ামতস্বরূপ মান্না এবং সালওয়া নামক খাদ্য প্রদান করতেন। কিন্তু তারা অতিরিক্ত খাবার জমা করে রাখতে চাইতো এবং তাতে পচন ধরতো।

 

বনী ইস্রাঈলের পাপ কাজের পর থেকেই কি পৃথিবীতে মাংস ও খাবার পচন শুরু হয়?

এবার আমরা জবাবের শুরুতে উল্লেখিত হাদিসের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। প্রশ্ন হল – এই হাদিস কি এমন কিছু দাবি করে যে বনী ইস্রাঈলের কোনো পাপ কাজের পর থেকেই মাংস বা অন্য খাবারে পচন ধরা আরম্ভ হয়েছে?

উত্তর হচ্ছে – না। হাদিসের সরল অনুবাদেও এমন কথা সরাসরি উল্লেখ নেই।

সেখানে শুধু এটুকু বলা হয়েছে যে, বনী ইস্রাঈল না হলে খাদ্য নষ্ট হতো না বা মাংস পচতো না।

কিন্তু এই কথার মর্মার্থ কী?

 

কোনো কোনো মুহাদ্দিসের মতে, খাদ্য পচনের প্রক্রিয়া বনী ইস্রাঈলের অস্তিত্বের বহু আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা পূর্বজ্ঞান থেকেই জানতেন বনী ইস্রাঈল তাঁর মহা নিয়ামত আসমান থেকে নাজিল করা খাদ্যসমূহকে তাঁর আদেশের বাইরে গিয়ে জমা করে রাখবে ও সীমালঙ্ঘন করবে। আর এ কারণে আল্লাহ আগে থেকেই এই পচন প্রক্রিয়াকে সৃষ্টি করেছেন।

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় আবুল ফাদ্বল আল ইরাকী(র.) বলেছেন –

 

وَقِيلَ أَنَّهُ كَانَ يَسْقُطُ عَلَيْهِمْ فِي مَجَالِسِهِمْ مِنْ طُلُوعِ الْفَجْرِ إلَى طُلُوعِ الشَّمْسِ كَسُقُوطِ الثَّلْجِ فَيَأْخُذُونَ مِنْهُ قَدْرَ كِفَايَتِهِمْ ذَلِكَ الْيَوْمَ إلَّا يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَيَأْخُذُونَ مِنْهُ لِلْجُمُعَةِ وَالسَّبْتِ فَإِنْ قَعَدُوا إلَى أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ فَسَدَ فَادَّخَرُوا فَفَسَدَ عَلَيْهِمْ، وَيَحْتَمِلُ أَنَّ التَّغَيُّرَ كَانَ قَدِيمًا قَبْلَ وُجُودِ بَنِي إسْرَائِيلَ سَبَبُهُ مَا عَلِمَهُ اللَّهُ مِمَّا يَحْدُثُ مِنْ بَنِي إسْرَائِيلَ بَعْدَ ذَلِكَ، وَاَللَّهُ أَعْلَمُ.

অর্থঃ "বলা হয়ঃ সুবহে সাদেক থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত তাদের বসার স্থানগুলোতে বরফ পড়ার মতো করে এগুলো (মান্না ও সালওয়া) তাদের ওপর বর্ষিত হতো। তারা সেখান থেকে কেবল সেই দিনের জন্য তাদের প্রয়োজন বা চাহিদামাফিক সংগ্রহ করত; তবে শুক্রবার ছাড়া, কারণ সেদিন তারা শুক্রবার ও শনিবার এই দুই দিনের জন্য সংগ্রহ করত। এরপর তারা যদি এর চেয়ে বেশি সময়ের জন্য তা রেখে দিত, তবে তা নষ্ট হয়ে যেত। অতঃপর তারা (অতিরিক্ত) জমা করতে শুরু করল এবং ফলশ্রুতিতে তা তাদের ওপর পচে নষ্ট হয়ে গেল।

তবে এই সম্ভাবনাও রয়েছে যে, খাবার বা গোশত পচে যাওয়ার এই পরিবর্তনটি বনী ইস্রাঈলের অস্তিত্বের বহু আগে থেকেই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। আর এর মূল কারণ ছিল বনী ইস্রাঈল পরবর্তীতে যে (অবাধ্যতাপূর্ণ) আচরণ করবে সে সম্পর্কে আল্লাহর পূর্বজ্ঞান। আর আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন।" [5]

 

