আধুনিকতাবাদী অপব্যাখার শিকার নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত একটি সহিহ হাদিস

নারী



 

লিখেছেনঃ সাদাত (সদালাপ ব্লগ)

 

আবু বাকরাহ রা. বলেন:

উষ্ট্রের যুদ্ধের সময় আল্লাহ একটি কথার দ্বারা আমাকে উপকৃত করেছেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এই কথা পৌঁছল যে পারস্যবাসী কিসরার কন্যাকে তাদের শাসনকর্তা বানিয়েছে তিনি বললেন:

{ لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَة ً}

 কোন জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না যদি তারা কোন নারীকে তাদের শাসনকর্তা বানায়।

সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭০৯৯

[দেখুন: https://sunnah.com/bukhari/92/50]

 

বর্তমানকালের কোন কোন আধুনিকতাবাদী মুসলিম স্কলার বলার চেষ্টা করছেন যে এই হাদিসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবলমাত্র সেই সময়কার পারস্যের অধিবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সকল জাতিকে উদ্দেশ্য করে নয়। এই দাবির যৌক্তিকতা কতটুকু আসুন একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক।

 

প্রথমত আরবী ব্যাকরণ অনুসারে এই হাদিসে অনির্দিষ্টভাবে সকল জাতিকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

বলা হয়েছে:

(لَنْ)  লান – Never – কক্ষনো নয়

(يُفْلِحَ) ইয়ুফলিহা – Will succeed – সফলকাম হবে

(قَوْمٌ) কওমুন – a nation – একটি জাতি / কোন জাতি

(لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ) = কোন জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না

 

এখানে 

(قَوْمٌ) /কওমুন =একটি জাতি/কোন জাতি

না বলে যদি

(هذا القوم)/হাযাল কওমু=এই জাতি

বলা হতো তাহলে আধুনিকতাবাদী স্কলারদের এ ধরণের দাবির একটি সুযোগ থাকতো। কিন্তু আরবী ব্যাকরণ অনুসারে এই ব্যাপক/সাধারণ বাক্যকে কোনভাবেই  একটিমাত্র জাতির জন্য নির্দিষ্ট করার সুযোগ নেই।

 

দ্বিতীয়ত,

হাদিসটি কে বর্ণনা করছেন?

আবু বাকরাহ রা.

কোন্ সময়ের কথা তিনি বলছেন?

উষ্ট্রের যুদ্ধের কথা

তাহলে আমরা সংক্ষেপে একটু উষ্ট্রের যুদ্ধ কী সেটা জেনে নিই।

উসমান রা. শহীদ হবার পর আলী রা. খলিফা হন। কথা ছিল তিনি উসমান রা. হত্যার বিচার করবেন। কিন্তু সেই সময়কার পরিস্থিতিতে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততর সময়ে করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। এই বিলম্ব অনেককেই ক্ষুদ্ধ করে, যাদের মধ্যে তালহা রা., যুবায়ের রা. এবং আয়েশা রা. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরই প্রেক্ষিতে দুইপক্ষ মুখোমুখি হন। অত:পর তাদের মধ্যে একটি সমঝোতাও প্রায় হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত খুনীরা তথা মুসলিমরূপী ছদ্ধবেশী ইহুদি ইবনে সাবার দল কিছুতেই এই সমঝোতা হতে দিতে চায়নি। ফলে রাতের অন্ধকারে তারা উভয়পক্ষের শিবিরে আক্রমণ করে। ফলে এক পক্ষ অন্যপক্ষ হতে আক্রমণ হয়েছে মনে করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

 

এই অনাকাক্ষিত যুদ্ধের সময় আবু বাকরাহ রা. যখন আয়েশা রা. এর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন, তখন  { لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَة ً} এই হাদিসটি তার মনে পড়ে যায় এবং এর দ্বারা তিনি উপকৃত হন ও বিরত থাকেন। এই কথাই হাদিস বর্ণনার শুরুতে বলা হয়েছে।

যদি হাদিসটি কেবল পারস্যবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলা হতো তবে আবু বাকরাহ রা. এই হাদিসের দ্বারা কীভাবে উপকৃত হলেন? তিনি কেন এই হাদিসকে নিজের জন্য এমন কি মুসলিমদের জন্যও প্রযোজ্য বলে মনে করলেন?

