ইসমাঈল(আ.) কি 'দাসীর পুত্র' ছিলেন বা কম মর্যাদাবান ছিলেন?

খ্রিষ্টান মিশনারীদের জবাব/বাইবেল ও খ্রিষ্টবাদ সংক্রান্ত



 

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর(র.)

 

বিকৃতি বা জালিয়াতি বাইবেলের মধ্যে অগণিত। এ সকল বিকৃতি যখন ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয় তখন তারা দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে চেষ্টা করেন, যেগুলি পাগলের প্রলাপের মতই। এমনই কিছু প্রলাপ তারা বকেছে এ স্থানে। দিশেহারা ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ বলেন, যেহেতু ইসমাঈলের মাতা “দাসী” ছিলেন, সেহেতু তিনি ইবরাহীমের অবৈধ সন্তান ছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। এজন্য তাকে বাদ দিয়ে ইসহাককেই “অদ্বিতীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতারণা ও বর্ণবাদী মানসিকতার নমুনা দেখুন! এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

 

নবীপরিবার, ঈশ্বরের খ্রিষ্ট ও পুত্রের নামে ব্যভিচারের অপবাদ:

সন্তানকে অবৈধ বলার অর্থ তার পিতাকে ব্যভিচারী বলা। কাজেই ইসমাঈল (আ)-কে অবৈধ সন্তান বলে দাবি করার অর্থ ইবরাহীম (আ)-কে ব্যভিচারী বলে দাবি করা (নাউযুবিল্লাহ)। অবশ্য ইহুদি-খ্রিষ্টানগণ এ বিষয়ে খুবই পারঙ্গম। নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসূলগণকে ব্যভিচারী বলতে তাদের মোটেও আটকায় না। পবিত্র বাইবেল বা তথাকথিত “তাওরাত শরীফ”, “যাবুর শরীফ” ও “ইঞ্জিল শরীফ” এবং “কিতাবুল মুকাদ্দাস” নামে প্রচলিত এ ঢাউশ গ্রন্থের মধ্যে নবীগণের এবং নবীপরিবারের ব্যভিচার ও অজাচারের অনেক মিথ্যা গল্প বিদ্যমান, যেগুলি একমাত্র অশ্লীল গল্পগ্রন্থেই থাকে। পাঠক, কায়মনোবাক্যে অনবরত “নাউযুবিল্লাহ” পড়তে থাকুন ও “পবিত্র বাইবেল” বা জাল “তাওরাত শরীফ" ও “ইঞ্জিল শরীফ”-এর মধ্যে বিদ্যমান অনেক অপবিত্র, অশ্লীল ও মিথ্যা কাহিনীর মধ্য থেকে কয়েকটি কাহিনী পাঠ করুন। পাঠক, এ সকল কাহিনী বলতে বা লিখতে গেলেও ঘৃণায় বমিভাব আসে, কিন্তু ইহুদি-খ্রিষ্টানদের জালিয়াতি প্রকাশের জন্য কিছু লিখতে বাধ্য হচ্ছি।

 

নবীর সাথে তার কন্যাগণের ব্যভিচার

 পবিত্র বাইবেলের একটি অপবিত্র কাহিনীতে বলা হয়েছে, রাতের পর রাত লুত নবীর দুই কন্যা তাদের পিতাকে মদপান করিয়ে মাতাল বানিয়ে তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। সে ব্যভিচার থেকে তারা গর্ভবতী হয়। নাউযুবিল্লাহ । (বিস্তারিত দেখুন, আদিপুস্তক: ১৯: ৩৩-৩৮) বাইবেলের ঈশ্বর এরূপ জঘন্য অজাচারের জন্য মোটেও রাগ করেন নি, আপত্তিও করেন নি, বরং ব্যভিচার-জাত সন্তানদেরকে একটু বেশিই ভালবেসেছেন। বাইবেলের ঈশ্বর ইহুদি-খ্রিষ্টানদেরকে ফিলিস্তিনের সকল মানুষকে নির্মমভাবে গণহত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, শুধু ব্যভিচারজাত সন্তানদের বংশধরদের ভালবেসে তাদেরকে সুরক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। (বিস্তারিত দেখুন: দ্বিতীয় বিবরণ: ২: ১৭-১৯ এবং ২০: ১৩-১৬)।