আবার কোনো কোনো মুহাদ্দিসের মতে, বনী ইস্রাঈল সর্বপ্রথম ঐভাবে খাদ্য সঞ্চয় করে, তাদের আগে কেউ এমনটা করত না বরং তাজা অবস্থায় মাংস এবং অন্য রান্না করা খাবার খেয়ে ফেলত। আর খাদ্য সঞ্চয় করলে স্বাভাবিকভাবেই তা পচে যাবে। বনী ইস্রাঈল প্রথমে এই কাজ করে এবং তাদের খাবার পচে যায়। তারা এভাবে নতুন এক রীতির সূচনা করে যার ফলে মানুষ খাদ্যে পচনের বিষয়টির সম্মুখীন হয়।

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় শায়খ আব্দুর রহমান আস সা'দী(র.) বলেছেন -

 

وَأَمَّا بَنُو إِسْرَائِيلَ؛ فَقِيلَ لَهُمْ: لَا تَدَّخِرُوا مِنَ اللَّحْمِ الَّذِي رُزِقْتُمُوهُ فِي التِّيهِ. فَادَّخَرُوهُ مِنَ الْهَلَعِ وَالْحِرْصِ الشَّدِيدِ وَضَعْفِ الثِّقَةِ بِاللَّهِ، وَكَانَ النَّاسُ قَبْلَ ذَلِكَ يَأْكُلُونَ اللَّحْمَ طَرِيّاً وَلَا يَدَّخِرُونَهُ، فَلَمَّا حَصَلَ ادِّخَارُهُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ؛ كَانُوا أَوَّلَ مَنْ سَنَّ لِلنَّاسِ هَذَا الْأَمْرَ.

অর্থঃ "আর বনী ইস্রাঈলের বিষয়টি হলো, তাদের বলা হয়েছিলঃ ‘তিহ’ (মরু) প্রান্তরে তোমাদের যে গোশত রিযিক হিসেবে দেওয়া হয়েছে, তা তোমরা জমা করে রেখো না। কিন্তু তারা চরম অস্থিরতা, তীব্র লোভ এবং আল্লাহর প্রতি দুর্বল বিশ্বাসের কারণে তা জমা করে রেখেছিল। এর পূর্বে মানুষ গোশত তাজা অবস্থায় আহার করত এবং তা জমা করে রাখত না। অতঃপর বনী ইস্রাঈল যখন তা জমা করা শুরু করল, তখন তারাই প্রথম মানুষের মাঝে এই অভ্যাসের প্রচলন ঘটাল।" [6]

 

এই হাদিস প্রসঙ্গে মুফতি তাকি উসমানী(হাফি.) বলেছেন -

 

وَعَلَيْهِ فَلَا يَدُلُّ الْحَدِيثُ عَلَى أَنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَمْ يَكُنْ يَفْسُدُ عَلَيْهِمُ الطَّعَامُ وَاللَّحْمُ وَلَوْ ادَّخَرُوهُمَا. وَإِنَّمَا الْمَعْنَى: أَنَّ الِادِّخَارَ لَمْ يَكُنْ مَعْهُوداً قَبْلَ بَنِي إِسْرَائِيلَ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا يَأْكُلُونَ وَيُطْعِمُونَ فَلَا يَفْسُدُ عَلَيْهِمْ شَيْءٌ، حَتَّى جَاءَ بَنُو إِسْرَائِيلَ فَجَعَلُوا يَدَّخِرُونَهُ حَتَّى فَسَدَ عَلَيْهِمْ، وَهَذَا كَقَوْلِهِمْ: (لَا تَرَى الضَّبَّ بِهَا يَنْحَجِرُ) أَيْ لَا ضَبَّ وَلَا انْحِجَارَ، كَمَا فِي مَجْمَعِ الْبِحَارِ مَادَّةِ (خَنَزَ).وَقِيلَ: إِنَّ فَسَادَ الطَّعَامِ كَانَ عَذَاباً عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ، وَلَمْ يَكُنْ قَبْلَهُمْ يَفْسُدُ الطَّعَامُ وَاللَّحْمُ وَلَوْ ادُّخِرَ أَيَّاماً، وَإِلَيْهِ يُشِيرُ لَفْظُ النَّوَوِيِّ وَغَيْرِهِ، وَلَكِنَّهُ بَعِيدٌ.

