জমজমের পানি কি আসলেই আর্সেনিক দূষিত বা বিষাক্ত?

ইসলামী বিশ্বাস সংক্রান্ত বিবিধ



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ

মুহাম্মাদ(ﷺ) দাবি করেছেন, জমজমের পানিতে (Islamic holy water) রয়েছে এক অলৌকিক ব্যাপার যা যে কোনো রোগের প্রতিকার করতে সক্ষম! কিন্তু এতে রয়েছে খুবই উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক (প্রায় তিন গুণ) এবং নাইট্রেট লেভেল, এবং অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া! আল্লাহ কি তার অনুসারীদের মাঝে এভাবে বিষক্রিয়া ঘটাতে চান?

 

উত্তরঃ

জমজম – সুপ্রাচীন এক কূপের নাম। নবী ইসমাঈল(আ.) এর স্মৃতিবিজড়িত এই কূপ। পানির পিপাসায় মৃতপ্রায় শিশু ইসমাঈল(আ.) এর জন্য সে সময়ের বিরান মক্কায় হন্যে হয়ে পানির সন্ধান করছিলেন মাতা হাজেরা(আ.)। সে সময়ে আল্লাহর আদেশে ফেরেশতা জিব্রাঈল(আ.) পা দ্বারা আঘাত করার ফলে উৎপত্তি হয় এর। [1] সেখান থেকেই গোড়াপত্তন মক্কা নগরীর। সেই সময় থেকেই হজযাত্রী ও আল্লাহতে বিশ্বাসী সকল মানুষের নিকট বরকতপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এই কূপের পানি।  

 

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِي اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ خَيْرُ مَاءٍ عَلَى وَجْهِ

الأَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ فِيهِ طَعَامٌ مِنَ الطُّعْمِ وَشِفَاءٌ مِنَ السُّقْمِ

অর্থঃ ইবন আব্বাস(রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ(বলেছেন, পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হল যমযমের পানি। তাতে রয়েছে তৃপ্তিকর খাদ্য এবং ব্যাধির আরোগ্য। [2]

 

ইসলামবিরোধীদের অভিযোগঃ

        বরাবরই ইসলামের উৎসমূল নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাস্তিক-মুক্তমনারা জমজম কূপের পানি নিয়েও আপত্তি তুলেছে। তাদের অভিযোগঃ জমজম কূপের পানি নাকি ভয়াবহভাবে দূষিত। জমজমের ব্যাপারে সহীহ হাদিসে উল্লেখিত তথ্য নাকি সত্য নয়। তাদের এই অভিযোগের উৎস হচ্ছে ২০১১ সালের ৫ই মে বিবিসিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন যেখানে বলা হয়েছেঃ জমজমের পানিতে উচ্চমাত্রার নাইট্রেট, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে তিন গুণ আর্সেনিক পাওয়া গেছে। “Contaminated 'Zam Zam' holy water from Mecca sold in UK” শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে জমজমের পানিকে বিষাক্ত (Poisonous) এবং ক্যান্সার উৎপাদক (carcinogen) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [3] কিন্তু এর দ্বারা কি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় যে মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত সুপ্রাচীন জমজম কূপের পানি দূষিত?

 

জমজমের পানি নিয়ে আরো কিছু গবেষণাকর্মঃ

        ইসলামবিরোধীরা জমজম কূপের পানির ব্যাপারে বিবিসির উপরিউক্ত প্রতিবেদন দেখায়। কিন্তু জমজমের পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে সেটিই কিন্তু একমাত্র গবেষণার উদাহরণ নয়।

 

(১)

বিবিসির সে প্রতিবেদনের পর তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এর জবাব দেয়। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র ২ দিন পরে ২০১১ সালের ৮ই মে সুবিখ্যাত Arab News’ পত্রিকার প্রতিবেদনে Saudi Geological Survey (SGS) এর প্রেসিডেন্ট জুহাইর নাওয়াব এর বরাতে উল্লেখ করা হয় -

 

“...Nawab said his organization has been responsible for monitoring the quality of Zamzam water, which not only concerns Saudi Arabia but the whole Islamic world. “Our experts monitor the condition of Zamzam on a daily basis. Every day we take three samples from the water to carry out tests and studies, which showed that it was not contaminated,” he explained. He said the newly established King Abdullah Zamzam Water Distribution Center in Makkah is equipped with advanced facilities and where bottling takes place in accordance with international standards. “We apply modern methods for filling bottles after sterilization,” Nawab said.” [4]

অর্থাৎ, জমজমের পানির বিষয়টি শুধু সৌদি আরবের নয় বরং পুরো ইসলামী বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা জমজম কূপের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করেন। প্রত্যেক দিন জমজমের পানির তিনটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় কোনো প্রকারের দূষণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মক্কায় অবস্থিত King Abdullah Zamzam Water Distribution Center -এ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে যাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জমজমের পানি বোতলজাত করা হয়।

 

(২)

খোদ বিবিসিতেই ২০১১ সালের ৫ই মে জমজমের দূষণসংক্রান্ত সেই প্রতিবেদন প্রকাশের ২ দিন পরে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। No arsenic in genuine holy water', Saudis say” শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে সৌদি দূতাবাসের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, সে বছর মার্চ মাসেই ফ্রান্সের লিওঁর CARSO-LSEHL এর গবেষণাগারে জমজমের পানি পরীক্ষা করা হয়। মার্চ মাসের সেই পরীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়েছেঃ

According to drinking water standards in France and based on the analysis conducted on the samples of Zamzam water, this water is fit for human consumption.” [5]

অর্থাৎ, ফ্রান্সের পানীয় জলের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড এবং জমজমের নমুনার বিশ্লেষণ করে এটি বলা যায়ঃ এই পানি মানুষের ব্যবহারের জন্য উপযোগী।

