ইসলামবিরোধীরা নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করার জন্য বিভিন্ন হাদিস অপব্যাখ্যা করে মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি করে। তারা অত্যন্ত অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্বক এই দাবি করেঃ নবী(ﷺ) নাকি তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হানি হানি(রা.) এর সাথে এমনভাবে মেলামেশা করতেন যাতে গাইরে মাহরামের ব্যাপারে ইসলামের আইন ভঙ্গ হতো (নাউযুবিল্লাহ)। শুধু তাই না, তিনি নাকি অন্যদের জন্য রোজা ফরয করলেও নিজেই নাকি রোজাকে গুরুত্ব দিতেন না (নাউযুবিল্লাহ) এবং রমযান মাসের মধ্যে তিনি নাকি নিজে রোজা ভাঙতেন, চাচাতো বোন উম্মে হানি(রা.) এর রোজাও ভাঙিয়ে দিতেন।
তারা তাদের এইসব কুৎসিত দাবি প্রমাণ করার জন্য নিম্নের হাদিসগুলো পেশ করে। প্রথম হাদিসটি সুনান আবু দাউদ গ্রন্থে আছে—
عَنْ أُمِّ هَانِئٍ، قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمُ الْفَتْحِ فَتْحِ مَكَّةَ جَاءَتْ فَاطِمَةُ فَجَلَسَتْ عَنْ يَسَارِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأُمُّ هَانِئٍ عَنْ يَمِينِهِ قَالَتْ فَجَاءَتِ الْوَلِيدَةُ بِإِنَاءٍ فِيهِ شَرَابٌ فَنَاوَلَتْهُ فَشَرِبَ مِنْهُ ثُمَّ نَاوَلَهُ أُمَّ هَانِئٍ فَشَرِبَتْ مِنْهُ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقَدْ أَفْطَرْتُ وَكُنْتُ صَائِمَةً . فَقَالَ لَهَا " أَكُنْتِ تَقْضِينَ شَيْئًا " . قَالَتْ لاَ . قَالَ " فَلاَ يَضُرُّكِ إِنْ كَانَ تَطَوُّعًا " .
অর্থঃ "উম্মে হানি (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি (রাবী) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন বিজয়ের পর ফাতিমা (রা.) আগমন করেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর বামদিকে উপবেশন করেন এবং উম্মে হানি (রা.) ডানদিকে। তিনি (রাবী) বলেন, এ সময় জনৈক দাসী একটি পাত্রে কিছু পানীয় দ্রব্য এনে পেশ করলে তিনি তা পান করেন। এরপর তিনি এর অবশিষ্টাংশ উম্মে হানিকে পান করতে দেন। তিনি তা পান করে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তো ইফতার করলাম, কিন্তু আমি যে রোযা ছিলাম। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি কোন কাযা রোযা আদায় করছিলে? তিনি বলেন, না। তিনি বলেন, যদি তা নফল রোযা হয়, তবে এতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না।" [1]
সুনান তিরযিযিতে প্রায় অনুরূপ আরেকটি হাদিস এসেছে।
حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ، حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ كُنْتُ أَسْمَعُ سِمَاكَ بْنَ حَرْبٍ يَقُولُ أَحَدُ ابْنَىْ أُمِّ هَانِئٍ حَدَّثَنِي فَلَقِيتُ، أَنَا أَفْضَلَهُمَا، وَكَانَ، اسْمُهُ جَعْدَةَ وَكَانَتْ أُمُّ هَانِئٍ جَدَّتَهُ فَحَدَّثَنِي عَنْ جَدَّتِهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ عَلَيْهَا فَدَعَى بِشَرَابٍ فَشَرِبَ ثُمَّ نَاوَلَهَا فَشَرِبَتْ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمَا إِنِّي كُنْتُ صَائِمَةً . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " الصَّائِمُ الْمُتَطَوِّعُ أَمِينُ نَفْسِهِ إِنْ شَاءَ صَامَ وَإِنْ شَاءَ أَفْطَرَ " .
অর্থঃ "মাহমুদ ইবনু গায়লান (রাঃ) ..... উম্মু হানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একবার রাসূল্লুাহ ﷺ তাঁর ঘরে আসেন এবং পানি নিয়ে আনতে ডাকলেন। তিনি তা থেকে পান করলেন, তারপর উম্মে হানীকে দিলেন; তিনিও পান করলেন। পরে উম্মে হানী (রাঃ) বললেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তো সাওম পালনকারী ছিলাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, নফল সিয়াম পালনকারী নিজের আমানতদার; ইচ্ছা করলে সিয়াম পালন করতে পারে আর ইচ্ছা করলে তা ভঙ্গও করতে পারে।" [2]
তিরমিযিতে এর ঠিক পূর্বের হাদিসটি এই হাদিসেরই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। সেখানেও এই ঘটনা সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। [3]
রোজা ভাঙা ও ভাঙানো সংক্রান্ত অভিযোগের জবাবঃ
আমরা উপরের হাদিসগুলোতে দেখতে পেলাম যে, মক্কা বিজয়ের দিনে উম্মে হানি(রা.) সাওম (রোজা) অবস্থায় ছিলেন এবং নবী(ﷺ) নিজে পান করে তাঁকে পানীয় দিলে তিনি এর দ্বারা রোজা ভেঙে ফেলেন। আবার, বিভিন্ন সিরাত গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, মক্কা বিজয় সংঘটিত হয় রমযান মাসে। [4] এখন প্রশ্ন হল – মুসাফির হিসেবে নবী(ﷺ) এর জন্য নাহয় রোজা ভাঙা জায়েজ ছিল, [5] কিন্তু তিনি কী করে কাউকে পানীয় পান করিয়ে রোজা ভাঙিয়ে দেন?
এর ব্যাখ্যা দেয়ার পূর্বে আমাদের দেখতে হবে এই বর্ণনাগুলোর সনদ ও মাতানের প্রকৃত অবস্থা কী, এই হাদিসগুলো কতটুকু বিশুদ্ধ।
সুনান আবু দাউদের উল্লেখিত হাদিসটি প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু আব্দুল বার(র.) এর ‘আত-তামহিদ’ গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থের তাহকিক অংশে এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَإِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ، قَالَ مُسْلِمُ بْنُ الْحَجَّاجِ: "يَزِيدُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ هُوَ مِمَّنِ اتَّقَى حَدِيثَهُ النَّاسُ، وَالِاحْتِجَاجُ بِخَبَرِهِ إِذَا تَفَرَّدَ لِلَّذِينَ اعْتَبَرُوا عَلَيْهِ مِنْ سُوءِ الْحِفْظِ وَالْمُتُونِ فِي رِوَايَاتِهِ الَّتِي يَرْوِيهَا" (التَّمْيِيز ١/٢١٤).