অর্থঃ "এর ওপর ভিত্তি করে হাদিসটি এটি প্রমাণ করে না যে, বনী ইস্রাঈলের পূর্ববর্তী লোকদের খাবার বা গোশত জমিয়ে রাখলে পচত না। বরং অর্থ হলোঃ বনী ইস্রাঈলের পূর্বে খাবার জমিয়ে রাখার প্রথা প্রচলিত ছিল না। তারা যা পেত তা খেয়ে ফেলত এবং অন্যকে খাওয়াত, ফলে কোনো কিছু নষ্ট হতো না। শেষ পর্যন্ত বনী ইস্রাঈল এসে তা জমিয়ে রাখতে শুরু করল এবং তা তাদের কারণে নষ্ট হতে লাগল। এটি তাদের একটি প্রবাদের মতোঃ {সেখানে তুমি কোনো গুঁইসাপকে গর্তে ঢুকতে দেখবে না} অর্থাৎ সেখানে কোনো গুঁইসাপও নেই এবং গর্তে ঢোকার দৃশ্যও নেই (অর্থাৎ মূল বিষয়টিরই কোনো অস্তিত্ব নেই)। যেমনটি 'মাজমাউল বিহার' গ্রন্থে 'খিনয' (خنز) শব্দমূলের অধীনে বর্ণিত হয়েছে।

বলা হয়েছেঃ খাবার নষ্ট হওয়া ছিল বনী ইস্রাঈলের ওপর একটি আযাব বা শাস্তি। তাদের পূর্বে কয়েকদিন জমিয়ে রাখলেও খাবার বা গোশত নষ্ট হতো না। ইমাম নববী(র.) ও অন্যদের বক্তব্য এদিকেই ইঙ্গিত করে, তবে এটি দুর্বল মত।" [7]

 

আমরা দেখলাম কোনো কোনো মুহাদ্দিস এটিও উল্লেখ করেছেন যে বনী ইস্রাঈলের খাবার জমিয়ে রাখার পরেই পৃথিবীতে প্রথম খাবার বা মাংস পচা শুরু হয়। তবে এই অভিমতকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন মুফতি তাকি উসমানী(হাফি.)।

 

মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা থেকে এটি স্পষ্ট হল - আলোচ্য হাদিস থেকে ইসলামবিরোধীরা ‘বৈজ্ঞানিক ভুল’ এর যে অভিযোগ করে তা সঠিক নয়। কারণ এই হাদিস থেকে মোটেও এই অর্থ নেয়া অপরিহার্য নয় যে বনী ইস্রাঈলের আগে পৃথিবীতে কখনো মাংসে পচন ধরতো না। 

 

আলোচ্য হাদিসে ইহুদিবিদ্বেষ আছে নাকি তাদের গুরুত্বের ইঙ্গিত আছে?

ইসলামবিরোধীরা দাবি করে আলোচ্য হাদিসে ইহুদিদের অহেতুক দোষারোপ করা হয়েছে, এবং এই হাদিসে নাকি ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম (Antisemitism) আছে। অথচ ইহুদিরা যে স্রষ্টার নিয়ামত মান্না এবং সালওয়া পেয়েও মহা অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন করেছিল এই কথা খোদ তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থেই আছে। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) অংশটি ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায়ের নিকট ঈশ্বরের বাণী বলে বিবেচিত। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন পুস্তকে ইহুদি জাতির সীমালঙ্ঘন, মহাপাপ ও অভিশপ্ত হবার উল্লেখ আছে। মান্না ও সালওয়া পেয়েও ইস্রাঈল জাতি যেভাবে সীমালঙ্ঘন করেছিল, তাদের খাবার কিভাবে পচে গিয়েছিল এবং তারা যেভাবে স্রষ্টার বিরাগভাজন হয়েছিল, এর বর্ণনা দিয়ে বাইবেলে উল্লেখ আছে—

 

11প্রভু মোশিকে বললেন, 12“আমি ইস্রায়েলের লোকদের নালিশ শুনেছি। সুতরাং ওদের বলো, ‘আজ রাতে তোমরা মাংস খেতে পারো এবং সকালে তোমরা যতখুশি রুটি খেতে পারো। তখন তোমরা বুঝবে যে তোমরা তোমাদের প্রভু, তোমাদের ঈশ্বরকে, বিশ্বাস করতে পার।’”

13রাতে, তিতির পাখীরা এসেছিল এবং শিবিরের চারপাশে বসেছিল। লোকরা সেই পাখীগুলোকে ধরে তার মাংস খেল। সকালে শিবিরের চারপাশে শিশির পড়েছিল। 14শিশির শুকিয়ে গেলে তুষার কণার সরু স্তরের মতো একটি বস্তু মাটিতে পড়ে থাকল। 15তা দেখে ইস্রায়েলবাসীরা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করল, “এটা আবার কি জিনিস?” তারা জানত না সেটা কি। তাই তারা একে অপরকে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করছিল। তখন মোশি তাদের বলল, “এটা এক ধরণের খাদ্যবস্তু যা প্রভু তোমাদের খাবার জন্য দিয়েছেন। 16প্রভু বলেছেন, ‘প্রত্যেকেই তার প্রয়োজন মতো এটা কুড়িয়ে নেবে। এবং প্রত্যেককে তার পরিবারের প্রত্যেকের জন্য অন্ততঃ দু’পোয়া করে নিতে হবে।”

