অভিযোগঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ কিয়ামত তথা মহাবিশ্বের ধ্বংস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতেন (নাউযুবিল্লাহ)। নবী ﷺ থেকে এমন কিছু বক্তব্য এসেছে যা থেকে বোঝা যায় যে তিনি ধারণা করতেন তাঁর অতি নিকটতম সময়ে বা কয়েক বছরের মধ্যেই কিয়ামত বা মহাপ্রলয় হবে এবং মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ তাঁর পরে ১৪০০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত পৃথিবী অক্ষত আছে, ধ্বংস হয়নি। অতএব কিয়ামতের ব্যাপারে মুহাম্মাদ ﷺ এর বক্তব্য ভুল (নাউযুবিল্লাহ)।
জবাবঃ
আমরা অভিযোগের জবাবে শুরুতেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করব। ইসলামের অন্যতম আকিদা হল - গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই রাখেন। কোনো মানুষ এই জ্ঞান রাখে না। সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছেন নবী-রাসুলগণ (আ.), আর তাঁরাও এ ব্যাপারে শুধুমাত্র ততটুকু জ্ঞান রাখতেন যতটুকু তাঁদেরকে ওহী মারফত জানানো হতো। কিয়ামত কবে হবে এটি গায়েবের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটে রয়েছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে—
قُلْ لَّا يَعۡلَمُ مَنۡ فِى السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَيۡبَ اِلَّا اللّٰهُؕ وَمَا يَشۡعُرُوۡنَ اَيَّانَ يُبۡعَثُوۡنَ
অর্থঃ “বলঃ আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না এবং তারা জানে না তারা কখন পুনরুত্থিত হবে।” [1]
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ۚ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً ۗ يَسْأَلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থঃ "তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে’? তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমানসমূহ ও যমীনের উপর তা (কিয়ামত) কঠিন হবে। তা তোমাদের নিকট হঠাৎ এসে পড়বে। তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে যেন তুমি এ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত। বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’।" [2]
নবী মুহাম্মাদ ﷺ কখনো দাবি করেননি কবে বা কত তারিখে কিয়ামত হবে তিনি এই জ্ঞান রাখেন। তিনি শুধুমাত্র ওহীর মাধ্যমে কিয়ামতের কিছু আলামতের বর্ণনা দিয়েছেন। সুবিখ্যাত ‘হাদিসে জিব্রাঈল’ এর মাঝে দেখা যায় ফেরেশতা জিব্রাঈল(আ.) নবী ﷺ কে কিয়ামত কবে হবে এই প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দেন যে এই ব্যাপারে তিনি তাঁর থেকে অধিক জ্ঞান রাখেন না। এরপর তিনি কিয়ামতের কিছু আলামত বর্ণনা করেন।
قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ قَالَ " مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ وَسَأُحَدِّثُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا
অর্থঃ "তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত কখন ঘটবে? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে সে ব্যাক্তি প্রশ্নকারীর চাইতে অধিক অবহিত নয়। তবে আমি কিয়ামতের কিছু আলামত বর্ণনা করছি। ... ..." [3]
নবী ﷺ থেকে কিয়ামত সম্পর্কে যেসব হাদিস রয়েছে, ইসলামবিরোধীরা তা থেকে বেশ কিছু হাদিস পেশ করে দাবি করে এসব স্থানে তিনি কিয়ামতের ব্যাপারে ভুল ভবিষ্যতবাণী করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। আমরা এই প্রবন্ধে এ সংক্রান্ত সকল হাদিস পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।
১। নবী মুহাম্মাদ ﷺ এবং কিয়ামতের মধ্যকার সময় দুই আঙুলের ব্যবধানের মতোঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর কিয়ামতের মধ্যকার সময়কে দুই আঙুলের মধ্যকার ব্যবধানের মতো বলে অভিহীত করেছেন। এর দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন যে তাঁর আগমনের খুব অল্প সময়ের বা কয়েক বছরের মধ্যেই কিয়ামত হয়ে যাবে! তারা এই দাবির স্বপক্ষে এই হাদিস পেশ করে—
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ " . قَالَ وَضَمَّ السَّبَّابَةَ وَالْوُسْطَى .
অর্থঃ "আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমি এবং কিয়ামত প্রেরিত হয়েছি এ দুটির মত। রাবী বলেন (এ সময়) তিনি তার শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলিকে একত্রিত করেছেন।" [4]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হাতিম ইবন হিব্বান(র.) বলেছেন -
أَرَادَ بِهِ أَي بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُونَ بَيْنَنَا نَبِيٌّ آخَرُ، لأَنِّي آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَعَلَى أُمَّتِي تَقُومُ السَّاعَةُ.
অর্থঃ "তিনি এর দ্বারা বুঝিয়েছেন যে, আমি ও কিয়ামত একসঙ্গে প্রেরিত হয়েছি, যেমন শাহাদাত আঙুল (তর্জনী) ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি থাকে। আমাদের মাঝে আর কোনো নবী নেই, কারণ আমি শেষ নবী, এবং আমার উম্মতের ওপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।" [5]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী(র.) এর শারহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ আছে—
قَالَ الْقَاضِي يَحْتَمِلُ أَنَّهُ تَمْثِيلٌ لِمُقَارَبَتِهَا وَأَنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُمَا إِصْبَعٌ أُخْرَى كَمَا أَنَّهُ لَا نَبِيَّ بَيْنَهُ وَبَيْنَ السَّاعَةِ وَيَحْتَمِلُ أَنَّهُ لِتَقْرِيبِ مَا بَيْنَهُمَا مِنَ الْمُدَّةِ وَأَنَّ التَّفَاوُتَ بَيْنَهُمَا كَنِسْبَةِ التَّفَاوُتِ بَيْنَ الْإِصْبَعَيْنِ تَقْرِيبًا لَا تَحْدِيدًا
অর্থঃ “কাযি [ইয়ায(র.)] বলেছেন, এটি কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়া বোঝাতে একটি উপমা হতে পারে, যেমন করে দু’টি আঙুলের মাঝে আর কোনো আঙুল থাকে না, ঠিক তেমনি তাঁর [নবী ﷺ] ও কিয়ামতের মাঝে আর কোনো নবী নেই। আবার এটাও হতে পারে যে, এটি সময়ের দিক থেকে তাঁদের পারস্পরিক নিকটবর্তী হওয়া বোঝাতে বলা হয়েছে এবং তাঁদের মাঝে পার্থক্য দুটি আঙুলের মাঝে যেভাবে থাকে, সে অনুপাতে। এটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বোঝাতে নয়, বরং কাছাকাছি একটি মান বোঝাতে বলা হয়েছে।” [6]
ইমাম কুরতুবী(র.) বলেছেনঃ
وَأَمَّا قَوْلُهُ: "بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ"، فَمَعْنَاهُ: أَنَا النَّبِيُّ الآخِرُ، فَلَا يَلِينِي نَبِيٌّ آخَرُ، وَإِنَّمَا تَلِينِي الْقِيَامَةُ كَمَا تَلِي السَّبَّابَةُ الْوُسْطَى، وَلَيْسَ بَيْنَهُمَا إِصْبَعٌ آخَرُ، وَهَذَا لَا يُوجِبُ أَنْ يَكُونَ لَهُ عِلْمٌ بِالسَّاعَةِ نَفْسِهَا، وَهِيَ مَعَ ذَلِكَ دَانِيَةٌ؛ لِأَنَّ أَشْرَاطَهَا مُتَتَابِعَةٌ، وَقَدْ ذَكَرَ اللهُ الْأَشْرَاطَ فِي الْقُرْآنِ، فَقَالَ: ﴿فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا﴾، أَيْ دَنَتْ، وَأَوَّلُهَا النَّبِيُّ ﷺ؛ لِأَنَّهُ نَبِيُّ آخِرِ الزَّمَانِ، وَقَدْ بُعِثَ وَلَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْقِيَامَةِ نَبِيٌّ، ثُمَّ بَيَّنَ مَا يَلِيهِ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ، فَقَالَ: "أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا"، إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِمَّا سَنَذْكُرُهُ وَنُبَيِّنُهُ بِحَوْلِ اللهِ فِي أَبْوَابٍ إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالَى.
অর্থঃ "আর তাঁর বাণী "আমি ও কিয়ামত এ দু'টির [আঙুলের] মতো প্রেরিত হয়েছি"- এর অর্থ হল আমি শেষ নবী, তাই আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না, বরং কিয়ামতই আমার পরবর্তী হবে, যেমন মধ্যমা আঙুল তর্জনীর পরবর্তী হয় এবং এ দু'টির মাঝে অন্য কোনো আঙুল থাকে না। এটি এই অর্থে নয় যে, তাঁর কাছে কিয়ামতের নির্দিষ্ট জ্ঞান আছে; বরং কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী। কারণ এর নিদর্শনগুলো একের পর এক প্রকাশিত হবে। আল্লাহ কুরআনে নিদর্শনসমূহ উল্লেখ করে বলেছেনঃ "নিশ্চয়ই এর নিদর্শনসমূহ এসে গেছে" (৪৭:১৮), অর্থাৎ তা নিকটবর্তী হয়েছে। আর এর প্রথম নিদর্শন হলেন নবী (ﷺ) নিজে, কারণ তিনি শেষ যামানার নবী। তিনি প্রেরিত হয়েছেন এবং তাঁর ও কিয়ামতের মাঝে কোনো নবী নেই। এরপর তিনি [নবী ﷺ] কিয়ামতের আরও নিদর্শন বর্ণনা করেছেন, যেমনঃ "দাসী তার মালিকাকে জন্ম দেবে", এবং অন্যান্য নিদর্শন, যা আমরা ইন শা আল্লাহ বিভিন্ন অধ্যায়ে আল্লাহর সাহায্যে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করব।" [7]
শায়খ উমার আল-আশকার (হাফি.) বলেনঃ
قَدْ يُقَالُ: كَيْفَ يَكُونُ قَرِيبًا مَا مَضَى عَلَى الإِخْبَارِ بِقُرْبِ وُقُوعِهِ أَلْفٌ وَأَرْبَعُمِائَةِ عَامٍ؟ وَالْجَوَابُ أَنَّهُ قَرِيبٌ فِي عِلْمِ اللَّهِ وَتَقْدِيرِهِ، وَإِنْ كَانَتِ الْمَقَايِيسُ الْبَشَرِيَّةُ تَرَاهُ بَعِيدًا (إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيدًا – وَنَرَاهُ قَرِيبًا) [المعارج: ٦-٧].
অর্থঃ "এমন প্রশ্ন আসতে পারেঃ কিভাবে তা [কিয়ামত] নিকটবর্তী হয়, যখন এর খবর দেওয়ার পর চৌদ্দ শত বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে?
উত্তর হলোঃ এটি আল্লাহর জ্ঞান ও পরিমাপে নিকটবর্তী, যদিও মানবীয় পরিমাপে এটি দূরবর্তী বলে মনে হয়। আল্লাহ বলেনঃ “তারা এটিকে দূরবর্তী মনে করে, অথচ আমি [আল্লাহ] এটিকে নিকটবর্তী দেখি।” (সুরা মাআরিজ ৭০ : ৬-৭)।" [8]
শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন(র.) বলেনঃ
وَقالَ بِإِصْبَعِهِ الْوُسْطى وَالسَّبَّابَةِ، وَالسَّبَّابَةُ قَرِيبَةٌ مِنَ الْوُسْطى لَيْسَ بَيْنَهُمَا إِلَّا جُزْءٌ يَسِيرٌ مِقْدَارُ الظُّفْرِ، وَهَذَا يَدُلُّ عَلَى قُرْبِهَا، لَكِنْ مَعَ ذَلِكَ كَمْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ نَحْنُ فِي الْقَرْنِ الْخَامِسِ عَشَرَ الْهِجْرِيِّ بَعْدَ بَعْثَةِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً، وَمَعَ ذَلِكَ مَازَالَتِ الدُّنْيَا بَاقِيَةً مِمَّا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ مَا مَضَى طَوِيلٌ جِدًّا، حَتَّى إِنَّ الرَّسُولَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَ غُرُوبِ الشَّمْسِ قَالَ: «إِنَّهُ لَمْ يَبْقَ مِنَ الدُّنْيَا - يَعْنِي بِالنِّسْبَةِ لِمَنْ سَبَقَكُمْ - إِلَّا كَمَا بَقِيَ مِنْ يَوْمِكُمْ هَذَا».
অর্থঃ “তিনি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন। তর্জনী মধ্যমার খুব কাছাকাছি, এতটাই কাছে যে তাদের মধ্যে শুধুমাত্র নখ পরিমাণ ফাঁকা রয়েছে। এটি কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু তারপরও, আমাদের ও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যে কতটা সময়ের ব্যবধান? আমরা হিজরি পঞ্চদশ শতাব্দীতে বসবাস করছি, রাসুলের ﷺ নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ১৩০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তবুও দুনিয়া এখনো টিকে আছে। যা প্রমাণ করে যে, ইতোমধ্যে যা অতিবাহিত হয়েছে, তা অত্যন্ত দীর্ঘ সময়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ ﷺ সূর্যাস্তের সময় বলেছিলেনঃ "তোমাদের পূর্ববর্তীদের তুলনায় এখন দুনিয়াতে যা অবশিষ্ট আছে, তা শুধুমাত্র আজকের এই দিনের অবশিষ্ট অংশের সমান। [বুখারী ৫৫৭]" ” [9]
শায়খ উমার আল-আশকার (হাফি.) আরও বলেনঃ
وَالْأَمْرُ الَّذِي يَنْبَغِي أَنْ يُنْتَبَهَ إِلَيْهِ أَنَّ الْبَاقِيَ مِنَ الدُّنْيَا قَلِيلٌ بِالنِّسْبَةِ لِمَا مَضَى مِنْهَا، فَإِنَّكَ إِذَا وَضَعْتَ لِمَنْ لَكَ عَلَيْهِ دَيْنٌ أَجَلًا طَوِيلًا، كَأَنْ تُؤَجِّلَهُ خَمْسِينَ عَامًا مَثَلًا، فَإِذَا انْقَضَى مِنَ الْخَمْسِينَ خَمْسَةٌ وَأَرْبَعُونَ، فَيَكُونُ مَوْعِدُ السَّدَادِ قَدِ اقْتَرَبَ بِالنِّسْبَةِ لِمَا مَضَى مِنَ الْمَوْعِدِ الْمَضْرُوبِ.
وَالْأَحَادِيثُ النَّبَوِيَّةُ الشَّرِيفَةُ تُشِيرُ إِلَى هَذِهِ الْحَقِيقَةِ الَّتِي بَيَّنَّاهَا هُنَا، فَفِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ وَمُسْلِمٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "إِنَّمَا أَجَلُكُمْ فِيمَنْ مَضَى قَبْلَكُمْ مِنَ الْأُمَمِ مِنْ صَلَاةِ الْعَصْرِ إِلَى مَغْرِبِ الشَّمْسِ"، وَفِي لَفْظٍ: "إِنَّمَا بَقَاؤُكُمْ فِيمَا سَلَفَ قَبْلَكُمْ مِنَ الْأُمَمِ مَا بَيْنَ صَلَاةِ الْعَصْرِ إِلَى غُرُوبِ الشَّمْسِ".