 

নবী-পত্নীর সাথে নবী-পুত্রের ব্যভিচার

ইহুদী-খৃস্টানদের মূল পুরুষ হযরত ইয়াকূব (আ)। তাঁর অন্য নাম ইস্রায়েল। আর তার থেকেই বনী ইস্রায়েল বা ইস্রায়েল সন্তানগণ। পবিত্র বাইবেলের একটি অপবিত্র কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, ইয়াকুবের বড় ছেলে রুবেন তার সৎ-মায়ের (বিলহার) সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। যদিও পবিত্র বাইবেলে বারংবার বলা হয়েছে যে, ব্যভিচারীকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে, কিন্তু নবীপুত্রের এ জন্য অজাচারের জন্য বাইবেলীয় ঈশ্বর কোনো শাস্তি প্রদান করেন নি। নাউযুবিল্লাহ। (আদিপুস্তক: ৩৫: ২২)

 

পুত্রবধুর সাথে নবী-পুত্রের ব্যভিচার

হযরত ইয়াকুব (আ) বা ইসরাঈল (আ)-এর আরেক পুত্র ইহূদা বা যিহূদা, যার নামেই মূলত ইহুদি জাতির পরিচয়। পবিত্র বাইবেলের আরেকটি অপবিত্র কাহিনীতে বলা  হয়েছে যে, নবী-পুত্র যিহূদা তার আপন পুত্রবধুর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হন। সেই ব্যভিচারের ফলে উক্ত পুত্রবধু গর্ভধারণ করেন এবং পেরস ও সেরহ নামে দুটি জমজ জারজ সন্তান প্রসব করেন। নাউযুবিল্লাহ। (বিস্তারিত দেখুন: আদিপুস্তক: ৩৮; ১৫-১৮, ২৭-৩০) সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রাণপুরুষ ও সকল গৌরবের উৎস দাউদ, সুলাইমান ও যীশুখ্রিষ্ট এ জারজ সন্তান পেরসের বংশধর। (বিস্তারিত দেখুন: মথিলিখিত সুসমাচার: ১: ১-৩)।

 

ঈশ্বরের জন্ম-দেওয়া প্রথমজাত পুত্র ও ঈশ্বরের খ্রিষ্ট কর্তৃক প্রতিবেশীর স্ত্রীকে ধর্ষণ

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রাণপুরুষ দাউদ (আ)। দাউদ (আ)-ই তাদের শ্রেষ্ঠ গৌরব। দাউদের বংশধর হওয়া যীশুখ্রিষ্টের শ্রেষ্ঠ গৌরব ও অন্যতম পরিচয়। তাঁর বিষয়ে গীতসংহিতা বা যাবুর-এর ২৭ শ্লেকে বলা হয়েছে: “(the LORD hath said unto me, Thou art my Son; this day have I begotten thee) সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন, তুমি আমার পুত্র, অদ্য আমি তোমাকে জন্ম দিয়াছি।" গীতসংহিতার ৮৯ গীতে বলা হয়েছে: “(২০) আমার দাস দায়ূদকেই পাইয়াছি, আমার পবিত্র তৈলে তাহাকে অভিষিক্ত করিয়াছি (with my holy oil have I anointed him)।... (২৬) সে আমাকে ডাকিয়া বলিবে, তুমি আমার পিতা, আমার ঈশ্বর (Thou art my father, my God)-.। (২৭) আবার আমি তাহাকে প্রথমজাত (my firstborn) করিব ...।” এভাবে দায়ুদকে অভিষিক্ত অর্থাৎ খ্রিষ্ট(Christ, Anointed) বা মসীহ (Messiah), ঈশ্বরের জন্ম-দেওয়া পুত্র (begotten son) ও প্রথমজাত পুত্র (firstborn) বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