17একথা শুনে ইস্রায়েলবাসীরা প্রত্যেকে ঐ খাদ্যবস্তু কুড়িয়ে নিল, কেউ কেউ আবার অন্যদের থেকে বেশী কুড়ালো। 18পরে ওজনে দেখা গেল যে যারা বেশী সংগ্রহ করেছিল তাদের কাছে অতিরিক্ত পরিমাণ ছিল না এবং যারা কম সংগ্রহ করতে পেরেছিল তাদেরও খাবারে কম পড়ে নি। প্রত্যেকের পরিবারই পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পেল।

19মোশি তাদের বলল, “পরের দিনের জন্য ঐ খাবার মজুত করে রেখো না।” 20কিন্তু কয়েকজন মোশির কথা না শুনে পরের দিনের জন্য ঐ খাবার রেখে দিল। কিন্তু মজুত করা খাবারগুলোয়় পোকা ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে গেল। তাই মোশি ঐসব লোকদের ওপর ক্রুদ্ধ হল।

11The Lord spoke to Moses, saying,

12I have heard the complaints of the children of Israel. Speak to them, saying, In the afternoon you shall eat meat, and in the morning you shall be sated with bread, and you shall know that I am the Lord, your God.

13It came to pass in the evening that the quails went up and covered the camp, and in the morning there was a layer of dew around the camp.

14The layer of dew went up, and behold, on the surface of the desert, a fine, bare [substance] as fine as frost on the ground.

15When the children of Israel saw [it], they said to one another, It is manna, because they did not know what it was, and Moses said to them, It is the bread that the Lord has given you to eat.

16This is the thing that the Lord has commanded, Gather of it each one according to his eating capacity, an omer for each person, according to the number of persons, each one for those in his tent you shall take.

17And the children of Israel did so: they gathered, both the one who gathered much and the one who gathered little.

18And they measured [it] with an omer, and whoever gathered much did not have more, and whoever gathered little did not have less; each one according to his eating capacity, they gathered.

19And Moses said to them, Let no one leave over [any] of it until morning.

20But [some] men did not obey Moses and left over [some] of it until morning, and it bred worms and became putrid, and Moses became angry with them. [8]

 

ইস্রাঈল জাতির লোভ-লালসা ও পাপের জন্য ঈশ্বর তাদের উপর কীরূপে ক্রুদ্ধ হয়ে শাস্তি দিয়েছেন, এর উল্লেখ করে বাইবেলে আরো বলা হয়েছে—

 

31এরপর প্রভু ঝড়ের সৃষ্টি করলেন যা সমুদ্র থেকে হঠাৎ‌‌ এসে হাজির হল। ঝড় সেখানে হঠাৎ‌‌ই ভারুই পাখীদের নিয়ে এল। ভারুই পাখীরা শিবিরের চারধারে উড়ে বেড়াতে লাগল। এতো বেশী ভারুই পাখী ছিল যে সেই জায়গার মাটি ঢেকে গেল। ভারুই পাখীগুলো মাটির ওপরে তিন ফুট স্তর তৈরী করল। একজন মানুষ একদিনে যতদূর পর্যন্ত হাঁটতে পারে, ততদূর পর্যন্ত ভারুই পাখীগুলো ছড়িয়ে ছিল। 32তারা গিয়ে সারাদিন এবং সারারাত ধরে ভারুই পাখীগুলোকে জড়ো করল। পরের দিনও সারাদিন ধরে তারা ভারুই পাখীগুলো জড়ো করল। একজন ব্যক্তি সবচেয়ে ন্যুনতম 60 বুশেল সংগ্রহ করল। এরপর লোকরা ভারুই পাখীর মাংস শিবিরের চারদিকে ছড়িয়ে রাখল।

33যখন লোকরা মাংস খাওয়া শুরু করল প্রভু খুব ক্রুদ্ধ হলেন। সেই মাংস তাদের মুখে থাকতে থাকতেই এবং তাদের মাংস খাওয়া শেষ করার আগেই প্রভু তাদের গুরুতরভাবে অসুস্থ করে দিলেন। অনেক লোক মারা গেল এবং ঐ জায়গাতেই তাদের কবর দেওয়া হল।

31A wind went forth from the Lord and swept quails from the sea and spread them over the camp about one day's journey this way and one day's journey that way, around the camp, about two cubits above the ground.

32The people rose up all that day and all night and the next day and gathered the quails. [Even] the one who gathered the least collected ten heaps. They spread them around the camp in piles.