إِنَّ الْحَدِيثَ يُمَثِّلُ الْوُجُودَ الْإِنْسَانِيَّ بِيَوْمٍ مِنْ أَيَّامِ الدُّنْيَا، ابْتَدَأَ وُجُودُ الْأُمَّةِ الْإِسْلَامِيَّةِ فِيهِ عِنْدَ الْعَصْرِ، فَيَكُونُ الْمَاضِي مِنْ عُمْرِ الْوُجُودِ الْإِنْسَانِيِّ بِنِسْبَةِ مَا مَضَى مِنْ ذَلِكَ الْيَوْمِ مِنَ الْفَجْرِ إِلَى الْعَصْرِ، وَيَكُونُ الْبَاقِي مِنْ عُمْرِ الزَّمَنِ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ كَمَا بَيْنَ الْعَصْرِ وَالْمَغْرِبِ، ذَلِكَ أَنَّ النُّصُوصَ صَرِيحَةُ الدَّلَالَةِ عَلَى أَنَّنَا آخِرُ الْأُمَمِ وُجُودًا، وَأَنَّ نِهَايَةَ وُجُودِ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَتَحَقَّقُ بِقِيَامِ السَّاعَةِ.
অর্থঃ “যে বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত তা হলো, দুনিয়ার যা অবশিষ্ট আছে তা অতীতের তুলনায় অত্যন্ত অল্প। যেমন আপনি যদি কাউকে ঋণ দেন দীর্ঘ সময়ের জন্য, ধরুন পঞ্চাশ বছর, আর যদি পঁয়তাল্লিশ বছর অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে বাকি পাঁচ বছরকে পূর্বনির্ধারিত সময়ের তুলনায় অতি নিকটবর্তী বলে গণ্য করা হয়।
নবীজির ﷺ হাদিস শরীফ এ সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে যা এখানে আমরা উল্লেখ করেছি। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ "তোমাদের আয়ু পূর্ববর্তী উম্মতদের তুলনায় আসরের নামায থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের সমান।" অন্য বর্ণনায় আছেঃ "তোমাদের অবশিষ্ট সময় পূর্ববর্তী উম্মতদের তুলনায় আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের সমতুল্য।"
এই হাদিসটি মানবজাতির অস্তিত্বকে দুনিয়ার একদিনের সাথে তুলনা করেছে। ইসলামী উম্মাহর অস্তিত্ব শুরু হয়েছে আসরের সময় থেকে। সুতরাং মানবজাতির অতীতকাল হলো সেই দিনের ফজর থেকে আসর পর্যন্ত সময়ের সমতুল্য। আর কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট সময় হলো আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের মতো। কারণ নুসুস (কুরআন-হাদিসের বাণীসমূহ) স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে আমরা শেষ উম্মাহ, এবং এই উম্মাহর অস্তিত্বের সমাপ্তি হবে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে।” [10]
অতএব আমরা বলতে পারি, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর যে হাদিসে তাঁর এবং কিয়ামতকে শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলিকে একত্রিত করে উপমা দিয়েছেন, সেখানে উদ্দেশ্য হল তাঁর এবং কিয়ামতের মাঝে আর কোনো নবী নেই। তাছাড়া মহাকালের তুলনায় শত বা হাজার হাজার বছরও অতি ক্ষুদ্র সময়। মহাকালের সাথে তুলনা করলে হাজার বছরকেও ‘ক্ষুদ্র সময়’ এর উপমা দিয়ে প্রকাশ করা যায়। এই হাদিসের দ্বারা মোটেও এই উদ্দেশ্য না যে তাঁর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই কিয়ামত হবে!
২। বালকের বৃদ্ধ হিবার পূর্বেই ‘কিয়ামত’ হওয়াঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ একবার বলেছেন সেই সময়কার একজন বালক বৃদ্ধ হবার আগেই কিয়ামত হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঐ বালকের বৃদ্ধ হতে যেই কয় বছর লাগে, সেই সময়ের মধ্যে মহাপ্রলয় হবে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা এই দাবির স্বপক্ষে নিম্নের হাদিসটি দেখায়ঃ
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ وَعِنْدَهُ غُلاَمٌ مِنَ الأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنْ يَعِشْ هَذَا الْغُلاَمُ فَعَسَى أَنْ لاَ يُدْرِكَهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ " .
অর্থঃ "আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামত কবে হবে? তখন তাঁর নিকট মুহাম্মাদ নামক এক আনসারী বালক উপিস্থিত ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ এ বালক যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে।" [11]
এই হাদিসের দীর্ঘ বর্ণনায় নবী ﷺ এর পূর্ণ বক্তব্য রয়েছে। দীর্ঘ বর্ণনাটি নিম্নরূপঃ
حَدَّثَنِي صَدَقَةُ، أَخْبَرَنَا عَبْدَةُ، عَنْ هِشَامٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الأَعْرَابِ جُفَاةً يَأْتُونَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَيَسْأَلُونَهُ مَتَى السَّاعَةُ، فَكَانَ يَنْظُرُ إِلَى أَصْغَرِهِمْ فَيَقُولُ " إِنْ يَعِشْ هَذَا لاَ يُدْرِكْهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ عَلَيْكُمْ سَاعَتُكُمْ ". قَالَ هِشَامٌ يَعْنِي مَوْتَهُمْ.
অর্থঃ "’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক কঠিন মেজাজের গ্রাম্য লোক নবী ﷺ-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল- ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কবে হবে? তখন তিনি তাদের সর্ব-কনিষ্ঠ লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেনঃ যদি এ লোক বেঁচে থাকে তবে তার বুড়ো হবার আগেই তোমাদের উপর তোমাদের ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) এসে যাবে। হিশাম বলেন, অর্থাৎ তাদের মৃত্যু।" [12]
আমরা যদি এই হাদিসের মূল আরবি দেখি, তাহলে লক্ষ করব এখানে কথাও সরাসরি আরবি কিয়ামত (قيامة) শব্দটি নেই। বরং ‘সা’আতুন’ (ساعة) শব্দটি আছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কবে ‘সা’আতুন’ (ساعة) হবে। এই শব্দের অর্থ বাংলায় করা হয়েছে ‘কিয়ামত’। যদিও ‘সা’আতুন’ দ্বারা কিয়ামতও বোঝানো হয়, এই অনুবাদ ভুল নয়। কিন্তু এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ কিয়ামত নয়। বরং এর আক্ষরিক অর্থ হল সময় বা কাল। [13] এই হাদিসের ইংরেজি অনুবাদেও ‘সা’আতুন’ (ساعة) শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে ‘Hour’। ‘Doomsday’ বলে অনুবাদ করা হয়নি।
Narrated `Aisha: Some rough bedouins used to visit the Prophet (ﷺ) and ask him, "When will the Hour be?" He would look at the youngest of all of them and say, "If this should live till he is very old, your Hour (the death of the people addressed) will take place." Hisham said that he meant (by the Hour), their death. [14]
আর আমরা যদি এই হাদিসের সরল অনুবাদ দেখি, তাহলে লক্ষ করব স্বয়ং এই হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হিশাম উল্লেখ করেছেন এখানে এই ‘সা’আতুন’ (ساعة) কথার দ্বারা বোঝানো হয়েছে তাদের মৃত্যু। স্বয়ং হাদিসের বর্ণনাকারী এখানে উল্লেখ করেছেন যে এখানে এর দ্বারা আদৌ মহাপ্রলয়ের কথা বোঝানো হয়নি বরং ঐ ব্যক্তিদের মৃত্যুর কথা বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ ঐ বালকটি বৃদ্ধ হবার আগেই সেই ব্যক্তিরা মারা যাবে। নবী ﷺ এর পূর্ণ বক্তব্য ভালো করে লক্ষ করলেও বিষয়টি বুঝতে পারা যায় তিনি শুধুমাত্র ঐ স্থানে উপস্থিত লোকদের মৃত্যুর কথা বলছেন। তিনি সেখানে বলেছেনঃ حَتَّى تَقُومَ عَلَيْكُمْ سَاعَتُكُمْ (তোমাদের উপর তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে)। তিনি যদি মহাবিশ্ব ধ্বংসের কথাই সেখানে বলতেন, তাহলে কোনোভাবেই তাদের উপর তাদের কিয়ামত এসে যাবার কথা বলতেন না।
ইসলামবিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এই হাদিস উল্লেখের সময়ে সংক্ষিপ্ত রেওয়ায়েত উল্লেখ করে যেখানে নবী ﷺ এর পূর্ণ বক্তব্য নেই এবং বর্ণনাকারীরও এই আলোচনা নেই। যাতে সহজেই মানুষকে ধোঁকা দিয়ে হাদিস থেকে ‘ভুল’ (!) ভবিষ্যতবাণী দেখানো যায়।
প্রখ্যাত আরবি ভাষাবিদ রাগিব ইসফাহানি(র.) এর 'আল মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন' গ্রন্থে উল্লেখ আছেঃ
السَّاعَاتُ الَّتِي هِيَ القِيَامَةُ ثَلَاثَةٌ: السَّاعَةُ الكُبْرَى، هِيَ بَعْثُ النَّاسِ لِلمُحَاسَبَةِ وَهِيَ الَّتِي أَشَارَ إِلَيْهَا بِقَوْلِهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ: «لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَظْهَرَ الفُحْشُ وَالتَّفَحُّشُ وَحَتَّى يُعْبَدَ الدِّرْهَمُ وَالدِّينَارُ» إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ وَذَكَرَ أُمُورًا لَمْ تَحْدُثْ فِي زَمَانِهِ وَلَا بَعْدَهُ.
وَالسَّاعَةُ الوُسْطَى، وَهِيَ مَوْتُ أَهْلِ القَرْنِ الوَاحِدِ، وَذَلِكَ نَحْوَ مَا رُوِيَ أَنَّهُ رَأَى عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أَنِيسٍ فَقَالَ: (إِنْ يَطُلْ عُمْرُ هَذَا الغُلَامِ لَمْ يَمُتْ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ)، فَقِيلَ: إِنَّهُ آخِرُ مَنْ مَاتَ مِنَ الصَّحَابَةِ.
وَالسَّاعَةُ الصُّغْرَى، وَهِيَ مَوْتُ الإِنسَانِ، فَسَاعَةُ كُلِّ إِنسَانٍ مَوْتُهُ، وَهِيَ المُشَارُ إِلَيْهَا بِقَوْلِهِ: قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً [الأنعام: ٣١]، وَمَعْلُومٌ أَنَّ هَذِهِ الحَسْرَةَ تَنَالُ الإِنسَانَ عِنْدَ مَوْتِهِ لِقَوْلِهِ: وَأَنْفِقُوا مِنْ مَا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ المَوْتُ فَيَقُولَ... [المنافقون: ١٠].
وَعَلَى هَذَا قَوْلُهُ: قُلْ أَرَأَيْتَكُمْ إِنْ أَتَاكُمْ عَذَابُ اللَّهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ [الأنعام: ٤٠]،
অর্থঃ “ সা’-আতুন (ساعة) দ্বারা কিয়ামতের তিনটি ধরণকে বোঝানো হয়ঃ
বড় কিয়ামত (السَّاعَةُ الكبرى) : এটি মানুষের পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশের দিন। রাসুল ﷺ এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা প্রকাশ পাবে এবং মানুষ দিরহাম ও দিনার (অর্থ-সম্পদ) পূজা করতে শুরু করবে।” এছাড়াও তিনি এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন যা তাঁর যুগে বা পরবর্তী সময়েও ঘটেনি।
মধ্যবর্তী কিয়ামত (الساعة الوسطى) : এর দ্বারা একটি প্রজন্মের মানুষের মৃত্যুকে বোঝানো হয়। এটি সেই হাদিসের মতো, যেখানে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস(রা.)কে দেখে বলেছিলেনঃ "যদি এই বালক দীর্ঘ জীবন পায়, তবে সে মারা যাবে না যতক্ষণ না কিয়ামত সংঘটিত হয়।" বলা হয় যে, তিনিই ছিলেন সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী।
ছোট কিয়ামত (الساعة الصّغرى) : এর দ্বারা একজন ব্যক্তির মৃত্যুকে বোঝানো হয়। প্রতিটি মানুষের কিয়ামত হলো তার মৃত্যু। এর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেনঃ
"নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে, যতক্ষণ না কিয়ামত তাদের ওপর হঠাৎ এসে পড়ে..." (আল-আনআম: ৩১)
এটি সুস্পষ্ট যে, এই অনুশোচনা একজন মানুষের মৃত্যুক্ষণে আসে, যেমন আল্লাহ বলেনঃ "আর তোমরা ব্যয় করো সেই রিজিক থেকে, যা আমি তোমাদের দিয়েছি, এর আগে যে তোমাদের কারও কাছে মৃত্যু এসে যায়, তখন সে বলে... (আল-মুনাফিকুন: ১০)।” [15]
আমরা দেখলাম এখানে কুরআন-হাদিস থেকেই ‘সা’আতুন’ (ساعة) শব্দের বিভিন্ন অর্থ আলোচনা করলেন প্রখ্যাত আরবি ভাষাবিদ রাগিব ইসফাহানি(র.)।
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন হাজার আসকালানী(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ফাতহুল বারী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—
قَالَ هِشَامٌ هُوَ ابْنُ عُرْوَةَ رَاوِيهِ يَعْنِي مَوْتَهُمْ) وَهُوَ مَوْصُولٌ بِالسَّنَدِ الْمَذْكُورِ، وَفِي حَدِيثِ أَنَسٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ قَالَ عِيَاضٌ: حَدِيثُ عَائِشَةَ هَذَا يُفَسِّرُ حَدِيثَ أَنَسٍ، وَأَنَّ الْمُرَادَ سَاعَةُ الْمُخَاطَبِينَ، وَهُوَ نَظِيرُ قَوْلِهِ: أَرَأَيْتُكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ فَإِنَّ عَلَى رَأْسِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لَا يَبْقَى عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مِمَّنْ هُوَ عَلَيْهَا الْآنَ أَحَدٌ، وَقَدْ تَقَدَّمَ بَيَانُهُ فِي كِتَابِ الْعِلْمِ، وَأَنَّ الْمُرَادَ انْقِرَاضُ ذَلِكَ الْقَرْنِ، وَأَنَّ مَنْ كَانَ فِي زَمَنِ النَّبِيِّ ﷺ إِذَا مَضَتْ مِائَةُ سَنَةٍ مِنْ وَقْتِ تِلْكَ الْمَقَالَةِ لَا يَبْقَى مِنْهُمْ أَحَدٌ، وَوَقَعَ الْأَمْرُ كَذَلِكَ، فَإِنَّ آخِرَ مَنْ بَقِيَ مِمَّنْ رَأَى النَّبِيَّ ﷺ أَبُو الطُّفَيْلِ عَامِرُ بْنُ وَاثِلَةَ كَمَا جَزَمَ بِهِ مُسْلِمٌ وَغَيْرُهُ، وَكَانَتْ وَفَاتُهُ سَنَةَ عَشْرٍ وَمِائَةٍ مِنَ الْهِجْرَةِ، وَذَلِكَ عِنْدَ رَأْسِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْ وَقْتِ تِلْكَ الْمَقَالَةِ،
অর্থঃ “হিশাম (যিনি এই হাদিসের বর্ণনাকারী হিশাম ইবনে উরওয়াহ) বলেন, এর অর্থ হলো 'তাদের মৃত্যু'। এটি উল্লিখিত সনদের সাথেই সংযুক্ত। আনাস (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, 'যতক্ষণ না কেয়ামত সংঘটিত হয়'। কাযি ইয়ায (র.) বলেনঃ আয়িশা (রা.)-এর এই হাদিসটি আনাস (রা.)-এর হাদিসের ব্যাখ্যা করে দিচ্ছে। আর এখানে 'কিয়ামত' বলতে সম্বোধিত ব্যক্তিদের মৃত্যু বা সময়কাল বোঝানো হয়েছে। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সেই বাণীর সদৃশ, যেখানে তিনি বলেছিলেনঃ "তোমরা কি তোমাদের এই রাতটি দেখছ? আজকের এই রাত থেকে একশ বছর পর বর্তমান পৃথিবীতে যারা জীবিত আছে, তাদের কেউই আর অবশিষ্ট থাকবে না।"
এই বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে 'কিতাবুল ইলম'-এ অতিক্রান্ত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সেই প্রজন্মের অবসান ঘটা। অর্থাৎ নবী ﷺ-এর যুগে যারা উপস্থিত ছিলেন, সেই কথা বলার সময় থেকে একশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের আর কেউ বেঁচে থাকবেন না। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। কেননা নবী ﷺ-কে দেখেছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশেষ জীবিত ব্যক্তি ছিলেন আবু তোফায়েল আমির ইবনে ওয়াসিলা (রা.), যেমনটি ইমাম মুসলিম ও অন্যান্যরা নিশ্চিত করেছেন। তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরি ১১০ সনে, যা ছিল নবী ﷺ-এর সেই কথা বলার ঠিক একশ বছর পরের সময়।” [16]
এই আলোচনার পরে ইমাম ইবন হাজার আসকালানী(র.) পূর্বে উল্লেখিত ভাষাবিদ রাগিব ইসফাহানি(র.) এর আলোচনাকে উদ্ধৃত করেন।
বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ এবং আরবি ভাষাবিদ উইলিয়াম লেনের অভিধানেও আরবি ساعة শব্দের এই অর্থগুলো আলোচনা করা হয়েছে—
الــسَّاعَةُ also signifies (tropical:) The resurrection; (S, K, TA;) the raising of mankind for the reckoning; also termed الــسَّاعَةُ ــالكُبْرَى: (Er-Rághib, B:) or the time thereof:
… … …
Also (assumed tropical:) The death of one generation; termed, for distinction, الــسَّاعَةُ ــالوُسْطَى: as in the saying of Mohammad, when he saw 'AbdAllah Ibn-Uneys, إِنْ يَطُلْ عُمْرُ هٰذَا الغُلَامِ لَمْ يَمُتْ حَتَّى تَقُومَ الــسَّاعَةُ (assumed tropical:) [If the life of this boy last long, he will not die until the death of the generation shall come to pass]: accordingly it is said that he was the last that died of the Companions. (Er-Rághib, B.) b4: Also (assumed tropical:) The death of any man; termed, for distinction, الــسَّاعَةُ ــالصُّغْرَى: as in the Kur [vi. 31], قَدْ خَسِرَ الَّذَينَ كَذَّبُوا بِلِقَآءِ اللّٰهِ حَتَّى إِذَا جَآءَتْهُمُ السَّاٰعَةُ بَغْتَةً (assumed tropical:) [They have suffered loss who disbelieved in, or denied as false, the meeting with God until, when death came to them suddenly]. (Er-Rághib, B) b5: Also (assumed tropical:) Difficulty, distress, or affliction; and so ↓ السَّاعُ. (TA.) b6: And (assumed tropical:) Distance, or remoteness. (TA.)
