আকাশ কি শক্ত কিছু দিয়ে তৈরি?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ আসমান কি শক্ত কিছুর তৈরি যে তা স্তম্ভ বা পিলার(যা মানুষের কাছে অদৃশ্য) দিয়ে খাড়া রাখতে হবে (Quran 13:2) (This is originated from ancient Greek myth)

 

উত্তরঃ কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে—

 

 “আল্লাহ ঊর্ধ্বদেশে আকাশমণ্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতিত, তোমরা এটা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নীত হলেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মানুবর্তী করলেন; প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণণা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে পার। [1]

 

আয়াতের অর্থ উপরে করা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলীকে কোন স্তম্ভ ব্যতিত উঠিয়েছেন; আমরা যা দেখতে পাচ্ছি [তাবারী,কুরতুবী ও ইবন কাসির] অর্থাৎ আল্লাহ এমন এক সত্তা যিনি আকাশমণ্ডলীকে কোন স্তম্ভ ব্যতিতই উচ্চে উন্নীত রেখেছেন যেমন আমরা আকাশমণ্ডলীকে এ অবস্থাতেই দেখি। আয়াতের অপর এক অর্থ হয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলীকে অদৃশ্য ও অননুভূত স্তম্ভসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। ইমাম ইবন কাসির(র) প্রথম তাফসিরকে প্রাধান্য দিয়েছেন। [2]

আয়াতের  উভয় অর্থের মধ্যে প্রায়োগিক কোন বিরোধ নেই।

 

ইসলামবিরোধীরা অপবাদ দেয় যে কুরআনের মহাবিশ্ব সম্পর্কে তত্ত্বগুলো আরবের প্রতিবেশি বিভিন্ন অঞ্চল যেমনঃ গ্রীসে প্রচলিত  ধারণা থেকে ধার করা। কিন্তু এ অভিযোগ নেহায়েতই অসত্য। একাধিক তত্ত্ব বা তথ্যে মিল থাকার অর্থ এই নয় যে তার একটা আরেকটার নকল। কুরআনে মহাকাশ সম্পর্কে কোন ধারণাই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। কুরআনের সাথে ঐসব অঞ্চলের সেসব তত্ত্বেরই মিল দেখা যায় যেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য। কিন্তু সেসব তত্ত্বের ভুল দিকগুলো কুরআনে দেখা যায় না। [বিস্তারিত দেখুনঃ লেখা ১  ও লেখা ২ এ] এটা প্রমাণ করে যে কুরআনের তথ্যগুলো সেসব স্থান থেকে ধার করা নয় বরং এর এটি বিশ্বজগতের স্রষ্টার কাছ থেকে আগত। এরিস্টটলের মত ছিল পৃথিবী শক্ত ও মজবুত হয়ে মহাবিশ্বের মাঝখানে স্থির হয়ে বসে আছে। গ্রীক জ্যোতির্বিদ টলেমী(১০০-১৭৮ খ্রিষ্টপূর্ব) পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব দেন এবং পৃথিবীকে স্থির বলে অভিহীত করেন। টলেমীর পর থেকে প্রায় ১৫০০ বছর এই ধারণা প্রচলিত ছিল। অথচ কুরআনে পৃথিবীর ঘূর্ণণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় [আম্বিয়া ২১:৩৩]। এর প্রায় ১৫০০ বছর পর নিকোলাস কোপার্নিকাস অপেক্ষাকৃত সঠিক একটি তত্ত্ব দেন, তিনি সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন এবং বলেন যে পৃথিবী ও অন্য গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তবে তার তত্ত্বে এটা বলা ছিল যে সূর্য স্থির। আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে সূর্যও আবর্তনশীল। অথচ কুরআন ১৪০০ বছর আগে বলেছে যে সূর্য আবর্তনশীল [ইয়াসিন ৩৬:৩৮,৪০]

 