33The meat was still between their teeth; it was not yet finished, and the anger of the Lord flared against the people, and the Lord struck the people with a very mighty blow. [9]

 

বাইবেলে উল্লেখ আছে নবী মুসা(আ.) [মোশি/Moses] ইস্রাঈল জাতি বা ইহুদি জাতির কুকর্ম ও মহাপাপের উল্লেখ করে বহু বাক্য ব্যয় করেছেন। তিনি তাদেরকে বিদ্রোহী ও একগুঁয়ে বলে উল্লেখ করেছেন। মুসা(আ.) বেঁচে থাকতেই ইস্রাঈলীরা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তাঁর মৃত্যুর পর আরো বিদ্রোহ করবে বলে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছেন।

 

24মোশি এই বিধানের সব কথা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি পুস্তকে লেখা শেষ করার পর 25তিনি সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুক বহনকারী লেবীয়দের এই আদেশ দিলেন: 26“তোমরা এই বিধানপুস্তক নিয়ে তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর নিয়ম-সিন্দুকের পাশে রাখো। এটি সেখানে তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে থাকবে। 27কেননা তোমরা কেমন বিদ্রোহী ও একগুঁয়ে তা আমি জানি। আমি তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতেই যখন তোমরা সদাপ্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছ, তখন আমি মারা যাওয়ার পরে আরও কত বেশি করেই না বিদ্রোহী হবে। 28তোমরা তোমাদের গোষ্ঠীর প্রবীণ নেতাদের ও কর্মকর্তাদের আমার সামনে একত্র করো, যেন আমি তাদের শুনবার জন্য এসব কথা বলি এবং তাদের বিরুদ্ধে মহাকাশ ও পৃথিবীকে সাক্ষী করি। 29কেননা আমি জানি যে, আমার মৃত্যুর পরে তোমরা একেবারেই মন্দ হয়ে যাবে এবং যে পথে আমি তোমাদের চলবার নির্দেশ দিয়েছি তোমরা তা থেকে সরে যাবে। ভবিষ্যতে তোমাদের উপরে বিপর্যয় নেমে আসবে কারণ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যা মন্দ তাই তোমরা করবে এবং তোমাদের নিজের হাতের কাজ দিয়ে তোমরা তাঁকে অসন্তুষ্ট করে তুলবে।

24And it was, when Moses finished writing the words of this Torah in a scroll, until their very completion,

25that Moses commanded the Levites, who carried the ark of the covenant of the Lord, saying:

26"Take this Torah scroll and place it along side the ark of covenant of the Lord, your God, and it will be there as a witness.

27For I know your rebellious spirit and your stubbornness. Even while I am alive with you today you are rebelling against the Lord, and surely after my death!

28Assemble to me all the elders of your tribes and your officers, and I will speak these words into their ears, and I will call upon the heaven and the earth as witnesses against them.

29For I know that after my death, you will surely become corrupted, and deviate from the way which I had commanded you. Consequently, the evil will befall you at the end of days, because you did evil in the eyes of the Lord, to provoke Him to anger through the work of your hands. [10]

 

বাইবেলে আরো বলা হয়েছে ঈশ্বরের দেয়া নিয়ম ও বিধি-ব্যবস্থা পালন না করে সীমালঙ্ঘন করার জন্য বনী ইস্রাঈল জাতি অভিশপ্ত হয়েছে। তারা বিপথগামী হয়েছে এবং তাদের ব্যাপারে মুসা(আ.) এর ব্যবস্থা তথা তাওরাতে অভিশাপ ও বিচারের কথা লিপিবদ্ধ আছে। --

 

3তাদের বলো যে, ইস্রায়েলের ঈশ্বর, সদাপ্রভু এই কথা বলেন: ‘অভিশপ্ত সেই মানুষ, যে এই নিয়মের শর্তাবলি পালন না করে,

...

8তারা কিন্তু শোনেনি বা আমার কথায় মনোযোগ দেয়নি; পরিবর্তে তারা নিজেদের মন্দ হৃদয়ের একগুঁয়ে মনোভাবের অনুসারী হয়েছিল। তাই আমি যে রকম আদেশ করেছিলাম, তারা তা পালন করেনি বলে আমি নিয়মে উল্লিখিত সব শাস্তি তাদের উপরে নিয়ে এসেছি।

3And you shall say to them, so said the Lord God of Israel; Cursed be the man who will not hearken to the words of this covenant,

...