 

উল্লেখ্য, পানীয় জল পরীক্ষা করার জন্য CARSO-LSEHL ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান। [6] CARSO গ্রুপের ওয়েবসাইটে তাদের স্বীকৃতি (Accreditation) এর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। [7] শুধু তাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানটির ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে ACS (attestation de conformité sanitaire) সার্টিফিকেট বা Certificate of Sanitary Conformity রয়েছে। [8] এমন একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করে জমজমের পানিকে মানুষের জন্য নিরাপদ বলে রায় দেয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে CARSO ল্যাবরেটরিকে দেয়া সার্টিফিকেটের একাংশ

 

(৩)

জমজম কূপের পানির গুণাগুণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একাধিক গবেষণাপত্র (Research Paper) প্রকাশ করা হয়েছে। এমন একটি গবেষণাপত্রের শিরোনাম হচ্ছেঃ Effects of perinatal exposure to Zamzam water on the teratological studies of the mice offspring” [9] লেখক Gasem Mohammad Abu-Taweel। এটি একটি পিয়ার রিভিউড জার্নাল। গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য অত্যন্ত সুবিখ্যাত একটি সংস্থা Elsevier থেকে ২০১৬ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাপত্রে জমজমের পানির বিভিন্ন গুণাগুণের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। সুইস ওয়েবস্টার ইঁদুরের উপর জমজম কূপের পানির প্রভাব নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা ও এর ফলাফল এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। গবেষণার জন্য মা ইঁদুরকে গর্ভাবস্থা থেকে শুধুমাত্র জমজমের পানি পান করতে দেয়া হয়েছে। ভূমিষ্ঠ শিশু ইঁদুরদেরকেও জন্ম থেকে পানীয় হিসেবে শুধুমাত্র জমজমের পানিই দেয়া হয়েছে। এই ইঁদুরের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। এই গবেষণাপত্রের Discussion অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন কারণে জমজম কূপের পানি ব্যতিক্রম। এর উৎসের মাঝে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে,

 

“Four toxic elements arsenic (As), cadmium (Cd), lead (Pb), and selenium (Se) have been found below the danger level for human consumption.”

অর্থাৎ, যেসব উপাদানের দ্বারা বিষক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, জমজমের পানিতে এমন চার ধরণের উপাদান আছে; যথাঃ আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড এবং সেলেনিয়াম। কিন্তু জমজমের পানিতে এগুলোর পরিমাণ বিপদসীমার নিচে এবং মানুষের ব্যবহারের উপযোগী

 

(৪)

জমজমের পানির উপাদান নিয়ে আরো একটি গবেষণাপত্রের শিরোনাম হচ্ছেঃ Nitrate and arsenic concentration status in Zamzam water, Holly Mecca Almocarama, Saudi Arabia”[10] লেখক Fahad N. Al-Barakah, Abdulrahman M. Al-jassas এবং Anwar A. Aly। এটি প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। এর Abstract অংশে উল্লেখ আছে, তাঁদের গবেষণার প্রধান উদ্যেশ্য ছিলো জমজমের পানি সত্যিই আর্সেনিক ও নাইট্রেট দ্বারা দূষিত কিনা সেটি খতিয়ে দেখা। এখানে জমজমের পানিতে বিদ্যমান বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জমজমের পানিতে বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়া, আর্সেনিক ও নাইট্রেটের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছে এবং WHO (World Health Organization) এর অনুমোদিত মাত্রার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আলোচ্য গবেষণায় মক্কার হারাম শরীফের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে জমজম কূপের পানির ২৯টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

গবেষণাপত্রের Results and Discussion এর Microbial assessment অংশে উল্লেখ করা হয়েছেঃ জমজমের ২৯টি নমুনার মধ্যে কোনো নমুনায় E.Coli ব্যাকটেরিয়ার দূষণ পাওয়া যায়নি। ২৯টি নমুনার মধ্যে মাত্র ২টি নমুনার মধ্যে U.S. Environmental Protection Agencyর নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে Coliform ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে (689.6 এবং 1986.3 (CFU / 100 ml))।  [দেখুন Table 1 ও 2] তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, মাত্র ২টি নমুনাতে এই বেশি পরিমাণে Coliform ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাবার কারণ হলো কিছু হাজী পানি পানের সময়ে তা দিয়ে হাত ও মুখ ধুয়ে থাকেন। জমজমের মূল উৎসে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

 

গবেষণাপত্রের Conclusions অংশে উল্লেখ করা হয়েছেঃ জমজমের নমুনাগুলোর মধ্যে Pb, Cd, As (আর্সেনিক), Zn, Cu, Ni, Co, Fe, Mn, Cr, PO43−, NO2, Br, F, NH+4, Li+ এই সকল আয়ন নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে আছে। [দেখুন Table 3, 4 ও 5]

 


     WHO কর্তৃক নাইট্রেট (NO3) এর সর্বোচ্চ নির্ধারিত মাত্রা 50 mg/L। কিছু নমুনায় নাইট্রেটের নির্ধারিত মাত্রার খুব সামান্য বেশি এসেছে (52.790 mg/L)। অপরদিকে, নাইট্রেটের জন্য নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক কমও এসেছে কিছু নমুনায়। 30.00 mg/L পর্যন্ত সর্বনিম্ন পরিমাণ পাওয়া গেছে। দেখুন  Table 5। নাইট্রেটের গড় (Mean) 35.480 mg/L এবং প্রচুরক (Median) হচ্ছে 34.555 mg/L। এগুলো WHO কর্তৃক  নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম।

 

(৫)