এর কারণ সুস্পষ্ট। কারণ হাদিসটিতে সামান্যতম কোন অস্পষ্টতা না রেখে সর্বকালের সকল জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে আমাদের আধুনিকতাবাদী স্কলাররা হাদিস বর্ণনাকারীর চেয়ে হাদিসটি বেশি বুঝে ফেলেছেন!

কাজেই স্বয়ং হাদিসের বর্ণনাকারী যেখানে হাদিসকে সকল জাতির জন্য ব্যাপক বলে বুঝেছেন, ব্যাকরণগতভাবেও যেটা বুঝা যায়, ১৪০০ বছর ধরে কোটি কোটি উলামায়ে কেরামও যেভাবে বুঝে এসেছেন সেটাই সঠিক ও সরল বুঝ। কেউ যদি এর বিপরীতে কতিপয় আধুনিকতাবাদী স্কলারের কথায় এই সহজ ও সরল, স্পষ্ট বুঝ থেকে বিচ্যুত হয় সেটা তার নিজস্ব ইচ্ছা।

 

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

প্রশ্ন আসতে পারে, এই রকম হাদিস থাকা সত্ত্বেও আয়েশা রা. কেন যুদ্ধের নেতৃত্ব দিলেন? উত্তরে বলা যায় আয়েশা রা. নেতৃত্ব দেবার উদ্দেশে আসেন নাই। তিনি এসেছিলেন উসমান রা. হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে। একটি অপরিকল্পিত যুদ্ধে তিনি জড়িয়ে পড়েন। ময়দানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যুবায়ের রা. ও তালহা রা., তিনি উটের পিঠে হাওদায় বসা ছিলেন। কিন্তু সেখানে তার উপস্থিতির কারণে তিনিও নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসেন। হতে পারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত হাদিসটি তখন পর্যন্ত তার জানা ছিল না। অথবা এটি তার একটি ভুল ছিল। তবে তার এই কর্মকাণ্ডকে যদি আমরা নারী নেতৃত্ব বলে ধরে নেই তবে বলতেই হবে সেই নেতৃত্বের পরিণতি ছিল পরাজয় এবং উভয়পক্ষের ১০০০০ মুসলিমের মৃত্যুবরণ। অবশ্য আমারা বিশ্বাস করি শুদ্ধ নিয়্যতের কারণে উভয়পক্ষের কেউই গুনাহগার হবেন না।

 

কেউ যদি আয়েশা রা. এর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারী নেতৃত্বের বৈধতা পেতে চায় তবে আয়েশা রা. এর এই বক্তব্য তার জানা উচিত-

আয়েশা রা. বলেন:

যদি নারীরা কী করছে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন তবে তিনি তাদের মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন যেমন বনী ইসরাইলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল। (দেখুন সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৮৬৯)

https://sunnah.com/bukhari/10/260

যিনি নারীদের মসজিদে যাওয়াকেই পছন্দ করতেন না, তার একটি অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নারী নেতৃত্বকে বৈধতা দানের প্রয়াস হাস্যকর।

 

একটি সংশয়

হাদিসটি নিয়ে আরেকটি সংশয় প্রকাশ করে কেউ কেউ বলেন হাদিসটি নাকি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ অনেক জাতি নাকি নারীর নেতৃত্বে সফল হয়েছে। তাদের উদাহরণগুলো দেখলেই বুঝা যায় তারা সফলতা বলতে বুঝেছেন পার্থিব উন্নতি। তাদের দেওয়া উদাহরণ নিয়ে আলোচনা না করে বলতে চাই, সফলতাকে নিজের মনমতো সংজ্ঞায়িত না করে একজন মুসলিমের উচিত সফলতার ইসলামী সংজ্ঞাটি জেনে নেওয়া। সফলতার অনেক সংজ্ঞাই পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য শুধুমাত্র কুরআনের শুরুতে বর্ণিত সফলতার সংজ্ঞাটি উল্লেখ করছি:

এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে
এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।
তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২-৫)

 

কাজেই,

আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই সফলতা মানুষের জন্য কামনা করেন সেই সফলতা হচ্ছে হেদায়েত লাভ এবং ঈমান ও আমলে উন্নতি সাধনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী আযাব থেকে বেঁচে যাওয়া।

 

সেই সফলতা নারী নেতৃত্বের মাধ্যমে আসবে না, আলোচ্য হাদিসে এটিই বলা হয়েছে।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সদালাপ ব্লগ

মূল আর্টিকেলের লিঙ্কঃ http://shodalap.org/bngsadat/41250/