রাসুল(ﷺ) কর্তৃক মারিয়া কিবতিয়া(রা.)কে উপহার হিসাবে গ্রহণ প্রসঙ্গ

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

প্রশ্নঃ

নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) মিসরীয় মেয়ে মারিয়া কিবতিয়াকে উপহার হিসাবে গ্রহণ করেন। একজন নবী হয়ে তিনি কিভাবে দাসী উপহার নিতে পারেন? সেই দাসীর গর্ভে নাকি তাঁর সন্তানও হয়েছিলো। আর কোনো নবী কি এহেন কাজ করেছেন?

 

উত্তরঃ

নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান মিশনারীরা নবী করিম(ﷺ) এর ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে সমালোচনার যেসব বাণ ছোড়ে এর মধ্যে মারিয়া কিবতিয়া(রা.) প্রসঙ্গ অন্যতম। মিসরের শাসক মুকাওকিসকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন রাসুলুল্লাহ(ﷺ)। মুকাওকিস অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সে চিঠির জবাব দিয়েছিলেন। চিঠির সাথে কিছু উপঢৌকনও পাঠিয়েছিলেন। এই উপঢৌকনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া(রা.)। [1] মারিয়া কিবতিয়া(রা.) এর গর্ভে ইব্রাহিম নামে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর একজন সন্তানও জন্মেছিলেন। [2] নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রশ্ন হচ্ছেঃ একজন নবী হয়ে কী করে মুহাম্মাদ(ﷺ) দাসী উপহার নিতে পারেন বা দাসীর সন্তানের পিতা হতে পারেন? এটা কি কোনো নবীসুলভ কাজ?

 

নবী হলে দাসী হিসেবে কোনো নারীকে উপঢৌকন নেয়া যাবে না – এটা ইসলামবিরোধীদের বানানো একটা স্ট্যান্ডার্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। নবী-রাসুলের ধারণা আছে আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিষ্ট ও ইসলাম ধর্মে। এই তিন ধর্মের কোনো ধর্মগ্রন্থে এমন কিছু বলা নেই যে একজন নবী দাসী গ্রহণ করতে পারবেন না। বা কোনো নারীকে দাসী হিসাবে গ্রহণ করলে একজন মানুষের নবুয়ত ক্ষুণ্ণ হবে। বরং এর উল্টো তথ্যই এসব ধর্মের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। এই তিন ধর্মেই ইব্রাহিম(আ.) [Abraham] একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) অংশের বইগুলো ইহুদি ও খ্রিষ্ট এই দুই ধর্মালম্বীদের নিকটই দলিল হিসেবে বিবেচিত। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের বই ‘আদিপুস্তক’ (Genesis) এ উল্লেখ আছে, ইব্রাহিম(আ.) মিসরে গেলে সেখানকার শাসক তাঁকে সমাদর করে গবাদি পশু ও দাস-দাসী উপহার দেন। তিনিও তা সানন্দে গ্রহণ করেন।

 

“অব্রামকে [ইব্রাহিম(আ.)] সারীর ভাই মনে করে ফরৌণ অব্রামের প্রতি সদয় ব্যবহার করলেন। অব্রামকে ফরৌণ মেষ, গবাদি পশু এবং বোঝা বইবার জন্য গাধা দিলেন। সেই সঙ্গে দাসদাসী এবং উটও পেলেন অব্রাম।” [3]

 

বাইবেলের কিতাবুল মোকাদ্দস বাংলা অনুবাদে আলোচ্য অংশটি এভাবে আছেঃ

 

আর সারীর দরুন ফেরাউন ইব্রামের [বাইবেলে উল্লেখিত ইব্রাহিম(আ.) এর পূর্বনাম] সংগে ভাল ব্যবহার করতে লাগলেন। তিনি ইব্রামকে অনেক ভেড়া, গরু, গাধা, গাধী, উট এবং গোলাম ও বাঁদী দিলেন  [4]

 

ইংরেজি বাইবেলে এভাবে আছেঃ

 

“He treated Abram well because of her, and Abram acquired flocks and herds, male and female donkeys, male and female slaves, and camels.” [5]