জমজমের পানি নিয়ে অভিযোগ সৃষ্টি হবারও বহু আগে আমাদের বাংলাদেশেই এর পানি নিয়ে গবেষণা হয়েছে।  শ্রীলঙ্কার  Sunday Observer’ পত্রিকায় ২০০৫ সালের ৩০ জানুয়ারী এই গবেষণার ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিলো। [11] প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমজমের পানির সংগৃহিত নমুনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (Bangladesh Atomic Energy Commission) এর চারজন সিনিয়র গবেষক। তাঁরা হচ্ছেন - এম. এ. খান, এ. কে. এম. শরীফ, কে. এম. ইদ্রিস এবং ম. আলমগীর। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, সাধারণ ভূগর্ভস্থ বা কলের পানির চেয়ে জমজমের পানি ৪ গুণ বেশি কড়া (hard), কিন্তু তা WHO (World Health Organization) এর গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যেই আছে। এর পানিতে কোনো ক্ষতিকর উপাদান পাবার কথা তো দূরের কথা, সেই প্রতিবেদনে জমজমের পানির নানা রকম রোগ প্রতিরোধী গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে খানিক বাদে বিষদ আলোচনা করা হবে ইন শা আল্লাহ।

 

বিবিসির প্রতিবেদনের গবেষণায় কেন বিপরীত ফলাফল এলো? :

একই বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গবেষক দলের ভিন্ন ফলাফল আসা বিচিত্র কিছু নয়। মানুষের সম্পাদন করা কোনো গবেষণাকর্মই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মানুষমাত্রই ভুল করে। যদিও বিবিসির একটি প্রতিবেদনে জমজমের পানিতে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক, নাইট্রেট ও ব্যাকটেরিয়া দূষণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা উপরে দেখলাম যে জমজমের পানির ব্যাপারে অন্যত্র বিভিন্ন স্থানের গবেষণায় এই পানি নিরাপদ হবার ব্যাপারটিই উঠে এসেছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিবিসির উল্লেখিত গবেষণাকর্মে কেন অন্যান্য গবেষণা থেকে ভিন্ন ফলাফল এলো?

এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

 

বিবিসির প্রতিবেদনে ওয়ান্ডসওয়ার্থ, দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডন, আপটন পার্ক, পূর্ব লন্ডন এবং লুটনের বিভিন্ন ইসলামী বইয়ের দোকানে জমজমের পানি বিক্রির কথা উল্লেখ রয়েছে। [12] এইসকল বইয়ের দোকানে যে জমজমের পানি বিক্রি হয়, সেসব পানির নমুনায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এইসব পানি জমজমের মূল উৎস থেকে সংগৃহিত নয়। এসব নমুনায় ভেজাল থাকা অসম্ভব কিছু নয়। ব্রিটেনে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের এক বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ার। তারা পূর্ব লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানে বহু ইসলামী জিনিসপত্রের দোকান পরিচালনা করে। সৌদি আরব থেকে প্রতি বছর হজ করে আসা ব্যক্তিরা নিজ নিজ দেশে বোতলে করে জমজমের পানি নিয়ে যান। দেশের আত্মীয় এবং বন্ধুদেরকে তা উপহার হিসেবে দেন। উপহারে সবাই হয়তো বেশি পরিমাণ পানি পায় না। এই স্বল্প পরিমাণ জমজমের পানিকে দীর্ঘদিন ধরে পান করার জন্য এক বিচিত্র প্রকারের এক সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে। সেটি হলোঃ স্বল্প পরিমাণ জমজমের পানির সাথে সাধারণ পানি মিশ্রিত করে পরিমাণে বৃদ্ধি করা, এবং সেই পানিকে দীর্ঘদিন ধরে “জমজমের পানি” হিসেবে পান করা। আমাদের দেশের বহুল প্রচলিত একটি অভ্যাস এটি। লন্ডনের দোকানগুলোতে যেসব “জমজমের পানি” বিক্রি হয়, সেগুলোতেও এমন কিছু হওয়া অসম্ভব নয়। আর বাইরের উৎসের পানি মিশ্রিত হলে তাতে উচ্চ মাত্রার আর্সেনিকের অস্তিত্ব থাকতেই পারে।

 

 ইসলাম ধর্মালম্বী ব্যতিত অন্য কারো মক্কায় প্রবেশাধিকার নেই। বিবিসিতে উল্লেখিত গবেষক দল নিজেরা মক্কা থেকে সরাসরি কোনো নমুনা সংগ্রহ করেনি। তারা কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছে মক্কা থেকে আগত অন্য ব্যক্তিদের দ্বারা। [13] কাজেই এই নমুনাগুলোর উৎস নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। জমজমের পানি সম্পর্কিত বিবৃতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষও এই ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেছে। জমজমের পানি বোতলজাত করে অর্থের বিনিময়ে বিক্রয় করাই একটি নিষিদ্ধ কাজ। Saudi Geological Survey (SGS) এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—

 

“ He (SGS President Zuhair Nawab) said the contamination of the water could have caused while redistributing the water in small bottles by individuals. Fahd Turkistani, adviser to the Presidency for Meteorology and Environment, said the BBC report focused on bottled water supplied by individuals and not by the Presidency of the Two Holy Mosques Affairs. The water supplied by the presidency undergoes close monitoring and ultraviolet rays are applied to kill harmful bacteria, he added. Turkistani said the Zamzam water contamination could have caused by illegal workers who sell Zamzam water at Makkah gates as they use unsterilized containers. He said the Saudi government has prohibited such illegal sales of Zamzam water.” [14]