অর্থঃ “এটির সনদ দুর্বল। ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ(র.) বলেছেনঃ "ইয়াজিদ ইবনু আবি জিয়াদ এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের হাদিস মানুষ পরিহার করত। যারা তার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা এবং তার বর্ণনাগুলোর মাতানে (মূল বক্তব্যে) ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন, তারা তার এককভাবে বর্ণিত হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি।" (আত-তাময়িয ১/২১৪)।” [6]
আমরা দেখলাম যে স্বয়ং ইমাম মুসলিম(র.) আলোচ্য হাদিসের একজন রাবীর (বর্ণনাকারী) দুর্বলতার ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন। তাই এই হাদিসের সনদকে যঈফ বা দুর্বল বলে গণ্য করা হয়েছে। এখানে এই রাবী হাদিসের বর্ণনার মাতান বা মূল বক্তব্যের মাঝে ভুল করতেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কিভাবে ভুল করতেন এ সম্পর্কে কিছুক্ষন পরেই আলোচনা করা হবে ইন শা আল্লাহ।
উপরে উল্লেখিত তিরমিযির হাদিসটিদ্বয়ের সনদের মাঝে সিমাক ইবনু হারব নামে একজন রাবী আছেন। তার সম্পর্কে প্রাচীন মুহাদ্দিসদের অভিমত উদ্ধৃত করে ইমাম ইবনুল জাওযি(র.) উল্লেখ করেছেন—
سِمَاكُ بْنُ حَرْبٍ كَانَ شُعْبَةُ وَسُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ يُضَعِّفَانِهِ، قَالَ ابْنُ عَمَّارٍ: "كَانُوا يَقُولُونَ إِنَّهُ يُغْلِطُ وَيَخْتَلِفُونَ فِي حَدِيثِهِ.قَالَ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ: "أَسْنَدَ أَحَادِيثَ لَمْ يُسْنِدْهَا غَيْرُهُ. وَقَالَ أَحْمَدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْعِجْلِيُّ الْحَافِظُ: "كَانَ فِي حَدِيثِهِ عِكْرِمَةُ، رُبَّمَا وَصَلَ الشَّيْءَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، وَرُبَّمَا قَالَ: (قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ). وَقَالَ صَالِحُ بْنُ مُحَمَّدٍ: "يُضَعَّفُ. وَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ يُوسُفَ بْنِ خَرَّاشٍ: "فِي حَدِيثِهِ لِينٌ. وَقَالَ ابْنُ عَدِيٍّ: "صَدُوقٌ لَا بَأْسَ بِهِ.
অর্থঃ "সিমাক ইবনু হারবকে শু‘বাহ এবং সুফিয়ান সাওরি দুর্বল হিসেবে গণ্য করতেন। ইবনু আম্মার বলেনঃ "মানুষ বলত যে, তিনি ভুল করতেন, এবং তার হাদিস নিয়ে মতভেদ ছিল।" ইয়াহইয়া ইবনু মা‘ইন বলেনঃ "তিনি এমন কিছু হাদিস সংযুক্তভাবে বর্ণনা করেছেন, যা অন্য কেউ এভাবে বর্ণনা করেননি [যার দ্বারা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তিনি ভুল করতেন - অনুবাদক]।" আহমাদ ইবনু আবদুল্লাহ আল-‘ইজলি (মুহাদ্দিস) বলেনঃ "তার ‘ইকরিমা সংক্রান্ত হাদিসে কিছু সমস্যা ছিল। তিনি কখনো কোনো কথা সরাসরি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে বর্ণনা করতেন, আবার কখনো বলতেনঃ ‘রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন...’ [তার কৃত ভুলের একটি উদাহরণ] " সালিহ ইবনু মুহাম্মাদ বলেনঃ "তিনি দুর্বল।" আবদুর রহমান ইবনু ইউসুফ ইবনু খিরাশ বলেনঃ "তার [বর্ণিত] হাদিসে কিছুটা শিথিলতা আছে।" ইবনু আদী বলেনঃ "তিনি ‘স্বদুক’ [7] এবং তার মধ্যে [গুরুতর] সমস্যা নেই।"" [8]
এখানে সকলেই এই রাবীর নানা দুর্বলতার ব্যাপারে বলেছেন। শুধুমাত্র একজন তাকে ‘স্বদুক’ বলেছেন যাতেও এই ইঙ্গিত আছে যে তার সংরক্ষণ দক্ষতায় ত্রুটি ছিল। এমন দুর্বল রাবী কোনো সনদে থাকলে সেই হাদিস যঈফ বা দুর্বল গণ্য হয়। এই কারণে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ শু’আইব আরনাউত(র.) এই হাদিসকে সরাসরি যঈফ গণ্য করেছেন। এই হাদিস সুনানুল কুবরা নাসাঈ এবং মুসনাদ আহমাদেও এসেছে। [9]
ইমাম শাওকানী(র.) এর সুবিখ্যাত ‘নাইলুল আওত্বার’ গ্রন্থের তাহকিক অংশেও উপরে উল্লেখিত [আবু দাউদ ও তিরমিযির] দুইটি হাদিসকেই যঈফ বা দুর্বল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [10] সেখানে উভয়ের হাদিসেরই রাবীর দুর্বলতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—
حَدِيثُ أُمِّ هَانِئٍ أَخْرَجَهُ أَيْضًا الدَّارَقُطْنِيُّ (٤) وَالطَّبَرَانِيُّ (٥) وَالْبَيْهَقِيُّ (٦) وَفِي إِسْنَادِهِ سِمَاكٌ وَقَدِ اخْتُلِفَ عَلَيْهِ فِيهِ. وَقَالَ النَّسَائِيُّ (٧): سِمَاكٌ لَيْسَ يُعْتَمَدُ عَلَيْهِ إِذَا انْفَرَدَ. وَقَالَ الْبَيْهَقِيُّ: فِي إِسْنَادِهِ مَقَالٌ، وَكَذَلِكَ قَالَ التِّرْمِذِيُّ (٨). وَفِي إِسْنَادِهِ أَيْضًا هَارُونُ ابْنُ أُمِّ هَانِئٍ. قَالَ ابْنُ الْقَطَّانِ (٩): لَا يُعْرَفُ. وَفِي إِسْنَادِهِ أَيْضًا يَزِيدُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ الْهَاشِمِيُّ. قَالَ ابْنُ عَدِيٍّ (١): يُكْتَبُ حَدِيثُهُ. وَقَالَ الذَّهَبِيُّ (٢): صَدُوقٌ رَدِيءُ الْحِفْظِ. وَقَدْ غَلِطَ سِمَاكٌ فِي هَذَا الْحَدِيثِ فَقَالَ فِي بَعْضِ الرِّوَايَاتِ: إِنَّ ذَلِكَ كَانَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَهِيَ عِنْدَ النَّسَائِيِّ (٣) وَالطَّبَرَانِيِّ (٤)، وَيَوْمُ الْفَتْحِ كَانَ فِي رَمَضَانَ فَكَيْفَ يُتَصَوَّرُ أَنْ تَكُونَ صَائِمَةً قَضَاءً أَوْ تَطَوُّعًا؟
অর্থঃ “উম্মে হানি (রা.)-এর এই হাদিসটি দারাকুতনী(র.), তাবারানী(র.) এবং বায়হাকী(র.)ও বর্ণনা করেছেন। তবে এর সনদে সিমাক আছেন, যাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নাসাঈ(র.) বলেনঃ “সিমাক যদি এককভাবে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে তিনি নির্ভরযোগ্য নন।” বায়হাকী(র.) বলেনঃ “এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে।” তিরমিজি(র.)ও একই কথা বলেছেন। এছাড়া এর সনদে হারুন ইবন উম্মে হানি আছেন, যার ব্যাপারে ইবনুল কাত্তান(র.) বলেনঃ "তিনি অজ্ঞাত (মাজহুল)।”
এতে ইয়াযিদ ইবন আবি জিয়াদ আল-হাশিমি আছেন, যার ব্যাপারে ইবনু আদি(র.) বলেনঃ “তার হাদিস লেখা হয়,” আর ইমাম যাহাবী(র.) বলেন: “তিনি স্বদুক [11], দুর্বল স্মৃতির অধিকারী।” সিমাক এই হাদিসে ভুল করেছেন, কারণ কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, এই ঘটনা বিজয়ের দিনে (মক্কা বিজয়ের দিন) ঘটেছিল, যা নাসাঈ(র.) ও তাবারানী(র.) উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন তো রমযান মাসে ছিল, তাহলে কিভাবে তিনি তখন কাজা বা নফল রোযা রাখতে পারেন?” [12]
আমরা দেখলাম আলোচ্য হাদিসদ্বয়ের আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম শাওকানী(র.) এর উভয়ের সনদ থেকেই রাবীদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করলেন।
কাজেই উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণ হয় যে – উভয় হাদিসের সনদেই দুর্বলতা আছে।
শুধু তাই না, এই হাদিসের মাতান বা মূল বক্তব্যেও সমস্যা রয়েছে। ইমাম শাওকানী(র.) উপরের আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে রাবী সিমাক এখানে ভুল করেছেন কেননা রমযান মাসে কাউকে কাযা রোজা বা নফল রোজার কথা উল্লেখ করে রোজা ভাঙতে বলার কথা একটি অবাস্তব জিনিস। কোনো সাধারণ অজ্ঞ মুসলিমও এমন ভুল কথা বলতে পারে না। আর সেখানে স্বয়ং নবী(ﷺ) থেকে এমন ভুলভাল বক্তব্য আসা তো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।
এখানে আরো একটি বিষয় থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে এই হাদিস মাতানগতভাবে বিশুদ্ধ নয়। রিজাল শাস্ত্রের ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী(র.) বলেছেন,
تَأَخَّرَ إِسْلاَمُهَا...وَأَسْلَمَتْ يَوْمَ الفَتْحِ
অর্থঃ “তাঁর [উম্মে হানি(রা.)] ইসলাম গ্রহণে বিলম্ব হয় ... এবং তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।” [13]
ইমাম ইবন আব্দুল বার(র.) উল্লেখ করেছেন,
كَانَ إِسْلَامُ أُمِّ هَانِئٍ يَوْمَ الْفَتْحِ.
