সাহাবী উবাই বিন কা’ব(রা.) এর কুরআনে কি আসলেই দুইটি অতিরিক্ত সুরা ছিল?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

প্রখ্যাত সাহাবী উবাই বিন কা’ব(রা.) এর মুসহাফের [লিপিবদ্ধ পূর্ণ কুরআন] সুরাসংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে দেশ-বিদেশের খ্রিষ্টান মিশনারী, তাদের মিডিয়া ইভানজেলিস্ট, নাস্তিক-মুক্তমনা এবং বিদেশী ওরিয়েন্টালিস্টরা। তারা বিরামহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যে—সাহাবী উবাই বিন কা’ব(রা.) এর ব্যক্তিগত মুসহাফে ১১৬টি সুরা ছিল-অর্থাৎ দুইটি ‘অতিরিক্ত’ সুরা ছিল। এ দ্বারা তার প্রমাণ করতে চায় যে বর্তমান কুরআনের সাথে সাহাবীদের কুরআনে সুরাসংখ্যায় বেশি-কম ছিল। এভাবে তারা উসমান(রা.) কর্তৃক সংকলিত কুরআনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। অর্থাৎ কুরআন নাকি যথার্থরূপে সংরক্ষণ করা হয়নি। এহেন প্রশ্ন তোলার অর্থ হচ্ছে ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

 

এই দাবি তোলার জন্য ইসলামবিরোধীরা নিম্নের বর্ণনাটি ব্যবহার করে—

 

“এবং উবাই(রা.) এর মুসহাফে ছিল ১১৬টি (সুরা/অধ্যায়) এবং শেষ থেকে তিনি লিপিবদ্ধ করেন সুরা হাফদ এবং খাল’। ” [1]

 

উল্লেখ্য, ‘সুরা’ শব্দের অর্থ অধ্যায়।

উবাই(রা.) তাঁর মুসহাফে যে অতিরিক্ত অংশটুকু লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাও জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র.) বর্ণনা করেছেনঃ

 

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ وَلَا نُكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ

اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحَقٌ.

অর্থঃ হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই, শুধু আপনার কাছেই ক্ষমা চাই, আপনার গুণগান করি, আপনার অকৃতজ্ঞ হই না, আর যারা আপনার অবাধ্য তাদের থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হই। হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, শুধু আপনার নিকট প্রার্থনা করি, শুধু আপনার প্রতি নত হই (সিজদাহ করি), আপনার দিকে ধাবিত হই। আর আমরা আপনার কঠিন শাস্তিকে ভয় করি, আপনার দয়ার আশা রাখি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি তো অবিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত। [2]

 

কোন কোন রেওয়ায়েতে সামান্য কিছু শব্দের পার্থক্য দেখা যায়।

 

জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র.) এরকম অনেক রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যাতে উল্লেখ আছে যে সাহাবী(রা)গণ নামাজে এই “সুরা”দ্বয় পাঠ করেছেন। যে শব্দগুলোকে কুরআনের সুরার সাথে মিলিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে জিব্রাঈল(আ) কর্তৃক রাসুল(ﷺ)কে শেখানো দোয়া।

 

ইমাম বাইহাকী(র.) বর্ণণা করেছেনঃ

بَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدْعُو عَلَى مُضَرَ إِذْ جَاءَهُ جَبْرَئِيلُ فَأَوْمَأَ إِلَيْهِ أَنِ اسْكُتْ فَسَكَتَ، فَقَالَ: " يَا مُحَمَّدُ إِنَّ اللهَ لَمْ يَبْعَثْكَ سَبَّابًا وَلَا لَعَّانًا، وَإِنَّمَا بَعَثَكَ رَحْمَةً، وَلَمْ يَبْعَثْكَ عَذَابًا {لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ} [آل عمران: 128] ثُمَّ عَلَّمَهُ هَذَا الْقُنُوتَ: اللهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ ...