অর্থাৎ, Saudi Geological Survey এর প্রেসিডেন্ট জুহাইর নাওয়াব বলেছেন, জমজমের পানি কিছু ব্যক্তি দ্বারা পুনরায় বোতলজাত করার দ্বারা দূষণের শিকার হতে পারে। Presidency for Meteorology and Environment এর উপদেষ্টা ফাহদ তুর্কিস্তানী বলেছেন, বিবিসির প্রতিবেদনে সাধারণ মানুষের সরবরাহকৃত পানির ব্যাপার উঠে এসেছে। তা হারামাঈন কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত পানি নয়। হারামাঈন কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত পানি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং তাতে অতিবেগুনী রশ্মির দ্বারা ব্যাকটেরিয়া দূর করা হয়। তুর্কিস্তানী আরো বলেন, যেসব অবৈধ শ্রমিকরা মক্কার প্রবেশপথে যে জমজমের পানি বিক্রি করে, তাদের দ্বারাও এই পানি দূষণের শিকার হতে পারে। তারা জীবাণুমুক্ত করা নয় এমন পাত্রে জমজমের পানি বিক্রি করে। তিনি বলেন, সৌদি সরকার জমজমের পানির এহেন অবৈধ বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে।

 

এ ব্যাপারে ব্রিটেনের সৌদি দূতাবাসের মুখপাত্রের থেকে যে বক্তব্য পাওয়া যায়—

 

The spokesman added that "pure" Zamzam water was collected, bottled and distributed by King Abdullah ibn Abdulaziz's Zamzam project, which was supervised by the Saudi Ministry of Water and Electricity. The spokesman added that Zamzam water was not exported to the UK and "anyone engaged in the trade of selling water here would come under British jurisdiction". "The Embassy wishes to make it clear that any writing on a bottle of water suggesting that it comes from the Zamzam source is not proof that the water is genuine."  [15]

অর্থাৎ, সৌদি দূতাবাসের মুখপাত্র বলেছেন, বাদশাহ আব্দুল আজিজ জমজম প্রজেক্ট বিশুদ্ধ জমজমের পানি সংগ্রহ, বোতলজাত ও সরবরাহ করে। এটি তত্ত্বাবধান করে সৌদি পানি ও বিদুৎ মন্ত্রণালয়। মুখপাত্র আরো বলেন, যুক্তবাজ্যে জমজমের পানি রপ্তানী করা হয় না। যদি কেউ এখানে (ব্রিটেনে) জমজমের পানি বিক্রয়ের সাথে জড়িত হয়, সে ব্রিটিশ আইনের আওতায় আসবে। দূতাবাস এটি পরিষ্কার করে বলতে চায়, কোনো বোতলে জমজমের পানি লেখা থাকলেই প্রমাণ হয় না যে এটি আসলেই জমজমের পানি।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতেও জনগণকে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিত অবৈধ জমজমের পানি ক্রয় করতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। সেখানকার রাস আল খাইমাহ মিউনিসিপালিটির খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানিয়েছে, নকল মিনারেল ওয়াটারকে জমজমের পানির মোড়ক লাগিয়ে বিক্রয় করা হয়। এমন কর্মে জড়িতদেরকে সেখানে জরিমানাও করা হয়েছে। [16]  

 

জমজম কূপের পানি সম্পর্কে হাদিসের তথ্যের সঠিকত্বঃ

 

عَنْ أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ إِنَّهَا

طَعَامُ طُعْمٍ وَشِفَاءُ سُقْمٍ

অর্থঃ আবু যার(রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ( বলেছেন, নিশ্চয়ই তা (জমজমের পানি) বরকতপূর্ণ। তা তৃপ্তিকর খাদ্য এবং রোগনিরাময়ের ঔষধ [17]

                                                                  

قَالَ أَبُو ذَرٍّ ‏.‏ فَكُنْتُ أَنَا أَوَّلُ مَنْ حَيَّاهُ بِتَحِيَّةِ الإِسْلاَمِ - قَالَ - فَقُلْتُ السَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ‏.‏ فَقَالَ ‏"‏ وَعَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ مَنْ أَنْتَ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ مِنْ غِفَارٍ - قَالَ - فَأَهْوَى بِيَدِهِ فَوَضَعَ أَصَابِعَهُ عَلَى جَبْهَتِهِ فَقُلْتُ فِي نَفْسِي كَرِهَ أَنِ انْتَمَيْتُ إِلَى غِفَارٍ ‏.‏ فَذَهَبْتُ آخُذُ بِيَدِهِ فَقَدَعَنِي صَاحِبُهُ وَكَانَ أَعْلَمَ بِهِ مِنِّي ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ مَتَى كُنْتَ هَا هُنَا ‏"‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ قَدْ كُنْتُ هَا هُنَا مُنْذُ ثَلاَثِينَ بَيْنَ لَيْلَةٍ وَيَوْمٍ قَالَ ‏"‏ فَمَنْ كَانَ يُطْعِمُكَ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ لِي طَعَامٌ إِلاَّ مَاءُ زَمْزَمَ ‏.‏ فَسَمِنْتُ حَتَّى تَكَسَّرَتْ عُكَنُ بَطْنِي وَمَا أَجِدُ عَلَى كَبِدِي سُخْفَةَ جُوعٍ قَالَ ‏"‏ إِنَّهَا مُبَارَكَةٌ إِنَّهَا طَعَامُ طُعْمٍ ‏"