অর্থঃ “উম্মে হানি(রা.) এর ইসলাম গ্রহণ ছিল মক্কা বিজয়ের দিনে।” [14]
উম্মে হানি(রা.) এর মক্কা বিজয়ের দিনে ইসলাম গ্রহণ একটি প্রমাণিত বিষয় যা রিজালশাস্ত্রের ইমামগণ উল্লেখ করেছেন। তাহলে এটা কী করে সম্ভব হতে পারে – কেউ যেই দিনে ইসলাম গ্রহণ করে, ঐ দিনেই রোজা অবস্থায় থাকে??!! রোজা রাখার জন্য তো ন্যুনতমভাবে কিছু প্রস্তুতির দরকার আছে, আগের রাতে ঈমানদার অবস্থায় সাহরী খাওয়া, নিয়ত থাকা ইত্যাদির ব্যাপারও আছে। ঐ দিনে ইসলাম গ্রহণ করে ঐ দিনেই রোজা অবস্থায় থাকা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। এ থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে আলোচ্য হাদিসদ্বয়ের মাতানগত সমস্যা আছে এবং তা মাতানগতভাবে বিশুদ্ধ নয়।
অতএব আমরা দেখলাম ইসলামবিরোধীরা যেই হাদিসগুলো দেখিয়ে দাবি করে যে – “নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) অন্যদের জন্য রোজা ফরয করলেও নিজেই রোজাকে গুরুত্ব দিতেন না (নাউযুবিল্লাহ) এবং রমযান মাসের মধ্যে তিনি নিজে রোজা ভাঙতেন, চাচাতো বোন উম্মে হানি(রা.) এর রোজাও ভাঙিয়ে দিতেন” - তা অপ্রমাণিত দুর্বল হাদিসের উপর ভিত্তি করে। এই ঘটনা আদৌ বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়।
বঙ্গীয় ইসলামবিরোধীদের কিছু সম্ভাব্য অভিযোগ এবং ‘প্রলাপ’ এর জবাবঃ
এখন ইসলামবিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে পারে – কিন্তু এই হাদিসদ্বয়কে তো শায়খ আলবানী(র.) সহীহ বলেছেন, যেই তাহকিক বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
এর জবাবে আমরা বলবঃ নিঃসন্দেহে শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী(র.) একজন মহান মুহাদ্দিস, নিঃসন্দেহে তিনি হাদিসশাস্ত্রের অনেক বড় একজন পণ্ডিত। কিন্তু কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি স্বয়ং ইমাম মুসলিম(র.)সহ বহু প্রাচীন মুহাদ্দিস আলোচ্য হাদিসগুলোর রাবীদের দুর্বলতার ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন। শায়খ শুআইব আরনাউত(র.) এর মতো সমকালীন শীর্ষ মুহাদ্দিস থেকেও আমরা এই হাদিসের দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে তাহকিক দেখিয়েছি।
ইসলামবিরোধীরা যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের সামনে পড়লে অনেক সময় নানা রকম প্রলাপ বকে। তারা হয়তো আমাদের এত যুক্তি-তথ্য-প্রমাণ দেখার পরেও বলবেঃ “শায়খ আলবানী বেশি বোঝেন নাকি তোমরা মামুলী মুমিনরা বেশি বোঝো?”
এর উত্তরে আমরা বলবঃ ইসলামবিরোধীরা অত্যন্ত অসৎ। শায়খ আলবানী(র.) এর আরো বহু তাহকিক আছে যা তাদের বিরুদ্ধে যায় বিধায় তারা সেগুলো মানে না বরং বেছে বেছে তারা আলেমদের উদ্ধৃত করে। আর মুসলিমরা সব ক্ষেত্রেই উলামাদেরকে দলিল ও প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসরণ করে। এবং যদি দলিল কারো মতের বিরুদ্ধে যায়, সেক্ষেত্রে মুসলিমরা সহীহ দলিল যেদিকে আছে, সেদিকে অনুসরণ করে।
আর এখানে ‘মামুলী’ মুমিনরা নিজে থেকে কোনো অভিমত দিচ্ছে না বরং প্রাচীন ও সমকালীন শীর্ষ মুহাদ্দিসদের অভিমত অনুসরণ করছে যাঁরা শায়খ আলবানী(র.) এর থেকে কোনো অংশে কম জ্ঞানী না। ইসলামবিরোধীরা বেছে বেছে এই স্থানে শুধুমাত্র সেসব ওয়েবসাইট থেকে উদ্ধৃত করে যেখানে আলোচ্য হাদিস সহীহ বলা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অন্য মুহাদ্দিসদের তাহকিক দেয়া থাকলেও ভুলেও তারা তা উদ্ধৃত করে না। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘দারুস সালাম’ থেকে প্রকাশিত আবু দাউদ ও তিরমিযি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদে একজন সমকালীন শীর্ষ মুহাদ্দিস যুবায়ের আলি জাঈ(র.) এর তাহকিক উল্লেখ করা হয়েছে। শায়খ যুবায়ের আলি জাঈ(র.) আবু দাউদ ও তিরমিযি গ্রন্থের আলোচ্য উভয় হাদিসকেই যঈফ বা দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। [15] এই তাহকিকও অনলাইনে পাওয়া যায়। [16] কিন্তু ইসলামবিরোধীরা ভুলেও তা দেখবে না বা উল্লেখ করবে না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য অসৎ, তাদের উদ্দেশ্য চেরিপিকিং করে মানুষকে ধোঁকা দেয়া।
গাইর মাহরামের ব্যাপারে ইসলামী বিধান ভঙ্গের অভিযোগের জবাবঃ
ইসলামবিরোধীরা উপরের দুর্বল হাদিসগুলোর পাশাপাশি আরো হাদিস পেশ করে অভিযোগ করে – “নবী(ﷺ) তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হানি হানি(রা.) এর সাথে এমনভাবে মেলামেশা করতেন যাতে গাইরে মাহরামের ব্যাপারে ইসলামের আইন ভঙ্গ হতো (নাউযুবিল্লাহ)।”
আমরা আবু দাউদ ও তিরমিযির হাদিসগুলোর তাহকিক থেকে দেখেছি যে সেগুলো আদৌ প্রমাণিত নয়। কাজেই সেসব অপ্রমাণিত ঘটনার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। এরপরেও যদি তর্কের খাতির উপরে উল্লেখিত হাদিসগুলোকে সহীহ ধরি, তাহলেও সেখানে আপত্তিকর বা ইসলামে গাইর মাহরামের ক্ষেত্রে যে বিধান আছে তা ভঙ্গ হবার মতো কিছুই পাওয়া যায় না। ইসলামী শরিয়তে ‘খালওয়াহ’ বা গাইর মাহরাম নারী-পুরুষের একাকী অবস্থানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আলোচ্য দুর্বল হাদিসগুলোতে উল্লেখিত ঘটনাতে নবী(ﷺ) মোটেও উম্মে হানি(রা.) এর সাথে একাকী হননি বরং সেখানে তাঁর কন্যা ফাতিমা(রা.)ও উপস্থিত ছিলেন। আর যদি ২ জন নারীর উপস্থিতিতে একজন পুরুষ অবস্থান করে, তাহলে তা ‘খালওয়াহ’ এর অন্তর্ভুক্ত হয় না। এ প্রসঙ্গে সুবিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েবসাইট IslamQAতে উল্লেখ করা হয়েছে—
“Khalwah can be avoided with the presence of a mahram or the presence of a righteous woman, according to the correct opinion.