8But they did not hearken, neither did they bend their ears, and they went, each man according to the view of his evil heart, and I brought upon them all the words of this covenant that I commanded to do, and they did not do. [11]

 

11সমগ্র ইস্রায়েল তোমার বিধান অমান্য করেছে ও বিপথে গেছে, তোমার বাধ্য হতে অস্বীকার করেছে।

তাই ঈশ্বরের দাস মোশির ব্যবস্থায় যেসব অভিশাপ ও বিচারের কথা লেখা আছে তা আমাদের উপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে কারণ আমরা তোমার বিরুদ্ধে পাপ করেছি।

11And all Israel have transgressed Your teaching, turning away, not heeding Your voice, and the curse and the oath, which are written in the Law of Moses, the servant of God, have befallen us, for we have sinned against Him. [12]

 

বাইবেলে ইহুদিদের পাপাচার এবং ঈশ্বরের বিরাগভাজন হওয়া ও অভিশপ্ত হওয়ার উল্লেখ করে বহু জায়গায় এমন আলোচনা রয়েছে। প্রবন্ধের কলেবর বড় হয়ে যাবার আশঙ্কায় আমরা এর সব উল্লেখ করলাম না। ইহুদিদের নিজ ধর্মগ্রন্থেই এভাবে তাদের পাপাচারের জন্য কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে এবং তাদেরকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে। ইসলামবিরোধীদের নিকট আমাদের প্রশ্ন থাকবেঃ তাহলে ইহুদিদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থই কি ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম (Antisemitism) এর দোষে দুষ্ট??!!!

 

আমরা নিশ্চিত, এর উত্তরে তারা বলবেঃ এখানে তো ইহুদিদের ব্যাপারে অযথা ঘৃণা ব্যক্ত করা হয়নি, শুধুমাত্র তাদের খারাপ কাজের সমালোচনা করা হয়েছে…ইত্যাদি ইত্যাদি।  

এর জবাবে আমরা বলবঃ কুরআন-হাদিসেও তো ইহুদিদের ব্যাপারে অযথা ঘৃণা ব্যক্ত করা হয়নি, শুধুমাত্র তাদের খারাপ কাজের সমালোচনা করা হয়েছে। বাইবেলে ইহুদিদের ব্যাপারে যে ভয়ানক কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন-হাদিসে সেই তুলনায় বহু গুণে কম কঠোর ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। তাহলে কুরআন-হাদিসের বেলায় আপনারা কেন অভিযোগ করেন আর ইহুদিদের নিজ ধর্মগ্রন্থের বেলায় নিরব থাকেন?? মাংসে পচন ধরার যে ঘটনার কথা হাদিসে আছে, ঐ ঘটনায় বনী ইস্রাঈল যে পাপাচারী ছিল এবং সীমালঙ্ঘন করেছিল এই ব্যাপারে তো তাদের ধর্মগ্রন্থই সাক্ষ্য দেয়।

 

ইহুদিদের নিজ ধর্মগ্রন্থে যদিও কোথাও এমনটা বলা নেই যে তাদের পাপের কারণে মাংসে পচন হয়। তবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই এটা আছে যে, মহাবিশ্বের বিভিন্ন জিনিস বনী ইস্রাঈলের কারণে হয়েছে। ইহুদিরা বিশ্বাস করে পৃথিবী সৃষ্টিই হয়েছে তাওরাতের জন্য এবং বনী ইস্রাঈলের জন্য। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের প্রথম গ্রন্থ ‘আদিপুস্তক’ (Genesis) অর্থাৎ ইহুদিদের তাওরাতে [13] ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকারক র‍্যাবাই শ্লোমো য়িৎযাকি (RASHI) উল্লেখ করেছেন—

 

בראשית ברא IN THE BEGINNING GOD CREATED — This verse calls aloud for explanation in the manner that our Rabbis explained it: God created the world for the sake of the Torah which is called (Proverbs 8:22) “The beginning (ראשית) of His (God’s) way”, and for the sake of Israel who are called (Jeremiah 2:3) “The beginning (ראשית) of His (God’s) increase’’.

অর্থঃ "আদিতে ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন - এই পদটি আমাদের র‍্যাবাইদের (ইহুদি পণ্ডিতদের) ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখেঃ ঈশ্বর এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তাওরাতের খাতিরে, যাকে (হিতোপদেশ ৮:২২ পদে) ঈশ্বরের পথের “শুরু” বলা হয়েছে, এবং ইস্রাঈলীদের খাতিরে, যাদেরকে (যিরমিয় ২:৩ পদে) ঈশ্বরের বৃদ্ধির “শুরু” বলা হয়েছে।" [14]

 

ইহুদিদের মিদরাসেও একই তথ্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে তাওরাতের আইনের রক্ষক অর্থাৎ ইহুদিদের জন্যই এই পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে।

 

The Holy One, blessed be He, gave the Torah to the Israelites so that they might devote themselves to it ... Who are the pillars of the earth? They are the guardians of the law, for whose sake alone the world was fashioned, as is said: He hath fashioned the world because of them (ibid.).”