অর্থঃ “যখন রাসুলুল্লাহ() মুদ্বার গোত্রের বিরুদ্ধে দোয়া করছিলেন, জিব্রাঈল(আ) তাঁর নিকট আসলেন এবং তাঁকে থামতে ইঙ্গিত করলেন, তাই তিনি থেমে গেলেন। এরপর জিব্রাঈল(আ) বললেন, “হে মুহাম্মাদ(), আল্লাহ আপনাকে অবমূল্যায়ন করতে বা দোষ দিতে পাঠাননি বরং তিনি আপনাকে এক দয়াস্বরূপ পাঠিয়েছেন। আর তিনি আপনাকে আযাব আনবার জন্যও পাঠাননি। {এরপর বললেন} “তিনি(আল্লাহ) তাদেরকে ক্ষমা করবেন কিংবা শাস্তি দেবেন এটা আপনার সিদ্ধান্ত নয়, আর নিশ্চয়ই তারা তো জালিম।” (আলি ইমরান ৩:১২৮)

এরপর তিনি তাঁকে কুনুতটি শিক্ষা দিলেনঃ “হে আল্লাহ, আমরা শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই,... ...” [3]

 

আনাস(রা)কে আব্বান বিন আবু আয়াশ এ কুনুতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেনঃ

وَالله إِن أَنْزَلَتَا إِلَّا من السَّمَاء

অর্থঃ আল্লাহর শপথ, এগুলো তো আসমান থেকে নাজিল হয়েছে। [4]

তুরস্কের তোপকাপি জাদুঘরে রক্ষিত উসমান(রা.) এর সময়ে সংকলিত কুরআনের এক কপি

 

অতএব আমরা দেখলাম যে, নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) যখন জালিম মুদ্বার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দোয়া করছিলেন, তখন ফেরেশতা জিব্রাঈল(আ) এসে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন যে আল্লাহ তাঁকে দয়াস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। এরপর তিনি তাঁকে সেই কুনুতটি (নামাজে পাঠ করা দোয়া) শিখিয়ে দেন। জালালুদ্দিন সুয়ুতি(র.) তাঁর আল ইতকানের বিভিন্ন বর্ণণায় । [5]

 

 উমার(রা), উবাই(রা.) এবং আবু মুসা(রা.) তাঁদের নামাজে সেই কুনুত পাঠ করেছেন বলে বিবরণ উল্লেখ করেছেন। যদিও নামাজে যে কোন দোয়া করা যায়, কিন্তু যেহেতু জিব্রাঈল(আ) সরাসরি এসে মুহাম্মাদ(ﷺ)কে ঐ কুনুত শিখিয়েছেন, সাহাবী(রা)গণও নামাজে সেই কুনুতটি পড়তে পছন্দ করতেন, অনেক সাহাবী থেকে এর বিবরণ পাওয়া যায়।আমরা দেখেছি কিভাবে কুরআন নাজিলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ উপায়ে বাক্যগুলো জিব্রাঈল(আ) এর দ্বারা মুহাম্মাদ(ﷺ)কে শেখানো হয়েছে। এ কারণে সুন্নাহপ্রেমী সাহাবীগণ নামাজে সে বাক্যগুলো কুনুত হিসাবে পড়তে ভালোবাসতেন। এই কুনুতটি বিতর নামাজে পড়া হয়। ফজরে কুনুত পড়বার বিবরণও পাওয়া যায়। সাহাবীগণ যেভাবে নামাজ পড়তেন, বর্তমান মুসলিমরাও হুবহু সেভাবেই নামাজ পড়েন। বর্তমান মুসলিমরাও নামাজে কুনুত পাঠ করে থাকেন। ইসলামবিরোধীরা যে এই শব্দগুলোকে “হারিয়ে যাওয়া সুরা” বলে প্রতষ্ঠিত করতে চায়, এর দ্বারা এই তত্ত্বের অসারতাই প্রমাণিত হয়।

 

