Pray for the world economy

ইসলামে নারীদেরকে কি পুরুষদের তুলনায় কম অধিকার দেয়া হয়েছে?

 

☛ মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

☛ অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

অনুবাদকের ভূমিকাঃ ইসলামে নারীদের অধিকার কি পুরুষের তুলনায় কম? ইসলামে কি নারীদেরকে কম সুবিধা দেয়া হয়েছে? নারীরা কি আল্লাহর নিকট পুরুষের সমান পুরষ্কার পাবে? ইসলামের সমালোচকদের থেকে হরহামেশাই এমন সব প্রশ্ন শোনা যায়। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েই এই আলোচনা।

 

ফতোয়া নং ১২৮৪০: পুরষ্কার ও শাস্তির ক্ষেত্রে নারীরা কি পুরুষের সমান?

 

প্রশ্নঃ

কিছু লোক দাবি করে নারীদের বুদ্ধি, দ্বীন, মিরাস এবং সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে কমতি রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তাদেরকে পুরষ্কার ও শাস্তির ক্ষেত্রে সমান করেছেন। এক্ষেত্রে আপনাদের অভিমত কী? ইসলামী শরিয়তে তাদের কি কমতি র‍য়েছে নাকি নেই?

 

উত্তরঃ

আলহামদুলিল্লাহ্‌।

ইসলামী শরিয়ত এসেছে নারীদের সম্মান দেবার জন্য, তাদের মর্যাদাকে উন্নীত করবার জন্য। তাকে তার উপযুক্ত অবস্থান প্রদান করার জন্য, তাকে যত্ন করবার জন্য, তার মর্যাদাকে রক্ষা করবার জন্য। ইসলাম নারীদের অভিভাবক এবং স্বামীদেরকে আদেশ করে তাদের জন্য ব্যয় করতে, তাদের সাথে ভালো আচরণ করতে। তাদের দেখাশোনা করতে এবং তাদের প্রতি দয়ালু হতে। আল্লাহ বলেছেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থঃ তাদের (নারীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর।

[আল কুরআন, নিসা ৪ : ১৯]

 

বর্নিত হয়েছে, নবী(ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”

[তিরমিযি ৫/৭০৯, নং ৩৮৯৫]

 

ইসলাম নারীদের সকল অধিকারকে এবং তাদের নানা বিষয়াদীকে উপযুক্ত পন্থায় সম্পাদন নিশ্চিত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থঃ এবং পুরুষদের উপর নারীদেরও হক আছে, যেমন নিয়ম অনুযায়ী পুরুষদের নারীদের উপরও হক আছে, অবশ্য নারীদের উপর পুরুষদের (বিশেষ) মর্যাদা আছে এবং আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাশীল।

[আল কুরআন, বাকারাহ ২ : ২২৮]

এর মাঝে সকল প্রকার লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, মীমাংসা, ওকালতি, ঋণ, অগ্রিম অর্থ, গচ্ছিত অর্থ সবই অন্তর্ভুক্ত।

 

ইবাদত এবং দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে যেগুলো নারীদের জন্য উপযোগী, ইসলাম সেগুলোকেই নারীদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। পুরুষদের মতোই তাদের জন্য তাহারাত (পবিত্রতা অর্জন), যাকাত, সাওম (রোজা), সলাত, হজ এবং অন্যান্য আরো ইবাদত নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

তবে ইসলামী শরিয়তে নারীরা উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকে। কারণ নারীদেরকে তাদের নিজের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য অথবা সন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয় করবার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। বরং এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরুষকে। এমনকি শরিয়তে যিয়াফত, আক্বল, সুলহ ‘আলাল আমওয়াল - এসব জায়গাতেও অর্থ ব্যয় করার দায়িত্ব পুরুষের। যিয়াফত (الضيافة) দ্বারা বোঝানো হয় মেহমানদের জন্য অর্থ ব্যয় করা। আক্বল (العقل) দ্বারা বোঝানো হয় দিয়াত বা রক্তপণ। সুলহ ‘আলাল আমওয়াল ( الصلح على الأموال ) দ্বারা বোঝানো হয় দুইটি বিবাদমান গোত্রের মধ্যে সন্ধির জন্য তাদের সম্পদ থেকে যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।