It says in Asna’l-Mataalib (3/407): It is permissible for a man to be alone with two women, but not the opposite; i.e., it is not permissible for two non-mahram men to be alone with a woman even if it is unlikely that they would agree to commit immoral actions, as was clearly stated by al-Nawawi in al-Majmoo‘; that is because a woman feels more shy of another woman than a man feels shy of another man.”
অর্থঃ “বিশুদ্ধ মতানুসারে খালওয়াহ (নির্জনতা) এড়ানো সম্ভব, যদি কোনো মাহরাম উপস্থিত থাকে বা একজন ধর্মপরায়ণ নারী উপস্থিত থাকেন।
আসনাল মাত্বালিব (৩/৪০৭) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ একজন পুরুষের জন্য দুইজন নারীর সঙ্গে একাকী হওয়া বৈধ, কিন্তু এর বিপরীতটি বৈধ নয়। অর্থাৎ, কোনো নারীর জন্য মাহরাম নয়—এমন দুই পুরুষের সঙ্গে নির্জনে থাকা বৈধ নয়, এমনকি যদি তাদের পক্ষে কোনো অশ্লীল কাজে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। ইমাম নববী আল-মাজমু’ গ্রন্থে এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কারণ, একজন নারী আরেকজন নারীর সামনে লজ্জাবোধ বেশি করেন। কিন্তু একজন পুরুষ অন্য পুরুষের সামনে ততটা লজ্জাবোধ করেন না।” [17]
অসুস্থ চিন্তাধারার ইসলামবিরোধীরা নবী(ﷺ) এবং উম্মে হানি(রা.) এর পাশাপাশি বসার বিষয়টি নিয়ে নানা অশ্লীল ইঙ্গিত করে এবং দাবি করে এতে নাকি ইসলামের বিধান ভঙ্গ হয়েছে! তারা আসলে ইসলামের বিধানের একেবারে প্রাথমিক বিষয়ে না জেনেই ভুলভাল অভিযোগ করে। উম্মে হানি(রা.) ছিলেন নবী(ﷺ) এর চাচাতো বোন। আর চাচাতো ভাই-বোনের একত্রে বসা প্রসঙ্গে এক ফতোয়ায় গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ শায়খ আব্দুল আযিয বিন বায(র.) বলেন—
يَجُوزُ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَجْلِسَ مَعَ أَخِي زَوْجِهَا أَوْ بَنِي عَمِّهَا أَوْ نَحْوِهِمْ، إِذَا كَانَتْ مُحَجَّبَةً الْحِجَابَ الشَّرْعِيَّ، وَذَلِكَ بِسَتْرِ وَجْهِهَا وَشَعْرِهَا وَبَقِيَّةِ بَدَنِهَا؛ لِأَنَّهَا عَوْرَةٌ وَفِتْنَةٌ، إِذَا كَانَ الْجُلُوسُ الْمَذْكُورُ لَيْسَ فِيهِ رِيبَةٌ، وَلَا خَلْوَةٌ بِأَحَدٍ مِنْهُمْ.
অর্থঃ "একজন নারী তার স্বামীর ভাই, তার [ঐ মহিলার নিজের] চাচাতো ভাই বা তাদের মতো অন্য পুরুষ আত্মীয়দের সঙ্গে বসতে পারেন, যদি তিনি শারঈ পর্দা মেনে চলেন। অর্থাৎ, তিনি তাঁর মুখ, চুল এবং শরীরের বাকি অংশ ঢেকে রাখবেন, কারণ তিনি (নারী) গোপনীয় এবং পরীক্ষার কারণ। তবে এটি তখনই বৈধ যখন উক্ত বসার পরিবেশে কোনো সন্দেহজনক বিষয় না থাকে এবং তাদের কারও সঙ্গে নির্জনতা (খালওয়াহ) সৃষ্টি না হয়।" [18]
আলোচ্য বর্ণনায় কোথাও এটা উল্লেখ নেই যে উম্মে হানি(রা.) হিজাব করা ছিলেন না। কাজেই উপরের [দুর্বল] বর্ণনাগুলোতে উল্লেখিত নবী(ﷺ) এবং উম্মে হানি(রা.) এর অবস্থান কোনোভাবেই ইসলামে গাইরে মাহরাম সম্পর্কিত বিধানের লঙ্ঘন করে না। ইসলামবিরোধীরা ইসলামের পর্দার বিধানকে বিকৃত করে অতি মাত্রায় কঠোরতার এক চিত্র অংকন করে ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। [19]
এসব দুর্বল হাদিসে নবী(ﷺ) এবং উম্মে হানি(রা.) এর একই পাত্র থেকে পান করা বা নবী(ﷺ) এর পানকৃত থেকে উম্মে হানি(রা.) কর্তৃক অবশিষ্ট পানীয় পানের বিষয়টি দেখিয়ে ইসলামবিরোধীরা অশালীন ইঙ্গিত করে। এর জবাবে আমরা বলব – এখানে আলাদা কিছুই নেই, উম্মে হানি(রা.) একা না বরং অন্যান্য সাহাবী থেকেও এই জাতীয় ঘটনা রয়েছে। বিভিন্ন সহীহ হাদিসে উল্লেখ আছে অন্য সাহাবীরা নবী(ﷺ) এর থুথু পর্যন্ত সংগ্রহ করতেন, তাঁর ব্যবহৃত ওযুর পানি সংগ্রাহ করার জন্যও তাঁরা প্রতিযোগিতা করতেন। এর কারণ ছিল নবীপ্রেম এবং নবী(ﷺ) থেকে বরকত হাসিল। [20] এ কারণে নবী(ﷺ) নিজেও তাঁর কুলিকৃত পানি অন্যদের ব্যবহার করতে বলতেন বলে উল্লেখ আছে।
قَالَ فَوَاللهِ مَا تَنَخَّمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ نُخَامَةً إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ وَمَا يُحِدُّونَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيمًا لَهُ فَرَجَعَ عُرْوَةُ إِلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ أَيْ قَوْمِ وَاللهِ لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى الْمُلُوكِ وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ وَكِسْرَى وَالنَّجَاشِيِّ وَاللهِ إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطُّ يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ مُحَمَّدًاﷺ
অর্থঃ "তিনি [উরওয়াহ ইবন মাসউদ] বলেন, ’আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ ﷺ কফ ফেলতেই তা ওদের কারো হাতে পড়ছিল এবং সে তা নিয়ে নিজের চেহারা ও চামড়ায় মেখে নিচ্ছিল। তিনি কোন আদেশ করলে তারা তাঁর আদেশ পালনে তৎপর ছিল। তিনি উযূ করলে তাঁর উযূর পানি নেওয়ার জন্য মারামারি করছিল। তিনি কথা বললে তারা নিজেদের আওয়াজ তাঁর কাছে নিচু ক’রে নিচ্ছিল। অতি সমীহতে তাঁর প্রতি তারা এক দৃষ্টে তাকাচ্ছিল না।’
উরওয়াহ নিজ সঙ্গীদের কাছে ফিরে এসে বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! অনেক রাজা-বাদশার দরবারে গেছি, ক্বাইসার, কিসরা ও নাজাশীর দরবারে গেছি। কিন্তু আল্লাহর কসম! কোন রাজাকে দেখিনি, তার প্রজারা তাকে তেমন সমীহ করে, যেমন সমীহ করে মুহাম্মাদ ﷺ এর অনুসারীরা মুহাম্মাদের !" [21]
سَمِعْتُ أَبَا جُحَيْفَةَ، يَقُولُ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالْهَاجِرَةِ، فَأُتِيَ بِوَضُوءٍ فَتَوَضَّأَ، فَجَعَلَ النَّاسُ يَأْخُذُونَ مِنْ فَضْلِ وَضُوئِهِ فَيَتَمَسَّحُونَ بِهِ، فَصَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الظُّهْرَ رَكْعَتَيْنِ وَالْعَصْرَ رَكْعَتَيْنِ، وَبَيْنَ يَدَيْهِ عَنَزَةٌ. وَقَالَ أَبُو مُوسَى دَعَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِقَدَحٍ فِيهِ مَاءٌ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ وَوَجْهَهُ فِيهِ، وَمَجَّ فِيهِ ثُمَّ قَالَ لَهُمَا اشْرَبَا مِنْهُ، وَأَفْرِغَا عَلَى وُجُوهِكُمَا وَنُحُورِكُمَا.