"...আবু যার (রা.) বললেন, আমি প্রথম লোক, যে তাঁকে ইসলামী শার’ঈ নিয়মে সালাম জানিয়ে বললাম, আসসালামু ‘আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ্! অতঃপর তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কে? তিনি বললেন, আমি গিফার সম্প্রদায়ের ব্যক্তি। তিনি বললেন, তারপর তিনি তাঁর হাত ঝুকালেন এবং তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো কপালে রাখলেন। আমি ধারণা করলাম, গিফার সম্প্রদায়ের প্রতি আমার সম্পর্ককে তিনি পছন্দ করছেন না। তারপর আমি তাঁর হাত ধরতে চাইলাম। তাঁর সাথী আমাকে বাধা দিলেন। তিনি তাঁকে আমার তুলনায় বহু বেশি ভালো জানতেন। অতঃপর তিনি মাথা তুলে দেখলেন এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কতদিন যাবৎ এখানে অবস্থান করছো? আমি বললাম, আমি এখানে ত্রিশটি রাত্রদিন যাবৎ আছি। তিনি বললেন, তোমাকে কে খাদ্য দিতো? আমি বললাম, জমজম কূপের পানি ব্যতিত আমার জন্য অন্য কোনো খাদ্য ছিল না। এ পানি পান করেই আমি স্থূলদেহী হয়ে গেছি, এমনকি আমার পেটের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে এবং আমি কক্ষনো ক্ষুধার কোনো দুর্বলতা বুঝতে পারিনি। তিনি [নবী()] বললেন, এ পানি অতিশয় বরকতময় ও প্রাচুর্যময় এবং তা অন্যান্য খাবারের মতো তা পেট পূর্ণ করে দেয়। ..." [18]

 

আমরা উপরের হাদিসগুলোতে জমজম কূপের পানির কিছু গুণাবলির কথা জানলাম। আর তা হলোঃ এই বরকতপূর্ণ পানিতে রোগের নিরাময় রয়েছে। এবং এই পানি এক প্রকারের উত্তম খাদ্যের ন্যায়। সাহাবী আবু যার(রা.) ৩০ দিন খাদ্য হিসেবে এই পানি পান করেছিলেন। এতে তাঁর ক্ষুধা নিবারণ হয়েছিলো এবং তিনি এর ফলে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছিলেন। উপরের হাদিসগুলো সহীহ হাদিস। কাজেই এর সঠিকত্ব নিয়ে আমরা মুসলিমরা কোনো প্রকারের সন্দেহ পোষণ করি না। কিন্তু ইসলামের সমালোচকরা জমজমের পানিকে ক্ষতিকর প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। অনেক সময়ে দুর্বল ঈমানের মুসলিমরাও তাদের অপপ্রচারে সংশয়ে পড়ে যায়। কাজেই সংশয় নিরসনের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য নিচে উল্লেখ করছি। যদিও ঈমানদার মুসলিমের নিকট ওহীর জ্ঞান মানুষের যে কোনো জ্ঞানের চেয়ে ঊর্ধ্বে।

 

জমজমের পানির রোগ নিরাময়ের গুণঃ

কিছুক্ষন আগেই শ্রীলঙ্কার Sunday Observer’ পত্রিকার জমজমের পানির উপর গবেষণার ব্যাপারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনটিতে গবেষকদের বরাতে জমজমের পানির রোগ প্রতিরোধী গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। [19] বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, জমজম কূপের পানি সাধারণ কলের পানির চেয়ে অনেক গুণে উত্তম এক প্রকারের পানি। কেননা তাঁরা এতে রোগ সারানোর মত কিছু উপাদানের অস্তিত্ব পেয়েছেন। কিছুটা ক্ষারধর্মী এই পানি মানুষের পাকস্থলিতে উৎপন্ন প্রয়োজনের হাইড্রোক্লোরিক এসিডকে হ্রাস করতে পারে, বুকে জ্বালাপোড়া করার সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছেন যে, জমজমের পানিতে অধিক পরিমাণে আয়োডাইড, সালফেট, এবং নাইট্রেট উপাদান রয়েছে যা থাইরয়েড অঙ্গের চাহিদা পূরণের জন্য জরুরী।

 

উপরে উল্লেখিত Nitrate and arsenic concentration status in Zamzam water, Holly Mecca Almocarama, Saudi Arabia” শিরোনামের গবেষণাপত্রটিতেও জমজমের পানির বেশ কিছু রোগ প্রতিরোধী উপাদানের কথা আলোচনা করা হয়েছে। [20] গবেষণাপত্রের Chemical assessment অংশে ২৯ টি নমুনা থেকে প্রাপ্ত জমজমের পানির নানা উপাদানের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জমজমের পানিতে উচ্চ মাত্রার লিথিয়াম, সোডিয়াম ও পটাশিয়াম পাওয়া গিয়েছে। লিথিয়ামের জন্য WHO কিংবা EPA এর কোনো নির্ধারিত মাত্রা নেই। কিন্তু দেখা গেছে যে, যেসব দেশের খাবার পানিতে লিথিয়ামের পরিমাণ কম কিংবা আদৌ নেই, সেসব দেশে হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদির হার তুলনামূলকভাবে বেশি। কাজেই পানিতে উচ্চমাত্রার লিথিয়াম থাকলে এগুলো কমে আসতে পারে। জমজমের পানিতে অধিক পরিমাণে ফ্লুরাইড আছে। যা দাঁতের জন্য উপকারী। এটি দন্তক্ষয় রোধ করে।

 

রোগ নিরাময় সম্পর্কে সহীহ হাদিসে যে বক্তব্য রয়েছে, গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো এর পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

 

জমজমের পানির খাদ্যগুণ বা পুষ্টি উপাদানঃ

উপরে উল্লেখিত Effects of perinatal exposure to Zamzam water on the teratological studies of the mice offspring” শিরোনামের গবেষণাপত্রটিতে সুইস ওয়েবস্টার ইঁদুরের উপর জমজমের পানির প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। [21] এই গবেষণায় দেখা গেছে  যে, যেসব ইঁদুরকে পানীয় হিসেবে শুধুমাত্র জমজমের পানি দেয়া হয়েছে, তাদের ওজন অন্য ইঁদুরের চেয়ে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর Abstract অংশে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

 

“...Zamzam water was given to female Swiss-Webster strain mice as the only source of drinking fluid and the control animals were administered plain tap water. Treatment started from the first day of pregnancy and continued until the postnatal day fifteen of delivery. All offspring were subjected to various tests. The rate of body weight gain remained relatively unaffected until the second week of weaning period, however; in the last week the offspring exposed to Zamzam water gained significant body weight as compared to their control offspring.”