অর্থঃ “الــسَّاعَةُ বলতে আরও বোঝায় (রূপক অর্থেঃ) পুনরুত্থান; (S, K, TA;) বিচার দিবসের জন্য মানবজাতির পুনরুত্থান; একে الــسَّاعَةُ ــالكُبْرَى- [“আস-সা’আতুল কুবরা” বা বড় কিয়ামত] ও বলা হয়: (Er-Rághib, B:) অথবা সেই নির্ধারিত সময়:
… … …
আরও (অনুমিত রূপক অর্থেঃ) এক প্রজন্মের মৃত্যু; পার্থক্য করার জন্য একে الــسَّاعَةُ ــالوُسْطَى [“আস-সা’আতুল উসত্বা” বা মধ্যবর্তী কিয়ামত] বলা হয়ঃ যেমন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বাণীতে পাওয়া যায়, যখন তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসকে দেখেছিলেন, إِنْ يَطُلْ عُمْرُ هٰذَا الغُلَامِ لَمْ يَمُتْ حَتَّى تَقُومَ الــسَّاعَةُ (অনুমিত রূপকঃ) [যদি এই বালকের আয়ু দীর্ঘ হয়, তবে সেই প্রজন্মের মৃত্যু না আসা পর্যন্ত সে মরবে না]: সেই অনুযায়ী বলা হয় যে, সাহাবীদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। (Er-Rághib, B.) b4: আরও (অনুমিত রূপক অর্থেঃ) যে কোনো মানুষের মৃত্যু; পার্থক্য করার জন্য একে الــسَّاعَةُ ــالصُّغْرَى বলা হয়ঃ যেমন কুরআনে [৬:৩১] আছে, قَدْ خَسِرَ الَّذَينَ كَذَّبُوا بِلِقَآءِ اللّٰهِ حَتَّى إِذَا جَآءَتْهُمُ السَّاٰعَةُ بَغْتَةً (অনুমিত রূপকঃ) [নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, যতক্ষণ না হঠাৎ তাদের নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয়েছে]। (Er-Rághib, B) b5: আরও (অনুমিত রূপক অর্থে:) অসুবিধা, কষ্ট বা যাতনা; এবং السَّاعُ- [আস-সা’আতু] ও একই অর্থ প্রদান করে। (TA.) b6: এবং (অনুমিত রূপক অর্থেঃ) দূরত্ব বা দূরবর্তীতা। (TA.)” [17]
আলোচ্য হাদিস প্রসঙ্গে অন্যান্য আলেমদের থেকেও অনুরূপ আলোচনা পাওয়া যায়। এই ব্যাখ্যায় ইমাম নববী(র.) এর শারহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—
قَوْلُهُ: (سَأَلُوهُ عَنِ السَّاعَةِ مَتَى هِيَ فَنَظَرَ إِلَى أَحْدَثِ إِنْسَانٍ مِنْهُمْ فَقَالَ: إِنْ يَعِشْ هَذَا لَمْ يُدْرِكْهُ الْهَرَمُ، قَامَتْ عَلَيْكُمْ سَاعَتُكُمْ. وَفِي رِوَايَةٍ: إِنْ يَعِشْ هَذَا الْغُلَامُ فَعَسَى أَنْ لَا يُدْرِكَهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ. وَفِي رِوَايَةٍ: إِنْ عُمِّرَ هَذَا لَمْ يُدْرِكْهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ. وَفِي رِوَايَةٍ: إِنْ يُؤَخَّرْ هَذَا).
قَالَ الْقَاضِي: هَذِهِ الرِّوَايَاتُ كُلُّهَا مَحْمُولَةٌ عَلَى مَعْنَى الْأَوَّلِ، وَالْمُرَادُ بِسَاعَتِكُمْ: مَوْتُهُمْ، وَمَعْنَاهُ: يَمُوتُ ذَلِكَ الْقَرْنُ أَوْ أُولَئِكَ الْمُخَاطَبُونَ.
অর্থঃ “তাঁর বাণীঃ "তারা তাঁকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল - তা কখন সংঘটিত হবে? তখন তিনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বললেনঃ “যদি এ বেঁচে থাকে, তাহলে বার্ধক্য তাকে স্পর্শ করার আগেই তোমাদের উপর তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে।'"
অন্য বর্ণনায়ঃ "যদি এই বালক বেঁচে থাকে, সম্ভবত তার বার্ধক্য আসার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।"
আরেক বর্ণনায়ঃ "যদি এ দীর্ঘজীবী হয়, বার্ধক্য তাকে স্পর্শ করার আগেই কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে।"
এবং অন্য বর্ণনায়ঃ "যদি তার আয়ু দীর্ঘায়িত হয়..."
কাযি [ইয়ায(র.)] বলেছেনঃ "এই সকল বর্ণনা প্রথম বর্ণনার অর্থ বহন করে। এখানে 'তোমাদের কিয়ামত' বলতে তাদের মৃত্যু উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সে যুগের মানুষ বা সম্বোধিতরা মৃত্যুবরণ করবে।"” [18]
হাদীস একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ’ গ্রন্থে এই সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ আছে—
“কিয়ামতকে (السَّاعَةِ) অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যেহেতু তা হঠাৎ সংঘটিত হবে। আর তা মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত হবে যদিও তা দীর্ঘসময় ধরে হওয়া সম্ভব। আল্লামাহ্ তুরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (السَّاعَةِ) দ্বারা সময়ের একটি অংশকে বুঝায় এবং কিয়ামত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ﷺ) -এর সুন্নাতে শব্দটি তিনটি প্রকারে বিভক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমত (الْكُبْرَى) কিয়ামতে কুবরা বলতে সমস্ত মানুষকে হিসাবের জন্য পুনরুত্থান করাকে বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত (الْوُسْطَى) বা মধ্যম কিয়ামত বলতে শিঙ্গা ফুৎকারের মাধ্যমে মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে এবং (الصُّغرَى) বা ছোট কিয়ামত বলতে মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে।” [19]
এই সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ইত্যাদি গ্রন্থের বরাতে সেখানে আরো বলা হয়েছেঃ
“(يَسْأَلُونَهُ عَنِ السَّاعَةِ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর নিকট প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোকজন এসে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত। একদিন নবী (ﷺ) তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে ছোট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন, এই ব্যক্তি যদি বেঁচে থাকে, তার বার্ধক্যকাল পৌছার আগেই তোমাদের ওপর কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে। তথা কিয়ামত সুগরা বা ছোট কিয়ামত হবে। এর অর্থ হচ্ছে রাসূল (ﷺ) -এর এই বক্তব্যের ১০০ বছর উপস্থিত সকলের মৃত্যু হবে অথবা অধিকাংশের মৃত্যু হবে।” [20]
সম্ভাব্য আপত্তি ও এর জবাবঃ
সংশয়বাদীরা এরপরেও প্রশ্ন করতে পারেঃ নবী ﷺ কেন সেই গ্রাম্য লোকদেরকে এভাবে উত্তর দিলেন? তিনি সরাসরি বললেই তো পারতেন যে কিয়ামত কবে হবে এই তথ্য আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তারা তো তাঁকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে; কখন তাদের মৃত্যু হবে এটা তো জানতে চায়নি!
এর উত্তরে আমরা বলবঃ সেই গ্রাম্য লোকেরা অর্থাৎ বেদুঈনরা জিজ্ঞেস করেছিল কখন ‘সা’আতুন’ (ساعة) ঘটবে। কখন কিয়ামত (قيامة) হবে এই শব্দে তারা প্রশ্ন করেনি। আর আরবিতে ‘সা’আতুন’ (ساعة) এর দ্বারা যে একাধিক জিনিস বোঝায়, এটা নিঃসন্দেহে আরবিভাষী নবী ﷺ এর জানা ছিল। আর তিনিও তাদেরকে যথাযথভাবেই উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে এমন একটি ‘সা’আতুন’ (ساعة) অর্থাৎ তাদের মৃত্যুর তথ্য তাদেরকে জানিয়েছেন, যেই তথ্যটি ওহী মারফত তাঁর জানা ছিল। একই সঙ্গে এই তথ্যটি তাদের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর ছিল। এই জাতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে নবী ﷺ এভাবেই মানুষকে উত্তর দিতেন যা তাদের জন্য কল্যাণকর উপদেশ হয়ে থাকে। যেমন, কিয়ামত কবে হবে এই সংক্রান্ত প্রশ্ন অন্য সাহাবী থেকেও করার উদাহরণ রয়েছে। সেখানেও নবী ﷺ উত্তম উপদেশের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ السَّاعَةِ، فَقَالَ: مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: «وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا» . قَالَ: لاَ شَيْءَ، إِلَّا أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ» . قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا بِشَيْءٍ، فَرَحَنَا بِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ» قَالَ أَنَسٌ: «فَأَنَا أُحِبُّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ، وَعُمَرَ، وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ بِحُبِّي إِيَّاهُمْ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِمِثْلِ أَعْمَالِهِمْ»
অর্থঃ আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী কারীম (ﷺ)– কে জিজ্ঞাসা করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কি (পাথেয়) সংগ্রহ করেছ? সে বলল, কোন কিছুই সংগ্রহ করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কে (আন্তরিকভাবে) মহব্বত করি। তখন তিনি বললেন, তুমি (কিয়ামতের দিন) তাঁদের সাথেই থাকবে যাঁদেরকে তুমি মহব্বত কর।
আনাস (রাযিঃ) বলেন, নবী কারীম (ﷺ)– এর কথা দ্বারা আমরা এত আনন্দিত হয়েছি যে, অন্য কোন কথায় এত আনন্দিত হইনি। আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমি নবী কারীম (ﷺ)– কে মহব্বত করি এবং আবু বকর ও উমর (রাযিঃ) কেও। আশা করি তাঁদেরকে আমার মহব্বতের কারণে তাদের সাথে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাঁদের আমলের মত আমল করতে পারিনি। [21]
নবী ﷺ সেই গ্রাম্য লোকদের প্রশ্নের জবাব কেন ওভাবে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবন হাজার আসকালানী(র.) উল্লেখ করেছেন—
قَالَ الدَّاوُدِيُّ: هَذَا الْجَوَابُ مِنْ مَعَارِيضِ الْكَلَامِ، فَإِنَّهُ لَوْ قَالَ لَهُمْ: لَا أَدْرِي ابْتِدَاءً مَعَ مَا هُمْ فِيهِ مِنَ الْجَفَاءِ وَقَبْلَ تَمَكُّنِ الْإِيمَانِ فِي قُلُوبِهِمْ لَارْتَابُوا فَعَدَلَ إِلَى إِعْلَامِهِمْ بِالْوَقْتِ الَّذِي يَنْقَرِضُونَ هُمْ فِيهِ، وَلَوْ كَانَ تَمَكَّنَ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِهِمْ لَأَفْصَحَ لَهُمْ بِالْمُرَادِ.
... ... ...