অর্থঃ "আবূ জুহায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একবার দুপুরে নবী ﷺ আমাদের সামনে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে উযূর পানি এনে দেওয়া হল। তখন তিনি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। লোকে তাঁর উযূর ব্যবহৃত পানি নিয়ে গায়ে মাখতে লাগল। এরপর নবী ﷺ যোহরের দু’রাকআত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। আর তাঁর সামনে ছিল একটি লাঠি।
আবূ মূসা (রাঃ) বলেনঃ নবী ﷺ একটি পাত্র আনালেন যাতে পানি ছিল। তারপর তিনি তার মধ্যে উভয় হাত ও চেহারা মুবারক ধুইলেন এবং তার মধ্যে কুলি করলেন। তারপর তাঁদের দু’জন [আবূ মূসা (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ)]-কে বললেন, তোমরা এ থেকে পান কর এবং তোমাদের মুখমণ্ডল ও বুকে ঢাল।" [22]
কাজেই নবী(ﷺ) এর পানকৃত পানীয় থেকে উম্মে হানি(রা.) যদি অবশিষ্ট পানীয় আসলেও পান করে থাকেন – সেটা আলাদা বা ‘বিশেষ’ কিছুই না বরং অন্য বহু সাহাবী(রা.) থেকেও এই জাতীয় আমল আছে যা নবীপ্রেম ও বরকতের সাথে সংশ্লিষ্ট।
ইসলামবিরোধীরা দুর্বল হাদিসের পাশাপাশি আরো হাদিস পেশ করেও গাইর মাহরামের বিধান ভঙ্গের অভিযোগ করে থাকে। তাদের পেশকৃত এমন একটি হাদিসঃ
عَنْ أُمِّ هَانِئٍ بِنْتِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَتْ دَخَلَ عَلَىَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ " هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ " . فَقُلْتُ لاَ إِلاَّ كِسَرٌ يَابِسَةٌ وَخَلٌّ . فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " قَرِّبِيهِ فَمَا أَقْفَرَ بَيْتٌ مِنْ أُدْمٍ فِيهِ خَلٌّ " .
অর্থঃ “উম্মে হানী বিনত আবূ তালিব(রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন আমার কাছে এলেন এবং বললেন, তোমাদের কাছে কিছু আছে কি? আমি বললাম, শুকনো রুটির কয়েকটি টুকরা ও সিরকা ছাড়া আর কিছুই নেই। নবী ﷺ বললেন, তা-ই নিয়ে আস, যে বাড়িতে সিরকা আছে যে বাড়িতে সালনের কোন অভাব আছে বলে বলা যায় না।” [23]
এর জবাবে আমরা বলব – মানসিকভাবে অসুস্থ না হলে কেউ এই ঘটনা থেকে অভিযোগ করে না। একজন মানুষ তাঁর চাচাতো বোনের কাছে খাবার চাইতে গেছেন – এই ঘটনা থেকে কেউ কিভাবে অশ্লীলতা বের করে? আমরা জানি যে নবী(ﷺ) কীরূপ অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতেন। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর চাচাতো বোনের কাছে খাবার চাইবেন এটা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপারে। আর এই বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট যে এই ঘটনা মাক্কী যুগে, পর্দার বিধান নাজিলেরও আগে। এই ঘটনা হিজরতের পরে ঘটলে নবী(ﷺ) অবশ্যই মদিনা থেকে মক্কায় উম্মে হানি(রা.) এর বাড়িতে এসে খাবার চাইতেন না! কাজেই এখানে গাইরে মাহরামের বিধান লঙ্ঘনের প্রশ্নই আসে না। আমরা জানি যে নবী(ﷺ) তাঁর চাচা আবু তালিবের বাড়িতে ছোটবেলা থেকে প্রতিপালিত হয়েছেন। আর উম্মে হানি(রা.) ছিলেন আবু তালিবেরই কন্যা। একই বাড়িতে ছোটবেলা থেকে যার সাথে বড় হয়েছেন, সেই চাচাতো বোনের কাছে খাবার চাওয়ার মতো স্বাভাবিক ঘটনা থেকে যারা অশ্লীল ইঙ্গিত বের করে, আমরা তাদের মানসিক সুস্থতা কামনা করি।
উম্মে হানি(রা.) এর বাড়িতে নবী(ﷺ) এর গোসল করা প্রসঙ্গে ইসলামবিরোধীদের নোংরামীর জবাবঃ
মক্কা বিজয়ের দিনে নবী(ﷺ) এর গোসল করা সংক্রান্ত কিছু হাদিস উদ্ধৃত করে ইসলামবিরোধীরা অত্যন্ত অশ্লীল কিছু ইঙ্গিত করে। এই সংক্রান্ত কিছু হাদিস—
سَمِعَ أُمَّ هَانِئٍ بِنْتَ أَبِي طَالِبٍ، تَقُولُ ذَهَبْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَامَ الْفَتْحِ، فَوَجَدْتُهُ يَغْتَسِلُ، وَفَاطِمَةُ ابْنَتُهُ تَسْتُرُهُ قَالَتْ فَسَلَّمْتُ عَلَيْهِ فَقَالَ " مَنْ هَذِهِ ". فَقُلْتُ أَنَا أُمُّ هَانِئٍ بِنْتُ أَبِي طَالِبٍ. فَقَالَ " مَرْحَبًا بِأُمِّ هَانِئٍ ". فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ غُسْلِهِ، قَامَ فَصَلَّى ثَمَانِيَ رَكَعَاتٍ، مُلْتَحِفًا فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، زَعَمَ ابْنُ أُمِّي أَنَّهُ قَاتِلٌ رَجُلاً قَدْ أَجَرْتُهُ فُلاَنَ بْنَ هُبَيْرَةَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِئٍ ". قَالَتْ أُمُّ هَانِئٍ وَذَاكَ ضُحًى.