 

বাইবেলের ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতে এ ব্যপারে আরো বিষদ আলোচনা আছে। [6]

 

শুধু তাই না, মিসরীয় এক দাসী হাগার [আরবি ‘হাজার’ বা বিবি হাজেরা] এর গর্ভে ইব্রাহিম(আ.) এর সন্তান ইসমাঈল(আ.) জন্মেছিলেন বলে বাইবেলে উল্লেখ আছে।

 

“ইশ্মায়েলের বংশ বৃত্তান্ত এই। অব্রাহাম ও হাগারের পুত্র ছিলেন ইশ্মায়েল। (হাগার ছিলেন সারার মিশরীয় দাসী।)” (BBS)

“These are the family records of Abraham’s son Ishmael, whom Hagar the Egyptian, Sarah’s slave, bore to Abraham.” (HCSB) [7]

 

ইহুদিদের মিদরাসের বর্ণনা অনুযায়ী এই হাগার বা বিবি হাজেরা ছিলেন মিসরের ফেরাউনের কন্যা। [8]

ইসলামী সূত্রগুলোতেও অনুরূপ ঘটনা উল্লেখ আছে। [9]

 

উপহার হিসাবে দাসী গ্রহণ করা কিংবা দাসীর গর্ভে সন্তান জন্ম দেয়া – বাইবেলে এসবের জন্য ইব্রাহিম(আ.)কে মোটেও নিন্দা করা হয়নি বরং এগুলোকে খুবই স্বাভাবিক ও বৈধ কাজ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইবেলে বারংবার তাঁকে “ঈশ্বরের বন্ধু” বলে অভিহীত করা হয়েছে। [10] ইব্রাহিম(আ.) এর এই সর্বোচ্চ সম্মানের অভিধার সাথে ইসলাম একমত। আল কুরআনে ইব্রাহিম(আ.)কে ‘খলিলুল্লাহ’ বা “আল্লাহর বন্ধু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [11]

 

আমরা দেখলাম যে, বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী ইব্রাহিম(আ.) মিসরের শাসকের নিকট থেকে দাসী উপহার নিয়েছেন। এবং মিসরীয় দাসীর গর্ভে তাঁর সন্তানও হয়েছে। কিন্তু খ্রিষ্টান মিশনারীরা কখনো এ জন্য ইব্রাহিম(আ.) এর নবুয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। খ্রিষ্টান মিশনারীদের নিকট ইব্রাহিম(আ.) হচ্ছেন ঈশ্বরের নবী এবং ঈশ্বরের বন্ধু। কিন্তু একই জিনিস মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বেলায় হলে তাদের আপত্তির আর শেষ থাকে না। মারিয়া কিবতিয়া(রা.)কে উপহার হিসেবে গ্রহণ করা কিংবা তাঁর গর্ভে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সন্তান হবার বিবরণ সিরাত গ্রন্থে এলেই খ্রিষ্টান মিশনারীরা তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে।

কেন এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড?

 

সত্য সন্ধানী হলে নবুয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা তো দূরের কথা বরং একজন এখানে ইব্রাহিম(আ.) এর সাথে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সাদৃশ্য খুঁজে পাবে। এটা তার কাছে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের স্বপক্ষে দলিল হতে পারে। এখানে পুরো ব্যাপারটি যেমন নবী ইব্রাহিম(আ.) এর ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, রাসুল(ﷺ) মারিয়া(রা.) এর গর্ভে জন্মানো সন্তানটির নামও রাখেন 'ইব্রাহিম'! সুবহানাল্লাহ। 

 

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, “রাত্রে আমার একটি সন্তান জন্মলাভ করে, আমি তার নাম আমার পিতা (পূর্বপুরুষ) ইব্রাহিম(আ.) এর নামে রাখি। ...” [12]

 

