শূন্য থেকে মহাবিশ্ব

নাস্তিক্যবাদের অসারতা



 

– কী রে কী খাচ্ছিস?
– কিছু-না।
– কিছু না মানে?! আমি দেখতে পাচ্ছি তুই খাচ্ছিস!
– হ্যাঁ, কিছু-নাই তো!
– ফাজলামোর একটা লিমিট থাকা উচিত!!
– আরে চেতিস ক্যান! এই যে দ্যাখ, প্যাকেটের গায়ে লিখা: কিছু-না!


মিটফোর্ডে পড়ার সময় বিকেলের নাস্তার জন্য মাঝেমধ্যে বিস্কুট টাইপের জিনিসপত্র হলে এনে রাখতাম। রসনাতৃপ্তি নামে একটা দোকান ছিল হলের কাছেই। একবার দেখি এক বন্ধুবর সেখান থেকে কি জানি এনে খাচ্ছে। আমি শুধালাম, কীরে শালা! কী খাচ্ছিস? সে উত্তর দেয়, ঘোড়ার ডিম! আমি ভাবলাম বদটা মনে হয় ফাজলামো করছে। পরে জানলাম ঐ খাবারের নামটাই হলো “ঘোড়ার ডিম”! ঘোড়ার ডিম বাগধারার অর্থ অলীক বস্তু, কিছুই নয়। কিছুটা হাওয়াই মিঠাই টাইপের ঐ খাবার মুখে দিলেই মিলিয়ে যেত। তাই সেটাকে ঘোড়ার ডিম বলেই বেচা হচ্ছিল। অর্থাৎ শব্দের খেলা।

 

শূন্য থেকে মহাবিশ্বও এমনই শব্দের খেলার অন্যনাম। সাম্প্রতিক সময়ে A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing গ্রন্থ লিখে নাস্তিকদের একজন প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ লরেন্স এম. ক্রউস। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির নাস্তিক প্রফেসর দেখাতে চেয়েছেন যে মহাবিশ্ব ‘Nothing’ থেকে আপনা-আপনি উৎপন্ন হয়ে গেছে। ছু মন্তর ছু! এটা শুনেই দাদারা যা খুশী না! পারলে এখনই আনন্দে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দেয় আরকি! যৌন হয়রানির মামলা খাওয়া এই নাস্তিকগুরুর বই পড়ে আহ্লাদে চব্বিশখানা হয়ে আরেক নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স লিখেছে:

 

Even the last remaining trump card of the theologian, “Why is there something rather than nothing?” shrivels up before your eyes as you read these pages. If On the Origin of Species was biology’s deadliest blow to supernaturalism, we may come to see A Universe from Nothing as
the equivalent from cosmology. The title means exactly what it says. And what it says is devastating.

A UNIVERSE FROM NOTHING, AFTERWARDS BY RICHARD DAWKINS

 

একেবারে ডারউইনের বইয়ের সাথে তুলনা! তাহলে তো বিশাল কিছু হবে! আসলে কাঁচকলা! কেন?! এক্ষেত্রে প্রথমেই যা বোঝা দরকার তা হলো, শূন্য বা শূন্যতা মূলত বলতে প্রচলিত অর্থে কী বোঝায়? শূন্যতা হলো সকল কিছুর অনুপস্থিতি; সকল পদার্থ-স্থান-শক্তি ও বিভব, কার্যকারণ যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে, তবে সে অবস্থাকেই শূন্যতা বলা হবে। অ্যারিস্টটল শূন্যতার ব্যাখ্যায় বলেছিলেন—পাথর যা স্বপ্ন দেখে, তাই শূন্যতা! পাথর যেহেতু নির্জীব বস্তু, তাই তার স্বপ্ন দেখার কোনো প্রশ্নই আসে না। এটাই শূন্যতা শব্দের প্রচলিত অর্থ।

 

প্রচলিত ধারণায় প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণের ফলে এক সিঙ্গুলারিটি থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। এই সিঙ্গুলারিটি আসলে কী, কোত্থেকেই-বা এলো—বিজ্ঞানীরা তা জানেন না। বিজ্ঞানীরা এই সিঙ্গুলারিটিকে ‘নাথিংনেস’ বলে থাকেন। কারণ তখন স্থাল-কাল-পদার্থ-সূত্র কিছুই ছিল না। একজন পদার্থবিদের ভাষায়, ‘আমাদের মহাবিশ্ব শুরুতে আসলে এই নাথিং-ই ছিল, এই সিঙ্গুলারিটি নামক নাথিং, যার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা ছিল অসীম। কোত্থেকে এলো এটা, কেনই-বা এলো আমরা জানি না।’ (আহমেদ মোস্তফা কামাল, ২০১৯) অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে মহাকাশবিদ্যার ভাষায় শূন্যতা আর প্রচলিত অর্থে শূন্যতা এক নয়! মহাকাশবিদ্যার নাথিং আসলে সামথিং, নট অনলি সামথিং, বাট সামথিং ইনরমাস!