অর্থঃ "উম্মে হানী বিনত আবূ তালিব (রাঃ) বলেনঃ আমি বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গিয়ে দেখলাম যে, তিনি গোসল করছেন আর তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রাঃ) তাঁকে পর্দা করে রখেছেন। তিনি বলেনঃ আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ এ কে? আমি উত্তর দিলামঃ আমি উম্মে হানী বিনত আবূ তালিব। তিনি বললেনঃ মারহাবা, হে উম্মে হানী! গোসল করার পরে তিনি এক কাপড় জড়িয়ে আট রাক’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। সালাত শেষ করলে তাঁকে আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সহোদর ভাই [’আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)] এক লোককে হত্যা করতে চায়, অথচ আমি সে লোকটিকে আশ্রয় দিয়েছি। সে লোকটি হুবায়রার ছেলে অমুক। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ হে উম্মে হানী! তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমিও তাঁকে আশ্রয় দিলাম। উম্মে হানী (রাঃ) বলেনঃ তখন ছিল চাশতের সময়।" [24]
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى، قَالَ مَا أَخْبَرَنِي أَحَدٌ، أَنَّهُ رَأَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي الضُّحَى إِلاَّ أُمُّ هَانِئٍ فَإِنَّهَا حَدَّثَتْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ بَيْتَهَا يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ فَاغْتَسَلَ فَسَبَّحَ ثَمَانَ رَكَعَاتٍ مَا رَأَيْتُهُ صَلَّى صَلاَةً قَطُّ أَخَفَّ مِنْهَا غَيْرَ أَنَّهُ كَانَ يُتِمُّ الرُّكُوعَ وَالسُّجُودَ .
অর্থঃ "আবদুর রহমান ইবনু আবী লায়লা (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেনঃ উম্মু হানী (রা.) ব্যতীত আমার নিকট আর কেউ একথা বর্ণনা করেননি যে, তিনি ﷺ -কে এই সালাত (আয-যুহা) আদায় করতে দেখেছেন। উম্মু হানী (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূল ﷺ ফতহে মক্কার দিন (মক্কা বিজয়ের দিন) তাঁর ঘরে এলেন এবং গোসল করলেন। এরপর আট রাকআত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত সালাত আদায় করতে আমি তাঁকে আর কখনও দেখিনি। তবে তাঁর এই সালাতে তিনি রুকূ ও সিজদা পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করেছিলেন।" [25]
যেহেতু ধার্মিক মুসলিমরা সহবাস করার পরে ফরয গোসল করে, ইসলামবিরোধীরা এখানে সেদিকে ইঙ্গিত করে নবী ﷺ এর বিরুদ্ধে জেনা-ব্যাভিচারের অপবাদ দিতে চায়, নাউযুবিল্লাহ। এই জঘন্য কথা মুখে আনতেও কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু ইসলামবিরোধীদের মিথ্যাচার অপনোদন করতে এগুলো উল্লেখ করতেই হল।
তাদের এইসব জঘন্য অভিযোগের জবাবে আমরা বলবঃ নিতান্তই আক্কেলজ্ঞানহীন এবং নোংরা চিন্তাধারার অধিকারী না হলে কেউ এমন কুৎসিত অভিযোগ আনতেই পারে না। কারণ –
ক) অনেক সময় মানুষ নিজে যেমন, অন্যকেও সেভাবে বিবেচনা করে। যেমন, খুব ভোরবেলা কোনো একজন মানুষকে হাত-মুখ ধুতে দেখলে একজন নামাজী ব্যক্তি ধারণা করে এই ব্যক্তি ফজরের নামাজের জন্য ওযু করছে। ঐ একই ব্যক্তিকে দেখলে একজন চোর চিন্তা করে – এই লোক বুঝি সারা রাত চুরি করে এখন হাত-মুখ ধুচ্ছে! ইসলামবিরোধীদের অবস্থায় ঠিক এরূপ। তারা সব জায়গায় শুধু ষড়যন্ত্র আর অশ্লীলতা খুঁজে পায়। গোসল করার অতি সাধারণ ঘটনা থেকে তারা অসাধারণ অশ্লীল মানে বের করেছে। নবী ﷺ মক্কায় প্রবেশ করে কেন গোসল করেছিলেন? ইসলামবিরোধীদের জ্ঞাতার্থে বলবঃ মানুষ শুধু ফরয গোসলই করে না, গোসলের আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। পবিত্র নগরী মক্কায় প্রবেশের আদবসমূহের একটা হচ্ছে গোসল করা। বাংলাদেশ থেকে যারা হজ, উমরাহ ইত্যাদির জন্য মক্কায় যান, তাঁরাও এটি করে থাকেন। [26] সহীহ বুখারীর ‘হজ’ অধ্যায়ে একটা পরিচ্ছেদের নামকরণই করা হয়েছেঃ “بَاب الاِغْتِسَالِ عِنْدَ دُخُولِ مَكَّةَ” {মক্কায় প্রবেশকালে গোসল করা}। [27] সেখানেও ইবনু উমার(রা.) এবং নবী ﷺ থেকে গোসলের আমল উল্লেখ করা হয়েছে। [28]
খ) নবী ﷺ কেন উম্মে হানি(রা.) এর বাড়িতে গোসল করলেন? এর উত্তর অতি সহজ। নবী ﷺ ছোটবেলা থেকে চাচা আবু তালিবের গৃহে প্রতিপালিত হয়েছেন। আবু তালিবের গৃহই ছিল মূলত “তাঁর নিজের” গৃহ। আর আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানি(রা.)ও সে গৃহে বড় হয়েছেন। ইসলাম গ্রহণ করে হিজরতের জন্য আবু তালিবের পুত্ররা মক্কা ছেড়ে চলে যান। উম্মে হানি যেহেতু তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি, তিনি মক্কাতে রয়ে যান। ফলে মক্কায় নবী ﷺ এর সব থেকে কাছের আত্মীয় ছিলেন উম্মে হানি(রা.)। কাজেই মক্কা বিজয়ের পরে মক্কায় প্রবেশের আদব হিসেবে গোসল করতে হলে তিনি উম্মে হানি(রা.) এর গৃহে এসেই গোসল করবেন, এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
গ) মক্কা বিজয়ের পরে উম্মে হানি(রা.) এর স্বামী যদি সেখানে না থাকেন, তাহলে ঐ বাড়িতে আর কেউ ছিল না এটা ইসলামবিরোধীদেরকে কে বলেছে? একটা বাড়ির মধ্যে কি শুধু ২ জন মানুষ বাস করে যে তাদের একজন না থাকলেই ঐ বাড়িতে ১ জন মাত্র অবশিষ্ট থাকবে?? বিশেষ করে ৭ম শতাব্দীর আরবীয় পরিমণ্ডলে এমনটা ভাবা তো আরো অযৌক্তিক। এমনকি ইসলামবিরোধীরা নবী ﷺ এর গোসলের যে হাদিস নিয়ে আসে সেখানেও দেখা যাচ্ছে সেখানে নবী ﷺ এর কন্যা ফাতিমা(রা.) উপস্থিত ছিলেন। অন্য বর্ণনায় আবু যার(রা.) এর উপস্থিত থাকার কথাও উল্লেখ আছে [যা একটু পরেই ফাতহুল বারী থেকে উদ্ধৃত করা হবে।] মক্কা বিজয়সহ প্রায় যে কোনো সময়েই নবী ﷺ কোনো না কোনো সাহাবী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। সেই বাড়িতে শুধু নবী ﷺ এবং উম্মে হানি(রা.) একা ছিলেন, এটা কোনো হাদিসেই উল্লেখ নেই; এটা ইসলামবিরোধীদের অশ্লীল কল্পনার ফসল।
ঘ) কেউ যদি জেনা-ব্যভিচার করার মতো পাপিষ্ঠ মনোবৃত্তির হয়, তাহলে সে কি আর ঐ কাজের পরে ফরয গোসল করার ধার ধারে? শরয়ী গোসল তো তাঁরাই করেন যারা ধার্মিক এবং দ্বীনের নিয়ম মেনে চলেন। নবী ﷺ এর গোসল করা থেকে যারা অশ্লীল মানে বের করে (নাউযুবিল্লাহ), তাদের মাথায় সামান্যতম যুক্তি-বুদ্ধিটুকুও নেই।
