বিবর্তনবাদের স্ববিরোধিতা

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ যুবায়ের হোসেন

 

মানুষ বানর থেকে এসেছে–বিবর্তনবাদের দাবি এটা নয়। বরং দাবি হচ্ছে, প্রাইমেটগুলো (মানুষ, বানর, শিম্পাজি, গরিলা) একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে। পরবর্তীতে সৃষ্ট Homo জেনাস এর মধ্যে হোমো ইরেকটাস, নিয়ান্ডারথ্যাল ইত্যাদি স্পেসিস বিলুপ্ত হয়ে গেলেও হোমো স্যাপিয়েন্স তথা আধুনিক মানুষ প্রজাতিটি রয়ে গেছে। 
 
কিন্তু এরপরও কগনিটিভ এভোলুশন তথা বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের ব্যাখ্যা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি কেন অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় এত বেশি এগিয়ে? এর উত্তরে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মহলে সহস্র তত্ত্ব আছে। আমাদের স্কুল লেভেলে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে আদিম মানুষ তত্ত্ব শেখানো হয়। এই তত্ত্বানুসারে মানুষ কিছুই জানতো না, বুঝতো না। নগ্ন থাকতো, পরে তার মধ্যে লজ্জাবোধ তৈরী হলো, সে লতাপাতা দিয়ে শরীর ঢাকতে থাকলো। কাঁচা মাংস ও ফল খেয়ে জীবনধারণ করতো। এরপর আস্তে আস্তে মানুষ উন্নত হয়েছে। এই তত্ত্বের কনক্লুশন হচ্ছে ইউরোপের সেক্যুলারিজম মুভমেন্টের আগে হোমো স্যাপিয়েন্সরাও সভ্য হতে পারে নি, শিল্প বিল্পবের পর তরতর করে এগিয়ে গেছে, "ভূলোক-দ্যুলোক-গোলক ভেদিয়া খোদার আসন আরশ ছেদিয়া" অনন্তে পৌঁছে যাচ্ছে। মনুষ্য আজ দুর্নিবার, অসীম তার ক্ষমতা, চরণে তার নীহারিকা আর মস্তকে বিশ্বজয়ীর রাজমুকুট। 
 
এখানে একটা পরিষ্কার কনট্রাডিকশন লক্ষ করা যায়। যেহেতু বিবর্তনের কোনও সীমা নেই কাজেই চরম উৎকর্ষ বলে কিছু নেই। সুতরাং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির কোনও শেষ নেই। একবিংশ শতাব্দীতে যা আমরা সত্য ভাবছি দ্বাবিংশ শতকে তা রজ্জুতে সর্পভ্রম বলে গণ্য হতে পারে। বিংশ শতকের আদিভাগে মানুষ টাইটানিক তৈরি করে নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী কল্পনা করেছিল, আর আজকের ক্রুস শিপের তুলনায় টাইটানিক হলো বোয়ালের পাশে পুঁটিমাত্র। 
 
বিজ্ঞান আমাদের বলছে রং-এর কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই, রং হলো আমাদের মস্তিষ্কের অনুভূতিমাত্র। আবার যাকে আমরা অস্তিত্বশীল ভাবছি সেটাও আসলে অস্তিত্বশীল কি না, দর্শন তাকেও প্রশ্ন করছে। অপটিক্যাল ইল্যুশন প্রমাণ করে, আমরা আসলে চোখ দিয়ে দেখি না, দেখি মস্তিষ্ক দিয়ে। মস্তিষ্ক আমাদের যা দেখাতে চায়, তা-ই দেখি। একইভাবে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রতিটিই স্নায়ু তথা মস্তিষ্কের তথ্যপ্রেরণের ওপর নির্ভরশীল। তাই "নিজের চোখে দেখেছি", "নিজের কানে শুনেছি", এগুলো কখনো সত্যের প্রমাণ হতে পারে না। এমনকি "প্রমাণ" নিজেও কিছু স্বতঃসিদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যে স্বতঃসিদ্ধ আবার মানুষের কগনিটিভ লজিকের বেসিসে গঠিত। 
 
এখন ঝামেলাটা হলো, এভোলুশন বলছে, এ কগনিটিভ লজিকের উৎকর্ষ চলতেই থাকবে। সুতরাং প্রত্যেক যুগে স্বতঃসিদ্ধ পাল্টাতে থাকবে। সুতরাং প্রত্যেক যুগে "প্রমাণ" শব্দটার অর্থ পাল্টাতে থাকবে। সুতরাং এক যুগের "সত্য" আর অন্যযুগে "সত্য" থাকবে না। 
 
এজন্য বিজ্ঞান ও দর্শনের জগতে "সত্য" শব্দটি উপযোগী নয়। সর্বোচ্চ বলা যায়–"আমার কাছে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুসারে যুক্তিযুক্ত"। কিন্তু জ্ঞানের শেষ নেই বলে যৌক্তিকতারও শেষ নেই। কোনওকিছুকে "সত্য" বলা মানে একে 'ভুল' প্রমাণের রাস্তাটা বন্ধ করে দেওয়া। বিজ্ঞান ও দর্শন তা হতে দিতে পারে না।
 
কিন্তু সমস্যা হলো, নাস্তিকরা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এভোলুশনের সীমাটার ছেদ টেনে দিয়ে তাদের বিশ্বাসটাকে চূড়ান্ত বলে দাবি করে। তাদের বলা উচিত ছিল- "স্রষ্টাবিষয়ক উপসংহারে আসা যাচ্ছে না"। তাদের অনেকে তা বলেছেও। আমাদের বঙ্গদেশীয় নাস্তিকরা যদিও তা মানতে নারাজ। 
 
এজন্যই হয়তো প্রবাদে আছে–মহাশূন্যের শেষ আছে কিন্তু ধর্মবিরোধীদের স্ববিরোধিতার শেষ নেই।