শয়তান কি ঈমানদার মুসলিমকে ভুলপথে চালিত করতে পারে?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) স্ববিরোধিতা সংক্রান্ত



স্ববিরোধিতার অভিযোগঃ শয়তান কি ঈমানদার মুসলিমকে ভুলপথে চালিত করতে পারে? – না (Quran 38:82-83) এবং হ্যাঁ (Quran 7:16-17) !

 

জবাবঃ সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো নিচে উল্লেখ করা হল।

 

( 16 )   قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ

( 17 )   ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ

অর্থঃ “ সে [শয়তান] বললঃ আপনি আমাকে যেমন উদভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের [মানবজাতি] জন্যে আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। “[1]

 

( 82 )   قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ

( 83 )   إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ

অর্থঃ “ সে [শয়তান] বলল, আপনার মর্যাদার শপথ, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেব।

তবে তাদের মধ্যে যারা আপনার একনিষ্ঠ বান্দা, তাদেরকে ছাড়া। “[2]

 

আলোচ্য আয়াতগুলোতে অর্থাৎ সুরা আ’রাফ ৭:১৬-১৭ ও সুরা ছোয়াদ ৩৮:৮২এ শয়তানের কিছু উক্তি আলোচিত হয়েছে যেখানে সে ঘোষণা দিচ্ছে যে সে মানবজাতির সবাইকে পথভ্রষ্ট করবে। সুরা ছোয়াদ ৩৮:৮৩ এ একটি নতুন তথ্য আছে আর তা হচ্ছে যাদেরকে শয়তান পথভ্রষ্ট করবে তাদের মধ্যে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা শামিল নয়।

শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা রাখে কি রাখে না, তার উত্তর শয়তানের নিজের এ উক্তির মাঝেই লুকিয়ে আছে। শয়তান নিজেই বলছে যে-- আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের সে পথভ্রষ্ট করবে না বা করতে পারবে না।

কেন?

কারণ আল্লাহর একনিষ্ট বান্দারা আল্লাহভীরু হয়, তাঁরা শয়তানের পথ অনুসরণের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। যারা শয়তানের পথ অনুসরণ করে, শয়তান শুধু তাদেরকেই পথভ্রষ্ট করে বা করতে পারে।

পুরো ব্যাপারটি কুরআনের অন্য কিছু আয়াতে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

 

 ( 39 )   قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ

( 40 )   إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ

( 41 )   قَالَ هَٰذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ

( 42 )   إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ

( 43 )   وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ

অর্থঃ “ সে [শয়তান] বললঃ হে আমার প্রভু, আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ঠ করে দেব। আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতিত।

তিনি [আল্লাহ] বললেনঃ এটা আমার নিকট আসার সোজা পথ।

নিশ্চয়ই বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে তারা ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোর কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। তাদের সবার নির্ধারিত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। “ [3]

 

অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাদের উপর শয়তানের এমন কোন ক্ষমতা নেই যে সে বান্দাদের খারাপ কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। সে কেবল মানুষকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিতে পারে। যারা শয়তানের কুমন্ত্রণার অনুসরণ করে, শয়তানের পথে চলে, তারা পথভ্রষ্ট হয়। এ টুকু ক্ষমতাই কেবল শয়তানের আছে। কুরআনে বলা হয়েছে—

 

كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ

 অর্থঃ “তারা শয়তানের মত, যে মানুষকে কাফির হতে বলে। অতঃপর যখন সে কাফির হয়, তখন শয়তান বলেঃ তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করি।“ [4]

 

যারা শয়তানের পথে চলে না, আল্লাহর শরণ নেয়, শয়তান তাদের উপর কোন প্রভাব খাটাতে পারে না।

 

  وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

অর্থঃ “যদি শয়তানের পক্ষ থেকে তুমি কিছু কুমন্ত্রণা অনুভব কর, তবে আল্লাহর শরণাপন্ন হও। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [5]

 

সুরা হিজর ১৫:৩৯-৪৩ প্রসঙ্গে ইয়াজিদ ইবন কুসাইত(রা) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন নবী তাঁর মসজিদে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় আল্লাহর শত্রু অর্থাৎ ইবলিস শয়তান তাঁর ও তাঁর কিবলার মাঝে বসে পড়ে। তখন ঐ নবী ৩ বার বলেনঃ

اعوذ بالله من الشيطان الرجيم

অর্থাৎ, “আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইছি।”

 তখন আল্লাহর শত্রু [শয়তান] সেই নবীকে বলে, “কী করে আপনি আমার অনিষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন? সেই খবর আমাকে দিন।”

নবী(আ) তখন তাকে বলেন, “তুমি বরং আমাকে খবর দাও কিভাবে তুমি আদমের বংশধরের উপর জয়যুক্ত হয়ে থাকো।”

এভাবে তারা একে অপরকে আগে জবাব দেয়ার জন্য তাগিদ দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত  নবী(আ) তাকে বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, নিশ্চয়ই বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোর অনুসরন করবে তারা ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোর কোন কর্তৃত্ব থাকবে না।

তখন আল্লাহর দুশমন ইবলিস বলল, এটা তো আমি আপনার জন্মেরও আগে থেকে জানি।

তার এ কথা শুনে নবী(আ) বললেন, আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, যদি শয়তানের পক্ষ থেকে তুমি কিছু কুমন্ত্রণা অনুভব কর, তবে আল্লাহর শরণাপন্ন হও। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

আল্লাহর শপথ! আমার কাছে তোর আগমনের খবর জানা থাকে না, কিন্তু তার আগেই আমি আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকি।

আল্লাহর শত্রু [ইবলিস শয়তান] তখন বললঃ আপনি সত্য বলেছেন, এর দ্বারাই আপনি আমার (কুমন্ত্রণা) থেকে মুক্তি পাবেন। ...” [6]

 

উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হল যে, শয়তানের মানুষকে ভুল পথে চালিত করার ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষ। যারা শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায়, তাদের উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই। আর যারা পথভ্রান্ত ও শয়তানের পথে চলে, শয়তান কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। এ তথ্যগুলোই আলোচ্য আয়াতগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব আয়াতগুলোতে কোন প্রকার স্ববিরোধিতা নেই।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, আ’রাফ ৭:১৬-১৭

[2]  আল কুরআন, ছোয়াদ ৩৮:৮২-৮৩

[3]  আল কুরআন, হিজর ১৫:৩৯-৪৩

[4]  আল কুরআন, হাশর ৫৯:১৬

[5]  আল কুরআন, আ’রাফ ৭:২০০

[6]  তাবারী ১৭/১০৫; তাফসির ইবন কাসির, ৪র্থ খণ্ড(হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী), সুরা হিজরের ৩৯-৪৩নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ৩৯৯-৪০০