وَقَالَ الْكَرْمَانِيُّ: هَذَا الْجَوَابُ مِنَ الْأُسْلُوبِ الْحَكِيمِ، أَيْ دَعُوا السُّؤَالَ عَنْ وَقْتِ الْقِيَامَةِ الْكُبْرَى فَإِنَّهَا لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا اللَّهُ، وَاسْأَلُوا عَنِ الْوَقْتِ الَّذِي يَقَعُ فِيهِ انْقِرَاضُ عَصْرِكُمْ فَهُوَ أَوْلَى لَكُمْ، لِأَنَّ مَعْرِفَتَكُمْ بِهِ تَبْعَثُكُمْ عَلَى مُلَازَمَةِ الْعَمَلِ الصَّالِحِ قَبْلَ فَوْتِهِ، لِأَنَّ أَحَدَكُمْ لَا يَدْرِي مَنِ الَّذِي يَسْبِقُ الْآخَرَ.
অর্থঃ “দাউদী (র.) বলেনঃ এই উত্তরটি ছিল ইশারা-ইঙ্গিতপূর্ণ, পরোক্ষ বক্তব্য। কারণ, তারা তখনো মরুবাসীদের স্বভাবজাত রুক্ষতার মধ্যে ছিল এবং তাদের অন্তরে ঈমান পুরোপুরি বদ্ধমূল হয়নি; এমতাবস্থায় তিনি যদি শুরুতেই বলতেন ‘আমি জানি না’, তবে তারা হয়তো সংশয়ে পড়ে যেত। তাই তিনি [নবী ﷺ] তাদের সেই সময়ের কথা জানিয়ে দিলেন যখন তাদের মৃত্যু হবে। যদি তাদের অন্তরে ঈমান মজবুত থাকত, তবে তিনি তাদের কাছে প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন।
... ... ...
কারমানী (র.) বলেনঃ এই উত্তরটি হলো 'উসলুবে হাকিম' বা প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল (অর্থাৎ প্রশ্নকারী যা জানতে চেয়েছে তা এড়িয়ে তার জন্য যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা জানানো)। এর অর্থ হলো— তোমরা বড় কিয়ামতের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করা ছেড়ে দাও, কারণ আল্লাহ ছাড়া কেউ তা জানেন না। বরং তোমরা সেই সময় সম্পর্কে জানো যখন তোমাদের প্রজন্মের অবসান ঘটবে; এটিই তোমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় সম্পর্কে অবগত হওয়া তোমাদেরকে সময় শেষ হওয়ার আগেই নেক আমল আঁকড়ে ধরতে উদ্বুদ্ধ করবে। কেননা তোমাদের মধ্যে কেউই জানে না যে কার মৃত্যু আগে ঘটবে।” [22]
৩। ১০০ বছর পরে কারো জীবিত না থাকাঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন তাঁর সময়ের ১০০ বছর পরে পৃথিবীর সবাই মারা যাবে, মহাপ্রলয় হয়ে সব শেষ হয়ে যাবে। এই দাবির স্বপক্ষে তারা নিম্নের হাদিস দেখায়ঃ
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ صَلَّى بِنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم الْعِشَاءَ فِي آخِرِ حَيَاتِهِ، فَلَمَّا سَلَّمَ قَامَ فَقَالَ " أَرَأَيْتَكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ، فَإِنَّ رَأْسَ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لاَ يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ أَحَدٌ ".
অর্থঃ ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী ﷺ তাঁর জীবনের শেষের দিকে আমাদের নিয়ে ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি দাঁড়িয়ে বললেনঃ তোমরা কি এ রাতের সম্পর্কে জান? বর্তমানে যারা পৃথিবীতে রয়েছে, একশ বছরের মাথায় তাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না। [23]
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ قَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَا مِنْ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ تَبْلُغُ مِائَةَ سَنَةٍ " . فَقَالَ سَالِمٌ تَذَاكَرْنَا ذَلِكَ عِنْدَهُ إِنَّمَا هِيَ كُلُّ نَفْسٍ مَخْلُوقَةٍ يَوْمَئِذٍ .
অর্থঃ "জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেনঃ কোন জীবন (ব্যক্তি) শতবর্ষ পর্যন্ত পৌছবে না। তখন সালিম (রহঃ) বললেন, আমরা বিষয়টি তাঁর (জাবির) নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, এই কথা দ্বারা আজকের সৃষ্ট সকল প্রানধারীকে বুঝানো হয়েছে।" [24]
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ صَلاَةَ الْعِشَاءِ فِي آخِرِ حَيَاتِهِ فَلَمَّا سَلَّمَ قَالَ " أَرَأَيْتَكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ عَلَى رَأْسِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لاَ يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ أَحَدٌ " . قَالَ ابْنُ عُمَرَ فَوَهَلَ النَّاسُ فِي مَقَالَةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تِلْكَ فِيمَا يَتَحَدَّثُونَهُ مِنْ هَذِهِ الأَحَادِيثِ عَنْ مِائَةِ سَنَةٍ وَإِنَّمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لاَ يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ الْيَوْمَ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ أَحَدٌ " . يُرِيدُ بِذَلِكَ أَنْ يَنْخَرِمَ ذَلِكَ الْقَرْنُ .
অর্থঃ "আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, কোন একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে আমাদের নিয়ে এশার নামায আদায় করেন। তিনি সালাম ফিরিয়ে খুতবাহ দিতে দাড়িয়ে বললেনঃ তোমরা কি আজকের এই রাতের প্রতি লক্ষ্য করছ? এখন যে সকল ব্যক্তি বেঁচে আছে শতবছর পর তারা আর দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকবে না। ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বক্তব্য “শতবছরের” বিষয়ে লোকেরা আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত হয়ে ভুল করে বসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণীঃ “শতবছর পর কেউ দুনিয়াতে বেঁচে থাকবে না"-এর তাৎপর্য হলোঃ বর্তমানের এই শতাব্দীটি তখন সমাপ্ত হয়ে যাবে।" [25]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী(র.) এর শারহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—
هَذِهِ الْأَحَادِيثُ قَدْ فَسَّرَ بَعْضُهَا بَعْضًا وَفِيهَا عَلَمٌ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ وَالْمُرَادُ أَنَّ كل نفس منفوسة كانت تلك اللَّيْلَةَ عَلَى الْأَرْضِ لَا تَعِيشُ بَعْدَهَا أَكْثَرَ مِنْ مِائَةِ سَنَةٍ سَوَاءٌ قَلَّ أَمْرُهَا قَبْلَ ذَلِكَ أَمْ لَا وَلَيْسَ فِيهِ نَفْيُ عَيْشِ أَحَدٍ يُوجَدُ بَعْدَ تِلْكَ اللَّيْلَةِ فَوْقَ مِائَةِ سَنَةٍ
অর্থঃ “এই হাদিসগুলো একে অপরকে ব্যাখ্যা করেছে, এবং এতে নবুয়তের নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন রয়েছে। এ থেকে বোঝানো হয়েছে যে, ঐ রাতের সময় যেসব জীবিত ব্যক্তি পৃথিবীতে ছিল, তারা কেউই একশ বছরের বেশি জীবিত থাকবে না—তাদের জীবনকাল এর থেকেও কম হোক বা না হোক। এতে এমন কারো বেঁচে থাকাকে অস্বীকার করা হয়নি, যে ঐ রাতের পর জন্মগ্রহণ করে এবং একশ বছরের বেশি জীবিত থাকে।” [26]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—
قَالَ الْحَافِظُ قَدْ بَيَّنَ ابْنُ عُمَرَ فِي هَذَا الْحَدِيثِ مُرَادَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِنَّ مُرَادَهُ أَنَّ عِنْدَ انْقِضَاءِ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْ مَقَالَتِهِ تِلْكَ يَنْخَرِمُ ذَلِكَ الْقَرْنُ، فَلَا يَبْقَى أَحَدٌ مِمَّنْ كَانَ مَوْجُودًا حَالَ تِلْكَ الْمَقَالَةِ. وَكَذَلِكَ وَقَعَ بِالِاسْتِقْرَاءِ، فَكَانَ آخِرُ مَنْ ضَبَطَ أَمْرَهُ مِمَّنْ كَانَ مَوْجُودًا حِينَئِذٍ أَبُو الطُّفَيْلِ عَامِرُ بْنُ وَاثِلَةَ.
وَقَدْ أَجْمَعَ أَهْلُ الْحَدِيثِ عَلَى أَنَّهُ كَانَ آخِرَ الصَّحَابَةِ مَوْتًا.
وَغَايَةُ مَا قِيلَ فِيهِ أَنَّهُ بَقِيَ إِلَى سَنَةِ عَشْرٍ وَمِائَةٍ، وَهِيَ رَأْسُ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْ مَقَالَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
অর্থঃ “ আল হাফিজ [ইবন হাজার আসকালানী(র.)] বলেছেনঃ "ইবন উমার (রা.) এই হাদিসে নবীজির (ﷺ) উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল যে - তাঁর সেই বক্তব্যের পর ১০০ বছর পূর্ণ হলে সে যুগের লোকেরা বিদায় নেবে এবং ঐ বক্তব্যের সময় যারা জীবিত ছিল তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। বাস্তবেও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়েছে। ঐ সময়ে জীবিতদের মধ্যে সর্বশেষ যে সাহাবীর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে তিনি হলেন আবু তুফাইল আমির ইবনে ওয়াসিলাহ (রা.)।
হাদিসবিদগণ একমত হয়েছেন যে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী সাহাবী। তাঁর সম্পর্কে সর্বোচ্চ যে সময় উল্লেখ করা হয়েছে তা হল তিনি ১১০ হিজরি সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, যা নবীজির (ﷺ) বক্তব্যের ঠিক ১০০ বছর পরের সময়।" ” [27]
আলোচ্য হাদিস প্রসঙ্গে ইমাম ইবন বাত্তাল(র.) উল্লেখ করেছেন—
فَوَعَظَهُمْ بِقِصَرِ أَعْمَارِهِمْ، وَأَعْلَمَهُمْ أَنَّهَا لَيْسَتْ تَطُولُ أَعْمَارُهُمْ كَأَعْمَارِ مَنْ تَقَدَّمَ مِنَ الْأُمَمِ لِيَجْتَهِدُوا فِي الْعِبَادَةِ. وَقَدْ سَمَرَ السَّلَفُ الصَّالِحُ فِي مُذَاكَرَةِ الْعِلْمِ.
অর্থঃ "তিনি তাঁদেরকে তাঁদের আয়ু স্বল্পতার ব্যাপারে উপদেশ দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন যে, তাঁদের আয়ু পূর্ববর্তী উম্মতদের মতো দীর্ঘ হবে না, যাতে তারা ইবাদতে আরও পরিশ্রম করে। আর সালাফে সালেহিন [নেককার পূর্বসুরীগণ তথা সাহাবী, তাবিঈ, তাবে-তাবিঈগণ] রাত জেগে জ্ঞানচর্চা করতেন।" [28]
আমরা দেখলাম আলোচ্য হাদিসের অর্থ হল নবী ﷺ এর ঐ বক্তব্যের সময় যারা জীবিত ছিল তাদের কেউ ১০০ বছর পরে অবশিষ্ট থাকবে না। এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল উম্মতকে তাদের আয়ুর স্বল্পতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া যাতে তারা সৎকাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে। এখানে আদৌ বলা হয়নি ১০০ বছর পরে পৃথিবীতে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না!
৪। সূর্যগ্রহণ হলে কিয়ামতের আশঙ্কা করাঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ সূর্য গ্রহণ হলেই যেহেতু কিয়ামতের আশঙ্কা করতেন, অতএব তাঁর ধারণা ছিল তাঁর সময়কালেই মহাপ্রলয় হয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে! এই দাবির স্বপক্ষে তারা নিম্নের হাদিস দেখায়—
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ خَسَفَتِ الشَّمْسُ، فَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَزِعًا، يَخْشَى أَنْ تَكُونَ السَّاعَةُ، فَأَتَى الْمَسْجِدَ، فَصَلَّى بِأَطْوَلِ قِيَامٍ وَرُكُوعٍ وَسُجُودٍ رَأَيْتُهُ قَطُّ يَفْعَلُهُ وَقَالَ " هَذِهِ الآيَاتُ الَّتِي يُرْسِلُ اللَّهُ لاَ تَكُونُ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنْ يُخَوِّفُ اللَّهُ بِهِ عِبَادَهُ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَافْزَعُوا إِلَى ذِكْرِهِ وَدُعَائِهِ وَاسْتِغْفَارِهِ ".
অর্থঃ "আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সূর্যগ্রহণ হল, তখন নবী ﷺ ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় উঠলেন এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। এরপর তিনি মসজিদে আসেন এবং এর আগে আমি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি, তার চাইতে দীর্ঘ সময় ধরে কিয়াম, রুকু ও সিজদা সহকারে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। আর তিনি বললেনঃ এগুলো হল নিদর্শন যা আল্লাহ পাঠিয়ে থাকেন, তা কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না। বরং আল্লাহ তা’লা এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন। কাজেই যখন তোমরা এর কিছু দেখতে পাবে, তখন ভীত বিহ্বল অবস্থায় আল্লাহর যিকর, দু’আ এবং ইসতিগফারের দিকে অগ্রসর হবে।" [29]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় উমদাতুল ক্বারী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—
قَالَ الْكرْمَانِي، وَهَذَا تَمْثِيل من الرَّاوِي كَأَنَّهُ قَالَ: فَزعًا كالخاشي، أَن تكون الْقِيَامَة، وإلاّ فَكَانَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم عَالما بِأَن السَّاعَة لَا تقوم، وَهُوَ بَين أظهرهم، وَقد وعده الله إعلاء دينه على الْأَدْيَان كلهَا، وَلم يبلغ الْكتاب أَجله. وَقَالَ النَّوَوِيّ: قد يسْتَشْكل هَذَا من حَدِيث أَن السَّاعَة لَهَا مُقَدمَات كَثِيرَة لَا بُد من وُقُوعهَا: كطلوع الشَّمْس من مغْرِبهَا، وَخُرُوج الدَّابَّة والدجال وَغَيرهَا، وَكَيف الخشية من قِيَامهَا حِينَئِذٍ، وَيُجَاب بِأَنَّهُ: لَعَلَّ هَذَا الْكُسُوف كَانَ قبل إِعْلَامه صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِهَذِهِ العلامات، أَو لَعَلَّه خشِي أَن تكون بعض مقدماتها
অর্থঃ “কারমানী(র.) বলেছেন, এটি বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে একটি উপমা, যেন তিনি বললেনঃ “এমন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছিলেন, যেন কিয়ামত এসে গেছে।” অন্যথায় নবী (ﷺ) জানতেন যে, যতক্ষণ তিনি তাদের মধ্যে থাকবেন ততক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হবে না। কারণ আল্লাহ তাকে তাঁর দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী হওয়ার ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং কিতাবের নির্ধারিত সময় তখনও পূর্ণ হয়নি।
নববী(র.) বলেন, এ হাদিস থেকে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এই দিক থেকে যে - কিয়ামতের পূর্বের অনেক নিদর্শন রয়েছে, যেগুলো অবশ্যই সংঘটিত হবে। যেমনঃ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া, দাব্বাহ ও দাজ্জালের আগমন এবং অন্যান্য চিহ্নসমূহ। তাহলে সে সময় কিয়ামতের ভয় কীভাবে সম্ভব?