“আল্লাহ ঊর্ধ্বদেশে আকাশমণ্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতিত” - আয়াতের প্রারম্ভের এই গূঢ় বিষয়টি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব বহন করে। আমরা শুধুমাত্র আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সম্পর্কে জানি। মহাবিশ্ব বা আকাশমণ্ডলীর সীমানা বা শেষ প্রান্ত সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই, আধুনিক বিজ্ঞান এ ব্যাপারে অবগত নয়। কাজেই বিজ্ঞানের আলোকে “আসমান শক্ত কিছুর তৈরি কি না” এটি চট করে সিদ্ধান্তে যাবার মত কোন বিষয় নয়। আল কুরআনের মাধ্যমে আমরা আকাশের সীমার ব্যাপারে জানি যে যেখানে সত্যিই শক্ত কিছু রয়েছে।[3]  বিজ্ঞান এখনো সে পর্যায়ে যেতে পারেনি, মহাকাশের শেষ সীমা দেখতে পারেনি। তবে বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত যেটুকু অগ্রগতি সাধন করেছে, তার আলোকেও বলা যায় যে এই আয়াতে কোন প্রকারের বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি নেই। কুরআনে ‘আকাশ’ কথাটি ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলের ভেতরের অংশ যেখানে মেঘ ভাসমান থাকে সে স্থানকে ‘আকাশ’ বলা হয়েছে [যেমনঃ বাকারাহ ২:২২], সৌরজগতসমূহ ও নিকটবর্তী দৃশ্যমান মহাশূন্যকেও ‘আকাশ’ বলা হয়েছে [যেমনঃ মুলক ৬৭:৫], আবার সমগ্র মহাবিশ্বকেও  আকাশ বলা হয়েছে [যেমনঃ সাজদাহ ৩২:৪]। কাজেই ‘আকাশ’ দ্বারা বিভিন্ন পরিমাণের এলাকাকে বোঝানো হয়। অতএব  ‘সৌরজগত’, ‘গ্যালাক্সী’ ইত্যাদি বিভিন্ন পরিমাপের এলাকা ‘আকাশমণ্ডলী’র অন্তর্ভুক্ত। আর এই আকাশমণ্ডলীর বিভিন্ন উপাদান হচ্ছে নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহ,উপগ্রহ ইত্যাদি। অর্থাৎ আকাশমণ্ডলী হচ্ছে এর বিভিন্ন উপাদান যেমনঃ নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহ,উপগ্রহ ইত্যাদির সমষ্টি। একটি স্তম্ভের কাজ হচ্ছে কোন ভারী বোঝা উপরে তুলে ধরা। আমাদের নিকট আকাশ যেমন ভাসমান বলে প্রতীয়মান হয় তেমনি পৃথিবীর চারদিকে পরিব্যপ্ত বায়ুমণ্ডলের বাইরে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, জ্যোতিষ্কমণ্ডলী মহাশূণ্যের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আকাশমণ্ডলী বা মহাবিশ্বে ভেসে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহ,উপগ্রহসমূহের একটা ভার রয়েছে যা ১১শ’ শতাব্দীতে আল-বিরূনী প্রকাশ করে গিয়েছেন এবং পরবর্তীকালে কুরআন নাজিল হওয়ার প্রায় ১২০০ বছর পর নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কারের ফলে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন যেমন আমরা জানি যে মহাকাশে বিরাজমান গ্রহ, উপগ্রহ বা কোন জড় বস্তু একটি শক্তি দ্বারা পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। এই শক্তি ঐ সকল বস্তুর ভরের সমানুপাতিক এবং পারস্পরিক দূরত্বের বর্গায়তনের ব্যাস্তানুপাতিক। মহাকাশে বিরাজমান এ সকল গ্রহ, উপগ্রহ, জ্যোতিষ্কমণ্ডলী ভেঙে পড়ে না বা পরস্পরের মধ্যে কোন সংঘর্ষের সৃষ্টি করে না। কারণ নিরন্তর কক্ষপথ পরিক্রমা থেকে উদ্ভুত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কেন্দ্রাতিগ শক্তি এরূপ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। স্পষ্টতই কেন্দ্রাতিগ শক্তি দ্বারা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ভারসাম্যকরণ এই আয়াতে উল্লেখিত “স্তম্ভ ব্যতিত আকাশমণ্ডলী স্থাপন” কিংবা “অদৃশ্য স্তম্ভের” ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি মূলত কোন স্তম্ভ নয়, কিন্তু স্তম্ভের ন্যায় ভারসাম্য রক্ষা করে যাচ্ছে;  অদৃশ্য স্তম্ভের মত কাজ করে যাচ্ছে। সূর্য, চন্দ্র ও জ্যোতিষ্কসমূহ আল্লাহর নির্দেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তা কুরআনের একাধিক স্থানে আলোচিত হয়েছে।

 

একটি বিষয়ে সকলের ধারণা থাকা উচিত যে কুরআন কোন বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআন যখন অবতীর্ণ হয় তখন মানব সভ্যতার কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি যে মাধ্যাকর্ষণ বা কেন্দ্রাতিগ শক্তির সূত্র বা তত্ত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানতে পারবে। সে সময়ের মানুষের বোঝার জন্য উপযোগী শব্দমালা দ্বারা কুরআন মহাবিশ্বের এই সত্য তথ্য সম্পর্কে আলোচনা করেছে যা বর্তমান সময়ের বিজ্ঞানের আলোকেও সত্য বলে প্রমাণিত।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]  আল কুরআন, রা’দ ১৩:২

[2]  কুরআনুল কারিম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির(ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া) ১ম খণ্ড, সুরা রা'দের ২নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ১২৫৮ দ্রষ্টব্য

[3]https://www.youtube.com/watch?v=T3vtWwFbtQo

 

সহায়ক গ্রন্থঃ 'আল কুরআনে বিজ্ঞান'; অনুবাদ পরিষদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।