অর্থঃ "পবিত্রতম সত্তা [ঈশ্বর], তিনি ধন্য, ইস্রাঈলীদের তাওরাত দান করেছিলেন যাতে তারা এর আনুগত্য করতে পারে...  পৃথিবীর এই স্তম্ভগুলো কারা? তারা হলো ব্যবস্থার (আইনের) রক্ষকবৃন্দ, কেবল যাদের খাতিরেই এই পৃথিবী গঠন করা হয়েছিল, যেমন বলা হয়েছে: 'তিনি তাদের কারণেই পৃথিবী গঠন করেছেন' (ঐ)।" [15]

 

তালমুদে উল্লেখ আছে, ইস্রাঈল জাতি যদি তাওরাত গ্রহণ না করতো, এই পৃথিবী আদিম বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতার অবস্থায় চলে যেতো তথা ধ্বংস হয়ে যেতো! ইহুদিরা তাওরাত গ্রহণের আগ পর্যন্ত পৃথিবী ধ্বংস হবার ভয়ে ভীত ছিল; তারা তাওরাত গ্রহণ করার পর পৃথিবী নাকি ভয় কাটিয়ে শান্ত হয়!

 

Holy One, Blessed be He, established a condition with the act of Creation, and said to them: If Israel accepts the Torah on the sixth day of Sivan, you will exist; and if they do not accept it, I will return you to the primordial state of chaos and disorder. Therefore, the earth was afraid until the Torah was given to Israel, lest it be returned to a state of chaos. Once the Jewish people accepted the Torah, the earth was calmed.

অর্থঃ "পবিত্রতম সত্তা [ঈশ্বর], তিনি ধন্য, সৃষ্টিজগতের সাথে একটি শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন এবং তাদের বলেছিলেনঃ যদি ইস্রাঈল সিভান মাসের ষষ্ঠ দিনে তাওরাত গ্রহণ করে, তবে তোমাদের অস্তিত্ব বজায় থাকবে; আর যদি তারা এটি গ্রহণ না করে, তবে আমি তোমাদের আদিম বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতার অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাব। অতএব, তাওরাত ইস্রাঈলকে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবী ভয়ে ভীত ছিল, পাছে এটি আবার বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরে যায়যখনই ইহুদি জাতি তাওরাত গ্রহণ করল, পৃথিবী শান্ত হলো।" [16]

 

যে ইহুদিরা বিশ্বাস করে তাদের জন্য এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, যেই ইহুদিরা বিশ্বাস করে তারা তাওরাত নেবে কিনা সেই ভয়ে পৃথিবী কাঁপাকাঁপি করেছিল, তারা যদি দেখে কোনো স্থানে লেখা আছে তাদের মহাপাপের কারণে মাংস পচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে – এই তথ্য কি আদৌ তাদের জন্য অবমাননাকর মনে হবে? নাকি এর উল্টোটাই মনে হবে?

বরং এর দ্বারা প্রকাশ পাবে যে তারা এমন এক জাতি যাদেরকে একটা সময়ে আল্লাহ তা’আলা অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন, যাদের মাঝে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন, যাদের জন্য আসমান থেকে নিদর্শনস্বরূপ খাদ্য অবতরণ করেছেন, কিন্তু তারা এমন নিদর্শন পেয়েও সীমালঙ্ঘন করেছে, যার কারণে আল্লাহর শাস্তি অবধারিত হয়েছে।

 

আমরা মুসলিমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তা’আলা বনী ইস্রাঈলকে এককালে মহান মর্যাদা দিয়েছিলেন, তাদের মাঝে বিপুল পরিমাণে নবী-রাসুল(আ.) প্রেরণ করেছে, তাদেরকে নিদর্শন দিয়েছেন, এমনকি একটা সময়ে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে সারা বিশ্বের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

 

يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَنِّي فَضَّلْتُكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ

অর্থঃ হে ইসরাঈল বংশধরগণ! আমার সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম। আর নিশ্চয় আমি সমগ্র সৃষ্টিকুলের উপর তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।[17]

 