এর উত্তর হলো - সম্ভবত এই গ্রহণ ঘটেছিল নবী(ﷺ)কে এসব নিদর্শন সম্পর্কে অবহিত করার আগে। অথবা তিনি হয়তো এর কিছু পূর্বাভাস ঘটার আশঙ্কা করেছিলেন।” [30]
অর্থাৎ এমন হবার সম্ভাবনা আছে যে, হাদিসের বর্ণনাকারী সূর্যগ্রহণকালে নবী ﷺ এর শঙ্কিত অবস্থাকে রূপকভাবে বর্ণনা করেছেন যে নবী ﷺ ঠিক যেন কিয়ামতের আশঙ্কা করছেন। অথবা এমনও হতে পারে নবী ﷺ এর এই আশঙ্কা তখন ছিল যখন তাঁকে কিয়ামতের সেই আলামতগুলো ওহী মারফত জানিয়ে দেয়া হয়নি, যে আলামতগুলো সংঘটিত হবার আগে কিয়ামত হবে না। কিয়ামতের আলামতের হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে নবী ﷺ আদৌ তাঁর সময়কালে মহাপ্রলয় বা পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কা করতেন না। এ ব্যাপারে প্রবন্ধের শেষাংশে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে, ইন শা আল্লাহ।
৫। ইবন সাইয়াদের হাদিসঃ
ইসলামবিরোধীরা দাবি করে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ ইবন সাইয়াদ নামক এক ব্যক্তিকে দাজ্জাল বলে সন্দেহ করতেন। আর দাজ্জাল যেহেতু কিয়ামতের বড় আলামতের একটি, কাজেই তিনি ধারণা করতেন তাঁর সময়কালেই কিয়ামত হয়ে যাবে! তারা আরো বলে - একজন নবী কী করে কে দাজ্জাল (Antichrist) আর কে দাজ্জাল না এমন জিনিস নিয়ে সংশয়ে থাকেন? তারা নিম্নের হাদিসসমূহ পেশ করে এহেন প্রশ্ন উত্থাপন করে—
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ امْرَأَةً مِنَ الْيَهُودِ بِالْمَدِينَةِ وَلَدَتْ غُلَامًا مَمْسُوحَةٌ عَيْنُهُ طَالِعَةٌ نَابُهُ فَأَشْفَقَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إِن يَكُونَ الدَّجَّالَ فَوَجَدَهُ تَحْتَ قَطِيفَةٍ يُهَمْهِمُ. فَآذَنَتْهُ أُمُّهُ فَقَالَتْ: يَا عَبْدَ اللَّهِ هَذَا أَبُو الْقَاسِمِ فَخَرَجَ مِنَ الْقَطِيفَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا لَهَا قَاتَلَهَا اللَّهُ؟ لَوْ تَرَكَتْهُ لَبَيَّنَ فَذَكَرَ مِثْلَ مَعْنَى حَدِيثِ ابْنِ عُمَرَ فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ ائْذَنْ لِي يَا رَسُولَ اللَّهِ فَأَقْتُلَهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِن يكن هُوَ فَلَيْسَتْ صَاحِبَهُ إِنَّمَا صَاحِبُهُ عِيسَى بْنُ مَرْيَمَ وَإِلَّا يكن هُوَ فَلَيْسَ لَك أتقتل رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْعَهْدِ» . فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُشْفِقًا أَنَّهُ هُوَ الدَّجَّال. رَوَاهُ فِي شرح السّنة وَهَذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّالِثِ
অর্থঃ “জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক সময় মদীনার জনৈকা মহিলা এমন একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিল, যার এক চোখ মোছানো, মাঢ়ির দাঁতগুলো মুখের বাহির পর্যন্ত লম্বা, তাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই আশঙ্কা করেছিলেন যে, হয়তো সে-ই দাজ্জাল। অতঃপর একদিন তিনি (ﷺ) তাকে দেখলেন, সে একখানা চাদর জড়িয়ে শুয়ে গুনগুন করছে, তখন তার মা তাকে ডেকে বলল, হে ’আবদুল্লাহ! এই যে আবূল কাসিম। তখন সে চাদরের ভিতর হতে বের হলো, এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (বিরক্তির সুরে) বললেন, এ মহিলাটির কি হলো আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন, যদি সে তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিত, তাহলে প্রকৃত অবস্থা উদঘাটিত হয়ে যেত। অতঃপর বর্ণনাকারী জাবির ইবনু উমার (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসের মতো বর্ণনা করেন। তখন ’উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাকে হত্যা করে ফেলি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যদি সে প্রকৃত দাজ্জালই হয়, তবে তুমি তার হত্যাকারী নও, বরং তার হত্যাকারী হলেন ’ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ)। আর যদি সে প্রকৃত দাজ্জালই না হয়, তাহলে এমন এক লোককে হত্যা করা তোমার অধিকার নেই, যে নিরাপত্তা চুক্তির আওতার রয়েছে। বর্ণনাকারী জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন থেকে এই আশঙ্কা করতেন যে, হয়তো সে (ইবনু সাইয়্যাদ)-ই প্রকৃত দাজ্জাল।” [31]
وَقَالَ سَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، يَقُولُ انْطَلَقَ بَعْدَ ذَلِكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأُبَىُّ بْنُ كَعْبٍ الأَنْصَارِيُّ إِلَى النَّخْلِ الَّتِي فِيهَا ابْنُ صَيَّادٍ حَتَّى إِذَا دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم النَّخْلَ طَفِقَ يَتَّقِي بِجُذُوعِ النَّخْلِ وَهُوَ يَخْتِلُ أَنْ يَسْمَعَ مِنِ ابْنِ صَيَّادٍ شَيْئًا قَبْلَ أَنْ يَرَاهُ ابْنُ صَيَّادٍ فَرَآهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ مُضْطَجِعٌ عَلَى فِرَاشٍ فِي قَطِيفَةٍ لَهُ فِيهَا زَمْزَمَةٌ فَرَأَتْ أُمُّ ابْنِ صَيَّادٍ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَتَّقِي بِجُذُوعِ النَّخْلِ فَقَالَتْ لاِبْنِ صَيَّادٍ يَا صَافِ - وَهُوَ اسْمُ ابْنِ صَيَّادٍ - هَذَا مُحَمَّدٌ . فَثَارَ ابْنُ صَيَّادٍ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لَوْ تَرَكَتْهُ بَيَّنَ " . قَالَ سَالِمٌ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي النَّاسِ فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ ذَكَرَ الدَّجَّالَ فَقَالَ " إِنِّي لأُنْذِرُكُمُوهُ مَا مِنْ نَبِيٍّ إِلاَّ وَقَدْ أَنْذَرَهُ قَوْمَهُ لَقَدْ أَنْذَرَهُ نُوحٌ قَوْمَهُ وَلَكِنْ أَقُولُ لَكُمْ فِيهِ قَوْلاً لَمْ يَقُلْهُ نَبِيٌّ لِقَوْمِهِ تَعَلَّمُوا أَنَّهُ أَعْوَرُ وَأَنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى لَيْسَ بِأَعْوَرَ " . قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَأَخْبَرَنِي عُمَرُ بْنُ ثَابِتٍ الأَنْصَارِيُّ أَنَّهُ أَخْبَرَهُ بَعْضُ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ يَوْمَ حَذَّرَ النَّاسَ الدَّجَّالَ " إِنَّهُ مَكْتُوبٌ بَيْنَ عَيْنَيْهِ كَافِرٌ يَقْرَؤُهُ مَنْ كَرِهَ عَمَلَهُ أَوْ يَقْرَؤُهُ كُلُّ مُؤْمِنٍ " . وَقَالَ " تَعَلَّمُوا أَنَّهُ لَنْ يَرَى أَحَدٌ مِنْكُمْ رَبَّهُ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَمُوتَ " .
অর্থঃ “… … সালাম ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং উবায় ইবনু কাব (রাঃ) সেই খেজুর বাগানের দিকে চললেন, যেখানে ইবনু সায়্যাদ বসবাস করত। বাগানের মধ্যে এসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বৃক্ষের আড়ালে আত্মগোপন করতে চেষ্টা করছিলেন, যাতে ইবনু সায়্যাদ তাঁকে দেখার পূর্বে তিনি তার কথা শুনে নেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে দেখলেন যে, সে তার বিছানায় একটি চাঁদরে আবৃত অবস্থায় গুনগুন করে কি যেন বলছিল। এদিকে ইবনু সায়্যাদের মা রাসুলুল্লাহ ﷺ কে দেখল যে, তিনি বৃক্ষের আড়ালে আত্নগোপনের চেষ্টা করছেন। সে ততক্ষণাৎ ইবনু সায়্যাদকে বলে উঠলঃ হে সাফ! এটা ইবনু সায়্যাদের নাম। মুহাম্মাদ এসে গেছে। (এ কথা শুনতেই) ইবনু সায়্যাদ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ তার মা তাকে সাবধান না করলে সে পরিষ্কার বলে ফেলত। সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের উদ্দেশ্যে একটি বক্তৃতা দিলেন। তাতে আল্লাহ তা’আলার যথাযোগ্য প্রশংসা ও গুনকীর্তনের পর দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন এবং বললেনঃ আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ফিৎনা সম্পর্কে সতর্ক করছি যেমন প্রত্যেক নবী তাঁর সম্প্রদায়কে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এমনকি নূহ (আ.) ও তাঁর কাওমকে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তবে এ সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় পরিস্কারভাবে বলে দিচ্ছি যা কোন নবী তার সম্প্রদায়কে বলেননি। তা হল এই যে, তোমরা জেনে রাখ, দাজ্জাল কানা হরে। আল্লাহ তাআলা কানা নন। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর জনৈক সাহাবী তাকে অবহিত করেছেন যে, যে দিন রাসুলুল্লাহ ﷺ দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সে দিন তিনি বলেছেন, যে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের মাঝখানে কাফির (كافر) অথবা (ك ف ر) লেখা থাকবে। যে ব্যক্তি তার কার্যক্রম অপছন্দ করবে সে তা পাঠ করতে পারবে অথবা প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তই তা পাঠ করতে সক্ষম হবে। তিনি এও বলেছেন যে, তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতিপালককে দেখতে সক্ষম হবে না।” [32]
এই হাদিসসমূহের সরল অনুবাদ পাঠ করলেই বোঝা যায় ইসলামবিরোধীদের দাবি কতটা অসার এবং হাস্যকর। আলোচ্য হাদিসসমূহে দেখা যায় নবী ﷺ ইবন সাইয়াদকে দাজ্জাল বলে সন্দেহ করতেন, কিন্তু ইবন সাইয়াদ যে দাজ্জাল এটা তো তিনি কোথাও বলেননি! আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতেই আলোচনা করেছি যে, কোনো মানুষই সর্বজ্ঞানী না, গায়েবের জ্ঞান রাখে না। নবী(ﷺ)ও এর এর ব্যতিক্রম নন। আলোচ্য হাদিসগুলোর মাঝেও দেখা যায় নবী(ﷺ) তাঁর সাহাবীদেরকে ওহী মারফত দাজ্জালের কিছু চিহ্ন বা বৈশিষ্ট্য জানাচ্ছেন [দাজ্জাল কানা হবে,
তাঁর চক্ষুদ্বয়ের মাঝখানে কাফির (كافر) অথবা (ك ف ر) লেখা থাকবে] যেই বৈশিষ্ট্যগুলো ইবন সাইয়াদের ছিল না। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় ইবন সাইয়াদ দাজ্জাল ছিল না। আর ইবন সাইয়াদ যদি দাজ্জাল হয়েও থাকতো, তাহলেও সে কিয়ামতের প্রধান ১০টি আলামতের ১টি আলামত হতো, কিয়ামতের আরো আলামত আছে বলে নবী(ﷺ) জানিয়ে গেছেন, যেই আলামতগুলো না সংঘটিত হলে কিয়ামত হবে না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা প্রবন্ধের শেষাংশে রয়েছে] কাজেই ইবন সাইয়াদ এর হাদিস থেকে আদৌ প্রমাণ হয় না যে নবী(ﷺ) সেই সময়ে কিয়ামত হবে বলে আশঙ্কা করতেন।
আলোচ্য হাদিসগুলো প্রসঙ্গে ইমাম ইবন কাসির(র.) বলেছেন,
وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ هَذَا قَبْلَ أَنْ يُوحَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فِي أَمْرِ الدَّجَّالِ، وَتَعْيِينِهِ، وَقَدْ تَقَدَّمَ حَدِيثُ تَمِيمٍ الدَّارِيِّ فِي ذَلِكَ، وَهُوَ فَاصِلٌ فِي هَذَا الْمَقَامِ، وَسَنُورِدُ مِنَ الْأَحَادِيثِ مَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الدَّجَّالَ لَيْسَ بِابْنِ صَيَّادٍ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ، وَأَحْكَمُ.