 

বেশ কিছু ক্ষেত্রে দুই জন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান হয়। এর কারণ হলো মাসিক ঋতুচক্র, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান, সন্তানদের বড় করা এসবের মধ্য দিয়ে যাবার ফলে নারীরা পুরুষদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভুলোমনা হন। এই বিষয়গুলো নারীর স্মৃতির উপরে প্রভাব বিস্তার করে এবং তিনি যা মনে রাখতে পারতেন এর অনেক কিছুই ভুলে যান। [1] এ জন্য শরিয়তের দলিল বলছে একজন নারীর সাক্ষ্যকে যেন আরেকজন নারী শক্তিশালী করেন, যার ফলে সেই সাক্ষ্য অধিকতর সঠিক হয়। তবে নারীদের সাথে সম্পর্কিত কিছু ক্ষেত্র আছে যেসব জায়গায় একজন নারীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। যেমনঃ শিশুদের দুধপান সম্পর্কিত বিষয়াদী, যেসব কারণে বিবাহ ত্রুটিগ্রস্ত হয় ইত্যাদি।

 

আল্লাহর নিকট পুরষ্কারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান। [2]  যেটি অর্জিত হবে ঈমান এবং উত্তম আমলের পথে সুদৃঢ় থাকলে। যারা পৃথিবীতে উত্তমভাবে জীবন যাপন করবে, তারা আখিরাতে মহা প্রতিদান অর্জন করবে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

অর্থঃ যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী - আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।

[আল কুরআন, নাহল ১৬ : ৯৭]

 

অতএব আমরা জানলাম (ইসলামী শরিয়তে) নারীদের কিছু দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে ঠিক যেমনি পুরুষদেরও কিছু দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো পুরুষদের জন্য উপযোগী। মহান আল্লাহ সেগুলোর দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যাস্ত করেছেন। ঠিক তেমনি কিছু কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো নারীদের জন্য উপযোগী। তিনি সেগুলোকে নারীদের উপর ন্যাস্ত করেছেন।

 

এবং আল্লাহই তাওফিকদাতা।

 

[আল লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহুসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা ১৭/৭]

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

আরবিঃ https://islamqa.info/ar/12840/

ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/12840/

 

 

অনুবাদকের টিকা

[1] এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য পড়া যেতে পারেঃ

“জাহান্নামে নারীর আধিক্য ও নারীদের স্বল্পবুদ্ধি নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীদের অভিযোগের জবাব”

https://is.gd/nZ92DJ

“Does Hadith say women are deficient in intelligence?”

https://www.letmeturnthetables.com/2009/06/why-hadith-says-that-women-are.html

[2] অনেকে প্রশ্ন তোলেন জান্নাতে তো পুরুষদের জন্য হুরের কথা বলা হয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে তা বলা হয়নি। তাহলে কিভাবে আখিরাতে তাদের পুরষ্কার সমান হলো? এর উত্তরে আমরা বলবোঃ জান্নাতে নারী ও পুরুষ উভয়ই অসীম (∞) পরিমাণ সময়কাল অবস্থান করবেন, সেখানে তাদের যা ইচ্ছা হবে সেটিই দেয়া হবে এবং তাদের পুরষ্কারের পরিমাণ হবে অসীম (∞)। এই অসীম পরিমাণ পুরষ্কারের সাথে ৭২ হুর যোগ হলেও মোট পুরষ্কারের পরিমাণ থাকে ∞ + ৭২ = ∞। কাজেই নারী ও পুরুষ উভয়ের মোট পুরষ্কার অসীমই থাকে। অতএব জান্নাতে নারী ও পুরুষের পুরষ্কার সমান।