ওরিয়েন্টালিস্ট, খ্রিষ্টান মিশনারী এরা বলতে চায় যে—বর্তমানে মুসলিমরা যে কুরআন পড়ে, তা খলিফা উসমান বিন আফফান(রা.) কর্তৃক সংকলিত হয়েছে এবং সেই কুরআনের সাথে সেই সময়কার অর্থাৎ প্রথম যুগের মুসলিমদের কুরআনের সাথে পার্থক্য ছিল। তিনি নাকি শুধুমাত্র ক্ষমতার প্রয়োগ দ্বারা স্বেচ্ছাচারীভাবে কুরআন সংকলন করেছেন, অন্যান্য মুসলিমদের সাথে মিল রেখে সংকলন করেননি। এর প্রমাণ হিসাবে তারা উবাই(রা.) এর মুসহাফ সংক্রান্ত রেওয়ায়েত এবং সাহাবীদের নামাজে কুনুত পড়বার রেওয়াতগুলো অপব্যাখ্যা করতে হয়। কিন্তু তাদের এই বাজে তত্ত্ব সহজেই অসার প্রমাণ করা যায় কেননা উবাই(রা.) এবং অন্যান্য সাহাবীদের কেউ কখনো এই দাবি করেননি যে ঐ বাক্যগুলো কুরআনের অংশ। উসমান(রা.) এর যদি কুরআন থেকে কোন বাক্য সরানোর ইচ্ছা আসলেই থাকতো (নাউযুবিল্লাহ), তাহলে তিনি নিজেই কেন সেই বাক্যগুলো নামাজে পাঠ করতেন? উবাই(রা.) এর মুসহাফের যে অতিরিক্ত অংশগুলো উসমান(রা.) কুরআন থেকে বাদ দিয়েছেন বলে ইসলামবিরোধীরা অভিযোগ তোলে, উসমান(রা.) স্বয়ং সেই বাক্যগুলো নামাজে পাঠ করতেন। এবং অন্য সকল সাহাবীর মতই তা কুনুত হিসাবে পাঠ করতেন; কুরআনের অংশ হিসাবে নয়। কোন বাক্য যদি তাঁর বাদ দেবারই ইচ্ছা থাকতো, তাহলে তিনি নিজে কেন নামাজে সেই বাক্যগুলোই পাঠ করবেন??

 

“হুসাইন বিন আবদুর রহমান বর্ণণা করেনঃ তিনি উসমান জিয়াদের পিছনে নামাজ আ্দায় করেছেন। নামাজের পরে তিনি তাঁকে বলেন যে, তিনি সেই বাক্যগুলো দ্বারা কুনুত পড়েছেন। অতঃপর বলেন, উমার বিন খাত্তাব(রা.) এবং উসমান বিন আফফান(রা)ও এভাবেই তা আদায় করতেন।” [6]

বাংলাদেশের বাইতুল মুকাররাম মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরিতে রক্ষিত উসমান(রা.) এর সময়ে সংকলিত কুরআনের ফটোকপি {তোপকাপি কপি থেকে তৈরি} 

 

বিরোধীরা এবার হয়তো বলবে—তাহলে উবাই বিন কা’ব(রা.) কেন তাঁর মুসহাফে অতিরিক্ত ‘সুরা’ দুইটি লিপিবদ্ধ করেছিলেন, যদি তা কুরআনের অংশ না হয়?

 

এ বিষয়ে প্রথমেই যেটি বলবঃ ‘সুরা’ শব্দের অর্থ অধ্যায়। উবাই(রা.) এর ব্যক্তিগত মুসহাফটিতে মোট অধ্যায় বা সেকশন ছিল ১১৬টি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তার সকল অধ্যায় বা সুরা কুরআনের অংশ।

 

মুহাম্মাদ আবদুল আজিম আল জুরকানী(র.) এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেনঃ

“যে সকল সাহাবীর এক বা তার অধিক ব্যক্তিগত কপি ছিল, তাঁরা সে সমস্ত কপিতে এমন কিছুও উল্লেখ করতেন যা কুরআনের অংশ ছিল না। তাঁদের লিপিবদ্ধ এই অতিরিক্ত অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কুরআনের যে অংশগুলো বোঝা কঠিন হত সেগুলোর ব্যাখ্যা (তাফসির) কিংবা দোয়া, যেগুলো অনেকটা কুরআনের দোয়ার মতই ছিল। সেই দোয়াগুলো নামাজে কুনুত হিসাবে পড়া হত। এবং তাঁরা জানতেন এগুলো কুরআনের অংশ নয়। লেখার সরঞ্জামের অভাবের জন্য তারা এমনটি করতেন। এবং তারা শুধুমাত্র নিজেদের পড়বার জন্য কুরআন লিখতেন কাজেই এগুলো বোঝা তাঁদের জন্য সহজ ছিল এবং কুরআনের সাথে মিশে যাবার ভয় ছিল না।” [7]

 

রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এগুলোর দ্বারা কুনুত পড়তেন এবং উমার(রা), আলী(রা.) এবং অন্যান্য সাহাবীদের(রাদিয়াল্লাহু আনহুম)কে শিখিয়েছেন। তাঁরা সবাই এগুলোর দ্বারা নামাজে আল্লাহর নিকট দোয়া করতেন। মুসলিমগণ তা শুনেছেন এবং তাঁদের থেকে বর্ণনা করেছেন এবং কিতাবসমূহে উল্লেখ করেছেন। [8]

 

عن عطاء أن عثمان بن عفان لما نسخ

القرآن في المصاحف أرسل إلى أبي بن كعب، فكان يملي على زيد بن ثابت وزيد

يكتب ومعه سعيد بن العاص يعربه، فهذا المصحف على قراءة أبي وزيد

আতা(র.) থেকে বর্ণিত; যখন কুরআন মুসহাফে লিপিবদ্ধ করা হবে, উসমান বিন আফফান(রা.) উবাই(রা.) এর নিকট প্রেরণ করলেন। অতএব তিনি যায়িদ বিন সাবিত(রা.) এর নিকট বর্ণনা করলেন এবং যায়িদ লিপিবদ্ধ করলেন এবং তারঁ সাথে ছিলেন সাঈদ বিন আস(র), প্রকাশ করার জন্য। অতএব এটি উবাই ও যায়িদের কিরাত অনুযায়ী মুসহাফ। [9]

 

এই বিবরণের দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হল যে, বর্তমানে আমরা ১১৪ সুরার যে মুসহাফ পাঠ করি, তা স্বয়ং উবাই(রা.) বর্ণিত ছিল এবং তাঁর কিরাতও ভিন্ন কিছু ছিল না। ফলে সামান্যতম সন্দেহেরও আর অবকাশ থাকলো না যে তাঁর লিখিত ব্যক্তিগত কুরআনে বর্তমান কুরআনের থেকে বেশি কিছু ছিল না যাকে তিনি কুরআনের অংশ বলে গণ্য করতেন।

 

এবং আল্লাহ ভালো জানেন।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

http://www.icraa.org/

http://www.letmeturnthetables.blogspot.com/

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]. আল ইতকান, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৬

[2]. আল ইতকান, জালালুদ্দিন সুয়ুতি ১/২২৭

[3]. সুনানুল কুবরা, ইমাম বাইহাকী, হাদিস নং ৩১৪২

[4]. দুররে মানসুর, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৬৯৫

[5]. দেখুন আল ইতকান ১/২২৭-২২৮

[6]. মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ, হাদিস নং ৭০৩২

[7]. মানাহিল আল ইরফান ফি উলুমুল কুরআন, পৃষ্ঠা ২২২

[8]. আল কুরআন ওয়া নাক্বদ মাতা’ইন আর রুহবান, পৃষ্ঠা ২৭৭

[9]. কানজুল উম্মাল, খণ্ড ২, হাদিস ৪৭৮৯