অর্থঃ “সম্ভবত এটা তখনকার কথা যখন নবী ﷺ-কে দাজ্জালের ব্যাপারে ও তার নির্ধারণ নিয়ে ওহী প্রদান করা হয়নি। তামিম আদ-দারীর হাদিস আগেই আলোচনা হয়েছে, যা এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে। আমরা এমন কিছু হাদিস উল্লেখ করব, যা প্রমাণ করে যে দাজ্জাল ইবনু সাইয়াদ নয়। আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান।” [33]
ইবন কাসির(র.) আরো বলেছেন,
وَالْمَقْصُودُ أَنَّ ابْنَ صَيَّادٍ لَيْسَ بِالدَّجَّالِ الَّذِي يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ قَطْعًا، لِحَدِيثِ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ الْفِهْرِيَّةِ، فَإِنَّهُ فَيْصَلٌ فِي هَذَا الْمَقَامِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
অর্থঃ “মূল কথা হল, ইবনে সাইয়াদ নিঃসন্দেহে সেই দাজ্জাল নয় যে শেষ যুগে আবির্ভূত হবে। ফাতিমা বিনতে কায়েস আল-ফিহরিয়্যার হাদিস এর স্পষ্ট প্রমাণ, যা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দানকারী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।” [34]
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী(র.) এর শারহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَلَا شَكَّ فِي أَنَّهُ دَجَّالٌ مِنَ الدَّجَّاجِلَةِ، قَالَ الْعُلَمَاءُ: وَظَاهِرُ الْأَحَادِيثِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يُوحَ إِلَيْهِ بِأَنَّهُ الْمَسِيحُ الدَّجَّالُ وَلَا غَيْرُهُ، وَإِنَّمَا أُوحِيَ إِلَيْهِ بِصِفَاتِ الدَّجَّالِ، وَكَانَ فِي ابْنِ صَيَّادٍ قَرَائِنُ مُحْتَمِلَةٌ، فَلِذَلِكَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَقْطَعُ بِأَنَّهُ الدَّجَّالُ وَلَا غَيْرُهُ، وَلِهَذَا قَالَ لِعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: إِنْ يَكُنْ هُوَ فَلَنْ تَسْتَطِيعَ قَتْلَهُ۔
অর্থঃ "এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সে [ইবনে সাইয়াদ] ছিল দাজ্জালদের [মিথ্যাবাদীদের] মধ্যে একজন দাজ্জাল। আলিমগণ বলেছেন, হাদিসগুলোর স্পষ্ট অর্থ থেকে বোঝা যায় যে, নবী (ﷺ)-এর কাছে এই মর্মে ওহী প্রেরিত হয়নি যে সে মাসিহ দাজ্জাল নাকি অন্য কেউ। বরং তাঁকে শুধু দাজ্জালের বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে ওহী দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু ইবনে সাইয়াদের মধ্যে কিছু সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা গিয়েছিল যা সেই প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা যেত, তাই নবী (ﷺ) তাকে স্পষ্টভাবে দাজ্জাল বলে ঘোষণা দেননি বা অন্য কিছুও বলেননি।
এজন্যই নবী (ﷺ) উমার (রা.)-কে বলেছিলেন: "যদি সে সত্যিই দাজ্জাল হয়, তাহলে তুমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না।" "[35]
আমরা দেখলাম, মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন ইবন সাইয়াদের ঘটনা ছিল দাজ্জালের নির্ধারণ সম্পর্কে নবী(ﷺ) এর ওহী পাবার আগের ঘটনা। তাই স্বাভাবিকভাবেই ইবন সাইয়াদের মাঝে কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে সে দাজ্জাল কিনা এটি বোঝার চেষ্টা করতেন। পরবর্তীতে নবী(ﷺ) নিজেই বিভিন্ন হাদিসে দাজ্জালের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন যা থেকে দাজ্জাল সম্পর্কে আরো সম্যক ধারণা লাভ করা যায় এবং এটিও পরিষ্কার হয় যে ইবন সাইয়াদ দাজ্জাল ছিল না। নবী(ﷺ) উল্লেখ করেছেন - দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। অথচ ইবন সাইয়াদ মদিনার মাঝেই ছিল।
وَعَنْ أَبِي بَكْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ رُعْبُ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ لَهَا يَوْمَئِذٍ سَبْعَةُ أَبْوَابٍ عَلَى كُلِّ بَابٍ مَلَكَانِ»
অর্থঃ "আবূ বকরাহ্ (রাঃ) নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (ﷺ) বলেছেন: দাজ্জালের কোন ধরনের ভয়ভীতি মদীনার অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। (সে সময়) মদীনার সাতটি প্রবেশদ্বার থাকবে এবং প্রত্যেক দ্বারে দু’ দু’জন মালাক (ফেরেশতা) (পাহারা দেয়ার জন্য) নিয়োজিত থাকবেন।" [36]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَأْتِي الْمَسِيحُ مِنْ قِبَلِ الْمَشْرِقِ هِمَّتُهُ الْمَدِينَةُ حَتَّى يَنْزِلَ دُبُرَ أُحُدٍ ثُمَّ تَصْرِفُ الْمَلَائِكَةُ وَجْهَهُ قِبَلَ الشامِ وهنالك يهلِكُ»
অর্থঃ "আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাঃ) বলেছেন: মাসীহে দাজ্জাল পূর্বদিক থেকে আগমন করে মদীনাহ্ মুনাওয়ারায় প্রবেশ করতে চাইবে। এমনকি সে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত পৌছে যাবে। অতঃপর মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তার চেহারা (গতি) সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন এবং সেখানেই সে (ঈসা আলায়হিস সালাম-এর হাতে) ধ্বংস হবে।" [37]
আমরা ইতিমধ্যেই মুহাদ্দিসদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি যে তামিম দারী(র.) এর সুবিখ্যাত হাদিসের দ্বারাও প্রমাণ হয় ইবন সাইয়াদ দাজ্জাল ছিল না। তামিম দারী(রা.) স্বয়ং দাজ্জালকে একটি দ্বীপে বন্দী অবস্থায় পেয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে কথোপকথনও করেছিলেন। আর সেই হাদিসেও নবী(ﷺ) দাজ্জালের আরো কিছু চিহ্ন উল্লেখ করেন যা থেকেও স্পষ্ট হয় ইবন সাইয়াদ দাজ্জাল না।
وَعَن فَاطِمَة بنت قيس قَالَتْ: سَمِعْتُ مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا قَضَى صَلَاتَهُ جَلَسَ عَلَى الْمِنْبَرِ وَهُوَ يَضْحَكُ فَقَالَ: «لِيَلْزَمْ كُلُّ إِنْسَانٍ مُصَلَّاهُ» . ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ لِمَ جَمَعْتُكُمْ؟» . قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: إِنِّي وَاللَّهِ مَا جَمَعْتُكُمْ لِرَغْبَةٍ وَلَا لِرَهْبَةٍ وَلَكِنْ جَمَعْتُكُمْ لِأَنَّ تَمِيمًا الدَّارِيَّ كَانَ رَجُلًا نَصْرَانِيًّا فَجَاءَ فَبَايَعَ وَأَسْلَمَ وَحَدَّثَنِي حَدِيثًا وَافَقَ الَّذِي كُنْتُ أُحَدِّثُكُمْ بِهِ عَنِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ حَدَّثَنِي أَنَّهُ رَكِبَ فِي سَفِينَةٍ بَحْرِيَّةٍ مَعَ ثَلَاثِينَ رَجُلًا مِنْ لَخْمٍ وَجُذَامَ فَلَعِبَ بِهِمُ الْمَوْجُ شَهْرًا فِي الْبَحْر فأرفؤُوا إِلَى جَزِيرَةٍ حِينَ تَغْرُبُ الشَّمْسُ فَجَلَسُوا فِي أقرب سفينة فَدَخَلُوا الْجَزِيرَةَ فَلَقِيَتْهُمْ دَابَّةٌ أَهْلَبُ كَثِيرُ الشَّعَرِ لَا يَدْرُونَ مَا قُبُلُهُ مِنْ دُبُرِهِ مِنْ كَثْرَةِ الشَّعَرِ قَالُوا: وَيْلَكِ مَا أَنْتِ؟ قَالَتْ: أَنَا الْجَسَّاسَةُ قَالُوا: وَمَا الْجَسَّاسَةُ؟ قَالَتْ: أَيُّهَا الْقَوْمُ انْطَلِقُوا إِلَى هَذَا الرَّجُلِ فِي الدَّيْرِ فَإِنَّهُ إِلَى خَبَرِكُمْ بِالْأَشْوَاقِ قَالَ: لَمَّا سَمَّتْ لَنَا رَجُلًا فَرِقْنَا مِنْهَا أَنْ تَكُونَ شَيْطَانَةً قَالَ: فَانْطَلَقْنَا سِرَاعًا حَتَّى دَخَلْنَا الدَّيْرَ فَإِذَا فِيهِ أعظمُ إِنسان مَا رَأَيْنَاهُ قطُّ خَلْقاً وأشَدُّهُ وَثَاقاً مجموعةٌ يَده إِلَى عُنُقِهِ مَا بَيْنَ رُكْبَتَيْهِ إِلَى كَعْبَيْهِ بِالْحَدِيدِ. قُلْنَا: وَيْلَكَ مَا أَنْتَ؟ قَالَ: قَدْ قَدَرْتُمْ عَلَى خَبَرِي فَأَخْبِرُونِي مَا أَنْتُمْ؟ قَالُوا: نَحن أُناس من العربِ ركبنَا فِي سفينةٍ بحريّة فلعِبَ بِنَا الْبَحْر شهرا فَدَخَلْنَا الجزيرة فَلَقِيَتْنَا دَابَّةٌ أَهْلَبُ فَقَالَتْ: أَنَا الْجَسَّاسَةُ اعْمِدُوا إِلَى هَذَا فِي الدَّيْرِ فَأَقْبَلْنَا إِلَيْكَ سِرَاعًا وَفَزِعْنَا مِنْهَا وَلَمْ نَأْمَنْ أَنْ تَكُونَ شَيْطَانَةً فَقَالَ: أَخْبِرُونِي عَنْ نَخْلِ بَيْسَانَ قُلْنَا: عَنْ أَيِّ شَأْنِهَا تَسْتَخْبِرُ؟ قَالَ: أَسْأَلُكُمْ عَنْ نَخْلِهَا هَلْ تُثْمِرُ؟ قُلْنَا: نَعَمْ. قَالَ: أَمَا إِنَّهَا تُوشِكُ أَنْ لَا تُثْمِرَ. قَالَ: أَخْبِرُونِي عَنْ بُحَيْرَةِ الطَّبَرِيَّةِ قُلْنَا: عَنْ أَيِّ شَأْنِهَا تَسْتَخْبِرُ؟ قَالَ: هَلْ فِيهَا مَاءٌ؟ قُلْنَا هِيَ كَثِيرَةُ الْمَاءِ. قَالَ: أَمَا إِنَّ مَاءَهَا يُوشِكُ أَنْ يَذْهَبَ. قَالَ: أَخْبِرُونِي عَنْ عَيْنِ زُغَرَ. قَالُوا: وَعَنْ أَيِّ شَأْنِهَا تَسْتَخْبِرُ؟ قَالَ: هَلْ فِي الْعَيْنِ مَاءٌ؟ وَهَلْ يَزْرَعُ أَهْلُهَا بِمَاءِ الْعَيْنِ؟ قُلْنَا لَهُ: نعم هِيَ كَثِيرَة المَاء وَأَهله يَزْرَعُونَ مِنْ مَائِهَا. قَالَ: أَخْبِرُونِي عَنْ نَبِيِّ الْأُمِّيِّينَ مَا فَعَلَ؟ قُلْنَا: قَدْ خَرَجَ مِنْ مَكَّةَ وَنَزَلَ يَثْرِبَ. قَالَ: أَقَاتَلَهُ الْعَرَبُ؟ قُلْنَا: نَعَمْ. قَالَ: كَيْفَ صَنَعَ بِهِمْ؟ فَأَخْبَرْنَاهُ أَنَّهُ قَدْ ظَهَرَ عَلَى مَنْ يَلِيهِ مِنَ الْعَرَبِ وأطاعوهُ. قَالَ لَهُم: قد كانَ ذلكَ؟ قُلْنَا: نعم. قَالَ: أَمَا إِنَّ ذَلِكَ خَيْرٌ لَهُمْ أَنْ يُطِيعُوهُ وَإِنِّي مُخْبِرُكُمْ عَنِّي: إِنِّي أَنَا الْمَسِيحُ الدَّجَّالُ وَإِنِّي يُوشِكُ أَنْ يُؤْذَنَ لِي فِي الْخُرُوجِ فَأَخْرُجَ فَأَسِيرَ فِي الْأَرْضِ فَلَا أَدَعُ قَرْيَةً إِلَّا هَبَطْتُهَا فِي أَرْبَعِينَ لَيْلَةً غَيْرَ مَكَّةَ وَطَيْبَةَ هُمَا مُحَرَّمَتَانِ عَلَيَّ كِلْتَاهُمَا كُلَّمَا أَرَدْتُ أَنْ أَدْخُلَ وَاحِدَةً أَوْ وَاحِدًا مِنْهُمَا استقبلَني ملَكٌ بيدهِ السيفُ صَلْتًا يَصُدُّنِي عَنْهَا وَإِنَّ عَلَى كُلِّ نَقْبٍ مِنْهَا مَلَائِكَةً يَحْرُسُونَهَا. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - وَطَعَنَ بِمِخْصَرَتِهِ فِي الْمِنْبَرِ -: «هَذِه طَيْبَةُ هَذِهِ طَيْبَةُ هَذِهِ طَيْبَةُ» يَعْنِي الْمَدِينَةَ «أَلَا هَلْ كُنْتُ حَدَّثْتُكُمْ؟» فَقَالَ النَّاسُ: نَعَمْ فَإِنَّهُ أَعْجَبَنِي حَدِيثُ تَمِيمٍ أَنَّهُ وَافَقَ الَّذِي كُنْتُ أُحَدِّثُكُمْ عَنْهُ وَعَنِ الْمَدِينَةِ وَمَكَّةَ. أَلَا إِنه فِي بَحر الشَّأمِ أَو بحرِ اليمنِ لَا بل من قبل الْمشرق ماهو من قبل الْمشرق ماهو من قبل الْمشرق ماهو وَأَوْمَأَ بِيَدِهِ إِلَى الْمشرق.