অর্থাৎ গর্ভবতী সুইস ওয়েবস্টার ইঁদুরকে পানীয় হিসেবে একমাত্র জমজমের পানি দেয়া হয়েছে। অন্য কিছু ইঁদুরকে সাধারণ কলের পানি পান করতে দেয়া হয়েছে। এদের বাচ্চাদেরকে নানা প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। দুধ ছাড়ার দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দুই প্রকারের ইঁদুর ছানার ওজন একই রকমের ছিলো। কিন্তু শেষ সপ্তাহে দেখা গেছে জমজমের পানি পান করা ইঁদুরছানার ওজন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে।

 

সাধারণ ও জমজমের পানি পান করা ইঁদুর ছানাদের দেহের ওজনের তুলনামূলক রেখাচিত্রও গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে—

রেখাচিত্রে দেখা যাচ্ছে জমজমের পানি পানের ফলে ইঁদুরছানার দেহের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

       উপরে উল্লেখিত শ্রীলঙ্কার Sunday Observer’ পত্রিকার জমজমের পানির উপর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে এর কিছু পুষ্টিগুণের কথা আলোচনা করা হয়েছে। [22]  বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে এসেছে, জমজমের পানিতে সাধারণ কলের পানি বা ভূ-গর্ভস্থ পানির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে  ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি দীর্ঘ পুষ্টি উপাদান (macro-nutrients) রয়েছে। তাঁদের মতে, সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানিতে পুষ্টিকর উপাদান অনেক বেশি।

 

এই তথ্যগুলো জমজমের পানির খাদ্যগুণ সম্পর্কিত সহীহ হাদিসের বক্তব্যকে সমর্থন করছে।

 

ইসলামবিরোধীদের অভিযোগের অসারতা এবং ইসলামের সত্যতাঃ

       আমরা উপরের আলোচনায় বিভিন্ন স্থানের গবেষণায় জমজমের পানির নিরাপদ হবার বিষয়টি দেখেছি। একটি গবেষণার বিপরীতে বেশ কয়েকটি গবেষণাকর্ম জমজমের পানিকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী বলে রায় দিচ্ছে। সেই সাথে সহীহ হাদিসে জমজমের পানির রোগ নিরাময় ও খাদ্য উপাদান হবার যে তথ্য রয়েছে, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনেও এর সত্যতাই ফুটে উঠেছে।

 

তবে এটি আবারও উল্লেখ করতে চাই - মানুষের সম্পাদন করা কোনো গবেষণাকর্মই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামে বিশ্বাসী মুসলিমগণের জন্য ওহীর জ্ঞানই সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড। বিশুদ্ধ হাদিসে জমজমের পানিকে বরকতময়, রোগের নিরাময়কারী বলা হয়েছে এবং এর খাদ্যগুণের কথা উল্লেখ আছে। একজন ঈমানদার মুসলিমের জন্য এটিই যথেষ্ট। এ জিনিস বিশ্বাসের জন্য তার কোনো প্রকারের গবেষণাপত্রের প্রয়োজন নেই। যদিও গবেষণাপত্রগুলো সবশেষে ওহীর তথ্যের পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

 

তবুও ‘মুক্তচিন্তা’র দাবিদার অনেক ব্যক্তিকে জমজমের পানি নিরাপদ হবার স্বপক্ষের গবেষণাকর্মগুলোকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে দেখা যায়। তারা বিভিন্ন গবেষণাকর্মের বিপরীতে বিবিসির প্রতিবেদনটির গবেষণাকেই ‘সঠিক’ ধরতে চায় এবং অন্য সকল গবেষণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় যেগুলোতে জমজমের পানিকে নিরাপদ বলা হয়েছে।

 

সেক্ষেত্রে তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিচ্ছি, বিবিসির প্রতিবেদনের গবেষণাটিই সঠিক; অন্য সকল গবেষণা ভুল। জমজমের পানিতে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক দূষণ আছে।

কিন্তু যদি এটি ধরে নেয়া হয়, তাহলে সহীহ হাদিসের তথা ইসলামের সত্যতা আরো বেশি করে প্রমাণ হয়।

কিভাবে? চলুন দেখি।

 

সৌদি আরবের মক্কায় জমজম কূপ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে পানি উত্তোলন করা হয়। মরুময় সে অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট রয়েছে। সেখানকার বেশিরভাগ জায়গার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত ও ব্যবহার উপযোগী নয়। এর মাঝে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হচ্ছে জমজম কূপের মিঠা পানি। কাজেই জমজমের পানির ব্যাপক চাহিদা সেই প্রাচীন কাল থেকেই আছে। সেখানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বসিয়ে জমজমের পানি উত্তোলন করা হয়। এই পাম্পগুলো সেকেন্ডে সাড়ে ১৮ লিটার পানি পাম্প করতে পারে। সে হিসেবে দিনে অন্তত দেড় হাজার টন পানি এ থেকে উত্তোলন করা হয়। এই পানি শুধু মক্কা নয়, মক্কার বাইরেও পাঠানো হয়। যেমনঃ প্রতিদিন ট্যাঙ্কারে করে অন্তত ১২০ টন জমজমের পানি মদীনার মসজিদ নববীর জলাধারে নিয়ে যাওয়া হয়। [23] প্রত্যেক দিন সৌদি আরবের এক বিশাল জনগোষ্ঠী জমজমের পানি পান করে থাকে। কোনো পানিতে যদি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে  ৩ গুণ বেশি আর্সেনিক থাকে, তাহলে সেটি ভয়াবহভাবে আর্সেনিক-দূষিত পানি হিসেবে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে যারা এই পানি পান করবে, তারা অবশ্যই আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হবে এবং এর লক্ষণ তাদের দেহে দেখা যাবে।