ঙ) ইসলামবিরোধীরা আরো অভিযোগ করে - নবী ﷺ কেন একাধিকবার গোসল করলেন, কী এমন কাজের জন্য একাধিক গোসলের প্রয়োজন হল। এই সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে একাধিকভাবে ব্যাখ্যার অবকাশ আছে। তবে সেখান থেকে অনায়াসেই এই ব্যাখ্যা করা যায় যে গোসল একবারই হয়েছিল এবং এমনটি ভাবাই অধিক যৌক্তিক। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবন হাজার আসকালানী(র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃ
قَوْلُهُ: (دَخَلَ بَيْتَهَا يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ فَاغْتَسَلَ وَصَلَّى) ظَاهِرُهُ أَنَّ الِاغْتِسَالَ وَقَعَ فِي بَيْتِهَا، وَوَقَعَ فِي الْمُوَطَّأِ وَمُسْلِمٍ مِنْ طَرِيقِ أَبِي مُرَّةَ عَنْ أُمِّ هَانِئٍ أَنَّهَا ذَهَبَتْ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ وَهُوَ بِأَعْلَى مَكَّةَ فَوَجَدَتْهُ يَغْتَسِلُ، وَجُمِعَ بَيْنَهُمَا بِأَنَّ ذَلِكَ تَكَرَّرَ مِنْهُ. وَيُؤَيِّدُهُ مَا رَوَاهُ ابْنُ خُزَيْمَةَ مِنْ طَرِيقِ مُجَاهِدٍ عَنْ أُمِّ هَانِئٍ، وَفِيهِ: أَنَّ أَبَا ذَرٍّ سَتَرَهُ لَمَّا اغْتَسَلَ، وَفِي رِوَايَةِ أَبِي مُرَّةَ عَنْهَا أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَهُ هِيَ الَّتِي سَتَرَتْهُ، وَيَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ نَزَلَ فِي بَيْتِهَا بِأَعْلَى مَكَّةَ، وَكَانَتْ هِيَ فِي بَيْتٍ آخَرَ بِمَكَّةَ فَجَاءَتْ إِلَيْهِ فَوَجَدَتْهُ يَغْتَسِلُ، فَيَصِحُّ الْقَوْلَانِ، وَأَمَّا السَّتْرُ فَيَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ أَحَدُهُمَا سَتَرَهُ فِي ابْتِدَاءِ الْغُسْلِ، وَالْآخَرُ فِي أَثْنَائِهِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
অর্থঃ “তাঁর বক্তব্যঃ {তিনি মক্কা বিজয়ের দিনে তার ঘরে প্রবেশ করলেন, গোসল করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন} – এর বাহ্যিক অর্থ হলো, গোসলটি তাঁর [উম্মে হানির(রা.)] ঘরেই সংঘটিত হয়েছিল। তবে মুয়াত্তা ও সহীহ মুসলিমে আবু মুররাহ্-এর বর্ণনায় উম্মে হানির(রা.) সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি নবী ﷺ–এর নিকট গেলেন যখন তিনি মক্কার উচ্চভাগে ছিলেন এবং সেখানে গিয়ে তাঁকে গোসলরত অবস্থায় পেলেন।
[একাধিকবার গোসল হয়েছে এই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে,] উভয় বর্ণনাকে এইভাবে সমন্বয় করা যায় যে - এই ঘটনা একাধিকবার ঘটেছিল। এই মতকে সমর্থন করে ইবন খুজাইমার বর্ণিত একটি হাদিস, যা মুজাহিদের মাধ্যমে উম্মে হানির(রা.) থেকে এসেছে। এতে বলা হয়েছে যে, নবী ﷺ যখন গোসল করছিলেন, তখন আবু যার(রা.) তাঁকে পর্দা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আবু মুররাহ্-এর আরেকটি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, তাঁর কন্যা ফাতিমা(রা.) নবী ﷺ-কে পর্দা দিয়েছিলেন।
[একবার গোসল হয়েছে এই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে,] সম্ভবত নবী ﷺ মক্কার উচ্চভাগে তাঁর [উম্মে হানির(রা.)] ঘরে অবস্থান করেছিলেন, আর উম্মে হানি(রা.) অন্য একটি ঘরে ছিলেন। পরে তিনি নবী ﷺ-এর নিকট এসে তাঁকে গোসলরত অবস্থায় দেখতে পান। এইভাবে, উভয় বক্তব্যই সঠিক হতে পারে। যেখানে পর্দা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে সম্ভবত একজন গোসলের শুরুতে পর্দা দিয়েছিলেন, আর অন্যজন গোসলের মাঝখানে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।” [29]
গোসল করার হাদিসগুলো যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে দেখব গোসলের পরেই নবী(ﷺ) কর্তৃক চাশতের (সলাতুদ দ্বুহা) নামাজ পড়ার উল্লেখ আছে। এ থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে এটা মূলত একই ঘটনার বর্ণনা এবং গোসল একবারই হয়েছে। বার বার গোসল করে বার বার চাশতের নামাজ পড়া বাস্তবসম্মত নয়। কাজেই একবার গোসলের ব্যাখ্যাই সঠিক। আমরা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি যে মক্কায় প্রবেশের আদবের মধ্যে মুস্তাহাব কর্ম হচ্ছে গোসল করা। এমনকি এই মুস্তাহাবের বিষয়টি বাদ দিলেও মদিনা থেকে মক্কার বিশাল দূরত্বের যাত্রা এবং কঠিন অভিযান শেষে মরুর তপ্ত গরমের মাঝে কেউ একবার এমনকি একাধিকবার গোসল করতেই পারে। এর মাঝে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। মূলত যাদের মনের মাঝে অশালীন চিন্তা তারাই এ থেকে খারাপ অর্থ বের করে।
আমরা সমগ্র আলোচনার সারাংশ হিসেবে বলতে পারিঃ
১। নবী(ﷺ) কর্তৃক রমযান মাসে রোজা ভাঙা বা উম্মে হানি(রা.) এর রোজা ভাঙানো সংক্রান্ত হাদিসগুলো বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। এগুলোর সনদ ও মাতান উভয়ই ত্রুটিপূর্ণ।
২। নবী(ﷺ) কর্তৃক কোনোভাবেই গাইর মাহরামের ব্যাপারে ইসলামী বিধান ভঙ্গের উদাহরণ দেখা যায় না। ইসলামবিরোধীরা এক্ষেত্রে মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা করে অভিযোগ আনে।
৩। মক্কায় প্রবেশকালের আদবের মধ্যে অন্যতম হল গোসল করা। আর নিকটাত্মীয় হিসেবে নবী(ﷺ) স্বাভাবিকভাবেই উম্মে হানি(রা.) এর গৃহে গোসল করেছেন। এর মাঝে কোনোরূপ অস্বাভাবিকতা বের করা অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক।
তথ্যসূত্রঃ
[1] সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৪৪৮
[2] সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ৭৩০
[3] সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ৭২৯
[4] "The Conquest of Makkah took place on the 20th of Ramadaan, when the people entered the religion of Allaah in crowds and Makkah became the centre of Islam. "
https://islamqa.info/en/articles/34/
অথবা https://archive.is/wip/4vq0x (আর্কাইভকৃত)
[5] দেখুনঃ https://islamqa.info/en/48975/
অথবা https://archive.is/wip/zwWGa (আর্কাইভকৃত)
[6] আত-তামহিদ – ইবন আব্দুল বার, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪৪৯; পাদটীকা নং : ১; তাহকিকঃ হাসান আব্দিল মুন’ইম শালাবি এবং মুহাম্মাদ বাশার আওয়াদ
https://shamela.ws/book/236/4156