অর্থঃ "ফাত্বিমাহ্ বিনতু কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -কে সালাতের জন্য ঘোষণা দিতে শুনতে পেলাম। সালাত শেষ করে তিনি (ﷺ) মিম্বারে উপবিষ্ট হলেন এবং মুচকি হেসে বললেন, প্রত্যেক লোক নিজ নিজ সালাতের স্থানে বসে থাক। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান, আমি তোমাদেরকে কেন একত্রিত করেছি? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তিনি (ﷺ) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে কিছু দেয়ার জন্য বা কোন ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য সমবেত করিনি; তোমাদেরকে একত্রিত করেছি বরং তামীম আদ্ দারী-এর বর্ণিত একটি ঘটনা শুনানোর জন্যই। তামীম আদ দারী ছিলেন একজন খ্রিস্টান, তিনি (আমার নিকট) এসে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি আমাকে এমন একটি ঘটনা শুনিয়েছেন, এটা ঐ কথারই সাথে মিল রাখে যা আমি তোমাদেরকে মাসীহে দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছিলাম। তিনি বলেছেন, একবার তিনি ’লাম ও জুযাম’ গোত্রের ত্রিশজন লোকের সঙ্গে একটি সামুদ্রিক নৌকায় সফরে বের হয়েছিলেন। সাগরের ঢেউ তাদেরকে দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত এদিক সেদিক ঘুরাতে ঘুরাতে পরিশেষে একদিন সূর্যাস্তের সময় একটি দ্বীপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে তারা এমন একটি জানোয়ার দেখতে পেলেন যার সমস্ত দেহ বড় বড় পশমে ঢাকা। অধিক পশমের কারণে তার অগ্র-পশ্চাৎ কিছুই নির্ণয় করা যায়নি। তখন তারা তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তোর অকল্যাণ হোক! তুই কে? সে বলল, আমি ’জাসসাসাহ্ (অর্থাৎ গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারিণী)। তোমাদের তথ্যাদি শুনার ও জানার প্রত্যাশী।
তামীম আদ দারী বলেন, উক্ত জন্তুর কাছে লোকটির কথা শুনে তার প্রতি আমাদের অন্তরে ভয় সঞ্চার হলো যে, তা জিন হতে পারে। তখন আমরা দ্রুত সেখানে গেলাম এবং গির্জায় প্রবেশ করে সেখানে এমন একটি প্রকাণ্ড দেহবিশিষ্ট মানুষ দেখতে পেলাম যা ইতোপূর্বে আমরা আর কখনো দেখতে পাইনি। সে ছিল খুব মজবুত করে বাঁধা অবস্থায়, তার হাত ঘাড়ের সাথে এবং হাঁটুদ্বয় নিচের উভয় গিটের সাথে লৌহশিকল দিয়ে একত্রে বাঁধা ছিল। আমরা তাকে বললাম, তোর অকল্যাণ হোক! তুই কে? সে বলল, নিশ্চয় তোমরা আমার সম্পর্কে জানতে পারবে, তবে তোমরা আগে আমাকে বল দেখি তোমরা কে? তারা বললেন, আমরা ’আরবের লোক। আমরা সমুদ্রে একটি নৌকায় আরোহী ছিলাম দীর্ঘ একমাস সাগরের তরঙ্গ আমাদেরকে এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে এখানে এনে পৌঁছিয়েছে। অতঃপর আমরা এ দ্বীপে প্রবেশ করার পর সারা দেহ ঘন লোমে আবৃত এমন একটি জন্তুর সাথে আমাদের দেখা হলো। সে বলল, আমি ’জাসসাসাহ্।
সে আমাদেরকে এ গির্জায় আসতে বলায় আমরা দ্রুত তোমার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছি।
সে বলল, আচ্ছা তোমরা আমাকে বল দেখি! বায়সান এলাকার খেজুর বাগানে ফল আসে কি? (বায়সান হিজাযের একটি জায়গার নাম) আমরা বললাম, হ্যা, আসে। সে বলল, সেই বাগানের গাছে অদূর ভবিষ্যতে ফল ধরবে না। অতঃপর সে বলল, আচ্ছা বল দেখি! ’তবারিয়্যাহ্’-এর নদীতে কি পানি আছে? আমরা বললাম, হ্যা, তাতে প্রচুর পরিমাণে পানি আছে। সে বলল, অচিরেই তার পানি শুকিয়ে যাবে। এবার সে প্রশ্ন করল, আচ্ছা বল দেখি! ’যোগার’ ঝরনার পানি আছে কি? আর তথাকার অধিবাসীগণ কি উক্ত ঝরনার পানি দ্বারা তাদের ক্ষেত-খামারে চাষাবাদ করে। অতঃপর সে প্রশ্ন করল, আচ্ছা বল দেখি! উম্মিদের নবীর সংবাদ কী? আমরা বললাম, তিনি মক্কাহ থেকে হিজরত করে বর্তমান ইয়াসরিব (মদীনায় অবস্থান করছেন। সে প্রশ্ন করল, বল দেখি! ’আরবরা কি তার সাথে লড়াই করেছিল? আমরা বললাম, হ্যা, করেছে। সে প্রশ্ন করল, তিনি (সে নবী) তাদের সাথে কি আচরণ করেছেন? এর উত্তরে আমরা বললাম যে, তার আশেপাশের ’আরবদের ওপরে তিনি জয়ী হয়েছেন এবং তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছে। এতদশ্রবণে সে বলল, তোমরা জেনে রাখ! তার আনুগত্য করাই তাদের পক্ষে কল্যাণজনক হয়েছে।
আচ্ছা এখন আমি আমার অবস্থা বর্ণনা করছি আমি মাসীহে দাজ্জাল, অদূর ভবিষ্যতে আমাকে বের হওয়ার অনুমতি প্রদান করা হবে। আমি বের হয়ে জমিনে বিচরণ করব। মক্কাহ্-মদীনাহ্ ছাড়া এমন কোন জনপদ বাকি থাকবে না, চল্লিশ দিনের মধ্যে যেখানে আমি প্রবেশ করব না। সেই দু স্থানে প্রবেশ করা আমার ওপরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যখনই আমি তার একটিতে প্রবেশ করতে চাইব, তখন নাঙ্গা তরবারি হাতে মালাক (ফেরেশতা) এসে আমাকে প্রবেশ করা হতে বাধা প্রদান করবে। মূলত তার প্রত্যেক প্রবেশ পথে মালাক পাহারারত রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, এ পর্যন্ত বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) - নিজ লাঠি দ্বারা মিম্বারে টোকা দিয়ে বললেন, এটা ত্বায়বাহ্, এটা ত্বায়বাহ্, এটা ত্বায়বাহ্ (মদীনাহ্)। অতঃপর তিনি (ﷺ) বললেন, বল দেখি! এর আগে আমি কি তোমাদেরকে এ হাদীস বর্ণনা করিনি? লোকেরা বলল, জী হ্যাঁ। অতঃপর তিনি (ﷺ) বললেন, দাজ্জাল সিরিয়ার কোন এক দরিয়ায় অথবা ইয়ামানের কোন এক দরিয়ায় আছে। পরে বললেন, না, বরং সে পূর্বদিক হতে আগমন করবে। এ বলে তিনি (ﷺ) হাত দ্বারা পূর্বদিকে ইঙ্গিত করলেন। " [38]
নবী(ﷺ) উল্লেখ করেছেন দাজ্জাল বের হবে পূর্বাঞ্চলের খুরাসান থেকে (যা বর্তমান আফগানিস্তান ও ইরানের অন্তর্ভুক্ত)। ইবন সাইয়াদের মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্যই ছিল না।
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ عَنْ أَبِي بَكْرٍ الصّديق قَالَ: حَدَّثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الدَّجَّالُ يَخْرُجُ مِنْ أَرْضٍ بِالْمَشْرِقِ يُقَالُ لَهَا: خُرَاسَانُ يَتْبَعُهُ أَقْوَامٌ كَأَنَّ وُجُوهَهُمُ المجانّ المطرقة
অর্থঃ "’আমর ইবনু হুরায়স (রহিমাহুল্লাহ) আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: দাজ্জাল পূর্বাঞ্চলের খুরাসান এলাকা থেকে বের হবে, এমন এক গোত্র তার আনুগত্য গ্রহণ করবে যাদের চেহারা হবে ঢালের মতো চ্যাপ্টা।" [39]
ইসলামবিরোধীরা অনেক সময়ে এই বলে সংশয়ের চেষ্টা করে যেঃ কোনো কোনো সাহাবী ইবন সাইয়াদকে দাজ্জাল বলেছেন। অতএব নবী(ﷺ) এর যেসব হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয় ইবন সাইয়াদ দাজ্জাল নয়, সাহাবীদের বক্তব্য এর সাথে সাংঘর্ষিক! যেমনঃ
وَعَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ قَالَ: رَأَيْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ يَحْلِفُ بِاللَّهِ أَنَّ ابْنَ الصَّيَّادِ الدَّجَّالُ. قُلْتُ: تَحْلِفُ بِاللَّهِ؟ قَالَ: إِنِّي سَمِعْتُ عُمَرَ يَحْلِفُ عَلَى ذَلِكَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يُنْكِرْهُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
অর্থঃ “মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে দেখেছি, তিনি আল্লাহর শপথ করে বলতেন যে, ইবনু সাইয়্যাদই দাজ্জাল। তখন আমি বললাম, আপনি আল্লাহর শপথ করে বলছেন? জবাবে তিনি বললেন, আমি ’উমার (রাঃ) কে এ সম্পর্কে নবী (ﷺ) -এর সামনে কসম করে বলতে শুনেছি, অথচ নবী (ﷺ) তাতে কোন আপত্তি করেননি।” [40]
হাদীস একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ’ গ্রন্থে এই সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনার ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে—
“অথবা বলা যায়, ‘উমার (রাঃ) দাজ্জাল দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন ইবনু সাইয়্যাদ ঐ সমস্ত দাজ্জালের একজন যারা নুবুওয়্যাত দাবী করবে অথবা মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে পথভ্রষ্ট করবে। প্রকৃতপক্ষে সে আসল দাজ্জাল নয়। যেহেতু রাসূল (ﷺ) নিজেই তার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না যা তার উক্তি থেকে প্রমাণিত হয়। তিনি তাকে বলেছিলেন, যদি সে দাজ্জাল হয় তাহলে তুমি তার হত্যাকারী নও, তাকে হত্যা করবে ‘ঈসা (আ.)। আর যদি সে না হয় তাহলে তাকে হত্যার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। এখানে ‘উমার (রাঃ) রাসূল -এর নিরবতার উপর প্রবল ধারণা করে কসম করেছেন এবং এটা তার জন্য বৈধ হয়েছে। [আল্লাহ সর্বাধিক ভালো জানেন।]
মিরকাত গ্রন্থকার বলেন, নবী (ﷺ) ‘উমার (রাঃ)-কে বাধা দেননি কারণ তিনি ঐ সমস্ত দাজ্জালদের একজন যাদের ব্যাপারে তিনি মানুষকে সতর্ক করেছিলেন এই বলে, (يَخْرُجُ فِي أُمَّتِي دَجَّالُونَ كَذَّابُونَ قَرِيبًا مِنْ ثَلاَثِينَ) “আমার এই উম্মতের মধ্যে ৩০ জনের মতো মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। আর ইবনু সাইয়্যাদ ঐ সমস্ত দলের একজন থেকে বাদ নয়। কেননা সে নবী (ﷺ)-এর উপস্থিতিকেই নুবুওয়্যাত দাবী করেছিল, তাই ‘উমার (রাঃ)-এর কসম করা সত্য বহির্ভূত হয়নি অথবা তিনি এর দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন তার মধ্যে দাজ্জালের কিছু গুণাবলি রয়েছে। আল্লাহই এ ব্যাপারে ভালো জানেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১৩দশ খণ্ড, হা. ৭৩৫৫; ‘আওনুল মাবুদ ৭ম খণ্ড, হা. ৪৩২৩)” [41]
অর্থাৎ সাহাবীর (রা.) এই বক্তব্যের মর্মার্থ হল ইবন সাইয়াদ ছিল একজন দাজ্জাল বা মিথ্যাবাদী, যেসব দাজ্জালদের ব্যাপারে নবী(ﷺ) সতর্ক করেছেন গেছেন। তবে এর অর্থ এই না যে সে কিয়ামতের পূর্বে আবির্ভূত হওয়া সেই বিশেষ মাসিহ দাজ্জাল। অর্থাৎ নবী(ﷺ) এর হাদিসের সাথে সাহাবীর বক্তব্যের কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই।
এমনকি যদি কোনো সাহাবী থেকে নবী(ﷺ) এর হাদিস থেকে স্পষ্ট হওয়া বিষয়ের বিপরীত কিছুও পাওয়া যেতো, তবুও তা নবী(ﷺ) এর স্পষ্ট হাদিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপরে বেশি প্রাধান্য পেতো না। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হতো সেই সম্মানিত সাহাবীর(রা.) নিকট এই প্রসঙ্গে নবী(ﷺ) এর হাদিস পৌঁছায়নি বা বিষয়টি তাঁর নিকট স্পষ্ট ছিল না।
এ প্রসঙ্গে নিম্নের আলোচনাটিও দেখা যেতে পারেঃ
Who was Saf Ibn Sayyad? Was he the Dajjal? - Assim al hakeem
কিয়ামতের অনেক আলামতের বর্ণনা প্রমাণ করে অতি দ্রুত কিয়ামত নিয়ে নবী(ﷺ) কোনো ভ্রান্ত ধারণা রাখতেন নাঃ
ওহী মারফত কিয়ামতের অনেকগুলো চিহ্ন বা লক্ষণ আমাদেরকে জানিয়ে গেছেন নবী(ﷺ)। কিয়ামতের এই বিপুল পরিমাণ আলামতকে ২টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ ছোট আলামত ও বড় আলামত।
কিয়ামতের ছোট আলামতের মধ্যে অন্যতম হলঃ
১. নবী ﷺ এর নবুয়ত লাভ।
২. নবী ﷺ এর মৃত্যু।
৩. বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয়।
৪. ফিলিস্তিনের “আমওয়াস” নামক স্থানে প্লেগ রোগ দেখা দেয়া।
৫. প্রচুর ধন-সম্পদ হওয়া এবং যাকাত খাওয়ার লোক না-থাকা।
৬. নানারকম গোলযোগ (ফিতনা) সৃষ্টি হওয়া। যেমন ইসলামের শুরুর দিকে উসমান (রাঃ) এর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া, জঙ্গে জামাল ও সিফফিন এর যুদ্ধ, খারেজিদের আবির্ভাব, হাররার যুদ্ধ, কুরআন আল্লাহর একটি সৃষ্টি এই মতবাদের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি।
৭. নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারদের আত্মপ্রকাশ। যেমন- মুসাইলামাতুল কাযযাব ও আসওয়াদ আনসি।
৮. হেজাযে আগুন বের হওয়া। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি ৬৫৪হিঃ তে এই আগুন প্রকাশিত হয়েছে। এটা ছিল মহাঅগ্নি। তৎকালীন ও তৎপরবর্তী আলেমগণ এই আগুনের বিবরণ দিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যেমন ইমাম নববী লিখেছেন- “আমাদের জামানায় ৬৫৪হিজরিতে মদিনাতে আগুন বেরিয়েছে। মদিনার পূর্ব পার্শ্বস্থ কংকরময় এলাকাতে প্রকাশিত হওয়া এই আগুন ছিল এক মহাঅগ্নি। সকল সিরিয়াবাসী ও অন্য সকল শহরের মানুষ তাওয়াতুর সংবাদের ভিত্তিতে তা অবহিত হয়েছে। মদিনাবাসীদের মধ্যে এক ব্যক্তি আমাকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, যিনি নিজে সে আগুন প্রত্যক্ষ করেছেন।”
৯. আমানতদারিতা না-থাকা। আমানতদারিতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার একটা উদাহরণ হচ্ছে- যে ব্যক্তি যে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নয় তাকে সে দায়িত্ব প্রদান করা।
১০. ইলম উঠিয়ে নেয়া ও অজ্ঞতা বিস্তার লাভ করা। ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে আলেমদের মৃত্যু হওয়ার মাধ্যমে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম এরসপক্ষে হাদিস এসেছে।
১১. ব্যভিচার বেড়ে যাওয়া।
১২. সুদ ছড়িয়ে পড়া।
১৩. বাদ্য যন্ত্র ব্যাপকতা পাওয়া।
১৪. মদ্যপান বেড়ে যাওয়া।
১৫. বকরির রাখালেরা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করা।
১৬. কৃতদাসী কর্তৃক স্বীয় মনিবকে প্রসব করা। এই মর্মে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমেহাদিস সাব্যস্ত হয়েছে। এই হাদিসের অর্থের ব্যাপারে আলেমগণের একাধিক অভিমত পাওয়া যায়। ইবনে হাজার যে অর্থটি নির্বাচন করেছেন সেটি হচ্ছে- সন্তানদের মাঝে পিতামাতার অবাধ্যতা ব্যাপকভাবে দেখা দেয়া। সন্তান তার মায়ের সাথে এমন অবমাননাকর ও অসম্মানজনক আচরণ করা যা একজন মনিব তার দাসীর সাথে করে থাকে।
১৭. মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়া।
১৮. অধিকহারে ভূমিকম্প হওয়া।
১৯. মানুষের আকৃতি রূপান্তর, ভূমি ধ্বস ও আকাশ থেকে পাথর পড়া।
২০. কাপড় পরিহিতা সত্ত্বেও উলঙ্গ এমন নারীদের বহিঃপ্রকাশ ঘটা।
২১. মুমিনের স্বপ্ন সত্য হওয়া।
২২. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া বেড়ে যাওয়া; সত্য সাক্ষ্য লোপ পাওয়া।
২৩. নারীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।
২৪. আরব ভূখণ্ড আগের মত তৃণভূমি ও নদনদীতে ভরে যাওয়া।
২৫. একটি স্বর্ণের পাহাড় থেকে ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর উৎস আবিষ্কৃত হওয়া।
২৬. হিংস্র জীবজন্তু ও জড় পদার্থ মানুষের সাথে কথা বলা।
২৭. রোমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং মুসলমানদের সাথে তাদের যুদ্ধ হওয়া।
২৮. কনস্টান্টিনোপল বিজয় হওয়া। [42]