 

আর্সেনিক দূষণের বিভিন্ন লক্ষণ আছে। উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক দূষিত পানি পান করলে মানবদেহে বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন, বিবিসির বহুল আলোচিত সেই প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, জমজমের পানি উচ্চমাত্রার আর্সেনিকযুক্ত, বিষাক্ত এবং এটি ক্যানসার উৎপাদক। শরীরের আরো বিভিন্ন অভ্যন্তরীন ক্ষতিও আর্সেনিক দূষণের ফলে হয়। [24] এর কিছু দৃশ্যমান লক্ষণও আছে। মানবদেহে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার দৃশ্যমান লক্ষণ হচ্ছে, ত্বকে কালচে বাদামী রং এবং গুটি দেখা দেওয়া। স্বল্পমেয়াদের সুপ্তাবস্থা থেকে শুরু করে মাত্র কয়েক বছর আর্সেনিক-দূষিত পানি পান করলে শরীরে এ ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। ত্বকের বর্ণ পরিবর্তন বলতে কালচে রং বা পীত রং ধারণ করা বোঝায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাত ও পায়ের তালু অতিশয় শক্ত হয়ে যায়, যা কেরাটোসিস নামে পরিচিত। ক্রমান্বয়ে হাত ও পায়ের শক্ত তালুতে আঁচিলের মতো গুটি দেখা দেয়। [25]   

আর্সেনিক দূষণের ফলে মানবদেহের ত্বকের অবস্থা [26]

 

        এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে—সৌদি আরবের জনগণ কি আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হচ্ছে? সেখান বহু মানুষ প্রত্যেক দিন এই পানি পান করছে। এই পানিতে যদি উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক থেকে থাকে, তাহলে আর্সেনিকের বিভিন্ন লক্ষণ তাদের দেহে ফুটে ওঠার কথা। মক্কা-মদীনার মানুষজনের দেহের চামড়ায় কি আর্সেনিক দূষণাক্রান্তদের মতো গুটি উঠতে বা ক্ষত সৃষ্টি হতে দেখা যায়? তাদের ত্বক কি আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে কালচে বা পীত রঙ ধারণ করে? এর উত্তর হচ্ছে – না। সৌদি আরবের মানুষের আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হবার কোনো খবর আমরা পাই না। সৌদি আরবে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। হজ করার জন্যও প্রতি বছর বহু মানুষ মক্কায় যান। তাদের কেউ সেখানকার মানুষজনের দেহে আর্সেনিক দূষণের ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

 

        এই ব্যাপারটিই Arab News’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন তালাল মাহজুব নামে এক সৌদি নাগরিক। Arab News’ পত্রিকাকে তিনি বলেছেনঃ

“আমি ও আমার পরিবার বহু বছর ধরে জমজমের পানি পান করি। আমরা কেউই এই পানি পান করার ফলে কোনো রোগে আক্রান্ত হইনি। বিবিসির প্রতিবেদন যদি সত্য হতো, মক্কার লোকজন ক্যানসারসহ বহু রোগে আক্রান্ত হতো কারণ তাদের অধিকাংশই জমজম কূপের পানি পান করে থাকে।”  [27] 

 

        এখন সব দিক বিবেচনা করে আমরা দুইটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র উল্লেখ করতে পারি।

 

১) জমজমের পানিতে মোটেও উচ্চমাত্রার আর্সেনিক নেই। তাই এটি নিয়মিত পানকারীদের কারো দেহে আর্সেনিকের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

অথবা

২) জমজমের পানিতে উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক আছে। বিবিসির দেয়া তথ্যই সঠিক, অন্য সব গবেষণা ভুল। কিন্তু এতো উচ্চমাত্রার আর্সেনিক থাকা সত্ত্বেও মক্কার কেউ আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হয় না। এর একমাত্র কারণ হতে পারেঃ জমজম কূপের পানির বরকত এবং অলৌকিক রোগ নিরাময়কারী ক্ষমতা। এর বরকতের দরুণ এমন উচ্চমাত্রার আর্সেনিক থাকা সত্ত্বেও কেউ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না।

 

উপরের দুইটি ক্ষেত্রের কোনো একটি ক্ষেত্র অবশ্যই সত্য। আমার মনে হয় ইসলামের সমালোচকরা এখন আর দাবি করবেন না যে জমজমের পানিতে উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক আছে। বরং তারা এবার ১ম ক্ষেত্রকেই বেছে নিতে চাইবেন। কেননা তা না হলে যে জমজমের পানির অলৌকিক গুণ তথা ইসলামের সত্যতাকেই মেনে নিতে হবে! কিন্তু সেটি করতে কি তারা প্রস্তুত?

