বালকের বৃদ্ধ হবার পূর্বেই ‘কিয়ামত’ হওয়া শীর্ষক হাদিসঃ নবী(ﷺ) কি কিয়ামতের ভুল ভবিষ্যৎবাণী করেছেন?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) অসঙ্গতি সংক্রান্ত



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ

মুহাম্মাদ(ﷺ) মনে করতেন যে তাঁর  অল্প কিছুকাল পরেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে! তিনি একবার এক বালককে দেখিয়ে বলেছিলেন যে – সে বৃদ্ধ হবার আগেই কিয়ামত এসে যাবে! অথচ আজ পর্যন্ত কিয়ামত হয়নি, পৃথিবী ধ্বংস হয়নি। একজন সত্য নবী কি ভুল ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে?

 

উত্তরঃ

এর উত্তরে আমরা শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ(হাফিজাহুল্লাহ) এর একটি ফতোয়া সম্পূর্ণ উল্লেখ করছি।

 

ফতোয়া নং : ২০৬৭৩ [মধ্যবর্তী কিয়ামত]

 

প্রশ্নঃ

আমি এক ওয়েবসাইটে কিয়ামতের আলামতের ব্যাপারে পড়ছিলাম। আমি এ হাদিসটি পড়েছি:

[নবী()-কে কিয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। তখন তিনি তাদের মাঝে সবচেয়ে কম বয়সী বালকের দিকে নজর দিয়ে বললেন: এ যদি বেঁচে থাকে তবে সে দীর্ঘদিন বাঁচার পুর্বেই সর্বশেষ সময় (কিয়ামত) তোমাদের কাছে আসবে।" এর দ্বারা তিনি তাদের মৃত্যু হওয়া এবং কিয়ামতকে বুঝিয়েছেন। কেননা সকল মানুষ অচিরেই মৃত্যুবরণ করবে এবং কিয়ামতের দিন হাযির হবে। কেউ কেউ বলছেন মানুষ মারা যাবার পরপর তার হিসাব গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। এ হাদিসটি এই অর্থে সঠিক।]

এই হাদিসের অর্থ কি এই যে,ঐ বালকটি বৃদ্ধ হবার আগেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে? দয়া করে হাদিসটির সঠিক অর্থ বিষদ ব্যাখ্যা করুন।

 

 

উত্তরঃ

আলহামদু লিল্লাহ।

এই হাদিসটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। যেমন,সহিহ বুখারী (৬১৪৬) ও সহিহ মুসলিম (২৯৫২)-এ এসেছে:

عن عائشة رضي الله عنها قالت : كان رجال من الأعراب جفاة يأتون النبي صلى الله عليه وسلم فيسألونه متى الساعة فكان ينظر إلى أصغرهم فيقول : إن يعش هذا لا يدركه الهرم حتى تقوم عليكم ساعتكم قال هشام [أحد رواة الحديث]: يعني موتهم.

অর্থঃ আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: কিছু অভদ্র বেদুঈন রাসূলুল্লাহ () র নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বললো যে,কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি তাদের মাঝে সবচেয়ে কম বয়সীর দিকে নজর দিয়ে বললেন: এ যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পুর্বেই তোমাদের উপর তোমাদের কিয়ামত সংগঠিত হবে। হিশাম -হাদিসটির একজন বর্ণনাকারী- বলেন: এর অর্থ হলো তাদের মৃত্যু।

 

হাদিসটির অর্থ পরিষ্কার। হাদিসের উদ্দেশ্য হল: এই লোকগুলোর কিয়ামত। অর্থাৎ তাদের মৃত্যু খুব নিকটবর্তী। এই বালকটি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তা সংঘটিত হবে। এ হাদিসে الساعة الكبرى (বড় কিয়ামত)-কে উদ্দেশ্য করা হয়নি;যেটা হচ্ছে পুনরুত্থান দিবস।

 

কাজী ইয়ায (র.) বলেন: এখানে “তোমাদের কিয়ামত” দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে— তাদের মৃত্যু। অর্থাৎ তাদের প্রজন্মের মৃত্যু কিংবা সম্বোধিত ব্যক্তিদের মৃত্যু।

[ইমাম নববী(র.) রচিত "শারহে মুসলিম" থেকে উদ্ধৃত]

 

আল-কারমানী (র.) বলেন: এ উত্তরটি হিকমতপূর্ণ শৈলীর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তোমরা বড় কিয়ামতের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করা বাদ দাও। কেননা সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বরং তোমরা তোমাদের প্রজন্মের সমাপ্তিকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। কারণ সেটি জানা তোমাদের জন্য বেশী উপযোগী। যেহেতু সেটা জানাটা তোমাদেরকে নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে, নেক আমলের সময় ফুরিয়ে যাবার আগে। কেননা তোমাদের কেউ জানে না যে,কার আগে কে মারা যাবে।

 

রাগিব ইসফাহানী (র.) বলেছেন: ساعة শব্দের অর্থ— “সময়ের একটি অংশ”। দ্রুত হিসাব গ্রহণের উপমাস্বরূপ এ শব্দ দিয়ে কিয়ামতকে বুঝানো হয়। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:

 

وَهُوَ أَسرَعُ الحاسِبينَ

অর্থঃ এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

(আল কুরআন, আন’আম ৬ : ৬২)

 

কিংবা নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ্‌ যা উল্লেখ করেছেন সে বিবেচনা থেকে কিয়ামত বুঝাতে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। 

 

كَأَنَّهُم يَومَ يَرَونَ ما يوعَدونَ لَم يَلبَثوا إِلّا ساعَةً مِن نَهارٍ ۚ 

অর্থঃ “তারা যেদিন তাদের প্রতিশ্রুত শাস্তি দেখতে পাবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা দিনের এক মুহূর্তের বেশী (পৃথিবীতে) অবস্থান করেনি।

(আল কুরআন, আহকাফ ৪৬ : ৩৫)

 

الساعة (আস-সা’আতু) শব্দটি তিনটি জিনিস বুঝাতে ব্যবহৃত হয়:

 

■ الساعة الكبرى (বড় কিয়ামত): তা হলো যেদিন মানুষকে হিসাব গ্রহণের জন্য পুনরুত্থিত করা হবে।

■ الساعة الوسطى (মধ্যবর্তী কিয়ামত): তা হলো কোনো প্রজন্মের সকলের মৃত্যু।

■ الساعة الصغرى (ছোট কিয়ামত): তা হলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যু।

কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির কিয়ামত হলো তার মৃত্যু।

[ফাতহুল বারী থেকে সংকলিত]

 

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

 

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

সম্পাদনাঃ শায়খ মুহাম্মাদ নুরুল্লাহ তারিফ

 

মূল আর্টিকেলঃ

ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/20673/

আরবিঃ https://islamqa.info/ar/20673/

Islamqa-তে গৃহিত এই অনুবাদঃ https://islamqa.info/bn/20673/

 

 

এ ব্যাপারে এই আলোচনাটিও দেখা যেতে পারেঃ