কিয়ামতের কিছু আলামতের উল্লেখ আছে সুবিখ্যাত ‘হাদিসে জিব্রাঈল’ এ।
قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ قَالَ " مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ وَسَأُحَدِّثُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا إِذَا رَأَيْتَ الْمَرْأَةَ تَلِدُ رَبَّهَا فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا وَإِذَا رَأَيْتَ الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الصُّمَّ الْبُكْمَ مُلُوكَ الأَرْضِ فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا وَإِذَا رَأَيْتَ رِعَاءَ الْبَهْمِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا
অর্থঃ “তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত কখন ঘটবে? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে সে ব্যাক্তি প্রশ্নকারীর চাইতে অধিক অবহিত নয়। তবে আমি কিয়ামতের কিছু আলামত বর্ণনা করছি। যখন দেখবে, দাসী তার মুনিবকে জন্ম দেবে, এটা কিয়ামতের একটি আলামত। আর যখন দেখবে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, বধির ও মূকেরা দেশের শাসক হয়েছে, এটিও কিয়ামতের একটি আলামত। আর যখন দেখবে, মেষপালক বিরাট বিরাট অট্টালিকার প্রতিযোগিতায় গর্বিত, এটিও কিয়ামতের একটি আলামত।” [43]
এখানে কিয়ামতের বিপুল পরিমাণ আলামত থেকে অল্প কিছু আলামতের উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়ামতের আরো অনেক আলামত উল্লেখ করে আরো অনেক হাদিস রয়েছে। সেসব হাদিস সংকলন করে আলাদা বহু গ্রন্থ পর্যন্ত রচিত হয়েছে। [44] আমরা যদি এই আলামতগুলোর দিকে লক্ষ করি, তাহলে সহজেই বোঝা যাবে যে খুব অল্প সময়ে বা অল্প কয়েক বছরে এগুলো সংঘটিত হওয়া সম্ভব না। উপরে উল্লেখিত কিছু আলামত নবী ﷺ এর মৃত্যুর বহুকাল পরে সত্যে পরিণত হয়েছে। যেমন, হেজাযে আগুন বের হওয়ার ভবিষ্যতবাণী নবী ﷺ এর মৃত্যুর ৬০০ বছরেরও বেশি সময় পরে সত্যে পরিণত হয়েছে। কনস্টান্টিনোপল বিজয় হয়েছে ১৪৫৩ সালে মুহাম্মাদ আল ফাতিহ(র.) এর হাতে, নবী ﷺ এর মৃত্যুর সাড়ে ৮০০ বছরেরও বেশি সময় পরে। [45] বকরীর রাখালদের সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করার প্রতিযোগিতার আলামত সত্য হচ্ছে নবী ﷺ এর মৃত্যুর প্রায় ১৪০০ বছর পরে বিগত কয়েক দশক ধরে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো পরস্পর আকাশছোঁয়া অট্টালিকা বানানোর জন্য আক্ষরিকভাবেই প্রতিযোগিতা আরম্ভ করেছে। ইতিহাসে আর কখনো এমনটি দেখা যায়নি। এসব আরব দেশের মানুষদের পূর্বপুরুষ ছিল বকরীর রাখাল। এই বিষয়টি উল্লেখ করে ২০০৮ সালে সুবিখ্যাত ‘Arab News’ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে “Gulf States in Race to Build World's Tallest Tower” {পৃথিবীর উচ্চতম ভবন তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো}। [46] ব্যভিচার বেড়ে যাওয়া, সুদ ছড়িয়ে পড়া, বাদ্য যন্ত্র ব্যাপকতা পাওয়া, মদ্যপান বেড়ে যাওয়া, কাপড় পরিহিতা সত্ত্বেও উলঙ্গ এমন নারীদের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি আলামতগুলো বর্তমান সময়ে প্রকাশ পাচ্ছে যা নবী ﷺ এর যুগে বা তার পরের বহু যুগেও বর্তমানের ন্যায় দেখা যায়নি। আরব ভূখণ্ড আগের মত তৃণভূমি ও নদনদীতে ভরে যাওয়াসহ আরো কিছু আলামত এখনো সত্য হয়নি যেগুলো ভবিষ্যতে সত্যে পরিণত হবে ইন শা আল্লাহ।
নবী ﷺ একদম স্পষ্টভাবে কিয়ামতের ১০টি বড় আলামতের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো ঘটবার আগে কিয়ামত হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيدٍ الْغِفَارِيِّ، قَالَ اطَّلَعَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَيْنَا وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ فَقَالَ " مَا تَذَاكَرُونَ " . قَالُوا نَذْكُرُ السَّاعَةَ . قَالَ " إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ " . فَذَكَرَ الدُّخَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ صلى الله عليه وسلم وَيَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلاَثَةَ خُسُوفٍ خَسْفٌ بِالْمَشْرِقِ وَخَسْفٌ بِالْمَغْرِبِ وَخَسْفٌ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسَ إِلَى مَحْشَرِهِمْ .
অর্থঃ “হুযাইফাহ ইবনু আসীদ আল গিফারী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা (বিভিন্ন বিষয়ে) আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের কাছে আসলেন এবং প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি বিষয়ে আলোচনা করছ? উত্তরে তারা বললেন, আমরা কিয়ামতের ব্যাপারে আলোচনা করছি। এ কথা শুনে তিনি বললেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি বিশেষ আলামত দেখবে। তারপর তিনি ধুম্র, দাজ্জাল, দাব্বা, পশ্চিমাকাশ হতে সূর্যোদয় হওয়া, মারইয়াম পুত্র ঈসা (আঃ) এর অবতরণ, ইয়া’জুজ মা’জুজ এবং তিনবার ভূখণ্ড ধ্বসে যাওয়া তথা পূর্ব দিকে ভূখণ্ড ধ্বস, পশ্চিম দিকে ভূখণ্ড ধ্বস এবং আরব উপদ্বীপে ভূখণ্ড ধ্বসের কথা বর্ণনা করলেন। এ আলামতসমূহের পর এক অগ্ন্যুৎপাতের প্রকাশিত হবে, যা তাদেরকে ইয়ামান থেকে হাশরের মাঠ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।” [47]
এই ১০টি আলামত নবী ﷺ এর যুগে তো দূরের কথা, এর একটিও আজ অবধি সংঘটিত হয়নি। আগের বিপুল পরিমাণ কিয়ামতের ছোট আলামতের কথা বাদ দিলেও স্রেফ এই ১০টি আলামত সংঘটিত হতেও বেশ অনেক সময় প্রয়োজন। আল্লাহ তা’আলা থেকে ওহী পেয়ে নবী ﷺ একদম স্পষ্টভাবে মানবজাতিকে জানিয়ে গেছেন এই বিশেষ ঘটনাগুলো ঘটবার আগে মহপ্রলয় হবে না। আর নবী ﷺ এর উম্মাতও সেই অনুসারে অবহিত আছে যে কিয়ামত হতে এখনও কমপক্ষে এই ঘটনাগুলো ঘটবার পরিমাণ সময় বাকি আছে। কাজেই যারা দাবি করে কিয়ামত তাঁর একদম অল্প সময় পরে বা কয়েক বছর পরে অনুষ্ঠিত হবে বলে নবী ﷺ ভ্রান্ত ধারণা রাখতেন – তাদের দাবি সন্দেহাতীতভাবে ভুল প্রমাণিত হল।
তথ্যসূত্রঃ
[1] আল কুরআন, নামল ২৭ : ৬৫
[2] আল কুরআন, আ'রাফ ৭ : ১৮৭
[3] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭
[4] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭১৪০
https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=19463
আরো দেখুনঃ সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ২২১৭
[5] সহীহ ইবন হিব্বান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭৩
https://shamela.ws/book/537/4385
অথবা https://web.archive.org/web/20250511181535/https://shamela.ws/book/537/4385 (আর্কাইভকৃত)
[6] শারহ মুসলিম – ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আন-নববী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৫৫
https://shamela.ws/book/1711/1331
অথবা https://archive.is/wip/mm0iP (আর্কাইভকৃত)
[7] আত তাযকিরাতু বি আহওয়ালিল মাউতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ – আবুল আব্বাস আল কুরতুবী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১২২৯
https://shamela.ws/book/21536/1212
অথবা https://web.archive.org/web/20250511183510/https://shamela.ws/book/21536/1212 (আর্কাইভকৃত)
[8] আল কিয়ামাতুস সুগরা – উমার সুলাইমান আল আশকার, পৃষ্ঠা ১১৫
https://shamela.ws/book/9834/102
অথবা https://web.archive.org/web/20250511185051/https://shamela.ws/book/9834/102 (আর্কাইভকৃত)
[9] তাফসিরুল উসাইমিনঃ হুজুরাত-হাদিদ, পৃষ্ঠা ২৬১
https://shamela.ws/book/151166/252
অথবা https://web.archive.org/web/20250511191332/https://shamela.ws/book/151166/252 (আর্কাইভকৃত)
[10] আল কিয়ামাতুস সুগরা – উমার সুলাইমান আল আশকার, পৃষ্ঠা ১১৬
https://shamela.ws/book/9834/103
অথবা https://web.archive.org/web/20250511200804/https://shamela.ws/book/9834/103 (আর্কাইভকৃত)
[11] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭১৪২
[12] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৬৫১১
[13] ساعة In English - Translation and Meaning in English Arabic Dictionary of All terms
https://www.almaany.com/en/dict/ar-en/ساعة/
অথবা https://archive.is/wip/1IoRy (আর্কাইভকৃত)
[14] Sahih al-Bukhari 6511
[15] আল মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন - রাগিব ইসফাহানি, পৃষ্ঠা ৪৩৫
https://shamela.ws/book/23636/417
অথবা https://archive.is/wip/A3srV (আর্কাইভকৃত)
[16] ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৬৩
[17] Lane's Lexicon - Edward William Lane, Page 1468
https://lexicon.quranic-research.net/pdf/Page_1468.pdf
অথবা https://web.archive.org/web/20260109202315/https://lexicon.quranic-research.net/pdf/Page_1468.pdf (আর্কাইভকৃত)
[18] শারহ মুসলিম – ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আন-নববী, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৯০
https://shamela.ws/book/1711/4011
অথবা https://web.archive.org/web/20250511203437/https://shamela.ws/book/1711/4011 (আর্কাইভকৃত)
[19] তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ (হাদীস একাডেমী), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৬৯
[20] তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ (হাদীস একাডেমী), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৭১
[21] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩৪২৩
[22] ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৬৪
[23] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ১১৬
[24] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬২৫৫
[25] সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ২২৫১ (সহীহ)
[26] শারহ মুসলিম – ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আন-নববী, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ৯০
https://shamela.ws/book/1711/3581
অথবা https://web.archive.org/web/20250514180844/https://shamela.ws/book/1711/3581 (আর্কাইভকৃত)
[27] তুহফাতুল আহওয়াযী – আব্দুর রহমান আল মুবারকপুরী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৩৫
https://shamela.ws/book/21662/3172
অথবা https://web.archive.org/web/20250514183301/https://shamela.ws/book/21662/3172 (আর্কাইভকৃত)
[28] শারহু সহিহীল বুখারী – ইবন বাত্তাল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৯২
https://shamela.ws/book/10486/163
অথবা https://web.archive.org/web/20250514183527/https://shamela.ws/book/10486/163 (আর্কাইভকৃত)
[29] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ১০০০
[30] উমদাতুল ক্বারী – বদরুদ্দিন আল আইনী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৮৮
https://shamela.ws/book/5756/1957
অথবা https://web.archive.org/web/20250514192935/https://shamela.ws/book/5756/1957 (আর্কাইভকৃত)
[31] শারহুস্ সুন্নাহ ৩/৬০৮, মুসনাদে আহমাদ ১৪৯৯৮, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৫০৪ (হাসান)
[32] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭০৯০
[33] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইবন কাসির, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৮৩
https://shamela.ws/book/30097/7807
অথবা https://web.archive.org/web/20250514201538/https://shamela.ws/book/30097/7807 (আর্কাইভকৃত)
[34] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইবন কাসির, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৭৭
https://shamela.ws/book/30097/7801
অথবা https://web.archive.org/web/20250514201611/https://shamela.ws/book/30097/7801 (আর্কাইভকৃত)
[35] শারহ মুসলিম – ইয়াহইয়া ইবন শারাফ আন-নববী, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৪৬
https://shamela.ws/book/1711/3968
অথবা https://web.archive.org/web/20250514204029/https://shamela.ws/book/1711/3968 (আর্কাইভকৃত)
[36] বুখারী ১৮৭৯, মুসনাদে আহমাদ ২০৪৫৯, সহীহুল জামি ৭৬৭৮, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৪৮১ (সহীহ)
[37] মুসলিম ৪৮৬-(১৩৮০), মুসনাদে আহমাদ ৯১৫৫, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৪৮০ (সহীহ)
[38] মুসলিম ১১৯-(২৯৪২), আবূ দাউদ ৪৩২৬, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৪৮২ (সহীহ)
[39] তিরমিযী ২২৩৭, ইবনু মাজাহ ৪০৭২, সহীহুল জামি' ৩৪০৪, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৪৮৭ (সহীহ)
[40] বুখারী ৭৩৫৫, মুসলিম ৯৪-(২৯২৯), আবূ দাউদ ৪৩৩১, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫৫০০
[41] তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ (হাদীস একাডেমী), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৬০
https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=85478
আরো দেখুনঃ
https://www.islamweb.net/en/fatwa/27088/
অথবা https://archive.is/wip/ZNsp9 (আর্কাইভকৃত)
[42] দেখুনঃ “কেয়ামতের ছোট ও বড় আলামতসমূহ” (islamqa)
https://islamqa.info/bn/78329/
অথবা https://web.archive.org/web/20260111184743/https://islamqa.info/bn/answers/78329 (আর্কাইভকৃত)
[43] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭
[44] দেখুনঃ
কিয়ামতের আলামত - আব্দুল্লাহ্ শাহেদ আল-মাদানী
https://www.hadithbd.com/books/section/?book=21
কিয়ামতের আলামত - মুহাম্মদ ইকবাল কিলানী
[45] দেখুনঃ The Conquest of Constantinople (Islamweb)
https://www.islamweb.net/en/article/28648/the-conquest-of-constantinople
অথবা https://archive.is/wip/6cxd1 (আর্কাইভকৃত)
[46] Gulf States in Race to Build World's Tallest Tower (Arab News)
https://www.arabnews.com/node/309816
অথবা https://archive.is/wip/sVjgm (আর্কাইভকৃত)
[47] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭১৭৭