নাস্তিকরা স্রষ্টাতেই বিশ্বাসী না। ‘নবী-রাসুল’ বলে তাদের নিকট কোনো কিছু নেই। কাজেই কিভাবে একজন মানুষ নবী হয় অথবা কী কারণে একজন নবী হতে পারে না – এমন কিছু বলার ব্যাপারে খেয়াল-খুশী ব্যতিত তাদের কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। একজন নবীর কেমন হওয়া উচিত - এ ব্যাপারে তাদের দাবির কোনো মূল্যই নেই। কেননা তা নেহায়েতই তাদের খেয়াল-খুশী বা তাদের নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ডের ভিত্তিতে বলা। সত্য সব সময় যে তাদের খেয়াল-খুশী বা তাদের স্ট্যান্ডার্ডের অনুগামী হবে এমন কোনো কথা নেই।

 

এখন তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন আসতে পারে— ২১ শতকের একজন মানুষ হয়ে আপনি কিভাবে মেনে নিতে পারেন যে একজন মহাপুরুষ একজন নারীকে দাসী হিসাবে উপহার নিয়েছেন? এটা কতটুকু নৈতিক?

 

এর উত্তরে আমরা বলিঃ  আমাদের নিকট নৈতিকতার মানদণ্ড হচ্ছে ওহী। কুরআন ও সুন্নাহ হচ্ছে ওহী। ইসলামে কিছু কিছু শর্তের ভিত্তিতে দাসপ্রথাকে বৈধ করা হয়েছে। দাস প্রথা ইসলামে অত্যাবশ্যক কিছু না হলেও বৈধ জিনিস। প্রাচীন কালে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির অপর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকট উপঢৌকন হিসাবে দাস-দাসী প্রেরণ করা খুবই স্বাভাবিক ও প্রচলিত রীতি ছিলো। এভাবে উপঢৌকন হিসাবে দাস-দাসী পেলে তা গ্রহণ করা ইসলামে বৈধ।  রাসুলুল্লাহ(ﷺ) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হুকুমের ভেতরে থেকেই মারিয়া কিবতিয়া(রা.)কে গ্রহণ করেছেন। তিনি যা করেছেন তা বৈধ। কাজেই আমাদের নিকট তা মোটেও আপত্তিজনক কিছু নয়। আমাদের নৈতিকতার মানদণ্ড সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না কেননা তা স্বয়ং স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত। বরং যারা নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে সময়ের সাথে সাথে নিজেদের নৈতিকতার মানদণ্ডকে পাল্টে ফেলে, তাদের ব্যাপারেই আমরা মুসলিমরা প্রশ্ন তুলি।

 

 এ প্রসঙ্গে এই লেখাটিও পড়া যেতে পারেঃ

“মালাকাত আইমানুহুম - মারিয়া কিবতিয়া(রা)”

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আর রাহিকুল মাখতুম—শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স], পৃষ্ঠা ৪০৫-৪০৭

[2]  আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—ইবন কাসির(র.) [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ] ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৮

[3]  বাইবেল [বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি (BBS) অনুবাদ], আদিপুস্তক ১২ : ১৬

[4]  বাইবেল [কিতাবুল মোকাদ্দস অনুবাদ], পয়দায়েশ ১২ : ১৬

[5]  Bible [Holman Christian Standard Bible (HCSB)], Genesis 12 : 16

[6]  ■ Rashi Commentary on Bereishit (Genesis) 12 : 16

http://tiny.cc/gobx8y

■ Gill's Exposition on Genesis 12 : 16

https://biblehub.com/commentaries/gill/genesis/12.htm

[7]  বাইবেল , আদিপুস্তক (Genesis) ২৫ : ১২

[8]  “HAGAR - JewishEncyclopedia”,  Volume 6, Page 138 (In Rabbinical Literature)

http://www.jewishencyclopedia.com/articles/7021-hagar

[9]  আর রাহিকুল মাখতুম—শফিউর রহমান মুবারকপুরী(র.) [তাওহীদ পাবলিকেশন্স], পৃষ্ঠা ৩৮

[10]  দেখুনঃ বাইবেল, যিশাইয় (Isaiah) ৪১ : ৮; ২ বংশাবলী (2 Chronicles) ২০ : ৭; যাকোবের পত্র (James) ২ : ২৩

[11]  আল কুরআন, নিসা ৪ : ১২৫

[12] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৮১৮