দায়ূদ (আ)-কেও “তাওরাত”-এ ব্যভিচারী ও ধর্ষক বলে চিত্রিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, উরিয়া নামে দাউদের এক প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধরত ছিলেন। দায়ূদ উরিয়ার স্ত্রীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজ বাড়িতে ডেকে এনে ধর্ষণ করেন। মহিলা এ ধর্ষণে গর্ভবতী হয়ে যান। দায়ূদ সেনাপতিকে চিঠি লিখে কৌশলে উরিয়াকে হত্যা করান এবং উক্ত মহিলাকে বিবাহ করেন। (বিস্তারিত দেখুন: ২ শমূয়েল: ১১: ১৪:১৭)।

 

 প্রচলিত জাল তাওরাতেও বারংবার বলা হয়েছে যে, ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। কিন্তু এ তাওরাতের ঈশ্বর অপরাধীর চেহারা দেখে বিচার করেন বলে মনে হয়। সম্ভবত দায়ূদ যেহেতু তার পুত্র ও তার অভিষিক্ত খ্রিষ্ট, সেহেতু তিনি এক্ষেত্রে দাউদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিলেন দায়ূদের বৈধ স্ত্রীদেরকে। তিনি দায়ূদকে বলেন, তুমি যেহেতু ব্যভিচার ও হত্যায় লিপ্ত হলে, সেহেতু তোমার সামনে তোমার স্ত্রীদের গণধর্ষণের ব্যবস্থা করব। কী অদ্ভুত বিচার ব্যবস্থা!! একটি পাপের শাস্তি হিসেবে আরেকটি পাপের ব্যবস্থা করা ও ধর্ষকের শাস্তি হিসেবে নিরপরাধকে ধর্ষণের ব্যবস্থা করা!! (বিস্তারিত দেখুন: ২ শমূয়েল ১২: ১১-১২)।

 

নবী-পুত্র কর্তৃক বোনকে ধর্ষণ

 প্রচলিত জাল তাওরাত বা কিতাবুল মুকাদ্দাসের আরেকটি কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, দায়ূদ নবীর পুত্র অম্মোন শয়তানী কৌশলে তার ভগ্নি তামরকে ধর্ষণ করে। সে অসুস্থতার ভান করে শুয়ে থাকে এবং দাউদকে বলে যে, আমি আমার বোন তামরের হাতে পিঠা খেতে চাই। তামর তাকে পিঠা খাওয়াতে আসলে সে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। (নোংরা কাহিনীটি বিস্তারিত দেখুন: ২ শমূয়েল ১৩: ১১১৪)। মজার ব্যাপার, পবিত্র বাইবেলের বা তাওরাতের ঈশ্বর এ জঘন্য পাপাচারের জন্য অম্মোনকে কোনো শাস্তি দেন নি বা তিরস্কার করেন নি।

 

নবী-পুত্র কর্তৃক সৎ মাতাদেরকে পাইকারী ধর্ষণ

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের আরেকটি অপবিত্র কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, দায়ূদের অন্য পুত্র অবশালোম প্রকাশ্যে ইস্রায়েল সন্তানদের সামনে তার পিতার স্ত্রীগণকে পাইকারী হারে ধর্ষণ করে। (বিস্তারিত দেখুন ১৬: ২২) অথচ এরূপ জঘন্য পাপাচারের জন্যও ইহুদি-খ্রিষ্টানগণের মাবুদ বাইবেলীয় ঈশ্বর কোনো শাস্তি প্রদান করেন নি, এমনকি তিরস্কারও করেন নি।

 