 

ইসলামবিরোধীরা ভাবতে থাকুন তারা কোন ক্ষেত্রটিকে বেছে নেবেন। ঈমানদার মুসলিমদের তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না। তাদের নিকট ওহীর তথ্যই ধ্রুব সত্য। তারা বরকতের আশায় সর্বদাই জমজমের পানি পান করে যাবেন।

 

بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ ۚ

অর্থঃ “বরং আমি [আল্লাহ] মিথ্যার উপর সত্য নিক্ষেপ করি; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং নিমিষেই তা বিলুপ্ত হয়। ...” [28]

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩১২৫ দ্রষ্টব্য; সম্পূর্ণ হাদিসটি দেখুন এখান থেকে

[2] ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৩৯১২, ৮১২৯; কাবীর ১১০০৪; সহীহুল জামে ৩৩২২; হাদিস সম্ভার [আব্দুল হামিদ ফাইযি] ১২০২ (সহীহ)

[3] “Contaminated 'Zam Zam' holy water from Mecca sold in UK” - BBC News (5 May 2011)

https://www.bbc.com/news/uk-england-london-13267205

[4] “Kingdom rejects BBC claim of Zamzam water contamination _ Arab News”
https://www.arabnews.com/node/376786

[5] 'No arsenic in genuine holy water', Saudis say - BBC News

https://www.bbc.com/news/uk-england-london-13326566

[6]

[7] “Accréditations _ Groupe CARSO”

https://www.groupecarso.com/en/accreditations/

[8] ■ CARSO Certificate of Sanitary Conformity (English)

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://tiny.cc/avbifz অথবা http://tiny.cc/8wbifz

■ CARSO_Frenceh_Certificate of Sanitary Conformity_2019_03_20

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://tiny.cc/5zbifz অথবা http://tiny.cc/u2bifz

■ “EU Directory of-Regulations and Standards”

ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://tiny.cc/q7bifz

[9] Abu-Taweel, G.M., 2017. Effects of perinatal exposure to Zamzam water on the teratological studies of the mice offspring. Saudi journal of biological sciences, 24(4), pp.892-900.

ডাউনলোড লিঙ্কঃ https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S1319562X16300146

অথবা http://tiny.cc/2ldifz

[10] Al-Barakah, F.N., 2016. Nitrate and arsenic concentration status in Zamzam water, Holly Mecca Almocarama, Saudi Arabia. Proceedings of the International Academy of Ecology and Environmental Sciences6(4), p.110.

ডাউনলোড লিঙ্কঃ https://www.researchgate.net/profile/Abdulrhman_Aljassas/publication/316165402_Nitrate_and_arsenic_concentration_status_in_Zamzam_water_Holly_Mecca_Almocarama_Saudi_Arabia/links/58f456fb0f7e9b6f82e7d24d/Nitrate-and-arsenic-concentration-status-in-Zamzam-water-Holly-Mecca-Almocarama-Saudi-Arabia.pdf

অথবা http://tiny.cc/f5eifz অথবা http://tiny.cc/p6eifz

[11] "The miracle of ZamZam" by S. H. A. Careem (Sunday Observer)

http://tiny.cc/y72jfz

[12] “Contaminated 'Zam Zam' holy water from Mecca sold in UK” - BBC News (5 May 2011)

https://www.bbc.com/news/uk-england-london-13267205

[13] ঐ                                                             

[14] “Kingdom rejects BBC claim of Zamzam water contamination _ Arab News”
https://www.arabnews.com/node/376786

[15] 'No arsenic in genuine holy water', Saudis say - BBC News

https://www.bbc.com/news/uk-england-london-13326566

[16] “UAE residents told to avoid buying Zam Zam water _ Uae – Gulf News”

https://gulfnews.com/uae/uae-residents-told-to-avoid-buying-zam-zam-water-1.802850

[17] ত্বাবারানীর সগীর ২৯৫; বাযযার ৩৯২৯; সহীহুল জামে ২৪৩৫; হাদিস সম্ভার [আব্দুল হামিদ ফাইযি] ১২০১ (সহীহ)

[18] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬২৫৩ দ্রষ্টব্য; সম্পূর্ণ হাদিসটি দেখুন এখান থেকে।

[19] "The miracle of ZamZam" by S. H. A. Careem (Sunday Observer)

http://tiny.cc/y72jfz

[20] Al-Barakah, F.N., 2016. Nitrate and arsenic concentration status in Zamzam water, Holly Mecca Almocarama, Saudi Arabia. Proceedings of the International Academy of Ecology and Environmental Sciences6(4), p.110.

ডাউনলোড লিঙ্কঃ  http://tiny.cc/f5eifz অথবা http://tiny.cc/p6eifz

[21] Abu-Taweel, G.M., 2017. Effects of perinatal exposure to Zamzam water on the teratological studies of the mice offspring. Saudi journal of biological sciences, 24(4), pp.892-900.

ডাউনলোড লিঙ্কঃ https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S1319562X16300146

অথবা http://tiny.cc/2ldifz

[22] "The miracle of ZamZam" by S. H. A. Careem (Sunday Observer)

http://tiny.cc/y72jfz

[23] “জমজমের কুয়ো সংস্কারে হাত দিয়েছে সৌদি আরব - BBC News বাংলা”

https://www.bbc.com/bengali/news-41803978

[24] বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ

“Arsenic poisoning_ Causes, symptoms, and treatment” (Medicine News Today)

https://www.medicalnewstoday.com/articles/241860.php

[25] “ঠেকাতে হবে আর্সেনিক-বিষক্রিয়া - প্রথম আলো” (২৩-১০-২০১১)

http://archive.prothom-alo.com/detail/news/195859

[26] Different types of arsenic-induced skin lesions (Researchgate)

https://www.researchgate.net/figure/Different-types-of-arsenic-induced-skin-lesions-a-Classical-raindrop-pigmentation-on_fig1_6949196

[27] “Kingdom rejects BBC claim of Zamzam water contamination _ Arab News”
https://www.arabnews.com/node/376786

[28] আল কুরআন, আম্বিয়া ২১ : ১৮