কাজেই এমন গুরুত্ববহ এক জাতির মহাপাপ যদি মাংস পচনের মতো কোনো প্রক্রিয়ার কারণ হয় – আমরা মুসলিমরা এর মাঝে অস্বাভাবিক কিছুই দেখি না। এর মাঝে ইহুদিবিদ্বেষ বা অবৈজ্ঞানিক কিছুই নেই। এখানে ইহুদিদের প্রতি যা সমালোচনা তা তাদের কাজের জন্য করা হয়েছে, তাদের বংশপরিচয়ের জন্য করা হয়নি। আর মাংস পচনের যে প্রক্রিয়া বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা আজ জানি, তাও ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক না। অণুজীব বা অন্য যেসব কারণে খাদ্যে পচন হয়, প্রকৃতির এই নিয়মগুলো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাঁর পূর্বজ্ঞান দ্বারা বনী ইস্রাঈলের মহা সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে জানতেন, আর এ কারণে পৃথিবীর সূচনা থেকেই পচনের এই নিয়মগুলো সৃষ্টি করে থাকতে পারেন। [18] বিজ্ঞান আমাদেরকে “কিভাবে” এর উত্তর দেয়, কিন্তু “কেন” এর উত্তর দেয় না। এই “কেন” এর উত্তর দেয় ওহী। এই হাদিসের সাথে বিজ্ঞানের কোনো সংঘর্ষ নেই।

 

 

তথ্যসূত্রঃ


[1] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩০৯৫

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=3353  

[2] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৫৪৩

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=50626

[3] আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ৫৭

[4] তাফসির ইবন কাসির, সুরা বাকারাহর ৫৭ নং আয়াতের তাফসির

https://quran.com/al-baqarah/57/tafsirs/bn-tafseer-ibn-e-kaseer

[5] ত্বরহুত তাছরিবি ফি শারহিত তাক্বরিব - আবুল ফাদ্বল আল ইরাকী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৬৫

https://shamela.ws/book/11036/1572

অথবা https://archive.is/wip/h9IIY (আর্কাইভকৃত)

[6] মাজমু'উ মুআল্লাফাতিশ শায়খিল ‘আল্লামাতি ‘আব্দির রহমানিবনি নাসিরিস সা‘দী - আব্দুর রহমান আস সা'দী, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ৫৩

https://archive.org/details/majmu3-muallafat-sa3di/21_121961/page/n51/mode/2up

[7] তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিম - মুফতি তাকি উসমানী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪০

https://archive.org/details/FathUlMulhim./Fath_Ul_Mulhim_Vol_07/page/n139/mode/2up

[8] বাইবেল, যাত্রাপুস্তক (Exodus) ১৬ : ১১-২০

https://www.bible.com/bible/3150/EXO.16.BERV

https://www.chabad.org/library/bible_cdo/aid/9877/jewish/Chapter-16.htm

[9] বাইবেল, গণনাপুস্তক (Numbers) ১১ : ৩১-৩৩

https://www.bible.com/bible/3150/NUM.11.BERV

https://www.chabad.org/library/bible_cdo/aid/9939/jewish/Chapter-11.htm

[10] বাইবেল, দ্বিতীয় বিবরণ (Deuteronomy) ৩১ : ২৪-২৯

https://www.bible.com/bible/2412/DEU.31.BCV

https://www.chabad.org/library/bible_cdo/aid/9995/jewish/Chapter-31.htm

[13] সাধারণভাবে বাইবেলের প্রথম পাঁচটি পুস্তককে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা ‘তাওরাত’ (Torah) বলে থাকে।

[14] RASHI Commentary on Genesis 1 :1

https://www.sefaria.org/Rashi_on_Genesis.1.1.2?lang=en 

অথবা https://archive.is/wip/dSeIo (আর্কাইভকৃত)

[15] Midrash Tanchuma, Bereshit 1 : 6

https://www.sefaria.org/Midrash_Tanchuma%2C_Bereshit.1.6?lang=bi&with=all&lang2=en

অথবা https://archive.is/wip/UuSnc (আর্কাইভকৃত)

[16] Talmud, Shabbat 88a : 6

https://www.sefaria.org/Shabbat.88a.6?lang=bi&with=all&lang2=en

অথবা https://archive.is/wip/KOccB (আর্কাইভকৃত)

[17] আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ৪৭

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবিঈ  কাতাদাহ(র.) ও মুজাহিদ(র.) বলেন, “তাদেরকে তৎকালীন সময়ের সমস্ত সৃষ্টিকুলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমানের সাথে সম্পৃক্ত নয়।” [তাফসীর আব্দুর রাজ্জাক, তাবারী] 

সুত্রঃ তাফসীরে জাকারিয়া, সুরা বাকারাহর ৪৭ নং আয়াতের তাফসির

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=54

[18] এই প্রবন্ধে উল্লেখিত বনী ইস্রাঈল ও মাংস পচনের হাদিস প্রসঙ্গে আবুল ফাদ্বল আল ইরাকী(র.) এর ব্যাখ্যাটি পুনরায় দেখুন

 

সোশ্যাল লিঙ্ক ও অ্যাপ

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ পোস্টসমূহ