 

ক্রউসও কিন্তু প্রচলিত অর্থে শূন্যতার কথা বলে নি, সে কোয়ান্টাম শূন্যতার কথা বলেছে। কোয়ান্টাম শূন্যতাকে সে নাথিং নাম দিয়েছে। কিন্তু কোয়ান্টাম শূন্যতা কি আসলেই নাথিং? নো অ্যান্ড নেভার! কোয়ান্টাম শূন্যতা হলো তরঙ্গায়িত শক্তির এক সমুদ্রের ন্যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে কোয়ান্টাম শূন্যতা নাথিং নয়, বরং সামথিং, সামথিং ফিজিক্যাল। নাস্তিক নীল ডিগ্রাসি টাইসন নিজেই স্বীকার করেছেন, “Nothing is not nothing. Nothing is something. That’s how a cosmos can be spawned from the void-a profound idea conveyed in A Universe From Nothing that unsettles some yet enlightens others.” এককালের খ্যাতনামা নাস্তিক, প্রফেসর এনটনি ফ্লিউ বলেন :

 

“বেশ কিছু মহাকাশতত্ত্ববিদ অনুমান করেছেন যে, মহাবিশ্ব ‘শূন্য’ থেকে উদ্ভব হয়েছে । … (তাদের দাবিকৃত) এই ‘শূন্যতা’ হল ক্ষেত্র বিশেষে শক্তির চমকপ্রদ উচ্চ ঘনত্ব বিশিষ্ট স্থান-সময়ের ফেনার ন্যায় ।”

PROF. ANTONY FLEW, THERE IS A GOD: HOW THE WORLD’S MOST NOTORIOUS ATHEIST CHANGED HIS MIND; P. 142

 

ফিজিক্যাল সামথিংকে নাথিং নাম দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা বঙ্গীয় মুক্তমনারা না বুঝলেও পশ্চিমের ওনারা ঠিকই বুঝেছেন। নিউ সাইন্টিস্ট ম্যাগাজিন প্রফেসর লরেন্স এম. ক্রউসের ‘Nothing’ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন,

 

“যদিও পরিশেষে তাকে একটু সূক্ষ্ম কারচুপির আশ্রয় নিতে হয়েছে । বস্তুত স্থান ও কাল শূন্যতা থেকে আসতে পারে; যে শূন্যতাকে ক্রউস চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে: শূন্যতা হলো (প্রকৃত অর্থে শূন্যতা নয় বরং) অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থা যা থেকে ‘সামথিং বা কোনো কিছু’-র উদ্ভব হওয়া প্রায় অনিবার্য ।”

MICHAEL BROOKS, TRYING TO MAKE THE COSMOS OUT OF NOTHING; THE NEWSCIENTISTS, ISSUE 2847, 14 JANUARY 2012

 

প্রফেসর ক্রউস কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূত্রগুলোকে সঠিক ধরে নিয়েই (হয়তো নৈতিকতার দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচার জন্য) শূন্য থেকে মহাবিশ্ব তৈরি হওয়ার গপ্পো ফেঁদেছেন। খোদার স্থানে প্রকৃতির সূত্র আর কোয়ান্টাম শূন্যতাকে বসিয়ে হাঁফ ছেড়েছেন। প্রকৃতির সুত্রের অন্টলজিও ব্যাখ্যা করেন নি! যে Why There Is Something Rather than Nothing ব্যাখ্যা করার চেষ্টায় বই ফেঁদেছেন, ঠিক সেই জিনিসটাই ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যৌন হয়রানির মামলা খেয়ে মুখ বাঁচাতে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া এই ব্যক্তির বই নিয়ে নামকরা পদার্থবিদ পদার্থবিদ জর্জ এলিস বলেন:

 

He is presenting untested speculative theories of how things came into existence out of a pre-existing complex of entities, including variational principles, quantum field theory, specific symmetry groups, a bubbling vacuum, all the components of the standard model of particle physics, and so on. He does not explain in what way these entities could have pre-existed the coming into being of the universe, why they should have existed at all, or why they should have had the form they did. And he gives no experimental or observational process whereby we could test these vivid speculations of the supposed universe-generation mechanism. How indeed can you test what existed before the universe existed? You can’t. Thus what he is presenting is not tested science. It’s a philosophical speculation, which he apparently believes is so compelling he does not have to give any specification of evidence that would confirm it is true... Krauss does not address why the laws of physics exist, why they have the form they have, or in what kind of manifestation they existed before the universe existed (which he must believe if he believes they brought the universe into existence). Who or what dreamt up symmetry principles, Lagrangians, specific symmetry groups, gauge theories, and so on? He does not begin to answer these questions. It’s very ironic when he says philosophy is bunk and then himself engages in this kind of attempt at philosophy.

JOHN HORGAN, IS LAWRENCE KRAUSS A PHYSICIST, OR JUST A BAD PHILOSOPHER? SCIENTIFIC AMERICAN

 

কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের হাত সাফাই ধরতে পারেননি। পদার্থবিদ জর্জ এলিস ঠিকই বলেছেন, ক্রউসের এই বই হলো স্রেফ অপ্রমাণিত দার্শনিক কপচানি মাত্র! আরেক নাস্তিক পদার্থবিদ কাম দার্শনিক ডেভিড অ্যালবার্ট ক্রউসের বইয়ের রিভিউতে লিখেছেন,

 

“আমার চোখে ক্রউসের অবস্থান একেবারেই ভুল। ধর্ম ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তারা একদম সঠিক।”

DAVID ALBERT, ON THE ORIGIN OF EVERYTHING. THE NEW YORK TIMES, 23 MARCH 2012

 

আমরা দেখলাম নাস্তিক নীল ডিগ্রাসি টাইসন তার রিভিউতে উচ্ছ্বাসের সাথে বলেছেন, ক্রউসের বই A Universe From Nothing কাউকে অতিষ্ট করবে, কাউকে আলোকিত করবে। হ্যাঁ, উনি ঠিকই বলেছেন। জ্ঞানী লোকদের অতিষ্ট করবে, মূর্খ আর নাস্তিকদের আলোকিত করবে! চয়েস ইজ ইউরস!

 

লেখকের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে লেখাটির লিঙ্কঃ

https://rafanofficial.wordpress.com/2020/06/28/universe-from-nothing/