অথবা https://archive.is/wip/y4n2z (আর্কাইভকৃত)
[7] যদি কোনো বর্ণনাকারীর চরিত্র গ্রহণযোগ্য হয় কিন্তু সংরক্ষণ দক্ষতায় কিছু ত্রুটি থাকে, তাহলে তিনি ২য় স্তরে নেমে যান, এই শ্রেণীর নাম صَدُوقٌ (স্বদুক)। দেখুনঃ হাদিস সংকলনের ইতিহাস – শাইখ ড. মুস্তফা আল-আযমি (সমকালীন প্রকাশন),পৃষ্ঠা ১২১
[8] আদ-দ্বু’আফা ওতাল মাতরুকুন – ইবনুল জাওযি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬
https://shamela.ws/book/5830/339
অথবা https://archive.is/wip/yCPCJ (আর্কাইভকৃত)
[9] দেখুনঃ https://dorar.net/h/yE9LoK3x
অথবা https://archive.is/wip/FeH9A (আর্কাইভকৃত)
[10] নাইলুল আওত্বারি শারহু মুনতাক্বাল আখবার - মুহাম্মাদ বিন আলি আশ-শাওকানী, তাহকিকঃ মুহাম্মাদ সুবহি বিন হাসান হাল্লাক, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৪৬-৪৪৭
https://shamela.ws/book/1218/3977
https://shamela.ws/book/1218/3978
অথবা (আর্কাইভকৃত)
[11] যদি কোনো বর্ণনাকারীর চরিত্র গ্রহণযোগ্য হয় কিন্তু সংরক্ষণ দক্ষতায় কিছু ত্রুটি থাকে, তাহলে তিনি ২য় স্তরে নেমে যান, এই শ্রেণীর নাম صَدُوقٌ (স্বদুক)। দেখুনঃ হাদিস সংকলনের ইতিহাস – শাইখ ড. মুস্তফা আল-আযমি (সমকালীন প্রকাশন),পৃষ্ঠা ১২১
[12] নাইলুল আওত্বারি শারহু মুনতাক্বাল আখবার - মুহাম্মাদ বিন আলি আশ-শাওকানী, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৪৭-৪৪৮
https://shamela.ws/book/1218/3978
https://shamela.ws/book/1218/3979
অথবা (আর্কাইভকৃত)
[13] সিয়ারু আ’লামিন নুবালা – শামসুদ্দিন যাহাবী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১২
https://shamela.ws/book/10906/2292
অথবা https://archive.is/wip/yGZDy (আর্কাইভকৃত)
[14] আল ইসতি’আবু ফি মা’রিফাতিল আসহাব – ইবন আব্দুল বার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৮৯
https://shamela.ws/book/12288/1876
অথবা https://archive.is/wip/NHrpc (আর্কাইভকৃত)
[15] দেখুনঃ
Sunan Abu Dawud Vol. 3 (Darussalam), Page 180
Jami at-Tirmidhi Vol. 2 (Darussalam), Page 172-174
[16] সুবিখ্যাত হাদিস ওয়েবসাইট Sunnah.com এ তিরমিযির হাদিসদ্বয়ের তাহকিক অংশে এদেরকে দুর্বল হাদিস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
https://sunnah.com/tirmidhi:731
https://sunnah.com/tirmidhi:732
অথবা (আর্কাইভকৃত)
[17] দেখুনঃ https://islamqa.info/en/146441/
অথবা https://archive.is/K99Wt (আর্কাইভকৃত)
[18] দেখুনঃ https://islamqa.info/ar/23302/
অথবা https://archive.is/ohubg (আর্কাইভকৃত)
[19] এ প্রসঙ্গে আরো দেখুনঃ
"Based on that, if your wife goes to your family’s house, and in the house there are people before whom she is not allowed to uncover, then she should remain in her hijab. There is nothing wrong with her sitting in the family gathering if it is free of the infractions referred to, namely looking, being alone together, shaking hands and speaking softly."
অর্থঃ "এর ভিত্তিতে, যদি আপনার স্ত্রী আপনার পরিবারের বাড়িতে যায় এবং সেখানে এমন লোকজন থাকে, যাদের সামনে তার পর্দা করা বাধ্যতামূলক, তাহলে তাকে তার হিজাব পরেই থাকতে হবে।
তবে, যদি পারিবারিক জমায়েতে এমন কোনো নিষিদ্ধ বিষয় না থাকে—যেমন নিষিদ্ধ দৃষ্টিপাত, খালওয়াহ (নির্জনতা), পরপুরুষের সঙ্গে করমর্দন এবং কোমল কণ্ঠে কথা বলা—তাহলে সেখানে বসতে তার কোনো সমস্যা নেই।"
দেখুনঃ https://islamqa.info/en/113136/
অথবা https://archive.is/wip/NKWBz (আর্কাইভকৃত)
[20] দেখুনঃ আল ইরশাদ-সহীহ আকীদার দিশারী - শাইখ ড. ছলিহ ইবনে ফাওযান আল ফাওযান
[21] বুখারী ২৭৩২, হাদিস সম্ভার ১৫১৬
[22] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ১৮৭
[23] সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ১৮৪৮ (হাসান)
[24] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩৫০
[25] সুনান তিরমিযি, হাদিস নং : ১৮৪৮ (হাসান)
[26] দেখুনঃ প্রশ্নোত্তরে হজ্জ ও উমরা - অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম
[27] এ প্রসঙ্গেসহীহ বুখারীর সব থেকে বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে বিস্তারিত মাসয়ালা আলোচনা করা হয়েছে।
قَوْلُهُ: (بَابُ الِاغْتِسَالِ عِنْدَ دُخُولِ مَكَّةَ) قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ: الِاغْتِسَالُ عِنْدَ دُخُولِ مَكَّةَ مُسْتَحَبٌّ عِنْدَ جَمِيعِ الْعُلَمَاءِ، ... ... وَقَالَ الشَّافِعِيَّةُ: إِنْ عَجَزَ عَنِ الْغُسْلِ تَيَمَّمَ. وَقَالَ ابْنُ التِّينِ: لَمْ يَذْكُرْ أَصْحَابُنَا الْغُسْلَ لِدُخُولِ مَكَّةَ، وَإِنَّمَا ذَكَرُوهُ لِلطَّوَافِ، وَالْغُسْلُ لِدُخُولِ مَكَّةَ هُوَ فِي الْحَقِيقَةِ لِلطَّوَافِ.
অর্থঃ "তাঁর বক্তব্যঃ (মক্কায় প্রবেশের সময় গোসল করার অধ্যায়) ইবনুল মুনযির বলেনঃ মক্কায় প্রবেশের সময় গোসল করা সকল উলামার দৃষ্টিতে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। … … শাফিঈরা বলেনঃ যদি কেউ গোসল করতে অক্ষম হয়, তবে সে তায়াম্মুম করবে। ইবনুত তিন বলেনঃ আমাদের সহচর [উলামারা] মক্কায় প্রবেশের জন্য নির্দিষ্টভাবে গোসলের কথা উল্লেখ করেননি; বরং তাঁরা এটি তাওয়াফের জন্য উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করা মূলত তাওয়াফের জন্যই নির্ধারিত।"
ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৩৫
https://shamela.ws/book/1673/2102
অথবা https://archive.is/wip/pfvsz (আর্কাইভকৃত)
বিভিন্ন সিরাত গ্রন্থে উল্লেখ আছে নবী ﷺ মক্কা বিজয়ের পরে তাওয়াফ করেছেন।
https://www.hadithbd.com/books/detail/?book=43&chapter=6389
নবী ﷺ থেকে তো এটাই প্রত্যাশিত যে, কোনো মুস্তাহাব কর্মও তিনি ছাড়বেন না। সম্ভবত সেই কারণে তিনি গোসল করেছিলেন। আল্লাহু আ’লাম।
[28] দেখুনঃ সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ১৫৭৩
[29] ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড , পৃষ্ঠা
https://shamela.ws/book/1673/1720
অথবা https://archive.is/m13bp (আর্কাইভকৃত)