পাঠক, এরূপ জঘন্য অশ্লীল গল্প নবীগণ বা তাদের পরিবারের নামে বাইবেলে আরো অনেক রয়েছে। এগুলিকে যারা ধর্মগ্রন্থ ও ওহীর জ্ঞান বলে বিশ্বাস করে, তাদের জন্য ইবরাহীম (আ)-কে ব্যভিচারী বলে দাবি করা কোনো ব্যাপারই নয়। তাদের মিথ্যা অহমিকা, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও জালিয়াতির  সমর্থনে তারা সবই করতে পারে ।

 

ইসরায়েলীয়গণ অধিকাংশই “দাসীর” সন্তান:

 দাসীর সন্তান হওয়ার কারণে কারো পুত্রত্ব বাতিল হওয়া ইহুদি-খ্রিষ্টানগণের বিশ্বাস ও বাইবেলের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। বনী ইস্রায়েলের প্রায় অর্ধেকই তো দাসীর সন্তান। আমরা আগেই দেখেছি যে ইহুদি-খ্রিষ্টানগণের মূল পুরুষ ইয়াকূব (ইস্রায়েল) (আ)। তাঁর দু স্ত্রী ছিলেন লেয়া (Leah) ও রাহেল (Rachel)। এ দু’ স্ত্রীর দু’জন দাসী ছিল: সিল্পা (Zilpah) ও বিলহা (Bilhah)। এ দু দাসীকে ইয়াকূব স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। ইয়াকুবের ১২ সন্তানের ৪ জন এ দু দাসীর সন্তান। দাসীর সন্তান হওয়ার কারণে কখনোই এদেরকে পুত্রত্বের হিসেব থেকে কোনোভাবে বাদ দেওয়া হয়নি বা অবমূল্যায়ন করা হয়নি । (বিস্তারিত দেখুন; আদিপুস্তকের ২৯ ও ৩০ অধ্যায়)

 

বাইবেলের শিক্ষানুসারে অবৈধ সন্তান বেশি আশীর্বাদপ্রাপ্ত:

সর্বোপরি পবিত্র বাইবেল বা প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল শিক্ষা দেয় যে, সন্তান জারজ (অবৈধ) হলেও তার পুত্রত্বের অধিকার বা আশীর্বাদ সামান্যতম কমে না, বরং বৃদ্ধিই পায়। আমরা দেখেছি, বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী যিহূদা তার পুত্রবধুর সাথে ব্যভিচার করে পেরেস নামক জারজ (অবৈধ) সন্তান জন্ম দেন। অবৈধ বা জারজ হওয়ার কারণে পেরেস পুত্রত্বের অধিকার কম পাননি, বরং একটু বেশিই পেয়েছেন। এজন্যই ইস্রায়েল বংশের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ, ঈশ্বরের দুই পুত্র, ঈশ্বরের দুই খ্রিষ্ট দায়ূদ ও যীশু এ জারজ সন্তান পেরেসের বংশধর হওয়ার গৌরব লাভ করেছেন।

 

 ভাবতে বড় অবাক লাগে যে, যারা জারজ সন্তানের মাধ্যমে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বিতরণ করেন, তারাই বিবাহিত বৈধ স্ত্রীর বৈধ সন্তানকে মনগড়াভাবে অবৈধ বলে দাবি করেন। আমরা দেখেছি, বাইবেলে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম হাগারকে বিবাহ করেন। এ বিবাহিত স্ত্রীর বৈধ ও প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এ পুত্রকে মহাজাতিতে রূপান্তরিত করার সুস্পষ্ট ঘোষণাও বাইবেলের মধ্যে বিদ্যমান। সর্বোপরি, পিতার মৃত্যুর সময় প্রথম পুত্র হিসেবে তিনি তার দাফন-সকারে উপস্থিত ছিলেন বলেও বাইবেলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

[[ লেখাটি ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর(র.) এর 'তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কুরআনের আলোকে কুরবানী ও জাবীহুল্লাহ' বই থেকে নেয়া হয়েছে।

বইটি ডাউনলোড করতে পারেন এখান থেকে ]]